বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মুমিনুল
লেখক: মোঃ ইয়াসির ইরফান।
=====================
মুমিনুলের মনটা ভীষন খারাপ । সে ব্যালকনিতে
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাঠের খেলা দেখছে । ঐ তো
তার বন্ধু একরাম কে দেখা যাচ্ছে । ব্যাট নিয়ে
হাঁটছে । শফি বলটা উপরে মারছে আর লুফে
নিচ্ছে । কামরুল স্ট্যাম্প ঠিক করছে ।
সবাই কি সুন্দর মাঠে খেলছে । আর মুমিনুল ঘরে
বসে বসে তাদের খেলা দেখছে । তার ঘরে
বসে থাকতে একদম ভাল লাগে না । ব্যালকনিতে
দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলা দেখা তার অপছন্দের
কাজগুলার একটি । কিন্তু উপায় নাই । আব্বার কড়া হুকুম
। মাঠে যাওয়া যাবে না । আম্মা বলে দিয়েছেন
বিকালে ঘুমাতে । তবেই সন্ধ্যেবেলা সে
তরতাজা হয়ে পড়তে পারবে ।
মুমিনুলের এসব চরম বিরক্ত লাগে । আম্মা-আব্বা
কেন বোঝে না, তার ঘুমাতে ভাল লাগে না । তার
খেলতে ইচ্ছা করে । মাঠে যেতে ইচ্ছা করে
। একরাম-শফিদের সাথে আউট, চার নিয়ে ঝগড়া
করতে ইচ্ছা করে । আব্বা বলেছেন, “যারা
খেলাধূলা করে তারা ডাব্বা মারে” । অথচ জামিলকে
সে সারা বছর দেখে ব্যাট-বল নিয়ে ঘুরছে ।
কই, সে তো ডাব্বা মারে না ? বরং গত বছর ক্লাস
টুয়ের বার্ষিক পরীক্ষায় বাংলাতে সে মুমিনুলের
চেয়ে দু’নম্বর বেশী পেয়েছিল । মুমিনুলের
কান্না পায় । সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাথরুমে ঢুকে
কান্না করে । কেউ দেখে না । কাজের
মেয়েটা দেখলে বেশ লজ্জার ব্যাপার হবে ।
তাই কান্না করার সময় সতর্ক থাকে, যেন কাজের
মেয়েটা না দেখে ।
মুমিনুলের মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছা করে মাঠে চলে
যেতে । কিন্তু যেই তার ‘আমার পণ’ কবিতাটি মনে
পরে, সে আর যেতে পারে না । সে
পড়েছে,
“আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে
আমি যেন সেই কাজ করি ভাল মনে” ।
আব্বা-আম্মা তো তার গুরুজন । সে কি করে
গুরুজনের কথা অমান্য করে ?
আচ্ছা, আম্মারা এতো অবুঝ কেন ? তাঁরা কি
বোঝে না মুমিনুলের একটু মাঠে যেতে ইচ্ছা
করে । সবার সাথে খেলতে ইচ্ছা করে । মাঠে
রেডি খেলা, ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন… সব
তার খেলতে ইচ্ছা করে । সে তো আর সারাদিন
মাঠে যেতে চায় না । কেবল বিকাল বেলা মাঠে
যেতে চায় । খেলাধূলা করতে চায় ।
সে আম্মা-আব্বার সব কথা শোনে । ভোরে
উঠে যায় । তারপর অযু করে আরবী পড়তে
বসে । জুমার নামাযে যায় । সকালে একঘন্টা রুটিন
মেনে কপি লেখে । সন্ধ্যার পর রাত দশটা
পর্যন্ত পড়ালেখা করে । প্রতিদিন একঘন্টা অংক
প্রাকটিস করে । স্কুলে টিচারের কথা মন দিয়ে
শোনে । বড় কাউকে দেখলেই সালাম দেয় ।
আম্মা-আব্বা যা যা করতে বলে, সব করে । তবু
তাঁরা তার একটি মাত্র কথা… খেলতে যেতে চাওয়া…
সেটাও কেন শোনে না ? মুমিনুলের আম্মা-
আব্বার উপর খুব রাগ লাগে ।
মুমিনুল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল । হঠাৎ নিজের নাম
শুনতে পেয়ে সে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে
তার ছোট চাচা এসেছে । সাথে সাথে তার মন ভাল
হয়ে গেল । সে ছোট চাচাকে জড়িয়ে ধরল ।
ছোট চাচা যে-ই জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে
মমিনা ভাল আছিস” ?
কথাটা শুনতেই মুমিনুলের খুব কান্না চলে আসল ।
সে সত্যি সত্যি কেঁদে দিল । ছোট চাচা পুরা
হতভম্ব হয়ে গেলেন । “ঐ মমিনা, কাঁদছিস
কেন ? কি হইছে তোর” ?
মুমিনুল ছোট চাচাকে তার দুঃখের সব কথা খুলে
বলল । ছোট চাচা বললেন, “এই ব্যাপার । এটা
তো কোন সমস্যাই নারে পাগলা । আয় আমার
সাথে আয় । আমিই তোকে মাঠে নিয়ে যাব” ।
ছোট চাচা মুমিনুলকে মাঠে নিয়ে গেলেন ।
মাঠের চারপাশে বাউন্ডারি ওয়াল দেয়া । গেট তালা
মারা । ওয়াল টপকে মাঠে যেতে হয় । মুমিনুল
কখনো দেয়াল টপকায় নাই । ছোট চাচা তাকে
দেয়াল টপকে মাঠে নিয়ে গেলেন । মুমিনুলের
কি যে আনন্দ হল ! তার ইচ্ছা করছিল ছোট
চাচাকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদে । তার আব্বাটা
চাচার মত নয় কেন ?
