বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমদ মুসার পরনে শিখ ড্রাইভারের পোশাক। মাথায় শিখের পাগড়ি। মুখভরা কালো দাড়ি। গায়ে ড্রাইভারের ইউনিফরম।
পেছনের সিটে ইস্তাম্বুল হার্ডওয়্যার লিমিটেড-এর জিএম ইসমাত ওসমানেগলু। জরুরি ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির কিছু স্পেয়ার পার্টস দরকার। পার্টসগুলোর স্পেসিফিকেশন আছে। তার অনুকরণেই স্পেয়ার পার্টসগুলো তৈরি হবে। এই অর্ডার নিয়েই যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানের জিএম ইসমাত ওসমানেগলু আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোম্পানীর কাছে।
আহমদ মুসা আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ওয়েব সাইটে দেখেছে, কোম্পানিটি জার্মানি ও জাপানের মিল-মেশিনারিজ এবং অফিস ইকুপমেন্ট তৈরিকারি দু’টি সোল এজেন্ট হওয়া ছাড়াও অর্ডারের ভিত্তিতে স্পেয়ার পার্টস তৈরি ও সরবরাহ করে থাকে।
আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজের ভেতরে ঢোকা এবং ভেতরের একটা অবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেয়ার জন্যে এর চেয়ে সস্তা ব্যবস্থা করার কোন পথ আর আহমদ মুসারা পায়নি।
আহমদ মুসা নকল ড্রাইভার। কিন্তু ইস্তাম্বুল হার্ডওয়্যারের জিএম ইসমাত ওসমানেগলু নকল নন। তিনি সত্যিই প্রতিষ্ঠানটির জিএম। একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে আনা হয়েছে। তবে স্পেয়ার পার্টস তাদের দরকার, এটা ঠিক।
বসফরাসের পূর্ব তীর ধরে একটা দামি মার্সিডিস এগিয়ে চলছে উত্তর দিকে।
গাড়িটা হাইওয়ের কেলি ইবরাহিম অংশে পৌঁছার পর সতর্ক হয়ে উঠল আহমদ মুসা। সামনেই ‘মারকাজ বেকিজ’-এর মোড়।
গাড়ি পৌঁছল মারকাজ বেকিজ-এর বিখ্যাত ব্যস্ত স্থানটিতে। এখান থেকে রাহিকায়া রোড পূর্ব দিকে গেছে। এই রোড ধরে তাদের পূর্বে পার্বত্য এলাকার দিকে এগোতে হবে।
রাহিকায়া রোড সাত-আট মাইল চলার পর গাড়ি গিয়ে পড়ল আকবাবা রোডে।
ঠিক যে স্থানটায় আহমদ মুসাদের গাড়ি আকবাবা রোডে উঠল, সেখানে সামনে বিরাট একটা বনজ উপত্যকা। তারপরেই একটা পার্বত্য ভূমি ধীরে ধীরে উপরে উঠে গেছে।
এই বনজ উপত্যকাতেই গড়ে উঠেছে আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড।
রাহিকায়া রোড থেকেই একটা পাথুরে প্রাইভেট রোড গাছের সারির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে আরও ভেতরে।
আহমদ মুসার গাড়ি একটি প্রাইভেট রোডে গিয়ে পড়ল।
পেছন থেকে ইসমত ওসমানেগলু আহমদ মুসাকে বলল, ‘ওদের সাথে যোগাযোগ করে আসিনি। ওরা কি ঢুকতে দেবে, সাক্ষাৎ দিতে রাজি হবে?’
