বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নীলা-০১

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X নীলা - সালেহ তিয়াস অধ্যায় এক বৃষ্টি হচ্ছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছি। বৃষ্টিতে দেখার মত আলাদা কিছু নেই। আকাশের দিকে তাকালে বৃষ্টিস্নাত অস্পষ্ট আকাশ, আর মাটির দিকে তাকালে গাছ পালা মাটি দালান রাস্তা সবকিছুর ক্রমাগত ভিজে যাওয়া আর বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার অথবা বৃষ্টিতে বাঁচার জন্য মানুষের ছোটাছুটি, এই তো। ঘুরেফিরে সেই কয়েকটা দৃশ্যই বারবার দেখতে হয়। তবু ওরই কি গভীর আকর্ষণ, কি অমোঘ টান, মানব মনের উপর কি অনির্বচনীয় প্রভাব! ওটাই মনের মধ্যে কি একটা যেন ওলট পালট করে দেয়। মনকে আশ্চর্য রকম নরম করে দেয়। নিজের সব দুঃখ কষ্ট গ্লানি এই বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে ফেলতে ইচ্ছা করে। বৃষ্টি স্রষ্টার পক্ষ হতে মানুষের জন্য এক আশ্চর্য উপহার। বৃষ্টির দিকে এই নির্নিমেষ চেয়ে থাকার ফাঁকে আমার হুট করে মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস ইলেভেন। ক্যাডেট কলেজে পড়ি। পড়ালেখা নাই। রাজার মত কলেজের চিপা চাপায় ঘুরে বেড়াই। বেড়াতে বেড়াতে একবার ধরা খেলাম। যার তার কাছে না, একেবারে অ্যাডজুট্যান্ট স্যারের কাছে। ইডি খেলাম। ইডি মানে এক্সট্রা ড্রিল। মানে সবাই খেলার সময় খেলবে আর আমি পানিশমেন্ট খাব। অপরাধ, আমার প্যান্টের পিছনের বোতাম নেই। তো যেদিনের কথা আমার মনে পড়ে গেল সেদিন আমি ইডির জন্য প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমেছি। বৃষ্টি হচ্ছে। প্রচণ্ড বৃষ্টি। মন উচাটন করা বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে আমাদের ইডি কার্যকর করা যাচ্ছে না। আমরা শেডের নিচে অবস্থান করছি। হ্যান্ডস ডাউন হয়ে। পানিশমেন্ট। হ্যান্ডস ডাউন হয়ে কিছুক্ষণ কাটাবার পর আমার কি মনে হল, আমি মাঠের দিকে তাকালাম। স্তম্ভিত হলাম। বাকরুদ্ধ হলাম। এ কিভাবে সম্ভব! পৃথিবী এত সুন্দর! এত! হ্যান্ডস ডাউন হয়ে তাকাবার অর্থ হচ্ছে মাথাটা উল্টো করে হাতের নিচ দিয়ে তাকানো। সুতরাং আমার কাছে মনে হল মাঠটাই আকাশ, আর আকাশটাই জমিন। মাঠে সবেগে বৃষ্টিপাত হচ্ছে, বৃষ্টির কণাগুলো মাঠে ধাক্কা খেয়ে বাষ্পের মত কিছু একটার জন্ম দিচ্ছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে অভিকর্ষ বল উল্টে গেছে, জমিন থেকে বৃষ্টি এসে সশব্দে আঘাত করছে আকাশে। বৃষ্টির ক্রমাগত আঘাতে আকাশটায় তৈরি হচ্ছে বাষ্প, সেটা আবার উল্টো অভিকর্ষের কারণে ছড়িয়ে পড়ছে আকাশের গায়েই। দৃশ্যটা আমার কাছে অদ্ভুত রকম স্বর্গীয় লাগল, আমি স্থান কাল পাত্র ভুলে দৃশ্যটির দিকে চেয়ে থাকলাম। অনেকটা সময় কেটে গেল, আমি হুট করে একসময় আবিষ্কার করলাম বৃষ্টির মধ্যেও ইডি করার জন্য অন্য সবাই মাঠে চলে গেছে, আমি একা তখনও হ্যান্ডস ডাউন হয়ে চেয়ে আছি, স্টাফ আমার দিকে আগুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এবং মনে মনে চিন্তা করছেন কিভাবে আমাকে ভয়াবহ টাইট দেয়া যায়। আসলেই আমাকে টাইট দেয়া হয়েছিল কি না সেটাও একটু একটু মনে পড়ছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত আমার স্মৃতিলেহন আর দীর্ঘায়িত