বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি রহিমা বেগম।আমি একজন গৃহিণী।আজ আমার ছেলে রবিনের ১৮তম জন্মদিন।ছেলের জন্য পায়েশ রান্না করেছি।তার প্রতি জন্মদিনেই আমি তার জন্য পায়েশ রান্না করি।আমার স্বামি একজন সরকারি চাকুরিজীবী।রবিন আমাদের একমাত্র সন্তান।তাই একমাত্র ছেলেকে আমরা ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছি।তাকে অনেক শাসন এর মধ্যে রেখেছি।কখনো মুক্ত ভাবে চলাফেরা করতে দিতে চাই নি।আর আজ আমার ছেলে এমনভাবেই মুক্ত হয়ে গেছে আমাদের থেকে যে তাকে আর কোনোদিন ফিরে পাবো না।হ্যা আমার ছেলে এক বছর আগে মারা গেছে।সে আমাদের উপর অভিমান করে না ফেরার দেশে চলে গেছে।এই প্রথম তার জন্মদিনে ছেলেটা নিজেই নেই আর।পায়েশ টা পড়ে আছে টেবিল এ কিন্তু কে খাবে এই পায়েশ।প্রতিবার রবিন এর জন্মদিনে রবিনকে আমি নিজ হাতে পায়েশ খাইয়ে দেই কিন্তু এ বছর আমি কাকে খাইয়ে দিব পায়েশ।আজ খুব মনে পড়ছে পুরোনো স্মৃতি।এক বছর আগে যখন রবিন এসএসসি পরিক্ষা দিবে।আমাদের একমাত্র সন্তান দেখে আমরা ওকে খুব কঠোর শাসনে রাখতাম।আমাদের ইচ্ছা ছিল যে আমাদের ছেলে একজন নামকরা ভালো ডাক্তার হবে।তাই তার কারো সাথে মেলা মেশা,খেলাধুলা করা কিছুই করতে দিতে চাইতাম না।শুধু স্কুল,কোচিং আর প্রাইভেট এর মধ্যে রাখতাম।রবিন যখন জেএসসি পরিক্ষায় পাশ করলো শুধু পাশ না অনেক ভাল রেজাল্ট করলো তখন নবম শ্রেণীতে ওকে আমরা সাইন্সে ভর্তি করে দিলাম।তখন ছেলেটার থেকে জানার প্রয়োজন ও বোধ করি নি আমরা যে সে সাইন্স পরতে চায় কি না।শুধু নিজেদের ইচ্ছটাকে তার উপর চাপিয়ে দিয়েছি।রবিন পড়াশোনার থেকে খেলাধুলা বেশি পছন্দ করতো।অনেকে আমাদের বলছে যে আপনাদের ছেলে অনেক ভালো ফুটবল খেলে।তাকে ভালো দেখে কোনো ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করে দিন।কিন্তু আমরা সেই সেসব কথার গূরুত্ব দেই নি।আমাদের একটাই ইচ্ছা যে আমাদের ছেলে ভালো ডাক্তার হবে।নবম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার পর সাইন্সের বিষয়গুলোতে রবিন ভাল করতে পারছিল না।তার পরিক্ষার রেজাল্ট খারাপ হচ্ছিল।এতে ওর বাবা ওকে অনেক বকা দিত।ওহ প্রাইভেট স্কুল ফাকি দিয়ে ফুটবল খেলতে যেত এই জন্য ওর বাবা ওরেহ অনেক মারধরও করতো।আমিও কিছু বলতাম না।আমার মনে হতো ওর বাবা ঠিকই করছে।রবিন আমাকে প্রায়ই বলতো যে আম্মু আমি সাইন্স পড়তে পারছি না।এগুলো আমার মাথায় ঢুকছে না।আমি ফুটবল খেলতে পছন্দ করি।আমাকে ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দাও।কিন্তু আমি ওর কথা শুনতাম না।আমাদের একটাই জেদ যে রবিনকে ভালো ডাক্তার হতেই হবে।তাইতো তার প্রাইভেট আরো বাড়িয়ে দিলাম।সাইন্সের সকল বিষয়ের প্রাইভেটের ব্যাবস্থা করলাম।সকালে প্রাইভেট তারপর স্কুল তারপর বিকেলে কোচিং তারপর রাতে আবার বাসাতে একজন শিক্ষক পড়াতে আসতো।আমার ছেলেটা একটুও সময় পেত না খেলাধুলা করার জন্য।আমরা চাইতাম আমাদের যত খুশি টাকা খরচ হোক কিন্তু আমাদের ছেলে মানুষ হোক। সে যেন একজন ভালো ডাক্তার হোক।রবিনের দশম শ্রেণীর টেস্ট পরিক্ষার ফলাফল বের হলো কিন্তু সে ভাল রেজাল্ট করতে পারলো না।এই জন্য আমরা ওরেহ অনেক বকাঝকা করি।তারপর ওইদিন রাতে খাবার সময়ও ওর বাবা ওরেহ বকাঝকা করে।অনেক বুঝাই আমরা যে বাবা এসব ফুটবলের চিন্তা বাদ দে।ফুটবল খেলে তুই কিছু করতে পারবি না।তাই আমাদের কথা শোন।পড়াশোনা কর।পরেরদিন সকালে রবিনকে ডাকছি কিন্তু রবিন উঠছে না।ওর সকাল সকাল প্রাইভেট আছে কিন্তু আজ উঠছে না কেন।কোনদিন তো এমন করে না।ওর বাবা আর আমি দরজা ধাক্কা দিচ্ছি কিন্তু ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসছে না।এতে আমি ভয় পেয়ে যাই।ভয় হতে থাকে যে আমার ছেলেটার কিছু হলো না তো।সে আবার কিছু করে বসলো না তো আবার।তারপর ওর বাবা প্রতিবেশি কয়েকজনকে ডেকে এনে দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকলো।তারপর আমরা যা দেখলাম।যাতে আমার মনে হচ্ছে যেন আমার পায়ের নিচে মাটি সড়ে যাচ্ছে।আমার কলিজাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে।আমার ভয়টাই সত্যি হলো।দেখলাম রবিন ঘরের ফ্যানের সাথে দড়ি লাগিয়ে তার নিজের গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।হ্যা আমার ছেলে আমাদের উপর অভিমান করে নিজেকে হত্যা করেছে।চলে গেছে না ফেরার দেশে।রবিনের পড়ার টেবিল এ একটি চিঠি পড়ে ছিল।সেখানে লিখা ছিল................
