বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটি অসমাপ্ত দৌড়ের গল্পঃ পর্ব
১১
- সালেহ তিয়াস
২৩
আজকেই হবে ওর সাথে আমার শেষ বোঝাপড়া।
পুরো যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। কথাগুলো আগেই সাজিয়ে
নিয়েছিলাম।
ঝাড়ি প্রধানত দু প্রকার, গরম মাথায় গরম ঝাড়ি আর
ঠাণ্ডা মাথায় ঠাণ্ডা ঝাড়ি। গরম ঝাড়ি সাধারণত মনে খুব
দীর্ঘস্থায়ী কোন দাগ ফেলতে পারে না।
কিন্তু চিবিয়ে চিবিয়ে দেয়া ঠাণ্ডা ঝাড়ি শুধু দাগ কেন,
হৃদয়কে করতে পারে এফোঁড় ওফোঁড়। গরম
ঝাড়ি যদি পটকা হয় তবে ঠাণ্ডা ঝাড়ি হল পয়েন্ট
ব্ল্যাঙ্ক থেকে শুট করা বুলেট। মিস হবার কোন
চান্স নেই।
আমার ধৈর্যের বাঁধ অনেক আগেই ভেঙ্গে
পড়েছিল। আমি শুধু পাচ্ছিলাম না প্রমাণ। পারছিলাম না
চোরকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে। আজ
আমার সে আশা পূরণ হয়েছে।
হয় এসপার, নয়তো ওসপার। আজ ওর একদিন কি
আমার একদিন।
তুমি এমন কর কেন?
উত্তরে একটা গরর...গরর শব্দ বেরুতে লাগল
ওর মুখ থেকে। ঠিক যেন শিকার করার আগে
ক্ষুধার্ত বাঘ।
এই মেয়ে, সমস্যাটা কি তোমার? তুমি এমন কর
কেন?
গরর...গরর...
তুমি কি জানো যে তোমার মাথায় সমস্যা আছে?
নিশ্চুপ।
তুমি কি জানো যে তুমি একটা পাগল?
গরর...গরর...
কি পেলে তুমি এগুলো করে? এই যে এতরাতে
আমার রুমে ঢুকে এসব ছেলেমানুষি করছ,
এসবের কি মিনিং আছে? চাওটা কি তুমি?
গরর...গরর...
কেন? কেন এরকম করছ? কি মজা পাও তুমি এসব
করে?
চুপ।
এই মেয়ে, চুপ করে আছিস কেন? বলিস না
কেন...বল...বল... আমি তার মুখটা ধরে
প্রবলভাবে ঝাকিয়ে দিলাম।
মেয়েটা কেমন কেমন করে জানি তাকাল। পুরো
উন্মাদের দৃষ্টি।
তুই কি জানিস যে তুই একটা বাজে মেয়ে?
চুপ।
তুই একটা রাস্তার মেয়ে, নষ্ট মেয়ে।
তার মুখে প্রচণ্ড রাগ ঘনীভূত হতে লাগল।
আমার উপর তখন কোন জন্তুর আত্মা ভর
করেছে। চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, তুই একটা
বেশ্যা।
কি!!! চিৎকার করে উন্মুক্ত পা দিয়ে আমাকে
জোরে লাথি মারল সে। আমি হাত দিয়ে ঠেকাতে
গেলাম। কিন্তু একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। লাথির
চোটে আমি ছিটকে পড়লাম। নূপুরটা ছিঁড়ে আমার
হাতে চলে এল।
রাগে তখন আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। হিতাহিত জ্ঞান
হারিয়ে ফেলেছি।
আমি উঠে এসে ওর গালে ঠাস করে একটা চড়
বসিয়ে দিলাম। হারামজাদি...কুত্তি...
ও চড় খেয়ে একটু দমে গেল, কিন্তু এই প্রথম
কোন কথা বলল, গায়ে হাত দিবি না বলছি...
কেন, আমার চোখে পাষণ্ডের দৃষ্টি, কি করবি
গায়ে হাত দিলে?
একেবারে হাত কেটে ফেলব।
ফেল দেখি। আমি রান্নাঘরে গিয়ে খুঁজে একটা
বটি নিয়ে এলাম। ওর হাতের বাঁধন খুলে দিলাম দড়ির
এক কোপে। কাট, আমার হাত কাট...ওর হাতে বটিটা
ধরিয়ে দিয়ে সজোরে বললাম আমি।
ও বটি হাতে নিয়ে রাগে কাঁপতে লাগল। অসম্ভব
কাঁপতে লাগল।
আমি চিৎকার করে বললাম, আমাকে মেরেই যদি
তোর শান্তি হয় তো মেরেই ফেল। নে মার,
কি হল...
