বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছায়াশহর"
লেখক : রাকিব হাসান
পর্ব ৯
চমকে গেছে সুজা। টর্চটা ওর হাত
থেকে রাস্তায় পড়ে ঝনঝন করে
উঠল। কেঁপে উঠল আলোটা কিন্তু
নিভল না। সুজা ওটা কুড়িয়ে
নেবার আগেই আমাদের সামনে
এসে দাঁড়াল অনুসরণকারী। আমরা
ঘুরে তাকালাম তার দিকে। বুকের
ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে হৃদপিন্ডটা।
" হ্যারি! তুমি!" আমি বলে উঠলাম।
সঙ্গে সঙ্গে সুজা টর্চটা কুড়িয়ে
নিয়ে আলো ফেলল ওর মুখের ওপর। দু
হাত দিয়ে নিজের মুখটাকে আড়াল
করল ছেলেটা, আলোর থেকে
বাঁচতে। আলোর বৃত্তের বাইরে সরে
গেল ও।
" এখানে কি করছ তোমরা?",
চেঁচিয়ে জানতে চাইল ও। সুজা ওর
মুখে আলো ফেলায় ও একেবারে
চমকে গেছে। " তুমি....তুমি আমাদের
ভয় পাইয়ে দিয়েছ", রাগতস্বরে বলল
সুজা। টর্চের আলো সরিয়ে নিয়ে ও
এখন আমাদের পায়ের কাছে আলো
ফেলচে।
" সরি....চিনতে পারিনি", হ্যারি
বলল, " তোমরা বেড়িয়েছ জানলে
ডাক দিতাম। "
" সুজা বলছে, কিটু কোথায় আছে, ও
জানে",আমি বললাম, " আমরা
কিটুকে খুঁজতে বেরিয়েছি। "
এখনো হাঁফাচ্ছি আমি।
" কিন্তু তুমি বেরোলে কেন?", সুজা
জিজ্ঞেস করল হ্যারিকে।
" মাঝেমাঝে ঘুম আসে না আমার,
তখন বেরিয়ে পড়ি", মৃদুস্বরে বলল
হ্যারি। "কিন্তু এত রাতে বেরোলে
তোমার আব্বা-আম্মা রাগ করেন
না?" আমি জানতে চাইলাম।
টর্চের আলোর আভায় হ্যারির মুখে
দুষ্টু হাসি খেলে যেতে দেখলাম।
বলল, " ওঁরা জানেন না।"
" দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথাই বলবে
না যাব?", অস্থির ভঙ্গীতে বলে উঠল
সুজা। তারপর জবাবের অপেক্ষা না
করে সামনে হাঁটা লাগল। প্রায়
দৌড়তে শুরু করল। টর্চের আলো ওর
সামনে দিয়ে নেচে নেচে
এগোতে লাগল। ঘুরে দাঁড়িয়ে
আমিও ওর পিছু নিলাম। আলোর
কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতে
লাগলাম।
" কোথায় যাচ্ছ তোমরা? হ্যারি
পেছন থেকে জানতে চাইল।
" গোরস্থানে", চেঁচিয়ে জবাব
দিলাম। "না," শীতলকণ্ঠে বলল
হ্যারি, " ওখানে যেও না।"
দাঁড়িয়ে গেলাম এবার। " মানে?" "
ওখানে যেও না", আবার একইভাবে
বলল হ্যারি। ওর মুখ দেখা যাচ্ছে
না। অন্ধকারে ঢাকা।
" জলদি কর", ডাক দিল সুজা। একটুও
গতি কমাচ্ছে না ও। হ্যারির
কন্ঠস্বরের পরিবর্তন খেয়াল করেনি
ও।
" থামো সুজা" ডাক দিল হ্যারি।
সেই একইরকম শীতল কণ্ঠস্বর। বলল, "
আমি বলছি তোমরা ওখানে যেও
না।"
" কেন যাব না?" হঠাৎ করেই অস্বস্তি
অনুভব করলাম আমরা। হ্যারি কি
আমাদের হুমকি দিচ্ছে নাকি? এমন
কিছু কি জানে ও, যা আমরা জানি
না? নাকি আমরাইই ওকে মিথ্যে
সন্দেহ করছি?
