বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
-কী কর? চমকে উঠে মিতি! কথাটা কানে আসতেই তাড়াতাড়ি কম্পিউটার বন্ধ করে দেয়। দরজা খুলে রাজু যে কখন এসেছে মিতি টেরই পায়নি। উফঃ আর একটু হলেই মিতি আজ ধরা খেয়ে যেত। ভাগ্যিস রাজু দেখেনি সে কম্পিউটারে কী করছিল। ওদিকে রাজু কিছুই বুঝে পায় না কেন মিতি চমকে গিয়ে কম্পিউটার বন্ধ করে দিয়েছে! আর কেনইবা মুখে কোন কথা না বলে-অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে! কাঁধের ব্যাগটা টেবিলে রাখতে রাখতে আবার জিজ্ঞাসা করে-
- কী করছিলে তুমি?
এতক্ষণে মিতি যেন টের পায় কিছু বলা দরকার। গলায় আটকে থাকা ঢোকটা জোর করে গিলে খেয়ে বলে-
- কই কিছু নাতো! উলটো সে প্রশ্ন করে-তুমি কখন এলে?
রাজু ভেবে পায়না ইদানীং কেন মিতি চমকে উঠে? ও দিব্বি শুনতে পেয়েছে যে মিতি কম্পিউটারে কী সব যেন টাইপিং করছিল। কী বোর্ডের খটাস খটাস শব্দ সে দরজায় দাঁড়িয়েই শুনতে পেয়েছে। বুঝতে পারে মিতি ওর কাছ থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছে। মনের ভেতরটাতে কে যেন হাতুড়ির বাড়ি মারে! "মিতি কী অন্য কারো সাথে চ্যাটিং করছে? কারো সাথে কী ওর প্রেম ট্রেম চলছে...!"কথাটা মাথায় আসতেই জোর করে সরিয়ে দেয়। গায়ের জামা খুলতে খুলতে মিতির কথার উত্তর দেয়-
-এতই ব্যস্ত ছিলে যে আমি এসেছি টেরই পাওনি!
-না মানে ইয়ে আসলে...।
রাজু বুঝতে পারে মিতি কিছু একটা বানিয়ে বানিয়ে বলতে,কথা হাতড়ে বেড়াচ্ছে। যখন দেখল কোন কথা খুঁজে না পেয়ে মিতি আমতা আমতা করছে। তখন রাজুই ওকে চমকে দিতে ঠোঁটে নিজের একটা আঙুল ছুঁয়ে দেয়- "হুসসস...থাক তোমাকে কিছু বলতে হবে না জান।" ফিসফিস করে কথাটা বলতে বলতে মিতিকে জড়িয়ে ধরে। আজ মিতি হালকা গোলাপি রঙের একটা জর্জেট শাড়ি পরেছে। ম্যাচিং করা ব্লাউজ। রাজুর চোখ থমকে যায় মিতির গোলাপি ঠোঁটে! এইতো দুদিন আগেই শপিং করতে গিয়ে পঁয়ত্রিশ ডলার দিয়ে হাই শাইন লিকুইড লিপিস্টিকটা কিনে এনেছে! পঁয়ত্রিশ ডলার মানে,দেশের প্রায় তিন হাজার টাকা! বিদেশে কেউ এত দামের লিপিস্টিক মাখে? নাইনটি নাইন সেন্টস-এর দোকান থেকে একটা কিনে মাখলেই তো হয়।দেশে একটা পরিবারের সবাই তিনহাজার টাকায় অন্ততঃ দুইবেলা ভাত মাছ গোস্ত খেতে পারে! বুকচিরে দীর্ঘশ্বাসটা বের হতে হতে আর বের হয় না। এমন সময় মিতি আদুরে কণ্ঠে বলে উঠে
-আরে ছাড়ো না। যাও তুমি হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে আসো।
রাজু সব ভুলে যায়। আলতো করে আদর মেখে দেয় মিতির ঠোঁটে।মিতি হাতের উলটো পিঠ দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে কপাল কুঁচকে বলে উঠে
-ইস কী কড়া গন্ধ! তুমি আবার ড্রিঙ্ক করেছো? তোমাকে না বারণ করেছি এসব খাবে না। আমি গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারি না।
-আর বল না আজ অফিসে একটা ছোট খাটো পার্টি ছিল।