হল না। একটা নরম কণ্ঠের ছোট্ট দুইটা প্রশ্ন আমাকে বর্তমানে ফিরে আসতে বাধ্য করল, “একা একা বৃষ্টি দেখছ? তুমি এত নিষ্ঠুর?” এত ছোট্ট দুইটা প্রশ্ন, কিন্তু কি অদ্ভুত মায়া এই দুই প্রশ্নের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে! আমার হৃদয় জুড়িয়ে গেল, সিক্ত হল অপরিসীম ভালোবাসায়। আমি পিছন ফিরতে বাধ্য হলাম। আকাশের মত গভীর এক জোড়া চোখের সাথে চোখাচোখি হল আমার। বললাম, “কেমন আছ?” সে বলল, “ভালো আছি। তুমি কেমন আছ?” “ভালো আছি। বিশ্বাস কর, তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল”। “থাক আর বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা কথা বলতে হবে না”। “সত্যি। আজ সারাদিন তোমাকে মিস করেছি। বিশ্বাস কর”। “করলাম”। “সুইট গার্ল। এসো, আমার পাশে বস। বৃষ্টি দেখি”। সে লক্ষ্মী মেয়ের মত আমার পাশে এসে বসল। আমি ওর হাত আলতো করে ছুয়ে দিতে গেলাম। ও হাত ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “তুমি এত খারাপ কেন বল তো?” আমি হা হা করে হেসে বললাম, “হাত ধরতে চাওয়া কি অপরাধ?” সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “হুম। হাত ধরবা ক্যান তুমি? আমার মনের সবটুকু যে তোমার কাছে বন্ধক রেখেছি এটুকু কি যথেষ্ট নয়?” আমি হাত ফিরিয়ে নিলাম। তার আবার এইসব ব্যাপারে আপত্তি আছে। থাকুক আপত্তি। আমার কোন সমস্যা নেই। আমার দরকার ভালোবাসা। শুধুই ভালোবাসা। আমি তা পাই। তার কাছ থেকে। তার নাম নীলা। বয়স, হবে সাতাশ আটাশ। আমাদের সম্পর্কটা শুধুই ভালোবাসার। নীলা আমাকে অন্ধের মত ভালোবাসে। আমিও ওকে অন্ধের মত ভালোবাসি। শুধু সমস্যা হচ্ছে নীলা বেশিক্ষণ থাকে না। দিনে বেশি হলে আধ ঘণ্টা, খুব বেশি ভাগ্যবান হলে এক ঘণ্টা। ব্যস। বাকি দিনটুকু আমার কাটে চরম হতাশায়। হতাশা কাটানোর জন্য আমি লিখতে বসি। সত্যি বলতে কি, লেখালেখি আমার নেশা। এবং পেশা। আমার নাম সাইফ হাসান। বয়স চল্লিশের ঘরে। বাংলাদেশের শতকরা কমপক্ষে চল্লিশ ভাগ লোক আমার নাম জানে। কারণ আমি বাংলাদেশের এক নাম্বার লেখক। আমার প্রতিটা বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশের দুই দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। আমার গল্পের চরিত্রগুলোকে অনুসরণ করা তরুণ প্রজন্ম ফ্যাশন বলে মনে করে। আমার উপন্যাস পড়ে বাচ্চারা আনন্দ পায়, তরুণরা প্রেরণা পায়, যুবকেরা রোমান্টিক হতে শেখে, বৃদ্ধেরা ফেলে দীর্ঘশ্বাস। আমাকে নিয়ে পত্রিকায় ফিচার হয়, টিভিতে অনুষ্ঠান হয়, ফেসবুকে স্ট্যাটাসের ঝড় বয়ে যায় আমাকে নিয়ে কোন কাহিনী কোনভাবে ফাঁস হলে। বাইরে আমি বেশি একটা বের হই না। সত্যি বলতে কি, বের হতে পারি না। আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে এক দুর্ঘটনায় আমার এক পায়ের কর্মক্ষমতা কমে যায়। আমি হাঁটতে পারি না। সেই থেকে হুইল চেয়ার আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই বাইরে বের হওয়া বেশ কঠিন। আর কোনমতে বের হলেও লোকজন আমাকে ঠিকই চিনতে পেরে ছেঁকে ধরে। সুতরাং সত্যিকার অর্থে, আমার বাইরে যাওয়া বন্ধ। সারাটা দিন আমি প্রায় একাই থাকি বলতে গেলে। শুধুমাত্র গোসল ও খাবার সময় একজন পরিচারক আসে, ওর নাম কালাম। ছেলেটার সবই ঠিক, শুধু কথা বলতে পারে না। ওকে দিয়ে আমার ভালোই