বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

নেকড়ে পাহাড় (wolf mountain )

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ মাজেদ (০ পয়েন্ট)

X ঈদ মোবারক WOLF MOUNTAIN লেখক : জে. আর. পিন্টো ভাষান্তরে : সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পর্ব:১ ।। ভরা পূর্ণিমার এক রাত।। পোর্ট অফ প্রিন্সের ধ্বংসস্তুপের পেছনে সূর্যটা ক্রমে ডুবে গেল। কিন্তু বিকেলের আলো তখনও মরে যায় নি। ক্যারিফোরের একটা ছোট মফস্বল শহর। বহুদিনের পুরনো, জীর্ণ ফুটবলটার গায়ে আন্দ্রে সজোরে একটা কিক মারতেই ওটা বেশ কিছুটা দূরে একটা গাছের গায়ে 'হিট' করে আবার ফিরে এলো ওর কাছে। ভোঁতা একটা শব্দ শোনা গেল। বারো বছর বয়স এখন আন্দ্রের, এই ছোট শহরটাতেই থাকে ও। শহর বলতে অবশ্য এখন শুধু কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপ আর তারই মাঝে মাঝে জায়গায় জায়গায় ছোট বড় ত্রিপলের তাঁবুর সমাবেশ। গত বছরেই প্রবল এক ভূমিকম্পে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে আন্দ্রে। বাড়িটাও আর আস্ত নেই। ভয়াল সেই ভূমিকম্প এ গ্রামের অন্যান্য অনেক বাচ্চার মতো তাকেও অনাথ করে দিয়েছে, বে-ঘর করে দিয়েছে। অনেকেই স্বজনহারা হয়েছে এখানে। কেউ হারিয়েছে তার স্বামীকে, কেউ হারিয়েছে নিজের স্ত্রীকে, কেউ হারিয়েছে সন্তানকে, আবার অনেক বাচ্চা আছে, যারা অনাথ হয়ে গিয়েছে। একটা বাড়িও এখানে আর আস্ত নেই। সবগুলিই ভেঙে পড়েছে। উদ্বাস্তুর মতো তাঁবু খাটিয়ে কোনওরকমে মাথা গোঁজার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে এখানকার ভূমিকম্পবিধ্বস্ত মানুষজন। পেট চলছে আমেরিকা, চীনের মতো দেশ থেকে আসা ত্রাণ সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে। আন্দ্রে এই ভূমিকম্পপীড়িতদেরই একজন। ভূমিকম্প তার মা,বাবা, মাথার ওপর থেকে ছাদ - সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। আপন বলতে তেমন কেউ আর নেই এখন। একমাত্র এক আন্টি মেরীই ওর দেখভাল করছে এখন। আরেকটা শট দেবে বলে বলটার গায়ে সবে পা ছুঁইয়েছে আন্দ্রে, ঠিক এইসময়েই দেখা গেল ওর বন্ধু পিয়ের এদিকেই আসছে ছুটতে ছুটতে। আন্দ্রের সঙ্গে চোখাচোখি হতে পিয়ের বলল, "আন্দাজ কর তো, কি বলবার জন্য এসেছি? " হাইতিয়ান পাঁচমিশালী ভাষায় কথা বলছিল সে। এখানকার ভাষা বলতে ফ্রেঞ্চ, স্পেনীয় এবং আফ্রিকান কিছু ভাষার সংমিশ্রণে কতগুলো শব্দসমষ্টি। "...কি বলতে? " জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পিয়েরের দিকে চাইল আন্দ্রে। পিয়েরের স্বাস্থ্য যাকে বলে একেবারে গোলগাল, নিটোল। আন্দ্রের মতো অ্যাথলেটিক চেহারা নয় ওর। অনেকটা পথ ছুটে আসায় খুব হাঁফাচ্ছিল ও। পরনে একটা সাদা টি-শার্ট আর ছাইরঙা প্যান্ট। এই পোশাকটাকে চেনে আন্দ্রে। এই সেদিন আমেরিকা থেকে পাঠানো ত্রাণ সামগ্রী এসেছিল, সেনাবাহিনীর লোকরা জামাকাপড় বিলি করছিল এখানে। পিয়েরের ভাগ্যে জুটেছিল এই টি শার্ট আর প্যান্ট'টা। আন্দ্রের এখনকার পরিধেয় পোশাকটাও একইভাবে পাওয়া। "....কাম অন..." হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল পিয়ের, "আন্দাজ করে বল না দেখি!" "....আমি কি করে জানব?" একটু বিরক্তি ফুটে উঠল এবার আন্দ্রের গলায়, তারপরেই গলার স্বর সামান্য খাটো করে বলল, "কেন? ওই অ্যানার কোনো গোপন মূহুর্তের ছবি টবি যোগাড় করেছিস নাকি?" "...না, তাও না..." এবার হেসে বলল পিয়ের, "তবে আমার কাজিন ব্রাদার জিনের প্রতি ইদানীং ও একটু বেশীই আগ্রহ দেখাচ্ছে...বলতে পারিস, প্রেমে পড়েছে"। অ্যানা আন্দ্রে'দের এলাকারই মেয়ে। ডাকসাইটে সুন্দরী, চালচলন চটুল প্রকৃতির, এজন্য ওদের এলাকার অনেক ছেলেই অ্যানা'র পেছনে ঘুরঘুর করে। এদিকে, জিন হচ্ছে পিয়েরের খুড়তুতো ভাই। আন্দ্রে এবং পিয়েরের চেয়ে বয়সে ঢের বড় জিন, হাতের মাংসপেশিগুলো ফোলা ফোলা, দেখতেও সুদর্শন। "...জিন বলেছে, মেয়েটা বলেছে, ও নাকি ওর সাথে ডেটিং করতে যেতে চায়...", বলল পিয়ের। "...তাই নাকি? " মাথাটা যেন বোঁ করে ঘুরে উঠল আন্দ্রের উত্তেজনায়, "কখন বলেছে?" "...এই এখনই..তাই তো ছুটে এলাম তোকে খবরটা জানাতে" "...তোর দাদা কি চায়, ও যখন অ্যানার সঙ্গে ডেটিং-য়ে যাবে, আমরা এবার ওদের ফলো করি? সেজন্যই তোকে এরকম একটা গোপন খবর জানিয়ে দিল?" গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করল আন্দ্রে। "....না, ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়", বলল পিয়ের, "তবে আমরা ওদের গোপনে ফলো করতে পারি"। আন্দ্রে এর আগে বহু যৌনতার দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছে। হাইতির পথেঘাটে বনে-বাদাড়ে প্রায়ই দেখা যায় প্রেমিক-প্রেমিকারা গোপন খুনসুটিতে মত্ত। হাইতির মতো জায়গায় এক্ষেত্রে কোনো প্রাইভেসি নেই। গতবছর ভূমিকম্পের আগে পর্যন্ত এরকমভাবেই চলছিল এখানকার জীবনযাত্রা। তারপর সেই ভয়াল ভূমিকম্পের পর এ পর্যন্ত স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা এখনও আগের মতো স্বাভাবিক হতে পারেনি। আর এরই মধ্যে হঠাৎ করে অ্যানা আর জিনের ডেটিং করতে যাওয়ার খবরটা কানে এলো আন্দ্রের। নিজের মনেই হাসি পেলো আন্দ্রের। এখনও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয় নি এখানে কিন্তু প্রেম যেন কোনওকিছুরই পরোয়া করে না। সত্যিই, এই প্রেম বড় অদ্ভুত জিনিস! "...তা,কোথায় যাবে ওরা ডেটিং করতে?" উত্তরে পিয়ের মুখে কিছু না বলে শুধু তর্জনী উঁচিয়ে দূরের পাহাড়টা দেখিয়ে দিল, "ওই পাহাড়ের ওপর মাঝখানে একটা পুকুর আছে, ওইখানে যাবে। " "...কবে রে?" "...কবে মানে!" পিয়ের ভ্রু জোড়া কপালে তুলল, "বল কখন...এখনই যাবে ওরা!" কথাটা অবিশ্বাস্য শোনাল আন্দ্রের কানে। বলল, "কিন্তু একটু পরেই যে আঁধার ঘনিয়ে আসবে। পাহাড় পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই রাত্রি গড়িয়ে আসবে যে! " তারপরেই ওর যেন কিছু যেন মনে পড়ল। তাই গলার স্বর নিচু করে অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে বলল, "ও আচ্ছা...আজ যে পূর্ণিমার রাত! তবু..." "...তবু কি?" দুই হাত বুকের ওপর ক্রশ করে বলল পিয়ের। আন্দ্রে দু এক সেকেন্ড কি যেন ভেবে নিয়ে তারপর মুখখানা চিন্তিতের মতো করে বলল, "যতই হোক, সময়টা তখন রাত আর হাজারটা বিপদ আপদ হতে পারে। বিশেষ করে, গুন্ডা বদমাশদের হাতে পড়ার ভয়টাই সবচেয়ে বেশী। জানিস তো, গতবছর যখন ভূমিকম্প হলো, পোর্ট অফ প্রিন্সের জেলখানাটা ভেঙে পড়েছিল আর সেই সুযোগে কত কত কয়েদী জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। কয়েকজন মাত্র পরে ধরা পড়েছিল কিন্তু অধিকাংশ কয়েদীই পালিয়ে গিয়েছিল। এখন তারা নিশ্চয়ই আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। কে বলতে পারে, ওই পাহাড়ে ওদের গোপন ঘাঁটি নেই? তাই বলছি, রাতের বেলা ওইসব পাহাড় জঙ্গলে যাওয়া জিন আর অ্যানা'ই বল বা আমরা - কারোর পক্ষেই নিরাপদ নয়!" এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল আন্দ্রে। উত্তেজনায় ওর চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। পিয়েরের ঠোঁটের কোণে এবার একটা অর্থপূর্ণ দুষ্টু হাসি খেলে গেল। বলল, "এমনিতে যেতাম না কিন্তু যেহেতু একটা মেয়ে আছে, ওর কথা ভেবেই যেতে চাইছি"। "...মানে?" "...মানে'টা ভেরি সিম্পল...তুই তো জানিস অ্যানা আর জিন যাচ্ছে। ওই পাহাড়ে যদি গুন্ডা বদমাশ থেকেও থাকে,তাহলে অ্যানার বিপদ হতে পারে। ও একটা মেয়ে, ওর বিপদের সম্ভাবনাটাই বেশী। তাই আমরা দুজনও লুকিয়ে ওদের ফলো করব। কেস সেরকম গুরুতর হয়ে উঠলে বা ওদের বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিলে আমরাও ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েটাকে বাঁচাব। ঠিক এই কারণেই আমাদের যাওয়া। ওদের দুজনের রোমান্সও দেখা হবে, আবার প্রয়োজনে ওদের হেল্পও করা যাবে"। নাচারভাবে আন্দ্রে তাকিয়ে রইল মাটির দিকে। যেন গভীরভাবে কিছু ভাবছে। পিয়ের যা যুক্তি দেখাচ্ছে, তা মোটেও ফেলে দেবার নয়। তারপর পিয়েরের দিকে তাকিয়ে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল সে। পায়ের কাছে রাখা ফুটবলটাকে নিয়ে অল্প অল্প ড্রিবল করতে লাগল সে। এই খেলাটায় বেশ পারদর্শী আন্দ্রে। হাইতির সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হলো ফুটবল। এখানকার প্রত্যেক নাগরিকেরই স্বপ্ন, খেলাটায় পারদর্শী হতে আর তারপর আন্তর্জাতিক স্তরে ফুটবল খেলে আরও আরও ধনী হয়ে উঠতে। পিয়েরের খুড়তুতো দাদা জিন আঠারো বছর বয়স থেকেই ফুটবল খেলছে। এখন ও একজন পেশাদার ফুটবলার। পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলে। গত বছর ভূমিকম্পের আগে ও পর্তুগালের হয়ে ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল, তাই রক্ষে। নইলে যে কি হতো! সত্যিই, গত বছর'টা ওদের সবার জীবনে আমৃত্যু একটা দগদগে স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে। কত লোক যে এখানে মারা পড়েছিল, তার ঠিক নেই। যারা কোনও গতিকে বেঁচেছে, আন্দ্রের মতো, পিয়েরের মতো...স্রেফ বরাতজোরে বেঁচেছে। আন্দ্রের স্বপ্ন, ও ফ্রান্সের হয়ে ফুটবল খেলবে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবে। বিশ্বের ধনী মানুষদের মধ্যে একজন হবে। ওর প্রত্যেকটা রাত কাটবে একেকটি সুন্দরী মডেলের সাথে। আজকাল প্রত্যেক রাতে ও এইসবই স্বপ্ন দেখে। আকাশকুসুম স্বপ্ন। .....