বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখাঃ উম্মে হাবিবা তানহা
গুণে গুণে তিনটা থাপ্পড় দিলাম আদ্রিতার গালে । মেয়েটা কোনো একটা কারণে আমার মাহতাবকে(আমার ছেলের নাম)ধমক দিচ্ছিলো ! থাপ্পড় দিয়ে শান্ত হলাম না । চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বের করে দিলাম। আপদ একটা !
বিয়ে হওয়ার আগেই জানতাম তুর্জয় আগে একটি বিয়ে করেছে এবং ঐ সংসারে ওর তিন বছরের একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।ওর আগের স্ত্রী সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা যায়।
যদিও পরবর্তীতে অনেক চিন্তাভাবনা করে ব্যাপারটা মেনে নিয়েছি। কারণ ওর আগের স্ত্রী যেহেতু মারা গেছে সেহেতু সংসার করাই যায়।তাছাড়া একই অফিসে চাকরী করি, সেই সুবাদে ওর সাথে চলাফেরা আর ওকে ভালো লাগতে শুরু হওয়া।
অতঃপর পরিবারের মতে বিয়েটা হয়।
ইদানিং ওর মেয়েটাকে দেখে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়।বরাবরই আমি উগ্র মেজাজের একটি মেয়ে।
বিয়ের পর থেকেই দেখছি মেয়েটা সারাক্ষণ পেছন পেছন ঘুরঘুর করে।শুধু কি ঘুরঘুর ! মা পর্যন্ত ডাকে আমায় ! সেদিন মা ডাকাতে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দেই। কারণ অন্য মহিলার বাচ্চা কেন আমাকে মা ডাকবে ? যতই ও আমার স্বামীর মেয়ে হোক আমি তো ওর মা নয় ।তারপর থেকে মেয়েটা আর আমাকে মা ডাকার সাহস পায় নি।
বিয়ের পর কিছুসংখ্যক পুরুষ বউয়ের আয়ত্তে চলে আসে।বউয়ের হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলানো আবার না তে না মিলানো ওদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।ঠিক তেমনি তুর্জয় আমার কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে লাগলো।অবশ্য আমি সেটাই চাইতাম ।
বিয়ের প্রায় তিন বছর পর আমার একটা ফুটফুটে ছেলে সন্তান হয়। ততদিনে আদ্রিতার (তুর্জয়ের মেয়ের নাম) বয়স ছয় বছর হয়ে যায়।মেয়েটা থাকাতে এক দিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, সংসারে তো একটা কাজের মেয়ের প্রয়োজন আছেই । আমি চাকরীর পাশাপাশি সংসারের কাজে খুব একটা সময় দিতে পারিনা।কিন্তু আমার সন্তানের জন্য কাজের ফাঁকে ঠিকই সময় বের করে নেই।
কাজের পাশাপাশি তুর্জয় ওকে পড়াশোনা শেখাতো কিন্তু তাতে আমি নিষেধ করতাম না।কারণ মেয়েটা আমার সংসারের কাজগুলো শেষ করে অবসর সময় পড়তো ।
আমার ছেলের বয়স এখন ১০।
সেদিন দেখলাম আদ্রিতার সাথে বসে বসে গল্প করছিলো।ওকে কাছে ডেকে নিয়ে এসে বলেছিলাম,
--আদ্রিতার সাথে বেশি গল্প করিসনা।কারণ ও কাজের মেয়ে।কাজের মেয়েদের সাথে এত হাসিমুখে কথা বলতে নেই তাহলে ওরা মাথায় চড়ে বসে।
--কিন্তু মা, বাবা বললো আদ্রিতা আমার বোন।ও তাহলে কাজের লোক কিভাবে হলো?
এই কথা বলাতেই মাহতাব'কে একটা ধমক দিয়ে বললাম,
--তোমার বাবা'র কথা শুনতে হবেনা। যাও, এখান থেকে যাও।
অতঃপর মাহতাব মন খারাপ করে চলে গেলো।
আমার ছেলের বয়স এখন ১৭।অনেকটা বড় হয়ে গেছে আমার মাহতাব ! সেদিন দেখলাম আদ্রিতা মাহতাবকে কোনো একটা কারণে ধমক দিয়ে কথা বলছে।আমি ধমকের আওয়াজ শুনে মাহতাবের রুমে যাই।আদ্রিতা মাহতাবকে চড় দিতে যাওয়ায় আমি ওর হাত ধরে উল্টা ওকে থাপ্পড় দেই।
তিনটা চড় মেরে ঘর থেকে বের করে দেই আদ্রিতাকে।বেহাইয়া একটা মেয়ে ! আমার ছেলেকে ধমক দেওয়ার পর আবার থাপ্পড় দিতে গিয়েছিলো ! কত্ত বড় সাহস মেয়েটার ! তাই থাপ্পড়গুলো দিয়ে বের করে দিলাম।এত মারধর করি তারপরেও আক্কেল হয় না মেয়েটার !
ওকে যখন বের করে দরজা লাগিয়ে দেই তখন মাহতাব আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
--মা, আদ্রিতা আপু কি করেছে ? ওকে বের করে দিলা কেন ?
--ওর অনেক সাহস বেড়ে গেছে তাই ওকে বের করে দিলাম। ওর কত্তবড় সাহস ও তোকে বকে আবার থাপ্পড় দেয় ! ও তোকে চড় মারতে গেলো কেন ?
-- তার জন্য আপুকে বের করে দিয়েছো ? আপু তো আমার বড়, আমি যেহেতু ওর ছোট সেহেতু ও আমাকে বকা দিতেই পারে অথবা থাপ্পড়ও দিতে পারে।আদ্রিতা আপু...