‘সেটাও টেস্ট করা আমাদের আজকের একটা লক্ষ্য।’
আড়াইশ’ তিনশ’ গজ এগোবার পর বাধা পেয়ে আহমদ মুসা গাড়ি থামিয়ে দিল।
দু’জন লোক রাস্তার দু’পাশ থেকে লাল পতাকা তুলে গাড়ি থামাতে নির্দেশ দিল।
আহমদ মুসা গাড়ি রাস্তার একপাশে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল।
লাল পতাকাধারী দু’জন লোক ছুটে এলো গাড়ির কাছে। একজন লোক খোলা জানালার দিকে ইসমাত ওসমানেগলুর সাথে কথা বলার জন্যে এগোলো, আরেকজন দাঁড়াল আহমদ মুসার পাশে এসে।
‘স্যার, কোথায় যাবেন?’ ইসমত ওসমানেগলুর দিকে এগিয়ে যাওয়া লোকটি জিজ্ঞেস করল ইসমাত ওসমানেগলুকে।’
‘আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজে।’ বলল ইসমত ওসমানেগলু।
‘কার কাছে?’ আবার জিজ্ঞাসা লোকটির।
‘জরুরি প্রয়োজন। সেল্স বা প্রোডাকশন ডিপার্টমেন্টের দায়িত্বশীল যাকেই পাই তার সাথে আলোচনা করব।’ বলল ইসমাত ওসমানেগলু।
লোকটি একটু চিন্তা করল। বলল, ‘আপনি কি এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছেন?’
‘বললাম তো খুব জরুরি ব্যাপার। মার্কেটে অনেক ঘুরেছি, তারপর সোজা এখানে আসছি শেষ ভরসা হিসেবে। যোগাযোগের সময় পাইনি।’ বলল ইসমত ওসমানেগলু।
‘ঠিক আছে, এসব গেটে গিয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসারকে বলবেন। কিন্তু আপনাদেরকে গাড়ি রেখে যেতে হবে। প্লিজ আপনারা নামুন। গাড়ি এখানেই পার্ক করা থাকবে।’
আহমদ মুসা নেমেছে। ইসমাত ওসমানেগলুও নামল।
‘গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না কেন?’ গাড়ি থেকে নেমেই আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল তার সামনের লোকটিকে।
‘এখানকার এটাই নিয়ম। সবাইকেই এখানে গাড়ি রেখে যেতে হয়। শুধু তো গাড়ি নয়, আপনাদের ব্যাগে, পকেটে মেটালিক কিছু থাকলে সেগুলোও রেখে যেতে হবে।’ জবাবে লোকটি বলল।
ভ্রূ কুঞ্চিত হলো আহমদ মুসার।
তার মনের কোণে একটা চিন্তা ঝিলিক দিয়ে উঠল। মনে মনে চমকে উঠল। কিন্তু বিষয়টা মনেই রেখে মুখে বিস্ময় টেনে বলল, ‘আমরা যে স্পেয়ার পার্টস কিনতে যাচ্ছি, তার অনেক রকমের স্যাম্পল আমাদের ব্যাগে আছে ! সেগুলো না নিলে আমাদের চলবে কি করে?’
‘আমরা সেটা জানি না। সেটা ওখানে গিয়েই বলবেন। তারা সেটা দেখবেন, এমনকি পকেটের চাবি, হাতের আংটি সবই আপনাদেরকে গাড়ির ভেতর রেখে যেতে হবে।’ একেবারে নিরস কন্ঠে বলল লোকটি।
‘আচ্ছা একটা কথা, আপনাদের ইন্ডাস্ট্রিজের লোকরাও কি এভাবে মেটালিক সব কিছু রেখে ভেতরে যায়?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা। তার মনে এ রকমের অনেক প্রশ্ন কিলবিল করছে।
‘তারা এ পথে যান না।’ বলল লোকদের একজন।
‘কোন্ পথে যান? আমরাও সে পথে যেতে পারি? কোন্ দিকে পথটা?’ জিজ্ঞেস করল আবার আহমদ মুসা।
লোক দু’জন বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘সেটা আকাশ দিয়ে কি পাতাল দিয়ে তা আমরা জানি না। কথা রাখলে, আমরা যেভাবে বলেছি, সেভাবে যেতে পারেন। না হলে ফিরে যান।’
‘দুঃখিত, মাফ করবেন। আমরা তো সাংঘাতিক ঝামেলায় পড়েছি! জিনিসগুলো খুব জরুরি। সেজন্যেই বলছিলাম। আমরা যদি মালিকদের অনুরোধ করি টেলিফোনে, তাহলে কি তারা পথটা আমাদের দেখিয়ে দিতে পারেন?’ খুব নরম গলায় বিনয়ের সাথে বলল আহমদ মুসা।
লোকটি পূর্ণ দৃষ্টিতে আহমদ মুসার দিকে তাকাল। ওষুধে ধরেছে বলে মনে হলো। তার চোখে নরম ভাব নেমে এসেছে। বলল, ‘স্বয়ং ঈশ্বর নেমে এলেও সে পথের সন্ধান পাবেন কিনা সন্দেহ আছে। আরে মিয়া, যাবেনই বা কি করে? পাহাড়ে কি গাড়ি চলে?’
