বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৫
নানা চিন্তা কিলবিল করছে আহমদ মুসার মাথায়। আইআরটির ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ এন্ড টেকনোলজি’র ওপর ওদের আক্রমণ ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু ওদের আক্রমণের শক্তি যে কত ভয়ানক তা প্রমাণিত হয়েছে নৌবাহিনীর অস্ত্র ‘ডিপো’র ওপর ওদের আক্রমণের প্রকৃতি দেখে। এ এক ধরনের ভৌতিক ধ্বংসলীলা। আক্রমণকে কেউ দেখবে না, বুঝবে না, কিন্তু চোখের পলকে আস্ত্রাগার, কলকারখানা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। আমাদের ‘সোর্ড’-এর প্রটেকশন আমব্রেলা ছাড়া এই নিরব ধ্বংসলীলা রোধ করার আর কোন উপায় নেই। কিন্তু ‘সোর্ড’-এর এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা দেয়া যাবে, কত কত জায়গায় দেয়া যাবে? ধ্বংসের এই দৈত্য আগে বাড়তে দিলে গোটা দুনিয়ার কি হবে! সকলের নিরাপত্তার একমাত্র উপায় ড. আরিয়েহ এবং তার অস্ত্র ও গবেষণাকে ধ্বংস করা। এই কাজ দ্রুতই হতে হবে। কিন্তু আরিয়েহকে পাওয়া যাবে কোথায়? সে কি ইস্তাম্বুলেই আছে, না বাইরে কোথাও পালিয়েছে? বিশাল তার লটবহরকে এত তাড়াতাড়ি বাইরে নেয়া সম্ভব নয়। এটা নিশ্চিত যে, তারা ইস্তাম্বুলেই আছে। তাছাড়া ‘সোর্ড’-এর ব্যাপারটার কোন হেস্তনেস্ত না করে তারা দূরে সরবে না। ‘সোর্ড’কেই এখন তাদের একমাত্র ভয়। রোমেলী দুর্গে ‘আইআরটি’র ওপর আক্রমণ করে তারা বুঝেছে ‘সোর্ড’-এর কাছে তাদের অস্ত্র অচল। সুতরাং ‘সোর্ড’ এখন তাদের পথের একমাত্র বাধা, একমাত্র শত্রু। এ শত্রুকে রেখে তারা কোথাও যাবে না। আমরা যেমন এখন ড. আরিয়েহ-ডেভিডদের অস্ত্র ধ্বংস করাকেই প্রধান কাজ ভাবছি, তেমনি ওরাও ‘সোর্ড’-এর ফর্মুলা হাত করা এবং আমাদের আইআরটি ধ্বংস করে ‘সোর্ড’কে শেষ করে দেয়াকেই নিশ্চয় সবচেয়ে বড় বিষয় ভাবছে। সামনে একটা ভয়ংকর লড়াই। লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ তাদের মতো আমরাও গ্রহণ করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো, ওরা আমাদের সব জানে, কিন্তু ওদের আমরা কয়েকটা নাম ছাড়া কিছুই জানি না। ওদের ঘাঁটির সন্ধান করতে না পারলে আমরা ওদের ওপর আঘাত করতে পারছি না। ড. আরিয়েহর নাম পেলাম। এখন সবচেয়ে বড় দরকার ওদের ঘাঁটির সন্ধান পাওয়া।
আহমদ মুসার হাত দু’টি গাড়ির স্টিয়ারিং হুইলে ঠিকভাবে থাকলেও এবং তার দুই চোখের দৃষ্টি ঠিকভাবে কাজ করলেও এই সব চিন্তায় কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু জেনারেল মোস্তফার অফিস ক্রস করে যেতেই সে সম্বিত ফিরে পেল সম্ভবত গেটের সেন্ট্রির লম্বা স্যালুট দেখেই।
গাড়ি পেছনে নিয়ে গেট দিয়ে জেনারেল মোস্তফার অফিসে প্রবেশ করল।
গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল জেনারেল মোস্তফা। আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামতেই বলল, ‘কি ব্যাপার মি. খালেদ খাকান, আপনিও এমন আপনভোলা হয়ে পড়েন? বেমালুম অফিস পার হয়ে যাবার মতো এতটা?’
