বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সমাধান
-নাসির খান
::এক::
বাবা আমাদের
ফ্লাটে ঢুকে প্রথমেই
যে কথাটি বললেন তা হলো, "ও
ছুবান এই ঘরবাড়ি কি তোর?"
বাবার এমন প্রশ্নে আমার
বিরক্তি চরমে পৌঁছালো।
আমি শার্ট থেকে টাই
ছাড়াতে ছাড়াতে বললাম,
-"আব্বা আমি এখন বড় হয়েছি,
আমাকে ছুবান বলবেন না। সুন্দর
করে বলবেন-সোবহান। আর বাড়ি-ঘর
আমারই। কিনেছি ছয়মাস
আগে এটা তো আপনি জানেন।
চিঠি পাননি?"
বাবা এক কথায় চুপ করে গেলেন।
গ্রামে থাকলে তা হত না। বাবার
সাথে আমি কথা বলছি আর বাবা চুপ
করে আছেন, এমন কখনও হয়না।
আমি এসি ছেড়ে দিলাম ঘরের।
তেমন প্রয়োজন ছিলো না।
বাবাকে দেখানোর জন্যই।
বাবা অবাক হয়ে এসির
দিকে কিছুক্ষণ
তাকিয়ে থেকে বললেন,
-"বুড়া হয়ে গেছিরে ছুবান। এসির
বাতাস সহ্য হয়না। শীত লাগে। বন্ধ
কর।"
আমি বন্ধ করলাম না এসি।
দেয়ালজোড়া টিভি ছেড়ে দিয়ে বললাম,
"আপনি টিভি দেখেন।
আমি জেবাকে রান্না করতে বলি।
কি খাবেন?"
বাবা অবাক বিস্ময়ে টিভির
দিকে তাকিয়ে থাকলেন। উত্তর
পেলাম না।
আমি বেডরুমে চলে এলাম।
::দুই::
বাবা তার সত্তর বছরের জীবনে এই
প্রথম ঢাকা এলেন।
আমি পাঁচ মাস মত বাড়ি যাইনা।
এদিকে বাবার খুব ইচ্ছা আমার
এখানে একবার বেড়াতে আসবেন।
আমি কোনদিন বাবাকে আসতেও
বলিনি। আমার কখনও
ইচ্ছা করেনি বাবাকে গ্রাম
থেকে এনে আমার বাসায় রাখি।
গ্রামে টাকা দরকার, কিছুদিন পরপর
পাঠাই। ব্যাস
ঝামেলা মিটে গেলো। এবার
বাবা তেমন কিছু না জানিয়েই
আমার অফিসে এসে হাজির।
আমি এত অবাক হলাম যে বাবার
সাথে কিছুক্ষণ কোন কথাই বললাম
না। এভাবে হাতে ডাব,
পেঁপে,দুধের বোতল নিয়ে হুটহাট
চলে আসলে কেমন দেখায়।
ক্যাশ সেকশনের জান্নাতুল
আপা তো বলেই বসলেন, "সোবহান
সাহেব আপনার জন্য তো গ্রামের
তরতাজা পুরো বাজারটাই হাজির।"
আমি অস্বস্তি নিয়ে হেসে হেসে
বললাম,"গ্রামে থাকা প্রাইমারি স্কুলের
শিক্ষক বাবারা এমনই হয়। এটা আমার
গর্ব।"
এমন ভাব করলাম যেন আমি বাবার
এমন
আগমনে গর্বে মাটিতে পা রাখতে পারছি না।
::তিন::
বাবা সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের রেস্ট
রুমে শুয়ে থাকলেন।
আমরা বাড়িতে ফিরব কখন এ
নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করলেন না।
এমনিতেই সচারচর আমার অনেক রাগ।
কিন্তু বাবার উপর বিরক্ত লাগলেও
আমি তেমন রাগ দেখালাম না।
বাসায় ফেরার সময়
গাড়িতে বসে বাবাকে জিজ্ঞেস
করলাম, "আব্বা শহরে এসব অনেক
পাওয়া যায়। এত দূর
থেকে এগুলো এনেছেন কেন কষ্ট
করে?"
