বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
কম্ফিটার
সাদরুজ্জামান নূর (তামাম)
-----
শাকুর সাহেবের মন আজ সকাল থেকেই প্রসন্ন।
একটু আগে অফিসের হেলাল সাহেবের সাথে
কথা হচ্ছিল। তার ছেলেটা এবারও বুয়েটে চান্স
পায়নি। পাবে কী করে। গবেট একটা। য্যাঁয়সা বাপ
ওয়াইসা বেটা – মনের আনন্দে তার মুখ দিয়ে হিন্দি
বেড়িয়ে যায়।
অফিসের মোখতার সাহেব তার দূরসম্পর্কের
ভায়রা ভাই হন। তাকে ফোন দিয়ে খবরটা জানালেন।
হেলাল সাহেবেরটাও্ আর নিজেরটাও। আজ
সকালে রেজাল্ট বেড়িয়েছে।
‘হেলাল সাহেবের ছেলেটা তো এবারও
টিকলো না, আমার লাবণি তো একবারের
চেষ্টাতেই বুয়েটে টিকে গেল। শুধু শুধু
হেলাল সাহেব দুই বছর কোচিং করিয়ে এতগুলো
টাকা গচ্ছা দিলেন। বুঝলেন, লাবণিকে তেমন
কোচিং টোচিং এ দেইনি। বেসিকটা আসলে ভাল।
আর সবই আলাহ-র ইচ্ছা!’ – গলায় আত্মতৃপ্তির
ছোঁয়া।
সবই আসলে প্ল্যানিং-এর ফলাফল, নিজেকে তিনি
মনে করিয়ে দেন। তিন তিনটা কোচিং-এ মক
টেস্ট দেয়া, আর বাসায় ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি,
ম্যাথে তিনটা আলাদা টিচার। তিনটাই বুয়েটের। চান্স না
পেয়ে যাবে কই?
ফোন ছেড়ে ভেতরের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে হাঁক
পাড়লেন ‘লাবণির মা, চলো আজকে বাইরে
খেতে যাই।’
লাবণি তার ঘর থেকে জবাব দেয় – ‘বেশী
বাড়াবাড়ি কোরো না বাবা। এখনও তো ওয়েটিং-এ।
সাবজেক্ট পেলে তারপর সেলেব্রেট
করবো।’
সে এখনও ফেসবুকে স্ট্যাটাস আপডেটটা
পর্যন্ত দেয়নি।
শাকুর সাহেব নিজে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ইচ্ছা ছিল
মেয়েটাকে ইলেকট্রিকাল বা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং
পড়াবেন। যাই হোক। এখন নিচের যে কোনো
সাবজেক্ট পেলেই খুশি। বুয়েট বলে কথা।
কলিং বেলের শব্দ শুনে শাকুর সাহেব দরজার
দিকে এগিয়ে যান। দরজা খুলে দেখেন ড্রাইভার
হাশেম দাঁড়িয়ে।
‘আজকে আবার ছুটি টুটি চেয়ে বোসো না।
রাতে একটু গুলশানের দিকে যেতে হবে।’
‘না না স্যার,’ আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাশেম বলে
ওঠে। ‘আমার পোলাটা আইসিলো স্যার। আমনের
লগে এট্টু দেহা করবার চায়।’
মাস কয়েক আগে হাশেম কিছু টাকা চেয়েছিল,
ছেলে নাকি চাচ্ছে। আর টাকার পরিমাণটাও কম ছিল,
পাঁচশোর মত। তিনি দিয়েছিলেন।
'কম্পিউটারের ট্রেনিং করাবা? ভাল।'
'জে স্যার। পোলাডা খুব কইরা ধরসে। ফরেন না
কি যেন কিনবে। কম্ফিটার পড়াশোনা।'
শাকুর সাহেব বেশি গা করেননি। হাশেমের গলার
আওয়াজে তিনি বর্তমানে ফিরে আসেন - 'স্যার
আপনারে কদমবুসি করতে চায়।'
'বাহ এর মধ্যে ট্রেনিং শেষ? ঠিক আছে পাঠিয়ে
দাও।'
'না স্যার,' হাশেমের মুখে সলজ্জ হাসি 'গেরাম
থেইকা ঢাকায় আইসা পড়সে। হস্টেলে থাকবো।'
শাকুর সাহেব কিছুটা বিরক্ত হন। এরা ঢাকায় থাকা মানেই
আজ একশ' কাল দুশ' দিতেই হবে। যত্তসব! আর
আজকাল তো পানির দরে জিপিএ ফাইভ
বিকোচ্ছে। আর সবাই জজ-ব্যারিস্টার হবার শখ
নিয়ে ঢাকায় এসে ভিড় জমাচ্ছে।
বিরক্ত গলায় ছেলেকে পাঠাতে বলে দিয়ে
শাকুর সাহেব সোফায় গা এলিয়ে বসেন। আজকে
রাতে নান্দোস যাবেন, নাকি পিজা হাট যাবেন ঠিক
করতে পারছেন না। আরেকটা কাজ আছে। একটা
স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিশন
কমিটির প্রধান তার পরিচিত। ওয়েটিং লিস্ট থেকে যদি
না হয় তা'হলে...