ঘন্টাখানেকের ভেতর আন্দ্রে এবং পিয়ের দুজনেই ছোট শহরটার সীমানার কাছাকাছি এসে পড়ল। এখন পড়ন্ত বিকেল। দিনের আলো মরে এসেছে অনেকখানি। সমুদ্রের সুগন্ধ বয়ে নিয়ে আসা একটা সুন্দর, ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। পাহাড়ে যাবার পথটা বেশ গোলকধাঁধার মতো। আর নোংরাও খুব। শহরের যত আবর্জনা, সব পাহাড়ে যাবার পথটার দিকে ফেলা হয়। আন্দ্রে এবং পিয়ের - দুই বন্ধু সাবধানে, আবর্জনা এড়িয়ে সেই পাহাড়ে পথ ধরল। শহরের বেশীরভাগ ঘরবাড়িই এখনো ধ্বংসস্তূপ। খুব ধীরেধীরে পুনর্গঠনের কাজ চলছে। ভূমিকম্প এখনও তার নির্মম, ভয়াবহ ধ্বংসলীলার চিহ্ন রেখে গেছে শহরের সর্বত্র। বেশীরভাগ জায়গায় এখনও উদ্বাস্তুদের মতো তাঁবু খাটিয়ে দৈনন্দিন সাংসারিক কাজ চলছে ঢিমেতালে। কোনো কোনো তাঁবুর সামনে কেউ বোধহয় আগুন দিয়েছে, রান্না চাপাবে বলে। সেই আগুনের ক্ষীণ ধোঁয়া ক্রমশ পাকিয়ে পাকিয়ে উঠতে শুরু করেছে আকাশের দিকে। নাকে আসছে ধোঁয়ার গন্ধ। আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়া থেকে যা সাহায্য আসছে, তাই দিয়েই এখনও জীবন ধারণ করে চলতে হচ্ছে এখানকার মানুষজনকে। জামাকাপড় থেকে শুরু করে খাবারদাবার, সব কিছুই সাহায্যের দান হিসেবে গ্রহণ করতে হচ্ছে ওদের। এইভাবেই এখন দিন চলছে এখানকার সবার। একটা বিষাদে মনটা ভরে উঠল আন্দ্রের। হায়, এটা কি ওর সেই চেনা শহর? যেখানে ও বড় হয়েছে? গোটা শহরটা যেন একটা রিফিউজি ক্যাম্প। ঈশ্বর জানেন, কবে আবার সবকিছু স্বাভাবিক হবে। সেদিনের তারিখটা ছিল ২১ শে ডিসেম্বর - আর চারদিন পরেই বড়দিন। আন্দ্রে এবং পিয়ের যত পাহাড়ের পথে এগোচ্ছে, পেছনে তাঁবুর ভিড় তত পাতলা হয়ে আসছে। মানুষের কথাবার্তা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে কানে আসছে। আগুন এবং ধোঁয়ার গন্ধও ক্ষীণভাবে নাকে আসছে। কাঁধের ওপর দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আন্দ্রে একবার দেখল পেছনে ফেলে আসা মলিন শহরটাকে। আসন্ন সন্ধ্যার ম্লান আলোয় সারি সারি তাঁবুগুলোকে দেখে ও মনে মনে কেমন যেন বিষন্ন হয়ে পড়ল। পাহাড়ে যাচ্ছে নিছকই একটা কৌতূকের বশে কিন্তু ভেতর থেকে ওর মনটা কিছুতেই তাতে সায় দিচ্ছিল না। তা কি ওদের শহরটার দৈন্যদশা দেখে, না কি অন্য কোনও কারণে? ক্রমে ক্রমে একসময় ওরা পাহাড়ের মাথায়, একটা ছোট বনের ভেতর প্রবেশ করল। ততক্ষণে সন্ধে জাঁকিয়ে বসেছে। আকাশে গোল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার রূপোলী আলোয় ভরে গিয়েছে বন আর পাহাড়। আন্দ্রে এবং পিয়ের যে বনে প্রবেশ করেছে, সেখানকার গাছগুলো এত উঁচু উঁচু আর ঘন সন্নিবিষ্ট যে চাঁদের আলো প্রায় প্রবেশই করতে পারছে না বনের ভেতরে। গাছে ধাক্কা খেয়ে ঠিকরে বেরিয়ে যাচ্ছে বাইরে। ফলে বনের ভেতর জায়গায় জায়গায় গাঢ় অন্ধকারের সৃষ্টি হয়েছে। ওরা দুই বন্ধু সেই ছায়ায় গা মিশিয়ে এগিয়ে চলেছে পায়ে পায়ে। তবু ক্ষীণভাবে যেটুকু আলো গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল, মাটির দিকে দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে এগোতে লাগল আন্দ্রে। অন্ধকারে কোনো সাপের গায়ে পা দিয়ে ফেলছে না তো! "....আমি বাবা ফেরার সময় এই অন্ধকার বনপথ ধরে আসতে পারব না", ভীতু ভীতু গলায় বলল আন্দ্রে। "....দেখা যাবে", মৃদু গলায় বলে উঠল পিয়ের, "একটু জলদি পা চালা। ওরা মনে হয় এদিকেই এসেছে"। ক্রমে ওরা পাহাড়ের শিখরদেশ ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে গেল। জঙ্গল এখানে একটু পাতলা হয়ে এসেছে। বেশ একটা ফাঁকা জায়গায় চলে এলো ওরা। এখান থেকেই পাহাড়ের একটা উতরাই সোজা নেমে গিয়েছে নিচের দিকে। খানিক দূরেই জলের মতো কি যেন চিকচিক করছে দেখা গেল। আন্দাজেই আন্দ্রে বুঝল, ওটাই সেই পুকুর। পাহাড়ি পুকুর। উতরাই বেয়ে এখন নামবার পালা ওদের, তারপর ছোট একটা গিরিখাত পার হয়ে ওই পুকুরটার কাছে পৌঁছতে হবে ওদের। পাহাড়ের এদিকটায় এসে ওদের মনে হতে লাগল ওরা যেন একটা অন্য পৃথিবীতে এসে পড়েছে, ওদের সেই চেনা পৃথিবীটাকে পেছনে ফেলে। যতক্ষণ ওরা নিজেদের শহরের সীমানায় ছিল, মানুষের পৃথিবীতে ছিল। কিন্তু পাহাড়ে ওঠার পর থেকে ওদের মনে হতে লাগল যেন ওরা সম্পূর্ণ এক অনৈসর্গিক দুনিয়ায় এসে পড়েছে, যেখানে জীবিত মানুষ বলতে শুধু ওরা দুজন। ওরা এখন যেখানটায় দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পর্বতশ্রেণীটাকে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায়। চাঁদের আলোয় পাহাড়ের সীমানায় ঘন গাছপালাগুলোকে মনে হচ্ছে যেন কেউ কালো কালি বুলিয়ে দিয়েছে। "....ওদেরকে তো কোথাও দেখতে পাচ্ছি না!" এদিকওদিক তাকাতে তাকাতে বলল পিয়ের। "...চল, ওই পুকুরের কাছে তো চল, মনে হয় ওরা ওখানেই কোথাও বসে লুকিয়ে প্রেম করছে!" "....কিন্তু এখান থেকে পুকুরের ওদিকটায় পৌঁছনোর তো কোনো রাস্তা চোখে পড়ছে না!" "....কিন্তু যেভাবে হোক আমাদের ওদের খুঁজে বের করতেই হবে, নইলে এই শীতের রাতে বেরিয়েছি কেন!" "....ইশশ! আর তর সইছে না আমার...এতক্ষণে হয়তো জিন মেয়েটার গা থেকে অর্ধেক কাপড় খুলে ফেলেছে! আমি না দেখেও দেখতে পাচ্ছি...খুব মিস করছি টেলিস্কোপের হট সিন'টা....!" "...সে সব তো পরের কথা", বিরস মুখে বলল আন্দ্রে, "আগে তো আমাদের ওদের কাছে পৌঁছতে হবে। আমাদের এমনভাবে লুকিয়ে যেতে হবে যেন ওরা কেউ টের না পায়।" "...উফফ...আমার আর সত্যিই তর সইছে না। অ্যানার খাড়া খাড়া ওই বুক'দুটো দেখার জন্য এত অপেক্ষা আর পোষাচ্ছে না। আমার ব্লাডপ্রেশার চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে..... পিয়েরের কথার মাঝেই ওদের আশপাশটা হঠাৎ আরও বেশীরকম নিস্তব্ধ হয়ে এলো। আর তারপরেই নিস্তব্ধ রাত কেঁপে উঠল একটা ভয়ঙ্কর, রক্তজল করা জান্তব গর্জনে। সে এমনই এক অপার্থিব ভয়াল গর্জন যে তা শুনলে বুকের রক্ত জল হয়ে যায় নিমেষে। গর্জনটা পাহাড়ের শিখরে শিখরে ধাক্কা খেয়ে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেল। বহুক্ষণ পর্যন্ত তার রেশ লেগে রইল। পিয়ের এবং আন্দ্রে দুজনেই ভীষণভাবে চমকে উঠেছিল। ব্যাপারটা কি হলো - সেটা বুঝতেই খানিকটা সময় কেটে গেল ওদের। দুজনেই প্রথমটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যারপরনাই হতভম্ব হয়ে এদিকওদিক চাইতে লাগল। মুখটা হাঁ হয়ে রইল ওদের সামান্য। "....কিসের গর্জন ওটা?" খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত, খানিকটা হতভম্ব গলায় জিজ্ঞেস করল আন্দ্রে। সত্যিই, গর্জনটা সত্যিই ওদের যতখানি না ভয় পাইয়ে দিয়েছে, তার চেয়েও বেশী বিস্মিত করেছে। এটা কোনো পশুর গর্জন হলেও সেটা যে কোন পশু, তা ওরা ঠিক ধরতে পারল না। কারণ এরকম কোনো পশুর গর্জনের সাথে ওদের আজন্ম পরিচিতি নেই। এটা সম্পূর্ণ অচেনা একটা পশুর ডাক। কিন্তু তা হলেও গর্জনটার রেশ এখনও ওদের কানে লেগে রয়েছে এবং থেকে থেকে বুকের ভেতরে হৃদপিন্ডটা লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে। মনে হলো, গর্জনটা যে পশুটার গলা দিয়ে বেরলো, সে ওদের থেকে খুব একটা কাছে নেই কিন্তু তা হলেও খুব একটা দূরেও নেই। আকাশের দিকে মুখ তুলল পিয়ের। চাঁদ এখন ওদের মাথার ঠিক ওপরে স্বমহিমায় বিরাজমান। "...জে-রাউজ...জে-রাউজ" শব্দটা বার দুই উচ্চারণ করল পিয়ের, "লাল দুটো চোখ...হাইতির সেই ওয়্যারউলফ নয় তো?!!!"....শেষের কথাটা খানিকটা বিড়বিড় করে কতকটা আপন মনেই বলল যেন। হাইতির প্রত্যেকটি শিশু জন্মলগ্ন থেকে তাদের মায়ের কাছে হাইতির পাহাড়ের ওয়্যারউলফ নিয়ে কাহিনী শুনে আসছে। এখানকার কাচ্চাবাচ্চা সবাই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে, এখানকার পাহাড়ে নাকি একটা ভয়ঙ্কর বিশাল ওয়্যারউলফ বাস করে। যদিও তাকে আজ পর্যন্ত স্বচক্ষে কেউ দেখেনি। সেই ওয়্যারউলফ'টা নাকি শিশু এবং অল্পবয়সী কিশোর-কিশোরী দেখলেই তাদের তার শিকার বানায়। আন্দ্রে এবং পিয়েরও শিশুবয়স থেকে তাদের বাবা-চাচাদের মুখে এই কাহিনী শুনে আসছে, যদিও তারা অন্যদের মতো তেমন বিশ্বাস টিশ্বাস করে না। কিন্তু আজ এই ভরা পূর্ণিমার রাতে একাকী এই নির্জন পাহাড় জঙ্গলের মাঝে দাঁড়িয়ে পিয়েরের মুখ থেকে ওয়্যারউলফের কাহিনী শুনে আন্দ্রে যেন আকাশ থেকে পড়ল। ও আরও একবার এদিকওদিক চেয়ে দেখতে লাগল কিন্তু আশেপাশে তাকিয়ে মনে ভয় জাগতে পারে এমন কোনও কিছুই নজরে পড়ল না। শুধু চাঁদের আলোয় কাছেই বনের ভেতর গাছের ডালপালাগুলোর বাতাসে দোল খাওয়া ছাড়া আর কিছু গোচরে এলো না ওর। ঠিক এইসময়েই আবার ভেসে এলো সেই হাড়হিম করা গর্জন! এবার মনে হলো যেন আগের চেয়ে একটু কাছে এগিয়ে এসেছে ওটা! পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলছে সেই ভয়াল গর্জন। আন্দ্রে এবং পিয়ার্স এবার সত্যি সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। ওরা এবার ছুটতে শুরু করল। প্রায় উদ্দেশ্যহীনভাবে। ছোটখাটো ঝোপঝাড়গুলো পেরিয়ে ওরা পড়িমরি ছুটতে শুরু করল। আন্দ্রে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিল সামনের দিকে, ওকে অনুসরন করে পেছনে পেছনে ছুটে আসছিল পিয়ের। ডাইনে-বামে, সামনে পেছনে না তাকিয়ে ছুটছে ওরা, এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি পথ বেয়ে। ....সহসা পেছন থেকে একটা 'ধপাস' করে একটা ভারী শব্দ কানে এলো ছুটন্ত আন্দ্রের। যেন মোটজাতীয় কোনও কিছু পড়ে গেল নিচে। তারপরেই শুনতে পেলো পিয়ারের গলায় আর্তনাদ। আপনা থেকেই ছোটা থামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে। দেখল, পিয়ের উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে আছে, ধুলো আর ঘাসে গড়াগড়ি খাচ্ছে শরীরটা। ওঃ হো! বেচারা পিয়ের! ছুটতে গিয়ে পড়ে গেছে! ওকে সাহায্য করার জন্য ওর দিকে এগিয়ে গেল আন্দ্রে। গর্জনটা তখন আর শোনা যাচ্ছে না, কোনো ওয়্যারউলফের টিকিও কোথাও নজরে পড়ছে না। তবু একটা অজানা আশঙ্কায় থেকে থেকে কেঁপে উঠছে আন্দ্রের মন'টা। কিন্তু ওর সঙ্গী যখন বিপন্ন তখন তাকে এ অবস্থায় একলা ফেলে পালাতেও বিবেকে বাধছে ওর। তাই ও সবকিছু ভুলে এগিয়ে গেল বিপন্ন পিয়েরকে সাহায্য করতে। "....ওঠ, পিয়ের", বন্ধুর হাত ধরে তাকে কোনওরকমে মাটি থেকে তুলে উঠিয়ে দাঁড় করাতে করাতে বলল আন্দ্রে, "জলদি ভাগ এখান থেকে। মনে হচ্ছে এখানে গতিক সুবিধের নয়"। ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে পিয়েরের। ভীষণ হাঁফাচ্ছে ও। বুকটা ঘন ঘন ওঠানামা করছে। আন্দ্রে ওর কবজি শক্ত হাতে চেপে ধরে না রাখলে বোধহয় ও উঠে দাঁড়াতেই পারত না। "...পিয়ের!" ফের চাপা গলায় ডেকে উঠল আন্দ্রে, "জলদি ভাগ এখান থেকে! এখানে পড়ে থাকলে চলবে না...!" অনিচ্ছাস্বত্তেও পিয়েরকে আন্দ্রের তালে তাল মিলিয়ে ছোটা শুরু করতে হলো, যদিও ওর শরীর সাড়া দিচ্ছিল না মোটেও। একেই এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি রাস্তায় পড়ে হাত এবং পায়ের জায়গায় জায়গায় ছড়ে গিয়ে যন্ত্রণা হচ্ছে খুব, তার ওপর আবার দ্রুত ছোটা শুরু করায় রক্তক্ষরণের বেগ আরও বেড়ে গেল ওর। যন্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল পিয়েরের। আর ছুটতে পারল না সে। দাঁড়িয়ে পড়ল। ওরা তখন পাহাড়চূড়ার বিপরীত দিকে আরেকটা বনের ভেতর প্রবেশ করেছে। গাছপালার জটলার ফলে জায়গাটা আধো আলো আধো অন্ধকারে ঢাকা। "....দাঁড়া!" হাঁফিয়ে উঠে বলল পিয়ের, "আর পারছি না..." আন্দ্রেকে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো। "...খুব যন্ত্রণা হচ্ছে পায়ে..." অস্ফুট গোঙানির মতো করে বলল পিয়ের, "একটু দম নিতে দে...."