বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ সঙ্কেত
কাহিনী : অমিতাভ গঙ্গোপাধ্যায়
রেস্তোরাঁ থেকে বেরোতে না বেরোতেই বৃষ্টি নামল আবার। একটানা ঝিরঝিরে ক্লান্তিকর বৃষ্টি। আজ রোববার তাই পানাজির এই এলাকায় বিকেল থেকেই দোকানপাট বন্ধ। অন্যদিনের জমজমাট এলাকা অন্যরকম লাগছে তাই। বড় রাস্তার মোড় ঘুরলেই হাওয়ায় টালমাটাল সি-বিচ। ওই নির্জন রাস্তা ধরেই ওদের ফিরতে হবে রানার আস্তানায়।
ওরা মানে রাজু আর মৃদুল। রানা বন্ধুদের নিয়ে এসেছিল সমুদ্রপাড়ের লাগোয়া এই রেস্তোরাঁয় রাতের খাওয়া সারতে। ও পানাজিতে আছে কয়েক বছর। ব্যাঙ্কে কাজ করে। বন্ধুরা এসেছে কলকাতা থেকে বেড়াতে। মুম্বইয়ে রাজুর এক আত্মীয়ের বাড়িতে দিন কয়েক কাটিয়ে দিন দুয়েক হলো ওরা পানাজি এসে পৌঁছেছে। কয়েকদিন থাকবে ওরা। বছরের শেষ দিকের জমানো ছুটিগুলো ওদের জন্যই রেখে দিয়েছিল রানা।
কাল একটা গাড়ি ভাড়া করে ওরা মায়াম লেক ঘুরে এসেছে। পানাজি থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার। ঘন সবুজ গাছপালায় ঘেরা মায়াম লেকের স্বচ্ছ টলটলে জলে অসংখ্য রঙবেরঙের প্যাডেল-বোট। অনেকটা সময় কেটেছে ওদের। নানা রঙিন ফুলে সাজানো চোখজুড়ানো বাগান। ফেরার পথে সপ্তকোটেশ্বরের পুরনো মন্দির থেকে বেরোতে না বেরোতেই বৃষ্টি। আর সে কি তুমুল বৃষ্টি! যেন ঘন চিকের আড়ালে হারিয়ে গেল গোটা শহরটাই। আর কোথাও যাওয়া হয়নি। রানার ফ্ল্যাটে পৌঁছে তারপর শুধু ঘুম আর গল্প। কালকের দিনটা এভাবেই কেটে গিয়েছিল।
আজকেও আকাশের মুখ সকাল থেকেই গোমড়া। থরে থরে মেঘ মেঘ জমে আছে আকাশে। মাঝেমাঝে সূক্ষ্ম আঁশের মতো ঝরে পড়া অল্প সময়ের বৃষ্টি। এ সময়টায় বৃষ্টি কম হয়। সম্ভবত নিম্নচাপের কারণেই এই অসময়ের বৃষ্টি। সন্ধ্যার একটু পরে ছাতা সম্বল করে কাছাকাছি দু-একটা চার্চ দেখতে গিয়েছিল ওরা। প্রার্থনার দিন বলেই হয়তো রাস্তাঘাটে লোকের জটলা আজও কম। তার ওপর মাঝেমাঝেই এই অনির্দিষ্ট খামখেয়ালি বৃষ্টি। ফাঁকাই লাগছিল তাই এলাকাটা।
ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ন'টা বাজে। আজ ওদের খাওয়াদাওয়া সারতেও দেরী হয়েছে। খাবার স্লিপ হাতে পেয়েও টেবিল ফাঁকা হবার অপেক্ষায় দাঁড়াতে হয়েছে। রোববার এই রেস্তোরাঁয় ভিড়টাও বেশী হয়। মেঘলা আবহাওয়া সত্ত্বেও ব্যতিক্রম হয়নি তার। বৃষ্টি এরপর জোরে নামবে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সুনসান রাস্তায় পথচারী মানুষ বড় একটা দেখাও