হাসল আহমদ মুসা। ডান হাতের ব্যাগটা বাম হাতে নিয়ে জেনারেল মোস্তফার সাথে হান্ডশেক করে বলল, ‘মাথায় এখন একটাই চিন্তা ড. ডেভিডদের নতুন ঠিকানা কোথায়?’
গম্ভীর হলো জেনারেল মোস্তফার মুখ। বলল, ‘হ্যাঁ, এটাই তো এখনকার সবচেয়ে বড় চিন্তা। কিন্তু কিছু সুরাহা হলো মি. খালেদ?’
দু’জনেই গাড়ি বারান্দা থেকে বারান্দার ধাপ ভেঙে অফিসের দিকে উঠছিল। আলো কোন দিকেই দেখা যাচ্ছে না। এলাম একটা বিষয় আলোচনার জন্যে।’
অফিসে ঢুকে আহমদ মুসাকে চেয়ারে বসিয়ে নিজের আসনে গিয়ে বসল। বলল, ‘বলুন মি. খালেদ খাকান। আমরা কি করব?’
আহমদ মুসা মুখ খুলেছিল কথা বলার জন্যে। তার মোবাইল বেজে উঠল।
মোবাইল-স্ক্রীনে নামটা দেখেই আহমদ মুসা মোবাইল মুখের কাছে তুলে নিয়ে বলল, ‘আসসালামু আলাইকুম, জোসেফাইন, সব ঠিক-ঠাক তো! ভালো আছ তো!’
‘ওয়া আলাইকুম সালাম। আমরা ভালো আছি। একটা জরুরি ব্যাপারে টেলিফোন করেছি। জেনি জিফা এইমাত্র টেলিফোন করেছিল। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে সে জানিয়েছে।’ ওপার থেকে বলল জোসেফাইন।
‘কি ঘটতে যাচ্ছে? কেন তিনি বললেন? কি জানতে পেরেছেন তিনি? এ সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছেন?’ আহমদ মুসার জিজ্ঞাসা।
‘একজন শিক্ষিকা তার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা কোর্স করেন। তার কথাবার্তায় তিনি বিষয়টা আঁচ করেছেন। তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে কি একটা অনুষ্ঠান হবে! প্রেসিডেন্টকে সেখানে নেয়া হবে। সেই সূত্রে শিক্ষক প্রতিনিধিদল প্রেসিডেন্ট ভবনে কয়েকবার গেছেন। কোর্স করতে আসা শিক্ষিকা শিক্ষক প্রতিনিধি দলের সাথে যেসব কথা বলেছেন এবং যে চিঠিটা তিনি দিয়েছেন তা থেকেই তার সন্দেহ হয়েছে।’ বলল জোসেফাইন।
‘তেমন দু’একটা কথা কি তিনি জানিয়েছেন, চিঠিটা কি ছিল?’ আহমদ মুসা জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, চিঠিটা জেফি জিনাকেই দিয়েছিল প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বেন গালিব গিদন নামের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দেয়ার জন্যে। তাকে বলা হয়েছিল, কার পার্কিং-এ তাদের স্বাগত জানাতে আসা প্রোটোকল অফিসারের পাশেই লোকটি থাকবে। তার শার্টের নেম-ব্যান্ড–এ ‘বেন গালিব’ লেখা থাকবে। হ্যান্ডশেক করার সময় তাকেই চিঠিটা দিয়ে দিতে হবে। জেফি জিনা বলল, সে জানত যে, প্রেসিডেন্ট হাউজের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একজন ‘থ্রি জিরো’র বলে একটা সন্দেহ রয়েছে। বেন গালিব গিদন নামের ‘গিদন’ শব্দ দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। এ নামটি হিব্রু। তাওরাতের একজন বীর যোদ্ধার নাম এটা। এই সন্দেহ থেকেই চিঠিটা সে পড়ে। চিঠির বক্তব্যকে তার রহস্যপূর্ণ মনে হয়। চিঠিতে লেখা ছিল:
‘বেন গালিব গিদন,
