বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একটি অসমাপ্ত দৌড়ের গল্প -
পর্ব ৭
- সালেহ তিয়াস
১৬
পরীক্ষাটা খারাপ হল।
হবে না-ই বা কেন? একটুও তো মনোযোগ
দিতে পারিনি। সামনে যখন ‘কোনটি ভেক্টর রাশি নয়
বললে ভুল হবে’ টাইপ প্রশ্ন একের পর এক
আসছে, আমার মন তখন সকল স্কেলার ভেক্টর
রাশি ছাড়িয়েও অনেক দূর চলে গেছে। সবাই
যখন সামান্তরিক সূত্র না ত্রিভুজ সূত্র এই নিয়ে মাথা
ঘামাচ্ছে, আমি তখন কল্পনায় কাউকে চুল কেটে
কালি মাখিয়ে সারা শহর ঘুরিয়ে আনছি।
বাসায় আসার পথে রাগ খালি বাড়তেই থাকল। আজকে
হবেই একটা কিছু। কিছু একটা হবেই।
আমি রিকশায় বসে আছি, কিন্তু মন চলে গেছে
কোন একটা অন্ধকার কারাগারে, যেখানে আমি
একমাত্র বন্দিনীর উপর টর্চার চালাচ্ছি। অথবা
সাইবেরিয়ার কোন একটা দুর্গম বরফাবৃত জায়গায়,
যেখানে আমি এক নির্বাসিতাকে রেখে চলে
আসছি। অথবা কোন এক কেমিকেলের
দোকানে, যেখানে আমি কোন এক হতভাগ্যার
মুখ পোড়াতে অ্যাসিডের বোতল কিনছি চুপে
চুপে।
এসব চিন্তায় এতটাই আত্মমগ্ন ছিলাম যে, কখন বাসার
সামনে চলে এসেছি টেরই পাইনি। রিকশাওলার
ডাকে হুঁশ ফিরল।
জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। ‘এই
খোলো, খোলো...’
এতই জোরে ধাক্কাচ্ছিলাম যে আশেপাশের দু
একটা বাড়ির জানালা থেকে দু একজন মাথা বের
করে উঁকি ঝুকি মারতে লাগল।
নূপুর পরা একটা পায়ের শব্দ শুনলাম। দৌড়ে আসছে।
দরজার সামনে কিছুক্ষণ থেমে রইল।
‘কি ব্যাপার? খুলছ না কেন?’
তাও কেউ খোলে না। কিন্তু এটা নিশ্চিত, সে
দাঁড়িয়েই আছে।
আমি এত জোরে ধাক্কা দিলাম যে আরেকটু
হলে দরজা টরজা সব ভেঙ্গেচুরে চুরমার হয়ে
যেত।
সিটকিনি খোলার শব্দ পেলাম। ওটা নামার সাথে
সাথেই এত জোরে একটা ধাক্কা দিলাম যে...
দরজার ওপাশে যে ছিল সে উলটে পড়ল। আমি
পুরো মাস্তান স্টাইলে রুমে ঢুকলাম।
আমার সম্বন্ধে যারা বিন্দুমাত্র জ্ঞান রাখেন, তারা
কখনও কল্পনাও করতে পারবেন না কি সাংঘাতিক রাগ
হয়েছিল আমার তখন। আমি তখন আর আমার মধ্যে
নেই, কোন একটা পিশাচ তখন আমার মধ্যে ভর
করেছে।
আমি সোজা গিয়ে ওর চুল ধরে উঠালাম। ও উঠল।
দেখি মেঝেতে ছিটকে পড়ার ফলে ওর নাক
দিয়ে বেরিয়ে এসেছে কয়েক ফোঁটা রক্ত...
আমি তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। যতটা সম্ভব চিবিয়ে
চিবিয়ে বললাম, কেন করেছ এসব?
ও কিছুই বলল না। কিন্তু মেঘহীন নির্মল আকাশে
হঠাৎ শুরু হল বৃষ্টি।
অঝোর ধারায় অশ্রু বয়ে যেতে লাগল ওর দুগাল
বেয়ে।
এমনিতেই আমি রাগে জন্তু হয়ে গেছি, তার উপর
আবার মেয়েদের ফিচ ফিচ কান্না! নিজের উপর
কন্ট্রোল হারিয়ে ফেললাম আমি।
‘কেন করেছ এসব? কেন? কেন? কেন?
কেন?...’প্রতিবার কেন বলার সময় ওর মাথাটা
প্রচণ্ড জোরে ঝাকাচ্ছিলাম আমি।
উত্তরে শুধু কান্না।
‘কি লাভ হল আমার সাথে এরকম করে?...কি লাভ
হল?? ...বল, বল, আরে বলছ না কেন?...’
ওর কান্নার স্বর খালি বাড়তেই থাকল।
‘ও, আমাকে আর সহ্য হচ্ছে না, না? জ্বালাতন
করে সাধ মিটছে না? ঠিক আছে, তোমার বাড়ি,
তুমিই থাক। যা ইচ্ছা কর। আমি আর থাকছি না এখানে...’
বলেই ওকে ছেড়ে দিয়ে দুড়দাড় করে রুমে
ঢুকে গেলাম আমি।
মামী ছিলেন বাথরুমে। বেরিয়ে এসে এই দৃশ্য
দেখেই হতভম্ভ। ‘আরে কি হয়েছে, কি
হয়েছে তোমাদের...আরে তোর এরকম
কেটে গেল কিভাবে...’
