বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
‘তার মানে’, ভাবল আহমদ মুসা, ‘পাইপগান ফায়ার করার ছয় মিনিটের মধ্যেই ভিকটিমরা শারীরিকভাবে অচল হয়ে পড়বে।’
বিষয়গুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আহমদ মুসা তার মোবাইল থেকে একটা মিস কল দিল জেনারেল মোস্তফাকে।
মাত্র পাঁচ মিনিট। আহমদ মুসার হাতের মোবাইল ভাইব্রেট করতে শুরু করল। দেখল মোবাইলের স্ক্রীনে মেসেজের সিগন্যাল।
মেসেজটি ওপেন করল আহমদ মুসা। জেনারেল মোস্তফার মেসেজ: দাবি মানার সম্মতি তাদের জানিয়ে দেয়া হলো। তারা খুশি হয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে আমাদের।’
মোবাইলের কল অফ করে আহমদ মুসা হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরটা সামনে এনে শেষ বারের মতো পরীক্ষা করল, শত্রুরা ঠিক ২০ মিটার দূরে।
আহমদ মুসা দুই পাইপগানের ডিস্ট্যান্স এডজাস্ট করে সময় দেখে নিয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রথমে একটা পাইপ গান ফায়ার করল।
প্রথম পাইপগান ফায়ার করার পর দ্বিতীয় পাইপ গান তুলে নিয়ে হিউম্যান বডি সেঞ্জিং মনিটরে আবার ওদের ২০ মিটার দূরত্ব ঠিক আছে কি না দেখে নিয়ে আল্লাহর নাম নিয়ে দ্বিতীয় ফায়ার করল আহমদ মুসা। সময়টা আবার দেখে নিল। মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, ‘হে জগতসমূহের মহান সর্বশক্তিমান মালিক, আমার জ্ঞান-সামর্থ্য অনুসারে আমি চেষ্টা করলাম, ফল আপনার হাতে, ফল দেবার মালিক আপনি। আপনার কাছে সবচেয়ে ভালোটা প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের সাহায্য করুন।’
বলতে গেলে এই প্রার্থনাতেই আহমদ মুসার কেটে গেল ছয় সাত মিনিট।
শেষে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আহমদ মুসা ভাবল, আল্লাহ করেন তো এই সময়ের মধ্যে এনজি-৪ গ্যাস টিউব তার মিশন শেষ করেছে।
পরীক্ষার জন্যে আহমদ মুসা ক্রলিং করেই সামনে এগোবার সিদ্ধান্ত নিল। ওরা সক্রিয় থাকলে অবশ্যই গুলী আসবে। যেহেতু এই এগিয়ে যাওয়া হবে ওয়াদার খেলাফ, তাই এ গুলী বৃষ্টি ভয়াবহ ধরনের তীব্র হতে পারে।
বিসমিল্লাহ বলে আহমদ মুসা অগ্রসর হতে লাগল। খুব দ্রুত সে ঝুঁকিপূর্ণ উঁচু জায়গাটা পার হলো। কিন্তু ওদিক থেকে কোন গুলী এলো না।
মনটা খুশিতে ভরে গেল আহমদ মুসার।
তবু নিশ্চিত হবার জন্যে সাবধানে আরও অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রাখল।
কিন্তু গুলী আর এলো না।
আহমদ মুসা আরও এগোল।
চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে সুড়ঙ্গের ওদিক থেকে বড় দু’টি চোখ জ্বল জ্বল করছে। আলোর কালার দেখে বুঝল, ও দু’টি দরজার ঘুলঘুলি। তার মানে সে দরজার শেষ প্রান্তে এসে গেছে। মনিটরটি টেনে নিয়ে দেখল মাত্র ৪ থেকে ছয় মিটার দূরে ওরা। তার মানে আহমদ মুসা ওদের কাছেই দাঁড়িয়ে আছে।
আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল আহমদ মুসার মন। তাদের এনজি-৪ পুরোপুরি কাজ করেছে। ওরা সবাই এখন শারীরিকভাবে অকেজো।
আহমদ মুসা ব্যাগ থেকে টর্চ বের করে বাম হাতে নিয়ে ডান হাতে রিভলবার বাগিয়ে টর্চ জ্বালল।
টর্চের আলো গিয়ে পড়ল লুটোপুটি খেয়ে পড়ে থাকা কিছু মানুষের ওপর।
পড়ে আছে পাঁচজন মানুষ।
সকলেই নিশ্চল।
তাদের চোখে দৃষ্টি আছে, দৃষ্টির ভাষা আছে, কিন্তু গতি নেই।
ওদের চোখ-ভরা বিস্ময় আর ভয়!
