বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ওসমানদের সাদা ইঁদুর
স্নিগ্ধা আফসানা রোশনী
বরিশাল
স্কুলটা ওসমানদের বাড়ি থেকে দূরে,বেশ খানিকটা দূরে।তাকে হাতে অনেকখানী সময় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হয়।ক্লাসে ঠিকসময়ে পৌঁছাতে হলে ঘড়ি ধরে সবকাজ শেষ করতে হয়।এতে অবশ্য তার সমস্যা হয়না।ওসমানের সময়জ্ঞান ভালো।
খুব ভোরে তার ঘুম ভাঙ্গে,দাঁত মাজতে মাজতে সে পুকুরঘাটে চলে আসে।এসময় ওসমানের হাতে থাকে মাছের খাবারের টিন।রাতে আটা গুলে সে ছোট্ট ছোট্ট গোল্লা বানিয়ে রেখেছে।পুকুর মাছে ভর্তি ওদের।পাড়ে বসে ওসমান পুকুরে খাবার ছিটায়,মাছেদের সাথে কথা বলে।ওর কথা মাছেরা বুঝল কি বুঝল না তাতে ওসমানের তেমন মাথাব্যথা নেই।তাছাড়া ওর ধারনা পশু-পাখি মানুষের কথা বুঝতে পারে।না পারলে হাজার বছর ধরে মানুষ-পশুপাখি একসাথে থাকে কিভাবে!পাশাপাশি থাকতে হলেই তো ভাবের আদান-প্রদান করতে হয়!
সময় নিয়ে দাঁত মাজে ওসমান,তার উদ্দেশ্য হল যত বেশি সময় মাছদের কাছাকাছি থাকা যায়।তারপর আসে উঠোনে।উঠোন ঝকঝক করছে,কোথাও একটুকরো ময়লা পড়ে নাই।ওসমানের মায়ের কাজ।এই মহিলার পরিষ্কারের বাতিক আছে।সব কিছু ঝকঝকে তকতকে চাই।
ওসমানের আগেই আয়েশা আক্তারের ঘুম ভাঙ্গে।ফযরের নামাজ সেরেই মহিলা ঝাড়ু হাতে কাজে লেগে পড়েন।টিনের দোতলা ঘর তার,গতবছর ওসমানের বাবা মেঝে পাকা করিয়েছেন।নতুন মেঝে এখনও চকচক করে।এই চকচকে আয়েশার ভালো লাগে না।ওসমানের পরনের পুরনো গেঞ্জি কেটে তিনি ন্যাকড়া বানিয়েছেন।সেই ন্যাকড়া ভিজিয়ে মেঝে মোছেন দিনের মধ্যে কয়েকবার।কালো মেঝে আরো বেশি চকচক করে।
উঠোনের একপাশে মুরগি-হাঁসে খোপ।ওসমানের বাবা হাতের কাজ ভালো জানেন।কাঠ,টিন আর বাঁশের খোপটা তিনিই বানিয়েছেন।ওসমান হাঁস-মুরগির খোপ খুলে দেয়।আহা বেচারাদেরও তো সকাল হওয়া দেখতে ইচ্ছা করে।রাতের বেঁচে যাওয়া ভাতে পানি দিয়ে রাখেন ওসমানের মা।সকালে সেই পান্তাভাত ওসমান হাঁস-মুরগিকে দেয়।পিলপিল করে ওরা ছুটে যায় খাবারের দিকে,সারারাত না খেয়ে সকালে তো পাগলের মতো ক্ষুধা লাগে ওদের।ওসমানের মায়া লাগে।সে উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে বসে দেখে।আহা,বেচারারা!
