বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ছায়াশহর (পর্ব ১৩ এবং শেষ)

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X ।। ছায়াশহর ।। লেখক : রাকিব হাসান (পর্ব ১৩ এবং শেষ) " ওঠো সুজা", ফিসফিসে গলায় বললাম, " এখান থেকে পালাতে হবে আমাদের।" কিন্তু দেরী করে ফেলেছি। শক্ত হাতে আমার কাঁধ চেপে ধরেছে কতগুলো কঠিন আঙুল। ফিরে তাকিয়ে দেখি, মিঃ জোনস। চোখ সরু করে কবরফলকে নিজের খোদাই করা নামের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তিনি। " মিঃ জোনস! আপনিও!", ককিয়ে উঠলাম আমি। এতটাই হতাশ হয়েছি, এতটাই ভয় পেয়েছি যে হাত পা অসাড় হয়ে গেল। " হ্যাঁ, আমিও", বিষন্নকন্ঠে বললেন মিঃ জোনস। তাঁর জ্বলন্ত চোখের দৃষ্টি আমার চোখের পর্দা ভেদ করে যেন মস্তিষ্কের কোষে পৌঁছে যাচ্ছে। " একসময় একটা স্বাভাবিক শহরই ছিল এই গ্রীন ভ্যালি।" হিসহিসে গলায় বলতে লাগলেন মিঃ জোনস, " আমরাও স্বাভাবিক মানুষ ছিলাম। আমরা অনেকেই শহরের প্রান্তে প্লাস্টিক কারখানাটায় কাজ করতাম। তারপর এক রাতে একটা এক্সিডেন্ট ঘটল। কারখানা থেকে একরকম হলুদ গ্যাস বেরিয়ে এসে শহরের আকাশ বাতাস ছেয়ে ফেলল। সেই গ্যাস শহরের ওপর অনেকক্ষণ ধরে ভেসে বেড়াল; তাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেল এই শহরের প্রত্যেক লোক। আশপাশের শহর থেকে মানুষ এসে আমাদের কবর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু কবরে গিয়েও শান্তিতে ঘুমোতে পারলাম না আমরা। মরেও মরলাম না আমরা। গ্রীন ভ্যালি একটা জীবন্মৃতদের শহরে পরিণত হল। বাইরের কেউই জানে না এই কথা।" " আমাদের কি করবেন এখন? " আমি কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম। পা দুটো এত টলছিল যে ঠিকভাবে দাঁড়াতেই পাচ্ছিলাম না। একজন মৃত মানুষ আমার কাঁধ চেপে ধরেছে, একজন মৃত মানুষ আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, ভাবাই যায় না! এত কাছে দাঁড়িয়ে ওঁর নিশ্বাসের দূর্গন্ধ পাচ্ছিলাম। মাথা ঘুরিয়ে গন্ধটা থেকে মুক্তি চাইলাম, কিন্তু পারলাম না। কটুগন্ধী নিশ্বাসটা আমার ফুসফুসে ঢুকে গেছে। " আমার মা বাবা কোথায়"? উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল সুজা। মিঃ জোনসের জ্বলন্ত দৃষ্টি এখন সুজার দিকে। " ভালোই আছেন ওরা", মিঃ জোনস বললেন, মুখে মৃদু হাসি। " এসো আমার সঙ্গে, দেখা করিয়ে দিই।" কাঁধ ছাড়ানোর চেষ্টা করলাম; কিন্তু তাঁর আঙুলগুলো যেন গেঁথে গেছে আমার কাঁধে। চিৎকার করে বললাম, " আমার ভাইকে যেতে দিন।" হাসিটা চওড়া হল মিঃ জোনসের। বললেন, ভয় নেই রেজা, যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করা হবে তোমাদের। " মোলায়েম, মসৃণ কন্ঠে বললেন তিনি, " এসো, আমার সঙ্গে।" " না!, " চেঁচিয়ে উঠল সুজা। অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় টর্চটা তুলে নিল মাটি থেকে। মিঃ জোনসের বিস্মিত মুখের দিকে টর্চটা তাক করল সুজা। সুইচ টিপল। আশ্চর্য, টর্চ আর জ্বলছে না। বারকয়েক চেষ্টাতেও জ্বলল না। " ভেঙে গেছে", ভাঙা গলায় বলল সুজা, " পাথরের ওপর পড়ে টর্চের বালব ফেটে