আহমদ মুসার দু’চোখ আকুল হয়ে খুঁজছিল প্রেসিডেন্টকে।
প্রেসিডেন্ট ঐ পাঁচজনের মধ্যে নেই।
আহমদ মুসার লাইটের ফোকাস আরও সামনে গিয়ে সুড়ঙ্গ- মুখের দরজার ওপর গিয়ে পড়ল।
এগোল আহমদ মুসা দরজার দিকে ওদের ডিঙিয়ে।
দরজাটা ১ ইঞ্চিরও বেশি পুরু ইস্পাতের প্লেট। বিদ্যুৎ খুঁটির মতো মোটা ইস্পাতের দু’টি বার দিয়ে দরজা স্থায়ীভাবে বন্ধ। বার দু’টি দু’পাশের পাথরের দেয়ালে ঢোকানো এবং সিমেন্টের প্লাস্টার দিয়ে আটকে দেয়া। দরজাটা যেমন পুরু, তেমনি স্টিলের হুকটা হেভি। মনে হয় কামানের গোলা মেরেও এই দরজার কিছু করা যাবেনা।
বিকল্প পথ তাহলে আছে।
আহমদ মুসার টর্চের ফোকাস বামে, সামনে ঘুরে ডান দিকের একটা সিঁড়ির ওপর এসে পড়ল।
সিঁড়িটা একতলা সমান উঁচু এবং তা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা দরজায়।
সুড়ঙ্গ-মুখের দরজার মতোই ও দরজাটা পুরু স্টিলের মনে হলো।
দরজাটা আধা খোলা।
দরজার পাশেই পাঁচ-ছয় ইঞ্চি আয়তনের একটা স্টিল বার দেখে আহমদ মুসা বুঝল সুড়ঙ্গের দরজার মতো এই হেভি স্টিল বারটা দিয়েই এই দরজা বন্ধ ছিল। এ দরজাও কামান দেগে ভাঙার মতো নয়।
আহমদ মুসার মনে পড়ল প্রাসাদের লে-আউটে সে সুড়ঙ্গ-মুখের পাশে মিলিটারী পর্যবেক্ষন টাওয়ার দেখেছিল। এটাই কি সে টাওয়ার হতে পারে?
এক হাতে টর্চ, অন্য হাতে রিভলবার বাগিয়ে আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
পা দিয়ে দরজা ধীরে ধীরে পিছন দিকে ঠেলে দিয়ে তাকাল ঘরের ভেতরে। রিভলবারের ট্রিগারে তর্জনি ছিল আহমদ মুসার।
কিন্তু ভেতরে দেখল একই দৃশ্য।
প্রথমেই নজর পড়ল দু’জনের ওপর। দুই চেয়ারে ওদের দু’জনের দেহ নেতিয়ে পড়ে আছে।
ওদের দু’জনের সামনেই গ্রেনেড লাঞ্চার ও হেভি মেশিনগান। ওগুলো ফায়ার প্যানেলে বাইরের বিভিন্ন ডাইরেকশনে তাক করে পেতে রাখা।
পর্যবেক্ষণ প্যানেলে রয়েছে একাধিক দূরবিন।
আহমদ মুসা বুঝল, এসব জিনিসই মিলিটারিদের। সন্ত্রাসী কিডন্যাপাররা এগুলো দখল করে নিয়েছিল মাত্র।
আহমদ মুসা এবার তাকাল ঘরের পেছন দিকে। চেয়ার দু’টির একটু পেছনেই দেখতে পেল দু’টি সংজ্ঞাহীন দেহ। তাদের দেহে সামরিক পোশাক। এরাই পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে ছিল, এদের মেরে বা সংজ্ঞাহীন করেই তারা সিঁড়ি মুখের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার দখল করে নিয়েছিল।
আরো পেছনে এলো আহমদ মুসার চোখ।
পেছনে দেয়ালের সাথে লাগানো একটা বেড দেখতে পেল। পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের সৈনিকদের বিশ্রাম নেয়ার মতো একটা সাধারণ বেড। বেডের ওপর দেখতে পেল প্রেসিডেন্টের দেহ।
আহমদ মুসা ছুটে গেল প্রেসিডেন্টের কাছে। সংজ্ঞাহীন প্রেসিডেন্ট। নেতিয়ে পড়ে আছে তাঁর দেহ।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টের শিথিল একটা হাত তুলে পাল্স পরীক্ষা করল। পাল্স স্বাভাবিক।
আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল।
এই সময়ই মোবাইল কেঁপে উঠল আহমদ মুসার।
মোবাইলের কল অন করে সালাম দিতেই ওপার থেকে জেনারেল মোস্তফার উদ্বিগ্ন কন্ঠ, ‘মি. খালেদ, এদিকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। আপনার কলের অপেক্ষা করছিলাম। কি অবস্থা? সব ঠিক তো?’
