বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
" ভাইরাস "
"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ইশিকা (০ পয়েন্ট)
X
#ভাইরাস!
জ্বর খানিকটা কমে আসায় বিছানা ছাড়লাম। চুলোয় পানি বসিয়ে এগুলাম ফ্রিজের দিকে। আজ ক'দিন যাবৎ বাজার করা হচ্ছে না। আহসান বাইরে থেকে খাবার আনছে.. আর সেসবই একটু আকটু করে খেয়েদেয়ে কাটছে দিন। অবশ্য এনিয়ে একদম অসন্তোষ নয় আহসান। না.. এটি তার স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থেকেও নয়! তার এই সন্তুষ্টি তার শরীরে ভাইরাস প্রবেশের ভয় থেকে। তার মতে আমার সংস্পর্শে এলেই ঝামেলা.. আর আমার হাতের খাবার খেলে তো কথাই নেই! এতে যে আমার শরীরের ভাইরাস তার শরীরে প্রবেশ করবে! আর ফলাফল হবে অল্পবয়সে মৃত্যু। মৃত্যুকে তুমি এত ভয় পাও আহসান? অথচ তোমার মাথায় এটা কেনো আসছে না বাইরের খাবারেও তো ভাইরাস থাকতে পারে। পারে না কি?
-তুমি রান্নাঘরে কী করো?
আহসানের গলার স্বরে খানিকটা চমকে উঠলাম। তবে ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললাম,
-চিকেন ফ্রাই করছি। খেতে ইচ্ছে হলো খুব।
বিরক্ত হলো আহসান। ভ্রু কুঁচকে বললো,
-খেতে ইচ্ছে হলে আমাকে একটা কল করতে! তুমি কেনো শুধুশুধু এসব ধরতে গেলে? এখন পুরো ঘরটা ভাইরাসে সংক্রামিত হয়ে গেল! এসব এখন হেক্সিজল দিয়ে কে পরিষ্কার করবে শুনি? আমার হয়েছে ভেজাল! না পারছি গিলতে আর না ওগড়াতে। শালার জীবন!
চুলো নিভিয়ে দিলাম। যা যা ছুঁয়েছিলাম সেগুলো এক করে একপাশে রাখলাম। ফিরে এলাম বিছানায়। দেশে করোনা আতঙ্ক আসার পর থেকেই এঘরে ঢুকছে না আহসান। তাকে ডেকে বলছে না ও তরু, তোমার হাতের এককাপ চা হবে? রাতে বিছানায় এসে দুষ্টুমি করে বলছে না আদর চাই, আদর চাই। আদর ছাড়া উপায় নাই। খেতে বসে বলছে না হা করো তরু। আজ আমিই তোমায় খাইয়ে দিচ্ছি। কেনো আহসান? দুই অক্ষরের মৃত্যু শব্দটির কাছে আজ তোমার ভালোবাসা এত সহজেই হারিয়ে গেল? একই বাড়িতে দুটি মানুষ থেকেও যে জীবনে এতটা নিঃসঙ্গ হওয়া যায় তা এইকয়দিনে খুব করে অনুভব করলাম।
-আমাকে মামার বাসায় দিয়ে আসবে?
পাশের ঘর থেকে গলা খাকড়ি দিয়ে উঠলো আহসান।
-তোমার মামাকে কল করেছিলাম.. বললো হাসপাতালে ভর্তি করতে। শালার হাসপাতাল গুলো কী উনার বাপের? বললাম আর নিল! আর টাকা? খরচাপাতি কি ওই শালা দেবে?
আজ বাবা-মা বেঁচে থাকলে তারাও কি একই কথা বলতো? তবে কি মামামামী কখনোই বাবা-মা হয়ে উঠতে পারেনা? হয়তো না..
-মামাকে গালাগাল করো না।
আমার কথার পাত্তা না দিয়ে আহসান বললো,
-সদর হাসপাতালে রাখার কথা বলেন উনি। অথচ শালার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেই শুনেছে জ্বর, কাশি, গলা ব্যথার রোগী.. ওমনি শালাদের কুড়কুড়ানি উঠে গেছে। রাগ দেখিয়ে বলে একজন রোগীর জন্য আর দশলোককে কেনো মারতে চাইছেন! আর এদিকে যে শালা আমি মরছি সে খেয়াল আছে? আর ওই শালার হেল্পলাইনে এতবার কল দিলাম। শালারা বলে করোনা না.. তোরা কি করোনার জামাই লাগোস? তোরা জানলি কেমনেরে শালা?