বটিটা দরজার দিকে ছুড়ে ফেলে দুহাত দিয়ে
চোখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল সে।
চিল্লাপাল্লা শুনে মামী উঠে দৌড়ে এসে ঘরের
বাইরে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় বটিটা তার পায়ের
উপরই পড়ল। চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলেন উনি।
আমরা দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকালাম। হঠাৎ
মন অজানা আতঙ্কে ছেয়ে গেল।
মামী ঢুকলেন রুমে। ঢুকেই একটা চিৎকার
দিলেন।
রাত পৌনে চারটার সময় একই ঘরে একটা ছেলে
আর একটা মেয়ে, সাথে অগোছালো পানিতে
ভেজা বিছানা, মেঝেতে উলটে পড়ে থাকা পানির
মগ আর একটা উড়ন্ত বটি দেখে উনি কি ভাবলেন
কে জানে? উদ্ভট কিছু কল্পনা করে নেয়াই
স্বাভাবিক।
কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ মামী এসে দুমদুম
করে আমার পিঠে কিল দিতে লাগলেন। সর্বশক্তি
দিয়ে থাপ্পড় মারতে লাগলেন গালে, মুখে।
বলতে লাগলেন, পেটের ছেলের মত বড়
করেছি তাহলে এজন্যে...হারামজাদা এসেছিলে
তো বস্তি থেকে...বস্তির স্বভাব এখনও যায়
নি...ভাবলাম যে ভাই বোনের মত থাকবে...তা
না...কালসাপ...কালসাপ...দুধ কলা দিয়ে কালসাপ
পুষেছি...হারামজাদা...লজ্জা করে না...নিজের
বোনের ইজ্জত লুটতে চাস???...
হঠাৎ করে যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। বধির হয়ে
গেলাম। অন্ধ হয়ে গেলাম। পৃথিবীর কোন শব্দ
কোন গান কোন ভাষা আর আমার কানে পৌঁছাল না,
কোন আলো কোন রঙ আর আমার চোখে
ধরা পড়ল না, কোন বানী কোন কথা আর আমার
কণ্ঠে স্থান পেল না। জগতের সকল অনুভুতির
উর্ধে গিয়ে খালি একটা কথাই কানে বাজতে
থাকল...বাজতেই থাকল...নিজের বোনের
ইজ্জত লুটতে চাস???...
মেঝেতে বসে পড়লাম আমি। মামী লাথি মারছে।
খালি গালাগাল দিচ্ছে। কে যেন কাঁদছে। আমি যেন
কিছুই অনুভব করতে পারছি না। হঠাৎ যেন আমি
অনেক ছোট হয়ে গেছি, অনেক ছোট...
২৪
একটা ছোট্ট ছেলে। বয়স? হবে বছর দশেক।
জীবনে মায়ের কোল ছেড়ে কোথাও যায়নি
সে। মা-ই তার সব।
বাবাকে কখনও দেখেনি সে। বাবার আদর কাকে
বলে জানে না।
সে বড় হয়েছে অভাব অনটনে। দারিদ্রে
সংগ্রামে। আজীবন মা-কে সারাদিন খাটতে
দেখেছে সে।
তাকে ঘিরে মায়ের ছিল অনেক স্বপ্ন।
তার সমবয়সী অন্য সবাই যখন মাঠে ঘাটে কাজ
করছে আর টই টই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে
তখন মায়ের আদেশে পড়ালেখা করেছে।
দিনে একবেলা খেয়েছে, অনেক সময় না
খেয়ে থেকেছে। কিন্তু কখনও অভিযোগ
করে নি। সে ছিল বড় শান্ত ভালো ছেলে।
গ্রামের স্কুলে বরাবরই সে ভালো রেজাল্ট
করত। আর সেটা দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরত
অন্য বড়লোকের ছেলেপুলে। বন্ধুত্বের
বদলে তারা এগিয়ে দিত শত্রুত্বের হাত।
তাকে দেখলেই বাবার কথা জিজ্ঞেস করত সেই
ডেঁপো ছেলের দল। তার মায়ের দিন চলে
কিভাবে এই নিয়ে দিত নানারকম বাজে ইঙ্গিত।
সে সব কথা রাতে ঘুমের সময় মা কে বলত
ছোট্ট ছেলেটা।
মা বলত, তোর বাবা গেছে রাজপুত্রের দেশে,
যেখানে আছে একটা সুন্দরী রাজকন্যা,
সেটাকে নিয়ে আসবে তোর জন্য...
শুনে লজ্জা পেত ছেলেটি। মা! তুমি এত দুষ্ট না,
যাও!
তারপর একদিন গ্রামে বিশাল ঝড় হল। প্রবল সেই
ঝড়ে মারা পড়ল অজস্র গবাদি পশু, উপড়ে গেল
অনেক গাছপালা, উড়ে গেল অনেক ঘরের চাল।
হতভাগ্য ছেলেটি ঝড়ের রাতে হঠাৎ ঘুম
ভেঙ্গে উঠে দেখল তার ঘরের চাল ভেঙ্গে
পড়েছে, সাথে সাথে দুদিকের দেয়ালও। কিন্তু
মা? মা কোথায়? ঝড়ের মধ্যেই বেরিয়ে গেল
সে। আশেপাশে খুঁজল সে পাই পাই করে। মা,
মা!
