বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছায়াশহর"
লেখক : রাকিব হাসান
পাঠিয়েছেন: প্রিয়া ব্যানার্জী
৮ ম পর্ব
" এই কি করছ, তোমরা এখানে?",
চক্রের বাইরে থেকে শোনা গেল
একজন বড় মানুষের কন্ঠ।
সবাই ঘুরে তাকালাম। লম্বা লম্বা
পা ফেলে মিঃ জোনসকে
এগোতে দেখলাম আমাদের দিকে।
তাঁর ব্লেজারের বোতামগুলো
খোলা, কানাদুটো বাড়ি খাচ্ছে
গায়ের ওপর। মুখে আন্তরিক হাসি। "
এই কি হয়েছে তোমাদের?"
আমার আর সুজার ওপর যে চড়াও
হয়েছিল এই ছেলেমেয়ের দল, মনে
হয় তিনি তা বুঝতে পারেন নি।
বুঝলে পারলে এরকম হাসি থাকত না
তাঁর মুখে।
" প্লে গ্রাউন্ডের দিকে
যাচ্ছিলাম আমরা", হাতের ব্যাটটা
ঘোরাতে ঘোরাতে বলল টমাস
হার্ডি, " সফটবল খেলতে।"
" ভাল, খেলাধূলোর মধ্যে থাকা
ভাল", মিঃ জোনস বললেন। তারপর
আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
" বৃষ্টি তো মনে হচ্ছে একটু পরেই
নামবে। দেখো, খেলতে পারো
কিনা।"
চক্র ভেঙে বেরিয়ে আসছিল
ছেলেমেয়েগুলো। চলে যাবার
জন্য পা বাড়াতে গিয়েও, আমার
আর সুজার দিকে চোখ পড়তে থমকে
গেলেন মিঃ জোনস। বললেন, "
আরে, তোমরা! খেয়ালই করিনি।"
" গুড মর্নিং! ", বিড়বিড় করে বললাম
আমি। পুরো দ্বিধায় পড়ে গিয়েছি
আমি।
সবাই এখন হাসছে, হৈ চৈ করছে।
অথচ একটু আগে এরাই আমাদের ওপর
চড়াও হয়ে মারতে আসছিল, এসবই কি
আমার কল্পনা? মাথা গরম হয়ে
যাওয়ায় উল্টোপাল্টা দেখেছি?
মিঃ জোনস ঠিক সময়মত না এলে
কি ঘটত আজ আমাদের কপালে?
ব্যাট দিয়ে মাথা গুঁড়িয়ে দিত
নাকি ছেলেদুটো? " নতুন বাড়িতে
কেমন লাগছে তোমাদের?", নিজের
মাথার ঢেউখেলানো চুল হাত
দিয়ে সমান করতে করতে জিজ্ঞেস
করলেন মিঃ জোনস।
" ভাল", একসঙ্গে জবাব দিলাম আমি
আর সুজা। ওদিকে কিটু আবার
ঘেউঘেউ শুরু করে দিয়েছে মিঃ
জোনসকে দেখে আর শেকল ছিঁড়ে
বেরিয়ে যেতে চাইছে।
কিটুর এই ব্যবহার ভাল লাগল না
মিঃ জোনসের। মুখ কালো করে
বললেন, " তোমাদের কুকুরটা দেখছি
এখনও আমায় দেখতে পারে না। " এই
বলে কিটুর ওপর ঝুঁকে পড়ে বললেন
তিনি, " এই, শান্ত হও বলছি, শান্ত
হও।"
কিটু এতে শান্ত তো হলোই না,
উলটে আরও জোরে চিৎকার
চেঁচামেচি শুরু করল।
" আজ কি যেন হয়েছে ওর",
কৈফিয়তের সুরে বললাম আমি, "