গেছে"। বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটা যেন পাগল হয়ে গেছে। এত জোরে জোরে লাফাচ্ছে যে ভয় হল যেন বন্ধ না হয়ে যায়। মিঃ জোনসের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর মুখে বিজয়ের হাসি। ************************** ১৪ তম এবং শেষ পর্ব " ভালো", হেসে সুজাকে বললেন মিঃ জোনস, " চেষ্টা করা ভাল।" হাসিটা দ্রুত মিলিয়ে গেল তাঁর মুখ থেকে। পরিষ্কার আলোয় তাঁর চেহারাটা এত কাছ থেকে দেখে আর ভাল লাগল না আমার। মুখের চামড়া শুকনো, চোখের নীচে খসখসে , জায়গায় জায়গায় চামড়া উঠে গেছে পেঁয়াজের খোলার মতো। " চলো", আমায় ঠেলা দিয়ে বললেন তিনি। উজ্জ্বল হতে থাকা আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। ক্রমে গাছপালার মাথা ছাড়িয়ে উঠে আসছে সূর্য। দ্বিধা করছে সুজা। " কি যেতে বললাম না?", ধমকে উঠলেন মিঃ জোনস। আমার কাঁধটা ছেড়ে সুজার দিকে এগোলেন। সুজা একবার হাতের ভাঙা টর্চটার দিকে তাকাল; তারপর ছুঁড়ে মারল মিঃ জোনসের কপাল লক্ষ্য করে। মিঃ জোনসের কপালে গিয়ে সজোরে আঘাত করল টর্চটা। চামড়া খানিকটা কেটে গেল। " উফ!" করে উঠলেন মিঃ জোনস। হাত দিলেন কপালের কাটা জায়গাটায়। আঘাতে চামড়া ফেটে কয়েক ইঞ্চি হাড় বেরিয়ে পড়েছে। " পালাও, সুজা, পালাও!", আমি চেঁচিয়ে বলবার আগেই দেখি সুজা দৌড়তে শুরু করেছে, দুই সারি কবরফলকের মাঝখান দিয়ে। আমিও দৌড়লাম ওর পেছনে। যতটা সম্ভব জোরে। একবার পেছন ফিরে দেখলাম, আমাদের পেছনে টলতে টলতে এগিয়ে আসছেন মিঃ জোনস। কপালের কাটা জায়গাটা হাত দিয়ে চেপে ধরে। একবার ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠা আকাশের দিকে তাকালেন। সকালের সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। অনেক বেশী আলোকিত আর উজ্জ্বল হয়ে গেছে আকাশটা। তাঁর সহ্য ক্ষমতার বাইরে। এবার তাঁকে ছায়াচ্ছন্ন কোনও অন্ধকার জায়গার খোঁজ করতেই হবে। পুরনো, উঁচু একটা মার্বেল স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে গা ঢাকা দিল সুজা। একপাশে কাত হয়ে আছে স্তম্ভটা; মাঝখানে মস্ত ফাটল ধরেছে। ছুটতে ছুটতে আমি ওর পাশে এসে দাঁড়ালাম। এত বেশী হাঁফাচ্ছি যে দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠান্ডা মার্বেলের গায়ে হেলান দিয়ে দুজনে উঁকি মেরে দেখলাম মিঃ জোনসকে। আমাদের দিকে আর আসছেন না। গম্ভীর মুখে হেঁটে চলে যাচ্ছেন সেই মঞ্চটার দিকে। " আমাদের দিকে আসছেন না", ফিসফিস করে বলল সুজা, " ফিরে যাচ্ছেন। " " রোদ সহ্য করতে পারছেন না", মার্বেলের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম আমি। " ওই টর্চটাই ডোবাল", সুজা বলল, " নইলে এতক্ষণে হ্যারির মতো অবস্থা হত।" " ও নিয়ে ভেবে এখন লাভ নেই", মিঃ জোনসের অপসৃয়মান ছায়াটার দিকে চেয়ে থেকে বললাম আমি। দেখলাম, ক্রমে তিনি মঞ্চের ওপর ঝুঁকে থাকা গাছটার ওপারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। " দেখো, দেখো", হঠাৎ আমার গায়ে গুঁতো দিয়ে বলল সুজা। ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, কতগুলি ছায়ামূর্তি এগিয়ে চলেছে কবর ফলকগুলির পাশ দিয়ে। যেন মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে ওরা। কবর থেকে উঠে এল নাকি? তাই-ই হবে। দ্রুত চলেছে ছায়ামূর্তিগুলো। মনে হচ্ছে সবুজ ঘাসে ঢাকা ঢালের ওপর দিয়ে ভেসে নেমে যাচ্ছে গাছের ছায়ার দিকে। ছায়ামূর্তি গুলোর দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সুজা। ছায়ামূর্তি গুলো কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। সুতোর টানে কলের পুতুলের মতো চলেছে যেন। সবার লক্ষ্য সেই গাছের ছায়ায় ঢাকা অদ্ভুত মঞ্চটা। " কেমন অদ্ভুত, তাই না?", সুজা ফিসফিস করে বলে উঠল। লক্ষ্য করলাম, চারপাশের কবরফলক, গাছপালা, গোটা গোরস্থান যেন জ্যান্ত হয়ে উঠেছে। ওরা কারা? কোথায় চলেছ? নতুন পুরনো লাশগুলো কি কবর থেকে বেরিয়ে পড়েছে কোনও নারকীয় মহোৎসবে যোগ দিতে যাবে বলে, যেখানে চলবে রক্তের হোলিখেলা? " ওই যে এরিকা", ফিসফিস করে বলে আঙুল তুলে দেখালাম। " আর ঐ যে টমাস",...... দলের সব ছেলেমেয়েই রয়েছে দেখছি। একসময় এরা আমাদের পুরনো বাড়িটায় বাস করত। এখন এরা সবাই কবরের বাসিন্দা। গাছের ছায়ায় ছায়ায় অন্যদের সঙ্গে হেঁটে চলেছে ওরাও। দ্রুত অথচ নিঃশব্দে। হ্যারিকে দেখতে পেলাম না। হ্যারিকে কাল রাতে আমরা ধ্বংস করে দিয়েছি। " মা-বাবা কি ঐ মঞ্চটাতেই রয়েছে? ওদেরই কি মারতে যাচ্ছে ঐ জীবন্ত লাশের দল?", সুজার কথায় আমার সম্বিত ফিরে এল। " চল, দেখতে হবে", সুজার হাত ধরে টান মেরে বললাম। শেষ ছায়ামূর্তিটাও গাছের ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল। পিনপতন নীরবতা নেমে এল গোরস্থানটায়। মেঘমুক্ত নীল আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে শুধু একটা নি:সঙ্গ শকুন। ধীরেধীরে, নিজেদের যতটা সম্ভব লুকিয়ে মঞ্চটার দিকে এগোলাম। গাছের আড়ালে আড়ালে, মার্বেলের স্মৃতিস্তম্ভের পেছনে পেছনে গা ঢাকা দিতে দিতে এগোলাম মঞ্চটার কাছে। চলাটাই যেন আমাদের কাছে দ্বিগুণ কষ্টকর ঠেকল। নিজেদের দেহটাকেই মনে হচ্ছিল যেন অসম্ভব ভারী। আসলে ভয়, আতঙ্ক আমাদের এমনভাবে গ্রাস করেছে যে পুরো দেহটা যেন অসাড় হয়ে গেছে। কিন্তু ভয় আমাদের জয় করতে পারল না, মা বাবাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছি আমরা। কিছুতেই কতগুলো জীবন্মৃত লাশের হাতে আমরা কেউ জীবন দেব না, এটাই আমাদের মনের জোর বাড়িয়ে দিল। মঞ্চের ওপর কাত হয়ে থাকা গাছটার কাছে চলে এসেছি। থেমে গেলাম। সুজাকেও টেনে ধরে থামালাম। গাছের শেকড়ের আড়ালে নিজেদের লুকোলাম। নীচের দিকের মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে বহুকন্ঠের গুঞ্জন। " মা আর বাবা কি ওখানেই আছে?", ফিসফিস করে বলতে বলতে সুজা শেকড়ের আড়াল থেকে দেখতে গেল। খামচে ধরে ওকে টেনে আনলাম নিজের দিকে। অস্ফুটে বললাম, " করিস কি? পিশাচগুলো আমদের দেখে ফেললে সর্বনাশ হবে!" " কিন্তু বাবা-মা আছে কিনা দেখা তো দরকার", সুজা তেমনই ফিসফিস করে বলল। ওর চোখে আতঙ্ক দেখতে পেলাম। " হ্যাঁ, তা ঠিক", আমি চিন্তিতভাবে বললাম। বিশাল, মোটা কান্ডটার পাশ দিয়ে সাবধানে উঁকি দিলাম নীচের দিকে। দেখলাম গাছের ছায়া ঘন অন্ধকার সৃষ্টি করেছে মঞ্চটার