বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নিয়তি-০২

"ফ্যান্টাসি" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ২। পরদিন সকালে বেশ ভোরে ঘুম থেকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। গতকাল বিকেলের বৃদ্ধের কথা কেন জানি কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারছেন না তিনি। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে হাটতে বেরিয়ে পড়লেন। সেই পাহাড়ের ধারে আরেকবার যাবেন আজ। ভোরের ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সূর্যোদয় হল মাত্র। স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। হাটতে হাটতে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলেন খন্দকার সাহেব। কাত হয়ে পড়ে থাকা একটা ঝাউগাছের গুড়ির উপর বসলেন। অদ্ভুত সেই বৃদ্ধের কথা ভাবছেন। ‘ধুত্তরী!’ পিছন থেকে অচেনা এক গলার স্বরে ঘোর কাটল খন্দকার সাহেবের। ঘুরে তাকালেন তিনি। বছর চল্লিশেক বয়সের এক লোক দাঁড়িয়ে আছে কিছুদূরে। পরনে বেশ দামি পোশাক, তবে অগোছালো। গলায় পেচানো মাফলার। চোখে রিমলেস চশমা। সুদর্শন, একহারা গড়ন। এলোমেলো চুল, আর কুঁচকানো কাপড়চোপড়। দেখে মনে হচ্ছে রাতে ভাল ঘুম হয় নি। মানুষ দেখে তার সম্পর্কে ধারনা করার একটা অভ্যাস আছে খন্দকার সাহেবের। এখানেও তার ব্যাতিক্রম হল না। লোকটা সামর্থবান। পোশাকআশাক দেখে বোঝা যায়। তবে চেহারা বলছে মানসিক অশান্তিতে আছে। কি হতে পারে? ব্যাবসা বা পরিবার সংক্রান্ত কিছু হতে পারে। এখানে কিজন্যে? হয়ত পালিয়েই এসেছে ঝামেলা থেকে বাঁচতে, কে জানে! উঠে দাড়ালেন খন্দকার সাহেব। ‘কিছু বললেন?’ ‘না না, কিছু না। এমনিই। এত সকালে কাউকে দেখবো বলে আশা করিনি, তাই...’ কথা শেষ করল না লোকটা। ‘আমিও সাধারনত এত সকালে আসি না। আজ কি মনে করে হাটতে হাটতে চলে এলাম। তা আপনিও যখন চলে এসেছেন, ইচ্ছে করলে বসতে পারেন। অবশ্য যদি আপনার কোন আপত্তি না থাকে।’ মৃদু হেসে আমন্ত্রন জানালেন খন্দকার সাহেব। লোকটা দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, যেন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। তারপর একসময় এগিয়ে আসল। খন্দকার সাহেব আবার বসলেন ঝাউএর গুড়িটার উপর। লোকটা তার পাশে বসলো। আলাপ শুরু করলেন খন্দকার সাহেব। ‘আমার নাম খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। আপনি?’ ‘আমার নাম সাজেদুল করিম।‘ ‘কোথায় থাকেন আপনি?’ ‘আমার বাড়ি ঢাকায়, তবে এখন আমি আমেরিকায় থাকি। দেশে ফিরেছি গত পরশু।’ দেশে ফিরেই এখানে চলে এসেছে? আত্মীয়স্বজন নেই কেউ? মনে মনে ভাবলেন খন্দকার সাহেব। তার বদলে বললেন, ‘ভালোই হল। কথা বলার একজন সঙ্গী পাওয়া গেল আজ। এমনিতে তো কাউকে আসতে দেখি না। অবশ্য গতকাল বিকেলে বুড়ো এক লোকের সাথে দেখা হয়েছিল। অদ্ভুত লোক!’ শেষ কথাটা নিজের মনেই বললেন তিনি। ‘আমিও, গতকাল সকালে এক লোককে দেখেছিলাম। সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পরা।’ বললেন সাজেদুল করিম। ‘হ্যা হ্যা, সেই তো। আপনিও দেখেছেন তাহলে তাকে? অদ্ভুত লোক, তাই না?’ ‘হুম।’ চুপ করে গেলেন সাজেদুল করিম। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ। চারদিকে শুধু সাগরের ঢেউএর অবিশ্রান্ত গর্জন ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। ‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে দেখে কেন জানি মনে হচ্ছে বেশ দুশ্চিন্তার ভেতর আছেন। কি ব্যাপার, খুলে বলবেন?’ খানিক দ্বিধার পর প্রশ্ন করলেন খন্দকার সাহেব। ‘তাই নাকি? এ কথা কেন মনে হল আপনার?’ ‘আপনার চেহারায় স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে। কোন সমস্যায় আছেন?’ ‘কেন জানতে চাচ্ছেন?’ কন্ঠস্বরে যেন কিছুটা বিরক্তি। ‘আপনার ব্যাক্তিগত কোন ব্যাপার যদি হয়, বা আপনি যদি বলতে না চান তাহলে ঠিক আছে। তবে জানেন তো, এসব ব্যাপার কারও সাথে ভাগাভাগি করে নিলে কষ্ট কিছুটা কম হয়। সে চিন্তা করেই বললাম আর কি।’ বললেন খন্দকার সাহেব। ‘আমার যে কষ্ট, তা কিছুতেই কমবে না।’ ‘চেষ্টা করেই দেখুন না একবার?’ খন্দকার সাহেব নাছোড়বান্দা। ‘আপনি যখন জোর করছেন, তা হলে শুনুন। তবে একটা ব্যাপার বলে দিচ্ছি, শোনার পর আমার ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে পারবেন না।’ ‘ঠিক আছে।’ ‘গোড়া থেকেই শুনুন তবে। বাবা মার একমাত্র সন্তান আমি। আমার বাবা ছিলেন বিশাল ধনী লোক। গুলশান এলাকায় আলিশান বাড়ি ছিল আমার। আর বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান হলে যা হয়, অল্প বয়সেই বখে গিয়েছিলাম আমি। আমার এমন কোন সাধ-আহ্লাদ ছিল না যা আমার বাবা পূরণ করেন নি। বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা আর হই-হুল্লোড়ে দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিল।’ ‘তারপর?’ ‘আমার যখন বাইশ বছর বয়স, তখন একদিন আমার বাবা হার্ট এটাক করে মারা গেলেন। তার কয়েক মাস পরে মারা গেলেন আমার মা। হঠাত করেই এভাবে বাবা মা কে হারিয়ে আমি তখন চোখে অন্ধকার দেখছি। তার উপর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি একদিন জানতে পারলাম, ব্যাংকে বিশাল অঙ্কের দেনা রেখে গেছেন তিনি। সেসব দেনা মেটাতে গিয়ে, আর সুযোগসন্ধানী লোকজনের পাল্লায় পড়ে বাবার বিশাল সম্পত্তি নিঃশেষ হতে খুব বেশি দেরি হল না। আমার সুপরামর্শদাতা বা শুভাকাংখী বলতে তখন কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত সহায় সম্পত্তি সামান্য যা কিছু বাকি ছিল তা বিক্রি করে দিয়ে পাড়ি জমালাম আমেরিকায়। দেশ তখন আমার কাছে এক দুঃস্বপ্ন।’ একটু থামলেন তিনি। ‘আমার এক দুরসম্পর্কের চাচা থাকতেন আমেরিকায়। সেখানে গিয়ে তার ফার্মে ছোট্ট একটা চাকরী নিলাম। বছর দশেক পর চাচা মারা গেলেন। বিপত্নীক এবং নিঃসন্তান হওয়ায় তার সবকিছুর একমাত্র উত্তরাধিকারী হলাম আমি। দিন ভালোই কাটছিল আমার। তবে এবার আমার শিক্ষা হয়ে গিয়েছিল। আর অপব্যায়ী হলাম না। ব্যাবসা দারুণ চলছিল। কিন্তু আমার কপালে বোধহয় এত সুখ নেই। একদিন আমার ঘুম ভাংলো প্রচন্ড মাথাব্যাথা নিয়ে।’ ‘তারপর?’ ‘মাথাব্যথার পরিমান দিন দিন বাড়তেই থাকল। শেষে উপায় না দেখে একদিন ডাক্তারের কাছে গেলাম। সব শুনে কিছু টেস্ট লিখে দিল ডাক্তার। সেগুলোর রেজাল্ট দেখে ডাক্তার কি বলল জানেন?’ ‘কি?’ ‘ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে আমার। কোন চিকিৎসা নেই। যদি সবকিছু ঠিক থাকে তবে আর ছয়মাস বাঁচব আমি।’ দুঃখ হল লোকটার জন্যে খন্দকার সাহেবের। কিন্তু কিই বা করতে পারেন তিনি? বললেন, ‘সত্যিই খুব খারাপ লাগছে আপনার জন্যে। কিন্তু তারপর কি হল?’ ‘সাত বছর আগে বিয়ে করেছিলাম আমি। সুসান আমেরিকান মেয়ে। বড় ভালবাসতাম ওকে আমি। দুটো ছেলেমেয়ে হয়েছিল আমাদের। ইকবাল আর জেনিফার। আমার চোখের মনি ওরা।’ মৃদু হাসি সাজেদুল করিমের মুখে, যেন বাচ্চাদুটোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন তিনি। কিছুক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খেই ধরলেন সাজেদুল করিম। ‘এতবড় একটা দুঃসংবাদ পাওয়ার পরেও, জানেন, একটুও ভেঙ্গে পড়িনি আমি। ভেবেছিলাম, কাউকে জানাব না। কি লাভ, বলুন? জীবনের শেষ ছয় মাস মানুষের সমবেদনা আর ফিসফিসানি নিয়ে আমি বাঁচতে চাইনি। তবে সুসানের কাছে লুকোলাম না। একদিন ওকে ডেকে সব খুলে বললাম আমি। ‘খুব কেঁদেছিল সুসান। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন? ঠিক সাতদিন পর এক সকালে আমাকে সে জানাল, আমার সাথে সে আর থাকতে রাজি নয়। ছেলেমেয়েদের নিয়ে সে বাবা মার কাছে চলে যাচ্ছে, আমি যেন ওর পাঠানো ডিভোর্স পেপারে সাইন করে দিই। ‘কি অদ্ভুত, তাই না? সাত বছরের সম্পর্ক, সাত দিনেই ভেঙ্গে গেল।’ বিষাদের সুর সাজেদুল করিমের কন্ঠে। ‘কেন সে আপনাকে ছেড়ে চলে গেল, জানতে চাননি?’ জিজ্ঞেস করলেন খন্দকার সাহেব। ‘চেয়েছিলাম। ও বলেছিল, যে মানুষটা আর কিছুদিন পরে মারা যাবে, তার সাথে থাকার টেনশন নিতে রাজি নয় সে। আমিও আর বোঝানোর চেষ্টা করিনি ওকে। যে সম্পর্ক একবার ভেঙ্গে যায়, তা কি আর জোড়া লাগে? ‘এক সপ্তাহ পর দেশে ফেরার প্লেনে চড়লাম আমি। সব কিছু আমার দুই ছেলেমেয়ের নামে লিখে দিয়ে এসেছি। যে দেশে আমার আর কিছু থাকল না, সেখানে থেকে কি লাভ?’ ‘আপনাকে সান্তনা দেয়ার কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না আমি। বিধাতা মানুষকে নিয়ে কেন এসব খেলা খেলেন, তা তিনিই ভাল জানেন। কিন্তু একটা ব্যপার বুঝলাম না, দেশে ফিরে আপনি এখানেই আসলেন কেন? আপনার আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব? তারা কোথায়?’ বললেন খন্দকার সাহেব। ‘তেমন কেউ অবশিষ্ট নেই। আর বাবা মারা যাওয়ার পরে এমনিতেও ওদের সবার পরিচয় জেনে গেছি আমি। আর এখানে আসার কারন যদি জানতে চান, তবে বলব জীবনে এখানেই একটু ভালবাসার দেখা পেয়েছিলাম আমি।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন সাজেদুল করিম। তারপর, অনেকটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই জায়গাটা কেমন লাগে আপনার?’ হঠাত এভাবে প্রসঙ্গ পাল্টানোয় কিছুটা অবাক হলেন খন্দকার সাহেব। তবে সেটা গোপন রেখে বললেন, ‘ভালোই তো। বেশ নির্জন।’ ‘আত্মহত্যার জন্যেও বেশ চমৎকার।’ চমকে উঠলেন খন্দকার সাহেব। তবে কি এই লোক এখানে আত্মহত্যা করতেই এসেছে? ঝট করে সাজেদুল করিমের চোখের দিকে তাকালেন তিনি। ‘ঠিক ধরেছেন। আত্মহত্যা করতেই এখানে এসেছি আমি।’ তার চোখের দৃষ্টি বুঝে নিয়েছেন সাজেদুল করিম। ‘কিন্তু কেন? আত্মহত্যা তো মহাপাপ। জেনেশুনে এই পাপ করবেন আপনি? জীবনে তো দুঃখ আসবেই। সেজন্যে একেবারে শেষ করে দেবেন নিজেকে?’ ‘জ্ঞান দেবেন না দয়া করে। তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে একেবারে তাকে আলিঙ্গন করে নেয়াই আমার কাছে শ্রেয়। এভাবে মরে মরে আমি বেঁচে থাকতে পারবনা।’ ‘জ্ঞান দিচ্ছি না। তবে আপনাকে একটা কথা বলি, এই ছয়মাস কিন্তু আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হতে পারে, যদি আপনি চান। জীবনে প্রতি মুহুর্তে কত সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়, আত্মহত্যা করা মানে তো সেগুলো সব বন্ধ করে দেয়া। এই ভুল কেন করবেন আপনি?’ ‘বলেছিলাম না আপনাকে, আমার কথা শোনার পর কোন মন্তব্য করতে পারবেন না? আপনি ঠিক সেই কাজটাই করছেন। এটা শোভন নয়। তাছাড়া, আমি যদি সত্যি আত্মহত্যা করতে চাই আপনি আমাকে ঠেকাতে পারবেন? কি করবেন আপনি?’ সাজেদুল করিমের কন্ঠে বিরক্তি। ‘সেটা ঠিকই বলেছেন। তবে দয়া করে এই মুহুর্তে কাজটা করবেন না। তাতে আমি খুনের দায়ে পড়ে যেতে পারি। পুলিশ ভাবতে পারে আমি আপনাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছি।’ হার মেনে নিলেন খন্দকার সাহেব। বুঝতে পেরেছেন তিনি, এই লোক তার সিদ্ধান্ত বদলাবে না। ‘গতকাল একবার ওই বুড়োর জন্যে ঝাপ দিতে গিয়েও পারি নি। আজ আবার আপনি বাগড়া দিলেন। আপনি যখন বললেন, তখন আপনার কথা মেনে নিচ্ছি।তবে আশা করি পরেরবার যখন আসব, আপনার সাথে আর দেখা হবে না।’ উঠে দাড়ালেন সাজেদুল করিম। ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ ‘হোটেলে ফিরে যাচ্ছি।’ ‘কোন হোটেলে উঠেছেন আপনি?’ ‘হোটেল সীগাল।‘ পেছনে না তাকিয়েই জবাব দিলেন সাজেদুল করিম, ইতিমধ্যে হাটতে শুরু করেছেন তিনি।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ মিজান সাহেবের নিয়তি-০২

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now