‘মিশন সাকসেসফুল! এই মাত্র প্রেসিডেন্টের সংজ্ঞাহীন দেহের পাশে এসে আমি বসলাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আলহামদুলিল্লাহ! প্রধানমন্ত্রী মহোদয় আমার পাশে। আপনি তাঁর সাথে কথা বলুন।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘আসসালামু আলাইকুম, মি. খালেদ খাকান।’ ওপার থেকে প্রধানমন্ত্রীর গলা শোনা গেল।
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ! স্যার, আমি মহামান্য প্রেসিডেন্টের পাশে বসে। তিনি সংজ্ঞাহীন, কিন্তু ভাল আছেন। আমি পাল্স পরীক্ষা করেছি। একদম নরমাল।’
‘ধন্যবাদ মি. খালেদ খাকান। আমরা সবাই, আমার দেশ আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।’ প্রধানমন্ত্রীর ভারী কন্ঠ। আবেগে কাঁপছে তাঁর কন্ঠ।
‘স্যার, সব প্রশংসা আল্লাহর। তিনিই আমাদের সাহস, বুদ্ধি, শক্তি সব কিছু দিয়েছেন।’
‘ঠিক মি. খালেদ খাকান। কিন্তু আল্লাহ যাঁকে দিয়ে তাঁর কাজ করান, তিনি ভাগ্যবান। ভাগ্যবানকেই তিনি বাছাই করেন। শুনুন মি.! আমরা সবাই হেলিকপ্টার নিয়ে আসছি। আমি ম্যাডামকেও আনতে পাঠিয়েছি। তিনিও আসবেন। লতিফা আরবাকান তাঁকে নিয়ে আসবে। ওকে...।’
প্রধানমন্ত্রীর কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘স্যার, আপনারা আসুন। কিন্তু একটা হেলিকপ্টারেই আসতে হবে। যাতে পাহারায় বা পর্যবেক্ষণে থাকা শত্রুপক্ষ বুঝে যে, তাদের দাবি অনুসারেই হেলিকপ্টার এসেছে বিজ্ঞানী ড. আন্দালুসি ও খালেদ খাকানকে ওদের হাতে তুলে দিতে। তারা বুঝুক যে, তাদের বিজয় হয়েছে। প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ স্থানে না পৌঁছানো পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে গুড হিউমারে রাখতে হবে।
সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘ধন্যবাদ, মি. খালেদ খাকান, আপনি ঠিক বলেছেন। আবেগ আমাদের বাস্তবতা থেকে সরিয়ে এনেছিল। জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধানই শুধু প্রেসিডেন্টকে আনতে যাবে। আর প্রেসিডেন্ট ও আপনাকেই শুধু নিয়ে আসবে। হেলিকপ্টার চলে আসার মিনিট পনের পরে চারদিকের পুলিশ ও সেনা অফিসাররা গিয়ে সুড়ঙ্গের সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করবে। আমরা সকলেই সামরিক হাসপাতালের চত্বরে অপেক্ষা করছি।’
‘ধন্যবাদ স্যার, ঠিক চিন্তা করেছেন। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করুন!’ আহমদ মুসা বলল।
‘ওকে, মি. খালেদ খাকান। আসসালামু আলাইকুম।’ বলল প্রধানমন্ত্রী।
‘ওকে স্যার, ওয়া আলাইকুম সালাম।’
বলে আহমদ মুসা মোবাইলের কল অফ করে দিল।