--থামো মাহতাব ।
ছেলের কথা শুনে মাথা গরম হয়ে গেলো ! তাই উত্তেজিত হয়ে ওকে বললাম।
--দেখো মাহতাব, ওকে ঘরে বসে খাইয়ে পরিয়ে টাকা নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।তাছাড়া টাকাটা আমার আর তোমার বাবার। সুতরাং টাকার মর্ম তুমি কি বুঝবা ? সুতরাং এখানে তুমি কোনো কথা বলতে আসবেনা।
কথাটা বলার পর মাহতাব আর একটি কথাও বলেনি।চুপ করে আমার সামনে থেকে ভিতরে নিজের রুমে চলে যায়।
বেশ কয়েকমাস হলো আদ্রিতা বাসায় নেই।যদিও প্রতিদিন তুর্জয় আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে আদ্রিতাকে ফিরিয়ে আনার জন্য । কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।এতদিন পর মনে হচ্ছে শান্তিতে সংসার করছি।পরবর্তীতে জানতে পারি আদ্রিতা হোস্টেলে থাকে।
সময় অতিবাহিত হয়ে যেত লাগলো।
আমার ছেলে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে। আমি আর ওর বাবা আনন্দে আত্মহারা প্রায় ! ছেলের একটা ভালো চাকরীও হেয়েছে ।
ইদানিং আমার শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছেনা।মাহতাবটাও কেমন যেনো হয়ে গেছে ! আমার কাছে আসেনা, পাশে বসেনা।খুব ইচ্ছে করে ছেলেটা আমার পাশে এসে বসে তৃপ্তিসহকারে কথা বলবে।কিন্তু আজকাল ঐ সময়টাও ওর কাছে নেই !
আচ্ছা সন্তানরা এমন কেন ? বৃদ্ধ মা বাবাকে দেওয়ার মত সময় কি ওদের থাকেনা ? অথচ ওদের মত বয়সেই তো আমরা ওদেরকে যথেষ্ট সময় দিয়ে মানুষ করেছি । তবে কি আমার সন্তান, কেবল উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে কিন্তু মানুষ করতে পারলাম না ছেলেটাকে ?
হঠাৎ একদিন দেখলাম মাহতাব বিয়ে করে বউ নিয়ে ঘরে এসেছে ! অথচ আমি আর ওর বাবা কিছুই জানতে পারলাম না ! আমার একমাত্র সন্তান না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলল !
ওর বাবা ধমকের স্বরে কয়েকটা কথা বলাতেই মাহতাব কড়া গলায় বললো,
--বাবা, আমি তোমার কথা শুনবো না।কারণ ছোটোবেলায় মা বলেছে, তোমার বাবা'র কথা শুনতে হবেনা । কি মা মনে নেই তোমার ? বলো !
দেখো বাবা মা, তোমরা বেশি কথা বলবা না।আমার ইচ্ছে হয়েছে আমি বিয়ে করেছি । আমার টাকায় আমি বিয়ে করেছি । এখন আমার টাকায় আমি সংসার করবো । কারণ এখন টাকাটা আমার নিজের পকেটের। সেদিন যখন আদ্রিতা আপুকে বের করে দিয়েছিলে তখন আমার টাকা ছিলো না।তাই আমার কথাগুলো শোনার বা মেনে নেওয়ার ধৈর্য্য তোমার ছিলো না,মা।
আর আদ্রিতা আপুকে তুমি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছো আমাকে থাপ্পড় বা বকা দেওয়ার কারণে।কিন্তু আদ্রিতা আপু সেদিন আমাকে বকা দেওয়ার কারণটা তুমি জানো ?
আমি বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি আমাকে বলার সুযোগটাও দাও নি।সেদিন আদ্রিতা আপু আমার প্যান্ট ধুতে গিয়ে পকেটে সিগারেটের প্যাকেট পেয়েছিলো।তাই আমাকে শাসন করেছিলো । আর তুমি কিনা ...
জানো মা, আমার আপুটা চলে যাওয়ার পর আমি আর সিগারেট ছুঁয়েও দেখিনি।আমার বোনটা ওর অজান্তে আমায় সঠিকটা শেখাতে পেরেছিলো।
এই কথা বলে মাহতাব বউকে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।জানিনা, আমার চোখ বেয়ে অশ্রু কেন গড়িয়ে পড়ছে ! কিন্তু মাহতাবের জন্য যতটুকু কষ্ট হচ্ছে তার থেকেও বেশি কষ্ট হচ্ছে নিজের ভুলের জন্য।
তুর্জয়ের দিকে তাকাতেই থমকে গেলাম।এই প্রথম আমি তুর্জয়কে এমন কাঁন্না করতে দেখছি।
চোখের পানি মুছে তুর্জয়ের হাতটা ধরে বললাম,
--চলো,আদ্রিতাকে নিয়ে আসি।
তুর্জয় আমার হাতে হাত রেখে ঝাপসা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।আমি তুর্জয়ের চোখের ভাষা বুঝতে পারছিনা কারণ ওর চোখ ঝাপসা ছিলো।তারপরেও যেন মনে হলো আমি আজ প্রথম তুর্জয়কে বুঝতে পারলাম।ওর চোখের পানিতে লুকানো চোখের ভাষাটা বুঝতে পারলাম।
বিঃদ্রঃ নতুন প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষাটাই দিন।কারণ এই শিক্ষাটার পুনরাবৃত্তি হওয়া নিশ্চিত ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now