বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
প্রহরী
এক
নিজের বাসা ছেড়ে কখনো অন্যের বাসায়
থাকতে হবে এমনটা ভাবতে পারেনি ঊর্মি। আগুন
লেগে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাবার চাকরিটা হঠাৎ
করে চলে গেল। তবুও প্রথম কয়েকমাস তারা ভাড়া
বাসাতেই ছিল; বাবা খুব চেষ্টা করলেন একটা
চাকরী যোগাড় করতে। প্রায় রিটায়ার্ডমেন্টের
সময় হয়ে যাওয়া একজন মানুষকে চাকরী দিতে
চায়না কেউ। পরিচিত যেসব কোম্পানিতে আফজাল
সাহেব প্রায়ই যেতেন অফিসের কাজে, তাদের
কর্মকর্তারা পারলে মুখ লুকিয়ে বাঁচে। অথচ আগে
কি কদর ছিল! আফজাল সাহেবও এতটা
মেরুদণ্ডহীন নন; সম্মান বজায় রেখে যতটুকু
বলা যায় একটা চাকরীর ব্যাবস্থা করে দেওয়ার
জন্য তিনি ঠিকততটুকুই বলেছেন। সবাই আশ্বাস
দেয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়না।
দেখেশুনে তিনি পরিবারের সবাইকে গ্রামের
বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন, ঊর্মিও চলে যেত, যদি না
আর পাঁচমাস পর তার ইন্টারমিডিয়েট ফাইনাল পরীক্ষা
থাকত। খালার বাসা থেকে কলেজ প্রায় ত্রিশ কিমি
দূরে, মা একপ্রকার খালার হাতে গছিয়েই দিয়ে
গেল তাকে। সে কত করে বলেছেঃ কোন
অসুবিধা হবে না মা, আমি নিজে নিজেই পারব।
মার সেই একযুক্তি, ইন্টারের সায়েন্স কি যেন
তেন কথা! কোচিং, ক্লাস, প্রাক্টিক্যাল না করে
পাশ করা যায়? কেউ শুনেছে কখনো!
-টাকা, টাকা আসবে কোথা থেকে মা? বাবা কোথা
থেকে কোচিং এর খরচ যোগাড় করবে? আর
প্রতিদিনের আসা যাওয়ার ভাড়া? সেও তো কম না!
মা ধমক দিয়ে বললঃ এত অল্প বয়সে পাকনামো
দেখনো লাগবে না, সেটা তোমার বাবা
দেখবে।
মা আর ছোটভাইটা গ্রামে একলা কি করে যে দিন
কাটাচ্ছে!
বাবার সাথে তাও প্রতি সপ্তাহে একবার দেখা হয়।
প্রতি শুক্রবার এসে দেখে যান তিনি ঊর্মিকে। বাবা
মানুষটাই অন্যরকম, সবসময় হাসিখুশি! এই যে এত ঝড়
তুফান যাচ্ছে তার উপর দিয়ে কেউ চেহারা
দেখে বলবে?
খালার বাড়ির উঠোনে এসেই ঊর্মি করে এক হাঁক
দিবেন, যেন সে এখনো খুকী। লজ্জাই লাগে
তার। এটা কি নিজেদের ঘর?
ঘণ্টাখানেক বসে সবার সাথে আড্ডা দিয়ে আবার
ফিরে যান শহরে, কোন এক বন্ধুর মেসে
উঠেছেন আপাতত। ওই বন্ধুর অফিসেই একটা
চাকরী হবে হবে করে ঝুলে আছে গত দুই
সপ্তাহ ধরে। বাবা যতবারই আসেন যাওয়ার সময় তার
হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে যান।
ঊর্মি অবাক হয়ে ভাবে, চাকরী বাকরি নেই বাবা
টাকা পায় কোথায়?
