বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

মধ্যাহ্নে বৃষ্টি

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X মধ্যাহ্নে বৃষ্টি -অনেকখুন ধইরা বইসা আছেন। চা সিকারেটের টাহা দ্যান। দোহান বন্দো করুম। ইমু কিছুক্ষণ দোকানদারের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দেখল দোকানদারের চোখে মুখে চিমসা বিরক্তি। এরা খুব দ্রুতই বিরক্ত হয়ে যায়। বিরক্তির রঙ এদের পুরনো কাপের তলার চায়ের দাগের মতই কালচে খয়েরি। ইমু পকেট থেকে নতুন একটা একশো টাকার নোট বের করে দিল। এতেও দোকানদারের চিমসা বিরক্তির পরিবর্তন হল না। সে চা সিগারেটের টাকা রেখে বাকি টাকা ফেরত দিল। ইমু বলল- ভাইজান, আসি। আবার আসবো। তখন চায়ে দুধ চিনি বেশি দিবেন। আজকেরটা আপনার মেজাজের মতই কড়া হয়েছে। দোকানদার কাপ ধোয়া বন্ধ করে হা হয়ে তাকিয়ে আছে ইমুর দিকে। দুপুর বেলা। কার্তিক মাসের রোদে সব জ্বলে যাচ্ছে। রাস্তা ঘাট স্বভাবতই ফাঁকা দুপুরের রোদের কারণে। ইমু আজ টিউশানির বেতন পেয়েছে। তার পকেটে এখন পাঁচশো টাকার দুটো নোট ও একশো টাকার চারটে চকচকে নোট। টাকাগুলো পকেটে নিয়ে হাঁটতে তার ভালই লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে সে চিন্তা করলো গত দুই দিন সে আদিবকে পড়াতে যাচ্ছে না। কারণ আদিব তাকে বলেছে আগামীকাল আমার জন্মদিন স্যার। আমি আগামীকাল পড়বো না। তাই সে সেদিন যায়নি। তার পরেরদিনও যায়নি। যায়নি ইচ্ছে করেই। থাকুক না জন্মদিনের রেশ আরেকটা দিন। অতি ধনীদের উৎসব একদিনে শেষ হয়না। শেষ হলেও তার রেশ থাকে কয়েকদিনের জন্য। আজো যাবার ইচ্ছে নেই ইমুর। কিন্তু যেতে হবে। পকেটে যখন টাকা আছে তখন তার জন্য কিছু একটা কেনাই যায়। এতে দোষের কিছুই নেই। ইমু চট করেই একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে গেল। দেখে শুনে একটা বই কিনল। বইয়ের নাম জাদুকর। হুমায়ুন আহমেদের বই। সেই সাথে সে সুন্দর একটা কলম কিনল। জাদুকরী কলম। কলম দিয়ে লিখলে কোন লেখা দেখা যায় না। কলমের মাথার আলো লেখায় ফেললে লেখা ফুটে ওঠে। কি আজব কাণ্ড কারখানা। পৃথিবী কত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সব কিছুই চোখের সামনে। একসময় পৃথিবী তার সঙ্গী বানাবে। মানুষ সেখানে বাস করতে শুরু করবে। পৃথিবীর মানুষ সেইখানে বেড়াতে যাবে। আসলেই কি এতসব হবে? এইসব ভাবতে ভাবতে ইমু এসে থামল রাস্তার পাশের এক ছোট হোটেলের সামনে। হোটেলের নাম গেদু হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। ইমুকে দেখেই হোটেলের মালিক বলল- ইমু ভাই যে! কই থাকেন আইজ কাইল? দেহা পাওন যায় না। -কিছুটা ব্যস্ত ছিলাম গেদু ভাই। সময় পেতেই চলে এলাম। আইয়া ভালই করছেন। আইজকাই তেহারি পাক হইছে। বহেন। হাত মুক ধুইয়া বহেন। খাওন দিতে কই। ইমুর সামনে গরম তেহারি। একটা ছোট প্লেটে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও শসা দেয়া হয়েছে। গেদু মিয়া গল্প করার জন্য ইমুর সামনে এসে বসেছে। রান্না তো মাসাআল্লাহ ভাল হয়েছে। -সবই আপনাগো দোয়া ভাই সাহেব। তয় আগের মত অত খিয়াল দিতে পারি না এদিগে। সংসারের ভেজালে সময় হয়না। আপনাগো ভাবী কয় গেরামে