বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখা: ফ্রাংকেনস্টাইনের কুৎসিত দানব(Dr. Raihan Masud Bipu)
প্রারম্ভিকা:
১৫৫৯ সাল। চট্টগ্রামের পাহাড়তলি , যেটা এখন দেশের অন্যতম রেলওয়ে প্রকৌশল এবং মেরামত কারখানার জন্য বিখ্যাত,সেটার নাম পাহাড়তলি ছিল না। ছিল সুলতানপুর। বাংলার সুলতান ছিল হোসেন শাহ। এই দেশে ব্যবসা করতে চট্টগ্রামের উন্মুক্ত বন্দরে আসা শুরু করে পর্তুগীজরা। ভাস্কো ডা গামার ভারতবর্ষ আবিস্কারের পর থেকেই শুরু হয়,একাধারে এদেশে পর্তুগীজদের আগমন।
১৫৩১ সালে এদেশে পর্তুগীজদের ব্যবসার বাইরেও আধিপত্য বিরাজ শুরু হয়।তাদের মন শুধুমাত্র ব্যবসায় পড়ে থাকে না। দুর্বল সুলতান হোসেন শাহের অদূরদর্শিতার জোরে পর্তুগীজদের এদেশে সামরিক এবং রাজনৈতিক শক্তি বাড়তে থাকে।
পর্তুগীজরা নিজেদের পণ্য এদেশে সৎপথে বিক্রি করে অর্জিত টাকায়ই খুশি থাকে না। তাদের টাকা উপার্জনের নতুন শিল্প হিসেবে তারা গ্রহণ করে দাস ব্যবসা।
বাংলাদেশি শক্তসমর্থ পুরুষ এবং সুন্দরি মহিলাদেরকে তারা অপহরণ করে দেশের ভিতরেই অন্য কোথাও বা বিদেশে বিক্রি করতে থাকে। রাজনৈতিক প্রভাব এসে যাওয়ায় সহজেই তারা এই অপকর্মকে ধামাচাপা দিতে থাকে। অন্তত প্রথমদিকে তা ই করে।
যখন দাস ব্যবসায় এদের প্রচুর টাকা আসে,কিন্তু ধরাও পড়ে না। এদের সাহস বেড়ে যায়। এরা রাতের আধারে ধনী দেশী লোকদের বাড়িতে ডাকাতি শুরু করে আর ধনসম্পদ আর মেয়েমানুষ লুট করতে থাকে। এদেশীয় পর্তুগীজ ক্যাম্পের আস্তে আস্তে ধনসম্পদের পাহাড় জমতে থাকে।
হঠাৎ ধনসম্পদ এবং দাসপণ্যের ঘাটতি পড়ায় পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যঘাটি পরিবর্তন করে। তারা নতুন বাণিজ্যঘাটি করে সুলতানপুরে। যেটা বর্তমানে পাহাড়তলি নামে পরিচিত।
পাহাড়তলি তখনকার খুবই সমৃদ্ধশালী গ্রাম ছিল।প্রত্যেকটা পরিবার সচ্ছল ছিল। প্রচুর ধনসম্পদ ছিল। কিন্তু জনসংখ্যা খুব কম ছিল। আশেপাশে ছিল পাহাড় আর জঙ্গল। যে পাহাড়ের পাদদেশে হবার কারণে জায়গাটির নাম হয় পাহাড়তলি।
এখন জনসংখ্যা কম।ধনসম্পদ বেশি। পারফেক্ট ঘাটি হবার জন্য পর্তুগীজদের জায়গাটা পছন্দ হয়। আগের ঘাটিতে খুব লুকিয়ে তাদের কাজ করতে হত,কারণ সুলতানের চোখে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এই জায়গাটা একটু ভিতরে হওয়ায়।শুধুমাত্র খাজনার সময় ছাড়া সুলতানের লোক খুব একটা আসে না।
পর্তুগীজরা তাদের ঘাটির জন্য পারফেক্ট জায়গা পেয়ে এখানে একটা দুর্গ তৈরি করতে থাকে। তাদের ব্যবসা দাসপণ্য এবং ধনসম্পদ ছাপিয়ে সুদূরপ্রসারী দিকে মন যায়। সেটা হল এদেশের ক্ষমতা। আস্তে আস্তে তারা শক্তি আরো বাড়াতে থাকে।
দুর্গ তৈরি হয়ে গেলে তারা আসল রূপ দেখায়। পাহাড়তলির লোকেরা এতদিন তাদেরকে অতিথিভেবে অনেক আপ্যায়ন করত। পর্তুগীজরা এখন তাদের লুট করা শুরু করে। এবং মানুষ অপহরণ শুরু করে।
দুই একটা ঘটনার পর পাহাড়তলির মানুষ ওদের আসল রূপ বুঝতে পারে। তারা প্রতিরোধ করে। পাহাড়তলির প্রত্যেকজন সমর্থ পুরুষ দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রাতের আধারে টহল দেয়া শুরু করে পুরো গ্রাম।
এবার পরের পনেরোদিন পর্তুগীজদের যেসব গ্রুপ রাতের আধারে গ্রামে আক্রমণ করতে থাকে,দেশী লোকদের পালটা প্রতিরোধে পালিয়ে যায়। এভাবে ব্যর্থ আক্রমণের এক পর্যায়ে এক পর্তুগীজ মরে যায়।
এখন যত অস্ত্রই থাক,সেসময় আগ্নেয়াস্ত্র প্রচলিত ছিল না। তাই বাংলাদেশি অস্ত্রগুলো পর্তুগিজদের স্টকের অস্ত্রের তুলনায় অনেক সমৃদ্ধশালী এবং ভয়ংকর ছিল।
পর্তুগীজরা বুঝে গিয়েছিল এভাবে পাহাড়তলিতে তাদের ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়বে। তাই একজন পর্তুগীজের মৃত্যু তাদের জন্য শাপে বর হল।
তারা সেই লাশ নিয়ে সুলতান হোসেন শাহের কাছে বিচার দিল যে পাহাড়তলির অসভ্য মানুষ তাদের এক নিরাপরাধ ব্যবসায়ীকে একা পেয়ে পণ্য লুট করে খুন করেছে।