আহমদ মুসা ঘড়ির দিকে তাকাল। দেখল, কিডন্যাপার ‘থ্রি জিরো’দের দেয়া দাবি পূরনের শেষ সময়ের আর ২০ মিনিট বাকি আছে। বিশ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার পৌঁছলেই ওরা ভাববে ওদের দাবি পূরণের জন্যেই হেলিকপ্টার এসেছে। আহমদ মুসার উদ্বেগ হলো, ওরা কোনওভাবে সন্দেহ করলে ওরা মরিয়া হয়ে মেটালিক ধ্বংসের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যার ফলে হেলিকপ্টার, গাড়ী মেটালিক কোন কিছু ব্যবহারই সম্ভব হবে না। প্রেসিডেন্ট ভবনের ওপর আমাদের সোর্ড- এর ডিফেন্স আমব্রেলা আছে, সামরিক হাসপাতাল পর্যন্ত সবটা পথের ওপর নেই।
আহমদ মুসাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলার ১০ মিনিটের মধ্যে হেলিকপ্টার এসে গেল।
বিমানবাহিনী হেলিকপ্টারের দক্ষ পাইলট গুহামুখের একদম সন্নিকটেই হেলিকপ্টার ল্যান্ড করাল। এসব মাউন্টেন রাইডার হেলিকপ্টার পাহাড়ে ল্যান্ড করার সামান্য সুযোগও কাজে লাগাতে পারে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করেতেই আহমদ মুসা পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের দরজা খুলে প্রেসিডেন্টকে কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এসে এগোলো হেলিকপ্টারের দিকে।
দীর্ঘ সময় পর বাইরের আলো-বাতাসের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ আহমদ মুসার।
চারদিকে চোখ যেতেই দেখল, পাহাড় ও বসফারাসে সেনা ও পুলিশের বেস্টনি তৈরী হয়ে আছে।
হেলিকপ্টার থেকে সিঁড়ি নেমে এসেছে।
আহমদ মুসা সিঁড়ির গোড়ায় পৌছতেই জেনারেল মোস্তফা ও পুলিশপ্রধান নেমে এলো।
তিনজন ধরাধরি করে প্রেসিডেন্টকে হেলিকপ্টারে তুলল।
হেলিকপ্টারটি একটি ফ্লাইং হাসপাতালও। একজন ডাক্তারও আছে।
প্রেসিডেন্টকে বেডে রাখতেই তাঁকে নিয়ে কাজে লেগে গেল ডাক্তার।
আহমদ মুসা প্রেসিডেন্টকে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর পুলিশপ্রধানও।
‘তুরস্ক আপনার এত ঋণ শোধ করবে কি করে মি. খালেদ খাকান?’ আবেগে কন্ঠ ভেঙে পড়ল জেনারেল মোস্তফার।
জেনারেল মোস্তফা, মি. খালেদ খাকানের গুলীবিদ্ধ স্থান থেকে রক্ত বেরুচ্ছে নতুন করে। ডাক্তার এদিকে দেখুন।’ বলল পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
জেনারেল মোস্তফা ডাক্তারের দিকে একবার তাকিয়ে ছুটে এলো আহমদ মুসার আহত জায়গাটা দেখার জন্যে। বলল, ‘এদিকের চাপে ভূলেই গেছি আপনার আহত হওয়ার কথা।’
ডাক্তার উঠে দাঁড়িয়েছিল।
‘না, ডাক্তার সাহেব, আপনি প্রেসিডেন্টকে পরীক্ষা করুন। ভার তুলতে গিয়ে চাপে একটু ব্লিডিং হচ্ছে। হাসপাতালে তো যাচ্ছিই। এখন কিছু দরকার নেই।’
‘আপনি প্রেসিডেন্টকে আনতে গেলেন কেন? আমরাই নিয়ে আসতাম। একটা বাহু এভাবে আহত হওয়ার পর কিছুতেই এ ভার বহন করা ঠিক হয়নি। কেন আমাদের নামতে নিষেধ করেছিলেন?’ বলল জেনারেল মোস্তফা।
‘আপনারা পরিচিত ব্যক্তিত্ব। হেলিকপ্টারে পুলিশপ্রধান ও গোয়েন্দাপ্রধান এসেছেন, এটা শত্রুকে জানানো হতো না। অন্য কিছু ঘটেছে বলে সন্দেহ করতো। যাক এ প্রসংগ। আসুন বসি।’ আহমদ মুসা বলল।