ওপর। আর সেই অন্ধকারেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় নিয়েছে নরকের ঐ পিশাচগুলো। মা-বাবাকে দেখলাম, দুজনকে একটা শক্ত খুঁটির সাথে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। মঞ্চের ঠিক মাঝখানে ওদের বেঁধে রাখা হয়েছে। খুবই কষ্ট হচ্ছে ওঁদের দেখেই বুঝলাম। বাবার মুখ টকটক করছে লাল, মায়ের মাথার চুলগুলো এলোমেলো ভাবে পড়েছে কপালের ওপর। সেই ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকারে পিশাচগুলোকে দেখলাম, ওদের প্রায় ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের মধ্যে মিঃ জোনসকেও দেখলাম। " মা-বাবাকে মেরে ফেলবে ওরা", ফিসফিস করে বলল সুজা, ওর চোখেমুখে আতঙ্ক লক্ষ্য করলাম, "ওদের মেরে ফেলে ওদেরও জ্যান্ত লাশ বানিয়ে ফেলবে।" " তারপর আসবে আমাদের শেষ করতে ", চিন্তিতভাবে বললাম, " মা বাবাই হয়ত তখন ওদের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের কাছে নিয়ে আসবে।" তাকিয়ে আছি। মা বাবা হাত পা মুখ বাঁধা অবস্থায় অসংখ্য নীরব দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অসহায়ের মতো। নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। " কি করব?" জিজ্ঞেস করল সুজা। জবাব দিতে পারলাম না। আমার মগজে তখন ঝড়ের গতিতে একটার পর একটা পরিকল্পনা খেলছে। মা বাবাকে বাঁচানোর একটা উপায় খুঁজছি। " কি করব, কিছু বলো", সুজা আবার বলে উঠল দাঁতে দাঁত চেপে। আমার হাতে শক্ত হল ওর হাতের চাপ। বলল, " আমাদের চোখের সামনে ওরা মরে যাবে আর আমরা কিছুই করতে পারব না?" গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালাম দুজনে। কান্ডের মাথার কাছে, ডালপালাগুলো শুরু হয়েছে যেখান থেকে। চাপ লেগে একটু যেন নড়ে উঠল গাছটা। তাড়াতাড়ি সরে এলাম ওখান থেকে। গাছটার দিকে চেয়ে হঠাৎ বুদ্ধিটা খেলে গেল মাথায়। " মনে হয় বাঁচাতে পারব", গাছটার দিকে চেয়ে বলে উঠলাম আমি। চকিতে আমার হাত ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল সুজা। অধীর আগ্রহে তাকাল আমার দিকে। " এই গাছটাকে যে কোনও উপায়ে ঠেলে ওপাশে ফেলে দিতে হবে", আমি বললাম, " গাছ না থাকলে ছায়াও থাকবে না। ওরা রোদ বা যে কোনও তীব্র আলো সইতে পারে না। গাছটা না থাকলেই রোদ এসে পড়বে ওদের গায়ে। ধ্বংস হবে ওরা।" " ঠিক!", বলে উঠল সুজা, " ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার ভাবটা কেটে গেলেই ওরা আর টিকতে পারবে না। ভূতগুলো সব রোদে পুড়ে মরবে।" " যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে", আমি বললাম। কান্ডের পাশ দিয়ে দুজনে নীচের মঞ্চের দিকে তাকালাম। দেখি, মা বাবার দিকে এবার এগোতে শুরু করেছে ওরা। এইবারই বোধহয় ওদের জীবনের যবনিকা পড়তে চলেছে। আর দেরী করা ঠিক হবে না। সুজাকে বললাম, " সুজা, বি রেডি। কিছুটা পিছিয়ে এসে লাফিয়ে উঠতে হবে গাছটার ওপর।" কয়েক পা পিছিয়ে এলাম দুজনে। যেভাবে গাছটা কাত হয়ে রয়েছে ঢালের গায়ে, আর শেকড়গুলো মাটি থেকে উপড়ে এসেছে, তাতে গাছটা আমাদের ভার সইতে পারবে না। কোনওভাবে মাটিতে ফেলে দিতে পারলে হল গাছটাকে।