এদিকে তখন দিল্লীতে মুঘল রাজা হুমায়ূনকে হটিয়ে শেরশাহ ক্ষমতা দখল করেছে।।এখন পুরো ভারতবর্ষ দখলের প্রয়াসে সে সৈন্যবাহিনী পাঠাচ্ছে বিভিন্ন প্রান্তে। হোসেন শাহ শুনেছে বাংলা আক্রমণ করতে আসছে তারা। সে তাই দুশ্চিন্তায় ছিল। পর্তুগীজরা এসময় বিচার চাইতে আসলেও সে ভ্রুক্ষেপ করল না।
পর্তুগীজরা হাল ছেড়ে দিল না। তারা খোজ নিল যে শেরশাহ বাংলা আক্রমণ করতে চাচ্ছে। তারা তখন হোসেন শাহকে বলল,তারা পর্তুগাল থেকে সৈন্য এনে হোসেন শাহকে শেরশাহের বিরুদ্ধে জিততে সাহায্য করবে।কিন্তু বিনিময়ে তাদেরকে শুল্কবিহীন বাণিজ্যের অনুমতি দিতে হবে,এবং বাংলায় নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় তাদেরকে আইনের উর্ধ্বে থাকার নির্দেশ জারি করতে হবে।
হোসেন শাহ কোন কিছু না ভেবে রাজি হয়ে গেল। পর্তুগীজ সৈন্য এল এদেশে আধুনিক অস্ত্র নিয়ে। শেরশাহ এই খবর শুনে আক্রমণ পিছিয়ে দিল।
হোসেন শাহ খুবই খুশি। সে পর্তুগীজদের সাথে বন্ধুত্ব করল।পর্তুগীজরা তাকে বলল,পাহাড়তলির লোকেরা তাদের ব্যবসায় আক্রমণ করছে।তাদের বিরুদ্ধে তারা আইনত ব্যবস্থা নিতে চায়।
সুলতান সৈন্য পাঠাতে চাইলে পর্তুগিজরা বলল,"তার প্রয়োজন হবে না,আমরা আপনার অনুমতি চাইছি যেন নিজেদের রক্ষা করতে আমরাই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারি। আর গ্রামটা যেহেতু দুর্গম। আপনার সৈন্যদের সেখানে যেতে অসুবিধা হবে,এর চেয়ে আমরাই একটা কারাগার বানিয়ে অপরাধীদের ধরি,"
সুলতান জানত না যে তারা অনেক আগেই দুর্গ বানিয়েছে। সে পর্তুগিজদের বন্ধু ভেবে অনুমতি দিল।
পর্তুগিজরা তখনই পাহাড়তলির প্রত্যেকটা পুরুষকে নতুন সৈন্যবলে ধরে নিয়ে গেল। তারাপর সেই দুর্গে আটকে রাখল। এখন পাহাড়লির সম্পদের মাঝে রইল শুধু দুর্বল নারী,বুড়ো আর শিশু।
পর্তুগীজদের দুর্গে মধ্যযুগীয় ভয়াবয় কিছু অত্যচারের উপকরণ ছিল। তারা অপরাধীদের কয়েকটা ভাগে ভাগ করল। বিশেষ কিছু অত্যাচারের ধাপ অনুযায়ী। যারা সর্বনিম্ন অত্যাচারেই মরে যেত তারা তো গেলই। যারা এরপরের আরেকটু কঠোর অত্যাচার সইতে পারত,তাদের দাস হিসেবে সুলতানের সেনাবাহিনীতে বিক্রি করত। সুলতানের কোন আইডিয়াই ছিল না এ ব্যপারে। যারা সবচেয়ে বেশি অত্যাচার সইতে পারত,তাদেরকে পর্তুগালে পাচার করে দেওয়া হত।
তবে সেই ভয়াবহ অত্যাচারের জন্য খুব কম পুরূষই দাস হিসেবে বাইরের আলো দেখার সুযোগ পেত। অধিকাংস মরে যেত।তাদের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হত কর্ণফুলীতে।
মৃত্যুর আগে তারা অভিশাপ দিত পর্তুগীজদের। যে ধনসম্পদের জন্য তারা এত অত্যাচার করত, সেই ধনসম্পদ যেন অভিশপ্ত হয়। যারাই ওই ধনসম্পদ হাতে নেবে,তাদের উপর যেন মৃত্যু নেমে আসে,ভয়ংকর মৃত্যু।
অমানুষিক অত্যাচারে মৃত পুরুষরা যেন চলে যায় না পাহাড়তলি থেকে।তারা প্রহরী হয়ে ঘুরে বেড়ায় সেই দুর্গে। জীবিত অত্যাচারিতের আর্তনাদের সাথে রাতের গহীনে কাদের যেন অপার্থিব আর্তনাদ শোনা যায়। পর্তুগিজদের ধনসম্পত্তির উপর অভিশাপ। যেই পাক সেই সম্পদ নিজ হাতে তাকে শাস্তি দেবে তারা।
এদিকে পাহাড়তলির পুরুষহীন নিরাপত্তাহীন মহিলাদের উপর পর্তুগীজরা হাত বাড়ায়। তাদের দুধের শিশুদের রাতের আধারে পা দিয়ে থেতলে মহিলাদের ভোগ করে পর্তুগিজ সেনারা।
এরকম দুই একটা ঘটনার পর মহিলারা বুঝে যায় তাদের কপালে কি থাকবে,তারা সিদ্ধান্ত নেয় দুনিয়া থেকে সম্মান নিয়ে যাবে তারা।
পাহাড়তলির সব নারী এক হয় জনমানবহীন প্রান্তরে এক রাতে। নিজেদের গায়ে আগুণ লাগিয়ে দেয়। এক গ্রাম নারীর অমানুষিক আর্তনাদে ধু ধু প্রান্তরের আকাশ বাতাস ভয়ার্ত হয়ে যায়। পর্তুগীজ ক্যাম্পে সেই চিৎকার শুনে আতংক যেন ছোটাছুটি করে।
পাহাড়তলিতে সেসময়ে এক তান্ত্রিক থাকত। পাহাড়তলির ধু ধু প্রান্তরে থাকা মহাশশ্মানে বসে সে পিশাচসাধনা করত। তার সাধনায় খুশি হয়ে এক পিশাচ তার ডাকে সাড়া দেয়। তান্ত্রিকের সামনে পিশাচ যখন ছায়াশরীরে আবির্ভাব হয়। তান্ত্রিক তখন পিশাচের কাছে শক্তি চায়। অলৌকিক শক্তি,যা দিয়ে সে এই দুনিয়ার মানুষের উপর রাজত্ব করতে পারবে। মানুষকে বশ করে বিভিন্ন কাজে লাগাতে পারবে নিজের।
