বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

সফলতা

"সত্য ঘটনা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মাহফুজার র (০ পয়েন্ট)

X আরিফ ভাই আমাকে বললেন, "বলতো একটা ডিমভাজাকে কয়ভাগ করা যায়?" "২/৩ ভাগ..." "তুই বাল কিচ্ছু জানিস না, একটা ভাজা ডিমকে ৬ পিছ করা যায়। ছয় বছর আগে মেডিকেল পাশ করেছি। আমরা পাঁচ বোন ও আমি, বাবার একটা ভিটে আর এক টুকরা জমি ছিলো। সেই জমিতে আমাদের পরিবারের আটজন মানুষের তিনমাসের খাবার জুটতো। বছরের বাকি নয়টা মাস আমাদের তিনবেলা খাবারের জন্য বাবা রাতদিন পরের বাড়িতে কামলা খাটতেন। অভাব কি জিনিস সেই হাফপ্যান্ট পরার বয়স থেকে খুব ভালোভাবেই জানতাম। এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, মা একটা ডিমের ভিতর ভাত দিয়ে সেই ডিমকে বড় করতেন।তারপর সেই ডিমকে ছয়ভাগ করে আমাদের ছয় ভাইবোনকে দিতেন। সাথে থাকতো বাজারের সস্তা দামের খেসারী ডাল। আমার বোনগুলো নীরবে খেয়ে যেত। শুধু আমার ঔটুকু ডিমে হতোনা, প্রতি বেলাই কোনো না কোনো বোন বলতো, 'আমি ডিম খাবো না, আরিফকে দিয়ে দাও।' চোখের সামনে বড় হওয়া বোনদের মলিন কাপড়ে অভাবের নানাবিধ রুপ দেখতে পেতাম। বোনেরা আমার চেয়ে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অভাবের কারনে প্রাইমারীতেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। শুধু আমার পড়াশোনা চালিয়ে নেয়ার নেওয়ার জন্য বড় বোন মায়ের সাথে প্রায় সংগ্রাম শুরু করে এবং সফলও হয়। যেদিন প্রাইমারীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেলাম সেদিন থেকেই মা, বোনরা আমায় নিয়ে একটু একটু করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো। আশেপাশের মানুষের প্রশংসা আমাকেও সেই স্বপ্নে আরো মনোযোগী করে তুললো। সেই থেকে আমার একাডেমিক সাফল্যে সবাই খুশী হলেও একজন থাকতেন ভাবলেশহীন, তিনি হলেন আমার বাবা। আমার যতটুকু মনে পড়ে বাবা আমার সাথে কথা বলতেন খুবই কম এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেলো। দেখতে দেখতে মেডিকেল এডমিশনের সময় চলে আসলো। ফর্মফিলাপ করে দিলেন এক মামা, প্রিপারেশন বলতে বোনদের মাটির ব্যাংকের টাকায় কিনা রয়েল গাইড আর দুই বছরের একাডেমিক নলেজ। মজার ব্যাপার হলো মেডিকেল পরীক্ষায় যে সাধারন জ্ঞান থেকে প্রশ্ন আসে তা আমি জানতামই না। জেনেছি পরীক্ষায় যাওয়ার মুহুর্তে বন্ধুর কাছ থেকে। আমাদের মাটির ঘরে ছিল পাশাপাশি দুটি রুম, রুমদুুটির মধ্যখানে ছিল একটা মাটির দেয়াল। সেই দেয়ালের মাঝখানের একটু অংশ কেটে চল্লিশ পাওয়ারের একটা বাল্ব লাগানো থাকত যাতে দুটি রুমই ঐ চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব কভার করতে পারে। স্পষ্ট মনে আছে পরীক্ষার আগের রাতে একটু আগেই শুয়েছিলাম, কিন্তু পরিক্ষার টেনশনে ঘুম আসছিলো না। বাবা অনেক রাত করে ঘরে ফিরছিলেন। হাতমুখ ধুয়েই মাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আরিফ কি ঘুমিয়ে পড়ছে?' মা হ্যা সূচক কিছু একটা বললেন। পাশের রুমে কাথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকা আমার শরীর দিয়ে উত্তেজনায় ঘাম ঝরতে লাগল। পরিক্ষার টেনশনে না, আমার শুধুই মনে হলো জন্মের পর এই প্রথম বাবা আমার নামটা ধরলেন, আমার সম্পর্কে কিছু বললেন। চুপচাপ শুয়েছিলাম আরেকটিবার বাবার মুখে কিছু শুনতে। নীরবতা ভেঙ্গে বাবা মাকে বললেন, 'ছেলেটিকে সাহস দিও, এতবড় পরিক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য সবার হয়না, পাশ করা না করা পরের ব্যাপার। আমি অভাবের লজ্জায় ছেলেকে কিছু বলতে পারিনা। বাজার থেকে কিছু ভালো চাল আর তেল এনেছি। সকালে মোরগটা কেটে ছেলেকে একটু পোলাও