তোমার ডেভিরা, পিতা, দু’চার দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছেন তুমি জান। যাওয়ার আগে একটা বুঝাপড়া হওয়া দরকার। ঘুম হলে সে ভালো থাকে। ডেব্রা, তোমার বোন, আসছে। ইলিরাজ ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
তোমার অ্যান্টি-
এসএম সিমশন।’
কথা শেষ করল জোসেফাইন।
‘চিঠিটা কি উনি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের বেন গালিবকে দিয়েছেন?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
‘দিয়েছে। না দিলে তো তিনি সন্দেহ করেছে, এটা ধরা পড়ে যেত। চিঠিটি কপি করে নিয়েছিল সে।’
‘চিঠি থেকে কি সন্দেহ করেছিলেন তিনি?’ বলল আহমদ মুসা।
‘তিনি বলেছেন, ‘ডেভিরা’ বলতে প্রেসিডেন্টকে বুঝানো হয়েছে। ‘পিতা’ শব্দ ‘ডেভিরা’র পরে বসায় ওর কোন অর্থ নেই। প্রেসিডেন্টকে নিয়েই কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। ‘ডেভিরা’ শব্দের মতো ‘ডেব্রা’ শব্দেরও ভিন্ন অর্থ আছে।’ জোসেফাইন বলল।
মুহূর্তের জন্যে ভাবল আহমদ মুসা। মনের পাতায় গেঁথে যাওয়া চিঠির কথাগুলোর ওপর একবার নজর বুলাল সে। বলল, ‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। আমার মনে হয় ‘ইলিরাজ’ শব্দেরও বিশেষ অর্থ আছে। তোমার বান্ধবী ‘জেফি জিনা’কেও ধন্যবাদ। তাঁর বলা আর কোন কথা আছে জোসেফাইন?’
‘আমার বুঝি কোন কথা নেই? জেফির কথাই শুধু শুনতে চাচ্ছ যে!’
হাসি চাপতে চাপতে কথাটা বলল জোসেফাইন, বুঝল আহমদ মুসা।
আহমদ মুসার মুখেও হাসি ফুটে উঠল। বলল, ‘আমি জোসেফাইনের কথা শুনেছি, জেফির নয়।’
‘কিন্তু আমি তো জেফি’র কথা বলছি।’ জোসেফাইন বলল।
‘কিন্তু মধুর কণ্ঠটা জোসেফাইনের, ভাষাও জোসেফাইনের, বিষয়ের কথা বাদ দাও।’ বলল আহমদ মুসা।
‘যাক, প্রশংসার দরকার নেই। তোমার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি। কিন্তু তুমি এখন কোথায়?’ বলল জোসেফাইন।
‘জেনারেল মোস্তফার অফিসে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কয়টা বাজে এখন?’ জোসেফাইনের জিজ্ঞাসা।
ঘড়ির দিকে না তাকিয়েই আহমদ মুসা বলল, ‘আজকে কিন্তু ঠিকই লাঞ্চে আসব। শর্ত হলো তোমার দেয়া ইনফরমেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এ সম্পর্কিত জরুরি কিছুতে জড়িয়ে না পড়লে ঠিকই আমাকে লাঞ্চের টেবিলে পাবে।’ হাসতে হাসতে বলল আহমদ মুসা।
ওপার থেকে উত্তর আসতে একটু দেরি হলো। মূহূর্ত পরেই শোনা গেল জোসেফাইনের কণ্ঠস্বর। বলল, ‘লাঞ্চের কথা বলো না, আসতে পারবে না। অনুরোধ, লাঞ্চটা ঠিক সময়ে খেয়ে নিও। আর ডিনার থেকে কিন্তু ছুটি নেই, মনে রেখ।’
‘নিয়ন্ত্রণের রশিটা তো এমন করে টানা দেখে? নতুন মনে হচ্ছে।’ বলল আহমদ মুসা। তার মুখে হাসি।
‘কেন, বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বার্থ বুদ্ধ্বি বাড়বে না?’ বলল জোসেফাইন। তার কণ্ঠ গম্ভীর।
‘তোমার স্বার্থ চিন্তা কত আছে আমি তা জানি। বল তো ব্যাপার কি?’