। আন্দ্রে দেখল, মুখ হাঁ করে দম নেবার চেষ্টা করছে পিয়ের। এই শীতেও ঘামে ভিজে গিয়েছে সর্বাঙ্গ। গায়ের জামাটা লেপ্টে গিয়েছে গায়ের সঙ্গে। যন্ত্রণায়, ক্লান্তিতে ওর শরীর যেন ভেঙে পড়ছে। আন্দ্রের ভেতরে আসন্ন বিপদের উত্তেজনা, উৎকন্ঠা দুটোই বেড়ে গিয়েছে। বার বার সে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এদিকওদিক দেখছে, কেউ বা কিছু ওদের সামনে পেছনে আসছে কিনা। কিন্তু চাঁদের আলো আর গাছপালা ছাড়া এখনও কোনও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি ওর। সেই গর্জনটাও আর এখনো পর্যন্ত কানে আসেনি। মনে মনে এই ভেবে নিজেকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করতে করতে আন্দ্রে এদিকে ফিরেছে, একেবারে পিয়েরের মুখোমুখি, আর তারপরেই...প্রচণ্ড একটা হোঁচট খেয়ে ও কয়েক হাত পিছিয়ে গেল। হৃদপিন্ডটা যেন একবার থমকে গিয়েই পরমূহুর্তেই রেসের ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করে দিল। হাত-পা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল, শ্বাসপ্রশ্বাস হলো দ্রুততর। আন্দ্রে দেখল, পিয়েরের ঠিক পেছনে, গাছপালার ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে দুটো লাল আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। বিন্দুদুটো ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে। বনের গাছপালার অন্ধকারে গা মিশিয়ে অতিকায় বিশাল ঘন কালো একটা কিছু যেন এদিকে এগিয়ে আসছে এবং ওই লাল বিন্দুদুটো সেই অদেখা জিনিসটারই চোখ! আন্দ্রে মূহুর্তে যেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হা ঈশ্বর ! ওটা কি! মুখ দিয়ে বোধহয় একটা চিৎকার বেরিয়ে আসতে গিয়েও বের হলো না। চিৎকারটা গলার কাছেই আটকে রইল। শুধু মুখটা ঈষৎ হাঁ হয়ে রইল। তখনিই আবার কানে এলো সেই গর্জন! তবে আগের মতো অতটা উচ্চৈঃস্বরে নয়। চাপা, ক্রুদ্ধ গর্জন। কিন্তু তাতেও আন্দ্রের মনে হলো, ওর বুকের ভেতর যেন বর্ষার ঘন জলভরা মেঘ ডেকে উঠল গুড়গুড় করে। "....পিয়ের?" আচমকা যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো আন্দ্রে, তারপরেই বন্ধুকে সাবধান করে দিতে গিয়ে চিৎকার করে উঠতে গেল। কিন্তু পিয়েরের ততক্ষণে সাড়া দেবার ক্ষমতা চলে গিয়েছে। ততক্ষণে বিকট একটা গর্জনে বনভূমি কাঁপিয়ে সেই অতিকায় জিনিসটা পিয়েরের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে। একটা ভয়ঙ্কর গর্জন আর সাথে সাথে একটা দূর্বল ক্ষীণ গলায় আর্তনাদ... ব্যস, আর কিছু শুনতে পেলো না আন্দ্রে। কারণ তার মাথা তখন প্রায় অর্ধেক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু ওর নির্নিমেষ চোখদুটো চেয়ে রইল, পিয়েরের দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া দৈত্যাকার জীবটার দিকে। সে তখন পিয়েরের ওপর চেপে বসে ওর ঘাড়টাকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে। বাঘ যেমন শিকারের ঘাড় কামড়ে ধরে ঝাঁকানি দেয়, ঠিক তেমনি করে এই ভয়াবহ জীবটাও পিয়েরের ঘাড় কামড়ে ধরে এদিকওদিক ঝাঁকুনি দিতে লাগল। প্রবলভাবে, নির্দয়ভাবে। পিয়েরের ওকে বাধা দেবার সামান্যতম ক্ষমতাও দেখা যাচ্ছে না। দেখতে দেখতে আন্দ্রের বিহ্বল চোখের সামনেই পিয়েরের একটা হাত আয়েশ করে চিবোতে শুরু করে দিল ভয়াবহ জন্তুটা। অন্ধকারের বুক থেকে হাড় চেবানোর খটরমটর শব্দ শোনা গেল। বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠে আন্দ্রে 'পিয়ের..পিয়ের..' বলে উন্মাদের মতো চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল পিয়েরের দেহের যেটুকু বাইরে বেরিয়ে আছে, তার ওপর। ওর অন্য একটা হাত ধরে উন্মাদের মতো টানাটানি শুরু করে দিল আন্দ্রে। ওদিকে, সেই ভয়াবহ জীবটা একবার শুধু তাচ্ছিল্যভরে আন্দ্রের দিকে তাকাল, তারপরেই ফের মনোযোগ দিল পিয়েরের দিকে। ওটার জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল চোখ আর কালো লোমাবৃত বিশাল শরীরটা আন্দ্রেকে মূহুর্তে চলচ্ছক্তিহীন করে দিল। হাঁ করতেই ওটার মুখের ভেতর থেকে ঝিকিয়ে উঠল তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো ধারালো আর বিশাল দাঁতগুলো। পিয়েরের ঘাড়ে আয়েশ করে এবার কামড় বসালো ওটা। পিয়েরের মরণ আর্তনাদ এবার পরিণত হলো একটা ঘরঘর গোঙানিতে। পিয়েরের প্যান্ট ভিজে গেল উত্তপ্ত প্রস্রাবে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য আর স্বচক্ষে দাঁড়িয়ে আর দেখতে পারল না আন্দ্রে। হঠাৎ চলচ্ছক্তি ফিরে পেয়ে চোঁচা দৌড় মারল। কোথায় যাচ্ছে, কোন পথ ধরে যাচ্ছে, সে জানে না। সে শুধু ছুটছে, ছুটছে আর ছুটছে। যেন গোটা বিশ্বসংসার ওর চোখের সামনে থেকে মুছে গিয়েছে। সামনে যেন কোনওকিছুই দেখতে পারছে না ও। কোথায় পড়ছে, কোথায় মরছে সেদিকে খেয়াল নেই ওর। শুধু অন্ধের মতো দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটছে! পেছন থেকে পিয়েরের মর্মন্তুদ আর্তনাদ আর শোনা যাচ্ছে না। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটছিল আন্দ্রে। হঠাৎ একটা বড় গাছে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ে গেল সে। মূহুর্তে নাক-মুখ রক্তাক্ত হয়ে উঠল ওর। ক্ষণিকের জন্য চেতনা ফিরে পেলেও যেইমাত্র ওর চোখের সামনে পিয়েরের ছিন্নভিন্ন দেহটার দৃশ্য ভেসে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণা ভুলে ফের বিদ্যুৎগতিতে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ছুটতে শুরু করল আন্দ্রে। সামনে পাহাড়ের একটা ঢাল পড়ল। সে সেই ঢাল বেয়ে বেগে নামতে লাগল। আশেপাশে এখন আর কোনো শব্দ নেই। শুধু নিস্তব্ধ পাহাড়ে পথে ওর জুতোর শব্দ, জোরে জোরে শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ আর বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটার দুমদুম শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ ওর কানে আসছে না। ঘামে জ্যাবজ্যাব করছে সর্বাঙ্গ, জামাটা লেপ্টে গিয়েছে গায়ের সাথে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা থেকে ঝাপসা হয়ে আসছে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কতক্ষণ বেগে নামতে নামতে বেশ কিছুটা দূরে হাইতির তাঁবুগুলোকে অস্পষ্ট দেখা যেতে লাগল। দূর থেকেও চোখে পড়ল জায়গায় জায়গায় লাল লাল আগুনের আভা এবং লোকজনের অস্পষ্ট নড়াচড়া। মুখ হাঁ করে দম ছাড়ছে আন্দ্রে। যাক, এতক্ষণে বুঝি সে নিরাপদ বলয়ের কাছাকাছি এসে পড়ল। আরও কিছুটা যেতে পারলেই সে একেবারে লোকালয়ে গিয়ে পড়বে। তখন আর কোনো ভয় থাকবে না। ছোটার গতি আরও বাড়িয়ে দিল আন্দ্রে। তখনও ও জানে না, মৃত্যু ওকেও নিস্তার দেবে না, সে নিঃশব্দে ওর অনুসরণ করে আসছে। ওই গর্জনটা...ওই হাউলিং'এর শব্দ কি শহরের কারোর কানে গিয়েছে? এত জোরালো হাউলিং, যা দূর দূর পাহাড়ের গায়েও প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, তা কি ওদের শহরের সবার কানে গিয়েছে? অবশ্যই, ওই হাউলিং ওদের সবার শুনতে পাওয়ার কথা। জিন আর অ্যানা যদি পাহাড়ের ওপরে ওই পুকুরের কাছে বেড়াতে গিয়েও থাকে, ওদের তো সর্বাগ্রে শুনতে পাওয়ার কথা? হ্যাঁ, আন্দ্রের ভাবনাই সঠিক। হাইতির প্রত্যেকটা মানুষ শুনেছে ওই ভয়ঙ্কর গর্জন। প্রত্যেকেই শিহরিত হয়েছে। পাহাড়ের দিক থেকেই যে গর্জনটা এসেছে, তাতে কারোর সন্দেহ নেই। এমনকি জিন এবং অ্যানা- যারা সত্যি সত্যিই ওই পাহাড়ি পুকুরের ধারের ঝোপের আড়ালে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় বসে দুজনে দুজনার মধ্যে মগ্ন ছিল, তাদের কানেও গিয়েছে সেই গর্জন। দুজনেই সচকিত হয়ে তটস্থ হয়ে গিয়েছিল সেই শব্দে। অ্যানা কান্নাকাটি জুড়ে দিল তাড়াতাড়ি তাকে এখান থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। ওদিকে, শহরের লোকজনের মধ্যেও দেখা দিয়েছে একটা প্রবল উত্তেজনা। সবাই বেরিয়ে এসেছে তাঁবুর বাইরে। সকলেরই উৎসুক চোখ পাহাড়ের দিকে, কারণ ওদিক থেকেই এসেছে শব্দটা। তৃতীয় গর্জনটা শোনা গেল তার মিনিট পাঁচেকের মাথায়। হাইতির লোক আর অপেক্ষা করল না। সবাই যে যার তাঁবুর আশ্রয় ছেড়ে সদলবলে ছুটতে লাগল পাহাড়ের পথে। সমতল পথ ছেড়ে পার্বত্য পথ ধরে কিছুদূর যেতেই থমকে গেল ভিড়টা। দেখল, নুড়িকাঁকর বিছানো পার্বত্য পথের ওপর পড়ে রয়েছে একজন মানুষের ছিন্নভিন্ন দেহ। সবাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল সেদিকে। পূর্ণিমার কল্যানে সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তাছাড়া, এই পাহাড়ি পথে গাছপালা ঝোপঝাড় একেবারেই না থাকায় আরও স্পষ্টভাবে সবকিছু দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। তাই আন্দ্রের ছিন্নভিন্ন দেহটা ওরা সহজেই শনাক্ত করতে পারল। আন্দ্রেকে হাইতির সবাই চিনত। গত বছরের ভূমিকম্প ছেলেটির মা-বাবাকে কেড়ে নিয়েছিল। তারই ছিন্নভিন্ন দেহ এভাবে পাহাড়ি পথে পড়ে থাকতে দেখে ওদের বিস্ময়ের সীমা রইল না। আবালবৃদ্ধবনিতা যারাই ছিল ভিড়ের মধ্যে, সবাই কিছুক্ষণ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কারোর মুখ দিয়ে কিছুক্ষণ কোনও কথা সরল না। গত বছরের ভূমিকম্পের ভয়াবহ স্মৃতি এখনও সবার মনে দগদগে ক্ষতের মতো এখনও বর্তমান, তারই রেশ কাটতে না কাটতেই আবার এই ভয়াবহ মৃত্যু! সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। আন্দ্রের ছিন্নভিন্ন শরীরটার কে যেন অর্ধেক খেয়ে গেছে। বুকের খাঁচাটাকে কোনো হিংস্র জন্তু যেন দু'ভাগে চিরে ফেলেছে। পথের ওপর রক্তের নদী বইছে। ভিড়ের মধ্যে একজন বৃদ্ধ লোক এই ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে তো 'ওয়াক...ওয়াক' করে বমি করতে শুরু করল। কেউ কেউ নাকে-মুখে কাপড় দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন সাহসী যুবক পাহাড়ে পথের ওপর ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলল এবং সঙ্গে সঙ্গে ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল - "দ্যাখো, দ্যাখো.. ও কি...!" ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় দেখা গেল, আন্দ্রের দেহটা যেখানে পড়ে আছে, সেখান থেকে রক্তের একটা সরু রেখা ক্রমশ নেমে এসে চলে গিয়েছে লোকালয়ের দিকে। শুধু রক্তরেখাই নয়, কোনো অতিকায় জন্তুর বড় বড় পায়ের থাবাও ক্রমশ এগিয়ে গিয়েছে সেই 'ট্রেইল' ধরে। আতঙ্কের মেঘ দেখা দিল সকলের মনের মধ্যে। ওরা দুরুদুরু বক্ষে সেই ট্রেইল ধরে পিছাতে লাগল। সেই ভয়াবহ থাবা এবং রক্তরেখা ক্রমে নেমে এসে শেষ হয়েছে লোকালয়ের একেবারে শেষপ্রান্তে একটা ছোট তাঁবুর কাছে। এটাই হাইতির জনপদের সর্বশেষ তাঁবু। এরপর থেকেই লোকালয়ের শেষ, পাহাড়ের শুরু; বরং উল্টোভাবে বললে পাহাড়ে পথের শেষ, লোকালয়ের শুরু। ভিড়টা এসে থামল সেই তাঁবুর কাছে। ভেতরটায় কালিগোলা অন্ধকার। এক চিলতে আলোও কোথাও নেই। তাঁবুটার কাছে এসে সবার মধ্যে এবার 'কি করি...