-পার্টি তো থাকবেই। তাই বলে ড্রিঙ্ক করতে হবে? এসব অজুহাত দিও না প্লিজ।
রাজুর মাথায় টং করে ঘণ্টা বাজে। মৃদ্যু রাগ দেখায়-
-ঢং কর না। আমি যে ড্রিঙ্ক করি এইটা জেনেশুনেই আমাকে বিয়ে করেছো।
কথাটা বলতে বলতে বাথরুমের দিকে যায়। মিতি ভেবে পায় না ইদানীং রাজু হঠাৎ হঠাৎ কেন এমন রেগে কথাবার্তা বলে! মিতিকে চাকরিটাও করতে দিল না।
মনে পড়ে সেদিনের কথা। সেদিন মিতিকে রাজু সোজা বলে দিয়েছিল
-বিয়ের পরে কোন চাকুরী করা যাবে না।
-রাজু এটা কী বলছ! আমরা একই অফিসে কাজ করি। বিয়ের পরেও যদি আমরা কাজ করি একসাথে আসব একসাথে বাসায় যাব। কত মজা হবে বল?এটা আমার একটা স্বপ্নও বলতে পারো।
- আরে গুলি মারো এসব স্বপ্ন টপ্ন। তুমি বাসায় ঘর সংসারের কাজ করবে।
-এটা তো অফিস করেও করা যায়। আমরা যাই করব দুজনে মিলেই করব।
-ইস...আমি কেন ঘরের কাজ করব? এটা আমাদের বংশের ছেলেরা করে না। আর...আর তুমি বাসায় আমার জন্য অপেক্ষা করবে। নানা রকম হাতের কাজ করবে। ঘর সাজাবে আর মজার মজার সব রান্নার আইটেম করবে। আমার মাও করেছে তুমিও করবে। এইটা আমি চাই।
মিতি রাজুকে ভীষণ ভালোবাসে। রাজু অ্যামেরিকাতে এসেছে তিন বছর হবে। ও দেশের একটা পোশাক কোম্পানিতে বেশ ভালো পদে কাজ করত। সেই অফিসের কাজে এখানে এসে আর দেশে যায় নি। পড়াশুনায় ভালো এবং কাজেও ভালো অভিজ্ঞতা থাকায় এই অফিস ওকে কাজ দেয়। এই অফিসেই মিতিও কাজ করত। রাজু খুব কম কথা বলে। অফিস আর বাসা ছাড়া কোথাও যেত না। মিতির সাথে পরিচয় হবার পরে ওরা দুজন মাঝে মাঝে কাজ শেষে পার্কে হেঁটে বেড়াত। একসাথে দুপুরের খাবার খেত। ধীরে ধীরে ওদের সম্পর্কটা অনেক বেশিই গাঢ় হয়ে গিয়েছিল। দুজন দুজনের কত কথা শেয়ার করেছে। আস্তে আস্তে রাতের খাবারও দুজন একসাথে খেয়ে তারপর বাসায় যেত। বাসায় গিয়েও ফোনে কথা বলতে বলতে মিতি ঘুমিয়ে গেছে।
তারপর...পরেরদিন সকালে রাজুকে মিতিই ওর বাসা থেকে তুলে নিত। রাজু একটা ফ্যামিলির সাথে পেইং গেস্ট হিসাবে থাকে। এই অফিসে কাজ পাওয়ার আগে মিতি ওর বাবা মায়ের সাথে ফ্লোরিডা থাকত। ওর খুব ইচ্ছে নিউইয়র্কে এসে থাকার। ডিগ্রী পাশ করে চাকুরীর জন্য দরখাস্ত করতেই চাকরিটা হয়ে গিয়েছিল। ছোট ভাইবোনের লেখাপড়া এবং বাবার কাজের সমস্যা। এসব চিন্তা করে মিতি একাই নিউইয়র্কে এসে একটা স্টুডিও বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। রাজু বেশ কয়েকবার বলেছে মিতির সাথে এসে ওর বাসায় থাকবে। কিন্তু মিতি রাজি হয়নি। বিয়ে না করে একসাথে থাকা ঠিক না। মিতি ওর বাবা মাকে কোনভাবেই কষ্ট দিতে পারবে না। বাবা মা-কে মিতি রাজুর কথা বলতেই সবাই সোজা এখানে চলে আসে। তারপর ওদের বিয়ে দিয়ে ওরা চলে যায়। প্রথমে বাবা মা দুজনেই কিছুটা অমত করে কু কা করলেও। পরে মিতির জেদের কাছে হার মেনেছে। বাবা মায়ের ভাবনা-"হাজার হোক ছেলে বাংলাদেশি। চারদিকে যা কিছু ঘটছে তারচেয়ে দেশি ছেলে বিয়ে করছে মেয়ে এটাই অনেক।"