‘বলব না, তুমি ডিনারে এসো।’ জোসেফাইন বলল ওপার থেকে।
গম্ভীর হলো আহমদ মুসা। বলল, ‘জোসেফাইন, এতটা সময় আমাকে অশান্তিতে রাখতে পারবে তুমি?’
জোসেফাইনের উত্তর এলো একটু দেরিতে। বলল, ‘তুমি এখন যুদ্ধ্বক্ষেত্রে। আবেগকে এতটা প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। আমি...।’
জোসেফাইনের কথার মাঝখানেই আহমদ মুসা বলল, ‘একে আবেগ বলো না জোসেফাইন। এ আত্মা ও অস্তিত্বের আকুতি।’
‘স্যরি! আমার এ কথার অর্থ- প্রতি পদক্ষেপে তোমাকে স্বাভাবিক, সচেতন ও সাবধান থাকতে হবে। তুমি এমন একটা পথে, যেখানে জীবন ও মৃত্যু এক সাথে...।’
আবেগে রুদ্ব হয়ে গেল জোসেফাইনের গলা। কথা আটকে গেল তার।
কিন্তু সংগে সংগেই সে নিজেকে সামলে নিয়ে গলাটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল, ‘আজকের দিনটা কোন্ দিন বলত?’
‘আজ...?’ হঠাৎ সচেতন হয়ে স্মৃতির সন্ধানে লাগল আহমদ মুসা। কিছুটা বিব্রত হয়ে উঠল সে।
জোসেফাইনই আহমদ মুসাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এলো। বলল, ‘কয়েক বছর আগের এক সুন্দর অপরাহ্ন, প্যারিসের এক মসজিদ...।’
‘স্যরি, আর বলো না জোসেফাইন। এদিন তো ভোলার নয়। ভুলিনি তো এর আগে। আজ ভুললাম কি করে এই প্রিয় দিনটাকে! তোমার টেবিলে মেহেদীর রংটা দেখেও আমার মনে পড়া উচিত ছিল। ধন্যবাদ তোমাকে। আমি আসছি।’
‘আবার তুমি আবেগকে বড় করছ। না, তুমি আসবে না এখন। তোমার সামনে যে কাজ তা আমাদের ব্যাক্তিগত স্বার্থের চেয়ে অনেক বড়। সকালে তোমাকে বলিনি তার কারণও এটাই। আমি ডিনারে তোমার অপেক্ষা করবো।’ বলল জোসেফাইন।
‘ধন্যবাদ জোসেফাইন। সত্যিই সাংঘাতিক গোলকধাঁধায় পড়েছি। সমাধানটা দেখা যাচ্ছে খুব কাছে, কিন্তু কোন পথ আমরা পাচ্ছি না। তাহলে এখনকার মত এটুকুই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘অসময়ে তোমার অনেকটা সময় নিয়েছি। দুঃখিত। খোদা হাফেজ! আসসালামু আলাইকুম।’ বলল জোসেফাইন।
‘কিন্তু আমি আনন্দিত হয়েছি। ওয়া আলাইকুম সালাম।’
আহমদ মুসা কল অফ করতেই উৎকণ্ঠিত জেনারেল মোস্তফা বলল, ‘স্যরি মি. খালেদ খাকান, ম্যাডামকে কষ্ট দিবেন না। আমাদের অপরাধী করবেন না।’
একটু থামল। বলল আবার সংগে সংগেই, ‘মি. খালেদ খাকান, ম্যাডাম কি তথ্য দিলেন। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ, চিঠি, সন্দেহ ইত্যাদি সব কথা শুনলাম। কিছুই বুঝলাম না।’ জেনারেল মোস্তফার চোখে-মুখে এবার স্পষ্ট উদ্বেগ।
‘গুরুতর কিছু তথ্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাউজের একজন কর্মকর্তার কাছে একটা চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিটা রহস্যপূর্ণ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘চিঠিতে কি ছিল সেটা কি জানা গেছে?’ দ্রুত কন্ঠে বলল, জেনারেল মোস্তফা।
‘চিঠিটা ছোট। আমাকে বলেছে। লিখুন, আমি বলছি।’
‘ধন্যবাদ’ বলে জেনারেল মোস্তফা একটা নোট প্যাড টেনে নিল। আহমদ মুসা বললে লিখে ফেলল জেনারেল মোস্তফা।
লেখার পর বলল, ‘হ্যাঁ, মি. খালেদ খাকান, বেন গালিব গিদনকে আমিও চিনতে পারছি। সে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের প্রশাসন বিভাগের কর্মচারী ব্যবস্থাপনা শাখার একজন কর্মকর্তা।’
‘সে কি ইহুদি?’ জিজ্ঞাসা আহমদ মুসার।
প্রশ্ন শুনে বিস্মিত চোখে তাকাল জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘না তো, সে ইহুদি নয় তো!’