কাউকেই সহ্য করতে পারছে না।"
" হ্যাঁ, কুকুররা এমনই হয়", সোজা হয়ে
দাঁড়িয়ে বললেন মিঃ জোনস। তাঁর
কথাটা কেমন রহস্যময় শোনাল আমার
কানে।
গাড়ির দিকে রওনা হলেন মিঃ
জোনস। কয়েক গজ দূরে রাস্তার ওপর
তাঁর গাড়িটা দাঁড়িয়ে থাকতে
দেখলাম আমরা।
" তোমাদের বাড়িতে যাচ্ছি ",
আমার আর সুজার দিকে ফিরে
তাকিয়ে বললেন মিঃ জোনস, "
দেখি, তোমাদের মা-বাবার কিছু
সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা।
আর এই ছেলেমেয়েরা, তোমরা এখন
খেলো। শুধু খেলো। আর কিছু কোর
না কিন্তু ", অস্পষ্ট একটা শাসানির
সুর লক্ষ্য করলাম মিঃ জোনসের
গলায়।
তারপর গাড়িতে উঠে চলে
গেলেন। " খুব ভালো লোক", মিঃ
জোনসকে লক্ষ্য করে হ্যারি বলল।
" হ্যাঁ", একমত হয়ে বললাম। মনে মনে
ভাবলাম, মিঃ জোনস তো চলে
গেলেন, জানি না এখন আবার কি
করবে ছেলেমেয়েগুলো! সেই
ভয়ঙ্কর চক্রব্যূহ রচনা করবে না তো
আবার! না, সবাই এবার অন্যদিকে
হাঁটতে শুরু করল। ব্লকের অন্যপাশে,
স্কুলের পেছনের প্লে গ্রাউন্ডের
দিকে। কথা বলছে, হাসাহাসি
করছে....আমায় আর সুজাকে যেন
বেমালুম ভুলে গেছে তারা।
ভাবতে ভাবতে চলেছি আমি। কি
জানি! সবটাই হয়ত আমার মনের
কল্পনা। আমায় আর সুজাকে হয়ত কিছুই
করতে চায়নি ওরা।
ভাগ্যিস চেঁচিয়ে উঠিনি বা
সেরকম কিছু করে বসিনি! তাহলে
স্রেফ গাধা ভাবত আমায়।
শূন্য প্লে গ্রাউন্ড। মনে হয় মেঘলা
আকাশ দেখে বৃষ্টির ভয়ে
বেশীরভাগ ছেলেমেয়ে ঘর থেকে
বেরোয়নি। ঘাসে ঢাকা একটা উঁচু
মাঠকে প্লে গ্রাউন্ড বানানো
হয়েছে। চারপাশে টিনের উঁচু উঁচু
শক্ত বেড়া। দোলনা, স্লাইড....
ছোটদের খেলার নানা জিনিস
রয়েছে। এক প্রান্তে বেসবল
খেলার জায়গা দেখলাম; আর এক
প্রান্তে টেনিস কোর্ট। কিন্তু সব
ফাঁকা। জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই
কোথাও। বেড়ার একটা খুঁটির সাথে
কিটুকে বাঁধল সুজা। তারপর দৌড়ে
এল আমাদের কাছে। জিম বাটলার
নামে ছেলেটা দল ভাগ করে দিল।
হ্যারি আর আমি এক টিমে; সুজা
অন্য টিমে। আমাদের খেলা শুরু হল।
বেসবল খুব একটা খেলতে পারি না
আমি। তবু উৎসাহ নিয়েই খেলতে
লাগলাম। নতুন প্লেয়ারদের সামনে
একটু আধটু অস্বস্তিও লাগছিল।
ছেলেমেয়েগুলোকে আর খারাপ
মনে হচ্ছে না এখন। এরিক গার্ডনার