কালো-বাদামী কুকুরটাকে ক’দিন ধরে বেশ শুকনো দেখাচ্ছে।ওসমান যখন ওটাকে রাস্তা থেকে উঠিয়ে আনে তখন একদম ন্যাদান্যাদা বাচ্চা ছিল ওটা।মায়ের দুধ খেয়ে খেয়ে বেশ পেটমোটা হয়ে উঠেছে।ওসমান স্কুলে যাওয়ার সময় কুকুর পরিবার দেখতে দেখতে যেত।তিনটা মোটাসোটা বাচ্চা,মায়ের কোলের মধ্যে।কি যে ভালো লাগত তখন ওসমানের।
মায়ের কাছ থেকে ওইটুকুন দুধের বাচ্চা তুলে নিয়ে আসার ছেলে ওসমান না।একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সে আর তার বন্ধুরা দেখে মা কুকুরটা মরে পড়ে আছে,বাচ্চাগুলো তখন পর্যন্ত টের পায়নি তা।মা তো প্রায়ই এভাবে পড়ে পড়ে ঘুমায়।বাচ্চারা মনের আনন্দে দুধ খেয়ে যাচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে ওসমানের কি যে মন খারাপ হল যা বলার না।সে ভালো ছাত্র,পড়াশুনায় বেশ মন তার। ক্লাসে স্যারের কথা সে খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে,খাতায় লেখে।ঐদিন ক্লাসে কিছুতেই মন দিতে পারল না।ঘুরেফিরে মা হারা কুকুরের বাচ্চাগুলোর কথা মনে পড়েছে।কি খাবে ওরা,কোথায় থাকবে!
আয়েশা আক্তার কুকুর পছন্দ করেন না।আগেও ওসমান কুকুরের বাচ্চা বাড়িতে আনার চেষ্টা করেছে।আয়েশা বেগম এমনিতে খুব নিরীহ মহিলা।ওসমানের পশু-পাখির প্রতি মায়ার কথা তিনি জানেন,বেশ ভালোই জানেন।অসহায়,বোবা জীবের প্রতি মায়া থাকতে হয়।জীব যে ভালবাসবে আল্লাহপাক তাকে ভালবাসবেন।এটা আয়েশার কথা না।হাদিস-কোরানের কথা।ছেলের অবলা জীবের প্রতি ভালবাসা দেখতে তার বড় ভালো লাগে।
কিন্তু কুকুর তিনি ঘরে আনতে চান না।ঘরের আশেপাশেও কুকুর থাকলে ফেরেশতা আসে না।আল্লাহর রহমত থাকে না সেই ঘরের উপর।এটা তো জানা কথা,সবাই জানে।
ছেলের জন্য তাড়াতাড়ি রান্না করেন আয়েশা।ছেলের পছন্দের খাবার,তেলাকুচি পাতার বড়া,মাষকলাইয়ের ডাল দিয়ে ছোট মাছের চচ্চড়ি।স্কুল থেকে ফিরলেই ওসমানের খিদে লাগে।“মা ভাত দেও,ভাত দেও তাড়াতাড়ি” করেতে থাকে।আর করবেই তো, পড়ালেখা কি মুখের কথা।পরিশ্রম আছে না!
ছেলে স্কুল থেকে ফেরার পর আজ চেঁচামেচি করল না,এই ব্যাপারটা আয়েশা খেয়াল করলেন।বইখাতা বিছানার উপর নামিয়ে রেখে সে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।ঘটনাটা কি?আয়েশা ছেলের পিছু পিছু ঘর থেকে বের হয়ে এলেন এবং হতবাক হয়ে গেলেন।
কলিম উদ্দিনের বেশ নাম-ডাক গ্রামের মধ্যে।এই নাম এমনি এমনি আসেনি।রাত দিন খেটে খেটে সে এই নাম বানিয়েছে।গ্রামের তার নাম হয়েছে এই কিছুদিন আগে।এখন কলিম উদ্দিনের ডাক পড়ে গ্রামের যে কোন আলোচনায়,সালিশে তার মতামত অন্যরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন।
একসময় এই কলিম উদ্দিনের কিছুই ছিল না।বাড়িঘর,গোয়ালের গরু,গোলার ধান কিছুই না।শহর থেকে তার এক বন্ধু এল,লোকে বলে ঐ বন্ধুই তার ভাগ্য নিয়ে এসেছে।কিছু কিছু মানুষ অন্যের ভাগ্য বহন করে আর সময় মতো তাকে দিয়ে আসে।
কলিম উদ্দিন এসব বিশ্বাস করে না।তার বন্ধু তাকে কিছু পরামর্শ দিয়েছে এ কথা ঠিক কিন্তু ভাগ্য-টাগ্য ওসব ভুল কথা।
হাতে নতুন পয়সা এলে লোকজন খুব দিল দরিয়া হয়ে যায়।কলিম উদ্দিন সেই দলে পড়ে না। সে তার যক্ষের ধনের মতো নিজের সম্পত্তি আঁকড়ে রাখে।একমুঠো চালও ভিক্ষা ডিতে তার কষ্ট হয়!