বাবা খুশি হয়ে উত্তর দিলেন,
"বৌমা মা হবে। এই
সময়ে ভালো ভালো জিনিস
খাওয়া উচিৎ। শহরের খাবার
দামী হলেও গ্রামের মত বিশুদ্ধ না।"
দু-তিনটা ডাব,পেঁপে আর দুধ কি এমন
ভালো খবার কে জানে।
এই কথার উত্তরে কি বলা উচিৎ
ভেবে পেলাম না। চুপ করে গেলাম।
বাবাই নিজ থেকে আবার বলল,
"এই গাড়ি কার? তোর?"
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, "না।
এটা অফিসের গাড়ি।"
আমি হিসাব করে দেখলাম বাবার
দীর্ঘ জীবনে এমন গাড়িতে সম্ভবত
বাবা প্রথম চড়লেন।
রাতে জেবা কে বললাম বাবার
প্রতি একটু খেয়াল রাখার জন্য।
বাবা কি খেতে চায়
তা খেতে দেয়ার জন্য।
জেবা তেমন কোন আগ্রহ
দেখালো বলে মনে হলোনা। একবার
শুধু বলল, "আমার শরীর খুব
বেশি ভালো না। শরীর
ভালো থাকতে উনি এলে ভালো হত।"
এসে যখন পড়েছে, তখন তো আর
বাবাকে বলে ফেলতে পারিনা,
"আব্বা আপনি গ্রামে চলে যান।
পরে সময় করে আসবেন বেড়াতে।"
রাতে খাবার
টেবিলে বাবা বারবার
বলতে লাগলেন,
"বৌমা কে ডাব কেটে দে।
পেঁপে কেটে খাও বৌমা। দুধ কাল
সবটুকু তুমি একাই খাবে।"
আমি বাবার বারবার অনুরোধে ডাব
কেটে আনলাম। জেবা খেলো না।
আমারও খেতে ইচ্ছা হলো না।
সারারাত খাবার টেবিলে বাবার
আনা ডাব পরে থাকলো।
সকালে উঠে হয়তো জেবা ফেলে দিলো
ওগুলো।
::চার::
পরদিন দুপুরবেলা বাবা আবার আমার
অফিসে এসে হাজির। হাতে ব্যাগ।
আমি অবাক হলাম। বাবা খুব
সন্তর্পণে আমাকে বাইরে ডেকে নিয়ে
বললেন,
"আমি গ্রামে চলে যাচ্ছি। অন্য সময়
সুযোগ মত এসে আরো কিছুদিন
থাকবো।"
আমি অবাক হলাম। ঘটনা কি?
জেবা কি বাবাকে কিছু বলেছে?
অনেক প্রশ্ন করেও বাবার কাছ
থেকে উত্তর পেলাম না তিনি কেন
চলে যাচ্ছেন। বাবা খুব সহজ
স্বাভাবিক। এক পর্যায়ে আমার হাত
ধরে বললেন,
"কিছু টাকা দে। তোর মায়ের জন্য
একটা কাপড় কিনে নিয়ে যাই।
অনেক খুশি হবে।
সারা গ্রামে দেখাবে, আমার
ছেলে আমার জন্য শহর থেকে কাপড়
পাঠাইছে।"
আমি বাবাকে পাঁচ হাজার
টাকা দিয়ে দিলাম।
বাবা চলে গেলেন।
আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম,
বাবা চলে যাওয়াতে আমার
কাছে হালকা হালকা লাগলো।
সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে শুনলাম সত্যিই
জেবা বাবার সাথে খারাপ
ব্যাবহার করেছে।
সকালে নাকি বাবা পাশের
ফ্লাটে গিয়ে গল্প
জুড়ে দিয়েছিলেন আমার
ছোটবেলার। আমরা কত গরীব
ছিলাম। এখন আমার কত
টাকা হয়েছে, এসব। আমার নিজেরই
রাগ লাগলো। বাবাকে পাশের
ফ্লাটে যেতে হবে কেন? এসব গল্প
করতে হবে কেন? বাবা ভেবেছেন
আমাদের গ্রামে পাশের বাড়ীর