পিশাচের নাম ছিল বজ্র। বজ্রের ছায়া তাকে বলে যে পিশাচের এই নির্দিষ্ট ক্ষমতা আছে যা দিয়ে মানুষকে বশ করে দাস বানিয়ে তাদের দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে নিতে পারে।পিশাচ তাকে বলে, "আমি তোমাকে এই শক্তি দেবো,কিন্তু এই শক্তি অনেক দামী,আমার কাছ থেকে নিতে হলে তোমাকে অনেক কিছু দিতে হবে।"
তান্ত্রিক মনে মনে প্রস্তুত ছিল,সে জানত,এরকম শক্তির বিনিময়ে পিশাচকে আত্মা দিয়ে দিতে হয়।সে বলল,"আচ্ছা আমি তোমার কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করব,আমার মৃত্যুর পর এই আত্মা তোমার দাস হবে। তুমি এর বিনিময়ে আমাকে সেই শক্তি দাও।"
পিশাচ বলে,"তোর ওই তুচ্ছ ছায়া দিয়ে আমি কি করব? আমি চাই পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ আমার পূজা করুক। আমি পৃথিবীতে দেবতা রূপে পূজিত হতে চাই। এজন্য তোকে একটা ব্যবস্থা করতে হবে। যেন আমি পিশাচলোক থেকে স্থায়ীভাবে পৃথিবীতে আসতে পারি। তোকে আমি একটা মন্ত্র দেব,এই মন্ত্র পড়ে তুই এই গ্রামের প্রত্যেকটা শিশু থেকে বুড়ো সব বয়সী মহিলাকে আগুনে পুড়িয়ে যজ্ঞ দিবি। তাহলে পৃথিবীতে আমি পূর্ণ শরীর নিয়ে এসে মানুষদের আমার অনুসারী করতে পারব ভয় দেখিয়ে।"
তান্ত্রিক প্রমাদ গুণেছিল। এক গ্রাম মহিলাকে আগুনে পুড়িয়ে যজ্ঞ করবে সে কিভাবে?
কিন্তু তারপর পর্তুগীজরা আসার পর অবস্থা এমন হয়ে গেল যে সব বয়সী মহিলারা আগুণে পুড়ে আত্মাহুতি দিল। দূর থেকে শ্মশানে বসা তান্ত্রিক ব্যপারটা দেখল। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সুযোগে সে যারপরনাই খুশি হয়ে গেল। আগুনে পুড়ে মহিলাদের জ্বলন্ত দেহ যখন ছটফট করছে,তান্ত্রিক ছাই দিয়ে সেই আগুণের কুন্ডলীর চারপাশে গোল একটা বলয় করল।
তারপর আসন পেতে পিশাচমন্ত্র পড়া শুরু করল। তান্ত্রিক রিচুয়ালে বিশাল একটা ভুল করে ফেলল। তাকে একটা নির্দিষ্ট মন্ত্র পড়ে একটা একটা করে মহিলাকে আগুণে পুড়ানোর কথা ছিল।কিন্তু পরিস্থিতি অনুযায়ী সব মহিলাকে জ্বলতে দেখে সে একাধারে প্রত্যেকটি মন্ত্র পড়ল।
আকাশের গোল পূর্ণিমার চাদে সেরাতে অশুভ হয়ে গিয়েছিল প্রকৃতি। চারপাশে মৃতের হাহাকার,পর্তুগীজ দের দুর্গে কোন নির্যাতিত লোকে মৃত্যুর আগে শেষ দীর্ঘশ্বাস,সব যেন পৃথিবীতে পিশাচের আগমণের ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল।
পিশাচ এল সশরীরে। বাদুড়ের মত ডানা,শরীরের দুপাশে লাল রঙ,বাকি লোমশ শরীরটা পার্পল। শিংওয়ালা,দুই শ্বদন্ত বিশিষ্ট,হাতির কান ওয়ালা,বিদঘুটে বীভৎস চেহারায় লাল ভাটার মত চোখদ্বয় অশুভ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
পিশাচ এসেছিল স্থায়ীভাবে পৃথিবীতে আসার জায়গা পেতে। কিন্তু এসে দেখল সে, ভুল মন্ত্রপাঠে তার পিশাচলোকে ফেরত যাবার রাস্তা চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি পৃথিবীতে সে পাহাড়তলির সীমানা পেরিয়ে অন্য কোথাও যেতে পারছে না। সে পাহাড়তলিতে বন্দি হয়ে গেছে।
তান্ত্রিকের বোকামিতে এই কাজটা হয়েছে বলে পিশাচ তান্ত্রিককে মারতে যায়। তান্ত্রিক ভয়ে পালিয়ে যায়।
পিশাচ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে।তার রক্তপিপাসা বেরে যায়। সে পাহাড়তলির লোকালয়ে গিয়ে অবশিষ্ট যেই শিশু বৃদ্ধ ছিল,সবার ঘাড় ছিড়ে দেয়। রক্তের বন্যা বয়ে যায় পাহাড়তলিতে।
তারপর পিশাচ আরো মানুষের লোভে যায় পর্তুগীজ ক্যাম্প এবং দুর্গে। পর্তুগীজরা মরতে থাকে। একটা ভয়ানক মূর্তিকে দেখে যখন আগ্নেয়াস্ত্রও কাজ করছে না,তখন পর্তুগীজ সৈন্যরা বাকি বণিকদের নিয়ে পালিয়ে যায়। ক্যাম্পে তাদের অজস্র পাহাড়সম ধনদৌলত রয়ে যায়।
পিশাচ যায় দুর্গের অত্যাচার কক্ষে,যে সমস্ত পর্তুগীজ কারারক্ষী এবং মৃতপ্রায় অত্যাচারিত বন্দিরা ছিল সবাইকে মেরে ফেলে।
দুর্গে বন্দি অত্যাচারিত লোকদের আত্মা পিশাচের সাথে আসা পৈশাচিক শক্তির প্রভাবে প্রেতাত্মা হয়ে যায়। তারা তাদের অভিশাপ রক্ষা করতে যায়। যারাই পর্তুগীজদের ধনসম্পত্তি হাতে পাবে,তাদের ভাগ্যে ভয়ংকর মৃত্যু আসবে।তারা পর্তুগীজ ক্যাম্পে গিয়ে তাদের ফেলে যাওয়া ধনরত্ন পাহাড়া দিতে থাকে।