প্রিয় আব্বু-আম্মু,
আমার পক্ষে আর এতো চাপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।তোমরা চাও আমি ডাক্তার হই।কিন্তু আমি ডাক্তার হতে চাই না।আমি ফুটবলার হতে চাই।তোমরা আমার ইচ্ছাটাকে মূল্য দিচ্ছ না।সবসময় প্রাইভেট,কোচিং এর চাপে আজ আমি ক্লান্ত।একটু যেন প্রাণখুলে নি:শ্বাস নেওয়া সময় নেই আমার।এত চাপ আমার পক্ষে আর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিদায় নিচ্ছি আমি এই পৃথিবী ছেড়ে তোমাদের ছেড়ে।তোমরা আমার জন্য ছোট থেকে অনেক কিছু করেছো।অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছো আমায়।তোমাদের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়।যখন তোমরা এই চিঠিটা পড়বে তখন আমি আর বেচে থাকবো না।তোমরা আমাকে মাফ করে দিও।আমি তোমদের ভাল ছেলে হতে পারলাম না।
ইতি
তোমাদের আদরের ছেলে রবিন।
চিঠিটা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছি।এই এক বছরে প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে রবিনের বাবা চিঠিটা পড়ে আর চোখের পানি ফেলে।আর আমাকে বলে আমাদের ছেলে এত চাপ আর কষ্ট নিজের মনে রেখে দিয়েছিল।কখনো আমরা তার মনের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করি নি।সে কি চায় সেটা ভাবি নি।সবসময় নিজেদের ইচ্ছা আমাদের ছেলের উপর চাপিয়ে দিয়েছি।
এই বলে প্রতিরাতে কান্না করে রবিনের বাবা।
আর আমি মা হয়েও আমারে ছেলেরে বুঝি নাই।যেই ছেলেরে দশ মাস দশ দিন পেটে রাখছি।কত কষ্ট করে মানুষ করেছি।আর সেই আমি একজন পাষাণ মা যে ছেলের ইচ্ছার প্রাধান্য দেই নি।আমার জন্য আমার ছেলে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে।তাইতো আমাক নিজেকে একজন খুনি মা মনে হয়।
তাই আমি সকল বাবা মা কে অনুরোধ করে বলছি।আপনার ছেলেমেয়েকে বোঝেন।নিজেদের ইচ্ছা ওদের উপর চাপিয়ে দিবেন না।সে যা হতে চাও তাকে তাই হতে দিন।দেখবেন সে একদিন আপনাদের মুখ উজ্জ্বল করবে।কখনো আমার মত ভূল করবেন না।আপনার একটা ইচ্ছা কি আপনার সন্তান এর থেকে বড় হতে পারে?সন্তান ই যদি বেচে না থাকে তাইলে কাকে ডাক্তার বানাবেন?কাকে ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন?তাই ছেলেমেয়েকে শাসন করবেন ঠিক আছে কিন্তু সেটা বেশি নয় তার উপর চাপ সৃষ্টি করে নয়।তাকে তার ভাল লাগা নিয়ে এগিয়ে যেতে দিন।নিজেদের ইচ্ছা ছেলেমেয়ের উপর চাপিয়ে দিয়ে আমার মতো নিজ সন্তান হারানোর দুয়ার খুলে দিবেন না।
নিজের একমাত্র ছেলে হারানোর যে কি কষ্ট তাহ এই একবছরে টের পেয়েছি। আজ নিজে মা হয়ে বেচে আছি।আর আমার ছেলে অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে।অতিত এর কথা গুলো মনে করতে করতে দেখি চোঁখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে।আজ কান্না করে চোঁখের পানি শুকিয়ে গেলেও আর কোনোদিন ফিরে পাবো না আমার ছেলেকে।আমার রবিন কে।নিজের ভূলে হারিয়ে ফেলছি আমার ছেলেকে।রবিন বাবা একবার ফিরে আয়।তুই যদি ফিরে আসতি বলতাম যাহ ফুটবেল খেল।তোকে ডাক্তার হতে হবে না।তুই শুধু আমার কোলে ফিরে আয় একবার।ফিরে আয় রে রবিন ফিরে আয় রে আমার কলিজার টুকরা।তোর মা কে ক্ষমা করে দে রে।তোকে যে কতো কথা বলার ছিল।কত কথা যে জমে আছে আমার মনে।কথাগুলো আর বলা হলো না নিজের মনেই থেকে গেলো কথাগুলো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now