মেয়েটা তো খুবই ভাল। খেলার
ফাঁকে ফাঁকে আমার সঙ্গে গল্প-
ঠাট্টা চালিয়ে যেতে লাগল।
পুরো তৃতীয় ইনিংস পর্যন্ত খেললাম
আমরা।
এইসময় মেঘ কেটে গিয়ে সূর্য উঁকি
দিল। তারপরেই কানে এল তীব্র
হুইসেলের শব্দ। তাকিয়ে দেখি,
জিম বাটলার একটা রূপোর হুইসেল
বাজিয়েই চলেছে। সবাই দৌড়ে
গেলাম ওর কাছে। জিম আমাদের
উদ্দেশ্য করে বলল, " আর এখন না
খেলাই ভাল। বাড়িতে বলে
এসেছি, লাঞ্চের আগেই ফিরব
আমরা।" হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে
দেখি, মোটে সাড়ে এগারোটা।
এখনও তো প্রায় সকাল।
কিন্তু কেউ এর প্রতিবাদ করল না
দেখে অবাক হলাম।
সবাই, সবাইকে হাত নেড়ে যে যার
বাসার উদ্দেশ্যে দৌড় দিল। যেন
পালাতে চাইছে।
অন্যদের মতোই আমার পাশ দিয়ে
দৌড়ে যেতে যেতে দাঁড়িয়ে
পড়ল এরিকা। গম্ভীর মুখে তাকাল
আমার দিকে। বলল, " তোমায় আমার
ভাল লেগেছে, রেজা। মনে হচ্ছে,
আমাদের আগামী দিনগুলো ভালই
কাটবে।" " হ্যাঁ, কাটবে।" আমি
বললাম, " তুমি জানো, কোন
বাড়িটায় উঠেছি আমরা?"
মাথা ঝাঁকিয়ে এরিকা বলল, "
জানি। একসময় আমরাও ঐ বাড়িতে
থাকতাম।" আবার ধড়াস করে উঠল
বুকের ভেতরটা। আবার কি ভুল
শুনলাম?
দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা দিন
কেটে গেল। নতুন বন্ধুদের সঙ্গে বেশ
অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। প্লে গ্রাউন্ডে
যেসব ছেলেমেয়েদের সাথে
দেখা হয়, তারা কেউই এখনো
আমাদের বন্ধু হয়নি। সবাই আমাদের
সঙ্গে কথা বলে, দলে খেলতে নেয়,
কিন্তু ওদের কারোর ব্যাপারেই
আমরা কিছু জানি না। লক্ষ্য করেছি,
ওদের মুখ থেকে কথা বের করা খুব
কঠিন। রাতে আমাদের ঘরে প্রতিদিনই
ফিসফিসানি, মৃদু হাসির শব্দ শুনি।
উপেক্ষা করতে না পেরে কানে
বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকি।
একরাতে মনে হল, সাদা কাপড় পরা
একটা মেয়েকে দেখলাম যেন,
দোতলার বারান্দার শেষ মাথায়।
কিন্তু যখনিই ভাল করে দেখতে
গেলাম, বারান্দার কোণে একদলা
পুরনো সাদা কাপড়ের স্তুপ ছাড়া
আর কিছুই নজরে পড়ল না।
আমি আর সুজা মানিয়ে নেবার
চেষ্টা করছি, কিন্তু কিটু পারছে
না। প্রতিদিন ওকে সঙ্গে নিয়ে
আমরা প্লে গ্রাউন্ডে যাই; কিন্তু
এখনো ওকে প্লে গ্রাউন্ডের