পিশাচ সেই আগুনে পুড়ে যাওয়া মহিলাদের লাশের কাছে যায়। পৈশাচিক শক্তি দ্বারা সেই পোড়া লাশগুলোকে জাগিয়ে তোলে।এই আশায়,তারা যেন এই পাহাড়তলি থেকে পিশাচকে বের হতে সাহায্য করে।
কিন্তু তারাও পারে না। এক অদৃশ্য বলয় পাহাড়তলি থেকে পিশাচকে বের হতে দেয় না। সেই তান্ত্রিক পাহাড়তলির বাইরে চলে যায়।পিশাচ কটমট করে তাকে দেখে। তান্ত্রিক তার জানা তন্ত্রমন্ত্রের জোরে বলে,,"পাহাড়তলি গ্রামের অধিবাসি,বা এর সাথে সম্পৃক্ত সকল অভিশপ্ত শক্তি যেন মাটি ফুড়ে নিচে চলে যায়,এবং সেখানেই বন্দি থাকে আজীবন,,,"
জীবন্মৃত মহিলাদের লাশ,প্রেতাত্মা,পর্তুগিজ দের অভিশপ্ত ধনদৌলত আস্তে আস্তে মাটি ফুড়ে নিচে নামতে থাকে। পিশাচও মাটি ফুড়ে নিচে নামতে থাকে,,, নামার আগে পিশাচ বলে,,"তুইও তো অভিশপ্ত। "
বলার সাথে সাথে পাহাড়তলির আশেপাশে থাকা পাহাড়ে একটা পাথরধ্বস হয়,পাথরটা তান্ত্রিকের গায়ে পড়ে তাকে থেতলে দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
পিশাচ এর মাথা যখন মাটিতে প্রবেশ করবে এমন সময় সে বলে,,"এক মানুষের লোভের জোরে আমি পৃথিবীতে এসেছিলাম,এই লোভের জোরেই আমি মাটি থেকে বের হব,,,,"
তান্ত্রিকের মন্ত্র কাজে দিয়েছিল। পাহাড়তলি ক্যাম্পের প্রত্যেকটা অভিশপ্ত পর্তুগীজ কয়েকবছর পরে শেরশাহের আক্রমণে হোসেন শাহের হয়ে লড়াইয়ের সময় মরে গিয়েছিল। বাংলায় পর্তুগিজ যুগের শেষ হয়েছিল।
৫০০ বছর পর, ২০১৭ সাল।
১.
ইকবাল হোসেন একজন ইঞ্জিনিয়ার। বয়স ২৭। সদ্য বুয়েট থেকে পাশ করা।দেশে চাকরির সংকট। বিশাল মেধাবীরাই চাকরি পায় না কোটার ঠেলায়।ইকবাল তো মাঝারি মানের ছাত্র ছিল বুয়েটে।যাই হোক,যখন সে চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে,তখনি সে চাকরির একটা অফার পেল। অফারটা এসেছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলিতে অবস্থিত রেলওয়ে মেরামত কারখানা থেকে। এটি বাংলাদেশের একমাত্র এবং সরকারচালিত রেলওয়ে কারখানা। কারখানায় জরুরি একজন ইঞ্জিনিয়ার লাগবে। ইকবাল হোসেন কোনকিছু না ভেবেই সাথে সাথে অফার গ্রহণ করে সে।
নতুন চাকরি পেয়ে সে পাহাড়তলি যাবার আগে বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা করতে যায়।সবাইকে বলে পাহাড়তলির রেলওয়ে কোম্পানি তে তার চাকরি হয়েছে।
বন্ধুরা কথাটা শুনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। ইকবাল জিজ্ঞেস করে,"কি হয়েছে রে?" বন্ধুরা বলে,"ওখান থেকে নাকি গত কয়েকবছর ধরে অফার আসতেছে ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে।কিন্তু কোন ইঞ্জিনিয়ার নাকি মোটা টাকার বিনিময়েও যেতে রাজি হচ্ছে না।এছাড়া সরকারি রেল মেরামত কোম্পানি হলেও বেশ কয়েকবছর ধরে কোম্পানি বন্ধ। শ্রমিকরা নাকি বন্ধ কোম্পানিতে বসে বসে নেশা করে,তাস খেলে আর মেয়েমানুষ নিয়ে আসে।মাস শেষে সরকার প্রদত্ত টাকাটা আসে বেতন হিসেবে।ওদিকে নতুন রেলগাড়ি তৈরি করতে হলে সরকার ডাইরেক্ট কোম্পানিতে নির্দেশ পাঠায় না। বরং বেসরকারি কোন কোম্পানিকে লিস দেয়। তারা রেলগাড়ি অন্য কোন জায়গায় বানিয়ে দেয়। এই জায়গাটা আপাতত পরিত্যক্ত হয়ে আছে। মাঝে মাঝে রেল দুর্ঘটনা হলে সেই রেল যদি মেরামত করতে হয়,তবেই পাহাড়তলিতে পাঠানো হয়। অত্যন্ত প্রত্যন্ত জায়গায় ব্রিটিশ আমলে রেল কোম্পানি তৈরি হয়েছিল বলে যোগাযোগ উন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। জায়গাটা নামেমাত্র বাংলাদেশের রেলশিল্প বলে গণ্য হয়।"
তবে সবচেয়ে বড় কথা হল,পরিত্যক্ত হবার পর নাকি দুইজন ইঞ্জিনিয়ার এখানে চাকরি করতে গিয়েছিল। তারা আর ফেরে নি,তাদের কি হয়েছে কেউ জানে না।
ইকবাল হোসেন এই কথা শুনে বিচলিত হয়।বিবরণ শুনে মনে হচ্ছে জায়গাটা চাকরির জন্য অযোগ্য।তবে কি আর করা,, টাকা তো পাবে।বেকার তো আর থাকতে হবে না। এছাড়া জায়গাটার আশেপাশে নাকি অনেক পুরনো জঙ্গল এবং পাহাড় আছে।অত্যন্ত সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য।ইকবালকে এরকম প্রকৃতি ছোটবেলা থেকেই টানে।