বুকচিরে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সুপ্ত গলায় আমি বললাম,
-তোমার অফিস ছুটিটা দিলে তুমি না হয় গ্রামে চলে যাও। আমি একা ম্যানেজ করে নিতে পারবো।
-ওই শালার অফিস! মরার পরের দিন দেবে ছুটি! এই, তুমি কোথায় কোথায় দিয়ে হেটেছো? দ্রুত বলো.. পরিষ্কার করে ফেলি!
-শুধু ড্রইংরুম থেকে রান্নাঘর। মাঝে একবার ফ্রিজ।
-ফ্রিজও ধরেছিলে? এহহ রে! এখন নিজের পেটেই ঢোকাও সব মাছ মাংস। আমি তো শালার মানুষই না! আমার কি ক্ষুধা আছে?
ঘরদোর পরিষ্কার করে গোসল সেরে টেলিভিশনের সামনে বসতেই উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো আহসান। আমি বিছানা ছেড়ে উঁকি দিতেই সে আবারও বললো,
-সুবহানাল্লাহ! শুকুর আলহামদুলিল্লাহ। এই না হলে আমাদের সরকার! কাল থেকে অফিস ছুটি.. আলহামদুলিল্লাহ।
বুকের ভেতরটা আমার কষ্টে মুচড়ে উঠলো। জলে ভর্তি চোখ নিয়ে আমি দরজার কোণায় দাঁড়াতেই দেখলাম আহসানের হাস্যজ্বল মুখটি। লোকটিকে হাসলে অদ্ভুত সুন্দর দেখায় কেনো?
-শুনো.. বেশি চলাফেরা করবে না। পুরো বাড়িতে ভাইরাস ফেলানোর দরকার নেই। এই আজাবের শেষে আমাকে তো আবার ফিরতে হবে! আর কিছু দরকার হলে বাড়িওয়ালা চাচাকে কল করবে। উনিই তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যবস্থা করে দেবে। আর ডেইলি হটলাইনে কলের উপরে থাকবা। শালারা পাইছে কী?
-আজ রাতেই যাচ্ছো?
গলা খানিকটা কেঁপে উঠলো আমার। তবে আমার ভেতরের এই কষ্ট উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হলো আহসান। সহজ গলায় সে বললো,
-তো? কাল থেকে বাস, ট্রেইন সব বন্ধ! তোমার সাথে প্রতিটা মুহুর্ত আমি যে কী পরিমাণ আতঙ্কে থাকি! ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও নিঃশ্বাসের কারণে আমার শরীরে ভাইরাস ঢুকে গেছে নাকি কে জানে!
ব্যাগ গোছানো শেষে সদর দরজার দিকে এগুলো আহসান। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম নিজের জায়গায়৷ আমার জায়গা যে আহসানের বাড়িতে সীমিত! তার জীবনে সীমিত! এই আহসান, একটাবার স্পর্শ করবে আমায়? শেষ স্পর্শ? করবে না? পায়ে পড়ি আহসান.. একটাবার বুকে টেনে নাও। একটাবার আদর দিয়ে আমার ভেতরটা ভরিয়ে দাও। কথা দিচ্ছি আমার মৃত্যু হলেও তোমার উপর কোনো ক্ষোভ থাকবে না...
মুক্তির আনন্দ নিয়ে রিক্সায় উঠছে আহসান.. অন্ধকার ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখছি আমি। হাত-পা কাঁপছে আমার। বুকের ভেতরটা ঝাঝরা হয়ে যাচ্ছে! শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এই কি সেই তুমি? যে বছর খানেক আগে কত আশা-ভরসা দিয়ে মামার কাছ থেকে আমার হাত চেয়েছিলে? এই কি সেই তুমি? যে আমাদের বিবাহিত জীবনের প্রথম রাতটিতে এই লাজুক মেয়েটির হাত চেপে ধরে বলেছিলে হাজারো ঝড় এলেও ছাড়বো না তোমার হাত? মাথার ভেতরের ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হতেই ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকালাম আমার মাথার উপরে ঘূর্ণমান ফ্যানের দিকে। কী রে? তুই কি মুক্তি দিবি আমায় এই যন্ত্রণাদায়ক জীবন থেকে?
#নাইমা_জাহান_রিতু
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now