বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হাঁটতে হাঁটতে আমি নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল হসপিটালে পৌঁছে গেলাম। ভেতরে ঢোকার সময় একটা স্ট্রেচার এর সাথে ধাক্কা খেলাম। ভয়ে কেঁপে উঠল বুকটা। অ্যাপ্রোনের পকেটে হাত ঢুকালাম সাথে সাথে। কাঁচের ঈষৎ উষ্ণ অ্যাম্পুলা টা আস্ত আছে দেখে এক ধরনের নিশ্চয়তা পেলাম। অন্যমনস্ক ভাবে চিন্তা করতে করতে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। কয়েকজন নার্স ছোটাছুটি করছে করিডোর জুড়ে। অসুস্থদের সেবা করতে করতেই এরা জীবনটা কাটিয়ে দিল... নতুন কিছু জানার আগ্রহ এদের আর নেই, কৌতুহল এখন আর এদের তাড়া করে বেড়ায় না। সাদামাটা রুটিনাবদ্ধ জীবনযাপন করে নির্বোধ মানবসমাজের অংশ হতে পেরেই এরা খুশি। মূল্যবান মানবজীবনের কি ভয়ংকর অপব্যবহার!
নির্বোধ মানবসমাজ... আমি হতাশভাবে চিন্তা করতে থাকি। এই নির্বোধ মানবসমাজ কীভাবে আমার মত মানুষদের জন্ম দেয়, ভাবতেই অবাক লাগে।
আমি ড. এরিক স্মিট, মাইক্রোবায়োলোজিতে রেকর্ড মার্ক পাওয়া স্টুডেন্ট, কিন্তু তারপরও এই নির্বোধ মানবসমাজের কাছে পরাজিত একজন মানুষ।
ছোটথেকেই ভাইরাস নামক জীবটার প্রতি আমার ব্যাপক আগ্রহ, প্রায় রাসায়নিক যৌগের মত আচরণ করা এই সত্বাটি কীভাবে জীবদেহের সংস্পর্শ পাওয়া মাত্রই জীবিত প্রাণীর মত আচরণ করা শুরু করে। তা সারাজীবনই আমাকে ভাবিত করে। আমি আর আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ক্রিস, আমরা দুইজনই ছিলাম একইরকম। আমরা দুইজনই মাইক্রোবায়োলজি তে পড়ি, এরপর আমি পিএইচডি গবেষনার জন্য আবেদন করি। আমার গবেষনার উদ্দেশ্য ছিল ভাইরাসকে মানুষের দেহে মিথোজীবী হিসেবে ব্যবহার করার জন্য উপযোগী করে তোলা। ভাইরাস খুব সহজে দেহের রিসেপ্টর সাইটের কাছে চলে যেতে পারে। দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারাও তেমন আক্রান্ত হয় না। ফলে ভাইরাসকে দেহের উপযোগী করে নেওয়া হলে মানুষের আয়ুস্কাল, বেঁচে থাকার ক্ষমতা, শক্তি, সব কিছুতেই যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। এমনকি তৈরি করা যেতে পারে সেই সব কাল্পনিক অতিমানবও, যারা এখনো মানুষের কাছে অধরাই থেকে গেছে।
কিন্তু এতে বাধ সাধল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ক্রিস। সে বলল, ভাইরাস নিয়ে মানবদেহের উপর গবেষণা করা খুবই বিপজ্জনক। আর ভাইরাস খুবই দ্রুত মিউটেশন ঘটাতে পারে। তাই আপাতদৃষ্টিতে উপকারী ভাইরাসও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে কিছু বুঝে ওঠার আগেই। আমি জানি এই গবেষণার রিস্কগুলো, কিন্তু ভালো কিছু পেতে হলে কিছু রিস্ক নিতে হয়। আর আমরা যেকোন সময়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মানুষগুলোর উপর ভাইরাস টেস্টিং করতে পারি... ওরা এমনিতেও না খেয়ে মারা যায়, একটা মহান গবেষনার জন্য মারা গেলে সমস্যাটা কোথায়? কিন্তু ক্রিস মানবতার দোহাই দিতে লাগল। মানবতা হল একটা দুর্বলতা। তাই আমি ওর কথা শুনলাম না। কিন্তু হার মানল না ক্রিস। উচ্চপর্যায়ে সে আমার গবেষণার রিস্কগুলো উল্লেখ করে অভিযোগ জানাল। কিন্তু ততদিনে আমি ভাইরাসের একটা কার্যকর মডেল তৈরি করে ফেলেছি। ফলে বোর্ড কতৃপক্ষ তার আবেদন নাকচ করে দিল। মানবতা! আমেরিকা যদি মানবতায় বিশ্বাস করত তাহলে অতীতে ইরান আক্রমন করত না।
আমি আংশিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা শুরু করলাম। গবেষনার মাঝামাঝি পর্যায়ে ক্রিস এসে আমার কাছে তার ভুল স্বীকার করল আর আমার সাথে কাজ করতে চাইল। এমনিতেও গবেষণার অগ্রগতির অভাবে আমি একজন স্পন্সর হারিয়েছি। তাই আমি সানন্দে ক্রিসকে আমার সহকর্মী বানিয়ে নিলাম। ক্রিসের মত নিবেদিতপ্রাণ কর্মী খুব কমই আছে... গবেষনা ধীরে ধীরে আলোর মুখ দেখতে লাগল, আর্থিক সমস্যা যেন না হয় সে জন্য আমি আমার শেষ কানাকড়ি পর্যন্ত গবেষনার পিছনে ব্যয় করলাম। ভাইরাসটি প্রায় স্টেবল হয়ে গিয়েছিল। আমি বোর্ডকে জানিয়ে দিয়েছিলাম যে আমার টেস্ট সাবজেক্ট দরকার ভাইরাস টেস্ট করার জন্য। বোর্ড আমাকে জানাল যে ইন্ডিয়ার একটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমেরিকার একটা হেলথ ক্যাম্পেইন খোলা হয়েছে। সেই খানে গিয়ে স্থানীয়দের উপর আমি ভাইরাসটা টেস্ট করতে পারি।