ইকবাল পাহাড়তলিতে চাকরিতে যোগ দেয়।গিয়েই বোঝে ইঞ্জিনিয়াররা কেন এখানে চাকতিতে আসতে রাজি হয় না নেহাত ঠেকায় পড়ে। হবেই বা কেন? জায়গাটা চট্টগ্রাম শহরের দূরবর্তী এক গ্রাম্য এলাকা। গ্রাম বলতেও এমন গ্রাম যেখানে গুটি কয়েক বাড়ি আছে,চিৎকার করে ডাকলে সেটা শুনতে কান খাড়া করে রাখতে হয়। রেলওয়ে কারখানার আশেপাশে শ্রমিকরা ক্যাম্প করে থাকে।ইঞ্জিনিয়ার এবং অফিসারদের কোয়ার্টার আরেকটু দূরে।ফ্যামিলি থাকবার মত অবস্থা না।শ্রমিকরাও সভ্য লোক না।নিরাপত্তা খারাপ।দুই একটা পেটমোটা দারোয়ান পাহাড়া দেয় বিশাল কারখানা এলাকা।
যাই হোক,ইকবাল হাসান সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হয় কারখানার শ্রমিকদের থেকে। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তার কিছু দায়বদ্ধতা থাকে,মাস শেষে কাজের অগ্রগতি হিসেব করে তাকে জবাবদিহি করতে হয়। যেটা শ্রমিকদের করতে হয় না।।ইকবাল তাই প্রথম প্রথম চেষ্টা করে শ্রমিকদেরকে কাজের দায়িত্ব দেবার।কিন্তু গত দুই বছর ধরে বিনা শ্রমে হেসে খেলে বেতন পেয়ে শ্রমিকরা অভ্যস্ত।তারা ইকবালকে ভ্রুক্ষেপও করে না। উলটা চোখ রাঙায়। ওরা সবাই গ্রুপ করে থাকে বলে ইকবালও কিছু বলে না।
ইকবালের আরো অত্যাচার সইতে হয়। শ্রমিকরা একটু অসাবধান হলেই কোয়ার্টারে ঢুকে চুরিচামারি করে।ইকবালের মোবাইলটা আর এ মাসে খাওয়ার টাকাটাও চুরি করে নিয়ে যায়। একেই যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ।ইকবাল অথৈ সাগরে পড়ে।
পরেরদিন যদিও তার শখের মোবাইলটা এক শ্রমিকের নোংরা হাতে দেখে সে। কিন্তু এব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে গেলে শ্রমিকরা গ্রুপ করে তাকে ঘিরে ধরে।ইকবাল সরে পড়ে।
ইকবাল প্রথমে এসেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য ঘুরতে বেরিয়েছিল বিকেলে। বিশাল বড় জায়গা,কোন মানুষ নেই।আশেপাশে পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা।ইকবাল হিসেব করে সর্বমোট ৫ টা বাড়ি আছে এই বিশাল গ্রামে।বাংলাদেশের মত দেশে এরকম জায়গা থাকতে পারে এটা ছিল তার স্বপ্নের বাইরে।
যাই হোক,৫ টা বাড়ির পরিবারের সাথে ইকবাল খাতির জমিয়েছিল প্রথমদিকে। আজ ক্ষুধার তাড়নায় সেই বাড়িতে গেল সে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়ে এখন খাবারের জন্য মানুষ এর বাড়ি যেতে হচ্ছে এটা মনে করেই চোখ ফেটে পানি এল তার। কিন্তু মাত্র তো ২ সপ্তাহ গেল। চাকরি ছাড়া যাবে না। বেকার জীবন অনেক কষ্ট,পরিবারের সদস্যদের খোটা শুনতে হয় দিনরাত।
৫ টা গ্রাম্য পরিবার কিন্তু ইকবালকে পেয়ে খুশিই হল। ইকবাল যেন দেশের রাজা। এক বাড়ি থেকে আরেকবাড়ি অনেক দূর হলেও ৫ টা পরিবারকেই খবর দেওয়া হল। তারা সবাই ইকবালকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বাড়িটায় এল। সবাই ইকবালের জন্য পুকুরের বড় মাছ,পোষা মুরগির ব্যবস্থা করল। ইকবাল খুবই ইতস্তত করে তার অসহায় অবস্থার কথা বলল। ৫ পরিবার তাকে বলল,এই মাসে বেতন পাবার আগ পর্যন্ত সে পালা করে ৫ পরিবারেই খেতে পারবে,থাকতে পারবে।
ইকবাল তাই ওখানেই থাকা শুরু করল। দিনে ছোট বাচ্চাদের সাথে খেলল। রাতে বড়দের সাথে গল্প করল। এখন ইকবাল চাচ্ছিল,রাতে এখানেই থাকবে ওই দুঃসহ কোয়ার্টারে ফিরবে না। তাই প্রয়োজনীয় জিনিস আনতে গ্রামের একটা ছেলেকে নিয়ে সে রাতের আধারে রওনা দিল।
ইকবাল শ্রমিকদের বস্তির কাছে আসার সময়,নারীকন্ঠের গোঙানি আর কান্না শুনতে পেল। সে থমকে দাড়াল। সে শুনেছে,বাইর থেকে পতিতাপল্লীর মেয়েদের রাতে শ্রমিকরা নিয়ে আসে। কিন্তু এখানে তো কান্না শোনা যাচ্ছে। আর যন্ত্রণার চিৎকার।
মহিলাটি যন্ত্রণায় কিছু কথা বলল, কথা শুনে ইকবাল বুঝল,যেই মেয়েটি ভিতরে আছে,সে শহরের উচ্চশিক্ষিত মেয়ে,ভদ্রঘরের। এবং ভিতরে তাকে ধর্ষণ হচ্ছে। এখন ক্যাম্পের বাইরে গুফো ভূড়িওয়ালা দারোয়ান ইকবালের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল।ইকবাল আর না দাঁড়িয়ে ওর জিনিস নিয়ে ফিরে চলল।