যাচ্ছে না। ঠাণ্ডা কনকনে ভেজা হাওয়া সমুদ্রের দিক থেকে ছুটে এসে উইন্ডচিটার ফুঁড়ে হাড় যেন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। রানা বলল, "দেরি করে লাভ কি। পথঘাটের অবস্থা তো দেখছিস। পায়ে হেঁটে সি-বিচের পাশ দিয়েও ফিরতে সময় নেহাৎ মন্দ লাগবে না। তারপর যদি হঠাৎ রাস্তার আলো নিভে যায়, ঝামেলা বাড়বে বই কমবে না।"
বলতে বলতেই বন্ধুদের উত্তরের ভরসায় না থেকে রানা ফুটপাতে পা বাড়ায়। ওর দেখাদেখি রাজু আর মৃদুলও। আর রাস্তায় নেমেই ওরা যেন কিছুটা স্বস্তি পায়। বৃষ্টিটা ধরেছে এতক্ষণে। হাওয়ার অবশ্য কমতি নেই। নির্জন, আলো-আঁধারে মেশানো রাস্তা। বড় রাস্তটার মোড় ঘুরে সমুদ্রতীর ধরে অনেকটাই পথ এগিয়ে যেতে হবে ওদের। আবার জোর বৃষ্টি নামলেই মুশকিল। হয়তো দাঁড়াবার মতোও আশ্রয় পাওয়া যাবে না। বুকের মধ্যেটা কেমন যেন ছমছম করে ওঠে। এই অসময়ের বৃষ্টি আর নির্জন জনমানবশূন্য রাস্তা সব মিশিয়ে যেন একটা আবছা দুর্বোধ্য ভয়ের হাতছানি। যার হয়তো কোনও ব্যাখ্যাই নেই। দু-একটা চালকবিহীন ফাঁকা অটোরিকশা এখানে ওখানে ঝিমোচ্ছে। বোঝাই যাচ্ছে রাতের প্যাসেঞ্জার নেবার কোনও তাগিদ নেই ওদের। অগত্যা ফুটপাত ধরেই এগিয়ে চলল তিন বন্ধু।
রানা একটা সিগারেট ধরায়। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলে, "তোদের যদি আপত্তি না থাকে, একটা ঘটনা বলি। একেবারে চাক্ষুষ ব্যাপার। এখনও চোখ বুজে ভাবতে গেলেই গায়ে কেমন কাঁটা দেয়। অবিশ্বাস্য, একেবারে অলৌকিক। বিশ্বাস করা না করা তোদের ইচ্ছে। গল্পের অমোঘ টানে রাজু আর মৃদুল তাকায় ওর দিকে। রাজু শুধু বলে, "মন্দ বলিসনি। মুখ বুজে হাঁটতে হাঁটতে বোর হয়ে যাচ্ছিলাম। "
মৃদুলের মুখে ফুটে ওঠে প্রচ্ছন্ন হাসির আভাস। ও বিলক্ষণ জানে, আড্ডা জমানো গল্প ফাঁদতে রানার জুড়ি নেই।
প্রায় শেষ হয়ে আসা সিগারেটটা ফেলে দিয়ে রানা শুরু করে এবার -
"....আমি তখন সবেমাত্র পানাজিতে এসেছি। ব্যাঙ্কে কাজে যোগ দিয়েছি। কাউকেই চিনি না। রাস্তাঘাট, এলাকা সব কিছুই অজানা অচেনা। অফিস বেরোই ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়। বাড়ি ফিরে বই পড়ি, গান শুনি অথবা টিভি দেখি। এভাবেই চলছিল। কিছুদিন পর অফিস কলিগদের মধ্যে গোমেজ নামে একজনের সাথে আলাপটা বেশ জমে গেল। আলাপি, প্রাণবন্ত, ঝলমলে টাইপের একটা ছেলে। ওর আরও দারুণ গুণ হলো চমৎকার মোটরবাইক চালায়। এখানকার রেসিং টুর্নামেন্টে একবার নাকি পুরস্কারও পেয়েছিল। সুতরাং বুঝতেই পারছিস, এরকম একটা শানদার বন্ধুত্বের দরকার ছিল আমার। পরিচিতিটা আর একটু গাঢ় হবার পর থেকে প্রায়ই ছুটি-ছাটায় গোমেজের বাইকে বেরিয়ে পড়তাম। বাড়িতে ওর মা ছাড়া আর কেউ নেই। একমাত্র বোনের বিয়ে দিয়েছে পুনেতে। সুতরাং একেবারে ঝাড়া হাত-পা। আমিও ঠিক তাই।"