রাতের অন্ধকারের মধ্যে ওর
চেহারা দেখে বোঝার চেষ্টা
করলাম।
" রাতের অন্ধকারে গোরস্থানে
যাওয়াটা পাগলামি ছাড়া কিছুই
নয়", আবার বলল হ্যারি।
ওকে ভুল বুঝেছি আমি, আমার মনে
হল। আসলে ও ওখানে যেতে ভয়
পাচ্ছে তাই আমাদেরকেও
ঠেকানোর চেষ্টা করছে।
" এই তোমরা কি যাবে?", ক্রমশ দূরে
সরে যাচ্ছে সুজা।
" যাওয়াটা উচিত হবে না", হ্যারি
বলল।
'হ্যাঁ, ও ভয়ই পাচ্ছে', আমার মন বলল। ওর
ওই শীতল কণ্ঠস্বর স্রেফ আমার কল্পনা।
" তুমি যেতে না চাইলে যেয়ো
না, কিন্তু আমরা যাব", কথাটা বলেই
সুজা আবার সামনের দিকে
দৌড়তে লাগল। " না, সত্যি বলছি",
হ্যারি বলতে লাগল, " ওটা খুব
খারাপ জায়গা"। হ্যারি আর আমি
পাশাপাশি দৌড়চ্ছি এখন। সুজার
কাছে পৌঁছবার চেষ্টা করছি। "
যেতেই হবে আমাদের", সুজা বলল, "
কিটু ওখানেই আছে, আমি শিওর। "
অন্ধকার, নীরব স্কুলবাড়িটা
পেরিয়ে গেলাম আমরা। একটা
মোড় ঘুরে গোরস্থানের রাস্তায়
উঠলাম। সুজার টর্চের আলো পড়ছে
গাছপালার নীচু ডালগুলোতে।
শার্টের হাতা দিয়ে কপালের
ঘাম মুছলাম। বাইরে একটুও হাওয়া
নেই, গুমোট পরিবেশ। শীত লাগতে
পারে ভেবে পুরো হাতাওয়ালা
শার্ট পড়েছিলাম। ভুল হয়ে গেছে।
এখন ঘামে ভিজে গেছে পুরো
শরীর।
গোরস্থানে যখন ঢুকলাম তখন আকাশ
একেবারে মেঘে ঢাকা।
জায়গাটা নীচু পাঁচিল দিয়ে
ঘেরা। গেট দিয়ে ঢুকলাম ভেতরে।
সাদা সাদা কবরফলকগুলো
অন্ধকারেও দেখা যাচ্ছে। পাথর
থেকে পাথরে নেচে বেড়াচ্ছে
সুজার টর্চের আলো।
" কিটু!" কবরস্থানের নীরবতা ভাঙল
ওর কন্ঠস্বরের ডাকে।
' মৃতদের ঘুম ভাঙাচ্ছে ও', একথাটা
মনে হতেই এক চাঙড় বরফ নেমে গেল
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে।
জোর করে মন থেকে ভয় তাড়ানোর
চেষ্টা করলাম।
" আমার কথা শোননি", আমার পাশ
ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলল হ্যারি, " খুব
বিপদ হবে তোমাদের। এখনো সময়
আছে, ফিরে যাও।"
" কিটু! কিটু!" আবার চিৎকার করে
উঠল সুজা।
"আমি বুঝতে পারছি, আমরা কাজটা
ঠিক করিনি", আমি বললাম, " তবে
সুজাকে একা একা এখানে আসতে
দিলে আরও খারাপ করতাম।"
" কারোরই এসময় এখানে আসা ঠিক
নয়", হ্যারি বলে উঠল।
" এই দেখো! " কয়েক গজ দূর থেকে
আমাদের ডেকে বলল সুজা। জুতোর
মচমচ শব্দ তুলে দৌড়ে গেলাম ওর
কাছে। কবরের সারির মাঝখান
দিয়ে দৌড়তে দৌড়তে খেয়ালই
রইল না যে আমরা গোরস্থানের
শেষপ্রান্তে চলে এসেছি।
" দেখো" সুজা আবার বলল।