গ্রামে এসে এই ঘটনা শেয়ার করল সে পরিবারগুলোর কাছে। পরিবারের লোকেরা দুঃখ নিয়ে বলল,ইকবালের আগের যে ইঞ্জিনিয়ার এখানে এসেছিল,সে নতুন বিয়ে করেছিল। যোগাযোগ খারাপ বলে ভেবেছিল বউকে নিয়ে কোয়ার্টারে উঠবে। শ্রমিকরা সুন্দরি বউ দেখে,২ দিনের মাথায় ইঞ্জিনিয়ারকে জবাই দিয়ে জঙ্গলে ফেলে দেয়। সে বউ সেই থেকে প্রায় দুইমাস ওই ক্যাম্পে পড়ে আছে।
কাহিনী শুনে ইকবালের মাথায় আগুন ধরে যায়। কিন্তু কি করবে সে? টিপিকাল বাংলাদেশি মানুষ। অন্যায় শুনলে গা গরম হয়,রক্ত মাথায় ওঠে। তারপর ঠুস। আবার অন্য ইস্যুতে মন চলে যাবে।
এছাড়া কবি বলেছেম,"শ্রমিকরা দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শ্রমিকদের উপর অত্যাচার করা মানায় না। ওদের হাতেই দেশ গড়ে।"
এখম এই শ্রমিকদেরও তো খায়েশ আছে,না কি? খায়েশ মিটাতে তারা এতকাল মায়ের আদরে ভরপেট খাওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার কেই নাহয় জবাই দিল,তার সুন্দরি বউকে নাহয় প্রতিরাত উপর্যুপরি ধর্ষণ করলই। এতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হল? এ শ্রমিকদের অধিকার। এর বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে,কবি বলেছিলেন,"তারা অত্যাচারী,অত্যাচারীদের কালো হাত গুড়িয়ে দাও।"
ইকবাল তাই আর শোষক হতে চাইল না। কঠোর পরিশ্রমী দেশের কারিগর শ্রমিকদের নৈশ আমোদে বাধা দিতে চাইল না। অধর্ম হবে। ফাঁসি হবে এতে।
ইকবালকে গ্রামের ৫ পরিবার আপন করে নিয়েছে তা আগেই বলেছি। ইকবালকে ঘিরে প্রতিরাতে বাড়ির উঠানে গ্রামের লোকদের গল্পের আসর জমে। এভাবে একদিন হঠাৎ ইকবাল এক পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলোয় এক মুরুব্বির কাছ থেকে পাহাড়তলির সেই ইতিহাস শুনল।
পাহাড়তলির ইতিহাস কমবেশি নেট ঘাটলেই পাওয়া যায়। তবে ইকবাল যা শুনল,তা যদি সভ্য জগতে কেউ বলে,তাকে পাবনায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
পিশাচ,পোড়া মহিলাদের জীবন্ত লাশ,অভিশপ্ত গুপ্তধন, তার পাহারায় থাকা প্রেতাত্মা,,, ঠিক যেন এক মহাকাব্যিক ভূতের এডভেঞ্চার গল্পের প্লট। গ্রামের সেই নির্জন নিস্তব্ধ পরিবেশে ইকবাল শিউরে উঠল।
ইকবালের ভক্ত হয়ে গিয়েছিল গ্রামের এক কিশোর। তার নাম জামাল।জামাল ইকবালকে গ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাত। মাঝে মাঝে তারা পাহাড়ে উঠত,ধনেশ পাখি দেখতে। ইকবাল তো আর কাজের জায়গায়ই যায় না। সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখানে সে থাকবে এই পরিবারের কাছে। সরকার যদি তাকে এখানে সাগরে ফেলেই দেয়,সেও দেখে নেবে। বানানো রিপোর্ট পাঠাবে মাসশেষে।বিনা কাজে বেতন নেবে।আর তা দিয়ে এই পরিবারগুলোর সাথেই ভালভাবে সময় কাটাবে। নিজের বাসায় ঘনঘন যাবে না।এতদিন বেকার বলে ঘর থেকে যারা তাকে বাইরে দেখতেই ভালবাসত। থাকুক না তারা তাদের মতই। তাদের ইচ্ছাই পূরণ হোক।
ইকবাল জামালকে বলে গ্রাম্য ভূতের লিজেন্ডে যেসমস্ত জায়গার কথা বলা হয়েছে,সেগুলো তাকে দেখাতে পারবে কিনা। জামাল বলে পারবে,, সে ইকবালকে সেই তান্ত্রিকের শ্মশানঘাট এ নিয়ে যায়। এখন সেটা ফসলি জমি। পর্তুগীজ এর ক্যাম্পে এখন শ্রমিকরা থাকে,পাশ নিয়ে রেললাইন চলে গেছে। রেললাইনে আছে কিছু পরিত্যক্ত বগী।
পুরনো সুলতানপুরের সমৃদ্ধশালী ঘরবাড়ির জায়গায় এখন গাছপালা। সেই মহিলারা যেখামে গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহনন করেছিল,সেটা এখন এক মজা পুকুর।
পর্তুগীজ দের টর্চার টাওয়ার এখন এক ধ্বংসস্তূপ।
ইকবাল সবজায়গা চিনে যায়। হঠাৎ করে তার একদিন মনে হয় আচ্ছা সেই পর্তুগীজরা তো খুব দ্রুত ক্যাম্প ছেড়ে চলে গিয়েছিল। গ্রাম্য ভুতুড়ে কাহিনী বাদ দিলেও যদি আমি নরমাল ইতিহাস ঘাটি,তাহলেও তো পাওয়া যায়,তারা পালানোর সময় কোন ধনরত্ন নেয় নি। তাদের অসৎপথের উপার্জনের কথা সবাই জানে। তাদের ধনসম্পত্তি নিয়ে সারাবিশ্বে অনেক গল্প প্রচলিত। কিন্তু পাহাড়তলির সেই ধনরত্ন কোথায়,শেরশাহ পর্তুগীজদের আক্রমণ করে চট্টগ্রাম থেকে তাড়ায় বটে। কিন্তু বিশাল ধনসম্পদ নেয়। এরকম তো কোন কথা শোনা যায় না?