ছায়া চলে যাবে। উজ্জ্বল সোনালী আলোয় ভরে যাবে মঞ্চটা। আমাদের জন্য আনন্দের। পিশাচগুলোর জন্য আতঙ্কের। গলে ধ্বংস হয়ে যাবে ওরা। আমাদের মা বাবা বেঁচে থাকবে। আমরাও বাঁচব। আমি আর সুজা। আমরা চারজনেই বেঁচে যাব। " সুজা রেডি?" আমি বললাম। মাথা ঝাঁকাল সুজা। এখনো ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি ও। এক....দুই....তিন... তীব্র গতিতে দৌড় দিলাম দুজনে। উঠে পড়লাম কান্ডটার ওপর। প্রাণপনে ঝাঁকাতে লাগলাম কান্ডটা ধরে। " জোরে....জোরে....আরও জোরে...." গাছটা সামান্য একটু বেঁকেই আবার লাফিয়ে উঠল। তারপর আর নড়ল না। " ঠেলা দে ....আরও জোরে.." আমি চেঁচিয়ে বললাম। ককিয়ে উঠল সুজা। একটা গোঙানি বেরিয়ে এল ওর মুখ দিয়ে। হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, " পারছি না ভাইয়া! এত বড় গাছ নাড়ানোর সাধ্য আমাদের নেই!" " সুজা হাল ছাড়িস না", দাঁত কিড়মিড় করে আমি বলে উঠলাম , " মা বাবাকে বাঁচাতে হবে"। গাছের গায়ে আরও জোরে ঠেলা দিল ও। নীচ থেকে শোনা যাচ্ছে উত্তেজিত, রাগত গুঞ্জন। সবাই তাকিয়ে আছে ওপর দিকে। " জলদি!", চেঁচিয়ে বললাম, " আরও জোরে ঠেলা দে....গাছটাকে ফেলতেই হবে....যে কোনও ভাবে।" দুজনে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁকাতে লাগলাম গাছটাকে। মুখ লাল হয়ে উঠছে আমাদের। কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, লাফাচ্ছে। গোঙানি বেরিয়ে আসছে আমাদের মুখ দিয়ে। " ঝাঁকা....ঝাঁকা...." আমি চেঁচিয়ে বলতে লাগলাম, " থামিস না। এর ওপরেই আমাদের আজ জীবন মরণ নির্ভর করছে।" প্রাণপনে শক্তিতে গাছটা ধরে ঝাঁকাতেই লাগলাম আমরা। কপালের শিরাগুলো বুঝি ফেটে যাবে এবার। কিন্তু গাছ আর একচুল নড়ছে না! কি হবে এখন! সেই যে একটু নড়েছিল আর নড়বার নাম নেই। আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম আমরা। কি হবে এখন? আত্মবিশ্বাস চলে গেছে আমাদের। দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লাম আমরা। পারলাম না নিজেদের বাঁচাতে....মা বাবাকে বাঁচাতে। হঠাৎ মোলায়েম একটা মড়মড় শব্দ কানে এল। টের পেলাম নড়ছে গাছটা। ক্রমশ একদিকে কাত হয়ে যাচ্ছে গাছটা। তাড়াতাড়ি গাছটার ওপর থেকে নেমে এলাম আমরা। সুজাও নেমে এল। বাড়ছে শব্দটা। ভারী হচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। শেকড় ওপড়ানোর প্রচণ্ড শব্দ তুলে পড়ে গেল গাছটা। প্রথমে ঢালের ওপর পড়ল গাছটা। মাটি কেঁপে উঠল। মাথা নীচের দিকে করে কিছুটা পিছলে গড়িয়ে নেমে গেল গাছটা। সুজার হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। দেখলাম আমার অনুমানই ঠিক। গাছটা পড়ে যাওয়াতে ছায়া সরে গিয়ে রোদ পড়েছে মঞ্চটার ওপর। নীচ থেকে ভেসে আসছে সম্মিলিত চিৎকার। উত্তেজিত, রাগত। ক্রমেই তা ভয়াবহ আর্তনাদের রূপ নিল। কবর থেকে উঠে আসা জীবন্মৃত মানুষগুলোর গায়ে রোদ পড়েছে। একে অন্যর মধ্যে ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেছে। চেঁচামেচি, ঠেলাঠেলি, হুড়োহুড়ি করে একে সবাই ঢাল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কোনও