গোরস্থানের শেষপ্রান্তে অদ্ভুত
একটা কাঠামোর ওপর টর্চের আলো
ফেলেছে ও। টর্চের আলোয় যে
জিনিসটা নজরে পড়ল, সেই
জিনিসটা এখানে দেখব আশা
করিনি। পাথরের একটা মঞ্চ তৈরি
করে রাখা হয়েছে। মঞ্চকে ঘিরে
বেশ অনেকগুলো পাথরের বেঞ্চও
তৈরি করা হয়েছে। মঞ্চে ওঠার
জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থাও আছে।
অনেকটা আউটডোর থিয়েটার বলা
যায় জায়গাটাকে।
" অদ্ভুত "! আমি আপনমনেই বলে
ফেললাম, " গোরস্থানের পাশে
এরকম থিয়েটারের মঞ্চ কে
বানাল?" সুজা আর হ্যারি আমায়
অনুসরণ করছে কিনা দেখার জন্য
ফিরে তাকালাম। আরেক দিকে
তাকিয়ে এগোতে গিয়ে জুতোর
ডগায় কি যেন বেধে গেল। সঙ্গে
সঙ্গে উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম।
"আঁউ", মুখ দিয়ে আপনাআপনি
গোঙানি বেরিয়ে এল। হাঁটু, মুখ
একেবারে ছড়ে গেল। কিসে পা
জড়িয়ে গেল? আমার গোঙানি
শুনে সুজা এগিয়ে এসে টর্চের
আলো ফেলল। আস্তে আস্তে উঠে
দাঁড়ালাম। হাঁটুতে ব্যথা করছে খুব।
ঢালের গায়ে মাটি থেকে
বেরিয়ে থাকা মস্ত একটা গাছের
শেকড়ে হোঁচট খেয়েছি আমি।
সুজার হাত কাঁপছে, হাতে ধরে
থাকা টর্চের আলোটাও কাঁপছে।
সেই আলোয় মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে
আসা গাছের শেকড়টাকে অনুসরণ
করে আমার দৃষ্টি চলে গেল কয়েক
গজ দূরের ঐ বড় গাছটার ওপর। অদ্ভুত
সেই মঞ্চটার ওপর এমনভাবে ঝুঁকে
পড়ে আছে গাছটা, মনে হচ্ছে যে
কোনও মূহুর্তে কাত হয়ে টলে পড়ে
যাবে। গোড়ার বড় বড় শেকড় টান
লেগে উপড়ে বেরিয়ে এসেছে
প্রায়। আর ঘন পাতায় ছাওয়া
ডালপালা সমেত গাছটা মঞ্চটার
ওপর ঝুঁকে পড়ে যেন আগলে
রেখেছে।
" অদ্ভুত! " সুজা বলে উঠল।
" হ্যারি, ওখানে কি হয়?", আমি না
জিজ্ঞেস করে পারলাম না।
" মিটিং ", শান্তকন্ঠে হ্যারি বলে
উঠল, আমার পাশে দাঁড়িয়ে সোজা
তাকিয়ে আছে গাছটার দিকে।
বলল, " এই শহরের লোক মিটিং করে
ওখানে।" " এই গোরস্থানের মধ্যে
মিটিং! " আমি প্রায় অস্ফুটে
চেঁচিয়ে বলে উঠলাম। অবিশ্বাস্য
লাগছে আমার কাছে। " চলো যাই",
হ্যারি বলে উঠল। ওকে দেখে মনে
হল, ভীষণ অস্বস্তিতে আছে। ঠিক
এইসময় আমাদের পেছনে পায়ের শব্দ
শোনা গেল। কেউ বা কিছু আসছে
মনে হল। সুজা সেদিকে টর্চের
আলো ফেলল।
" কিটু!" চেঁচিয়ে উঠল ও। কাছেই
কয়েকটা নীচু কবরফলকের পাশে
দাঁড়িয়ে আছে কুকুরটা। নিজের
চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
সুজা তাহলে ঠিকই অনুমান করেছিল!