ঠিক সেইসময় একদিন রাতে ক্রিস তার আসল রূপটা দেখাল। সিস্টেম হ্যাক করে সে সব গোপনীয় ফাইল কপি করে উইকিলিকসে সেগুলো ফাঁস দিল সে। সারা বিশ্বে তোলপাড় শুরু হল। চাপের মুখে সরকার আমার প্রজেক্ট টা বন্ধ করে দিল। সেই প্রজেক্ট, যার পিছনে আমি আমার শেষ সেন্ট পর্যন্ত ব্যয় করেছিলাম। তীরে এসে তরী ডুবল আমার। শুধু তাই নয়। এই গবেষণা কখনো হয়ই নি, ফাঁস হওয়া ফাইলগুলো সব মিথ্যে, এটা প্রমাণের জন্য সরকার গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সব তথ্য খুব সতর্কতার সাথে সব জায়গা থেকে সরিয়ে ফেলল, যেন এই নামের কোন মানুষ কখনো ছিল ই না। ড. এরিক স্মিট নামে কেউ যে পৃথিবীতে আছে, এটার এখন আর কোন প্রমাণ নেই। সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ হল আরও ভয়ংকর! এই গবেষনার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে মেরে ফেলতে লাগল সরকার। আমার অনেক সহকর্মী মারা গেছে। আজ সকালে ক্রিস মারা গেছে কার অ্যাক্সিডেন্টে। গতকাল রাতে আমি ডার্ক ওয়েবে আমাকে, ক্রিসকে, এবং আমাদের আরও কিছু জীবিত সহকর্মীদের মারার জন্য বেশ ভারি অঙ্কের টাকা দেওয়া হবে বলে একটা বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম।
আমি নিজেও পালিয়ে বেড়াচ্ছি।
মানবসমাজ খুবই নির্বোধ। শুধু আমি না, মানবসভ্যতার সম্পূর্ণ ইতিহাসেই বিজ্ঞানীরা নির্যাতিত। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে, এই সত্যটি বলার জন্য ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, গ্যালিলিও কে কারাবন্দী করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর, মেন্ডেল বেঁচে থাকতে বংশগতিবিদ্যার উপর ওনার গবেষনার কোন মূল্যায়ন হয় নি, নাইলন পলিমারের আবিষ্কারকও আত্মহত্যা করেছিলেন ওনার গবেষণার মূল্যায়ন না হওয়ায়, গণিতবিদ হাইপেশিয়াকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, আর হাইপেশিয়াকে মারার মূল হোতা পরে খ্রিস্টান পোপ নির্বাচিত হয়েছিলেন!
মানবসভ্যতা এগিয়েছে বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের কারণে। কিন্তু মানবসভ্যতা খুবই অকৃতজ্ঞ। বিজ্ঞানীদের তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয় নি। আর এই সমাজ কখনো নতুনকে গ্রহণ করতে রাজি নয়। প্রাচীন ধ্যানধারণাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় এই সভ্যতা। এত অকৃতজ্ঞ আর প্রাচীনপন্থী কোন সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না। মানবসভ্যতা টিকে থাকার অনুপযোগী।
আমার পকেটের কাঁচের অ্যাম্পুলাটা দেখতে সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর একটি ভাইরাস। বাতাসের সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়বে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। মানুষের শ্বাসনালি হয়ে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে মস্তিষ্ককে আক্রমণ করবে। আর সারা দেহের কোষগুলো ব্যবহার করে নিজের আরো অসংখ্য প্রতিরূপ তৈরী করবে। এক দিনের মাঝে এই ভাইরাসটি কয়েক হাজার সাবটাইপ তৈরি করতে সক্ষম। ফলে এর বিরুদ্ধে ঔষধ তৈরি করা হবে অসম্ভব প্রায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মানবজাতি বিলুপ্ত হবে এই ভাইরাসের আক্রমণে। মানবজাতির কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করার সময় এসেছে। আমি দেব সেই শাস্তি!
আমি হাতের মুঠোয় চাপ দিয়ে অ্যাম্পুলাটা ভেঙে ফেললাম। কাঁচের ভাঙা খন্ডের সাথে লেগে আমার হাত কেটে গেল। ভাইরাসটি সরাসরি আমার রক্তে প্রবেশ করছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। আমার শরীরের নানা জায়গার ত্বক ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। আমি জানি, সেই ফাটা কোষগুলো থেকে বের হচ্ছে আরো নতুন ভাইরাস। ওরা আমার সৃষ্টি, আমার সন্তান। আমি মারা যাচ্ছি, কিন্তু অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। নিজের সৃষ্টির অভ্যুত্থান এর মাঝে মরেও শান্তি আছে। আমি আমার ঘড়ির দিকে তাকালাম। আজ ১৭ ডিসেম্বর ২০৫৩, এখন বেলা ১১:৩৭ মিনিট। দেখে কত সাধারণ একটা দিন মনে হয়, কিন্তু আজ মানবসভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। তবে মজার ব্যাপার হল আজকের দিনটির কথা মানবসভ্যতার ইতিহাসে লেখা থাকবে না।
কারণ আজকেই এই সভ্যতার বিলুপ্তির সূত্রপাত!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now