বাইরে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতে
হয়। ঐ ছেলেমেয়েগুলোকে
দেখলেই ও ভয়ঙ্কর হিংস্র হয়ে ওঠে,
ঘেউঘেউ করতে করতে মুখ দিয়ে
ফেনা উঠতে থাকে, কামড়ে
দিতে যায়।
দুই হপ্তা বাদে একদিন। সেদিনও
আমরা কিটুকে প্লে গ্রাউন্ডের
বাইরে খুঁটির সাথে বেঁধে বেসবল
খেলছিলাম, হঠাৎ খুঁটির দিকে
চোখ পড়তে দেখি, কিটু নেই! শেকল
ছিঁড়ে কোনওভাবে পালিয়েছে।
ঘন্টার পর ঘন্টা আমি আর সুজা খুঁজে
বেড়ালাম কিটুকে। প্রত্যেকটা ব্লক,
প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে,
পেছনের উঠোনে, পতিত জায়গায়,
বনে জঙ্গলে সব জায়গায় খুঁজলাম।
তারপর একসময় লক্ষ্য করলাম, আমরা পথ
হারিয়েছি। গ্রীন ভ্যালির
রাস্তাগুলো সেই আগের মতোই
রয়েছে। রাস্তার পাশে ইঁট, পাথর,
টালির তৈরি বাড়িঘর, গাছে
ঘেরা অন্ধকার রাস্তাঘাট। "
বিশ্বাস করতে পারছি না, আমরা পথ
হারিয়েছি!", একটা গাছের গায়ে
ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল সুজা।
পথশ্রমে ঘন ঘন হাঁফাচ্ছে ও।
" ওই বোকা কুকুরটা!", শূন্য রাস্তার
দিকে দেখতে দেখতে বললাম
আমি, " এভাবে পালাল কেন? আগে
তো কখনো এরকম পালায় নি।"
" শেকল কিভাবে খুলল, তাই তো
বুঝতে পারছি না", সুজা মাথা
নেড়ে বলল। শার্টের হাতা দিয়ে
কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, "
বেশ শক্ত করেই তো বেঁধেছিলাম!" "
আচ্ছা, বাড়ি চলে যায়নি তো?",
ভাবনাটা পুলকিত করে তুলল আমায়।
" হ্যাঁ, ঠিক বলেছ"! গাছের কাছ
থেকে সরে এসে আমার সামনে
এসে দাঁড়াল সুজা, " হয়ত কোন
ফাঁকে বাড়ি চলে গেছে। আর
আমরা এখানে বোকার মতো খুঁজে
বেড়াচ্ছি। চল, আগে বাড়িতে
গিয়ে দেখি।"
" চলো", যে জায়গাটায় রয়েছি
আমরা, সেটার চারপাশে
তাকালাম আমি, " বাড়ির রাস্তা
কোনদিকে আগে সেটা বুঝতে হবে
তো।" রাস্তার এমাথা ওমাথা
তাকালাম। স্কুল আর বাড়ি
কোনদিকে, শেষ আমরা কোন
মোড়টা ঘুরেছিলাম, মনে করতে
চেষ্টা করলাম। কিন্তু মনে না পড়ায়
আন্দাজে একটা দিক ধরে চলতে
লাগলাম আমরা।
ভাগ্য ভাল, স্কুলটা কিছুক্ষণের
মধ্যেই চোখে পড়ল। প্লে গ্রাউন্ডের
পাশ দিয়ে যাবার সময় খুঁটিটার
দিকে নজর পড়ল। এখানেই বাঁধা
ছিল কিটু। হতচ্ছাড়া, ঝামেলা
পাকানোর ওস্তাদ হচ্ছে কুকুরটা!