" কিটু! কিটু!" সুজা দু'বার ডেকে উঠল।
দুজনেই দৌড়ে গেলাম কুকুরটার
দিকে। কিন্তু পেছনের পায়ে ভর
দিয়ে পিঠটাকে ধনুকের মতো
বাঁকিয়ে ফেলল কিটু। পালিয়ে
যেতে যেন তৈরি। আমাদের
দিকে তাকিয়ে আছে। টর্চের
আলোয় ওর চোখদুটো টকটকে লাল
চুনির মতো জ্বলছে। আশ্চর্য! ওর চোখ
তো কখনো এভাবে জ্বলতে
দেখিনি!
" কিটু আয়, আয়, আমাদের কাছে আয়!",
আমি ডাক দিলাম।
আশ্চর্য! কিটু শুনল না! মাথাটা নীচু
করে দুলকি চালে হেঁটে চলে
যাচ্ছে। " কিটু! কোথায় যাচ্ছিস?
আমাদের চিনতে পারছিস না?",
সুজা চেঁচিয়ে ডাকল।
এক দৌড়ে গিয়ে কিটুকে মাটি
থেকে তুলে নিল সুজা। " কোথায়
যাচ্ছিস? " বলে মৃদু চাপড় মারতে
গেল ওর মাথায়।
আমিও দৌড়ে গেলাম।
হঠাৎ সুজা ওকে হাত থেকে ফেলে
দিল। মুখ বিকৃত করে বলল, " ইয়াক থু,কি
দূর্গন্ধ!"
" দূর্গন্ধ! কিসের দূর্গন্ধ!", আমি অবাক
হলাম।
" কিটুর!", নাক মুখ বিকৃত করে বলল
সুজা, " কিটুর গা থেকে পচা
লাশের গন্ধ বেরোচ্ছে!"
মাথা নীচু করে ধীরেধীরে সরে
যাচ্ছে কিটু। " সুজা! আমাদের
দেখে ও খুশী হয়নি", আমি বললাম, "
এমন ভাব করছে যেন চিনতেই
পারছে না!" কবরফলকের পরের
সারিটার কাছে চলে গেল কিটু।
ফিরে তাকাল আমাদের দিকে। ওর
চোখদুটো জ্বলছে এখনো। কিটুর কি
হয়েছে? এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন?
আমাদের দেখে খুশী হল না কেন ও?
" বুঝলাম না", সুজা বলে উঠল। ওর নাক
মুখ এখনও কোঁচকানো, এখনও যেন
দূর্গন্ধটা ওর নাকে লেগে রয়েছে।
বলল, " তিরিশ সেকেন্ড আমাদের
না দেখলে যে পাগল হয়ে যেত,
এতক্ষণ পর দেখেও এভাবে
পালাতে চাইছে কেন, বুঝতে
পারছি না!"
" আমাদের এখন এখান থেকে চলে
যাওয়া দরকার!", হ্যারি দূর থেকে
বলে উঠল। গোরস্থানের মঞ্চটার
সেই গাছটার কাছেই দাঁড়িয়ে
আছে ও এখনো। কিটু, কি হয়েছে তোর?",
আমি
বলে উঠলাম। কিটু এবারেও সাড়া
দিল না। আমি আবার বললাম, " কিটু,
তুই কি তোর নামও ভুলে গেছিস?