এই ধরনের মানুষের কাছে গেলে সাহায্য পাওয়া যাবে না সে তো জানা কথা।ক্লাস সিক্সের ছেলে ওসমানও তা বোঝে।কিন্তু এ মুহূর্তে তার হাতে আর কোন উপায় নেই।তাছাড়া কলিম চাচা এসময় বাড়িও থাকেন না,এই তথ্য ওসমানের জানা।তবু সে আশা ছাড়তে পারল না।
ওসমানের ভাগ্য ভালোই বলা যায়।কলিম উদ্দিন বাড়িতেই ছিলেন।উঠোনে মাদুর পেতে রোদে পিঠ দিয়ে আছে।ইদানীং পিঠের ব্যথাটা বেশ বেড়েছে।তার বয়স বেশি না।এ বয়সেই বাত ধরে গেল কি-না কে জানে!রোদের পিঠ দিলে গরমে ব্যথার আরাম হয়।
কলিম উদ্দিন তার দিকে বাড়িয়ে দেওয়া মেলামাইনের বাটির দিকে বিরক্তমুখে তাকালেন।ওসমান বাটিটা এনেছে। একটু গরুর দুধ চাই তার!
চোখ পারলে কপালে তুলে ফেলেন কলিম উদ্দিন।বলে কি এই ছেলে?গরুর দুধ চাইছে সে।একে তো পয়সা দেবে না,তাও আবার কুকুরের বাচ্চার জন্য!মাথাটা গেছে না-কি!
ওসমান করুন মুখ করে তাকিয়ে আছে।রাস্তা থেকে বাচ্চাটাকে তুলে আনা ছাড়া তার আর করার কিছুই ছিল না।সে যখন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে বাচ্চাগুলোকে তার বাড়ি নিয়ে যাবে তখন সে দেখে একটাই বাচ্চা রাস্তায় শুয়ে শুয়ে কুঁইকুঁই করছে!ওর বাকী দুজন ভাই-বোনকে ওসমান আশেপাশে অনেক খুঁজেও পেল না।নিশ্চয়ই কেউ নিয়ে গেছে।যাক,সেটাও খারাপ হয়নি।কিন্তু একটা বাচ্চাকে ফেলে রেখে গেল কেন কে জানে!