তবে কি এই আদি দুর্গম পাহাড়তলির নিচে এখনো লুকিয়ে আছে সেই সোনাদানা?
ভাবতে ভাবতে ইকবাল দাঁড়িয়ে থাকে সেই পুকুরপাড়। যেখানে ৫০০ বছর আগে পুকুর ছিল না। এক গ্রাম মহিলার বীভৎস আত্মহত্যা হয়েছিল এখানে।
চাদের আলোয় ইকবাল এক অপার্থিব দৃশ্য দেখে। এক ফর্সা সুন্দরি, সম্পূর্ণ নগ্ন মহিলা খোড়াতে খোড়াতে পুকুরপাড়ে আসে। তার ফর্সা গায়ে গত দুইমাসে দেশগড়ার কারিগর শ্রমিকদের নখ ও দাতের আঘাত চাদের আলো প্রস্ফূটিত।
মহিলার হাতে একটা কন্টেইনার। মহিলা সেই কন্টেইনার থেকে কি একটা তরল নিজের সারা গায়ে ঢালল। ইকবালকে মোহগ্রস্ত অবস্থা রেখে কন্টেইনারের উপরে রাখা একটা ম্যাচবক্সের কাঠি জ্বালিয়ে দিল।
আকাশ বাতাস মহিলার প্রচন্ড যন্ত্রণাময় চিৎকারে কেপে উঠল।ইকবালের চিৎকার যেন গলায় আটকে রইল। সে কাঠ হয়ে দাড়াল। মহিলার গায়ে জ্বলা আগুনের আলোয় স্পষ্ট যেত সে দেখতে পেল,এক গ্রাম মহিলা,শিশু থেকে বুড়ো সব বয়সের,,,নিজেদের জ্বলন্ত শরীরে মৃত্যুযন্ত্রণায় ভয়ংকর নৃত্য করছে। আকাশে বাতাসে এই মহিলার চিৎকারের সাথে অমানুষিক আরো কিছু চিৎকার জুড়ে গেল যেন।
ইকবাল ভয়ংকর চিৎকার করে দৌড় দিল। দৌড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল গ্রামে এসে। লোকেরা তাকে ঘরে নিয়ে গেল।
পরেরদিন ইঞ্জিনিয়ার এর নববধূর পোড়া বিকৃত লাশ পাওয়া গেল পুকুর পাড়ে। গ্রামের লোকে যেখানে তার জবাই দেওয়া স্বামীর লাশ দাফন করেছিল,তার পাশেই দাফন করল মহিলার দেহ।
ইকবালের স্বাভাবিক হতে কয়েকদিন লাগল।যখন সে স্বাভাবিক হল।তার বেতন এসে গেছে। সে অফিসে গেল। আশেপাশে দাঁড়ানো শ্রমিকদের দেখেই তার রক্ত গরম হয়ে গেল। নিশ্চয়ই তার রক্তে শোষকের রক্ত মিশে আছে। নইলে শ্রমিকদের দেখলে তাদের গলা টিপে ধরতে হাত নিশপিশ কেন করবে?
ইকবাল তার বেতন নেবার সময় দেখল,কোম্পানি আনওফিশিয়াল বন্ধ হবার পর ইকবালের আগে একজন না দুইজন ইঞ্জিনিয়ার এসেছিল।একজনের ভাগ্য তো সে জানে।তার আগেরজনের কি হয়েছিল?
ইকবাল গ্রামে এসে জিজ্ঞেস করে সবাইকে। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। অবশেষে বলে,সেই ইঞ্জিনিয়ার নাকি গ্রাম্য ভুতুড়ে কাহিনী শুনে বারবার জিজ্ঞেস করত,ধনসম্পত্তি কেউ কি পেয়েছিল? তারপর সেই ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ঘুরে বেড়াত। আর একটা খাতায় কি জানি লিখত।
হঠাৎ একদিন সে খুবই উত্তেজিত অবস্থায় কাজ ছেড়ে পাহাড়ের দিক যায়। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে,"সব উত্তর ওই টর্চার টাওয়ারে"
কিন্তু সেই ইঞ্জিনিয়ার কে আর দেখা যায় না। তার কি হয়েছে,কোথায় আছে,,,কেউ জানে না।
ইকবাল কথাটা শোনে,কিছু বলে না। তার মানে তার কথাই ঠিক।গুপ্তধন আছে,এবং আগের ইঞ্জিনিয়ার সেটা জানত।
ইকবাল টর্চার টাওয়ারের ধ্বংসস্তূপের কাছে যায়,,,কি উত্তর আছে এখানে?