হেলিকপ্টার আকাশে উঠে আসার পর দ্রুত চলতে শুরু করেছে।
বসেছে আহমদ মুসারা।
‘মি. খালেদ খাকান, আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনি নিজেকে নিজেই বোধ হয় চিনতে পারবেন না। ধুলো, বালি, কালিতে আপনার পোশাকেরই শুধু রং পাল্টায়নি। মুখটাকেও অচেনা করে দিয়েছে।’
বলে হাসল জেনারেল মোস্তফা।
‘বহুকালের পুরানো সুড়ঙ্গ। ধুলো, বালি, কালির স্তর পড়ে গেছে। ওর মধ্যে দিয়েই গড়াগড়ি দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
পাশ থেকে ডাক্তার বলে উঠল, ‘আমাদের মহামান্য প্রেসিডেন্ট পারফেক্টলি ওকে। অল্পক্ষনের মধ্যেই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসবে। হাসপাতালে নিয়ে এ্যান্টি এনজি-৪ ইনজেকশন দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবেন।’
এবার দশ মিনিটও লাগল না সামরিক হাসপাতালে পৌঁছতে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করল সামরিক হাসপাতালের চত্বরে।
হেলিকপ্টার ল্যান্ড করতেই সিঁড়ি নেমে গেল। ছুটে এলো এ্যাম্বুলেন্স। সেনারা চারদিকে সতর্ক অবস্থানে। হেলিকপ্টার থেকে নিরাপদ দূরে কয়েকটা কার দাঁড়িয়ে আছে।
এ্যাম্বুলেন্সটা উঠে এলো হেলিকপ্টারের দরজার সমতলে। হাসপাতালের কয়েকজন ডাক্তার এ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে হেলিকপ্টারের বেডটাকে গড়িয়ে এ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে গেল।
নিচে নেমে গেল এ্যাম্বুলেন্স।
‘মি. খালেদ খাকান, সিঁড়ির গোড়ায় প্রধানমন্ত্রী। আপনি আগে নামুন।’ বলল জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসাকে।
‘অলরাইট’ বলে আহমদ মুসা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। তার পেছনে পেছনে জেনারেল মোস্তুফা এবং পুলিশপ্রধান নাজিম এরকেন।
সিঁড়ির গোড়ায় মাটিতে পা দেবার আগেই আহমদ মুসা দেখতে পেল অল্প একটু দূরে কারের খোলা দরজা দিয়ে আহমদ মুসার দিকে হাত নাড়ছে তার ছেলে আহমদ আব্দুল্লাহ। তার পাশে জোসেফাইন। আর ড্রাইভিং সিটে দেখতে পেল লতিফা আরবাকানকে।
আহমদ মুসা হাত নেড়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে তাকাল প্রধানমন্ত্রীর দিকে।
সিঁড়ি থেকে নেমে মাটিতে পা রাখতেই আহমদ মুসাকে এসে জড়িয়ে ধরল প্রধানমন্ত্রী। বলল, ‘আমার সরকার, আমার জনগণের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। মহাআতংক, মহাক্ষতি থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করেছেন। আল্লাহ আপনাকে এর জাযাহ দিন!’ অশ্রুরুদ্ধ কন্ঠ প্রধানমন্ত্রীর।
‘ধন্যবাদ স্যার’ বলে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘স্যার, আমার গোটা শরীর ধুলো-বালিতে ভরা। আপনার কাপড়-চোপড়ও নষ্ট হয়ে গেল।’
‘আপনি ধুলো-ময়লার মধ্যে সাতার কেঁটেছেন, আর আমি জামা-কাপড়েও কিছু ধুলো-কালি লাগাতে পারবো না!’