ওইটুকু একটা বাচ্চাকে রাস্তায় ফেলে চলে যাওয়া ওসমানের পক্ষে সম্ভব হয়নি।সে তুলে নিয়ে এসেছে।মা কুকুরের বাচ্চা পছন্দ করেননা ওসমান খুব ভালো করেই জানে।এমনিতে তার মা একদমই রাগ করেন না।কিন্তু কুকুর দেখলেই মা রেগে যান।তাদের বাড়িতে গরুও নেই যে গরুর দুধ খাওয়াবে।তখন প্রথমেই ওসমানের কলিম চাচার কথা মনে পড়ল।তিনিও দেন কি-না কে জানে।তবু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই।ওসমানের মা উঠোনে দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করছেন,এই ফাকে ওসমান একটা বাটি আর বগলে কুকুরছানা নিয়ে বের হয়ে এল।
ভ্রু কুঁচকে ওসমানের দিকে তাকিয়ে আছেন কলিম।নবীন শেখের এই ছেলেটাকে সে চেনে।প্রায়ই কোলে ছাগলের বাচ্চা,বিড়াল নিয়ে ঘুরতে দেখা যায়।ছেলেটা বাপের মতো হয়েছে।কলিম উদ্দিনের পুরনো কথা মনে পড়ল।সে আর নবীন শেখ বন্ধুর মতোই ছিল।কুকুর-বিড়াল নিয়ে ছানাছানি তারাও করেছে।নবীন শেখ বিয়ে-থা করল, কাজ করতে শহরে চলে গেল,সে গ্রামে থেকে গেল। সংসার তাকে দিয়ে হবে না সে বোঝে।
ওসমান বাটিটা এখনও বাড়িয়ে ধরে আছে কলিম উদ্দিনের দিকে,তিনি বিরক্ত মুখে বললেন, “এই প্রথম আর এই শেষবার”।
হাঁসমুরগির জন্য রাখা পান্তাভাত,ওসমানের নিজে কম খেয়ে খেয়ে কুকুরটাকে খাওয়ায় ওসমান।খেয়েদেয়ে অল্পদিনেই কুকুরের বাচ্চা বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠল।আয়েশা আক্তারের চেঁচামেচিও কমে গেছে ইদানীং।অবশ্য এ জন্য ওসমানকে কুকুরছানা বাড়ির পেছনের বাশবাগানে রেখে দিয়ে আসতে হয়েছে।ওখানে অবশ্য সে ভালোই আছে ধারনা করা যায়।ওসমান টিন,খড় দিয়ে সুন্দর ছোট্ট ঘর বানিয়ে দিয়েছে।
নবীননগর গ্রামটা বেশি বড়ও না আবার ছোটও না।মাঝামাঝি আকারে আছে।লোকজন একে-অন্যকে চেনেজানে।সুখে-অসুখে খোঁজ খবর নেয়।খাওয়া-পরার খুব রমরমা না থাকলেও অভুক্ত থাকেনা কেউ একবেলাও।চাষবাস করে লোকজন বেশ ভালোই আছে।
ওসমানের মামাবাড়ি নবীননগরের দু’গ্রাম পরে।প্রতিবছর ওসমানের স্কুলে আম-কাঠালের ছুটি হলে মামাবাড়ি থেকে লোক আসে ওসমান আর তার মাকে নিয়ে যেতে।
এবছর ছুটি শুরু হয়ে গেছে প্রায় সপ্তাহ গড়িয়েছে,কেউ আসেনি নিয়ে যেতে।চিন্তায় আয়েশার মুখে দানা-পানি ওঠে না।রাতে ঘুমালে আজেবাজে স্বপ্ন দেখে।ওসমানের আব্বাকে নিয়ে দেখে।মানুষটা বিদেশ বিভূঁইয়ে থাকে,কেমন থাকে কে জানে!তবে গতপরশুই সে ওসমানের আব্বার চিঠি পেয়েছে।মানুষটা প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে চিঠি পাঠায়।আয়েশা আক্তারের চিন্তা তবু দূর হয় না।
আজেবাজে স্বপ্ন সে বাপের বাড়ির লোকজন নিয়েও দেখে।খারাপ স্বপ্ন বদ জ্বিন দেখায় আয়েশা তা জানে।তখন ডান কাত হয়ে শুতে হয় তিনবার থুথু ফেলতে হয়।সবই করে আয়েশা।তবু তার মন শান্ত হয়না।খারাপ কিছু ঘটল ঐ গ্রামে!নাহ,কালই সে লোক পাঠাবে বাপের বাড়ি।সাথে ওসমানকে দিয়ে দেবে।ছেলেটা মামাদের ন্যাওটা হয়েছে।
ওসমানদের পাশের বাড়িতে থাকে তার এক দূর সম্পর্কের চাচা,হাশেম আলী।সে ভ্যানে করে গঞ্জে যায়।নিজের ভ্যান,তাতে হরেক মাল থাকে।কাচের চুড়ি,ফিতে থেকে শুরু করে এলুমিনিয়ামের পাতিল,মাটির কলসি সবই পাওয়া যায়।
আয়েশা হাশেম আলীর কাছে যেয়ে কেঁদে পড়ল।ছোটভাইয়ের এই বউকে হাশেম আলী বেশ পছন্দ করে।একদিন ব্যবসা না হবে।উপায় কি! আপনজনদের বিপদে উপকারে না এলে কিসের আত্মীয়!