করে দিও। এত বড় পরিক্ষা ছেলেকে সাহস দিও আরিফের মা।' পরদিন সকালে পরিক্ষায় যাওয়ার সময় বাবাকে পাইনি। অভাবের লজ্জা আবার হয়ত বাবাকে আমার থেকে আড়াল করল। পরীক্ষা দিয়ে এসে যথেষ্ট হতাশই হলাম, পরীক্ষা একদম মনমাফিক হয়নি। প্রতিটা প্রশ্নে আমি ছিলাম কনফিউজড। রেজাল্টের আগের দুদিন একদম ঘর থেকে বের হলামনা। দুপুরের দিকে হঠাৎ বাবা এসে আমার পাশে বসলেন। আমার পাশাপাশি বসার অভ্যাস না থাকায় অন্যদিকে থাকিয়ে বললেন, 'তোমার কাজ ছিল চেষ্টা করার তুমি তা যথেষ্ট করেছ, বাকিটুকু উপরওয়ালার কাজ। মনখারাপ করে বসে থাকবেনা,দেখতে ভালো দেখায় না।' বলেই বাবা উঠে চলে গেলেন। ঐদিনই রেজাল্ট দিল, উপরওয়ালার কৃপায় দেশের প্রথম সারির মেডিকেলে চান্স হল। মা-বোনদের খুশী ছিল দেখার মত। আমার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের অধিকারী বাবা মৃদু হেসে প্রথমবারের মত আমাকে বলেছিলেন, "অনেক খুশী হয়েছি বাবা।" বাবা ছাড়া পরিবারের সবার হাসিটা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি যখন জানা গেল মেডিকেলে ভর্তি ও বই কিনতে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার মত লাগে। মা তো রুটিন করে সকাল-বিকাল আত্নীয়স্বজনদের বাড়ি টাকার জন্য ধরনা দিতে লাগলেন। পাড়াপড়শিরা মাকে চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিতে লাগলো। গ্রামের শিক্ষিত লোকজন আমার চান্স পাওয়া আর অভাবের বিষয়টি জাতীয় পত্রিকায় দেয়ার তোড়জোড় শুরু করলেন। শুধু বাবা ছিলেন নীরব। এদিকে আমার ভর্তির ডেট চলে আসায় মা রাতে বাবাকে এ বিষয়ে বললে আমার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বের অধিকারী বাবা বললেন, "শোনো আরিফের মা, ছেলে আমার কারো কাছে ভিক্ষা বা নত হয়ে ডাক্তার হউক তা আমি চাইনা। আমার ছেলে এই গ্রামের কাছে গরিবের ছেলে, আমি এই গ্রামের কাছে গরিব বাবা, পত্রিকায় এসব প্রকাশ করে আমি দেশের কাছে অভাবী বাবা আর আমার ছেলেকে দেশের কাছে গরিবের সন্তান হিসেবে প্রকাশ করতে চাই না। আমার ছেলের বিষয় আমিই দেখবো।" যেদিন মেডিকেলে ভর্তি হতে যাবো তার আগের দিন বাবা শুধু আমাকে বলেছিলেন, 'তৈরি থেকো তোমাকে সকালে বের হতে হবে৷' সকালে তৈরি হয়ে বাবার কাছে বিদায় নিতে গেলে বাবা আমার হাতে সাদা প্যাকেটে মোড়ানো একটা বান্ডেল দিতে দিতে বললেন, 'আরিফ, এখানে চার লাখ সত্তর হাজার টাকা আছে। পুরো পাঁচ বছরে আরও কিছু টাকা লাগবে তোমার। এটা শেষ হয়ে গেলে জানাবে আমি ব্যবস্থা করবো।' আমি বাবার দিকে মুখ হা করে তাকিয়েই ছিলাম। শুধু মনে পড়ে ঐদিন বাবার ধমকে গাড়িতে উঠছিলাম। মেডিকেলে এসে বুঝতে পারলাম আমিই একমাত্র ছেলে যার বাবা মেডিকেল লাইফের শুরুতে বিশ্বাসের সাথে হাতে তুলে দিয়েছেন চার লাখ সত্তর হাজার টাকা। একমাস পর ছুটিতে এসে মায়ের কাছে জানতে পারলাম বাবা আমাদের একমাত্র ভাতের জমিটি বিক্রি করে টাকাটা আমাকে দিয়েছিলেন। ঢাকা শহরে মেডিকেল স্টুডেন্টদের জন্য চলা কঠিন না, টিউশনির বাজার ভালো। এক বছরের মধ্যে বাবার জমিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ছুটিতে বাড়িতে আসতে মা বোনদের জন্য এটাসেটা নিয়ে আসতাম, এগুলোই ছিল আমাদেরর জীবনের সবচেয়ে দামী আনন্দের উপলক্ষ্য। জীবন ভালোই চলছিলো। দেখতে দেখতে শেষ বর্ষে চলে এলাম। একদিন মেডিসিন ওয়ার্ডে স্যার এনজাইনা আর এমআইয়ের মধ্যে পার্থক্য ধরেছিলেন, পারিনি। স্যার খুব লজ্জা দিয়েছিলেন। দুপুরের দিকে পার্থক্যটি দেখছিলাম। হঠাৎ বড় বোনের ফোন, "বাবার বুকে খুব ব্যাথা হচ্ছে, আমরা সদরে নিয়ে যাচ্ছি। তোকে খুব দেখতে চাচ্ছেন, তাড়াতাড়ি চলে আয়।" বোনের ফোন রেখেই রওনা দিলাম হাসপাতালের দিকে। কেন জানি পথের মধ্যে এমআইয়ের