জিজ্ঞেস করবে করবে ভেবে করা হয়না।
আসলে আফজাল সাহেব সুযোগই দেন না। টাকাটা
দিয়েই, মাথায় হাত বুলিয়ে বের হয়ে আসেন।
আর বলেনঃ ঠিক মত পড়িস রে বেটি।
ঊর্মি বাবাকে বলতে পারেনা পরের বাসায় থাকলে
স্বাধীনভাবে পড়ালেখা করা যায়না বাবা। পড়ালেখা
করতে হয় কাজের ফাঁকে ফাঁকে। কলেজ
থেকে ফিরে খালার তিন মেয়ের কাপড় ধুতে হয়
ঊর্মিকে। সে আসার কিছুদিন পর কাজের মেয়েটা
চলে যায় তিন বোনের হুকুমের অত্যাচার সইতে
না পেরে। মেয়েগুলোর নাম অদ্ভুত তোচন,
নোটন আর ছোটন। কেউই তেমন পড়াশুনা
করেনি। ঘুরেফিরে সময় কাটে তাদের। ঊর্মি
আসার পর তাদের আরেকটা কাজ যুক্ত হয়েছে,
কিভাবে তার পেছনে লেগে থাকা যায় সারাক্ষন।
যেমন গতকাল রাতে পড়ার টেবিলে বসা মাত্রই
তোচন নাকি সুরে বলল, তিনকাপ চা বানিয়ে দাওনা
ঊর্মি আপা। তোমার হাতে চা বেশ ভাল হয়। বাসায়
মেহমান এসেছে।
ঊর্মি পড়ে গভীর রাতে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে,
যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় তখন। তাও রাজ্যের
অভিযোগ, সারারাত খুটখাট শব্দের জন্য নাকি তারা
ঘুমাতেই পারে না। ঊর্মি সারারাত যে পড়ে তা কিন্তু
না, বেশীর ভাগ সময় বড় জানালাটা দিয়ে তাকিয়ে
রাতের আকাশ দেখে। খালাদের নিজেদের বাড়ি,
তাই জানালাটা কত বড়! শহরের জানালাগুলো কেমন
মুরগীর খোপের মত। একটুখানি আকাশ দেখা যায়।
যেন আকাশ দেখার অধিকারটাও টাকা দিয়ে কেনা;
যাদের যত বেশী যত টাকা, তাদের জানালা তত
বড়, তত বেশী আকাশ যায় দেখা।
খালা এসব দেখেও দেখে না। তবে মানুষ
হিসেবে তেমন খারাপ না, খালি মেয়েদের
পড়ালেখার গুরুত্বটাই বোঝেন না। খালু যে তিন
মেয়ের আচরণে বেশ বিরক্ত সেটা বোঝা যায়।
মাঝে মধ্যে খালাকে বলেই ফেলেনঃ
মেয়েটাকে দিয়ে কাজ করানোর জন্য তোমার
বোন তোমার কাছে পাঠায়নি।
খালা প্রতিউত্তরে বলেনঃ কি আর এমন কাজ, ঘরে
কাজের কেউ নেই। তোমার তিন মেয়ে তো
কিছুই পারে না তাই মাঝে মধ্যে একটু সাহায্য করে
আমাকে।
আজ হয়েছে এক কাণ্ড! খালু কোথা থেকে
এক কাজের মেয়ে ধরে এনেছেন, সে
কখনো ঘরের ভিতরে টয়লেট ব্যবহার করেনি।
কোনভাবেই সে টয়লেটে যাচ্ছে না। কারন
জিজ্ঞেস করলে সে কিছু বলে না।
পরে খালা ধমক দিতেই সে বলল, বাগিচা ছাড়া তার এই
কাজের অভ্যেস নেই!