মৃদুল এসময়ে হঠাৎ ফাঁক পেয়ে বলে ওঠে, "বড্ড ফেনাচ্ছিস রানা, আসল ব্যাপারটা শুরু কর এবার। মাথা ধরে যাচ্ছে রে"।
রানা অসহিষ্ণু গলায় বলল, "ব্যস্ত হোস না। সে কথাই বলব এবার। খুব শীত পড়েছিল। তেমনি কুয়াশা। জানুয়ারির মাঝামাঝি হবে সময়টা। এক ছুটির দিনে আওয়াদা ফোর্ট দেখতে গিয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, আমার সঙ্গী হয়েছিল গোমেজ। পাহাড়ের গায়ে কবেকার ওই প্রাচীন দূর্গ আর তার কুখ্যাত বন্দিশালা। জায়গাটা যেমন নির্জন তেমন রহস্যময়। অনতিদূরে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা জুয়ারি নদী। প্রাচীনতার গন্ধ মেশানো ঐতিহাসিক জায়গাটা আমাদের টানছিল। আগেই অবশ্য শুনে নিয়েছিলাম এখানকার যাবতীয় বিবরণ। তখনকার দিনে সমুদ্রপথে বোম্বেটে জলদস্যুদের আক্রমণ হত ঘনঘন। তাদের নির্মম আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই যুদ্ধবাজ পর্তুগিজরা এই সুরক্ষিত দূর্গ তৈরি করেছিল।
খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে এসেছে খেয়াল করিনি। ঘড়ি দেখে গোমেজ বললে, 'চলো ফিরি এবার। অনেকটা পথ যেতে হবে।' প্রায় নির্জন ফুরিয়ে আসা বিকেলে আমাদের মোটরবাইকটা সাঁই সাঁই করে হাওয়া কেটে ছুটছিল। মুখেচোখে এসে লাগছে হিমের ছোঁয়া। কনকনে হাড় জমিয়ে দেওয়া ঠান্ডায় সিঁটিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তার একপাশে দীর্ঘ নারকেল বাগান। কখনো চোখে পড়ছিল একটা দুটো পরিত্যক্ত কবরখানা। অনেকক্ষণ থেকেই চায়ের জন্য উসখুস করছিল গোমেজ। আওয়াদা ফোর্ট থেকে লম্বা রাস্তাটা ধরে অনেকটা এগিয়ে আসার পর ডানদিকে চোখে পড়ল একটা জনবিরল ধাবা। হঠাৎই বাইকটা থামিয়ে দিল গোমেজ। বলল, 'চলো, একটু কফি খেয়ে নিই। বড্ড ঠাণ্ডা লাগছে'।
গাড়িটাকে রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে আমরা ভেতরে ঢুকে পড়লাম। অল্প পাওয়ারের দু একটা আলো জ্বলছে। দোকানটায় আমরা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও খরিদ্দার চোখে পড়ল না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল। একটু পরেই কফি আর টোস্ট এসে গেল। খেতে খেতেই মালিকের সঙ্গে কথা বলছিলাম আমরা। বয়সের ভারে জরাজীর্ণ লোকটির বয়স কম হবে না। সঙ্গে ওর হেল্পার নাতি। সে-ই আমাদের কফি আর টোস্ট এনে দিল।