বিগত দিনের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মিতি ভুলে যায় রাজুর জন্য টেবিলে ডিনার দিতে হবে। কাজ থেকে এসে ডিনার। তারপর কম্পিউটারে নানা ধরণের কিছু অফিসের কাজ। নানা জায়গায় ফোন করে কথা বলা। তারপর নয়টা বাজলেই সোজা বিছানায় গিয়ে শোয়া। আবার সেই সকাল সাতটায় উঠে কাজে যাওয়া। এই নিয়ম মেনে চলা রাজুর নাকি অনেক আগে থেকে অভ্যাস। এই নিয়ে মিতিও কোনদিন কিছু বলেনি।
আজ মিতি সারাদিন রাজুর পছন্দের খাবার বানিয়েছে। ওর পছন্দ মানেই নানা ধরণের মাছ। সে নিজেই চাইনিজ দোকানে গিয়ে বেছে বেছে টাটকা মাছ কিনেছে। দেশি দোকান থেকে ফ্রজেন ইলিশ এবং ছোট মাছ কিনেছে। আজ সে একটু বেশিই গোলাপি গোলাপি সাঁজে সেজেছে। নিশ্চয় রাজু অনেক খুশি!
"মোর ভাবনারে কি হাওয়ায় মাতালো... দোলে মন দোলে অকারণ হরষে..." প্রিয় গানের কলিতে মিতির ফোন বেজে উঠতেই ভাবনার তার ছিঁড়ে যায়। ফোনটা কানে নিয়ে মিতি ঘাড় বাঁকিয়ে আশে পাশে দেখে নেয় রাজু বের হয়েছে কিনা! তারপর ফিসফিস করে কথা বলে-
-হ্যাঁ বল...! ওপাশ থেকে বলা সব কথা শুনে মিতি আবার বলে
- ঠিক তো এভাবে সময় সেট করে দিলেই কাজ হবে? হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক রাত নয়টায় সেট কর...ওকে ওকে এখন রাখি।
-কে ফোন দিয়েছে? রাজুর করা প্রশ্নে ফোনটা প্রায় হাত থেকে পড়েই যাচ্ছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে মিতি বলে
-কে আবার? আমার এক বান্ধবী। রাজুর কেন যেন বিশ্বাস হয় না মিতির কথা...। বলে-
-আমি তো তোমার সব বান্ধবীদেরই চিনি... নাম বল!
মিতি কিছু না ভেবেই বলে-
-শাহানা ফোন দিয়েছিল।প্লিজ তুমি খেতে থাকো। আমি একটু আসছি...। সে কম্পিউটারে কীসব যেন করে। তারপর কম্পিউটার অন রেখেই সোজা গিয়ে বাথরুমে ঢোকে। রাজু অবাক হয় মিতির ব্যবহারে!
আজ মনে হচ্ছে মিতি চরম পর্যায়ে চলে গেছে। ওকে যেন রাজু চিনতেই পারছে না! এই মিতি ওকে খুশি করতে কি না করেছে। চাকুরী ছেড়ে যেমনটা চেয়েছে ঠিক তেমনটাই করেছে। সারাদিন ঘরে থাকে,ঘরের কাজ করে। রাজুর মনে পড়ে-বেশ কয়েকদিন আগে মিতি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ও তখন অফিসের কাজে আপ ষ্টেট-এ। মিতির বন্ধুই তো ওকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল মনে হয়। সেদিন মিতি ফোন করে ভয়ে ভীষণ কেঁদেছিল। বারবার বলেছিল-"প্লিজ রাজু চলে আসো।" কিন্তু কাজটাও অনেক জরুরি ছিল। সারা রাত অস্থিরতায় কাটিয়ে দিনে দিনে কাজ সেরে রাজু সন্ধ্যায় বাসায় এসেছিল। এসে দেখে একটা ছেলে মিতির পাশে বসে হেসে হেসে কথা বলছে। রাজুর কাছে মিতিকে একটুও অসুস্থ মনে হয়নি! এখানে ওর খুব একটা বন্ধু নেই। তারপরও কোন ছেলে সে বন্ধু হলেও কেন যেন রাজুর একদম সহ্য হয় না। সেদিন ঐ বন্ধুটাকেও সহ্য করতে পারেনি। ধন্যবাদ দেবার পরিবর্তে ওকে সোজা বলে ফেলে-
-"এখন অনেক রাত হয়েছে। আর আমি চলে এসেছি। আমার মনে হয় মিতিকে দেখাশুনার জন্য আমিই যথেষ্ট!"