ভ্যানে হলুদ নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা সব মাল খুলে ফেলল হাশেম আলীর বউ।পাশে বসে চাচীর কাজ দেখছে ওসমান।তাকে নারিকেলের নাড়ু খেতে দেওয়া হয়েছে।এই জিনিসটার প্রতি ওসমানের লোভের ব্যাপারটা তার এই চাচী ভালোই জানেন।সন্তান নেই বলে ওসমানের প্রতি তার ভালবাসারও সীমা নেই!
চাচার ভ্যানে আরাম করে বসে ওসমান মামাবাড়ি রওনা দিল।মা মামাদের জন্য গুড়,নারিকেল দিয়ে বানানো চিড়ার মোয়া,কিছু বাতাসা,একটা মুরগি দিয়ে দিয়েছে।ভ্যানে যেতে সময় লাগবে না বেশি তবু আয়েশা ছেলে আর ভাসুরের জন্য ভাত রেঁধে প্লাস্টিকের বাক্স করে দিয়ে দিয়েছে।পথে যেতে যেতে খিদে ত পেতেই পারে।আর গ্রামের হাওয়া বদলালে এমনিতেই মানুষের খিদে বেশি লাগে।
পলাশপুর পৌঁছাতে ওসমানদের সন্ধ্যা লেগে গেল।পশ্চিমের আকাশে তখন লাল রঙ ধরে গেছে।হাশেম আলী নামাজ পড়ার জন্য অস্থির বোধ করলেন।মাগরিবের ওয়াক্ত বেশিক্ষন থাকে না।গায়ের পশম দেখা নয়া গেলে বুঝতে হবে ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে।নিজের হাতের দিকে তাকালেন হাশেম আলী।আছে,ওয়াক্ত আছে।পশম দেখা যাচ্ছে এখনও।
এই ভর সন্ধ্যায় গ্রামটা সুনসান হয়ে আছে।এই সময় লোকে বদনা নিয়ে কলপাড়ে থাকবে,ওযু করে মসজিদে যাবে।লোকজন তেমন দেখা যাচ্ছে না।ওসমানের মামাবাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিলেন হাশেম আলী।না দিয়েই বা উপায় কি,এই সন্ধ্যায় দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বসে আছে সবাই।
বেশ কয়েকবার জোরে জোরে ডাক দেওয়ার পর খুঁট করে একটা শব্দ হল।ওসমান আনন্দে চিৎকার করে উঠল-
“চাচাজান,খুলেছে দরজা,খুলেছে”।
হাশেম আলী ভাতিজার উচ্ছ্বাস দেখে ম্লানমুখে হাসলেন।এদের কি হয়েছে এটা ভেবে তিনি চিন্তিতবোধ করছেন!
দরজা খুলে বের হয়ে এসেছেন ওসমানের বড় মামী।তাকে দিশেহারার মতো দেখাচ্ছে।অতিথিদের দেখে আনন্দ প্রকাশ করার কথাও তিনি ভুলে গেছেন যেন।
ওসমান ছুটে গিয়ে মামীকে জড়িয়ে ধরলে তার হুঁশ ফিরল।তিনি অতিথিদের ঘরে নিয়ে গেলেন।
ঘরে টিমটিম করে একটা বাতি জ্বলছে।বাতির প্রাণবায়ু শেষ হয়ে আসছে বলেই মনে হচ্ছে।এই বাতিতে অন্ধকার কমেনি বরং পরিবেশ রহস্যময় হয়ে গেছে।
এই গরমেও গায়ে একটা কাঁথা চাপিয়ে চৌকিতে শুয়ে আছে কে যেন।অন্ধকার সব জমাট বেঁধে আছে ওখানে।ওসমানের কেমন ভয় ভয় করতে লাগল।এ কোথায় এল সে।এই বাড়ি আর গত ছুটিতে আসা মামাবাড়ির মাঝে কত অমিল।মামাবাড়ি পা দিলেই বড়মামা তাকে কাঁধে তুলে নেন।মামী এসে তার পা ধুইয়ে দেন।চুলে হাত বুলিয়ে আদর করেন।ছোটমামা তাকে নিয়ে তাদের আম-কাঠালের বাগানে ঘুরে ঘুরে বেড়ান।আম খেতে খেতে আর ভাত খাওয়ার জায়গা থাকে না পেটে।মামাতো ভাই-বোন দুজনের সাথে সারাগ্রাম ছুটে বেড়ায়।ওদেরও দেখা যাচ্ছে না,হলটা কি ওসমানের ছোট্ট মাথায় তা ধরে না!