দুঃখ করে বলছিল বুড়ো লোকটি, 'আগে এই ধাবার অবস্থা এত খারাপ ছিল না। লোকজনের আনাগোনা ছিল। বিক্রিবাটাও ভালো হতো। কিন্তু এখন আর তেমন লোকজন আসে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর তো একেবারেই নয়।' কারণ জিজ্ঞাসা করাতে বুড়ো মানুষটির মুখ আরও যেন গম্ভীর দেখাল। ফিসফিস করে সে শুধু উচ্চারণ করল, 'ভয়, সাহেব ভয়। আতঙ্কের জন্যই সন্ধ্যার পর মানুষ এখানে আর আসে না। বুকের ঝোলানো ক্রুশটা একবার স্পর্শ করে সে বলল, 'অচেনা রহস্যময় একটা মোটরবাইক নাকি অনেক রাতে ঘুরে বেড়ায় এখানকার নির্জন রাস্তায়। তার আরোহীকে কেউ দেখেনি। লোকে বলে, যারা সেই মোটরবাইকের সাক্ষাৎ পেয়েছে তারা কেউ বেশীদিন বাঁচেনি। অবশ্য আমরা কোনওদিন দেখিনি। জানি না, সত্যি-মিথ্যে কোনটা আসল!'
'....তোমাদের ভয় করে না এভাবে এখানে থাকতে?'
'...কোথায় যাব সাহেব!' বুড়োর কোঁচকানো মুখে অসহায় হাসি ফুটে ওঠে। 'পেটের টান বড় টান। কোনওরকমে দুটো মানুষের দিন চলে। দিনের বেলা তাও কিছু লোকজন আসে'।
ধাবা থেকে বেরোতে গিয়ে আর এক বিপত্তি। মোটরবাইকটায় স্টার্ট দিতে গিয়ে গোমেজ দেখল স্টার্ট নিচ্ছে না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। জনবসতি সেরকম একটাও চোখে পড়ছে না। একটু আগে শোনা বুড়ো ধাবামালিকের কথাগুলো অবিশ্বাস্য মনে হলেও কেমন যেন ভাবিয়ে তুলেছিল আমাদের। আমাদের সঙ্গের ব্যাগে বড় একটা টর্চ ছিল। গাড়ির ছোটখাটো ঝামেলাগুলো গোমেজ নিজেই সারাতে পারে। আমাকে টর্চটা ধরতে বলে ও ধাবার পাশেই বাইকটাকে নিয়ে কাজে লেগে গেল। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে। কনকনে ঠাণ্ডা হিম যেন বরফের মতো ঘিরে ধরছিল আমাদের। একনাগাড়ে ভারী টর্চটা ধরে রাখতে রাখতে হাতটা যেন অবশ হয়ে আসছিল আমার। ঝোপজঙ্গল, পরিত্যক্ত কবরখানা, অন্ধকার আর এই ভূতুড়ে নির্জনতা - য় থেকে থেকে আমার মন কু-ডাক ডাকছিল। অধৈর্য হয়ে ভাবছিলাম, কতক্ষণে ওর কাজ শেষ হবে।
একসময় স্বস্তির একটা শব্দ করে উঠে দাঁড়ায় গোমেজ। মোটরবাইকে স্টার্ট নিয়ে বলে, "যাক, এযাত্রায় উদ্ধার করা গেল। পানাজি পৌঁছতে এমন কিছু সাঙ্ঘাতিক দেরী হবে না। " বলতে বলতে চটপট উঠে পড়লাম আমি ওর বাইকটায়। তখন কি বুঝতে পেরেছিলাম, পথের বাঁকে কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য!"
