বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যখন আমি একা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Md.Samiul Alim. (০ পয়েন্ট)

X দরজাটা খুলে আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। এটা কি সত্যি? কাকে দেখছি আমি? দীপা আস্তে করে বলে , "ভেতরে ঢুকতে দাও শুভ"। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপাতত আমার মাথায় ঘুরছে ফুটবল খেলার কথা। পরশু পরীক্ষা। কাল যদি খেলতে যাই বাবা ঠ্যাং ভেঙ্গে দিতে পারেন! কিন্তু সেটা আমার মাথা ব্যাথা না! বাসার সবাই এতদিনে জেনে গেছে এই ছেলেটা যৌথ বাড়ির আর দশটা ছেলের মত শান্ত, নিরীহ টাইপ না! আগে বড় চাচাত ভাইরা শাসন করতেন। এখন আর করেন না। কিন্তু বাবা মাঝে মাঝেই প্রচন্ড রেগে যান। কিন্তু আমার বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে কাল আমাদের খেলায় ফয়সাল থাকছে না। বেচারার পা মচকে গেছে। অথচ আমাদের সেরা ডিফেন্ডার ও। রায়পাড়ার কাছে হেরে গেলে মান ইজ্জত আর কিছু থাকবে না! কিছুক্ষন মিঠু আর রায়হানের সাথে কথা বলে বাসায় চলে আসলাম। আমাদের দোতলা প্রকান্ড বাড়িটায় আমাদের তিন চাচা আর আমার বাবা থাকেন। দাদা-দাদী কেউ নেই। কিন্তু যৌথ পরিবারটা রয়ে গেছে।দক্ষিন দিকের ছোট একটা চিলে কোঠার ঘর বরাদ্দ আমার জন্য। কাল যেহেতু খেলা আজ যদি পারি তো কিছু পড়ে নেই। এই চিন্তাতেই দুপুরে খেয়ে জানালার পাশে এসে বসলাম বই নিয়ে। জানালা দিয়ে সামনের বাড়িটা দেখা যায়। অনেকদিন ওখানে কেউ ছিল না, কিছুদিন হল একটা হিন্দু ফ্যামিলি এসেছে। দেশে তো এখন খুব গোলমাল চলছে। এখন অনেক হিন্দুই ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। আর এরা কিনা এই সময়ে এরকম একটা বাড়ি কিনে নিল! আমার মুখোমুখি জানালাটা একদিন ও খোলা দেখিনি এখনো। মন দিয়ে যখন কেমিস্ট্রির বইটা পড়ছিলাম , হঠাৎ মনে হল চোখের কোনে কিছু একটা নড়াচড়া। সরাসরি তাকালাম জানালা দিয়ে। একটা মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে জানালা খুলে! কি উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জানালার শিক গলে। আমিও তাকিয়ে আছি। সম্মোহিতের মত। মেয়েটা যখন টের পেল মুহুর্তেই জানালাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিল। কি যে লজ্জা লাগছে! ওরা যদি এখন আমাদের বাসায় এসে নালিশ দেয়? কি বাজে ব্যাপার হল। কিন্তু পরদিন ফুটবল খেলে এবং ১-০ গোলে জিতে যখন ভয়ে ভয়ে বাসায় ঢুকলাম সন্ধ্যার পর , তখন ও বাবার গম্ভীর গলার ডাক শুনতে না পেয়ে নিশ্চিন্ত হলাম! যাক, তাহলে নালিশ করে নি! পরীক্ষা হল ভালোই। দুপুরের আগেই কলেজ ছুটি। অন্যদিন হলে এতক্ষনে কাদের মিয়ার দোকানে বসে পরোটা -ঝাল মাংস খেয়ে সবাই মিলে ঘুরতে যেতাম বুড়িগঙ্গার পাড়ে। তারপর আমার আর রায়হানের সাঁতার পাল্লা। আজ কিছুই ইচ্ছে হচ্ছে না। ইচ্ছে হল বাসায় চলে যাই। তখনো বুঝি নি বন্ধ জানালা আমাকে ডাকছে। চুপচাপ এসে বসে রইলাম জানালার পাশে। ইশ, একবার যদি খুলত! এ কথা ভাবতে ভাবতেই দেখি জানালা টা অল্প একটু খুলে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা! সরাসরি তাকাতে খুব লজ্জা হল। বন্ধ হয়ে গেল আবার জানালা। কোনদিন গার্লস কলেজের সামনে দাঁড়ায় নি। আজ দাঁড়ালাম। কেন তা নিজেও জানি না। "আপনি জানালা দিয়ে হাবার মত তাকিয়ে থাকনে কেন?", প্রশ্নটা এত তীব্র গতিতে এল যে আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম! তাই তো। কেন তাকিয়ে থাকি? "আর তাকিয়ে থাকব না", বলেই হন হন করে হাঁটা দিই। প্রায় ছুটে এসে আমাকে ধরে দীপা। "আপনি খুব জেদী! "। সেদিন আর বেশি কথা