গায়ে কাথা চাপিয়ে শুয়ে আছে্ন ওসমানের বড়মামা।সাতদিনের জ্বর আর ভেদবমিতে তাকে দেখে আর চেনা যায় না।শুকিয়ে বিছানার সাথে মিশে গেছেন।কি হয়েছে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার তা ধরতে পারছেন না।গঞ্জে নিয়ে যাবেন সে উপায়ও নেই।আম-কাঠালের বাগান,জমিজমা যা ছিল সব মাতব্বর ভুয়া কাগজ দেখিয়ে দখল করে নিয়ে গেছেন।এখন ঘরে ভাত রান্না হবে নয়া এমন অবস্থা।ওসমানের ছোট মামা গেছেন গঞ্জে টাকার ব্যবস্থা করতে।তাও আজ তিনদিন,খবর নেই তার কোন।কোন বিপদ হল কি-না আল্লাহই জানেন।
একবছরের মধ্যে ওসমানের মামাদের অবস্থা নেমে এসেছে।ঘরের অবস্থা খারাপ দেখে ছেলেমেয়ে দুটোকে তাদের নানাবাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।আর যাই হোক না খেয়ে তো থাকতে হবে না।
হাশেম আলী সব দেখে শুনে খুবই দুঃখিত হলেন।নবীননগর ফিরে ভাইয়ের বউকে কি করে এসব বলবেন!
ওসমানের মনটা যা খারাপ হল।সে কি করবে এখানে থেকে এখন!মামাদের রান্নাঘরে একটা জিনিস দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
চাচার সাথে যখন বাড়ির পথে রওনা দিল তখন কেবল ভোরের আলো ফুটেছে।ওসমানের মন খারাপ ভাব একদমই নেই।মামার জন্য খারাপ লাগলেও একটা জিনিস হাতে পেয়েই তার মনটা ভালো হয়ে গেছে।
এর আগে যতবার গ্রামে এসেছে ওসমান ততবার শনের মতো একমাথা চুলের কুঁজো এক বুড়িকে দেখেছে।এই ভোরেও তাকে গাছতলায় বসে বসে মাথা চুলকাতে দেখা গেল।
ওসমানের দিকে আঙ্গুল তুলে বুড়ি খ্যানখ্যানে গলায় বলল, “নিস না গো নাতি,সর্বনাশ লগে কইরা নিস না”।
ভাতিজা ভয় পাচ্ছে ভেবে হাশেম আলী ওখান থেকে ভ্যান তাড়াতাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেলেন।রোদ মাথায় উঠার আগেই তাকে গ্রামে ফিরতে হবে।
আয়েশা আক্তার ভাসুরের কাছে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে ভাইয়ের বাড়ির কথা সব জিজ্ঞেস করেন।হাশেম আলী রেখে-ঢেকে যা বললেন তাতেই আয়েশার মাথায় হাত।সে কেঁদে কেটে একটা কান্ড করল।তার স্বপ্ন সত্যি হল।হায় আল্লাহ,কেন তার সাথেই এমন হয় বারবার!এই ভালোমানুষ ভাই-ভাবী কি এমন দোষ করল!ভালোমানুষের সাথেই কেন এমন হয়।