রানা হঠাৎ চুপ করে যায়। এতক্ষণ ওরা বড় রাস্তাটা পেরিয়ে এসে সি-বিচের দিকে ঘুরেছে। বৃষ্টি আর পড়ছে না। অথচ কালো আকাশ যেন পাঁশুটে বাঘের মতোই ওৎ পেতে রয়েছে। কালো অন্ধকার সমুদ্রের দিক থেকে সি-বিচ ছুঁয়ে ছুটে আসছে হাওয়ার অবিশ্রান্ত ঢেউ। সাগরের ঢেউগুলো যেন আসন্ন বৃষ্টির আভাস পেয়ে আরও বন্য আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রানা আবার তার কাহিনীর খেই ধরে -
"...হিম রাত নেমে আসা সুনসান রাস্তায় হেডলাইটের জোরালো আলোয় আমাদের মোটরবাইকটা যেন উড়ে যেতে থাকে। চুপচাপ গাড়ি হাঁকাচ্ছে গোমেজ। ওর মতো আড্ডাপ্রিয় মানুষকে এরকম চুপ হয়ে যেতে দেখিনি এর আগে কখনো। আমিও কথা বাড়াইনি।
রাস্তাটা এবার সামান্য খাড়াই হয়ে ওপরের দিকে উঠছে। হেডলাইটের কুয়াশা-ম্লান আলোয় সামনের যেটুকু নজরে আসছিল একেবারে ফাঁকা সুনসান। শুধু চাপ-চাপ কুয়াশা আমাদের চারপাশে যেন এক অতিপ্রাকৃত জগৎ নিঃশব্দে গড়ে তুলেছিল। হঠাৎ ভীষণভাবে চমকে উঠলাম আমি। উল্টোদিক থেকে কি যেন একটা ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে এদিকেই। কিসের গাড়ি ওটা? এই নির্জন রাস্তায়, এত রাতে.....!
বাইক চালাতে চালাতেই কেমন যেন ভয়ের গলায় গোমেজ বলে ওঠে, '....মনে হচ্ছে একটা মোটরবাইক আসছে।' তবে কি.... ভেতরে ভেতরে যেন এক প্রবল জ্বরের তাড়সে কেঁপে উঠলাম আমি।
তক্ষুনি ঘটে গেল ব্যাপারটা। খানিক উঁচু হয়ে যাওয়া রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে হঠাৎই যেন ঘন কুয়াশার ঘেরাটোপ ছিঁড়েখুঁড়ে জেগে উঠল দ্রুত ধাবমান একটা গাড়ির শিল্যুট। আমরা যেন কুয়াশায় মোড়া এক অলৌকিক ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছি। ছুটে আসছে গাড়িটা, দূরত্ব কমছে। তারপর একসময় ঝোড়ো হাওয়ার মতো উল্টোদিকের মোটরবাইকটা আমাদের পেরিয়ে এক মূহুর্তে দূরের কুয়াশায় হারিয়ে গেল। একইসঙ্গে অদ্ভুত একটা ভয়ের আওয়াজ বেরিয়ে এলো আমাদের গলা থেকে। এইমাত্র কুয়াশায় মিলিয়ে যাওয়া গাড়িটার কোনো আরোহী ছিল না। ততক্ষণে নিজের মোটরবাইকটা থামিয়ে দিয়েছে গোমেজ। হেডলাইটের আলোয় মনে হলো ও কাঁপছে। আমার অবস্থাও ওরই মতো। ধাবার বুড়ো মানুষটার কথাগুলো যদি সত্যি হয়? তবে....