‘কিন্তু তার নামের ‘গিদন’ শব্দটা হিব্রু, ইহুদিরাই শুধু ব্যবহার করে থাকে।’ বলল আহমদ মুসা।
‘কোন অর্থ আছে এ শব্দের?’
‘তাওরাতে উল্লিখিত একজন যোদ্ধার নাম এটা।’ বলল আহমদ মুসা।
বিস্ময় বিমূঢ় চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল জেনারেল মোস্তফা। একটু পর বলল, ‘অথচ সে বলেছিল সিরিয়ার এক গ্রামের নাম গিদন। ওটা ছিল তার পূর্বপুরুষের বাসস্থান। পূর্বপুরুষের স্মৃতি হিসেবেই তারা নামের সাথে এই নাম ব্যবহার করে থাকে।’
মুহূর্তের জন্যে থেমেই আবার বলে উঠল, ‘দুনিয়াটা বড় অসরল। ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছে মি. খালেদ খাকান যে, আমরা মুসলমানরা ছাড়া দুনিয়ার সবাইকেই দেখছি ধর্মকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহারের ক্ষেত্রে দারুন মৌলবাদী। ওসমানীয় খিলাফত আমলে আমাদের তুরস্কে মুসলমানদের চেয়ে খৃষ্টান প্রজাদেরকেই বেশি সু্যোগ-সুবিধা দেয়া হতো। আর আমাদের আজকের নব্য তুরস্কে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বার্থে ইসলাম নির্বাসিতই হয়েছিল। কিন্তু আমরা ধর্ম ছাড়লেও ওরা কিন্তু দেখছি ওদের ধর্ম ছাড়েনি। যাক, আসুন, চিঠির দিকে মনোযোগ দিই।’
চিঠির ওপর নজর বুলাল জেনারেল মোস্তফা। বলল, ‘সত্যিই চিঠিটা রহস্যপূর্ণ। এই রহস্য থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, এই চিঠির পেছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে অবশ্যই। চিঠির কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হলে রহস্যটা বুঝা যাবে। বেন গালিব গিদনের ‘পিতা’ কে বা কি, ‘বুঝাপাড়া’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে, ‘ইলিরাজ’ কি ইত্যাদি। আপনি কিছু বুঝছেন, মি. খালেদ খাকান?’
‘আমিও চিন্তা করছি। যার কাছে তথ্য এসেছে তিনি কিছু ক্লু দিয়েছেন। বলেছেন; ‘পিতা’ শব্দের কোন অর্থ নেই। তেমনি আমার বোন শব্দেরও কোন অর্থ নেই। কারণ ‘বোন’ শব্দ ‘পিতা’র মতো ‘ডেব্রা’ শব্দের পরে বসেছে। ‘পিতা’ ও ‘বোন’ যদি অনর্থক শব্দ হয়, তাহলে ‘ডেভিরা’, ‘ ডেব্রা’ শব্দের নিশ্চয় কোন অর্থ আছে। ‘গিদন’ ও ‘ইলিরাজ’ শব্দ হিব্রু। ‘ডেভিরা’ ও ‘ডেব্রা’ নিশ্চয় হিব্রু শব্দ। এ দুটি শব্দের অর্থ জানা দরকার। হিব্রু ডিকশনারী নিশ্চয় আপনার অফিসে আছে।’
সংগে সংগে জেনারেল মোস্তফা উঠে গিয়ে হিব্রু ডিকশনারি নিয়ে এলো।
বসে ডিকশনারি থেকে শব্দ দু’টি খুঁজে বের করল। বলল, ‘হ্যাঁ, মি. খালেদ খাকান, ‘ডেভিরা’ শব্দের অর্থ আশ্রম, আশ্রয় এবং ‘ডেব্রা’ শব্দের অর্থ মৌমাছির ঝাঁক। আর ‘গিদন’ শব্দের অর্থ আপনি তো বলেছেনই। ‘ইলিরাজ’ শব্দ আপনার জানা। ওটার অর্থ কি?’