বাড়ি থেকে বেশ দূরে একটা বড় আমগাছের
নিচে সে তার মা-কে খুঁজে পেল। মা সেখানে
অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে।
সে ডাকল, মা! মা!
মা চোখ মেললেন। জেগেই তিনি নিজের
দিকে খেয়াল না করে সন্তানের গায়ে মাথায় হাত
বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, এই ঝড়ের
মধ্যে...কিভাবে এলি তুই...
ঝড় থামল একসময়। সকালে মা-ছেলে রওনা হল
শহরের উদ্দেশ্য। এখানে তাদের শেষ
সম্বলটুকুও যে প্রলয়ঙ্কারি ঝড় কেড়ে
নিয়েছে।
মায়ের কাছে একটা ঠিকানা ছিল। অনেক খুঁজে
খুঁজে সেই ঠিকানায় পৌঁছাল তারা।
হ্যাঁ, এ বাড়িটিই হবে হয়তো।
মা দূরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ছেলেকে বললেন,
খোকা, দ্যাখ তো, এটা কাদের বাসা? জিজ্ঞেস
কর তো এটা আহমেদ মিরাজ সাহেবের বাসা কি না?
খোকা বেল টিপল।
কে?
একটু খুলুন।
কে?
খুলুন না আগে।
দরজা খুলল একটা ছোট্ট মেয়ে। বলল, আব্বু
তো বাসায় নেই।
খোকা বলল, তোমার আব্বুর নাম কি?
মেয়েটি দাঁত বের করে ভেংচি কেটে বলল,
অপরিচিত কাউকে আব্বুর নাম বলতে হয় না!
খোকা তাকায় মা-র দিকে। মা, কি করব?
তুই নামটা বলে দ্যাখ চিনতে পারে কি না।
আচ্ছা তোমার আব্বুর নাম কি আহমেদ মিরাজ?
হ্যাঁ!!! হঠাৎ মিষ্টি মেয়েটি কেন যেন খুব খুশি
হয়ে উঠল। তুমি চেন? এস ভিতরে এস।
খোকা আবার তাকায় মা-র দিকে...আরে, কোথায়
মা?...মা...মেয়েটা বলে উনি তো ডানদিকে
গেলেন...খোকা দৌড়ে যায়...মা...মা.
..মা...খোকা ডানদিকে দেখে...বামদিকে
দেখে...কেউ নেই...কেউ নেই...খোকার
সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে...মা মা করে
সে বসে পড়ে রাস্তার উপরই...একটু পরে
মেয়েটা এসে বলে তুমি আমাদের বাসায়
চল...আব্বু আসলে আমরা সবাই মিলে খুঁজে দেব
তোমার মা-কে...
কিন্তু খোকার মন প্রবোধ মানে না...সে আকাশ
বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করতে থাকে মা তুমি আমায়
ছেড়ে কোথায় গেলে...কোথায় গেলে...
২৫
হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসি। আবিষ্কার করি দু গাল
বেয়ে নিজের অজান্তেই বয়ে গেছে
অশ্রুস্রোত।
সামনে তাকাই। দেখি মেয়েটা বসে বসে
কাঁদছে। নিঃশব্দে।
আর মামী পাথরের মত মুখে বসে আছে।
আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। আমাদের সঙ্গী
হয় জানালা দিয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস।
তারপর মামী কথা বলে ওঠেন। তার গলাটা মনে হয়
অপরিচিত, যেন অনেক দূর থেকে ভেসে
আসছে।
তুমি কালই চলে যাবে।
আমি একটুও অবাক হই না। যেন আমি আগে
থেকেই জানতাম কি হবে।
তোমার মামা আসলে তার সাথে দেখা করেই তুমি
চলে যাবে।
একটু থেমে মামী আবার বলেন, এটা মনে
কোর না তোমাকে আমরা ভালবাসি না। আমরা
অবশ্যই বাসি। কিন্তু যা ঘটছে, এর পর আর
তোমাকে এখানে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তুমি চাইলে আমরা তোমায় ভালো কোন
হোস্টেলে রেখে আসতে পারি। তুমি
সেখানে বসে পড়াশোনা করবে। মেডিকেলে
চান্স পেলে তো ভালো, সেখানেই তুমি
থাকতে পারবে।
আমরা তোমার সব খোরপোশ দেব। যা লাগে
দেব। খালি একটাই শর্ত, তুমি আর আমার বাড়ির
ধারেকাছে আসতে পারবে না।
আমি নির্বিকার থাকি। যেন এটাই আমার নিয়তি।
মামী তার মেয়েকে নিয়ে চলে যান। আমি
তাদের পায়ের আওয়াজ শুনি। শুধু নূপুরের শব্দটা পাই
না।
নূপুরের শব্দ আমার জীবন থেকে চিরদিনের
মত হারিয়ে গেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now