কি করি..' ভাব দেখা গেল। ভেতরে ঢুকে যে কেউ দেখবে, সে সাহস কারোর নেই। কয়েকজন যুবক এবার সাহস করে তাঁবুর ভেতরে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলল। সেই সূচীভেদ্য অন্ধকার ভেদ করে সেই আলো গিয়ে পড়ল তাঁবুর ভেতরে। যে মানুষটিকে নির্বিকারভাবে ভেতরে ঘুমিয়ে থাকতে দেখা গেল, তাকে এই এলাকার সবাই চিনলেও, তার সাথে এখানকার কারোর ঘনিষ্ঠতা ছিল না। আন্দ্রের সঙ্গেও এর কোনো পরিচিতি বা হৃদ্যতা ছিল না। তাঁবুর ভেতরে একটা মোটা কম্বলের ভেতর সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় টান টান হয়ে শুয়ে দিবানিদ্রা দিচ্ছিল সিডাউ মার্চ্যান্ড। ভিড়টা যখন সিডাউ'য়ের তাঁবুর সামনে এসে দাঁড়াল, ভেতরে ফ্ল্যাশলাইটের আলো ফেলে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল, তখন তার দিবানিদ্রা ভঙ্গ হচ্ছে সবে। আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করেছে সবে শরীরটা। সবাই বিস্মিত, ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল আধো ঘুমন্ত লোকটির দিকে। সিডাউয়ের দেহের জায়গায় জায়গায় রক্তের দাগ কারোর নজর এড়াল না। তাঁবুর ভেতর সিডাউ ছাড়াও তার গৃহস্থালির জিনিস বলতে কয়েকটা মাটির পাত্র, কতগুলো মুরগীর পালক, একটা মানুষের মাথার খুলি আর একটা নেকড়ের ছোট কাঠের মূর্তি। ব্যস, এছাড়া আর কিছু নেই। সিডাউ ততক্ষণে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে বসেছে। তার তাঁবুর সামনে এতগুলো মানুষের ভিড় দেখে প্রথমটায় সে একটু হকচকিয়ে গেল। বিস্মিত দৃষ্টিতে সবার ওপর দ্রুত নজর বোলাতে লাগল সে। যেন ব্যাপারটা কি হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছে না ও। "...জে..রাউজ!" চাপা ক্রুদ্ধ একটা গুঞ্জন উঠল ভিড়টার মধ্যে। "....জলদি!" ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলে উঠল, "তাড়াতাড়ি ওকে টেনে বের করে আনো...ও দ্রুত রূপ বদলে ফেলার আগেই ওর ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে!" সবাই মিলে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে সিডাউ মার্চ্যান্ড'কে হিড়হিড় করে টেনে বের করে আনল। তারপর ওকে টানতে টানতে নিয়ে গেল কাছেই একটা বড় গাছের তলায়। চলল বেদম প্রহার। কয়েকজন মোটা রজ্জু দিয়ে ওর হাত-পা বেঁধে ফেলল। বাকি'রা ওর গলায় রজ্জু বেঁধে তারপর ওকে ঝুলিয়ে দিল গাছের একটা উঁচু ডালের সাথে। ওর পায়ের নিচে রাখা হলো একটা ছোট কাঠের টুল জাতীয় জিনিস। যখন সবাই নিশ্চিত হলো যে সবকিছু ঠিকমতো করা হয়েছে তখন ভিড়ের মধ্য থেকে একজন এগিয়ে এসে লাথি মেরে টুলটাকে ঠেলে ফেলে দিতেই সিডাউ'য়ের দেহটা ঝুলে পড়ল শূন্যে। 'মট' শব্দ করে ঘাড়টা ভেঙে একদিকে কাত হয়ে আলগাভাবে ঝুলতে লাগল। জিভের ওপর দাঁতের চাপ পড়ে জিভ কেটে টুপটাপ করে রক্ত ঝরতে লাগল। শূন্যে ডাইনে-বামে দোল খেতে লাগল সিডাউ মার্চ্যান্ডের নিষ্প্রাণ দেহটা। দারুণ মুখরোচক একটা খবর।। ৪ নং রাস্তা থেকে ডানদিকে টার্ন নিয়ে নিউ জার্সির টিনেকের দিকে গাড়ি ঘুরিয়ে দিল আশার গ্রীণ। টিনেকে ওর সাবেক বাড়ি। যদিও এখানে আসতে গ্রীণের একেবারেই ভালো লাগে না, কারণ এখানে এলেই ওর মনে হয় ওর সাবেক বাড়িটা ওকে দেখে যেন দুয়ো দিচ্ছে, তাকে নিয়ে নিষ্ঠুর ঠাট্টা করছে। সময়টা এখন পড়ন্ত বিকেল। সূর্য পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে প্রায় ডুবুডুবু কিন্তু মেঘের আড়ালে সূর্য প্রায় ঢাকা পড়ে পড়ে থাকায় গোধূলি বেলার সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছে না। এখন শীতকাল তাই গাছগুলোর সব পাতা ঝরে গিয়ে ন্যাড়া ডালগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কঙ্কালের সরু সরু হাড়সর্বস্ব হাত বেরিয়ে রয়েছে কবরের মাটি ফুঁড়ে। সামনেই বড়দিন, তাই শীতটাও পড়েছে এখন বেশ জমিয়ে। দিনের বেলাতেও হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ইদানীং দু'সপ্তাহ ধরে রোজ তুষারপাত হচ্ছে। সে কি তুষারপাত, মনে হচ্ছে না কোনওদিন এর থেকে রেহাই মিলবে। এমনিতে শীতকাল খুব একটা খারাপ লাগে না গ্রীণের কিন্তু গত বছরে স্ত্রী'র সঙ্গে ওর ডিভোর্স হয়ে যাওয়াটা ওকে একটা বড় ধাক্কা দিয়েছে। তাই এবারের শীতকালটা ও কিভাবে এনজয় করবে, কিছুতেই বুঝতে পারছে না গ্রীণ। এবারের এই শীতকালটা ওর বেশ দুর্দশায় কাটবে, বোঝাই যাচ্ছে। লেপ যতই আরামদায়ক হোক, তার তলায় উপযুক্ত সঙ্গিনী না পেলে শীতকালের মজাটা'ই যে মাটি! এবারের শীত গোড়া থেকেই ওকে বেশ কাবু করে ফেলেছে। নানারকম অদ্ভুত অদ্ভুত উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, অফিস যেতে ইচ্ছে করে না। খালি মনে হয় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। শুয়ে থাকবে সেই বসন্তকাল না আসা পর্যন্ত। এবারের ঠাণ্ডাটা ওকে যেন জমিয়ে দিচ্ছে। ...সাত-পাঁচ নানারকম ভাবনার মাঝে গাড়িটাকে সে ঘুরিয়ে দিল ওল্ড স্ট্রিটের দিকে। ওই তো দেখা যাচ্ছে তার সাবেক বাড়ি। পুরনো দিনের সাদা বাড়িটা! এখান থেকেই কি দারুণ দেখাচ্ছে। এমনিতেও এখানকার লোকালিটি'টাও ভারী চমৎকার। চওড়া রাস্তা, বাড়িগুলো যথেষ্ট তফাতে। বাচ্চাদের খেলবার পর্যাপ্ত জায়গা সবকিছুই আছে। গাড়িটা ড্রাইভওয়েতে ঢুকিয়ে এক জায়গায় পার্ক করতে করতে ও দেখতে পেলো, প্রতিবেশীদের বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো মহানন্দে ছোটাছুটি করে খেলছে। ড্রাইভওয়েতে বরফ জমেছিল, তার ওপর দিয়ে গ্রীণের গাড়ির চাকাগুলো যেন স্লিপ খেয়ে গেল। এককোণে নিজের চার চাকার বাহনটাকে গ্যারেজ করাল গ্রীণ। গাড়ি থেকে নেমে এলো গ্রীণ, জ্যাকেটের কলারটাকে গলা পর্যন্ত টেনে নিতে নিতে নিজের সাবেক বাড়িটার দিকে এগোতে লাগল সে। ওর বাড়িটা দোতলা। ল্যান্ডিংয়ের সিঁড়িটা মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত টানা লম্বা। রোদ থাকলে কাঁচের মধ্য দিয়ে রোদ বাড়ির ভেতর ঢুকে খেলা করে। কিন্তু মেঘলা দিনের জন্য কাঁচের ওপিঠ'টায় মনে হচ্ছে চাপ চাপ অন্ধকার। সিঁড়ির জানলার দিকে চোখ পড়তে গ্রীণ হঠাৎ থমকে গেল যেন। একটা ছায়াকে খুব দ্রুত সরে যেতে দেখল। কেউ কি ওর আগমন লক্ষ্য করছিল? হ্যাঁ, হতে পারে খুব সম্ভব ওর ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ হয়তো দাঁড়িয়েছিল জানলায়। ওর সাবেক স্ত্রী ভেলেরি এবং সন্তানরা হয়তো এখন এ বাড়িতেই আছে। কিন্তু যদি বাড়িটা পরিত্যক্ত হয়ে থাকে তবে ব্যাপারটা ওর পক্ষে সত্যিই খুব চিন্তার ব্যাপার। দোটানায় দুলতে দুলতে আশার গ্রীণ ওর সাবেক বাড়ির দরজায় এসে নক করল। আশা, ভেতরে যদি ভেলেরি এবং ছেলেমেয়ে যদি সত্যিই থেকে থাকে তাহলে অবশ্যই এসে দরজা খুলে দেবে। কিন্তু আধ মিনিট কেটে গেলেও কেউ দরজা খুলল না। এবার দরজার পাশে কলিংবেলের বাটনে জোরে চাপ দিল গ্রীণ। শুনতে পেলো, ভেতরে বেল বেজে উঠল। তিরিশ সেকেন্ডের মাথায় ভেতর থেকে দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেলো গ্রীণ। দরজা খুলে যে দাঁড়াল, সে ভেলেরি ছাড়া আর কেউ নয়। আজ ওর পরনে ধূসর রঙের একটা গাউন আর সাদা সিল্কের ব্লাউজ। বাইরে গ্রীনকে দেখেই ওর মুখে একটা চাপা বিরক্তির ভাব ফুটে উঠল। "...কেন এসেছ আবার এখানে?" স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ স্বর ফুটে উঠল ভেলেরির গলায়। প্রাক্তন স্বামীকে ভেতরে আপ্যায়ন করার কোনও মানসিকতাই দেখা গেল না ওর ভেতরে। "...তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমি কেন এসেছি এখানে", যতদূর সম্ভব নিজেকে সংযত রেখে বলল গ্রীণ। এমন কিছু ওর গলার স্বরে প্রকাশ পেলো না যাতে ভেলেরির মেজাজ আরও সপ্তমে চড়ে যায়। গ্রীণ বলল, "আমি এসেছি আমার বাচ্চাদের এখান থেকে নিয়ে যেতে"। "...ওরা এখানে নেই", সোজাসাপটা গলায় বলল ভেলেরি, "তুমি ভালো করেই জানো সেটা"। "....না, আমি জানি না", আগের মতোই যতদূর সম্ভব গলার স্বর সংযত রেখে বলল গ্রীণ, "ওরা কোথায় থাকতে পারে, তা-ও আমার জানা নেই। কিন্তু আমি এখন ওদের নিয়ে যেতে এসেছি। ওদের ওপর আমার আইনত অধিকার আছে"। সদর দরজাটা অল্প করে ভেজিয়ে রেখে গ্রীণের সাথে কথা বলছিল ভেলেরি। গ্রীণ বাচ্চাদের এখান থেকে নিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বুঝতে পেরে ভেলেরির মুখে এবার তীব্র একটা অসন্তোষের ভাব ফুটে উঠল। বলল, "এই উইকেন্ডে তুমি ওদের সঙ্গ পাবে না, গ্রীণ। ওরা এই উইকেন্ড'টা ওদের মামার বাড়িতে কাটাবে"। আশার গ্রীণ অনুভব করল, ধীরেধীরে ওর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। তবু সে সংযম হারাল না। বলল, "এটা তো কথা ছিল না। প্রত্যেক উইকেন্ডে ওরা আমার সঙ্গে কাটাবে, আমার কাছে থাকবে - এমনটাই তো কথা ছিল। আমাদের ডিভোর্সের সময় জজসাহেব এমনটাই বলেছিলেন, আশা করি মনে আছে তোমার। কিন্তু তুমি এখন আইনের শর্ত ভাঙছ দেখে আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি!" "...কিন্তু নিজের নানীর সঙ্গে তাই বলে ওরা দেখা করবে না?" বলল ভেলেরি, "উইকেন্ড এলেই তোমার সাথে ওদের কাটাতেই হবে, এমন strictly তো কিছু বলা হয় নি!" "....আমি এসব জানি না", এবার সটান দৃঢ় গলায় বলল গ্রীণ, "এই উইকেন্ডে ওদের যে মামার বাড়ি পাঠানো হচ্ছে, এ খবর তুমি আগে আমায় দিয়েছিলে? আমায় তো এ ব্যাপারে কিছুই জানাওনি।" "...সব জানিয়েছিলাম...ই-মেলেই তোমায় জানিয়েছিলাম" বলতে বলতে গ্রীণের মুখের ওপরেই দরজা সজোরে বন্ধ করে দিতে গেল ভেলেরি। "...আমি কোনো ই-মেল পাইনি", গ্রীণের কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে দৃঢ় শোনালেও অদ্ভুত রকম শান্ত। দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফের সামান্য একটু ফাঁক হলো, ভেলেরির মুখটা সামান্য বেরিয়ে এলো বাইরে। বলল, "আমি ই-মেল পাঠিয়েছিলাম। তুমি যদি না চেক করো, তাহলে সেটা আমার প্রবলেম নয়। " "...আমি আমার ইনবক্সের প্রত্যেকটা ই-মেল চেক করেছিলাম", দাঁতে দাঁত চেপে বলল গ্রীণ, "কিন্তু তোমার একটা ই-মেলও আমার চোখে পড়েনি, কারণ তুমি আদৌ কোনো ই-মেল আমায় পাঠাওনি। আমাকে বোকা বানাবার চেষ্টা কোরো না"। "...দ্যাখো.." এবার গলার স্বর চড়ে গেল ভেলেরির, "আমি তোমার এসব ফালতু কথা শুনতে এখানে দাঁড়িয়ে নেই", বলেই দরজাটা আবার সজোরে বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল সে কিন্তু পারল না। গ্রীণের বুটের এক লাথিতে দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। ভেলেরি ছিটকে পিছিয়ে গেল দরজার সামনে থেকে। গ্রীণের কাছ থেকে হঠাৎ এরকম ব্যবহার পাবে, কল্পনাও করতে পারেনি সে। দরজাটা পুরো খুলে যেতেই গ্রীন সদর্পে ভেতরে প্রবেশ করল। ওকে বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেখে একইসঙ্গে ঘৃণা এবং ক্রোধ উপচে পড়ল ভেলেরির মুখেচোখে। চিৎকার করে বলল, "বেরিয়ে যাও বলছি আমার বাড়ি থেকে!...