মানুষ আর শহরের পাশের ফ্লাটের
মানুষ একরকম।
এজন্য বাবাকে জেবা নিষেধ
করাতে হয়ত খারাপ লেগেছে তাই
চলে গেছে।
জেবার
মতামত,এটা নাকি জেবা আর আমার
জন্য এই সমাজ পরিবেশে বিরাট এক
সমস্যা। কারন ধনীরা অপেক্ষাকৃত
দরিদ্রদের প্রতি অন্য রকম মনোভব
পোষন করে। এতে স্ট্যাটাস
কমে যায়।
হয়ত এই সমস্যার সমাধান করতেই
বাবা চলে গেলেন।
::পাঁচ::
রাতে ঘুমাতে গিয়ে আমার
মনে হলো আমি যথেষ্ট অমানুষ
হয়ে গেছি। টাকা পয়সা দুদিন
ধরে কামিয়ে অহঙ্কারবোধ
আমাকে ছোটলোক
বানিয়ে দিয়েছে।
প্রত্যক্ষভাবে হোক আর
পরোক্ষভাবেই হোক বাবার
সাথে এমন আচরণ করা আমাদের ঠিক
হয়নি।
বাবা তার
স্বকীয়তা নিয়ে এখানে থাকতে চেয়েছিলেন।
আমরা আমাদের মত চিন্তা করে তার
স্বকীয়তা কে নষ্ট
করতে চেয়েছিলাম মাত্র।
সারারাত আমার এপাশ-ওপাশ
করে কাটলো। তেমন ঘুম হলোনা।
আমি যতবার এমন নিন্দনীয় অপরাধ
করি, ততবারই কোন না কোন
রাতে তার জন্য বিবেকের
প্রায়শ্চিত্ব অনুভব করি। কিন্তু রাত
গড়িয়ে সকাল হলেই আমি আবার
সেই
টাকা কামানো শহুরে সোবহান
হয়ে যাই। যে সোবহান কে অমানুষ
বলা যায়। যে অমানুষিকতার
সমাধান
স্থায়ীভাবে আমি করতে পারি না।
::ছয়::
জেবা দীর্ঘ পাঁচ বছর পর
মা হতে যাচ্ছে। এর আগে তিনবার
কনসিভ করেও তা সাকসেস হয়নি।
তাই এবার খুব সচেতন ভাবে দিন পার
করছে ও। প্রায় দিনেই অফিস
থেকে খুব তারাতারি বাসায়
ফিরে জেবাকে সময় দেই।
একটা ফুটফুটে সন্তানের প্রতি আমার
আগ্রহ জেবাকেও হার মানায়।
কতদিন আমি চিন্তা করেছি আমার
একটা তুলতুলে স্বর্গীয় মেয়েশিশু
থাকবে। লাল টুকটুকে ওর
ঠোটে আমি সিগারেট
খাওয়া ঠোট নিয়ে চুমু
দিতে যাবো আর
জেবা রা রা করে উঠবে । ওকে চুমু
দেয়া হবেনা আমার।
পরে জেবাকে আড়াল করে ঠিকই
আমার ছোট্ট আম্মুটাকে চুমু
দিয়ে দেবো।
এমন কত স্বপ্ন আমার।
জেবার সুবিধার জন্য হাসনা নামের
এক মহিলা কে রেখে দিয়েছি।
হাসনা খালা আমার
উত্তেজনা দেখে দিন-রাত মুখ
টিপে হাসে আর বলে,
"ভাই আপনের খুব সুন্দুর মাইয়া অইব।
চিন্তা নিয়েন না।"
"আমি চিন্তা নিচ্ছি তোমাকে কে বলেছে?"
"দেইখাই বুঝা যায়। আমারে কিন্তু
হাজার টাকা বকশিশ দেওন
লাগবো।"
"সবই দেবো।
তুমি জেবাকে দেখে রাখো।
ওকে কোন কাজ করতে দিওনা।"
বাবু হতে আর মাত্র পনেরো দিন
বাকি। আমার পনেরো দিন
অপেক্ষা করার মত ধৈর্য্য আমার
ছিলোনা।
বাবা হওয়ার উত্তেজনায় আমি এই
পনেরো দিন ঠিকমত
খাওয়া দাওয়া করতেও পারলাম না।
খেতে বসলেই আমার পেট ভরে যায়।
হাসনা খালা অকারনে মুখ
টিপে হাসে আর বলে,
"খাওন টেস হয় নাই?"