মুমিনুলের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে
। ছোট চাচা চলে যাচ্ছেন । মাত্র দুইদিনের জন্য
এসেছিলেন । এখন তাকে কে মাঠে নিয়ে
যাবে ? ছোট চাচা তাকে বললেন, “কাঁদিস নারে
পাগলা । আমি আবার আসব” ।
মুমিনুল বলল, আম্মা সত্যি যেতে দেবে ? তুমি
ঠিক করে বলে দিছ ?
-কোথায় মমিনা ?
-কোথায় আর ? মাঠে আর কি !
-ও… হ্যাঁ হ্যাঁ । আলবত যেতে দেবে । চাচার
জন্য দোয়া করিস কেমন । চলি রে মমিনা ।
-আহ… চাচা ! মমিনা মমিনা করো নাতো । হাদীসে
নাম উল্টা-পাল্টা বলতে নিষেধ করছে ।
ছোট চাচা জিভ কেটে, হেসে বলেন, “ওহ
হো… সরি সরি । ভুল হয়ে গেছে । মুমিনুল যাই,
কেমন ? এবার ঠিক আছে” ?
মুমিনুলের ভীষন কান্না পাচ্ছে । চিৎকার করে
কাঁদতে ইচ্ছা করছে । তার খুব বলতে ইচ্ছা
করছে, “ছোট চাচা যেও না” ।
সে বলতে পারল না । ছোট চাচা চলে গেলেন
।
ছোট চাচা এত ভাল কেন ? মুমিনুলের ছোট চাচার
জন্য খুব খুব খারাপ লাগছে ।
মুমিনুলের পেটের মধ্যে গুড়গুড় করছে । মাঠে
ছেলেরা আসতে শুরু করেছে । ছোট চাচা
আম্মা-আব্বাকে কি বলে গেছে সে জানে না ।
আব্বা অফিসে । আম্মা ঘুমাচ্ছেন । আম্মার কাছ
থেকে মাঠে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইতে তার ভয়
ভয় করছে । আম্মা যদি বলে বসেন, “কোত্থাও
যেতে হবে না । সোজা ঘুমাতে যাও” । তার
পেটে কেমন জানি লাগছে । একটু বাথরুমে যাওয়া
দরকার ।
মুমিনুল পা টিপে টিপে আরেকবার আম্মাকে
দেখে আসল । আম্মা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ।
কাজের মেয়েটা রান্নাঘরে ধোয়া-ধুয়ি করছে ।
হুম… এবার যাওয়া যায় । মুমিনুল আস্তে আস্তে
দরজাটা খুলল । তার বুকে ঢিপঢিপ করছে । বুকের
মধ্যে কে যেন ভীষনভাবে ছোটাছুটি করছে
। সে স্যান্ডেলটা পায়ে দিল । তারপর সিঁড়ি বেয়ে
অতি দ্রুততার সাথে নেমে গেল । একটুও আওয়াজ
করল না । যদি হঠাৎ আম্মার ঘুম ভেঙ্গে যায় !
মুমিনুলের সব অন্যরকম লাগছে । সে মাঠে
যাচ্ছে । তা-ও আবার একা একা । ভয়… খুশী…
মুক্তি… এক অদ্ভুত অনুভূতি । কিন্তু মাঠে এসেই
তার মনে হল এত কিছু সব বৃথা । সে দেয়াল
টপকে কিভাবে মাঠে ঢুকবে ! আজ তো
ছোট চাচা নাই । কি করবে সে ?
সে কয়েকটা ছেলেকে দেখল টপ করে
দেয়াল টপকে ঐ পাশে চলে যাচ্ছে । সে
কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইল । ছেলেগুলার দেয়াল
টপকানো দেখল । তারপর অনেক সাহস সঞ্চয়
করে সে নিজেই দেয়াল টপকানোর চেষ্টা
করল । পারল না । একবার… দুবার… তিনবার… এভাবে
বারকয়েক চেষ্টাতেও পারল না । সে মাঠে
ঢুকতে পারছে না । দেয়ালে উঠতেই পারছে না
। তার বুকের ঢিপঢিপানি আরো বেড়ে গেছে ।
ঘামে ভিজে চুপচুপ হয়ে গেছে, সে । হাতের
কয়েক জায়গায় ছিলে গেছে । সেখানে জ্বালা
করছে । ফিরে যাবে নাকি ভাবছে, সে ।
আবার ভাবল, আরেকবার চেষ্টা করবে কি না !
একটু দম নিল । আবার চেষ্টা করতে শুরু করল । বার
কয়েক চেষ্টার পর সে দেয়ালে উঠে যেতে
পারল । এবার নামার পালা ।
তাকে দেখেই শফি বলল, “এই দেখ মুমিন
আসছে” ।
জামিল ছুটে এল । একরাম বলল, “মুমিন দাঁড়া ! এই
যে এই খানে একটা পা দেয়… হুম… এবার
আমাদের ধর… হ্যাঁ… আস্তে করে লাফ দেয়
এবার । মুমিনুল লাফ দিল ।
মুমিনুলের কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে । সে তাদের
বাসার ব্যালকনির দিকে তাকাল । আব্বার লুঙ্গিটা বাতাসে
উড়ছে, সেখানে । আহ, কি শান্তি ! মুমিনুলের
ভাবখানা এমন হল যে, যেন সে দিগ্বিজয়ী বীর
।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now