চলে যায়। ঘরের বাইরে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হলেও ঐ আমার একমাত্র ভরসা। আমাদের বাসাটা বিশাল। এই বিশাল বাসায় দুইতলার এক কোণের রুমটা আমার। বাসায় কালাম ছাড়া আরও কয়েকজন থাকে, অধিকাংশই ভৃত্যস্থানীয়। আর থাকে একজন। একজন নারী। পেশায় ডাক্তার। আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে আমি তাকে বিয়ে করেছিলাম। বিয়েটা শুধু কাগজে কলমে টিকে আছে। আমাদের মধ্যে শারীরিক মানসিক কোন সম্পর্ক নেই। শুধু আমরা একসাথে থাকি, এইটুকুই। একসাথে বললেও বেশি বলা হবে, আসল সত্যটা হচ্ছে আমরা এক বাসায় থাকি। আমাদের খাবার একই কিচেন থেকে রান্না হয়। দিন শেষে আমাদের দুজনের ঠিকানা একই। এটুকুই সম্পর্ক। আমার বৈধ স্ত্রীর সাথে আমার প্রতিদিন দেখা হয় না। মাঝেমধ্যে হয়। ও এখনও কেন আমার সাথে আছে আমি তা বুঝে উঠতে পারি না। দুটো মানুষের মধ্যে ভালোবাসা নেই, প্রেম নেই, প্রীতি নেই, টান নেই, আকর্ষণ নেই, এভাবে কতদিন বেঁচে থাকা যায়? তাছাড়া ও চলে গেলে আমার আরও একটা লাভ হত, আমার নীলার সাথে বেশি বেশি দেখা হত। আমার স্ত্রী জানে না নীলার কথা। আমি তাকে জানাই নি। শুধু কালাম জানে। আমি তাকে বলেছি। সে-ই নীলাকে আমার ঘরে আসার ব্যবস্থা করে দেয়। সে কাউকে কিছু বলেও না। ভালোবাসার জন্য আমার কাঙ্গাল হৃদয়ের হাহাকার সে বোঝে। নীলাকে নিয়মিত পাওয়ার জন্য কালামের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আমার স্ত্রী প্রতিদিন সকাল দশটার দিকে অফিসে যায়। দুপুর দুইটার দিকে ফিরে আসে। বাচ্চাদের একটা হাসপাতালে চাকরি করে সে। আমার উপার্জিত টাকা সে নেয় না। আমার টাকা ছুঁতেও নাকি তার ঘৃণা হয়। এই যে আমার স্ত্রীর প্রায় চার ঘণ্টা বাসায় না থাকা, এটাই হল নীলার আসার উৎকৃষ্ট সময়। নীলা সুযোগ বুঝে আসে। যাতে কেউ না জানে। এসে আমাকে ভালোবাসে। আমার ভালোবাসা উপভোগ করে। তারপর চলে যায়। আমি তৃষ্ণার্তের মত তার পথ চেয়ে বসে থাকি। তার বিরহে আমার বাকি দিন কাটে। আমার মনে অনুভূতিরা খেলা করে। আমি লিখতে বসি। লিখে লিখে ভরিয়ে ফেলি পাতার পর পাতা। প্রকাশক আর সম্পাদকেরা নিয়মিত ফোন করে আমাকে। আমি তাদের আশ্বস্ত করি। হাজার অনুরোধের পরেও যেনতেন ভাবে কোনকিছু লিখে প্রকাশকের হাতে তুলে দিই না। আমার প্রতিটা লেখায় বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়, বারবার শব্দ বাক্য কাহিনী ইত্যাদি পরিবর্তন করা হয়। যতক্ষণ না আমার মনের শান্তি আসছে আমি একই লেখার উপর অস্ত্রোপচার করতেই থাকি। একসময় মনে সন্তুষ্টি আসে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। স্বস্তির নিঃশ্বাস মিশে যায় পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডলে। প্রকাশকের হাসি চওড়া হয়। সবকয়টা দাঁত গোণা যায়। আমি মাঝে মাঝে গুনি। এই রে, নীলার গল্প করতে করতে নীলা যে পাশে দাঁড়িয়ে আছে এই জিনিসটাই তো আমি ভুলতে বসেছিলাম! জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি শেষে আকাশটা ঝকঝকে, বাইরে ভেজা রাস্তার উপর হাঁটাচলা শুরু করেছে ব্যস্ত অথবা ব্যস্ততাহীন মানবজাতি। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি দুটো বাজে প্রায়, তার মানে নীলা এখনই চলে যাবে। মাত্র আধঘণ্টা সময় আজ আমরা একত্রে কাটালাম। আমি নীলার মুখের দিকে তাকালাম। নীলার মুখে রাজ্যের অভিমান। বললাম, “যেও না”। নীলা গভীর দুঃখের সাথে বলল, “আমায় যে যেতে হবেই”। “কাল আসবে তো?” “হ্যাঁ আসব”। “কাল তোমায় জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি দেখব। তোমার জন্য বানিয়ে আনব সুস্বাদু কফি। তোমার গায়ে জড়িয়ে দেব শাল। তুমি চেয়ে থাকবে বৃষ্টির দিকে। আমি চেয়ে থাকব তোমার দিকে”। “ছাড়ো তো। ওগুলো ফালতু কথা। তুমি আসলে আমাকে একটুও ভালোবাসো না। আমি এমনিই আসি। আর আসব না”। “প্লিজ”। “তাহলে বল আমায় ভালোবাসো?” “বাসি। বাসি। বাসি”। “কি! আমি বাসি?” “না। তোমাকে ভালোবাসি”। আমি নীলার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। নীলা আমার আঙ্গুল স্পর্শ করল। আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি লাফ দিয়ে নীলাকে জড়িয়ে ধরতে গেলাম। নীলা হাসল। আমি অসহায়ের মত হুইল চেয়ারে পড়ে রইলাম। নীলা বলল, “আসি”। আমি ফিসফিস করে বললাম, “নীলা, যেও না। দোহাই লাগে”। নীলা হাসল। ওর হাসিতে ঝর্ণা ছিল, বৃষ্টি ছিল, রোদ ছিল, বন্যা ছিল। আমার হৃদয় তীব্র ভালোবাসায় এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। চিৎকার করে ডাকলাম, “নীলা!” আমার বাড়িয়ে দেয়া হাত প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমাকেই একটা চড় বসিয়ে দিল যেন। অধ্যায় দুই প্রায় আঠার-উনিশ বছর আগের কথা। ফাইনাল প্রফের এক মাস বাকি। সাইফ কলেজ চত্বরে কাচুমাচু হয়ে বসে আছে। নুসরাত সাইফের দিকে গম্ভীর হয়ে চেয়ে আছে। তার চোখে রাগ। অনেক রাগ। কেউ হঠাৎ করে দেখলে অগ্ন্যুৎপাত-উন্মুখ ফুজিয়ামা বা ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারে। নুসরাত বলল, “তুমি কি সিরিয়াস?” সাইফ বলল, “হুম”। “তুমি সত্যিই ডাক্তার হতে চাও না?” “না”। “আমার বাবা-মা কিন্তু ডাক্তার ছেলে ছাড়া বিয়ে দেবেন না”। “জানি”। “জেনেও বলছ তুমি ডাক্তার হবে না?” “না”। “তুমি কি আসলেই আমাকে ভালোবাসো?” “বাসি”। “মিথ্যুক। প্রতারক”। “আই অ্যাম সো সরি”। নুসরাত সবার সামনেই কেঁদে দিল। লোকজন অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। সাইফ বলল, “আই অ্যাম সো সরি। রিয়েলি”। নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি বড় না তোমার লেখালেখি বড়?” সাইফ বলল, “কেউ বড় না। তুমি আন্তরিকভাবে চাইলে আমি লেখক হলেও আমাকে বিয়ে করে সুখে শান্তিতে লাইফ লিড করতে পারবে”। “আমি ফ্যামিলির বিরুদ্ধে যাব? শেষ পর্যন্ত তুমি আমাকে এই কাজে বাধ্য করবে?” “আমি কাউকে বাধ্য করছি না। আমি শুধু বলছি, আমি লেখক হতে চেয়ে এমন কোন অপরাধ করি নি যার জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে”। “আগে বল নাই কেন? আগে বললে আমি তোমার সাথে প্রেম করতাম না”। “তোমাকে হারাবার রিস্ক আমি নিতে চাই নি”। “তুমি একটা ইতর। মিথ্যুক। প্রতারক”। “আমি একজন লেখক। লেখক। লেখক। এমন একজন লেখক যে তোমাকে ভালোবাসে”। নুসরাত কাঁদতে কাঁদতে রিকশায় উঠল। সাইফ বলল, “আমি বাসায় দিয়ে আসি?” “গেট লস্ট”। “আসি? তুমি একা একা পারবে না”। “আই সেড, গেট লস্ট। মামা, টান দেন তো”। নুসরাত বাসায় চলে গেল। সাইফ সে রাতে তিন প্যাকেট সিগারেট শেষ করল। পরদিন থেকে নুসরাত বোরখা পরে আসতে শুরু করল, ক্লাসে ছড়িয়ে গেল তার নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সাইফের মাথা খারাপের মত হয়ে গেল, পাঁচ দিন সে উদ্ভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াল, দুই দিন কি যেন চিন্তা করল, এবং এর দুই দিন পর নুসরাতকে কলেজ চত্বরে পাকরাও করে সাইফ মুখ আমসি করে বলল, লেখক হবার ভুত তার মাথা থেকে নেমে গেছে। সে ডাক্তারই হবে। কথাটা শোনার সাথে সাথে নুসরাত কথা নেই বার্তা নেই সবার সামনেই সাইফকে জড়িয়ে ধরল এবং তিন সেকেন্ড পরেই ছেড়ে দিল। তারপর প্রায় সবই আগের মত হয়ে গেল, ওরা ফাইনাল প্রফ দিল, পাশ করল, ইন্টার্ন করল এবং মোক্ষম সময়ে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। সবই ঠিক ছিল, দুজনেই ডাক্তারি করে সংসার গুছিয়ে নেবার মত আয় উপার্জন করছিল, পরিবারের নতুন সদস্যের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল দুই ফ্যামিলির সবাই। ঠিক এমন সময়েই ঘটল ঘটনা। অথবা দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনাটা ঘটল বিয়ের চার বছর পর। রোড এক্সিডেন্টে ডান পায়ের হাড় ভেঙ্গে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেল সাইফের। কেটে গেল গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ। ডান পায়ের অনেকগুলো পেশী নড়াচড়ার ক্ষমতা হারাল। সেই ক্ষমতা আর কখনো ফিরে এল না। সাইফের ডান পা আর কখনো ভালো হল না। হাঁটাচলা না করতে পারার ফলে হাসপাতালে গিয়ে ডিউটি দেয়াও সম্ভব হল না সাইফের। ফলে চাকরি হারাতে হল তাকে। বসে বসে প্র্যাকটিস করলেও হত, কিন্তু শহরে ডিগ্রিঅলা বড় বড় ডাক্তারদের উপস্থিতির কারণে তার পসার জমল না একদমই। গ্রামে গেলেও হত, কিন্তু নুসরাতের চাকরি তো শহরে। নুসরাতকে ডিগ্রি করতে হলে শহরেই থাকা লাগবে। আর পঙ্গু সাইফকে দেখাশোনার জন্য দুজনকে একসাথেই থাকা লাগবে। আবার যেহেতু সাইফের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত তাই নুসরাতকে ডিগ্রিটা করতেই হবে। এর ফাঁকে একটা ব্যাপার ঘটল, সাইফের একটা উপন্যাস কোন এক অখ্যাত প্রকাশনী ছেপে ফেলল এবং বইমেলায় বিক্রি করতে শুরু করল। কিভাবে কি হল সে জানে না, সে শুধু জানে তার বইয়ের প্রথম সংস্করণ বইমেলা শেষ হবার পাঁচ দিন আগেই শেষ হয়ে গেছে। ঘটনাটা সাইফকে আলোড়িত করল, সাইফ নুসরাতকে সেই পাঁচ বছর আগের কথাটিই আবার বলল, সে লেখক হতে চায়, যেহেতু এখন ডাক্তার হওয়া তার পক্ষে প্রায় সম্ভবই না। নুসরাত অনেক ভেবেচিন্তে ব্যাপারটা মেনে নিল, তার ফ্যামিলি থেকে পরোক্ষভাবে চাপ আসতে লাগল যাতে সে সাইফকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়, কিন্তু এমন কথা মাথায়ও আনল না নুসরাত। সে চুপচাপ লক্ষ্মী মেয়ের মত নিজের ভাগ্যকে মেনে নিল এবং মন দিয়ে ডাক্তারি করতে লাগল। সাইফ পূর্ণোদ্যমে লিখতে শুরু করল, যেহেতু এখন তাকে বাঁধা দেবার কেউ নেই, ডাক্তার হবার চাপটাও নেই। ক্রমান্বয়ে সে খ্যাতি পেতে শুরু করল, তার নাম ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে শুরু করল। একদিকে নুসরাত ডাক্তার অন্যদিকে সাইফ খ্যাতিমান লেখক, সংসারটা সুখেরই হবার কথা ছিল। কিন্তু হল না। যার জন্য হল না সে হচ্ছে নীলা।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮২ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now