গ্রীন ভ্যালিতে এসে থেকে অদ্ভুত
কাণ্ডকারখানা করে চলেছে।
বাড়ি গিয়ে দেখব তো ওকে, এমন
সন্দেহও মাঝেমাঝে হচ্ছিল মনের
মধ্যে।
কয়েক মিনিট পর আমি আর সুজা
আমাদের বাড়ির সুরকি বিছনো
ড্রাইভওয়েতে ঢুকে কিটুর নাম ধরে
ডাকতে ডাকতে ছুটলাম। ঝটকা
দিয়ে খুলে গেল সামনের দরজা।
মা বেরিয়ে এলেন। মাথায় লাল
রুমাল বাঁধা। পরনের জিনসে ময়লা
লেগে আছে। মা আর বাবা
পেছনের উঠোনটা রঙ করছিলেন।
" কোথায় ছিলে তোমরা?", মা
জিজ্ঞেস করলেন, " দুই ঘন্টা আগে
লাঞ্চের সময় পেরিয়ে গেছে।"
" কিটু ফিরেছে?", আমি জিজ্ঞেস
করলাম।
" আমরা এতক্ষণ ওকেই খুঁজছিলাম। " ভ্রু
কুঁচকে গেল মায়ের। বললেন, " আমি
তো ভাবলাম, ও তোমাদের সঙ্গেই
আছে।"
মনটা দমে গেল আমার। দীর্ঘশ্বাস
ফেলে সুজা নুড়ি বিছনো,
পাতালতায় ঢাকা পথের ওপর চিত
হয়ে শুয়ে পড়ল।
" ওকে দেখনি?", গলা কাঁপছে
আমার, " আমাদের সঙ্গেই তো ছিল।
কখন পালালো, দেখতেও পেলাম
না।"
" তাই নাকি?", সুজাকে ড্রাইভওয়ে
থেকে উঠতে ঈশারা করলেন মা, "
পালাল কি করে? তোমরা ওকে
বেঁধে রাখো নি?"
" তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো
মা," সুজা বলল, " কিটুকে খুঁজতে
যেতে হবে। তোমার সাহায্য
লাগবে।"
" মনে হচ্ছে, বেশীদূর যায়নি। ঠিক
আছে, খুঁজতে বেরবো আমরা। আগে
খেয়ে নাও। নিশ্চয় তোমাদের খুব
খিদে পেয়েছে....."
আমাদের আর খাওয়াদাওয়ায় রুচি
রইল না। শেষে মা-বাবা অনেক
পীড়াপীড়ি করাতে কোনওরকমে
তাড়াহুড়ো করে পিনাট বাটার আর
জেলি দিয়ে স্যান্ডউইচ খেয়ে
নিলাম। তারপর গ্যারেজ থেকে
গাড়ি বের করলেন মা।
পুরো গ্রীন ভ্যালি তন্নতন্ন করে
খুঁজলাম। কিন্তু, কোনও চিহ্নই নেই
কুকুরটার। সুজা আর আমার এত মন
খারাপ হয়ে গেল যে কোনওরকমে
কান্না চাপলাম। বাবা আমাদের
স্বান্তনা দিলেন যে, কিটু বাড়ি
চেনে, ঠিকই চলে আসবে। কিন্তু
আমাদের বিশ্বাস হল না। নীরবে
ডিনার খেলাম চারজনে। আমার
জীবনের ভয়ঙ্করতম সন্ধ্যা ওটা। " খুব
শক্ত করেই বেঁধেছিলাম ", সুজা বলল।
ওর চোখে পানি টলমল করছে।
খাবারগুলো পড়ে আছে প্লেটে। "
পালিয়ে যাওয়ায় কুকুররা ওস্তাদ ",
বাবা বললেন, " ও ঠিক ফিরে
আসবে, চিন্তা কোর না।"
" যা রাত!", বিষন্নকন্ঠে বললেন মা, "
এমন রাতে পার্টি!"
আমাদের মনে পড়ল, এখন মা আর
বাবা বেরিয়ে যাবেন। পাশের
ব্লকের এক প্রতিবেশী তাঁদের
পার্টিতে দাওয়াত দিয়ে
রেখেছেন।
" আমারও যেতে ইচ্ছে করছে না",
বাবা বললেন, " সারা দিন যা
পরিশ্রম গেছে, এখন বিশ্রাম নিলে
ভাল হয়। কিন্তু না গেলেও চলবে
না। ওঁরা মাইন্ড করবেন। " তারপর
আমার আর সুজার দিকে তাকিয়ে
বললেন, " তোমরা একা থাকতে
পারবে তো?"