কিটু, এই কিটু!" "ওর গায়ে যা গন্ধ
হয়েছে!", প্রায় চেঁচিয়ে বলল সুজা,
" ওয়াক, থু!" " বাড়ি নিয়ে গিয়ে
গোসল করালেই গন্ধ চলে যাবে",
আমি বললাম বটে, কিন্তু আমার গলা
কাঁপছে , টের পেলাম। সেই সঙ্গে
একটা অজানা অস্বস্তি আর ভয়।
" হয়ত ওটা কিটু নয়", সুজা কেমন
চিন্তান্বিতের মতো বলল।
অন্ধকারে কিটুর চোখদুটো আবার
লাল হয়ে জ্বলতে দেখলাম। একটা
কবরফলকের সামনে দাঁড়িয়ে
আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে
ওটা।
" কিটুই", শান্তকণ্ঠে বললাম আমি, " ওই
দ্যাখ, শেকলটা এখনো গলায়
আটকানো, মাটিতে টেনে নিয়ে
বেড়াচ্ছে। চল সুজা, দেরী নয়, ধর
ওকে।"
" তুমি ধরো", সুজা বলে উঠল, " এত
দূর্গন্ধ বাপরে!"
" আরে, ওর গলার শেকলটা ধরলেই
তো হয়ে যাবে, কোলে নেওয়ার
দরকার নেই", আমি ওকে বোঝাবার
চেষ্টা করলাম।
" না, আমি পারব না", সুজা
কঠিনভাবে বলল।
বুঝলাম, আবার জেদ শুরু করেছে সুজা।
তাই আর চাপাচাপি না করে আমি
বললাম, " বেশ, আমিই ধরছি, টর্চটা
দে।" সুজার হাত থেকে টর্চটা
নিয়ে কুকুরটার দিকে দৌড়ে
গেলাম আমি। " কিটু, আর এক পা-ও
এগোবি না বলছি", আমি এভাবে
বললে কখনো অমান্য করত না ও। কিন্তু
এখন করল। মাথাটা নীচের দিকে
করে দৌড়তে লাগল।
" কিটু, থাম বলছি", আমি আবার
চেঁচিয়ে বললাম।
" ওকে চোখের আড়াল হতে দিয়ো
না", পেছন থেকে সুজাও চেঁচিয়ে
উঠল। বারকয়েক চলল কিটুর সঙ্গে
আমার লুকোচুরি। কবরফলকগুলোর পাশ
দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে মাঝে
মাঝেই চোখের আড়াল হয়ে যেতে
লাগল ও। তারপর একটা কবরফলকের
কাছে গিয়ে হঠাৎ কোথায় যেন
উধাও হয়ে গেল কুকুরটা।
আর দেখতে পেলাম না ওকে।
" সর্বনাশ! আবার হারিয়ে ফেললাম
নাকি!" মনে মনে প্রমাদ গুনলাম
আমি। আমি আর সুজা পালা করে
ডাকতে লাগলাম, " কিটু, কিটু!"
কোনও সাড়া নেই। কবরফলকগুলোর
ওপর আলো ফেলতে ফেলতে আমরা
ছুটলাম। শেষে গ্রানাইট পাথরে
তৈরি একটা কবরফলকের ওপর
আমাদের টর্চের আলোটা গিয়ে
বিদ্ধ হল।
পাথরে লেখা নামটা পড়ে থমকে
গেলাম আমি। একমূহুর্ত মাথায় কিছু
ঢুকল না আমার। শক্ত করে আঁকড়ে
ধরলাম সুজার হাতটা।
" সুজা দ্যাখ", বলে কবরটার ওপর দৃষ্টি
আকর্ষণ করালাম সুজার।
" কি?" বলে সুজা সেদিকে তাকাল।
" কবরের পাথরে লেখা নামটা পড়ে
দ্যাখ", আমি বললাম।
নামটা পড়ল সুজা।
" এরিকা গার্ডনার", বিড়বিড় করে
নামটা পড়ল সুজা।
তাকাল আমার দিকে। মনে হল, ও-ও
কিছু বুঝতে পারে নি।
" আমাদের নতুন বন্ধু এরিকা", আমি
ফিসফিস করে বলে উঠলাম, " যার
সঙ্গে আমাদের রোজ প্লে
গ্রাউন্ডে দেখা হয়, যার সঙ্গে
রোজ আমরা কথা বলি, তার নাম
এখানে!"