ছায়াময় জায়গায় আসার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে সবাই। হামাগুড়ি দিয়ে সবাই শরীরটাকে হেঁচড়ে পিঁচড়ে এগিয়ে আসছে। কিন্তু বেশীক্ষণ এই অবস্থা চলল না। রোদের তীব্র আলোয় ওদের শরীরের মাংস গলে গিয়ে হাড় বেরিয়ে পড়ছে। চোখ বেরিয়ে গিয়ে চোখের কোটর দেখা যাচ্ছে। বীভৎস সেই দৃশ্য। যেন নরকে এসেছি আমরা। অথচ চোখও সরাতে পারছি না এই দৃশ্য থেকে। এরিকাকেও দেখলাম ভীড়ের মধ্যে। এরিকা গার্ডনার। সকলের সঙ্গে সে-ও ঢাল বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ওর মাথা থেকে চুলের বোঝা খসে পড়ল, বেরিয়ে পড়ল চামড়া গলে যাওয়া বাদামী রঙের মাথার খুলি। আমার দিকে তাকাল ও; তবে বেশীক্ষণ তাকাতে পারল না। চোখদুটো গলে কোটর ছেড়ে বেরিয়ে এল; সৃষ্টি হল দুটো শূন্য গহ্বর। হাঁ করল। মাঢ়ির সমস্ত দাঁত খসে পড়ল। তারপরেই টলে পড়ে গেল ও। অসহ্য হয়ে উঠেছে জীবন্ত লাশগুলোর চেঁচামেচি। সহ্য করতে না পেরে কানে আঙুল দিলাম আমি আর সুজা। অন্যদিকে মুখ ফেরালাম। রোদের তেজে ধ্বংস হতে লাগল জীবন্মৃত পিশাচের দল। ধীরেধীরে থেমে গেল চিৎকার চেঁচামেচি। আবার যখন তাকালাম তখন দেখলাম, ঢাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য হাড়গোড়। একটা দেহও আর আস্ত নেই। মঞ্চের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মা বাবা তখনও রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে তখনো আতঙ্ক আর অবিশ্বাস। " মা! বাবা!", চেঁচিয়ে ডাকলাম আমি আর সুজা। ওঁদের মুখে আমি সেদিন যে হাসি দেখলাম জীবনে কখনো তা ভুলব না। আমরা দৌড়ে গেলাম মা বাবাকে মুক্ত করতে। মুভার্স কোম্পানির লোককে খবর দিল বাবা। ওরা এসে ভারী জিনিসগুলো নিয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবার মতো জিনিসগুলো দ্রুত গুছিয়ে নিলাম আমরা। আবার আমরা আমাদের পুরনো বাড়িতে ফিরে যাচ্ছি। " ভাগ্যিস! আমাদের পুরনো বাড়িটা বেচে দিইনি", বাবা বললেন। গাড়িতে উঠে পড়লাম। বাবা গাড়ি স্টার্ট করে দিলেন। ড্রাইভওয়েতে পিছোতে শুরু করল আমাদের গাড়ি। রাস্তায় উঠে এল। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে শেষবারের মতো বাড়িটাকে দেখলাম। নীলচে ধূসর ছায়ায় ঢাকা, শূন্য বাড়িটাকে কেমন যেন মনে হল। হঠাৎ বাড়ির বারান্দার দিকে চোখ পড়তে ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতরটা। ক্লিপবোর্ড হাতে বারান্দায় ঐ লোকটা কে দাঁড়িয়ে? মিঃ জোনস না? ভাল করে দেখবার জন্য ঘাড় ঘুরিয়েও দেখতে পেলাম না। ততক্ষণে গাড়ি বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে এসেছে। নিজের মনকে বোঝালাম, উঁহু, মিঃ জোনস হতেই পারেন না। রোদের তেজে অন্য সকলের মতো ধ্বংস হয়ে গেছেন তিনিও। নাকি....নাকি... .তিনি ঠিক সময়মত কোনও ছায়াচ্ছন্ন জায়গায় উঠে আসতে পেরেছিলেন? কে জানে? কিন্তু এসব চিন্তা করার মতো আর সময় রইল না। ততক্ষণে আমাদের গাড়ি গ্রীন ভ্যালির রাস্তা ছাড়িয়ে হাইওয়েতে উঠে পড়েছে। হাইওয়ে ধরে আমাদের পুরনো বাসার দিকে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। ( সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now