আমার বাড়ি এটা কারণ আমি এখন এর মেইন্টেনান্স 'পে' করি"। "...ডিভোর্সের সময় জজ এমন কথা মোটেও বলেন নি"। শান্ত স্বরে বলল গ্রীণ। "...তুমি জজের কথা কিছুই শোনোনি, তার মানে...!" ভেলেরির কণ্ঠস্বর ক্রমশ চড়ছিল। "...বললেই কি আর না বললেই কি...তিনি এ ব্যাপারে নাক গলাবেন না!" "...দেখো!" উত্তেজনায়, সীমাহীন ক্রোধে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলতে লাগল ভেলেরি, "তুমি যদি এখুনি এই বাড়ি ছেড়ে না বেরোও, আমি কিন্তু পুলিশ ডাকব!!" এবার একটু থমকে গেল গ্রীণ। নির্লিপ্ত চোখে একবার তাকাল ওপরতলার দিকে। তারপর ভেলেরির দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, তুমি কিসের জন্য এত ভয় পাচ্ছ, বলো তো? তুমি আর রালফ বিয়ে করেছ এবং একসঙ্গে এ বাড়িতে বসবাস করছ, এটা আমি দেখে ফেলব, জেনে ফেলব এই ভয়ে? রালফের সাথে লুকিয়ে বিয়েটা সেরে ফেলেছ বলেই হয়তো এখন আর নিজের ভরণপোষণের জন্য আমার সাহায্য দরকার নেই, তাই তো?" বলেই গ্রীণ ওপরতলার দিকে চেয়ে উঁচু গলায় ডেকে উঠল, "রালফ! আছো নাকি? " অসহ্য লাগল এবার ভেলেরির। রাগে-বিরক্তিতে ফেটে পড়ে বলল, "যথেষ্ট হয়েছে। এবার আমি পুলিশ ডাকছি!" বলেই দৌড়ে চলে গেল ওয়াল-ফোনটার দিকে। রিসিভার কানে লাগিয়ে একটা নম্বর ডায়াল করতে লাগল। ব্যাপারটাকে পাত্তা দিল না আশার গ্রীণ। লাথি মেরে পেছনে সদর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে হলওয়ের দিকে কিছুটা এগিয়ে আসতে আসতে বলল, "কি বলবে তুমি পুলিশকে? বলবে, 'অফিসার, দেখুন না..আমি বাচ্চাদের লুকিয়ে রেখেছি বলে আমার হাজব্যান্ড খুব আপসেট হয়ে পড়েছে - এই বলবে?" ভেলেরিকে লক্ষ্য করে ইনিয়েবিনিয়ে কথাগুলো বলল গ্রীন। গ্রীণের কথাগুলো কানেও তুলল না ভেলেরি। ওপ্রান্তে ফোন রিসিভ হতেই সে কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব দৃঢ় করে বলল, "হ্যালো, অফিসার? দেখুন না...আমার এক্স-হাজব্যান্ড জোর জবরদস্তি আমার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে.."। ভেলেরির কথাগুলোকে কেমন যেন ফাঁকা আওয়াজের মতো শোনাচ্ছিল। হাস্যকরও শুনতে লাগছিল। গ্রীন স্পষ্টই বুঝতে পারছিল, ওপ্রান্তে আসলে কেউই ফোন ধরেনি। ভেলেরি জাস্ট ওর সাথে চালাকি করছে। ও ভাবছে, এইরকম একটা পন্থা নিলে যদি গ্রীন পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। মূর্খ ভেলেরি ! ও জানে না, গ্রীণ ওর সব চালাকি ধরে ফেলেছে। তাই ঠোঁটের গোড়ায় একটা ব্যাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, "ওদের আরও বলো যে আমি তোমায় খুন করার হুমকি দিচ্ছি!" তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে হাসতে গ্রীণ আরও বলল, "এটাও বলো যে মিঃ আশার গ্রীণ এখন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট'কেও প্রাণে মারার চেষ্টায় আছে। তাহলে ব্যাপারটা আরও জমবে"....মজাচ্ছলে কথাগুলো বলতে বলতে গ্রীণ কাছেই একটা সোফায় বসে গা এলিয়ে দিল। পা দুটো ক্রশ করে বসে অদূরে ফোনে বাক্যালাপরত ভেলেরিকে লক্ষ্য করতে লাগল। "...প্লিজ অফিসার...জলদি আসুন...ও কিন্তু ক্রমশ আরও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠেছে!" অধৈর্য গলায় বলে উঠল ভেলেরি। তারপর ওপ্রান্তে অফিসার'কে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রেখে দিল। এবার ঘুরে তাকাল সোফায় পা ক্রশ করে আয়েশ করে বসে থাকা আশার গ্রীণের দিকে। ওর দিকে চেয়ে কঠিন স্বরে বলল, "পুলিশ আসছে। এবার জেলের ঘানি টানার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকো"। ভেলেরির তীক্ষ্ণ স্বরে বলা কথাগুলো একটুও বিচলিত করতে পারল না আশার গ্রীনকে। বরঞ্চ ঠোঁটের গোড়ায় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে একটু হেসে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল, "আসুক। নিশ্চয়ই আসবে ওরা" "...হ্যাঁ, আসবেই তো...এবার দ্যাখো আমি তোমার কি হাল করি!" বেপরোয়া একটা ক্রুদ্ধ ভাব ফুটে উঠল ভেলেরির গলায়। "....না, ব্যাপারটা তুমি যেরকম ভাবছ, সেরকম হবে না। ওদের সঙ্গে আমি একটু কার-রেস খেলব, এই আর কি! তারপর সেটা খবরের শিরোনামে উঠবে। আমি আমার ছেলেমেয়েদের গাড়িতে তুলেই তবে বাড়ি যাব", বলতে বলতে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল গ্রীণ। সদর দরজাটা খুলে বাইরে পা রাখল। ওকে অনুসরণ করে ভেলেরি একরকম ছুটে এলো। প্রায় চেঁচিয়ে বলল, "তুমি কি একটুও চাও না, বাচ্চাগুলো একটা উইকেন্ড অন্তত ওদের মামাবাড়িতে কাটাক?" ভেলেরির কথাগুলো কানে যেতেই জায়গাতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল গ্রীণ। নাঃ, ভেলেরি মেয়েটা তার জীবনে সত্যিই যেন শনি ডেকে নিয়ে এসেছে। কিভাবে ওকে কষ্ট দিতে হয়, কিভাবে জব্দ করতে হয়, তা ওর চেয়ে ভালো কেউ জানে না। আর গ্রীনকে কষ্ট দিয়ে ভেলেরি যেন মনে মনে ব্যাপারটা বেশ এনজয় করে। মনে মনে ব্যথিত হলেও বাইরে তার প্রকাশ হতে দিল না আশার গ্রীন। ভেলেরির দিকে ঘুরে বলল, "কাজটা ভালোই গুছিয়ে নিয়েছ। আমি তো এসেছিলাম আমার বাচ্চাদের খোঁজে, তোমার ওই কাকের মতো মুখটা দেখতে নয়!" বলেই আর দাঁড়াল না আশার গ্রীন। হনহন করে পা চালিয়ে দিল অন্ধকার ড্রাইভওয়ের দিকে যেখানে ওর গাড়িটা পার্ক করা আছে। পকেট থেকে চাবি বের করে যখন গাড়ির দরজা খুলছে গ্রীন তখন পেছন থেকে শুনতে পেলো, ওর উদ্দেশ্যে ভেলেরির ছুঁড়ে দেওয়া একটা ছোট্ট গালাগালি - "ফাক ইউ!" বিনিময়ে এদিকে না তাকিয়েই হাতের কড়ে আঙুলটা বেঁকিয়ে ভেলেরিকে উদ্দেশ্য করে একটা নীরব ভেংচি কাটল গ্রীন। তারপর গাড়িতে উঠে সটান স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। ছেলেমেয়েদের সাথে সেদিন আর দেখা করতে গেল না আশার গ্রীন। ভেলেরির গেমপ্ল্যানটা ভালোই খেটেছে। সে মনেপ্রাণে চাইছিল, কিভাবে ছেলেমেয়েদের সাথে গ্রীণের সম্পর্কে একটা দূরত্ব সৃষ্টি করা যায়। বাবা-সন্তানদের মধ্যে যাতে দেখা না হয়, তার জন্য চেষ্টার কসুর করেনি ভেলেরি আর তাতে ও আজ বহুলাংশে সফল হয়েছে। এরপর না জানি প্রতি উইকেন্ডে আরও কতরকম বাহানা খাড়া করবে যাতে গ্রীণের সাথে ওর সন্তানদের দেখা না হয়। গ্রীন সেটা মনে মনে ভালোই জানে। ইচ্ছে করলে গ্রীন ভেলেরির বাপের বাড়িতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের পিক আপ করে নিয়ে ভেলেরিকে জব্দ করতে পারত কিন্তু তা সে করল না। কারণ ও চায় না, নিষ্পাপ ছেলেমেয়েগুলোকে কেন্দ্র করে তার সাবেক স্ত্রী'র সঙ্গে ওর একটা অশান্তি বাধুক। তাছাড়া, ভেলেরি যেমনই মেয়ে হোক, ওর মা ট্রিশ একজন প্রকৃতই খুব ভালো মনের ভদ্রমহিলা। ভেলেরির সাথে ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি গ্রীনের সঙ্গে এখনও যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করেন এমনকি সময়ে সময়ে তার খোঁজখবরও নেন। মনে মনে ভদ্রমহিলার একটা গোপন ইচ্ছেও হয়তো আছে যে গ্রীনের সাথে তাঁর মেয়ের একদিন আবার পুনর্মিলন হবে। ওঁর মুখচোখ দেখে গ্রীণ ওঁর মনের গোপন ইচ্ছেটার কিছু কিছু আঁচ পেয়েওছে ইতিমধ্যে। তাছাড়া, ভেলেরির মা ট্রিশ একজন খুব ভালো নানী। নাতি-নাতনীদের খুবই ভালোবাসেন, যত্ন নেন। গ্রীন জানে, উইকেন্ডে ওর ছেলেমেয়েরা তাদের নানীর কাছে রয়েছে, তার মানে এই উইকেন্ড'টা তারা দারুণ এনজয় করবে। ডিজনীল্যান্ডে যাওয়া, রাইডে চড়া কত কি! গ্রীন অবশ্য কখনো বাচ্চাদের নিয়ে পাবলিক প্লেসে যায় নি। গ্রীনের কাছে, বাচ্চাদের নিয়ে উইকেন্ড কাটানো মানে উইহকেনের চার দেওয়ালের ফ্ল্যাটটার ভেতরে বসে ভিডিও গেম খেলা আর খুব বড়জোর চাইনীজ রেস্টুরেন্টে গিয়ে ডিনার খাওয়া। ব্যস, এই পর্যন্ত। কিন্তু ট্রিশের মতো একজন আপাদমস্তক ভালো, ভদ্র একজন মহিলার মেয়ে হয়ে ভেলেরি কি করে এত নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর স্বভাবের হলো, তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না গ্রীন। গাড়ি নিয়ে মেইন রাস্তায় উঠে এলো গ্রীন। অনেক বাড়িতেই এখন ক্রিসমাস ইভ উপলক্ষ্যে ক্যান্ডল লাইট ডিনার শুরু হয়ে গিয়েছে। এখন আর এসব কোনওকিছুই স্পর্শ করে না তাকে। ভেলেরি এবং তার মধ্যে পুনর্মিলনের যে আশা ভেলেরির মা দেখছেন, তা সুদূরপরাহত। গাড়ি চালাতে চালাতে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল দুটো শিশুমুখ - লেসলি এবং ক্রিশিয়ানো'র মুখ। ভেলেরি এবং গ্রীনের সন্তান। এরা জন্মাবার পর বাবার দায়িত্ব পালন করতে নিজের কেরিয়ার জীবনকে একরকম বিসর্জন দিয়েছিল গ্রীন। ছেলেমেয়ে অন্ত প্রাণ গ্রীন। এখনও পুরো সপ্তাহ সে অপেক্ষা করে থাকে, কবে উইকেন্ড আসবে, কবে আবার ওদের দেখা পাবে। কিন্তু ভেলেরি আজ ওর সেই আশায় ছাই ফেলে দিয়েছে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি একটা স্থানীয় ছোট কলেজে অধ্যাপনার পার্ট-টাইম চাকরীও জুটিয়ে নিয়েছিল গ্রীন; কিন্তু ভেলোরির সঙ্গে ডিভোর্সটা ওর জীবনে এমনভাবে তছনছ করে দিয়ে গেল যে কোনওকিছুই এখন আর ওর ঠিকঠাক চলছে না। নিউ জার্সিতে একটা খুব বড় পলিটিকাল ডিবেটের ওপর একটা কলাম লিখবে বলে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছে গ্রীন। বড় মাপের একটা সরকারী দূর্নীতি নিয়ে কলাম'টা লিখবে বলে স্থির করেছিল ও কিন্তু গোটা প্ল্যানটাই এখন ওকে প্রায় বাতিল করতে হচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন কোনো সাবজেক্ট ওকে খুঁজতে হচ্ছে। এখন এই মূহুর্তে নতুন কোনো সেমিস্টার ওর হাতে নেই, এর ওপর সন্তানদের সাথে উইকেন্ড কাটানোর সুযোগও হারাতে হলো ওকে। একটা শপিং মলের কাছে এসে গাড়িটাকে দাঁড় করাল গ্রীন। এক কাপ কফি এখন ওকে একটু চাঙ্গা করতে পারে। এঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ির চাবিটা পকেটে ভরতে ভরতে শপিং মলের লাউঞ্জের দিকে পা বাড়াল গ্রীন। কাউন্টারে এসে এক কাপ কফি আর কিছু হালকা স্ন্যাকসের অর্ডার দিয়ে গ্রীন নিজের সিটের দিকে ফিরছিল, চোখ চলে গেল ওদিকের বুকস্টোরগুলোর দিকে। বুকস্টোরগুলো একেকটা লাইব্রেরির সমান। গ্রীন জানে, এখানে বইয়ের পাশাপাশি অনেক নিউজ আর্টিকলও দেখতে পাবে সে। সারা দুনিয়ার খবরাখবর জানা যায় এইসব আর্টিকেলগুলো থেকে। তাই পায়ে পায়ে হাঁটা লাগাল বুকস্টোরগুলোর দিকে। কতকগুলো আর্টিকেল উলটে পালটে দেখে একটা কিনে ফেলল সে। দাম চুকিয়ে আর্টিকেলটা নিয়ে এসে ফিরে এলো লাউঞ্জে, নিজের সিটে। তারপর বসে বসে পড়তে লাগল। এরইমধ্যে বয় এসে ওর সামনে গরম কফি আর স্ন্যাকস রেখে গেল। কফিতে অল্প অল্প চুমুক দিয়ে আর্টিকেলটায় চোখ বোলাতে বোলাতে এক জায়গায় ওর দৃষ্টি আটকে গেল। শিরোণামটার দিকে নজর পড়তেই ওর চোখদুটো উত্তেজনায় চকচক করে উঠল। দেখল, লেখা আছে : ।। হাইতির পোর্ট-অফ-প্রিন্সে এক