‘ইলিরাজ’ অর্থ ‘গোপন’।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বিদঘুটে’ সব অর্থ! চিঠিটার অর্থ তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে মি. খালেদ খাকান?’ জিজ্ঞাসা জেনারেল মোস্তফার।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। বলল, ‘তোমার আশ্রয় দু’চার দিনের মধ্যে চলে যাচ্ছে তুমি জান। যাওয়ার আগে একটা বুঝাপাড়া হওয়া দরকার। ঘুম হলে সে ভালো থাকে। মৌমাছির ঝাঁক আসছে। গোপন ব্যাপারে তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।’ তিনটি হিব্রু শব্দের অর্থ পাওয়ার পর এই দাঁড়াচ্ছে চিঠির বক্তব্য। যিনি এই তথ্যটা দিয়েছেন, তার বক্তব্য হলো চিঠির ‘ডেভিরা’ বা ‘আশ্রয়’ শব্দের অর্থ ‘প্রেসিডেন্ট’। এদিক থেকে ‘বুঝাপড়া’ ও ‘ঘুম’ বিষয়টি প্রেসিডেন্টের সাথে সম্পর্কিত। এখন প্রশ্ন হলো: ‘বুঝাপড়া’, ‘ঘুম’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে? আর পরবর্তী দুই বাক্যের ‘মৌমাছির ঝাঁক’ ও ‘গোপন ব্যাপার’ বিষয় দুটিও রহস্যপূর্ণ।’
‘প্রেসিডেন্টের সাথে বেন গালিব গিদনের কি বুঝাপড়া হতে পারে! নিশ্চয় এটা কোন ষড়যন্ত্র। আর শেষের ‘গোপন ব্যাপার’টাও সেই ষড়যন্ত্র। কিন্তু ‘ঘুম’ আর ‘মৌমাছির ঝাঁক’ বলতে কি বুঝাচ্ছে?’
থামল জেনারেল মোস্তফা।
‘আসল বিষয় সম্ভবত এই শব্দ দু’টির অর্থের মধ্যে নিহিত রয়েছে।’
বলে থামল আহমদ মুসা।
সোফায় গা এলিয়ে দিল আহমদ মুসা। অর্ধবোজা তার চোখ। গভীর ভাবনার ছাপ তার চোখে- মুখে।
হঠাৎ সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। তাকাল জেনারেল মোস্তফার দিকে। বলল, ‘মি. জেনারেল, ‘বুঝাপড়া’ ব্যাপারটা যদি তার ক্ষতি করার কোন ষড়যন্ত্র হয়, তাহলে ‘ঘুম’ ও ‘মৌমাছির ঝাঁক’ সেই ক্ষতি করার অস্ত্র হতে পারে। যে ধরনের ‘ক্ষতি’ করা হবে, সেই ধরনের অস্ত্র হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কি ধরনের ক্ষতি করতে চায়? আমার মনে হচ্ছে, তাঁকে কিডন্যাপ করার চেষ্টা করা হবে। আর...।’
‘কিডন্যাপ? প্রেসিডেন্টকে!’ আহমদ মুসার কথায় বাধা দিয়ে বলল জেনারেল মোস্তফা। তার দু’চোখ ছানাবড়ার মতো বিস্ফোরিত!
একটু সামলে উঠেই জেনারেল মোস্তফা আবার দ্রুত কন্ঠে বলে উঠল, ‘এমন সাংঘাতিক চিন্তাটা আপনার কেন এলো?’