‘পাহাড়ে যাবো কেন?’ আহমদ মুসা বলল।
‘পথ তো ওখানেই।’ বলল একজন।
‘পাহাড়-টাহাড় থাক, এখন বলুন, কোনওভাবে গাড়ি নিয়ে গেটে যেতে পারবো কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘দেখুন, আপনারা ফিরে যান। এভাবে স্পেয়ার পার্টস কেনার জন্যে এখানে কখনও কেউ আসেনি। আপনারা ফিরে গিয়ে বসদের সাথে যোগাযোগ করুন।’ বলল ওদের দু’জনের একজন।
‘সেটাই ভালো!’ বলে আহমদ মুসা ইসমাত ওসমানেগলুকে বলল, ‘ঠিক আছে। গাড়িতে উঠুন।’
আহমদ মুসা ও ওসমানেগলু দু’জনেই গাড়িতে উঠল।
আহমদ মুসা গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলতে শুরু করল।
‘গেলেই কি ভালো হতো না গাড়ি রেখে!’ ইসমাত ওসমানেগলু বলল।
‘দরকার নেই, ইসমাত ওসমানেগলু, যেজন্যে আসা তা হয়ে গেছে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘হয়ে গেছে?’
‘হ্যাঁ, ইসমত ওসমানেগলু।’
‘আলহামদুলিল্লাহ!’ বলল ব্যবসায়ী ইসমাত ওসমানেগলু। কথা সে বাড়াল না। সে জানে, গোয়েন্দা বিভাগের অনেক জরুরি কাজ। জরুরি প্রয়োজন থাকে। সব জানা তাদের ঠিক নয়।
আরিয়েহ ইন্ড্রাস্ট্রিজের পূর্ব প্রান্তের পাহাড়ে উঠেছে আহমদ মুসা।
স্যাটেলাইট ফটোতে পাহাড়ের এই এলাকা নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করেছে আহমদ মুসা। আরিয়েহ ইন্ড্রাস্ট্রিজে ঢোকার পথে দু’জন লাল পতাকাধারীর কাছ থেকে জেনেছিল এই পাহাড়ী এলাকা থেকে আরিয়েহ ইন্ন্ড্রাস্ট্রিজে ঢোকার গোপন পথ রয়েছে।
গাড়ি ও কোন প্রকার মেটাল দ্রব্য নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার পথ নেই, লাল পতাকাধারীরা বাধা দেয়া থেকে এ বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, আরিয়েহ ইন্ড্রাস্ট্রিজের চারদিক ঘিরে একটা নিষিদ্ধ এলাকা তারা সৃষ্টি করেছে যে এলাকায় তাদের নিরব ধ্বংসের দৈত্য সক্রিয় থাকে। শত্রুরা যাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে এজন্যেই এই ব্যবস্থা। কেউ প্রবেশ করতে চেষ্টা করলে তাদের অস্ত্র হাওয়া হয়ে যাবে, এমনকি বিস্ফোরকের সাথে যদি মেটালিক কিছু থাকে, তাহলে তাও বিস্ফোরিত হয়ে নষ্ট হয়ে যাবে।
আহমদ মুসারা পাহাড়ের গোপন পথেই আরিয়েহ ইন্ডাসস্ট্রিজে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লাল পতাকাধারীদের কথা থেকে যা বুঝা গেছে তাতে এই পথে মেটালিক অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করা যাবে। কিন্তু আহমদ মুসারা মেটালিক অস্ত্র ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাণহানি এড়িয়ে যুদ্ধ ছাড়াই আরিয়েহ ইন্ড্রাস্ট্রিজের গবেষণাগার ও অস্ত্রশস্ত্র দখলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা গ্যাস অস্ত্র ব্যবহারের।