ব্যক্তিকে ওয়্যারউলফ সন্দেহে পিটিয়ে, গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা।। গ্রীন আরেকটু ঝুঁকে পড়ল খবরটা ভালো করে পড়ার জন্য। খবরে লেখা : গত বছরের ভূমিকম্প এক লক্ষেরও বেশী হাইতিবাসীকে গৃহহীন করেছিল। সেই গৃহহীন ভূকম্পপীড়িতদের একজনকে গতকাল ক্যারিফোরের পাহাড়ের নিচে একটি গাছের ডালের সাথে নির্মমভাবে ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের নাম সিডাউ মার্চান্ড। কি অপরাধ ছিল তার? স্থানীয়দের অভিযোগ, লোকটি নাকি একটি ওয়্যারউলফ ছিল। পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন হাইতির দুজন স্থানীয় কিশোরের বীভৎস ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে। যেখানে আন্দ্রে নামে কিশোরটির মৃতদেহ পড়েছিল, সেখান থেকে সিডাউ'য়ের তাঁবু খুব বেশী দূরে ছিল না এবং রক্তের দাগ সিডাউয়ের তাঁবুর ভেতরেই ঢুকেছিল। তাতেই স্থানীয়দের সন্দেহ হয় যে ওই দুই কিশোরকে অমন নৃশংসভাবে খুনের পেছনে নিশ্চয়ই সিডাউয়েরই হাত আছে এবং সে কোনো মানুষ নয় - ওয়্যারউলফ। লোকটির সঙ্গে এলাকার বিশেষ কারোর চেনাজানা ছিল না এবং এজন্যই সম্ভবত তাকে সন্দেহভাজন মনে করে হত্যা করতে এলাকার কারোর হাত কাঁপে নি। হাইতি দেশটা এমনিতেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ওয়্যারউলফ বা মায়া নেকড়ের অস্তিত্ব এখানকার মানুষের মনের বিশ্বাসের গভীরে গেঁথে আছে। পূর্ণিমার রাতে অস্বাভাবিক কোনো মানুষ তার মানুষী স্বত্তা হারিয়ে একটি ভয়ঙ্কর অপার্থিব জানোয়ারে পরিণত হয় এবং রক্তের সন্ধানে বের হয়। হাইতির বাসিন্দাদের বিশ্বাস, সিডাউ মার্চান্ড ছদ্মবেশে একটি ওয়্যারউলফ ছিল। তাই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ....খবরটা আদ্যোপান্ত পড়ল আশার গ্রিন। লক্ষ্য করে দেখল, খবরটা প্রায় দু সপ্তাহ আগেকার। পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে গুগলে 'হাইতির ওয়্যারউলফ' বলে টাইপ করে খবরটার ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে বসল গ্রীন। ওর মনে হলো, এইসব অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলো অনেক সময় এইধরনের বিনোদনমূলক খবর ছাপে। এই খবরগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হয় গুগলে সার্চ করে। গ্রীনের কৌতূহল বেড়ে গেল যখন দেখল, গুগলেও হাইতির ঘটনাটাকে সত্য প্রতিপন্ন করে একইরকম খবর দেখাচ্ছে। তার মানে, হাইতির এই খবরটা সত্যি! বিস্ময়ের সীমা রইল না গ্রীনের। স্ট্রেঞ্জ! এই ২০১১ সালেও পৃথিবীতে এমন দেশ আছে, যেখানকার মানুষ ওয়্যারউলফের মতো এসব প্রাচীন গালগল্পে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে? এমনকি ওয়্যারউলফ সন্দেহে অন্যকে খুন পর্যন্ত করে! ********************************************* ************ "...হাইতি?" বিস্মিত গ্যারি সিমোন্সের মুখ দিয়ে নাম'টা বেরিয়ে এলো। সবিস্ময়ে চেয়ে রইল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রীনের দিকে, "হাইতি'তে যাবে? মাথা-টাথা হঠাৎ খারাপ হলো নাকি তোমার?" আশার গ্রীন গ্যারি সিমোন্সের মুখোমুখি চেয়ারটায় বসে পড়তে পড়তে বলল, "কেন যেতে পারি না? খবরটা তো বেশ মুখরোচক! একবার নিজে গিয়ে ব্যাপারটা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েই আসি"। নিউ জার্সির নিওয়ার্কের ( Newark) বিশাল এক বহুতলের সবচেয়ে উঁচু তলায় নিজের অফিসের নিউজ এডিটরের মুখোমুখি বসেছিল আশার গ্রীণ। ওর অফিস - Newark Star-Ledger এক আন্তর্জাতিক নিউজ এজেন্সি। গ্যারি সিমোন্স এই নিউজ এজেন্সিরই এডিটর। আশার গ্রীন হাইতির ওয়্যারউলফের কিংবদন্তির ওপর ফিচার লিখতে চায় শুনে হাসল এবার গ্যারি সিমোন্স। সিমোন্সকে দেখলে মোটেও এডিটর মনে হয় না। তার চেহারাটা তার পদের সাথে মোটেও খাপ খায় না। রোগা রোগা অ্যাথলেটিক চেহারা, মধ্য চল্লিশ বয়স, বাম দিকের কানের ওপর একটা জন্মগত কাটা দাগ আছে। খুব অল্প কথার মানুষ। "...আমি চাইছি অন্যরকম নিউজ", বলল গ্যারি সিমোন্স, " ওই জায়গাটার ব্যাপারে প্রত্যেকদিনই নিউজ কভার করা হচ্ছে। ভূমিকম্পের পরে হাইতি কেমন, কি অবস্থায় রয়েছে..সবই..." "....এটা অন্যরকম নিউজ হবে, স্যার", বলল আশার গ্রীণ, "আমি জানি ওই জায়গাটাকে। আমেরিকা থেকে ছশো মাইল দূরে। ওখানকার মানুষ আজও বিশ্বাস করে ওয়্যারউলফের অস্তিত্ব। ওরা আজও মনে করে, ওখানকার পাহাড়ে নাকি একটা ওয়্যারউলফ বাস করে। আর এই ওয়্যারউলফ সন্দেহে ক'দিন আগে একটা লোককে নির্মমভাবে মারা হয়েছে। আমি সেই ঘটনাটার ওপরেই কভার করতে চাই"। "...কি দরকার ওদের ওসব অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে স্টোরি কভার করার?" বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে উঠল সিমোনের, "একেই ওদের অবস্থার যেখানে বিশেষ কোনো উন্নতি হয় নি, সেখানে এখন ওদের কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস নিয়ে ফিচার লেখাটা ভালো দেখাবে না। বাদ দাও এখন বরং সময়টা!" "...আপনি যেরকম ভাবছেন, ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয় স্যার", গলায় দৃঢ়তা ফুটিয়ে বলল আশার গ্রীণ, "আমি জাস্ট একটা ঘটনার ওপর ইনভেস্টিগেশন করব, ফিচার লিখব...দ্যাটস অল! আমি এমন কিছু লিখব না যাতে মনে হয় আমি ওই দূর্দশাপীড়িত মানুষদের নিয়ে মস্করা করছি"। "....এ লাইনে তোমার কত বছরের এক্সপেরিয়েন্স আছে, গ্রীণ?" সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল এবার সিমোন্স। আশার গ্রীণকে এবার আহত দেখাল। বলল, "আপনি কি আমার যোগ্যতার ওপর সন্দেহ করছেন?" "....ঠিক তা নয়। আসলে এরকম ডেঞ্জারাস একটা অ্যাসাইনমেন্ট নিচ্ছ, অভিজ্ঞ রিপোর্টার না হলে ব্যাপারটা কেলো হতে বেশী দেরী হবে না। তাই কথাটা জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমায়। বাই দ্য ওয়ে, তুমি হাইতিতে কখনো গিয়েছিলে?" "...জ্বি...না", এক মূহুর্ত কি যেন ভেবে নিয়ে বলল গ্রীন, " কিন্তু ওর কাছাকাছি একবার গিয়েছিলাম"। "...জায়গাটা কিন্তু অন্য জায়গা থেকে একেবারেই আলাদা", বললেন সিমোন, "তুমি যখন এই পেশায় 'দুধের শিশু' ছিলে, তখন আমি নিজে একবার গিয়েছিলাম জায়গাটায়। সেইসময় জায়গাটাও ভারী চমৎকার ছিল"। জানলার দিকে এগিয়ে গেল গ্রীন। নিচে, অনেক নিচে ব্রড স্ট্রিটের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনস্রোতের দিকে চেয়ে রইল সে। শহরটা খুব ঘিঞ্জি, কোথাও নেই এতটুকু সবুজ। ঠিক যেন তার জীবনটার মতো। খানিক দূরেই এয়ারপোর্ট। প্লেন ওঠানামা নিত্যদিন অফিসে বসেই দেখতে পাওয়া যায়। সেরকমই একদিন প্লেনে করে বাইরে কোথাও নিউজ কভার করতে যাবে, এটা অনেকদিনের স্বপ্ন গ্রীনের। এবার বোধহয় তার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। অফিস থেকে হাইতি যাবার পারমিশন জুটে গেল শেষমেশ গ্রীনের ভাগ্যে। দু'দিন পর সে হাইতিগামী প্লেন ধরল। ফোর্ট লডারডেল এয়ারপোর্ট থেকে আশার গ্রীন পোর্ট অফ প্রিন্স গামী বিমান ধরল। ওর অফিসের এডিটর মিঃ সিমোন্স নিতান্ত অনিচ্ছায় বাইরে যাবার অনুমতি দিয়েছেন আর এই অপমানটাই ওর ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল। কেন তাকে কিছুতেই ভরসা করতে পারেন না মিঃ সিমোন্স? কিসের অভাব আছে তার ভেতরে? কেন তাকে বাইরে কাজে যেতে হলে কারোর পারমিশন নিতে হবে? ভেলেরি, গ্যারি সিমোন্স - সবার আচরণ ইদানীং ওর কাছে অসহ্য হয়ে উঠছে। গ্রীনের এই হাইতি যাত্রায় অফিস থেকে সে কোনো সাহায্য পাচ্ছে না, তাকে পকেটের পয়সা খরচ করেই যেতে হচ্ছে। যাত্রার আগে সে ইন্টারনেট সার্ফ করে হাইতি যাত্রার খরচের ব্যাপারে সবকিছু খুঁটিনাটি জেনে নিয়েছে। আশ্চর্য হয়েছে এটা জেনে যে হাইতি যাত্রার খরচ মাত্রাতিরিক্ত সস্তা এবং যাত্রাও অত্যন্ত সহজ। নিজের পকেট থেকে যাত্রার খরচনির্বাহ করলেও সেটা ওর ওপর তেমন চাপ ফেলবে না। হাইতিতে সে নিজের ইচ্ছেমত যতদিন খুশি থাকতে পারে। যে'কদিন থাকবে, ওয়্যারউলফ নিয়ে পুরো স্টোরি'টাকে কভার করবে সে। কথা বলবে ওখানকার প্রায় সমস্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। ভাগ্য তার সহায় হোক, মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগল আশার গ্রীন। ফোর্ট লডারডেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওয়েটিং লাউঞ্জে বসে বসে এসবই ভাবছিল গ্রীন। লক্ষ্য করল, ওর আশেপাশে প্রচুর হাইতিয়ান লোক বসে। সবাই বিমান ধরার অপেক্ষায়। বিমানবন্দরে বসে নিজের আগামী পরিকল্পনা ভাঁজছিল গ্রীন। যেখানে যাচ্ছে, সেটা কোনো ছুটি কাটাবার জায়গা নয়, যাচ্ছে একটা কাজে। ভারী রহস্যময় একটা ঘটনার পর্দা উন্মোচন করতে। এমন একটা জায়গায় যেখানে এখন একটাও ঘরবাড়ি আস্ত নেই। চারিদিকে তাকালে শুধু দূর্যোগপীড়িতদের তাঁবু ছাড়া আর কিছু নজরে পড়বে না। মিলবে না মাথা গোঁজার মতো কোনও নিশ্চিন্ত আশ্রয়। খাওয়া-শোয়া-ঘুম কখন কোথায় হবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। অবশ্য, সাংবাদিকদের এসব দেখলে চলেও না। সে নিজেও সেখানে যাচ্ছে একজন সাংবাদিক হিসেবে। এডিটর সিমোন্সের উপদেশটা মাথায় ঘুরছে ওর - নিজেকে প্রমাণ করো। হ্যাঁ, এটাই সময় ওর নিজেকে প্রমাণ করার। তাই ও আজ এমন একটা নিউজ নিয়ে কভার করতে বেরিয়েছে, যেটা নিয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো রিপোর্টার ভাবেনি। হয়তো এটাই হতে পারে ওর কেরিয়ারে একটা মাইলস্টোন। ওর বাবা সিড ছিলেন একটা রেস্তোরাঁর মালিক। নিউজপেপারে প্রায়ই নিজের রেস্তোরাঁর বিজ্ঞাপন দিতেন। সেই সূত্রেই নিউজপেপারের এডিটরদের সাথে তাঁর বেশ চেনাজানা ছিল। বাবা চাইতেন, ছেলেও তাঁর মতো রেস্তোরাঁর মালিক হোক। কিন্তু গ্রীনের বরাবরই অন্য পেশায় আগ্রহ ছিল। কিশোর বয়স থেকেই তার শখ ছিল, সে সাংবাদিক হবে। তার লেখা প্রতিবেদন কাগজে বেরোবে, দশজন পড়বে তার লেখা। সেইভাবেই নিজে পড়াশোনা শুরু করে সে। তার বাবাও তাকে পড়াশোনার ব্যাপারে এবং কেরিয়ার গড়তে যথেষ্ট সহায়তা করেন। জার্নালিজমে মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট করে গ্রীন নিউজপেপারের অফিসে জয়েন করে। শুরু হয় তার কর্মজীবন। ....ভাবনার মাঝে ছেদ পড়ে আশার গ্রীনের। প্লেন এসে গিয়েছে। অন্য সহযাত্রীদের সঙ্গে সে-ও প্লেনে গিয়ে উঠল। গ্রীন লক্ষ্য করল, তার সহযাত্রীদের বেশীরভাগই হাইতিয়ান, যারা কোনওভাবেই ইংরেজি বলতে বা লিখতে পারে না। এমনকি তাদের কোনও ভদ্রজনোচিত ম্যানার্স পর্যন্ত নেই। প্লেনে ওঠার পর গ্রীনের পরিচয় হলো একজন সাদা-চুল আমেরিকানের সাথে। গ্রীন লক্ষ্য করল, এইসব অসভ্য হাইতিয়ান সহযাত্রীদের মাঝে এই আমেরিকান ভদ্রলোকটিও কেমন যেন নিজেকে বিব্রত বোধ করছে। সে সবাইকার টিকিট চেক করছে এবং টিকিটের নম্বর অনুযায়ী তাদের সিট কোথায় পড়েছে, তা দেখাতে সাহায্য করছে। অশিক্ষিত হাইতিয়ানগুলো টিকিটের মর্ম বোঝে না, যেখানে সিট পেয়েছে, সেখানেই বসে পড়েছে। গ্রীনের কাছে একসময় এগিয়ে এলো লোকটি। "...