" পারব", আমি বললাম। আমার মনপ্রাণ
জুড়ে রয়েছে কিটুর ভাবনা। কান
খাড়া করে রয়েছি দরজায় কুকুরের
ডাক শোনার জন্য।
কিন্তু না। ঘন্টাগুলো গড়িয়ে চলল।
শোবার সময় হয়ে এল। কিন্তু কিটু এল
না। ওপরতলায় চলে এলাম আমি আর
সুজা। খুব ক্লান্ত লাগছে। সারাদিন
কিটুকে খুঁজে বেড়ানোর পরিশ্রম
আর দুশ্চিন্তায়।
আমার বেডরুমের বাইরের বারান্দা
ধরে হেঁটে এসে আমার ঘরের
সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভেতরে শুরু
হল রোজকার মতো সেই
ফিসফিসানি। ভেতরে হেঁটে
বেড়াচ্ছে কেউ, নড়াচড়ার শব্দ
বাইরে থেকে টের পাচ্ছি।
এখন এসব গা সওয়া হয়ে গেছে ।
এসবে এখন ভয়ও পাই না, চমকেও উঠি
না। কোনওরকম দ্বিধা না করে দরজা
ঠেলে ঘরে ঢুকলাম। সুইচ টিপে
আলো জ্বাললাম। যথারীতি শূন্য ঘর।
জানি, এমনটাই দেখব। পর্দাগুলোর
দিকে তাকালাম, স্থির হয়ে
ঝুলছে। ফিসফিস শব্দটাও আর নেই।
বিছানার ওপর দেখলাম, অনেকগুলো
পোশাক এলোমেলো ভাবে পড়ে
রয়েছে। কয়েক জোড়া জিনস,
একজোড়া টি শার্ট, একটা গরম
কাপড়ের জামা, একটা নাইট গাউন।
আশ্চর্য! ভারী আশ্চর্য তো! মা কখনো
জিনিস এলোমেলো করে রাখে
না বরং গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে
মায়ের বাতিক আছে। এই কাপড়গুলো
মা ধুয়ে থাকলে এগুলো আমার
ড্রেসারের ড্রয়ারে থাকত,
এভাবে বিছানায় পড়ে থাকত না। জোরে একটা
নিশ্বাস ফেললাম।
কাপড়গুলো আবার ড্রেসারের
ড্রয়ারে গুছিয়ে রাখলাম। মনে মনে
ভাবলাম, মা হয়ত এগুলো ধুয়ে
রেখেছে ঠিকই, বিছানায় রেখে
গেছে যাতে আমি গুছিয়ে রাখি
কিংবা বিছানায় এগুলো রেখে
অন্য কাজে গিয়েছিল, পরে এসে
গুছিয়ে রাখবে ভেবে। আধ ঘণ্টা
ধরে বিছানায় শুয়ে রইলাম ; চোখে
ঘুমের লেশমাত্র নেই। ওপরের
ছাদের ছায়াগুলোর দিকে
তাকিয়ে রইলাম। কতক্ষণ এভাবে
ছিলাম জানি না। কটা বাজে,
তাও জানি না। শুধু ভাবছিলাম
কিটুর কথা, আমাদের নতুন
বন্ধুবান্ধবদের কথা, আমাদের নতুন
প্রতিবেশীদের কথা।
এইসময় ক্যাঁচকোঁচ করে আমার ঘরের
দরজাটা খুলে গেল। কাঠের
মেঝেতে চাপা একটা পদশব্দ
শোনা গেল। লাফ দিয়ে উঠে
বসলাম। অন্ধকার ঘরে কেউ ঢুকেছে!
" ভাইয়া, আমি!" চাপা ফিসফিস
করে কেউ বলল।
এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম
আমি যে সুজার কণ্ঠস্বরও চট করে
প্রথমেই চিনতে পারল না। একটু
ধাতস্থ হলে বললাম, " সুজা! এইসময়!
এখানে! কি দরকার? "
টর্চটা একবার জ্বালিয়েই নিভিয়ে
দিল সুজা; তারপর ছাদের দিকে
আলো ফেলল। সেই আলোয় আমি
ওকে দেখতে পেলাম।
" কিটু কোথায় আছে, আমি জানি",
ফিসফিস করে বলল সুজা, " আমি ওকে
আনতে যাচ্ছি এখন, তুমি যাবে
আমার সঙ্গে?"