আহমদ মুসা ক্রলিং করে এগোচ্ছে।
এলাকাটা ফ্লাট, কিন্তু এবড়ো-থেবড়ো।
টার্গেটটা এখনও বেশ দূরে।
টার্গেট হলো ছোট আকারের ডিশ প্লাস কম্যুনিকেশন এ্যান্টেনা। এ্যান্টেনা দাঁড়িয়ে আছে প্রায় চার ফুট উচু পাথুরে পিলারের ওপর। পিলারটা হবে চার বর্গফুটের মতো প্রশস্ত। আহমদ মুসারা সন্দেহ করেছে গোপন সুড়ঙ্গ পথ এখানেই থাকতে পারে।
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে ঐ এ্যান্টেনার দিকেই এগোচ্ছে।
আহমদ মুসার গায়ে পাথুরে রঙের একটা বুলেট প্রুফ জ্যাকেট। কপাল পর্যন্ত নেমে এসেছে বুলেট প্রুফ জ্যাকেটটি। গলায় ঝুলছে হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটর ও একটি গ্যাস মুখোশ। হাতের কাছে জ্যাকেটের বুক পকেটে রয়েছে আল্ট্রা ক্লোরোফরম গান। এই গ্যাস ক্যাপসুল বুলেট মানুষের সংস্পর্শে যাওয়ার সংগে সংগেই মানুষের সংজ্ঞা লোপ পায়।
সামনে বড় পাথর পথ রোধ করে উঁচু হয়ে আছে।
পাথরটা ডিঙাবার জন্যে মাথা তুলেছিল আহমদ মুসা।
হঠাৎ সামান্য যান্ত্রিক একটা শব্দে সামনে তাকিয়ে হালকা অন্ধকারে দেখতে পেল, এ্যান্টেনাটি একদিকে কাত হয়ে গেছে।
কৃষ্ণপক্ষের রাত হলেও তারার আলো উন্মুক্ত জায়গায় অন্ধকার অনেকখানি ফিকে করে দিয়েছে।
আহমদ মুসা মাথাটা পাথরের আড়ালে এনে চোখ রাখল টার্গেট স্থানটার দিকে।
পার হলো কয়েক মূহুর্ত।
প্রশস্ত পিলারের ভেতর থেকে মানুষ বেরিয়ে আসতে দেখল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার চোখ এবার আঠার মতো লেগে গেল দৃশ্যটির ওপর।
এক এক করে পাঁচজন লোক বেরিয়ে এলো।
পঞ্চম ব্যক্তি বেরিয়ে এলে একজন গিয়ে কাত হয়ে পড়া এ্যান্টেনার গোড়ায় কি যেন করলো। এ্যান্টেনা আবার সোজা হয়ে প্রশস্ত পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে গেল।
আহমদ মুসা বুঝল পিলারটি আসলে সিঁড়ির মুখ বা সুড়ঙ্গ মুখ। এ্যান্টেনা হচ্ছে সুড়ঙ্গ মুখের ক্যামোফ্লেজ। আর এ্যান্টেনার গোড়ায় রয়েছে সুড়ঙ্গ মুখ খোলার চাবিকাঠি।
পাঁচজন একত্র হয়ে উদ্যোগ নিল সামনে মানে পাহাড়ের ওপর দিকে এগোবার।
আহমদ মুসা আর সময় নষ্ট করল না।
তারা এ সিদ্ধান্তই নিয়েছে প্রথম সুযোগেই তারা আক্রমণে যাবে, লোকটিকে অচল করে দেবে। সেই ফর্মুলাই এখন বাস্তবায়ন শুরু করার পালা।
আহমদ মুসাও বুক পকেট থেকে আল্ট্রা ক্লোরোফরম গ্যাস ক্যাপসুল বের করল। গানটা ওদের দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দিল। মানব দেহের সান্নিধ্যে গিয়ে অটো-বিস্ফোরণযোগ্য ক্যাপসুল বুলেট ছুটল সামনের পাঁচজনের দিকে।
মাত্র কয়েক সেকেন্ড!