‘দেখুন, ইতিমধ্যে ওরা তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে দু’টি কিডন্যাপের আশ্রয় নিয়েছে। তৃতীয় প্রচেষ্টাও কিডন্যাপেরই হতে পারে। বড় কোন ভিভিআইপিকে কিডন্যাপ তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সহজ। আর প্রেসিডেন্ট হতে পারেন তাদের সবচেয়ে মূল্যবান শিকার, লক্ষ্য অর্জনে যা হবে অব্যর্থ।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কথায় যুক্তি আছে।’ শুকনো কন্ঠে বলল জেনারেল মোস্তফা। তার চোখ- মুখ থেকে রক্ত যেন সরে গেছে। তাকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে।
কথাটা শেষ করে মুহূর্তের জন্যে থেমেই আবার বলল, ‘তাহলে, ‘ঘুম’ ও ‘মৌমাছির ঝাঁক’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?’
‘তাদের অতীতের দু’টি কিডন্যাপেই তারা ক্লোরোফরম জাতীয় সংজ্ঞালোপকারী বস্তু ব্যবহার করেছে। প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও এটাই ঘটতে পারে। ‘ঘুম’ শব্দটি আমি মনে করি, এরই ইংগিত দিচ্ছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে কোনওভাবে সংজ্ঞাহীন করে তাকে কিডন্যাপ করা হবে? ‘মৌমাছির ঝাঁক’ কথাটার কি অর্থ দাঁড়াচ্ছে?’ বলল অস্থির কন্ঠে জেনারেল মোস্তফা।
‘চিঠির ‘ঘুম’ শব্দের ইংগিত এ রকমই বলছে। আমার মতে ‘মৌমাছির ঝাঁক’ হতে পারে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রশাসন বিভাগে কর্মরত সেই বেন গালিব গিদনকে তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সাহায্য দিতে আসবে তারা।’ বলল আহমদ মুসা।
‘তার মানে এটা একটা পরিপূর্ণ ষড়যন্ত্র! ওরা আঁট-ঘাট বেঁধে লেগেছে। আমাদের মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে গিদনের মতো, সেই প্রটোকল অফিসারের মতো তাদের আরও লোক অনুপ্রবেশ করে থাকতে পারে। এত বড় ষড়যন্ত্র একার পক্ষে সম্ভব নয়।’
থামলো জেনারেল মোস্তফা। তার শুষ্ক কন্ঠ কাঁপছিল।
থেমেই আবার বলে উঠল, ‘এখনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের অফিসকে জানাতে হবে। মি খালেদ খাকান, এখনই আমাদের কিছু করা দরকার। কিন্তু কি করা দরকার? ষড়যন্ত্র কত দূর এগিয়েছে কে জানে! যদি কিছু...।’
কন্ঠ আপনাতেই থেমে গেল জেনারেল মোস্তফার।
‘চিঠির যা বক্তব্য তাতে প্রেসিডেন্ট আংকারা যাওয়ার আগেই তারা ঘটনা ঘটাবার চেষ্টা করবে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘তার মানে যে কোন সময় ঘটনা ঘটতে পারে। তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু এ সপ্তাহেই তিনি আংকারা যাবেন। তার মানে আর চার দিন বাকি। খুব বেশি ভাবার সময় নেই। এখন বলুন, কি করব আমরা? আমাকে এখনি একবার প্রধানমন্ত্রীর অফিসে যেতে হবে।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘দুটি কাজ এখনি করুন। এক. মৌমাছির ঝাঁক মানে বাইরের লোক যাতে কোন পরিচয়েই কোনভাবেই ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করুন। দুই. প্রেসিডেন্ট প্রাসেদের চীফ অব স্টাফকে বলুন, তিনি যেন বেন গালিব গিদনকে চোখে চোখে রাখেন অথবা তাকে গ্রেফতারও করতে পারেন। আপনি প্রধানমন্ত্রীর ওখানে যান, কিন্তু আমাকে এখনই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাবার ব্যবস্থা করে দিন। প্রধানমন্ত্রীর ওখান থেকে আপনিও সেখানে আসুন।’ আহমদ মুসা বলল।
কোন কথা না বলে জেনারেল মোস্তফা অয়ারলেস তুলে নিল। প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের চীফ অব স্টাফ ইসমত ইউসুফ ইনুনুর সাথে সংযোগ নিয়ে সালাম দিয়ে বলল, ‘আমি জেনারেল মোমস্তফা কামাল। বেন গালিব গিদন কোথায়?’