" মানে?", ঘড়ির দিকে তাকালাম
আমি, " বারোটার বেশী বাজে। এই
রাতদুপুরে কোথায় যাবি?"
" বেশীক্ষণ লাগবে না", ফিসফিস
করেই বলল সুজা।
এবার যেন সুজাকে ভাল করে
দেখতে পেলাম আমি। হ্যালোজেন
লাইটের আভায় ওর মুখটা দেখতে
পাচ্ছি। পুরো রেডি হয়েই এসেছে
ও। পুরো হাতাওয়ালা টি শার্ট আর
জিনস পরে বাইরে বেরোনর জন্য
রেডি হয়ে এসেছে।
" আমি বুঝতে পারছি না সুজা", ঘুরে
বসে বললাম আমি, " আমরা সব
জায়গায় খুঁজেছি, কোথায় যেতে
পারে কিটু?" " গোরস্থানে", চাপা
গলায় বলল সুজা। " মানে?", বুঝলাম
আমার চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে।
" প্রথমবার পালিয়ে তো ওখানেই
গিয়েছিল, ভুলে গেছ? সেই সেদিন,
যেদিন আমরা প্রথম বাড়ি দেখতে
এসেছিলাম, তখন তো পালিয়ে
গোরস্থানেই চলে গিয়েছিল।"
" কিন্তু আজ বিকেলেও তো আমরা
ঐদিকটায় গিয়েছিলাম। তখন
তো...." আমায় থামিয়ে দিয়ে সুজা
বলল, " আমরা গোরস্থানের পাশ
দিয়ে ঘুরেছি, ভেতরে ঢুকিনি।
আমি নিশ্চিত ভাইয়া, ও ওখানেই
আছে। তুমি না যাও, আমি একাই
যাচ্ছি ওকে খুঁজে আনতে।"
" সুজা, মাথা গরম কোরো না", ওর
কাঁধে হাত রাখলাম আমি, "
গোরস্থানে ও ঢুকবে কেন বলো?" "
প্রথম বার তাহলে ও গিয়েছিল
কেন?", সুজা আবার চাপা গলায়
বলে উঠল, " নিশ্চয় কোনও কিছুর গন্ধ
শুঁকে শুঁকে। আর আমি নিশ্চিত এবারও
ও ওখানেই গেছে।"
" বুঝলাম ওকে ঠেকানো যাবে না।
একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন
যাবেই। তাই বললাম, " সুজা, সত্যিই
তুই এই রাত দুপুরে একটা অপরিচিত
গোরস্থানে ঢুকতে চাস?"
" আমি ভয় পাই না " বলে সারা ঘরে
টর্চের উজ্জ্বল আলো ফেলল সুজা। ও
যখন আলোটা ঘোরাচ্ছিল তখন হঠাৎ
মনে হল ঘরের ভেতর পর্দার আড়ালে
কাউকে যেন লুকিয়ে থাকতে
দেখলাম। মূহুর্তের জন্য। একটা
চিৎকার করতে গিয়েও মুখ হাঁ করে
থেমে গেলাম।
" তুমি যাবে কিনা বলো আমার
সাথে?" সুজা আবার জিজ্ঞেস করে
উঠল।
' না' বলতে গিয়েও মনে হল, এই
ঘরটাও তো ভূতুড়ে। তাই
অনিচ্ছাস্বত্তেও " হ্যাঁ, যাব" বলতে
বাধ্য হলাম। বললাম, " কাপড়টা বদলে
নিই"।
" ঠিক আছে", টর্চ নিভিয়ে ফেলল
সুজা। বলল, " আমি এখন যাচ্ছি। আমি
ড্রাইভওয়ের মাথায় দাঁড়িয়ে
আছি। তুমি কাপড় বদলে এসো। "
" সুজা, আমরা কিন্তু গোরস্থানে
গিয়ে বেশী দেরী করতে পারব
না। একবার চট করে দেখেই চলে
আসব", আমি বললাম। " হ্যাঁ", সুজা
আশ্বস্ত করল, " মা বাবা পার্টি
থেকে ফেরার আগেই আমরা ফিরে
আসব। আমি বাইরে চললাম। তুমি
রেডি হয়ে এসো", এই বলে সুজা
ধীরেধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে
গেল। বাইরের সিঁড়িতে ওর চাপা
সতর্ক পায়ের শব্দ শুনলাম।
এত রাতে গোরস্থানে যাব ভেবেই
গা টা কেমন শিরশির করে উঠছে।
গ্রীন ভ্যালিতে বলেই বোধহয়
পারছি। এখানকার পরিবেশই
আমাদের দু:সাহসী হতে সাহায্য
করেছে।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে কয়েকটা
পোশাক নিয়ে পরতে শুরু করলাম।
যাও, যাও বলে নিজেকে সাহস
সঞ্চয়ের চেষ্টা করলাম। যা
একখানা এডভেঞ্চার হবে না!