হয় না। একটা কলেজ ড্রেস পরা মেয়ের সাথে তার বয়সী একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায় , এটা ঢাকা শহরে খুব একটা স্বাভাবিক দৃশ্য না এই একাত্তর সালে! আমাদের কথা হয় না। বাইরে দেখাও খুব কম। জানালা খুলে শুধু নির্বাক বসে থাকা। দীপার চোখের কথাগুলো পড়তে চেষ্টা করি আমি। বুঝতে পারি এই মেয়েটার মাঝে আমার অস্তিত্তের সবটুকু। মাঝে মাঝে দুই একটা চিঠি দেয়া নেয়া। কিন্তু যতই নির্জন থাকা আমার আর দীপার জনালায় মুখোমুখি বসে থাকা, কিছুদিনের মধ্যেই পাড়ায় রটে গেল ব্যাপারটা। বন্ধুরা সাবধান করে দিচ্ছে এ বোকামি না করার জন্য। দীপা হিন্দু ,আমি মুসলমান। কিন্তু কেউ তো জানে না আমার অস্তিত্ব এখন দীপার মাঝে বিলীন। ২৪ শে মার্চ সন্ধ্যায় বাবা ডাকলেন। শহরে আজ প্রচন্ড গোলমাল। যেকোন সময় আর্মি নামবে বলে গুজব। রাস্তাগুলো সব মানুষ যেভাবে পারছে বন্ধ করতে চেষ্টা করছে। সন্ধ্যায় বাবা ডাকলেন আমাকে। "তোমার নামে কিছু কথা শুনছি শুভ।" চুপ করে যান বাবা। আমিও চুপ। "আচ্ছা এখন না, কাল সকালে তোমার সাথে কথা হবে"। আমি চলে আসি। রাত বারোটার পর মনে হল ঢাকা শহরে দৈত্য নেমেছে। বোধহয় পাড়ার সবচেয়ে পিছনে হওয়ায় আমাদের আর দীপাদের বাড়িটা বেঁচে যায়। সকালে উঠে গলির মুখেই দেখতে পাই কয়েকটা লাশ। বড় রাস্তায় উঁকি দিলাম না। শুনতে পাচ্ছি গাড়ির শব্দ। চেনা গাড়ি না, দানবদের গাড়ি। অন্ধ আক্রোশে জ্ব্লছে আমার শরীর। এপ্রিলের ৫ তারিখে যখন বাবার সামনে এসে বললাম , বাবা আমি যুদ্ধে যাচ্ছি, বাবা চুপ করে রইলেন কিছুক্ষন। তারপর বললেন, "যাচ্ছ যাও, কিন্তু দেশটা স্বাধীন না করে ফিরো না। মনে রেখ দেশটা তোমার মা। সেই মা আজ আক্রান্ত। সুতরাং কখনো পিছু হটো না"। বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে শিশুর মত কাঁদতে লাগলেন, এই প্রথম মা মারা যাওয়ার পর বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। দীপার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, ওদের বাসাতেই । কোন সঙ্কোচ ছাড়াই। দীপা কাঁদে নি, শুধু বলেছিল, "শুভ কাল আমরা ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি। "। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখে ফিরে এসেছিলাম আমি। আমি একাই। আমার সাথে বড় চাচার দুই ছেলে সারোয়ার ভাই আর ইমরান ভাই ও গিয়েছিলেন, উনারা ফিরেন নি। বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছিল। সুব্রতের কাছ থেকে শুনেছিলাম, দীপারা ইন্ডিয়ায় ঠিকমত পৌঁছেছে। আর কোন খবর ও জানে না। জানি না কিভাবে আজ পঁয়ত্রিশটা বছর চলে গেছে। একটা বেসরকারী ব্যাঙ্কের এম ডি এখন আমি। বাড়িটায় কেউ নেই, মেজ চাচার ছেলে- মেয়েরা সবাই বাইরে। দীপাদের বাড়িটাও আছে। কেউ থাকেনা ও বাড়িটায়। মাঝে মাঝে চুপ করে জানালা খুলে তাকিয়ে থাকি ওদিকে, যখন বুকের ব্যাথাটা খুব তীব্র হয়। আর কোন কোন দিন সেই স্বপ্নটা দেখে জেগে উঠি গভী রাতে। দেখি ,"একদিন মধ্য দুপুরে, দরজাটা খুলে আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আর সেই শান্ত হাসি হেসে দীপা আস্তে করে বলে , "ভেতরে ঢুকতে দাও শুভ"। বুকের ব্যাথাটা আরো বেড়ে যায়। অন টপিকঃ এই গল্পটি মূলত ব্যান্ড এল আর বির বিখ্যাত গান "সাবিত্রী রায়" এর একটি রুপান্তর লিখনের অপপ্রয়াস! যারা গানটি শুনেছেন তারা বুঝতে পারবেন সহজেই। আমার অসম্ভব পছন্দের একটি গান। তাই এই দুঃসাহস! যারা লেখাটি পড়বেন তারা নিজ গুনে আমার দুঃসাহস ক্ষমা করবেন, এই আশা রইল!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৮ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now