যাইব। পোলা নাকি হারাদিন এদিক সেদিক ঘুইরা বেড়ায়। খারাপ পোলাপাইনের লগে চলে। রুটিন করে দোকানে বসান। ব্যবসা দেখুক। আপনার রান্নার হাত যা তাতে আপনার ব্যবসা ভবিষ্যতে চার গুণ হবে। এখন ছেলে যদি ব্যবসা বুঝে যায় তবে ভবিষ্যতে আপনার পরিশ্রম কম হবে। -ভাইজান আপনের মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। ভেজাল চন্দন না, খাঁটি চন্দন। কথাডা যুক্তির বলেছেন। আকাম করনের চাইতে কাম করুক। ব্যবসা দেহুক। খাওয়া শেষ করে ইমু কিছুক্ষণ দোকানে বসে গেদু মিয়ার সাথে গল্প করলো। নানান বিষয় নিয়ে তাদের মাঝে আলোচনা হল। বিকেল হয়ে যাচ্ছে। এখন তার আদিবকে পড়াতে যাবার সময়। সে গেদু মিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হল আদিবদের বাড়ির দিকে। আসলে বাড়ি নয়, প্রকাণ্ড এক বাড়ি। চারিদিক উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা একটি তিনতলা মার্বেল পাথরের বাড়ি। বাহিরের মানুষের কাছ থেকে বাড়িকে আড়াল করার জন্য বাড়ির সামনের গেটটাও বিশাল। সচরাচর এমন গেটে দু একটা ফুটো থাকে যা দিয়ে তাকালে বাড়ির ভেতর দেখা যায় কিন্তু এই গেটে কোন রকম ফুটো নেই। ইমু এখন প্রকাণ্ড বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বিশাল বাড়ির দারোয়ানগুলোও হয় বিশাল রকমের আলসে। তারা কাউকেই তোয়াক্কা করে না বাড়ির লোকজন ছাড়া। যদি কোন মন্ত্রী পর্যায়ের লোকও আসে তবে তারা নির্বিকারভাবে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে এসে গেট খুলবে। জিজ্ঞেস করবে কাকে চাই। আদিব গিফট পেয়ে মহা খুশি। সে জাদুকরী কলম নিয়ে দৌড়ে সুপ্রার ঘরের দিকে গেল। ফিরে এল মন খারাপ করে। কি হয়েছে? -আপি জাদুকরী কলম পছন্দ করেনি। আপু করেনি তো কি হয়েছে? তুমি করেছ তো? যেহেতু গিফট আমি তোমাকে দিয়েছি সেহেতু তোমার পছন্দ অপছন্দ বিবেচ্য। অন্য কারোর নয়। -জি স্যার। ঠিক বলেছেন। এটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমি আমার বন্ধুদের জাদু দেখাব এটা দিয়ে। যখন ওরা আমার সাথে দুষ্টামি করবে তখন এটা দিয়ে আমি ওদের নাম লিখে রাখবো। নামের পাশে একটা করে গালি লিখব। খারাপ গালি না, ভাল গালি। যেমন ধরুন... থাক। বলার দরকার নেই। সুপ্রা আদিবের বড় বোন। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করছে। কিন্তু তাকে দেখলে মনে হয় না তার মধ্যে সাহিত্যের কোন ছিটে ফোটা আছে। তার অসম্ভব সৌন্দর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রাগ। এখন সে বাগানে বসে আছে। নিয়ম করেই সন্ধ্যার আগে আগে সে বাগানে বসে বই নিয়ে। তখন তার কাছে কেউ যায় না। এমনকি তার বাবা জামিলুর রহমানও না। সুপ্রা এখন থমাস হার্ডির Tess of the D’Urbervilles পড়ছে। গভীর মনোযোগ তার। হঠাৎ বই থেকে চোখ তুলতেই ইমুর দিকে চোখ গেল তার। ইমু তার ছিঁড়ে যাওয়া জুতা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে গেটের দিকে যাচ্ছে। আর মনে মনে বলছে এখানেই তোর জীবনাবসান? কোন গরীবের বাড়িতেই পরলোক গমনে যেতে পারতি? যাই হোক অতি ধনীদের বাড়িতে মারা যাবার সৌভাগ্য অর্জন করলি তুই। এটাও অনেক বড় ব্যাপার। সুপ্রা ইমুর দিকে এগিয়ে এলো। পায়ে কি