সালাম নিয়ে ওপার থেকে ইসমত ইউসুফ ইনুনু বলল, ‘স্যার, আজ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ইন্টারনাল স্টাফদের বার্ষিক গেট টুগেদার। বেন গালিব গিদন ওখানেই গেছে। আমিও যাব। তাকে দরকার স্যার?’
‘না। শোন, তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখ। আর প্রেসিডেন্টের সার্বক্ষণিক পার্সোনাল সিকিউরিটি বাড়িয়ে দাও। আর উনি এখানে থাকা পর্যন্ত আগামী কয়েকদিন দর্শনার্থীসহ সব রকম প্রোগ্রাম বাতিল করে দাও। মি. খালেদ খাকান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাচ্ছেন। তার প্রয়োজন অনূসারে তাকে সহযোগিতা করো। একটু পরে আমিও আসব।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘আপনার নির্দেশ পালিত হবে স্যার। আজ সকালে প্রেসিডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলোজিতে একটা প্রোগ্রাম করেছেন। কয়েকটা সাক্ষাৎকার ছাড়া সামনের কয়েকদিন বড় কোন প্রোগ্রাম নেই।’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘মাননীয় প্রেসিডেন্টের আজকের প্রোগ্রামটা ভালো হয়েছে। তিনি এখন কোথায়?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘উনি রেস্টে আছেন। একবার হয়তো অনুষ্ঠানেও আসবেন।’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘ঠিক আছে সাবধান থেক। মি. খালেদ খাকান যাচ্ছেন?’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘স্যার, কিছু কি ঘটেছে? কোন কিছুর আশংকা আছে?’ বলল ইসমত ইউসুফ ইনুনু।
‘যে কোন সময় যে কোন কিছু ঘটতে পারে। আবার নাও ঘটতে পারে। কিন্তু ঘটবে এটা সামনে নিয়েই এ্যালার্ট থাকি আমরা।’ জেনারেল মোস্তফা বলল।
‘অবশ্যই স্যার।’
‘ধন্যবাদ।’ বলে সালাম দিয়ে কল অফ করে দিয়েই জেনারেল মোস্তফা আহমদ মুসার দিকে চেয়ে বলল, ‘তাহলে মি. খালেদ খাকান, আমি উঠছি।’
‘আমিও উঠব। কিন্তু প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের একটা লে-আউট আমি চাই, জনাব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘অবশ্যই এটা আপনার দেখা উচিত।’
বলেই জেনারেল মোস্তফা কম্পিউটার থেকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের একটা লে-আউটের প্রিন্ট বের করে আহমদ মুসার হাতে দিয়ে বলল, ‘খেলাফত আমলের দোলমাবাসি প্যালেসই এখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ। প্রেসিডেন্ট যখন ইস্তাম্বুলে থাকেন, তখন এই প্রাসাদেই তিনি উঠেন। আগের লে-আউটের বড় ধরনের কোন পরিবর্তন হয়নি। আপনি দেখুন, কোন কিছু প্রশ্ন থাকলে ইসমত ইউসুফ ইনুনু উত্তর দিতে পারবে।’
‘ধন্যবাদ’ বলে আহমদ মুসা উঠে দাঁড়াল।
উঠে দাঁড়াল জেনারেল মোস্তফাও।
দু’জনে এক সাথেই বেরিয়ে এলো।
গাড়ি বারান্দায় নেমে আহমদ মুসার সাথে হ্যান্ডশেক করে নিজের গাড়ীর দিকে এগোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মি. খালেদ খাকান, সত্যিই আমি উদ্বিগ্ন বোধ করছি। ওদের হাত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ভেতরেও প্রবেশ করেছে।’
‘আল্লাহ হাফেজ, জেনারেল মোস্তফা।’
বলে আহমদ মুসা নিজের গাড়ির দিকে এগোলো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now