'স্যার, স্লামালিকুম।'
ছেলেটা খোলা দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে।
গায়ে একটা সাধারণ সাদা রঙের শার্ট আর
টেট্রনের নীল রঙের প্যান্ট ইন করে পড়া।
পায়ে রোঁয়া উঠে যাওয়া সস্তা বেল্টওয়ালা একটা
স্যান্ডেল। মাথার চুল ডানদিকে সিঁথি করে
আঁচরানো। গাত্রবর্ণ কালো। কিন্তু যে জিনিসটা
প্রথমেই চোখে পড়ে তা হলো অসম্ভব
বুদ্ধিদীপ্ত এক জোড়া চোখ।
'ও আচ্ছা আসো আসো। নাম কী তোমার?'
'স্যার, জয়নাল।' ছেলেটা একটা মিষ্টি করে হাসি
দিল। ঝকঝকে সাদা দু'পাটি দাঁত।
'তা তুমি কি কম্পিউটার শিখতে ভর্তি হচ্ছো
কোথাও?'
'জ্বী?' ছেলেটার চোখে সংশয়। সাথে
সাথেই আবার সামলে নিয়ে বলল - 'স্যার,
কম্পিউটারে ভর্তি হচ্ছি। পড়বো।'
'আচ্ছা। কোচিংটা কোথায়?'
'কোচিং?' - ছেলেটা আবার দ্বিধায় পরে গেল।
'স্যার, ইউনিভার্সিটি।'
'ভার্সিটি? ' - এবার শাকুর সাহেবের অবাক হবার পালা।
'কোনটা?'
'স্যার, বুয়েট। ১০৩ তম হয়েছি স্যার। কম্পিউটার
নিয়ে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল।' - জয়নালের গলা ভারী
হয়ে আসে। 'নিজে নিজে পড়েছি। বাবাকে
বুঝাতেও পারিনি। উনি তো কম্পিউটারও বলতে
পারেন না। বলেন কম্ফিটার।' ছেলেটার চোখ
ছলছল করছে - 'ফরম কেনার টাকা সময়মত
জোগাড় হয়নি। আপনি না থাকলে...'
বাকি কথাগুলো আর শাকুর সাহেবের কানে
ঢুকলো না। তার কানে তখন ঝাঁ ঝাঁ।
ছেলেটাকে বিদায় করে খাবার ঘরে গেলেন।
প্রচণ্ড তৃষ্ণা। ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি দরকার।
লাবণি এসে পাশে দাঁড়াল। 'বাবা, আমার মনে হয়
তিনজনের জন্য গুলশানের পিৎজা হাটটা বেটার
হবে, এরপর আইসক্রিম খেতে বনানী...।'
'তিনজন নয় রে মা। চল্ আজকে চারজন খেতে
যাই।'
'চারজন?' লাবণির কণ্ঠে বিস্ময় 'চার নম্বরটা কে?'
শাকুর সাহেব জবাব দিলেন না। তার চোখের
কোণে পানি জমতে শুরু করেছে তখন।
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now