ওসমানের সেদিকে কোন খেয়াল নেই,সে তার নতুন সঙ্গী পেয়ে গেছে।তার সারাদিন কেটে যায় ওদের সাথে।মামাবাড়ির রান্নাঘরে খাঁচার মধ্যে অযত্নে পড়েছিল।মামীকে বলতেই দিয়ে দিয়েছেন।যত্ন করার কেউ নেই।নিজেদেরই ঠিক নাই ইঁদুরের জন্য কে সময় দেবে।এতদিন রেখেছে ছেলের শখ বলে।আগে নিজেরা সামলে নেওয়া যাক সব পরে শখ মেটানো যাবে।
পলাশপুর থেকে সপ্তাহখানেক পরে লোক এল ওসমানদের বাড়ি।ওসমানের বড়মামা সুস্থ হয়ে উঠছেন ধীরে ধীরে।ছোট মামাও দিনরাত কাজ করে তাদের জমি উদ্ধার করতে শুরু করেছেন।
খবরটা শোনার সাথে সাথে আয়েশা দশ রাকায়াত শোকরানা নামাজ আদায় করল।আল্লাহ মুখ তুলে তাকিয়েছেন।
সাদা ইঁদুরগুলো ওসমানের সার্বক্ষনীক সাথী হয়ে গেল।যেখানেই যায় সাথে ইঁদুরের খাঁচা থাকে।যে ছেলে একদিনও স্কুল কামাই দেয়না সেই ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে আয়েশার ঘাম ছুটে যায়।পড়ালেখায় বিন্দুমাত্র মন নেই তার।
কলিম উদ্দিনের গোপন ব্যবসা মার খেয়েছে হঠাত,কেউ যেন হাত ধরে তাকে টেনে মাটিতে নামিয়ে নিয়ে এসেছে।এক সন্ধ্যায় মাঠ থেকে ঘরে তোলার জন্য গিয়ে সে তার গরুগুলোকে খুঁজে পায় মৃত অবস্থায়।সুস্থ,সবল গরু মরে পড়ে আছে মাঠে,মাছিরা উড়ে বেড়াচ্ছে মৃত পশুর গায়ে।গরমের দিনে মাছির উপদ্রব বেড়ে যায়।
গত তিন সপ্তাহে স্বামীর কাছ থেকে একটাও চিঠি পায়নি আয়েশা,পায়নি সংসার চালানোর টাকা।নিজের জমানো টাকার উপর খরচ চালাচ্ছে।দরকার হলে ভাইয়ের কাছে সাহায্য চাইবে সে।কিন্তু ওসমানের আব্বার কি হল!মানুষটা ঠিক আছে তো?দিনরাত আল্লাহপাককে ডাকে সে,মানুষটা যেন ভালো থাকে!
মানুষটা যে ভালো আছে সে খবর এনে দেন হাশেম।গঞ্জে মাল কিনতে গিয়ে সে দু’চার কথা শোনে।পরে নিজে খোঁজ-খবর করে নিশ্চিত হয়।এত ভালো বউটাকে ফেলে বাজারের মেয়েমানুষ বিয়ে করে তার ভাই কি সুখ পেল তিনি খুঁজে পান না।ছেলেটার কথা ভাবলো না একবারও?ভাইয়ের বউ আর ছেলেটার জন্য তা বড় মায়া লাগে।
ওসমানের সাদা ইঁদুর প্রতি দু’সপ্তাহে বাচ্চা দেয়।কি নরম,গোলাপী দেখতে বাচ্চাগুলো।ওরা ওদের সংসার বাচ্চাকাচ্চা দিয়ে ভরিয়ে ফেলে।ওসমানের মনও আনন্দে ভরে যায়।
মামাবাড়ির কুঁজো বুড়ির কথার অর্থই সে বোঝনি।তার বোঝার কথাও না।বোঝেনা সর্বনাশী সাদা ইঁদুরগুলো।দূর্ভাগ্য দিয়ে তারা ঘর মনের আনন্দে ভরিয়ে ফেলে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now