গোমেজ শুধু ফিসফিস করে আমায় বলল, "তুমি ঠিক দেখেছ সেনগুপ্ত, সত্যি ওই মোটরবাইকটায় কোনও আরোহী ছিল না? কি করে সম্ভব! না, না, কুয়াশায় আমাদের দুজনেরই হয়তো দেখার ভুল হয়েছে! আমিও যেন তখন হারিয়ে ফেলেছি মুখের ভাষা। গোমেজ আর দেরী করল না। মূহুর্তে আবার স্টার্ট দিল গাড়িতে। ফেরার বাকি পথে আমরা আর একটাও কথা বলিনি। সেদিন প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু বেশী রাতেই বাড়ি ফিরেছিলাম।
এতক্ষণ একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে একটু দম নিল রানা। কেমন অপ্রস্তুত গলায় বন্ধুদের বলল, "আর মিনিট দশেক। প্রায় এসে গেছি আমরা।"
মৃদুল আস্তে আস্তে বলে, "তারপর কি হলো? কাহিনীর শেষটা এবার বলে ফ্যাল"।
রানা বন্ধুদের মুখের দিকে একবার তাকায়। বলল, "গত বছরেই পুজোর সময়ে মোটরবাইক দূর্ঘটনায় মারা যায় গোমেজ। সে সময়ে আমি আবার এখানে ছিলাম না। বোনের কাছে পুণে গিয়েছিলাম। খবর পেয়ে ছুটে আসি পানাজিতে। সেদিনও নাকি মোটরবাইক চালাচ্ছিল গোমেজ। একটা লোডেড মিলিটারি ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে ওর বাইকের। এত ভালো গাড়ি চালাত গোমেজ। কি করে যে দূর্ঘটনা ঘটল, আজও আমি বুঝে উঠতে পারিনি। শুধু মনে হয়, সেদিনের ওই রক্তজল করা অভিজ্ঞতা, রহস্যময় চালকবিহীন মোটরবাইক, তবে কি মৃত্যুর কোনো আগাম সঙ্কেত ছিল? সেই থেকে অদ্ভুত একটা আতঙ্ক আমার মনের মধ্যেও ঢুকে গেছে। আমিও যে শরিক ছিলাম ওই অলৌকিক ঘটনার।"
ওরা হাঁটতে থাকে। কেউ আর কথা বলে না। যেন হঠাৎ এক ভয়ের আভাস পেয়ে ফুরিয়ে গেছে ওদের সব কথা। ওদের ডানদিকে রাতের সমুদ্র। ঢেউ আর হাওয়ার তুমুল হল্লা কানে এসে আছড়ে পড়ছিল। এবার ওরা একটা ছোট্ট গলিরাস্তায় ঢুকে যাবে। তারপরই বাড়ি। রাতের বিশ্রাম আর আরামের ঘুম। ওরা পা চালায় দ্রুত।
হঠাৎ ওদের ভীষণরকম চমকে দিয়ে রাস্তার আলোগুলো সব নিভে গেল। লোডশেডিং। রাজুর হাতের পেন্সিল টর্চটা জ্বলে ওঠে একবার। আর তক্ষুনি অনেকটা দূর থেকেই যেন একটা যান্ত্রিক শব্দ শুনতে পায় ওরা। নির্জন অন্ধকার সি-বিচের রাস্ত দিয়ে কি যেন একটা ভয়ঙ্কর বেগে ছুটে আসছে। হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ে ওরা। অন্ধকারেই ফ্যাকাসে রক্তশূন্য হয়ে ওঠে রানার মুখ। রাজুর কাঁপা হাতে অস্বচ্ছ আলোর বৃত্তটা ছড়িয়ে পড়ছে।
লোডশেডিং-এর অন্ধকারে যেন ঝোড়ো হাওয়ার মতোই ছুটে আসছে একটা মোটরবাইক। রানা ফিসফিস করে কি যেন বলে ওঠে। ওদের বিস্ফারিত চোখের সামনে দিয়েই অন্ধকারে দূরে কোথায় হারিয়ে যায় রহস্যময় গাড়িটা। রাজুর পেন্সিল টর্চের আলোয় আজও দেখার ভুল হয়নি রানার। চালকবিহীন একটা অলৌকিক মোটরবাইক। তক্ষুনি লোডশেডিং-এর খোয়াব ভেঙে জ্বলে ওঠে সি-বিচের আলো। রানা কোনো কথা বলে না। ওর মনে একটাই প্রশ্ন জেগে উঠতে থাকে, এবার না জানি কার পালা!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now