ছেলেটাকে আর কিছুই বলতে হয়নি। ঐ যে বলে না "সমঝদারকে লিয়ে ইশারায়ই কাফি হে।" ছেলেটা চলে গেলে মিতি অনেক রাগ হয়েছিল। ও রাজুকে ভীষণ বকা দিতে লাগলো। কেন ও অভাবে কথা বলল! রাজু মিতিকে অনেকবার "সরি" বলার পরওকোন কাজ হয়নি। বেশ কিছুদিন মিতি ওর সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিল।"মিতি তোমাকে বুঝতে হবে আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। তোমার পাশে আমি কাউকেই সহ্য করতে পারি না।"কিন্তু মিতি আমাকে বুঝলই না! নানা চেষ্টায় আমিও যখন ওর রাগ ভাঙ্গাতে পারি নি। তখন সময়ের উপর ছেড়ে দিয়েছিলাম। মেয়েটা যা করে না! তিন সপ্তাহ আমার সাথে কথা বলে নি! এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাজু ভাবনায় আসে-
"নিশ্চয় ফোনে বা কম্পিউটারে কারো সাথে কথা বলে। না হলে কেউ একই ছাঁদের নীচে থেকে কথা না বলে থাকতে পারে...?" রাজুর অফিসেও বেশ ব্যস্ত সময় কাটে। সেই সকালে যায় আর বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত।"আচ্ছা মিতি কী করে বাসায়?"এটা বুঝতে মাঝে মাঝেই রাজু হঠাৎ হঠাৎ বাসায় আসে। নিজেই চাবি দিয়ে দরজা খোলে। এখন ওর মনে হয় মিতি চাকরি না ছাড়লেই ভালো ছিল। বাড়তি কিছু টাকাও ঘরে আসত। আর ঘরে বসে বসে তেলও বাড়ত না। হাজার হোক চোখের সামনে থাকত! "শালি কানারে তুমি হাইকোর্ট দেখাও...। অ্যামেরিকায় বড় হওয়া মেয়ে তুমি আমার কাছে সতী সাবিত্রী সাঁজ না...?" দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সাথেই নিজে কথা বলে উঠে রাজু।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে খাবার একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। ঘাড় বাঁকিয়ে পিছন ফিরে রাজু দেখে মিতি কপালে হাত দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। ভাবখানা সে অনেক অসুস্থ বোধ করছে! "অসুস্থ্ না ছাই। নিশ্চয় প্রেমিক আর ওর মাঝে কোন কিছু নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে!" মনে মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মিতিকে খুব খেয়াল করে দেখে রাজু। গোলাপি শাড়ির উপর থেকে ওর বুকের দ্রুত উঠানামা বুঝা যাচ্ছে। ওর ফর্সা কোমরের জায়গাটায় থাকা কালো তিলটা নজরে এলো। "অসম্ভব একটা সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে এই ছোট্ট তিলটা। একেবারে নেশা ধরিয়ে দেয়।" রাজু ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। দেখে ফোনটা পড়ে আছে বালিশের পাশেই। কী ভেবে তুলে নেয় হাতে। শেষ কলটা কাকে করেছে তা দেখতে রিসেন্ট কলে যায়। রাজু দেখে শেষ ফোনটা দিয়েছে সেই বন্ধুটা। যে কিনা মিতিকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলে! ওর নাম শাহান...!