বলেই প্রধানমন্ত্রী আহমদ মুসার আহত বাহু স্পর্শ করে জানতে চাইলেন, ‘হেলিকপ্টারে ডাক্তার ছিল, উনি কি আপনার আহত স্থানটা পরীক্ষা করেছেন? ‘
‘আমি নিষধ করেছিলাম। এখন গিয়ে দেখাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এই তো আপনার জন্যে এ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষা করছে! ম্যাডাম এসেছেন।’ প্রধানমন্ত্রী বললেন।
এ্যাম্বুলেন্স ও জোসেফাইনের কারটি পাশেই এসে দাঁড়িয়েছিল।
মোবাইল বেজে উঠেছে প্রধানমন্ত্রীর। মোবাইলটা তুলে নিতে নিতে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মি. খালেদ খাকান, আপনি এ্যাম্বুলেন্স যান। আমি আসছি হাসপাতালে।’
‘ওকে স্যার। আসসালামু আলাইকুম।’
বলে আহমদ মুসা এ্যাম্বুলেন্স ও গড়ির দিকে এগোলো।
এ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে একজন ডাক্তার নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘আসুন স্যার।’
আহমদ মুসা হেসে বলল, ‘না, ডাক্তার, আপনি চলুন। আমি ঐ কারে আসছি।’
আহমদ মুসা এগোলো কারের দিকে।
গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে এসেছে লতিফা আরবাকান।
এদিকে গাড়ির পেছনের দরজা খুলে আহমদ আব্দুল্লাহও বেরিয়ে এসেছে।
জোসেফাইন গাড়ির ভেতরে সিটে বসে আছে। আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে ডান হাতে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেল কপালে।
‘তোমার কাপড়ে ময়লা, মুখে ময়লা। কেন? ময়লা পরিষ্কার করনি কেন?’
আহমদ আব্দুল্লাহকে চুমু খেয়েই একটু ঝুঁকে পড়ে সালাম দিল জোসেফাইনকে।
জোসেফানের মুখে হাসি, চোখে অশ্রু।
সালাম নিয়ে বলল, ‘আহমদকে নামিয়ে দাও তোমার আঘাতে চাপ পড়ছে।’
আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে নামিয়ে দিয়ে সামনে তাকিয়ে সালাম দিল লতিফা আরবাকানকে।
সালাম নিয়ে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার উঠুন।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা আহমদ আব্দুল্লাহকে গাড়িতে তুলে নিজে উঠে বসল।’
লতিফা আরবাকান গাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজে সিটে গিয়ে বসল।
গাড়ির সিটে বসে স্টিয়ারিং-এ হাত রেখে লতিফা আরবাকান বলল, ‘স্যার, কত বড় ঘটনা যে ঘটে গেল, মানুষ জানতেই পারলো না। জানতেই পারলো না, একজন বিদেশী তাদের প্রেসিডেন্টকে উদ্ধারের জন্যে কি করেছেন, কিভাবে রক্ত ঝরিয়েছেন, কিভাবে মৃত্যুর মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন! আমার তুরস্কের পক্ষ থেকে আপনাকে কনগ্র্যাচুলেশন স্যার।’
আবেগ-উচ্ছ্বাসজড়িত কান্নায় লতিফা আরবাকানের কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে এসেছিল।
‘উনি তো বিদেশী নন লতিফা। গোটা দুনিয়া তো ওঁর দেশ।’ বলল জোসেফাইন। শান্ত, ভারী কন্ঠ জোসেফাইনের।
‘ধন্যবাদ, ম্যাডাম। এটাই উপযুক্ত উত্তর। ধন্যবাদ আপনাদের।’ লতিফা আরবাকান বলল। তখনও কান্না তার কন্ঠে।
গাড়ি স্টার্ট নিল।
চলতে শুরু করল গাড়ি।
আহমদ আব্দুল্লাহ আহমদ মুসার কোলে মুখ গুঁজেছে।
আহমদ মুসা গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল জোসেফাইনের দিকে। বলল, ‘তুমি এসেছ, ধন্যবাদ।’
জোসেফাইনের নিরব সজল দৃষ্টি আহমদ মুসার চোখে।
ধীরে ধীরে আনত হলো জোসেফাইনের মুখ।
তার মাথাটা ধীরে ধীরে গিয়ে ন্যস্ত হলো আহমদ মুসার কাঁধে। তার সজল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোটা অশ্রু।
জোসেফাইনের একটি হাত আঁকড়ে ধরেছে আহমদ মুসার একটা হাতকে।
হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে যাবার পথে আহমদ মুসা ঘড়িতে সময় দেখে জোসেফাইনকে বলল, ‘যথাসময়ে বাড়িতে ফিরে গিয়ে ওয়াদা মতো তোমার সাথে ডিনার করতে পারছি, ইনশাআল্লাহ!’
জোসেফাইনের ঠোঁটেও মধুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘ইনশাআল্লাহ!’
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now