ওরা পাঁচজনই সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল পাথুরে চত্বরে।
একটু সময় অপেক্ষা করল আহমদ মুসা। তার পর এগোলো ক্রলিং করেই ওদের দিকে।
ওদের কাছে পৌঁছে আহমদ মুসা পেন্সিল টর্চ জ্বেলে ওদের একবার করে দেখে নিতে লাগল।
একটি মুখে টর্চের আলো স্থির হয়ে গেল। স্তম্ভিত হয়ে গেল বিজ্ঞানী আবদুর রহমান আরিয়েহকে দেখে! আজই তার ফটো দেখেছে আহমদ মুসা জেনারেল মোস্তফার ফাইলে।
আনন্দে ভরে গেল আহমদ মুসার মন। শুরুতেই পেয়ে গেছে আসল লোককে। সাথের এ লোকগুলোও নিশ্চয় গুরুত্বপূর্ণ কেউ হবে।
আহমদ মুসা দ্রুত মেসেজ পাঠালো পাথুরে এই এলাকার পাশে অপেক্ষমান তার টিমের লোকজনদের কাছে। তাদের তাড়াতাড়ি আসতে বলল এই পাঁচজনকে নিয়ে যাবার জন্যে।
আহমদ মুসা সেই পাথরের আড়ালে বসে অপেক্ষা করতে লাগল ওদের আসার জন্যে।
এই সময় আহমদ মুসা একটা চাপা হিস হিস শব্দ শুনে ওপরের দিকে তাকাল।
দেখল, মাথার ওপর একটা হেলিকপ্টার নেমে আসছে।
হেলিকপ্টারের আলো নেভানো ও অনেকটা নিঃশব্দে। নিয়ন্ত্রিত শব্দের এ হেলিকপ্টারগুলো অত্যন্ত দামি।
হেলিকপ্টারটি ল্যান্ড করল যেখানে পাঁচজন লোক সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে আছে, তা থেকে কিছুটা পূর্বে, পাহাড়ের আরও উঁচুতে। ওখানে পাহাড়ের মাথাটা যথেষ্ট সমতল।
ওদের সংজ্ঞাহীন হওয়ার ঘটনার পর পরই হেলিকপ্টার আসায় আহমদ মুসা বুঝল, হয় এই হেলিকপ্টারে আবদুর রহমান আরিয়েহদের কোথাও যাবার কথা ছিল অথবা এই হেলিকপ্টারে বড় কেউ আসছেন, যাদের স্বাগত জানানোর জন্যই তারা যাচ্ছিলেন ওদিকে।
হেলিকপ্টার থেকে এক এক করে নামল চারজন মানুষ। ওরা এগিয়ে আসতে লাগল এ্যান্টেনার দিকে।
এ্যান্টেনার সামনেই পড়ে আছে পাঁচজনের সংজ্ঞাহীন দেহ।
কথা বলছিল হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসা লোকগুলো।
বেশ বড় গলাতেই কথা বলছিল তারা।
কে একজন বলছিল, ‘মি. ডেভিড ইয়াহুদ, বিজ্ঞানি আরিয়েহ ও তার সহযোগি চারজন বিজ্ঞানী ঠিক রাত ৯টায় এখানে রেডি থাকবেন এবং তাদেরকে এখান থেকে নিয়ে তৃতীয় জায়গাটায় মিটিং-এ বসব, এটাই তো সিদ্ধান্ত ছিল। ওরা আসেননি, আর্শ্চয!’