"মিতি মিথ্যে বলেছে যে শাহানা ফোন দিয়েছে! যেখানে ওর শাহানা নামে কোন বন্ধুই এখানে নেই।" যে কজন আছে রাজু তাদের সবাইকেই চেনে। রাগে রাজুর শরীর ঠকঠক করে কাঁপছে। মিতি ওকে মিথ্যে বলেছে,ওকে ঠকিয়েছে! ওর আর সহ্য হয় না। ধাম করে ঘুষি মারে একেবারে মিতির তল পেটে। ঠিক তিলটা যেখানে তার একটু নিচে। মিতি কিছু বুঝে উঠার আগেই রাজু ওর চিকন শরীরটা ধরে টেনে নামায় মেঝেতে। একহাত দিয়ে মিতির মুখ চেপে ধরে যেন শব্দ না বের হয়। আরেক হাতে ওর কোমর ধরে রাখে। হাঁটু দিয়ে দুই তিনটা গুঁতা মারে মিতির তলপেটে। ব্যথায় কুঁকড়ে যায় মিতি। সে মেঝেতে বসে পড়ে। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে দুই পা মেঝেতে ঘষতে থাকে। কোন শব্দ যেন বাইরে না যায়। তাই রাজু জোর করে চেপে ধরে ওর নাক মুখ। মিতির নিঃশ্বাস নিতে প্রচণ্ড কষ্ট হয়। এক সময় মিতি নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়। বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে। ঠিক তখনই কম্পিটারের স্ক্রিনে ওদের যুগল ছবি ভেসে উঠে। রাজু ধপ করে ছেড়ে দেয় মিতিকে।ভেসে আসে মিতির মিষ্টি কণ্ঠস্বর-
-আমারে একখান কুঁড়ে ঘর দিবা? আমি সেই ঘরে হ্যারিকেন জ্বালাই থাকপানে। আর যদি কেরাসিন কেনার টাকা না থাহে? ঘরখান জুইড়া চান্দে আলো ভইরা দেবে! আমি তোমার কান্ধে মাথা রাইখা,গুনগুন কইরা গান করবানি। আর তোমার বুকের গন্ধ শুঁইকে, নিঃশ্বাস নেবানে! তুমি শুধু আমারে একখান কুঁড়ে ঘর দিবা? আমি সেই ঘরের রানী হবানি,আর তুমি হবা আমার রাজা।
কী বিশ্বাস হচ্ছে না তো? এই দেখো তোমার অঞ্চলের ভাষায় আমি কবিতা লিখেছি। তুমি বল না আমি সারাদিন বাসায় কী করি? কী করব বল...? তুমি এত ব্যস্ত থাকো। তবে খুব শিঘ্রি আমাকে সময় দিয়ে ব্যস্ত রাখতে কেউ একজন আসছে জনাব। তখন তুমিও আমাকে পাবে না বলে দিলাম। হিঃ হিঃ হিঃ কী বুঝলে নাতো...! তুমি কী দেখো না? চোখের দরজা মনের দরজা সব বন্ধ করে রেখেছো? কেন...!? তুমি অনেক বদলে গেছো রাজু! আমি কত ভাবে তোমাকে ইঙ্গিত দিয়েছি যে,আমি অসুস্থ। তুমি আমার দিকে দেখোই না! আর তাই এতদিন ইচ্ছে করে তোমাকে কিছুই বলিনি। আর কখন বলব? কথা শুনার সময় কই তোমার? সারাক্ষণ কাজ অফিস দেশে ফোন দিয়ে সবার সমস্যার কথা শোনা। সারাক্ষণ দেশের সব সমস্যা নিয়ে ভেবে ভেবে শুধু ডলারের পিছনে ছুটে বেড়াও। সবার জন্য সময় আছে তোমার।কিন্তু আমার জন্য কোন সময় নেই। কেন রাজু? বাড়ি গাড়ী আমি এসব কিছু চাইনা। কুঁড়ে ঘরে থাকব...! তুমি যা কর না? তা ভাবলে আমার অনেক অভিমান হয়। তবে আর কোন রাগ অভিমান কিছুই করব না দেখে নিও...। তোমাকে আমি কতটুকু সময়ই বা পাই বল...? এখন থেকে যেটুকু সময় আমার কাছে থাকবে,আমরা তিনজন শুধু গল্প করব!