" ওর নাম হয় কি করে!", সুজা অধৈর্য
ভঙ্গিতে বলল, " নিশ্চয় ওর দাদীর
নাম। এসো, সময় নষ্ট না করে কিটুকে
খুঁজি।" " না, দাঁড়া। তারিখটা
দেখি।" আমি বললাম।
দুজনেই ঝুঁকে পড়ে টর্চের আলোয়
তারিখটা দেখলাম।
১৯৬০-১৯৭২
" ওর দাদী তো নয়ই, ওর মা-ও নয়",
আমি বললাম। কথা বলতে গিয়ে
আমার গলার স্বর কেঁপে গেল।
আপনমনেই বললাম, " ইস! মাত্র বারো
বছর বয়সেই মারা গেছে কবরের এই
মেয়েটা! আমাদের খেলার
মাঠের এরিকার বয়সও তো বারো! ও
আমায় বলেছে!"
অন্যদিকে চোখ ফেরাল সুজা। ওর
চোখ এখনও কিটুকে খুঁজছে।
এগিয়ে গেলাম পরের কবরফলকটার
কাছে। ওটায় যে নামটা লেখা,
সেটা কখনো শুনিনি। তারপর পর পর
দুটো কবরের গায়ের নামগুলো
পড়লাম। অপরিচিত নাম। কখনো
শুনিনি। আর একটা কবরফলকের কাছে
আসতেই আবার চমকে উঠলাম। লেখা
আছে: টমাস হার্ডি
১৯৭৫-১৯৮৮
" ভাইয়া, চলো", সুজা তাড়া
লাগায়। আমি ওর কথায় কান না
দিয়ে বললাম, " সুজা আবার এই
নামটা দেখ, টমাস! আমাদের প্লে
গ্রাউন্ডের বন্ধুদের মধ্যে আর একজন!
" ভাইয়া, কিটুকে খুঁজে বের করতে
হবে আমাদের", সুজা তাড়া
লাগায়। কিন্তু আমি ওর কথা শুনেও
শুনলাম না। একের পর এক
কবরফলকগুলোর পাশ দিয়ে দৌড়তে
লাগলাম, টর্চের আলো ফেলতে
ফেলতে। দেখতে পেলাম, জিম
বাটলারের নামটা। খুঁজে পেলাম
টনি এরিকসনের নামটাও।
এরা সবাই আমাদের প্লে
গ্রাউন্ডের ছেলে।
এদের সবার সাথে রোজ বেসবল
খেলি আমরা; আর এদের সবার নামই
এখানে। বুকের ভেতরে হাতুড়ি
পিটোচ্ছে আমার। কবরফলকের
সারির পাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছি
আমি। নরম ঘাসে পা ডেবে যাচ্ছে
আমার। অবশ হয়ে আসছে শরীরটা।
সারির শেষপ্রান্তের কবরফলকটার
ওপর আলো ফেললাম। হাত এত
কাঁপছে যে ঠিকমতো টর্চের
আলোটা ফেলতেই পাচ্ছি না
কবরফলকটার ওপর।
তবু নামটা পড়তে পারলাম:- হ্যারি
ব্যানার
১৯৭৭-১৯৮৮
আমায় ডেকে সুজা কি বলল, আমার
কানে গেল না। স্থির হয়ে
দাঁড়িয়ে আছি কবরফলকটার সামনে।
তাকিয়ে আছি অক্ষর আর
সংখ্যাগুলোর দিকে। উত্তেজনায়
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে,
পড়তে পারছি না আর ওগুলো। হঠাৎ
লক্ষ্য করলাম, কবরফলকটার পাশে
দাঁড়িয়ে আছে হ্যারি। আমার
দিকে তাকিয়ে।
" হ্যারি!", টর্চের আলো ফেলে
ঘোরাতে লাগলাম কবরফলকটার
গায়ে, " এটা কি তোমার কবর?"
জ্বলে উঠল হ্যারির চোখ। জ্বলন্ত
কয়লার মতো।
" হ্যাঁ, আমার",মৃদুস্বরে বলল হ্যারি।
এগোতে শুরু করল আমার দিকে।
"দুঃখিত, রেজা" বলে আমার দিকে
এক পা এক পা করে এগিয়ে এল
হ্যারি।
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now