‘আমি স্তম্ভিত হচ্ছি, মি. বেন জায়ন বেন ইয়ামিন! মিটিং-এর স্থান শেষ মূহুর্তে পাল্টে আমরা আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজেই মিটিংটা করব ঠিক করা হয়েছে, এটা তো বিজ্ঞানী আরিয়েহদেরকে জানানো হয়নি! তাহলে সিদ্ধান্ত অনুসারে ওরা এখানে থাকবেন না কেন, বিশেষ করে ‘থ্রি জিরো’র সুপ্রিম কমান্ডার বেন জায়ন বেন ইয়ামিন হেলিকপ্টারে থাকবেন, তার উপস্থিতিতে সিদ্ধান্তের অন্যথা তিনি করবেন, তা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।’
একথাগুলো ‘থ্রি জিরো’র ইস্তাম্বুল প্রধান ডেভিড ইয়াহুদের। তা প্রথম জনের কথা থেকেই আহমদ মুসা বুঝল। আর যাকে লক্ষ্য করে ডেভিড ইয়াহুদ কথাগুলো বললেন অর্থাৎ যিনি প্রথম কথা বলেছিলেন, তিনি বেন জায়ন বেন ইয়ামিন ও ‘থ্রি জিরো’র সুপ্রিম কমান্ডার মানে সুপ্রিমপ্রধান।
একই সাথে বিস্ময় ও আনন্দে আহমদ মুসার মন নেচে উঠল। ‘থ্রি জিরো’র সব হিরোকে আল্লাহতায়ালা এক সাথে করে তাদের কাছে এনে দিয়েছেন। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল আহমদ মুসা।
ওরা এসে পৌঁছে গেছে সংজ্ঞাহীন পাঁচজনের কাছে।
কাছাকাছি হতেই ওরা চারজন ছুটে এলো মাটিতে পড়ে থাকা পাঁচজনের দিকে।
ওরা চারজনই ঝুঁকে পড়েছে ওদের সংজ্ঞাহীন দেহের ওপর।
এটাই সময়, সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল আহমদ মুসা।
বুক পকেট থেকে আরেকবার উঠে এলো ক্লোরোফরম গান আহমদ মুসার হাতে।
ক্লোরোফরম গানটা ওদের দিকে টার্গেট করে ট্রিগারে তর্জনি চেপে ধরল আহমদ মুসা।
ছুটল ক্যাপসুল বুলেট ওদের চারজনের দিকে।
মাত্র আট-দশ সেকেন্ড। এর মধ্যেই ওদের চারজনের সংজ্ঞাহীন দেহ ঝরে পড়ল ওদের পাঁচজনের ওপর। ওরা সেই যে ঝুঁকে পড়েছিল, উঠে দাঁড়ানোরও আর সু্যোগ পেল না।
পেছনে পায়ের পরিচিত শব্দ পেল আহমদ মুসা। মুখ ঘুরিয়ে দেখল, তার দশ জনের টিমটি এসে গেছে।
আহমদ মুসা কমান্ডো টিমের নেতা মুরাদ আনোয়ারকে নির্দেশ দিল, ‘এ্যান্টেনার কাছে ৯ জন লোক সংজ্ঞাহীন পড়ে আছে। প্রথমে এদের সবাইকে পিছমোড়া করে বাঁধ। তারপর এদের নিয়ে নিচে গিয়ে পুলিশে কাছে হস্তান্তর কর। তারা যেন জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধানের নির্দেশ আনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মনে রেখ, এরা সবাই ভিভিআইপি বন্দী। একটুও অসাবধান হওয়া যাবে না।’
ওরা নির্দেশ নিয়ে স্যালুট করে চলে গেল।
আহমদ মুসা এবার কল করল জেনারেল মোস্তফাকে।