হয়েছে আপনার? -কিছুই না। জুতা ছিঁড়ে গিয়েছে। আপনার উচিত ছিল আদিবকে গিফট না দিয়ে একজোড়া জুতা কেনা। -আপনি কি এভাবেই কথা বলেন? মানে এমন কঠিন ভাষায়ই কথা বলেন? হা হা হা। আমি কঠিন ভাষায় কোন কথাই বলিনি। আগে প্রয়োজন তারপর শখ। বুঝেছেন? -জি। একটা প্রশ্ন করব? করুন। আসুন বসে কথা বলি। -কোন কারণে কি আপনার মন খারাপ? I wish I had never been born.. there or anywhere else!! -থমাস হার্ডি পড়ছিলেন? জি। -মন খারাপের কারণ কি এটাই? জি। -এই উপন্যাসে লেখকের কোন কথাটা আপনার ভাল লেগেছে? যেটা বলেছেন ওটাই? হ্যাঁ। আমার মনে হয় পুরো উপন্যাসে এই কথাটাই চমৎকার। -আমাদের যখন মন খারাপ হয় বা থাকে তখন প্রকৃতি খুব অদ্ভুত এক বিষয় আমাদের দেয়। প্রিয় কোন স্মৃতি, কোন কথা তখন বারবার মনে পড়ে। সেটাই বলার বা করার চেষ্টা করি আমরা। সেটাকেই ভাল লাগে আমাদের। মনে হয় এটাই সুন্দর, অদ্বিতীয়। নিজেকে সান্তনা দেবার একটা প্রক্রিয়ার চমৎকার আয়োজন। কিন্তু যখন মন ভাল থাকে তখন কিন্তু আমাদের এই ক্ষমতা দেয় না প্রকৃতি। সুন্দর বলেছেন। তবে কি আপনার পছন্দ ভিন্ন? -The beauty or ugliness of a character lay not only in its achievements but in its aims and impulses; its true history lay, not among things done but among things willed. আজ আসি। ভাল থাকবেন। ইমু ছেঁড়া জুতা হাতে নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেল। সুপ্রা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ইমুর দিকে। তার দৃষ্টি করুণ। ভোর হচ্ছে। আলো নিভানো ঘরে শেষ রাতের অন্ধকার ভেদ করে কুয়াশার মত কিছুটা আলো জানালা দিয়ে সুপ্রার পায়ের কাছে পড়েছে। সুপ্রার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যাবার ব্যাপারটা বিশ্রী লাগে সুপ্রার কাছে। সে একটা স্বপ্ন বারবার দেখছে ইদানিং। সন্ধ্যার পর সে ঘরে বসে গান শুনছে। আকাশ ভেঙ্গে জোৎস্না নেমেছে। সে জোৎস্না দেখার জন্য জানালা দিয়ে আকাশে তাকাতেই দেখে দুইটা চাঁদ। একটা ছোট, একটা বড়। আর তখনই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আজ সুপ্রা ঠিক করলো ব্যাপারটা আদিবের স্যার ইমু সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। সে এর ব্যাখ্যা দিতে পারবে নিশ্চয়ই। হঠাৎ ইমু সাহেব কেন? তিনি সুন্দর করে কথা বলেন এজন্য? সুপ্রা ভাবতে ভাবতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। চারিদিক নিস্তব্দ। কিছু ঘুম ভাঙ্গা পাখির ডাকাডাকি শোনা যাচ্ছে। সুনসান নিরবতার মাঝে সুপ্রা ভোর হওয়া দেখছে। সে ঠিক করলো আজ ইমু সাহেবের কাছেই তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইবে সে। আদিবকে ইমু আজ পড়াতে আসেনি। সুপ্রা এর মাঝেই দুবার আদিবের ঘরে এসে খোঁজ নিয়ে গেছে তার স্যার এসেছে কিনা? খোঁজ নিয়ে সুপ্রা বাগানে গিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ পর আবার ফিরে এলো আদিবের ঘরে। কিছু বলবে? -তোর জাদুকরী কলমের ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করতো আমার কাছে? আমার কাছে এটা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য আপি। তুমি এটা দিয়ে