তথ্যগুলো চোখের সামনে খুব ভাসছিলো। হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বাবা দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা সহ্য করে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন, "আরিফ আসছিস তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম বাবা। আমার কাছে একটু আয়।" কানের কাছে মুখ নিয়ে বাবা আমার হাতটি ধরে বলেছিলেন, 'তোর বোনগুলোকে একটু দেখে রাখিস বাবা।' বোনগুলোকে বাবা কাছে নিয়ে শুধু এটুকই বললেন, 'তোরা কাঁদছিস কেন? তোদের জন্য ডাক্তার একটা ভাই রেখে যাচ্ছি।' ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমাদের বাবা পৃথিবী থেকে চলে গেলেন। বাবা চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরই পৃথিবীর কঠিনতম বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম আমি। আত্নীয়স্বজন, পাড়াপড়শি সবাই আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চাইলেন যে আমার বোনরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া দরকার। আমি তখন মাত্র এমবিবিএস পাশ করেছি। চোখে ঝাপসা দেখছি। বোনদের বিয়ে দেওয়ার জন্য প্রচুর টাকা দরকার। প্রায় রাতে ঘুম ভাঙ্গত বাবার শেষ কথাটি স্বপ্নে দেখে, 'বোনদের দেখে রাখিস বাবা।' আমার বন্ধুরা যখন বড় বড় ডিগ্রীর স্বপ্ন দেখছে, আমি তখন ঢাকা ছেড়ে এসে উঠলাম একটি জেনারেল হাসপাতালে। বিগত ছয়টা বছরের প্রতিটা দিনের চব্বিশটা ঘন্টা এই হাসপাতালে আমি কাটিয়েছি। প্রতিটা রাত কেটেছে ইন্টারকমের শব্দে সাড়া দিয়ে। ডাক্তার হিসেবে ছয় বছরে অনেক টাকাপয়সা করেছি, আমার চারটা বোনকে ডাক্তারের বোন হিসেবে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছি। আমার গ্রামের বাড়িটিকে সমাজের মানুষ যাতে ডাক্তারের বাড়ি ভাবে সেভাবেই সাজিয়েছি। এসব করতে গিয়ে আমার জীবন থেকে আমি হয়ত মূল্যবান ছয়টা বছর হারিয়েছি। কিন্তু তাতে আমার বিন্দুমাত্র আফসোস হয় না। এখন পর্যন্ত কোনো কোর্সে ঢুকতে পারিনি বলে আমি একটুও হীনমন্যতায় ভুগিনা। কারন আমার কেন যেন মনে হয় আমার বাবার কাছে আমি ডাক্তার ছেলে হতে পেরেছি। যে বোনদের ধার দেয়া ডিমের অংশ খেয়ে বড় হয়েছি তাদের কাছে ভাই হতে পেরেছি। এক জীবনে আর কি লাগে? আমার কাছে এসবের মূল্য ডিগ্রীর চেয়ে শত শত গুন বেশী। প্রতিটা দিনই আমার কাছে উপরওয়ালার রহমতে সাজানো দিন। শুধু যেদিনটাতে আমি আমার পাহাড়সম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পিতাকে চিরদিনের জন্য শুয়ে দিয়েছিলাম সেই দিনটা আমার কাছে অসহ্য কষ্টের মনে হয়৷ এই দিনটা আসলে আমি বাজারের সবচেয়ে দামী পাঞ্জাবীটা পরে বাবার কাছে যাই, বাবাকে যে দিকে মুখ করে শুয়ে দিয়েছিলাম সেদিকে সামনাসামনি বসি। কেন যেন মনে হয় বাবা আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ওপর পাশ হয়ে শুয়ে থাকেন। আমি ডাকি, "বাবা, ও বাবা...অভাবের লজ্জাটা আমি তাড়িয়ে দিয়েছি বাবা...!" কিন্তু না, সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে আমার ডাক পৌছায় না..." ©ডাঃ ফয়জুর রহমান #সংগৃহিত


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ➤চেষ্টাই সফলতা➤
→ ""প্রত্যাখ্যানই সফলতার প্রেরন""
→ শত চেষ্টার পর সফলতা আসবেই!
→ একটি সফলতার গল্প
→ সফলতার উপায়
→ সফলতার রহস্য
→ ব্যর্থতায় সফলতা
→ ব্যর্থতা সফলতার পেছনের প্রধান কারন
→ অবহেলা আমাদের সফলতাকে পিছিয়ে দেয়।
→ চেষ্টাই সফলতার মূল
→ আলি-বাবা: জ্যাক মা - একজন সফল ব্যাক্তিত্ব - সফলতা
→ কর্মক্ষেত্রে সফলতার চাবি কাঠি
→ বিপদ,অহংকার,সাধ্য,অবলহেলা ও সফলতা
→ সফলতা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now