নেডকে চিঠি লিখে জানাতে
হবে পরে।
আর যদি সুজার যুক্তি ঠিক হয়, কিটুকে
যদি খুঁজে পাই, তাহলে তো মস্ত
একটা কাজের কাজ হবে।
একটু পরে ফুলহাতা শার্ট আর জিনস
পরে বাইরে বেরিয়ে এলাম।
কথামতো ড্রাইভওয়ের শেষ মাথায়
এসে দেখি, সুজা দাঁড়িয়ে আছে।
রাতটা বেশ গরম। ভারী মেঘে
ঢাকা পড়েছে চাঁদ। প্রথমবারের
মতো লক্ষ্য করলাম আমাদের ব্লকে
রাস্তায় একটাও বাতি নেই। মরা
পাতা মাড়ানোর মরমর শব্দ তুলে
টর্চের আলো জ্বেলে আমরা
এগিয়ে চললাম। আমাদের ব্লক
পেরিয়ে স্কুলের কাছে চলে
এলাম। এখান থেকে মাত্র দুই ব্লক
দূরেই কবরস্থানটা। " এত অন্ধকার! "
ফিসফিস করে বলল সুজা। " হ্যাঁ, আর
তেমনি অতিরিক্ত নীরবতা ", আমি
যোগ করলাম। আশপাশের বাড়িগুলো
অন্ধকার আর নিস্তব্ধ। বাতাস প্রায়
নেই। মনে হচ্ছে সারা পৃথিবীতে
আমরাই শুধু বুঝি এইদুটি জীবিত মানুষ।
সুজার সঙ্গে তাল রাখতে আমাকেও
দ্রুত ওর সঙ্গে চলতে হচ্ছে। ফিসফিস
করে বললাম, " একটা ঝিঁঝিঁও
ডাকছে না কোথাও। এখনও ভেবে
দেখ, সত্যিই গোরস্থানে যেতে
চাস?"
" চাই", সুজা বলল। রাস্তায় গোল হয়ে
পড়া টর্চের আলোটা আগে আগে
চলেছে, আর ওটাকে অনুসরণ করে
এগিয়ে চলেছে ও। " আমি জানি
কিটু ওখানেই আছে", সুজার চাপা
ফিসফিসানি শোনা গেল আবার।
প্রায় দুই ব্লক চলে এলাম। স্কুলটা
এখনো চোখে পড়ছে। ঠিক এইসময়
পেছনে কার পায়ের শব্দ শুনতে
পেলাম। সুজা আর আমি দুজনেই
দাঁড়িয়ে গেলাম। সুজা ওর হাতের
টর্চটা একটু নীচু করে ধরল।
দুজনেই শব্দটা শুনেছি। তারমানে,
এবার আর এটা আমার কল্পনা নেয়।
কেউ আমাদের অনুসরণ করছে!
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now