কী কিছু বুঝেছো? আমি শিওর তুমি এখনও কিছু বুঝনি! আজ সাত সপ্তাহ...। জানো ৮ মি. মি. এর মত লম্বা হয়েছে। বুঝনি তো...? আরে বুদ্ধু আমাদের সন্তান। তুমি আমি বাবা মা হতে চলেছি...। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে এই রেকর্ডিং করে কম্পিউটারে সময় সেটিং করে দিয়েছিলাম। আজ গোলাপি সাঁজে সেজেছি। জানো কেন...? আমি চাই ঠিক তোমার মত দেখতে,কোঁকড়া চুলের একটা তুলতুলে মেয়ে হবে। আজকের সব খাবার রেঁধেছি তোমার পচ্ছন্দের। জানো কতবার বমি করেছি এসব রাঁধতে গিয়ে? তবুও অনেক আনন্দ পেয়েছি! আজ আমরা একসাথে খেয়ে যখন ঘুমাতে যাব। ঠিক তখন রেকর্ডিংটা বাজবে। আমি তোমার বুকে মাথা রেখে শুনব। আমি শুনব জীবনের এত বড় সুসংবাদটা শুনে তোমার হার্ট বিট কত জোরে জোরে আর কত দ্রুত বেজে যায়! ধিক ধিক...ধিক ধিক...ধিক ধিক! আমি জানি আমাকে জড়িয়ে ধরে ঠিক আগের মত করে বলবে-"মিতি আমি তোমার দামি লিপিস্টিকটার একটু টেস্ট নিয়ে দেখি তো,ব্যাটারা কেন এত দাম রাখে...!" হিঃহিঃহিঃ তুমি না...! হুমমম তুমি খুব ভালো একটা মানুষ। স্বামী হিসাবে আমার গর্ব তুমি...। আমাকে তুমি অনেক ভালোবাস জানি। এখন ভালো একজন বাবা হয়ে দেখিয়ে দেবে...। অহঃ ব্যাই দ্যা ওয়ে ভিডিওটা বানাতে শাহানের সাহায্য নিয়েছি। সো সাম ক্রেডিট গোস টু শাহান। ওকে আবার বকে দিও না যেন। সেদিন যা করলে না...! তাই তোমাকে জেদ করেই জানাইনি ও আমার ছোট ভাই রিফাতের বন্ধু...। আমাকে আপু বলে ডাকে। কী...অবাক হলে? ও নিউইয়র্কে ঘুরতে এসেছে। ভাগ্যিস সেদিন আমার সাথে দেখা করে মায়ের দেয়া কিছু জিনিষ দিতে এসেছিল। না হলে আমাকে হাসপাতালে কে নিয়ে যেত বল! যাইহোক,তোমাকে সামনা সামনি এতোগুলো কথা কোনদিনই বলতে পারব না বলেই রেকর্ড করেছি। বিশেষ করে আমাদের বেবির খবরটা দিতে ভীষণ লজ্জা লাগছিল। এখন থেকে যখনই ইচ্ছে হবে এই ভিডিও দেখে আমার সময় কেটে যাবে। আরে...! নিশ্চয় এখন আমার পেটের দিকে তাকিয়ে আছো তাই না...? এই বেশরম! কী দেখছো অমন করে... হিঃহিঃহিঃ।
রেকর্ডিংটা শেষ হতেই ঘরের মাঝে কেমন একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে। রাজুর মনে হল মিতি যেন এতক্ষণ ওর বুকে মাথা রেখেই কথাগুলো বলছিল! কিন্তু মিতি তো ওর বুকে নেই! "উফঃ"বুকটা খুব ভারি লাগে...। "আমি ওর ঠোঁটের লিপিস্টিক নিয়ে এত ভাবি! অথচ মানুষটাকে নিয়ে একটুও ভাবলাম না!" কথাটা ভেবে বুক চিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। হঠাৎ চোখ যায় সামনে। মেঝেতে পড়ে থাকা মিতির দেহের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে রাজু! ওর গোলাপি শাড়িটা চপচপ রক্তে খয়েরী রঙ হয়ে গেছে। ফর্সা পা বেয়ে নেমে যাচ্ছে-টকটকে লাল রক্তের ধারা...।
শেষ
গভীর ভালোবাসাও সন্দেহের কাছে হেরে যায়...!
-সেলিনা ইসলাম
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now