শুনে সবাই হেসে গড়াগড়ি। ছোটন তো সত্যিকার
অর্থেই মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছিল। খালু ধমক দিয়ে
সবাইকে থামালেন। এরপর তিনি এমন এক কাজ
করলেন যা শুধু তাকে দিয়েই সম্ভব। টয়লেটের
উপর তিনি চারখন্ড ইট রেখে, ভিতরে হাফডজন
ফুলের টব ঢুকিয়ে, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে
বললেনঃ নে এবার যা তোর বাগিচায়।
দুই
কলেজে ক্লাস শুরু হয় দশটায়, নয়টায় দিদার স্যারের
কোচিং তাই বাসা থেকে বের হতে হয় সাতটায়।
রোজ এই সময় খালা ঘরের সামনের আমগাছটাকে
নয়বার ঝাড়ু দিয়ে বাড়ি দেন। গত সোমবার এক ওঝা
এসেছিল, সে বলেছে মহিলা মানুষের উপর
ভূতের আছর হলে যেমন তাদের বাচ্চা হয়না,
তেমনি গাছের উপর খ্যাখ্যা ভূতের আছর হলে
সেই গাছ বাঁজা হয়ে যায়। কারন খ্যাখ্যা ভূত সব মুকুল
খেয়ে ফেলে। ৪০ দিন একটানা ঝাড়ুপেটা করলে
ভূত এই গাছ ছেড়ে পালাবে।
খালু বিষয়টা জানে না। জানলে এক ধমকে সব ঠাণ্ডা
করে দিত।
ঊর্মি মুচকি হেসে পা বাড়ায়, দেরী হয়ে যাচ্ছে।
লোকাল বাসে চড়ে ৩০-৩৫ কিমি পাড়ি দেয়া কম
ঝাক্কির ব্যাপার নয়।
তিন
ধুর! আজ না এলেই হত। কলেজের অবসর
প্রাপ্ত একজন শিক্ষক মারা গিয়েছেন। তাই স্যাররা
সবাই ওখানে। ক্লাস, কোচিং কিছু হবে না।
কি করা যায়, কি করা যায় ভাবতে ভাবতে ঊর্মি বাবার
মেসের দিকে রওনা দিল। লতিফ চাচা যে মেসে
থাকেন সেটার ঠিকানা একবার বাবা বলেছিল কথা
প্রসঙ্গে। বেশ হবে বাবাকে চমকে দিয়ে।
সমস্যা হল বাবা থাকবে তো? দশটায় লতিফ চাচার
অফিস, এখন সাড়ে আটটা বাজে। ঊর্মি একটা রিকশা
ডেকে নিল। বহুদিন পর! রিকশায় চড়াটা এখন তাদের
জন্য বিলাসিতা।
চার
লতিফ চাচা মেসেই আছেন, বাবা নেই। তিনি
ঊর্মিকে দেখে চমকে উঠলেনঃ মা তুই?
-বাবা কোথায়?
লতিফ চাচা আমতা আমতা করে জবাব দিলেনঃ কাজে
গিয়েছেন হয়ত।
-বাবা কি চাকরিটা পেয়েছেন?
লতিফ সাহেব সহজ সরল মানুষ, ভাল মিথ্যে বলতে
পারেন না। মিথ্যে বলতে গেলেই সব গুলিয়ে
ফেলেন।
-চাকরী? ও হ্যাঁ! চাকরীতো সেই কখন
থেকেই করে তোর বাবা।
-চাচা আমি জানতে চাইলাম বাবা কি আপনার অফিসে
চাকরিটা পেয়েছেন?
শুন্য দৃষ্টিতে তিনি ঊর্মির দিকে তাকিয়ে আছেন।
-বাবা কোন বিছানায় থাকেন চাচা? বাবার কাপড় চোপড়
কোথায়?