লিখবে কিন্তু খালি চোখে কিছুই দেখা যাবে না। -তাহলে কি চোখ বন্ধ করে দেখতে হবে? আদিব অবাক হয়ে সুপ্রার দিকে তাকিয়ে আছে। কি বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। সুপ্রা তার সাথে দুষ্টামি করে কথা বলছে এটা আদিবের বিশ্বাসই হচ্ছে না। কারণ সুপ্রা প্রয়োজন ছাড়া এ বাড়ির কারোর সাথে কথা বলে না। আর দুষ্টামি তো দূরের কথা। কি হল বললি না কিভাবে দেখতে হবে? -তুমি যা লিখবে তা এই কলমের মাথার আলো ফেলে দেখতে হবে। আর কোন ভাবেই দেখা সম্ভব না। তোমাকে কি এখন লিখে দেখাবো? আমার ডায়েরিতে লেখা আছে এই কলমের। ওটাও দেখতে পারো। -এখন দেখব না। তুই আমাকে ডায়েরি আর কলমটা দে। আমি দেখে নেব। এখন বল এই যে তোর স্যার নিয়মিত আসেন না এটার কি একটা বিচার হওয়া দরকার না? তোর কি মনে হয়? আদিব আবার ভয়ে চুপসে গেছে। সে এখন আবার সুপ্রার দিকে তাকিয়ে আছে। এই মানুষটাই কিছুক্ষণ আগে তার সাথে কত সুন্দর করে কথা বলেছে আর এখন আবার কঠিন হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। আদিব ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল- হ্যাঁ। হওয়া উচিত। কঠিন বিচার হওয়া উচিত। এই বলেই সে মনে মনে বলল- স্যার খুব ভাল। আমি এই বিচারের তীব্র প্রতিবাদ জানাই। -তোর কাছে তোর স্যারের কোন নাম্বার আছে। যেটাতে ফোন দিলে তোর স্যারকে পাওয়া যাবে? হ্যাঁ আছে। -দে। দু বার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। কেউ ফোন তুললো না। তিন বারের বার ফোন তুলে কেউ একজন বিরস গলায় বলল- কারে চাই? -জি আমি ইমু সাহেবকে চাচ্ছিলাম। উনি কি আছেন? দেয়া যাবে? উনি এখন নাই। সকাল নাগাদ বাইর হইছেন এখনো আসেন নাই। পরে ফোন দ্যান। -সন্ধ্যার পর দিলে কি পাওয়া যাবে? আটটার পরে দ্যান। তখন উনি ফেরেন। কারণ ওই সময় খানার টাইম। খানার টাইম পার হইয়া গেলে কাউকেই খানা দেয়া হয় না। কোন মন্ত্রী মিনিস্টার এইখানে থাকলেও কাম হবে না। তার জন্যও একই নিয়ম। কঠিন নিয়ম করছি দেইখাই এখনো এই ম্যাস টিক্কা আছে। জি আমি আটটার সময়ই কল দিব। রাখি। সুপ্রা ফোন রাখল। যে ফোন ধরেছে সে ওই মেসের ম্যানেজার টাইপেরই কেউ। এই কারণেই ফোন ধরে কে বলছেন না বলে কাকে চাই বলেছেন। তার মানে ওখানে সবাই ফোন করে তাদের পরিচিত মানুষকেই চায়। সুপ্রার রাগ হচ্ছে। ভয়ানক রাগ। ইমু তো তার পরিচিত কেউ না। তাহলে কেন সে তার জন্য আবার ফোন করবে বলে বলেছে? খুব মাথা ধরেছে সুপ্রার এখন। সে রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে গেল চায়ের জন্য। ইমু এখন চিমসা বিরক্তি টি স্টলে বসে আছে। আজ চা খুব ভাল হয়েছে। দোকানদার বারবার ইমুর মুখের দিকে তাকাচ্ছে তার অভিব্যক্তি দেখার জন্য। আজ চা মাসাল্লাহ ভাল হয়েছে। -আরেক কাপ দিমু ভাইজান? ভাল জিনিস বেশি খেতে নেই। এতে আকর্ষণ কমে যায়। তবে কড়া করে এক কাপ বানালে খাওয়া যেতে পারে। -ছিঃ ভাইজান। গরীবেরে লজ্জা দিয়েন না। মাপ কইরা দিয়েন। আপনে কইলে পা ধইরা মাপ চাইবার পারি। পা ধরবেন কেন? -কাস্টমার দোহানের লক্ষ্মী। আমি হেই কাস্টমারের লগে কটু ব্যবহার করছি। খারাপ ব্যবহার করেছিলেন এখন ভাল ব্যবহার করছেন এতে ভাল খারাপে কাটাকাটি হয়ে গেছে। -ভাইজান, আপনে ভালা লোক। বহুত ভালা। বিকেল বেলা। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। সুপ্রা বারান্দায় আদিবের ডায়েরি আর জাদুকরী কলম নিয়ে বসেছে। প্রথমে কয়েক পাতা আদিবের লেখা হাবিজাবি। তার পরের হাতের লেখা চমৎকার অক্ষরের। সুপ্রাকে নিয়ে লেখা। আদিব, তোমাকে বলেছিলাম না তোমার বড় বোন বদরাগী সুন্দরী! সুন্দরের সাথে তার সখ্যতা যত গভীর, রাগের সাথেও তার মিতালি সুনিপুণ। তুমি হেসেছিলে। বলেছিলে তুমি তোমার আপুকে খুব ভয় পাও। শুধু তুমি না, তোমার আপুর রাগের কারণে সারা বাড়ির লোকজন ভয়ে তটস্থ থাকে। তোমার মা, বাবাও মাঝে মাঝে তোমার আপুর সাথে কথা বলতে গেলে চিন্তা করে বলে। কিন্তু আসলে বিষয়টা তেমন নয়। তোমার আপু খুব চমৎকার একটা মেয়ে। সে চুপচাপ থাকতেই পছন্দ করে। আর এটাকে সবাই ভেবে নিয়েছে রাগ। উনি মোটেই রাগী নন। যারা অনেক সুন্দর হয় তারা প্রকৃতপক্ষে বুদ্ধি কম বোকা স্বভাবের হয়ে থাকে। তোমার আপুও এই গণ্ডি থেকে বের হতে পারেননি। একটা বিষয় মনে রাখবে। এই পৃথিবীতে খুব অল্প সংখ্যক সুন্দরী ছিলেন বা আছেন যারা তাদের সৌন্দর্যের সাথে বিশাল রকমের বুদ্ধি নিয়ে এসেছিলেন বা এসেছেন। তোমার আপু বিচক্ষণ তবে তাদের একজন হতে পারেননি। আশা করি তুমি তাকে ছাপিয়ে যাবে। তুমি অনেক বুদ্ধিমান একজন হবে। সক্রেটিস না হতে পারো তবে তার মত হওয়া তো যায়ই! তখন একদিন তোমার সাথে বসে চিমসা বিরক্তি টি স্টলে বসে এক কাপ চা খাব। দোকানের মালিক সবুজ মিয়া খুবই ভাল চা বানায়। মানুষটাও খারাপ না। দোয়া রইল তোমার জন্য। ইতি, তোমার স্যার আকাশের মেঘ কেটে গেছে। সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। আজ সুপ্রা বারান্দা ছেড়ে বাগানে গেল না। বারান্দায় বসেই সে দেখছে ইমু বাড়ির ভেতর ঢুকছে। তার খুব ইচ্ছে করছে ইমুকে গিয়ে বলতে সবখানে শিক্ষকতা করতে নেই। আপনি আমাকে আদিব পাননি। আমি সুপ্রা। কিন্তু সুপ্রার উঠতে ইচ্ছে করছে না বারান্দা থেকে। বিকেলের এই আলোতে ইমুর মুখটা খুব মায়াবী লাগছে সুপ্রার কাছে। কেন লাগছে তার ব্যাখ্যা সুপ্রার কাছে নেই। বুদ্ধিমান হলে চট করে বের করতে পারতো। কিন্তু সে আসলেই বোকা। এই তথ্যটা সে ছাড়া আর একজনই জানেন। সুপ্রা হাসলো। আজ আদিবের মনটা ভাল নেই। সুপ্রা তার ডায়েরির একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। তার মন খারাপের কোন কারণই থাকতো না যদি সে ওই পৃষ্ঠার লেখাটা পড়তো। সে পড়ার আগেই সুপ্রা সেটা নিয়ে গেছে। আরেকটা কারণ হল তার অনুমতি ছাড়াই সুপ্রা পৃষ্ঠাটা ছিঁড়েছে। আপনার কি মনে হয় স্যার কাজটা খারাপ করেছে না আপি? -অবশ্যই খারাপ করেছে। এতে তোমার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাহলে কি করা উচিত স্যার? -তোমার তার সাথে কথা বলা উচিত। সরাসরি আলোচনা। স্যার, আমার হয়ে কি আপনি কথা বলতে পারবেন? -চেষ্টা করা যেতে পারে। তাহলে আমাকে সাহায্য করুন। সুপ্রা আদিবের ঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। ইমু বের হতেই সুপ্রা ইমুকে ডাকলো। শুনুন ইমু সাহেব! -ভাল আছেন সুপ্রা? আপনি কাল ফোন দেবার কথা বলে আর দেননি। আমি অপেক্ষা করেছিলাম। ও আর একটা কথা, আপনি আদিবকে