ওপারে জেনারেল মোস্তফার কন্ঠ পেতেই আহমদ মুসা সালাম দিয়ে বলল, ‘আল্লাহর অসীম করুণা, যুদ্ধ শুরুর আগেই যুদ্ধের বড় বিজয়টাই হয়ে গেছে! ধ্বংসের নিরব দৈত্যের প্রধান বিজ্ঞানী আবদুর রহমান আরিয়েহসহ চারজন বিজ্ঞানী, ‘থ্রি জিরো’র সুপ্রিমপ্রধান বেন জায়ন ও ড. ডেভিড ইয়াহুদসহ আরও নেতা, সব মিলিয়ে ৯ জন এখন আমাদের হাতে। কমান্ডোরা ওদের পাহাড়ের নিচের ক্যাম্পে নিয়ে যাচ্ছে।’
‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান। আপনি শুধুই বড় বিজয় বলছেন কেন? এটাই সবচেয়ে বড় বিজয়। প্রধান বিজ্ঞানীসহ পাঁচজন বিজ্ঞানী মাইনাস হলে নিশ্চয় ওদের ধ্বংসের নিরব দৈত্য অচল হয়ে পড়বে। আর বেন জায়ন ও ডেভিড ইয়াহুদ আমাদের হাতে আসা মানে ওদের সংগঠনকে এখন আমরা হাতের মুঠোয় আনতে পারব। এই অসাধ্য সাধন কি করে হলো মি. খালেদ খাকান?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘এটা একেবারেই আল্লাহর বিশেষ রহমত। এ্যান্টেনার স্থানটা পরীক্ষা করার জন্য পাহাড়ে উঠেছিলাম।’
বলে আহমদ মুসা ওদের ৯ জন সংজ্ঞাহীন করার ঘটনা সংক্ষেপে জানিয়ে বলল, ‘কমান্ডোরা ওদের রেখে ফিরে এলেই আমি এ্যান্টেনার সিঁড়ি পথে ভেতরে ঢুকবো।’
‘পাহাড়ের নিচের ক্যাম্পে আমি যাচ্ছি, মি. খালেদ খাকান। পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আপনার কিছু বলার আছে?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘চারদিকের বেষ্টনিকে আরও ক্লোজ করুন এবং আপনি ও নাজিম এরিকেন আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজের গেটের দিকে চলে আসবেন। আমি ভেতরে ঢোকার পর পরবর্তী প্দক্ষেপ নিয়ে আপনার সাথে মোবাইলে আলাপ করবো।’ আহমদ মুসা বলল।
‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান। আমি আপনার কলের অপেক্ষা করব। আর বেন জায়ন ও ডেভিড ইয়াহুদদের আমি গোয়েন্দা হেড কোয়ার্টারে সরিয়ে নিচ্ছি। ওকে মি. খালেদ খাকান। আসসালামু আলাইকুম।’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম’ বলে আহমদ মুসা কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা অপেক্ষা করতে লাগল কমান্ডোদের।
ওরা এলেই একটা পরিকল্পনা করে আহমদ মুসা প্রবেশ করবে থ্রি জিরোর গবেষণাগার, অস্ত্রাগার আরিয়েহ ইন্ডাস্ট্রিজের অভ্যন্তরে, যেখানে আছে নিরব ধ্বংসের দৈত্য, ‘Fotan silent destruction demon’ যার বলে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, দাস বানাতে চাচ্ছে আর সব মানুষকে।
আহমদ মুসার অপেক্ষার ইতি হলো।
তারার আবছা আলোতেই আহমদ মুসা দেখতে পাচ্ছে, কমান্ডোরা সার বেঁধে উঠে আসছে পাহাড়ের ওপরে।
এটা সাইমুম-৪৭ মত গল্প
পরবর্তী বই
মাউন্ট আরারাতের আড়ালে
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now