আমি তখন কাপড় চোপড় যা আছে সব তুলে এনে
বিছানায় ফেলেছি। বড় একটা ব্যাগ ছিল বিছানার নিচে,
সেটা না মুছেই বিছানার উপর উঠিয়ে আমি তখন
কাপড় চোপড় ওতে ভরা শুরু করেছি।
একটু পরে মামী দৌড়ে আমার রুমে এলেন। ‘এই,
কি করছ?...আরে, পাগল হয়ে গেলে
নাকি?...কোথায় যাচ্ছ তুমি?...কি হয়েছে বলবে
তো আগে...’
আমি তখন জানোয়ারের মত রাগে ফুঁসছি আর বলছি,
‘আমি আর তোমাদের সাথে থাকব না, আমি চলে
যাব...’
মামী আমাকে ধরে প্রবলভাবে ঝাঁকাতে
লাগলেন। ‘কি আবোলতাবোল বকছ এসব?
কোথায় যাবে তুমি? কি হয়েছে? ও কিছু
বলেছে?...’
‘না, কেউ কিছু বলেনি। আমার ইচ্ছা হয়েছে, আমি
চলে যাচ্ছি’...ঝাঁঝের সাথে উত্তর দিলাম আমি।
ওপাশ থেকে আবার কি সব ভাঙ্গার শব্দ হচ্ছে।
মামী পড়লেন মহা ফাঁপরে। এ কূল সামলান তো ও
কূল যায়, ও কূল সামলান তো এ কূল যায়।
মামীর সাথে মোটামুটি ধস্তাধস্তি করেই শেষ
পর্যন্ত আমি ব্যাগটা গুছিয়ে ফেললাম। চেন লাগালাম।
তারপর রুম থেকে বেরুতে যাব, এমন সময় একটা
চিনামাটির প্লেট উড়ে এসে আমার কপালে লাগল।
ব্যস, উলটে পড়ে গেলাম আমি।
জ্ঞান হারানোর আগে কান্নাভেজা গলায় খালি একটা
কথাই শুনতে পেলাম, ‘চিঠি ক্যান পাবে ও? ক্যান
পাবে?’
১৭
বিশ মিনিট পর জ্ঞান ফিরল। দেখি আমি আমার রুমে
শুয়ে আছি। পাশে শুধু মামী। কানে মোবাইল।
হয়তো মামার সাথে কথা বলছিলেন, আমাকে
চোখ খুলতে দেখেই বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,
এইতো চোখ খুলেছে...জ্ঞান ফিরেছে...’
আমি এদিক ওদিক তাকালাম। কপালে একটা ব্যান্ডেজ
বাঁধা বলে ঠিকমত দেখতে পারছিলাম না।
দেখলাম, ব্যাগটা বিছানার পাশে, খোলা। আর সব
ঠিকঠাক...কঙ্কালটাও ঝুলে ঝুলে সামনে তাকিয়ে
তার স্বাভাবিক হাসি হাসছে।
মামী মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘কি, খুব ব্যথা?’
হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত আদরে আমি যেন অনেক
দিন আগের সেই ছোট বাচ্চাটি হয়ে গেলাম।
বাপমায়ের স্নেহ বঞ্চিত আমি এই সামান্য, অথচ
অসামান্য ভালবাসায় আপ্লুত হয়ে চেনা জগত
থেকে যেন হারিয়ে ফেললাম নিজেকে। হঠাৎ
পৃথিবীকে বড় সুন্দর মনে হল, এই সবকিছুকেই
মনে হল শাশ্বত সুন্দর...আমি প্রবল আবেগে
মামীর হাত নিজের গালে ছুঁইয়ে ভালবাসার স্পর্শ
উপভোগ করতে লাগলাম।
সব মানুষই ভিতরে ভিতরে ভালবাসার কাঙ্গাল। কিন্তু
সেই ভালবাসার কাছে আত্মসমর্পণের অন্যতম
প্রধান শর্ত, সেখানে একটু হলেও বৈধতা থাকতে
হবে। পার্টিতে গিয়ে বন্ধুস্ত্রীর ভালবাসা
আমাকে আর যা দিক, অন্তত স্বস্তি তো দেবে
না!
মামীর আদর উপভোগ করতে করতে আমি
জীবনের না মেলা কিছু হিসাব মেলানোর চেষ্টা
করছিলাম। মেয়েটার এত আক্রোশের কারণ
তাহলে ঐ চিঠিটাই? কিন্তু ওটা তার মনোজগতকে
এভাবে তোলপাড় করে দেবে কেন?
আমি তো তার কেউ না, তাহলে আমাকে পাঠানো
অন্যের চিঠি তাকে এভাবে খেপিয়ে দেবে
কেন? সে কি হিংসায় এ কাজ করেছে? নাকি
প্রতিশোধস্পৃহায়? কেন, আমি তার কি ক্ষতি
করেছি? আমি তাকে কখনও অসম্মান করি নি,
স্বাভাবিক একটা দুরত্ব সবসময় বজায় রেখেছি পাছে
আমাদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু হয়ে যায়...
আমি তার কেউ না, সত্যিই কি আমি তার কেউ না?
এই হিসাবটাই মিলছিল না। কিছু হিসাব কখনই মেলে না।
সেগুলো মিলানোর ক্ষমতাও আমাদের নেই।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now