হ্যালো!" বলে উঠল গ্রীন, "আপনি কি ফ্লাইট অ্যাটেন্ডেন্ট?" "...জ্বি..না", হেসে বললেন সেই ভদ্রলোক, "আমি একজন রোমান ক্যাথোলিক প্রিস্ট"। গ্রীন দেখল, তার পাশে যে দুজন সহযাত্রী বসেছে, তারা সৌভাগ্যক্রমে হাইতিয়ান নয়। তারা হলো শিক্ষিত, মার্জিত কলেজ স্টুডেন্ট। তারা ভূমিকম্পবিধ্বস্ত হাইতিতে চলেছে সেবামূলক কাজের উদ্দেশ্যে। ছাত্রদ্বয়ের সঙ্গে কুড়ি মিনিট কথা বলার পর গ্রীন বুঝল, এরা প্রকৃতই সৎ, মার্জিত এবং রুচিশীল মনের মানুষ। তরুণ এবং তরুণী দুজনেই ফ্লোরিডার বিশপমন্ডলীর সদস্য এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কয়েক বছর ধরেই এইভাবে সেবামূলক কাজের জন্য অভিযান চালাচ্ছে। বিভিন্নরকম চ্যারিটি কাজের সাথে যুক্ত এরা, যেমন - ঘরবাড়ি নির্মান, খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ জোগানের ব্যবস্থা করা, পানীয় জলের সুরাহার জন্য কুয়ো খনন এইরকম আর কি। ওদের সাথে কথাবার্তা বুঝে গ্রীন জানল, ইতিপূর্বে ওরা বাহামা দ্বীপপুঞ্জের বহু অনুন্নত এলাকায় গিয়ে চ্যারিটি কাজ করে এসেছে। কথাবার্তার মাঝেই বিমানের জানলা থেকে Hispaniola দ্বীপটির চেহারা ঝাপসাভানে দৃষ্টিগোচর হলো আশার গ্রীনের। এই Hispaniola হলো হাইতির অন্যতম একটি দ্বীপ যা Dominican Republic এর অন্তর্ভূক্ত। বিমান থেকেই নিচে পুরো দেশটাকে একটা মানচিত্রের মতো দেখা যেতে লাগল। ওরা বিমানের জানলা দিয়ে নিচে দেশটাকে দেখছিল। গ্রীনের মনে হলো, সে যেন কোনো উপগ্রহ থেকে পৃথিবীর মানচিত্রের কোনো ছোট অংশকে লক্ষ্য করছে। উত্তর দিক অভিমুখে ওদের বিমানটা উড়ে যাবার সময় গ্রীন লক্ষ্য করল, প্রচুর বিশাল চেহারার জাহাজ লাবাডে বন্দরে নোঙর করে আছে। হয়তো ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরটার পুনরুজ্জীবনের কাজে ইনভেস্ট করার এটাই মওকা বুঝে দেশ বিদেশের জাহাজগুলো নোঙর করে আছে। অবশ্য সবাই যে ইনভেস্ট করার মওকায় এসেছে তা নয়,কোনও কোনও জাহাজ ত্রাণ নিয়েও এসেছে। উঁচু থেকে নিচে জাহাজগুলোকে ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র খেলনাপাতির মতো দেখাচ্ছে। হাইতি দেশটার ম্যাপ খুললে একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এর মধ্যভাগে কোনো জনবসতি নেই, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। যদিও প্লেনে বসে কোনওকিছু ঠিকঠাকভাবে ঠাহর করা সম্ভব নয়, ম্যাপটাই ভরসা, তাই নিজের সিটে বসে বসে কোলের ওপর খুলে রাখা ম্যাপবইটাতেই চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল গ্রীন। হাইতি এমন একটা ভূখন্ড, যেটাকে উঁচু থেকে দেখতে লাগে অনেকটা ইংরেজি 'U' অক্ষরের মতো। এই 'U' এর দুই দিকের উত্তর এবং দক্ষিণ অংশ চারধার দিয়ে সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। এর দক্ষিণাংশ মিলিত হয়েছে পশ্চিমের মূল ভূখন্ডের সাথে এবং এই মুল ভূখন্ডের ওপরেই পোর্ট অফ প্রিন্স বিমানবন্দর। পাহাড়, নদী, চারধারে সমুদ্র সবমিলিয়ে দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ম্যাপটাকে দেখছিল গ্রীন। তারই মাঝে হেয়ারহস্টেসের সুরেলা কণ্ঠস্বর কানে এলো : ' বিমান এখন পোর্ট অফ প্রিন্স বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।' একসময় সত্যিই সত্যিই ওদের প্লেনটা পোর্ট অফ প্রিন্সে অবতরণ করল। বিমানের জানলা দিয়ে বিমানবন্দরটার ওপর একনজর বুলিয়ে নিতেই একটা অন্যরকম জিনিস নজরে পড়ল আশার গ্রীনের। দেখল, রানওয়ের একদিকে একটা বিমান একলা দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে হতশ্রী চেহারা বিমানটির। ভালো করে সেটিকে লক্ষ্য করে গ্রীন বুঝল, বিমানটি ছোট কোনো Cessna নয়, বরং Full Boeing 727 প্যাসেঞ্জার জেট...কিন্তু এরকম একটি নামীদামী বিমান এমন হতশ্রী অবস্থায় রানওয়ের একদিকে পড়ে আছে কেন! বিমানের গায়ে যে সংস্থার লোগো আঁকা আছে, সেরকম কোনো সংস্থার নাম এর আগে কখনো শোনেনি আশার গ্রীন। হতে পারে বিমানটি স্থানীয় ক্যারিবিয়ান এয়ারলাইন্স কোনো সংস্থার। বিমানের সামনের দরজা প্রায় নেই বললেই চলে, রানওয়ের পাশে একটা মাঠের ওপর একাকী দাঁড়িয়ে আছে। পরিত্যক্ত অবস্থায়। কিন্তু তখন অতকিছু ভাবার মতো সময় ওর হাতে নেই। অন্যান্য সহযাত্রীদের সঙ্গে তাকেও একসময় বিমান থেকে অবতরণ করতে হলো। হাইতির এয়ারপোর্টের ব্যবস্থাপনা বেশ উন্নতমানের দেখে একটু বিস্মিতই হলো গ্রীন। সে ভাবতে পারেনি হাইতির মতো দেশের বিমানবন্দর এতটা উন্নত ধাঁচের হবে। স্থানীয় Zouk মিউজিক শুনতে শুনতে ঝাঁ চকচকে হলওয়ে অতিক্রম করে আশার গ্রীন সুদৃশ্য এস্কেলেটর সিঁড়ি দিয়ে নিচের গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে এলো গ্রীন। এখানেও একদল Zouk বাজনাদার ওদের মিউজিকের সাথে আপ্যায়ন করল। এটাই বোধহয় এদের স্থানীয় মিউজিক। তারপর এয়ারপোর্টের গেট পেরিয়ে ঝাঁ চকচকে লাউঞ্জে পা রাখতেই রঙিন কাঁচের দরজার বাইরে দুপুরের প্রখর রৌদ্র চোখে পড়ল ওর। শহরটাকেও দিব্যি দেখা যাচ্ছিল। অন্যান্য শহরের মতো মোটেও ট্রাফিক জ্যাম নেই, কংক্রিটের দেয়াল মোটেও ওর দৃষ্টিরোধ করছে না। লাউঞ্জে দাঁড়িয়ে সামনেই তাকালেই, চোখে পড়ে রাস্তার ওপাশে পাহাড়ের সবুজ গা। এখান থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ সবুজ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের গা জুড়ে। কত দূরে পাহাড়টা, অথচ এখান থেকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কত কাছে। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। এখানে এসে গ্রীনের মনে হতে লাগল সে যেন তার ব্যস্ত কর্মচঞ্চল জীবনটাকে দূরে, বহুদূরে ফেলে এসেছে। এখানে আসার পথে বিমানে ওর সহযাত্রী সেই কলেজ স্টুডেন্ট দুজনের একজন ওর কাছে জানতে চেয়েছিল হাইতিতে কোন কাজে যাচ্ছে সে। গ্রীন প্রথমটায় ভাবল, উত্তরটা এড়িয়ে যাবে কিন্তু পরক্ষণেই সে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সোজাসাপটা উত্তরে বলেছিল, ওয়্যারউলফের ওপর নিউজ কভার করতে। কথাটা শুনে ওরা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ওর দিকে। হয়তো ভাবছিল, গ্রীন বুঝি ওদের সঙ্গে মস্করা করছে। তাই ওদের মনে তার সম্পর্কে যাতে কোনো ভুল ধারণা না আসে তাই গ্রীন তখন বলেছিল, "না, আমি সিরিয়াসলি বলছি। আসলে, ওখানে কিছুদিন আগে একটা লোককে ওয়্যারউলফ সন্দেহে খুব নৃশংসভাবে হত্যা করেছে ওখানকার স্থানীয় জনগণ। " "....তাই নাকি?" শুনে বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল সেই কলেজ-পড়ুয়াদ্বয়। ওদের মুখের ভাব দেখে গ্রীন বুঝেছিল, এই খবর ওদের কাছে সম্পূর্ণ অজানা। "....জ্বি, তাই আমি হাইতির লোকজনের মধ্যে ওয়্যারউলফ নিয়ে যে একটা কিংবদন্তি চালু আছে, সেটার ওপর রিসার্চ করতে যাচ্ছি।" "....আচ্ছা, আপনি কি মনে করেন, হাইতির পাহাড়ে সত্যি সত্যিই ওয়্যারউলফ আছে?" "...না, একদমই না", দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলেছিল আশার গ্রীন, "এগুলো মানুষের অন্ধ বিশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়। আমি যাচ্ছি ব্যাপারটার ওপর রিসার্চ করে ওদের সেই ভুলটা ভাঙিয়ে দিতে"। ব্যস, এরপর আর এই বিষয় নিয়ে ওদের মধ্যে আর কোনো কথা এগোয়নি। বিমানবন্দরে নেমে গ্রীন এটাও লক্ষ্য করেছিল, এখানে হাইতি যাবার ট্যুরিস্ট বলতে একমাত্র সে একাই। বাকি সবাই হয় হাইতিরই স্থানীয় লোকজন আর নয়তো NGO র কর্মী। বাইরে থেকে হাইতি ভ্রমণে আসা ট্যুরিস্ট বলতে একমাত্র আশার গ্রীন। যদিও সে ট্যুর করার উদ্দেশ্য নিয়ে সেখানে যাচ্ছে না। এক্সিট ডোরের দিকে এগোতেই গ্রীন দেখতে পেলো, একজন বৃদ্ধ হাতে একটা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্ল্যাকার্ডে যে নামটি লেখা আছে, সেটা পড়েই চিনতে পারল গ্রীন। বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে গেল গ্রীন। তার দিকে করমর্দনের জন্য ডান হাত বাড়িয়ে বলল, "হ্যালো, আমি মিঃ গ্রীন!" বৃদ্ধও সোল্লাসে বলে উঠল, "হ্যালো, আমি বেন। হোটেল থেকে আসছি। হাইতিতে আপনাকে স্বাগত"। দুজনে দুজনের করমর্দন করল। "....দিন স্যার, আপনার ব্যাগটা", বলল বেন। "...থাক, এটা আমিই বহন করব", উত্তরে বলল গ্রীন। ট্রলিব্যাগ'টাকে ঠেলতে ঠেলতে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জের দরজার দিকে হাঁটা লাগাল সে। আসলে বৃদ্ধ বেন এই ভারী ব্যাগটা বয়ে নিয়ে যাক, ও চায় না। বাইরে আসতেই সূর্যের নরম আলো ওদের মুখেচোখে এসে পড়ল। সময়টা যেহেতু শীতকাল তাই রোদের পরশটা বেশ মিঠে লাগছিল গ্রীনের। বাইরে বেরিয়ে আসতেই ও দেখতে পেলো, বাইরে ফুটপাতের ওপর থিকথিক করছে ভিড়। সবার চোখেমুখেই কেমন একটা উত্তেজনা। যেন কারোর আসার অপেক্ষায় রয়েছে ওরা। গ্রীনের মনে হলো, বোধহয় কোনো সেলিব্রিটি আসবে, তারই আগমনের অপেক্ষায় বসে আছে এরা। মনের ভাবটা প্রকাশই করে ফেলল সে। বেনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "এত লোক! কেউ আসবে নাকি? কোনো ফিল্মস্টার বা সেরকম কেউ?" বেন বলল, " Baby Doc আসবেন আজ। হাইতির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট।" অবাক হলো গ্রীন। এইজন্য এত ভিড়! Jean-Claude Duvalier, যিনি Baby Doc নামেও পরিচিত - এঁর নাম শুনেছে আশার গ্রীন। সাল ১৯৭১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত হাইতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। প্রায় দু-দশক ফ্রান্সে স্বেচ্ছা নির্বাসিত ছিলেন। আজ হঠাৎ ফের দেশে ফিরে এলেন। তিনি আসছেন খবর পেয়েই পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ গোটা বিমানবন্দর চত্বর। এই খবরও কানে এলো গ্রীনের যে, Baby Doc দেশের মাটিতেই পা রাখামাত্রই তাঁকে গ্রেফতার করা হবে। আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলা ঝুলে রয়েছে তাঁর নামে। ব্যাপারটা কতদূর এগোয়, দেখবার জন্য সে ব্যাগ নিয়ে ডিজিটাল ক্যামেরাটা বের করে অপেক্ষা করতে লাগল। "....আপনি হোটেলে যাবেন তো স্যার?" পাশ থেকে একরকম তাগাদা লাগায় বেন। "...হ্যাঁ, যাব তো! কিন্তু আগে Baby Doc কে দেখতে চাই! ওঁকে কিছু প্রশ্নও করতে চাই"। বেন এবার আমতা আমতা করে বলল, "আসলে স্যার...দেরী করলে এরপর অন্ধকার নেমে আসবে। জায়গাটাও খুব একটা নিরাপদ নয়"। গ্রীন ওর কথাকে পাত্তাও দিল না। অগত্যা বেন নাচারভাবে গ্রীনের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। একটু পরেই এয়ারপোর্টের দরজায় দেখা গেল Baby Doc কে। পরনে কালো স্যুট, মুখে রাজ্যের গাম্ভীর্য আর বিরক্তি। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ আর জনতার ভিড়টা যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল ওঁর ওপর। গ্রীন লক্ষ্য করল, আশেপাশে একমাত্র সে ছাড়া আর কোনো সাংবাদিক নেই। ভিড় ঠেলে সটান এগিয়ে গেল প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের দিকে। "...হাইতিতে আপনাকে স্বাগত!" নিজের পরিচয় দিয়ে প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের মুখের সামনে মাইক্রোফোনটাকে এগিয়ে দিয়ে বলল গ্রীন, "দু-দশক পর আজ হঠাৎ দেশে ফিরলেন কেন? প্লিজ আমাদের জানাবেন কি?" কোনও উত্তর দিলেন না Jean-Claude Duvalier ওরফে Baby Doc। গোমড়া মুখে প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে গিয়েও পারলেন না। বললেন, "আমি এসেছি আমার দেশের লোককে সাহায্য করতে। তাদের সুবিধা অসুবিধার দিকগুলো দেখতে। " রীতিমতো আত্মবিশ্বাসী দেখাল আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত প্রাক্তন এই প্রেসিডেন্টকে। "....আপনার বিরুদ্ধে এখনো অনেক মামলা ঝুলে আছে", বলল গ্রীন, "আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত আপনি। এখানে আপনার অনেক বেনামি সম্পত্তি আছে, যা পরে বাজেয়াপ্ত করে নেওয়া হয়েছিল। আপনি কি দেশে ফিরেছেন, সেই ব্যাপারে নিজের কিছু সাহায্যলাভের আশায়?" এবার একেবারে মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন Jean-Claude Duvalier। কোনো উত্তর দিলেন না। কঠিন মুখে ভিড় ঠেলে এগোতে লাগলেন সামনের দিকে। ভিডিও ক্যামেরায় এতক্ষণ ওদের পুরো কথোপকথনটা রেকর্ড করছিল বৃদ্ধ বেন। এবার ক্যামেরার দিকে ঘুরে গ্রীন বলল, "হাইতির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট Jean-Claude Duvalier এর দাবী, তিনি এসেছেন দেশের লোকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। যদিও আইনের চোখে তাঁর কার্যকলাপ রীতিমতো সন্দেহজনক। আশার গ্রীন, theNewark Star-Ledger, হাইতি"। গ্রীনের বক্তব্য শেষ করেই ভিডিও ক্যামেরা অফ করে দিল বেন। তারপর ভিড় এড়িয়ে বাইরে এসে দুজনে হোটেলের গাড়িতে উঠে বসল। এই গাড়িটাই ওকে পৌঁছে দেবে ওর গন্তব্যে। গাড়িতে উঠে মোবাইল সুইচ অন করল গ্রীন। ওর এডিটর মিঃ সিমোন্সকে ফোন করতে হবে এখুনি। যদিও আজ রবিবার এবং সিমোন্স হয়তো এখন তাঁর পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাচ্ছেন, তবু তাঁকে একবার খবরটা না দিলেই নয়। "...কি? এখনও হাইতিতে পৌঁছোও নি? " ওপ্রান্ত থেকে বলে উঠলেন গ্যারি সিমোন্স, "হ্যাঁ...হ্যাঁ...শুনেছি...Jean-Claude Duvalier হাইতি বিমানবন্দরে এসে নেমেছেন। ওঁর আগমনের খবর তো কেউই জানত না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কাছেও ওঁর আগমনের ব্যাপারে কোনও খবর ছিল না। " "....উনি দেশে ফেরা মাত্র ওঁকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে", এপ্রান্ত থেকে বলল আশার গ্রীন। "...তাই নাকি? বেশ, বেশ, এনিওয়ে, তুমি এখন কোথায়?" "...আমি হাইতি পৌঁছে গিয়েছি, স্যার"। "...ও মাই গড, তোমাকে কতবার বলেছিলাম, যেতে হবে না তোমায়..." "....আপনি আমার অফিসের বস হতে পারেন,কিন্তু গার্জেন নন...". এপ্রান্ত থেকে গম্ভীর গলায় বলল আশার গ্রীন, "আমি জাস্ট একটা 'ভেকেশনে' এসেছি। কারণ আপনি আমাকে ছুটি কাটিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন"। "...গ্রীন, হাইতি'তে কেউ ভেকেশনে যায় না"। "....কিন্তু এখানকার চিত্র যে সম্পূর্ণ অন্যকথা বলছে!" ওপ্রান্ত থেকে সিমোন্সের একটা গভীর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলো গ্রীন। বুঝল, ওর এখানে আসা'টা সিমোন্স মোটেও ঠিকভাবে নিচ্ছেন না। "...এনিওয়ে", ওপ্রান্ত থেকে হাল-ছাড়া গলায় বললেন সিমোন্স, "ওখানে এখন কি অবস্থা? Jean-Claude Duvalier এর সাথে কোনো ইন্টারভিউ হয়েছে তোমার?" "...হয়েছে, স্যার। এইমাত্র হয়েছে। " "....কিভাবে?" "...স্যার, ওঁর সাথে ইন্টারভিউটা আমি ভিডিও-তে রেকর্ড করে সেভ করে রেখেছি। টাইমে পেয়ে যাবেন। আমি ছাড়া স্পটে আর অন্য কোনো জার্নালিস্ট ছিল না, স্যার"। "....গ্রীন, তুমি কি জানো, তুমি কি জন্য গিয়েছ ওখানে?" "...জানি, স্যার। ভালোই জানি। ওটাও আমার মাথায় আছে"। "...তুমি দেখছি ওসব ছাইপাঁশ খবর পাবলিশ করে আমাদের কাগজের নাম ডোবাবে"। "...আমি এমন কিছুই লিখব না স্যার যাতে আমাদের পেপারের রেপুটেশন নষ্ট হয়।" "...বাই দ্য ওয়ে, Jean-Claude Duvalier এর সাথে তোমার ইন্টারভিউয়ের ভিডিও রেকর্ডিং'টা কখন পাব?" "...জানাচ্ছি", বলে মোবাইলটাকে মুখের অন্যপাশে সরিয়ে পাশের সিটে বসা বেনকে উদ্দেশ্য করে গ্রীন জিজ্ঞেস করল, "হোটেল পৌঁছতে কতক্ষণ সময় লাগবে?" "....এই আধাঘণ্টা, স্যার"। ফের ফোনটাকে মুখের সামনে এনে ওপ্রান্তে সিমোন্সকে সে জানাল, "পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পেয়ে যাবেন"। "....কোন হোটেলে উঠেছ?" "....অলোফসন-এ"। ".....বেশ, আমি অপেক্ষা করব"। লাইনটা কেটে গেল। বাকি পথটুকু গ্রীন হাইতির প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট Jean-Claude Duvalier এর সাথে ওর কথোপকথনের ভিডিও-টা সেট আপ করতেই ব্যস্ত থাকল। ঠিক টাইমে এটা সেন্ড করতে হবে তার বস'কে। কাজটা করতে সে এতটাই মনোযোগী ছিল যে তার গাড়ি কোন পথ ধরে ছুটছে, সেটাই খেয়াল রইল না তার। অবশ্য, সেটা এমন কিছু ব্যাপার নয়। এমনিতেই ইতিমধ্যে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। রাস্তাঘাটেও কোনো পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারে দৃষ্টিও বেশীদূর চলে না। কতক্ষণ পর ওদের গাড়িটা একটা বিশাল উঁচু ইমারতের সামনে এসে থামল। খোলা ফটকের সামনে খাকি ইউনিফর্ম পরা কাঁধে একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সিকিউরিটি গার্ডদের ইতিউতি ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল। ভেতরের হলওয়ে থেকে উজ্জ্বল আলোর আভাস আসছে। এটাই অলোফসন হোটেল। এই বিদেশে গ্রীনের আপাতত স্থায়ী ঠিকানা। গাড়ি থেকে নেমে খোলা ফটক দিয়ে ভেতরের চৌহদ্দিতে প্রবেশ করল আশার গ্রীন। ফটকের ভেতরে ঢুকে হোটেলের দিকে যেতে সুন্দর সুছাঁদ একটা বাগান চোখে পড়ল। এই অঞ্চলে এই অলোফসন হোটেলটাই বেস্ট হোটেল। বাইরে থেকে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা হাইতিতে বেড়াতে এলে এই হোটেলেই এসে ওঠেন। ভূমিকম্পের পরেও এখনও হোটেলটাকে অক্ষত অবস্থায় দেখবে, স্বপ্নেও কল্পনা করেনি গ্রীন। আবার এমনও হতে পারে, হয়তো হোটেলটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিন্তু খুব চটজলদি রিনোভেশন করানো হয়েছে। বাগানের সীমানা ঘেরা তালগাছগুলো মৃদুমন্দ হাওয়ায় যেন মাথা দুলিয়ে ওকে স্বাগত জানাচ্ছে। এ যেন এক অন্য জগৎ। নিজের ছকে বাঁধা কর্মজীবন থেকে, হাইতির অন্যান্য বিধ্বস্ত অংশ থেকে - এ যেন অন্য এক জগতে এসে পৌঁছেছে সে। রিসেপশনটা চমৎকার সুসজ্জিত। অ্যান্টিক জিনিসে সাজানো প্রশস্ত দামী কাঠের লবি। একদিকে খোলা বারান্দা, ওই বারান্দাতেই বাহারি চেয়ার টেবিল সাজিয়ে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। "...ম্যাগডা!" রিসেপশনে এনে বেল বাজিয়ে কাকে যেন ডাকল বৃদ্ধ বেন। হোটেলের লোগো সাঁটা সাদা পোশাক পরা স্থানীয় একটি অল্পবয়সী হাইতিয়ান মেয়ে কোথা থেকে এসে হাজির হলো। স্থানীয় ভাষায় বেন কিছু বলতেই মেয়েটির মুখে এবার হাসি ফুটে উঠল। বলল, "আপনিই মঁসিয়ে গ্রীন?" "....জ্বি", হেসে বলল গ্রীন। "...আপনারই অপেক্ষায় ছিলাম আমরা", বলল মেয়েটি অর্থাৎ ম্যাগডা,"আপনার অফিসের এডিটর সাহেব মিঃ সিমোন্সের কাছ থেকে এইমাত্র ফোন পেয়েছি আমরা। তিনি বিশেষভাবে জানিয়েছেন, 'জন ব্যারিমোর' স্যুইট'টা আপনাকে দিতে"। "....কিন্তু আমি তো স্যুইট চাই নি, আমি তো রুম চেয়েছিলাম। জাস্ট একটা রুম", মুখের হাসিটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই বলল গ্রীন। ম্যাগডা বলল, "কিন্তু সিমোন্স সাহেব বলেছেন, আপনাকে এই হোটেলের বেস্ট স্যুইট'টা দিতে। আর এখানকার সবচেয়ে বেস্ট স্যুইট হলো 'জন ব্যারিমোর'। " "...কিন্তু..." বাধা দিয়ে গ্রীন কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু মেয়েটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "সিমোন্স সাহেব এ'ও জানিয়েছেন, আপনি যতদিন এখানে থাকবেন, থাকা-খাওয়ার খরচ উনিই দিয়ে দেবেন"। বিস্ময় আর আনন্দে এবার অভিভূত হয়ে গেল গ্রীন। দোতলায় ফোর-বেডরুম ব্যালকনিওয়ালা সম্পূর্ণ একটা বড় ঘর ও পাচ্ছে। একটু পরে ওকে বসের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে বসতে হবে। বস ওর এত বড় একটা উপকার করলেন, তারও একটা প্রতি-দায়িত্ব আছে বৈকি। সে ম্যাগডা'কে বলল, "আর একটা কাজ করলে খুব উপকার হয়"। ম্যাগডা তখন একটা খাতা টেনে খসখস করে কি যেন লিখছিল। গ্রীনের কথায় মুখ না তুলেই বলল, "বলুন, স্যার"। "...আগামীকাল আমি একটা জায়গায় যাব। একটা গাড়ি আর সঙ্গে একজন গাইড দিলে খুব উপকার হয়। যতদিন এখানে থাকব, প্রতিদিন গাড়ি আর গাইড সঙ্গে থাকবে আমার। ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ আর ক্রিওল - এই তিনটে ভাষার যে কোনো একটা ভাষা জানে, এরকম গাইড দরকার আমার"। ম্যাগডা তাকে আশ্বাস দিল, সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তাকে একজন বিশ্বাসী গাইড দেবে সে। .....মাঝরাতে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল গ্রীনের। বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পেলো বাইরে ঝড় উঠেছে। ঝড়ের সে কি মত্ত গর্জন! হাইতি অতি প্রাচীন দেশ। এখানকার অরণ্যপ্রকৃতিও অত্যন্ত আদিম, তাই এখানকার ঝড়ের একটা আলাদা ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য আছে। বিছানা ছেড়ে জানলার কাছে উঠে গেল গ্রীন। দেখল, বাইরে শুধু ঝড় নয়, মুষলধারে বৃষ্টিও ঝরছে। কাঁচের জানলার গায়ে নিষ্ঠুরভাবে আঘাত হানছে বৃষ্টি। কাঁচ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। বাইরেটা ঝাপসা দেখাচ্ছে। হোটেল প্রাঙ্গনের বাতির আলোয় বাগানের গাছের পাতাগুলোর নড়াচড়া কিরকম যেন ভৌতিক দেখাচ্ছে। আদিম প্রকৃতির বুকে গভীর রাতে এই ঝড়জল দেখতে দেখতে অজান্তেই ওর বুকের ভেতরে কিসের আশঙ্কায় যেন গুড়গুড় করে উঠল। ওর হঠাৎ কেন জানি মনে হলো, এ যেন ঝড়ের গর্জন নয়, কোনো অপার্থিব বুনো পশুর গর্জন! ঝড়ের গর্জনের নেপথ্যে এ যেন... এ যেন কোনো অতিকায় নেকড়ের গর্জন! • copy


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯৫ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now