-মারে তোর বাবা আমার এখানে থাকেন না। কোন
মানুষের অনুগ্রহ নেয়ার মত মানুষ আফজাল নয়।
ঝরঝর করে চোখের পানি পড়ছে লতিফ
সাহেবের।
-বন্দরে বদলী দারোয়ান হিসেবে চাকরী
করে আফজাল, কোনদিন ডিউটি থাকে কোনদিন
থাকে না। আবার কখনো কখনো সারারাত নাইট করার
পর মর্নিং ও করে যদি কেউ সুযোগ পায়।
ঊর্মি পাথরের মত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে সব কথা
শুনছে।
-রাতে কোথায় থাকে বাবা?
-বন্দরেই থাকে, গার্ড রুমের নিচে বিছানা করে।
বাবার চেহারা দেখে বুঝিস না সে কোথায় থাকে,
ঘুমায় নাকি নির্ঘুম দাঁড়িয়ে থেকে রাত কাটায়? আমার
এখানে প্রায়ই আসে হেঁটে হেঁটে। আমি
জোর করে ভাত খাইয়ে দিই, তাই আসতে চায়না।
সারারাত বদলি ডিউটি করে যে টাকা পাওয়া যায় সেটা
দিয়ে কি আজকাল তিনবেলা ভাতের পয়সা হয়?
অথচ ছাত্রজীবনে আমরা কত টাকা ধার নিয়েছি
তোর বাবার কাছ থেকে, আজো ফেরত
দেইনি। একবার আমার জ্বর হয়েছিল, আমি জ্ঞান
হারিয়ে ফেলেছিলাম। তোর বাবা সারারাত আমার মাথায়
পানি ঢালল, গা মুছিয়ে দিল। অথচ সেদিন যখন এল,
সে কি কাশি, আমি যখন বললাম চল ডাক্তারের কাছে
নিয়ে যাই। ওমনি ফোঁস করে উঠল! ডাক্তার
দেখাবার মত নাকি কিছুই হয়নি।
-চাচা, বাবার ঠিকানাটা আমাকে দিন।
-সেকি! ওখানে যেয়ে বাবাকে লজ্জায় ফেলিস
না।
-না ফেলব না। আপনি ঠিকানা দিন।
লতিফ সাহেব একটা কাগজে ঠিকানা লিখে মাথা নিচু
করে বাড়িয়ে ধরলেন কাগজটা।
পাঁচ
গভীর রাত!
ঊর্মির খোলা চুল এলোমেলো, সে জানালা
দিয়ে তরল আঁধারের সমুদ্র পানে তাকিয়ে আছে।
খুব দূরে টিমটিম করে তারা জ্বলছে নিভছে।
যেন গভীর সমুদ্রে দোদুল্যমান ভেসে থাকা
লণ্ঠন। বিষণ্ণ মৃদু বাতাস তার গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে,
সেই বাতাসে মিশে আছে রুধির অশ্রুজল।
এত দূর থেকেও যেন ঊর্মি তার বাবাকে
দেখছে, নতজানু হয়ে তিনি স্যালুট ঠুকছেন বড়
সাহেবদের। তাদের সন্তুষ্ট করতে পারলেই
পার্মানেন্ট হয়ে যাবে চাকরিটা।
শহরের অন্যপ্রান্তে আফজাল সাহেব তখন
আকাশের পানে তাকিয়ে শুকরিয়া আদায় করছেন,
কাল সকালেও একটা ডিউটি পাওয়া গিয়েছে। এই
সপ্তাহের ৫০০ টাকা নিয়ে চিন্তা নেই, গ্রামেও টাকা
পাঠানো যাবে। চোখের ছোট মণিতে অনন্ত
নক্ষত্রের ছায়া টলমল করে উঠল। বহুদূরের
গ্রামে বউটা কেমন আছে কে জানে? কি দিয়ে
ভাত খেয়েছে আজ? ছোট ছেলেটা তো
বিস্কিট ছাড়া বিকালে নাস্তাই করতে চায়না।
যতই ক্ষুদ্র হোক, মানুষের চাওয়া পাওয়ার হিসেব না
মেলাটাই নিয়তি।
***
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now