::সাত::
মে মাসের
পনেরো তারিখে জেবার
একটি মেয়ে সন্তান হলো।
আমি বড়জোর দুইবার মেয়ের মুখ
দেখলাম। জেবা এই গরমে সারাদিন
মেয়েকে তোয়ালে দিয়ে ঢেকে রাখে।
কেও দেখতে এলে মন খারাপ
করা গলায় বলে, "বাবু তো অসুস্থ। সুস্থ
হোক তারপর দেখবেন।"
সন্তান যেমনই হোক, বাবা-মায়ের
কাছে তা সন্তানই। কিন্তু আমাদের
কাছে এমন বাক্য সফল হলো না।
আমাদের মেয়ে আমার মন মত হয়নি।
এত কালো হয়েছে।
সেটা সমস্যা না। বড়
সমস্যা হলো মেয়েটির মুখের বাম
পাশ টা থ্যাবড়ানো হয়েছে। বাম
চোখ, নাকের এক অংশ সহ কানের
দিকটা ভেতরের দিকে চ্যাপ্টা।
কাঁদেও না, হাসেও না।
প্রতিবন্ধি হয়েছে অনায়াসেই
বলা যায়। জেবার মনের
কি অবস্থা জানিনা। আমার মনের
অবস্থা খুবই দূর্বিসহ হয়ে গেলো।
এরমধ্যেই সবাই বলাবলি শুরু করেছে,
সোবহান সাহেবের
মেয়েটা প্রতিবন্ধি হয়েছে,
আহারে।
সারারাত আমার ঘুম হয়না।
অনেক আগেই
আমি বুঝে ফেলেছি মানুষ
হিসেবে আমি যথেষ্ট অমানুষ
হয়ে গেছি। বাবা হিসেবেও যে খুব
নীচুস্তরের হয়ে গেছি তা বুঝলাম এক
রাতে। একদিন রাতে অবাক
হয়ে আমি চিন্তা করলাম, এই
মেয়েটি আমাদের জন্য সমস্যা।
আমার মনে হলো, মেয়েটি যদি মৃত
জন্ম নিতো, তবে সেটা হত সুন্দর
সমাধান।
::আট::
হাসনা খালা কে তিনটা কাপড় আর
দেড় হাজার টাকা দিলাম বেতনের
সাথে অতিরিক্ত। তারপরও
তাকে রেখে দিলাম। কারন
বাচ্চা আর জেবা কারো শরীরই
ভালো না।
রাতে শোবার ঘরে জেবা আর
বাচ্চা থাকে।
মেঝেতে হাসনা খালা বিছানা পেড়ে থাকে।
আমি বসার ঘরের সোফাতে ঘুমাই।
প্রায় রাতেই
হাসনা খালা এসে বলে, বাবুরে এট্টু
কোলে নেন। আফায় ঘুমাইতেছে।
আমি চার পাঁচ মিনিট
কোলে করে আবার বিছানায়
শুইয়ে দেই। বাচ্চা একদম নির্জীব।
কোলে নিলে চঞ্চলতা দেখে মায়া লাগবে,
এমন না।
আমার মনটা যে খুবই খারাপ,
জেবা এটা বোঝে। তাই
বাচ্চা নিয়ে তেমন কথা বলে না।
একদিন শুধু বলল, "নাম রাখতে চাও
কি?"
আমি রসকষহীন ভাবে বললাম,
"যা ঠিক করে রেখেছিলে তাই
রেখে দাও। টুম্পি।"
বাচ্চার তেইশদিন হয়ে গেলো। এর
মধ্যে আট নয় বার ডাক্তার
দেখাতে হলো। বিরক্তি আর
কাকে বলে।
তেইশদিনের মাথায় এক ভোর
রাতে হাসনা খালা আমাকে ঘুম
থেকে জাগিয়ে একটা সমাধানের
কথা বলল।
সোফায় ঘুমাচ্ছিলাম। রাত কত হবে?
তিনটা?
হাসনা খালা এসে আমাকে খুবই
ধীরে ধীরে ডেকে উঠিয়ে চোরের
মত ফিসফিস করে শীতল গলায় বলল,
"ভাইজান, বাচ্চায় মারা গেছে।
জেবা আফায়
কোলে নিয়া বইসা আছে।"
খবরটা শুনে সবার আগে আমার
যে কথাটা মনে হলো তা হলো,
বাচ্চা মারা গেছে তাহলে জেবা কাঁদছে না কেন?
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now