জিজ্ঞেস না করে ওর ডায়েরির পাতা ছিঁড়েছেন এতে ও ভীষণ মন খারাপ করেছে। আপনি ওকে বলে ছিঁড়লেই পারতেন। আমিই বলে যাচ্ছি একা একা। আপনি কিছু বলতে চাচ্ছিলেন আমাকে। না কিছু না। বলেই সুপ্রা হাঁটতে শুরু করলো তার ঘরের দিকে। কিছুদূর হেঁটে সুপ্রা আবার ফিরে তাকাল পেছনে। ইমু সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামছে। বসার ঘরের আলোতে ইমুর ছায়া দেয়ালে পড়েছে। দুদিন ইমুর কোন খবর নেই। মেসেও নাকি নেই। সুপ্রা সকাল বিকাল ফোন করছে মেসে। এখন মেসের ম্যানেজার সুপ্রার সাথে আন্তরিক। সুপ্রা মেসের ঠিকানা নিয়েছে। সময় করে একবার মেসেও যাবে বলে কথা দিয়েছে ম্যানেজার তরিকুল হোসেনকে। তরিকুল বলেছে ইমু আসা মাত্র সুপ্রাকে সে ফোন দিয়ে জানাবে। সুপ্রা যেন কোন টেনশন না করে। আজ খুব জোৎস্না হয়েছে। আকাশে পূর্ণ পূর্ণিমার চাঁদ। জোৎস্নার ঢেউয়ে শহর ভেসে যাচ্ছে। এমন সময় মন ভাল থাকলে যেন খারাপ হয়ে যায় কেমন করেই। আবার খারাপ থাকলে ভালও হয়ে যায় হুটহাট। সুপ্রার মন খারাপ। ভীষণ খারাপ। অনেক ভেবে সে লিখতে বসেছে ইমুকে। তার হাতে এখন জাদুকরী কলম। ইমু সাহেব, আপনি মানুষটা এত বেখেয়ালি কেন? কোন কিছুতেই কি আপনার মন বসে না? নাকি এভাবে হারিয়ে যেতেই পছন্দ করেন আপনি? কিছু মানুষ আছে যারা অন্য মানুষকে চিন্তা দিয়ে নিজে অনায়াসেই ভাল থাকতে পারে। আপনি হলেন সেই ধরণের মানুষ। “The beauty or ugliness of a character lay not only in its achievements but in its aims and impulses; its true history lay, not among things done but among things willed.” এই কথাটা নাকি আপনার খুব পছন্দের। আমার আরেকটা কথা পছন্দ হয়েছে। কারণ আমি খুব বড় রকমের একটা অপরাধ করে ফেলেছি। এই কারণেই কথাটা পছন্দের। অপরাধ করলেও কিন্তু আমি ভিকটিম। অপরাধী নই। অপরাধী আপনি। তাই আপনার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। অনেক বড় শাস্তি। আপনার নাকি অনেক বুদ্ধি আদিব বলে। তাহলে বলেন তো আমি কি অপরাধ করেছি? দেখি পারেন কিনা? Whip me, crush me; you need not mind those people under the rick! I shall not cry out. Once victim, always victim- that’s the law! এটাই আমার পছন্দের কথা। বি. দ্রঃ সামনে আদিবের পরীক্ষা। আশা রাখবো এখন থেকে নিয়মিত হবেন আপনি। এভাবে আর ডুব দিবেন না। আপনি আসলে আপনাকে একটা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করব। আমি জানি আপনি পারবেন। ইতি, বোকা মেয়ে সুপ্রা দুপুর বেলা। ইমু মেসে ফিরে এসেছে। তরিকুল হোসেন ইমুকে দেখেই ধমক দিয়ে বলল কোথায় ছিলেন এক সপ্তাহ? সবাই খোঁজাখুঁজি করছে আপনাকে। -আমাকে কে খোঁজাখুঁজি করবে? তরিকুল হোসেন চিঠি বের করে দিল। বলল সুপ্রার চিঠি। চার দিন আগে এসেছে। সকাল বিকাল ফোন করছে। কিছু না বলে ইমু রাস্তায় বের হল। আকাশে ভীষণ মেঘ করেছে। ইমু দ্রুত পায়ে এগুচ্ছে ফুটপাত ধরে। ইমুর বুক পকেটে সুপ্রার চিঠি। কোথায় যাবে তা ইমু ভেবে নিল। আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে এখন। ইমু দ্রুত পা ফেলছে কিন্তু পথ শেষ হচ্ছে না। ***


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now