টর্চার টাওয়ারের ভিতরে যায় সে।জায়গাটায় কেমন জানি মৃত্যু মৃত্যু গন্ধ।অত্যাচারের গন্ধ।হাহাকারের গন্ধ।মধ্যযুগীয় ভয়ংকর কিছু টর্চার করার যন্ত্র দেখল সে। কয়েকটা তখনো কাজ করে। এর ভিতরে কোন মানুষকে রাখলে তার কি অবস্থা হত,ভেবে শিউরে উঠে সে।
নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠে সে। দোতলায় চারপাশ ফাকা,,,আলো বাতাস আছে। দেখার কিছু নেই। তখন তার মনে হল,কারাগার তো থাকবে মাটির নিচে,দোতলায় না। সে একটা টর্চ হাতে খুজতে লাগল,মাটির নিচের ঘর।ট্রাপডোর পেয়ে গেল
মাটির নিচে কারাগার এবং শিকল দেখল সে।সে দেয়ালে টর্চ মারতে লাগল,,, এক জায়গায় লেখা দেখল,, নখের আচড়ে বহু পুরনো বাংলা লেখা,,,, "পানি খাব"
ইকবাল শিউরে উঠল।নিরাপরাধ বাংলাদেশিদের পর্তুগিজ রা পানি পর্যন্ত দিত না।
আরেকটা দেয়ালে দেখল,,, "পানি চাইলে পেচ্ছাব দেয়।"
আবার দেখল,,,"পাশের ঘরের আব্দুর রহমানের পুরুষাঙ্গ কেটে দিয়েছে,ওর ক্রেতার শক্তসমর্থ ক্রীতদাস চাই,কিন্তু সুন্দরি বউয়ের যেন স্বাস্থ্যবান দাসের উপর নজর না পড়ে,,,,"
আবার দেয়ালে লেখা,,,,"অভিশাপ পর্তুগীজদের,,, যেই টঙ্কার জন্য তোরা আমাদের সাথে এমন করলি,সেই টঙ্কা কেউ ভোগ করবে না,আমরা পাহাড়া দেব,,,,"
তারপর দেয়ালে লেখা,,"অভিশাপ,,,,অভিশাপ,,,,,অভিশাপ,,,,,,"
এবার আরো ভিতরে গা শিউরানো কিছু জিনিস দেখল ইকবাল,,, পর্তুগিজ সেনাদের মধ্যযুগীয় পোশাক সে নেটে দেখেছে। সেরকম পোষাক পড়া কিছু কংকাল পড়ে রয়েছে। প্রত্যেকটার ঘাড় অদ্ভুত এংগেলে পড়ে আছে।
গ্রামের লোকেরা বলেছিল,,পিশাচ নাকি রক্তপিপাসায় মত্ত হয়ে এই দুর্গে আসে। কি পর্তুগীজ, কি বেঁচে থাকা নির্যাতিত বন্দি। কাউকেই ছাড়ে নি।
অন্ধকার কোণায় চোখের সামনে টর্চের আলোয়,বাকাতাড়া অলৌকিক নারকীয় কিছু অক্ষর ফুটে ওঠে, "গুপ্তধন পেতে চাইলে আমার পিছে আয়,,,,"
ভয়ে ইকবালের টর্চ হাত থেকে পড়ে যায়। সে তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে দেখে কাল একটা ছাড়া ভগ্ন দেয়ালের সাথে সাথে তার সাথে দৌড়াচ্ছে।
ইকবাল চেচিয়ে দুর্গ থেকে বের হয়। সবুজ ঘাসের উপরের কাল ছায়া দিনের আলোয় ইকবাল এর সামনে দিয়ে চলে যায়।কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। যেন ইকবালের জন্য অপেক্ষা করছে।
ভয়ের মাথা খেয়ে কৌতূহল জেতে।ইকবাল কাল ছায়াটার পিছু নেয়। পাহাড় জঙলের বর্ডারে একটা বিশাল পাথরের কাছে এসে কাল ছায়া অদৃশ্য হয়ে যায়। পাথরটা দেখেই ইকবালের মাথায় আসে। এর নিচেই কি সেই অভিশপ্ত তান্ত্রিকের লাশ?
কাল ছায়া যেখানে অদৃশ্য হয়েছিল সেখানে ইকবাল এক মানব কঙ্কাল এর আংগুল পায়,তাতে একটা আংটি।ভয়ে ভয়ে সে সেটা হাত্র নেয়। আংটির উপরে লেখা,, "শ্মশানে আমার আসনের ৫ শত গজ উত্তরেই রইয়াছে ফিরিঙ্গিদের ঘাটি।"
ইকবাল বুঝে,এটা তান্ত্রিকের আংটি। ইকবাল এও বুঝে শ্রমিকদের ক্যাম্প পর্তুগীজ দের ক্যাম্প ছিল না। জামাল ভুল জানে।
ইকবাল তান্ত্রিকের আসন খুজে বের করে। এককালের শ্মশান, আজ ফসলি জমি। কিন্তু এক জায়গায় ফসল ফলে না। বুঝল ইকবাল,এটাই অভিশপ্ত আসন। সে ৫০০ হাত উত্তরে যায়। কিছু ৫০০ হাত উত্তর দিক হল তান্ত্রিকের আসনের পিছে। তান্ত্রিক ধ্যানে বসলে এটা জানবে না। তারমানে উত্তর বলতে বাম বুঝানো হয়েছে। ইকবাল ৫০০ হাত বামে যায়। গ্রামের মাঝে অজানা কারণে এই জায়গাটায় প্রচুর গাছ এবং ঝোপ। ইকবাল ভিতরে যায়।
একটু পরে দেখতে পায় একটা কোদাল,একটা ছোট গড়ত,আর একটা আধুনিক ড্রেস পড়া সদ্য কংকাল। ইকবাল বুঝে যায় এটা সেই ইঞ্জিনিয়ার। ইকবাল কাছে যায়।কংকালের শরীরের নিচে একটা নোটবুক আরেকটা কাগজ। কাগজ দেখেই বোঝা যায় এটা একটা ম্যাপ।
ইকবাল ওই জিনিস দুটা নিয়ে চলে আসে।গ্রামে ফিরলে সে দেখে গ্রামের সব লোক দাঁড়িয়ে ইকবালের দিক কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ইকবাল হতভম্ব হয়ে যায়। এতদিনের পরিচিত গ্রামের লোকেরা ইকবালকে তাড়িয়ে দেয়। তারা দেখেছে সে অভিশপ্ত দুর্গে ঢুকেছে। সে জানত না গ্রামের লোকেরা বলে,ওটা অভিশপ্ত। ওখানে কেউ গেলে সে বাইরের লোকের জন্য অভিশাপ নিয়ে আসে।
ইকবাল বাধ্য হয়ে নিজের কোয়ার্টারে ফিরে আসে।এবং নোটবুক পড়তে থাকে। নোটবুকের প্রথম পেইজে সেই গ্রাম্য লিজেন্ডের কথা লেখা,যা সবাই জানে। তারপর লেখা ইঞ্জিনিয়ারের সারাজীবনের কষ্টের কথা,দেনার কথা,ব্যার্থতার কথা,টাকার অভাবে তার কি কি কষ্ট হয়েছে তার বর্ণনা। প্রেমিকা ছেড়ে গেছে সেই কথা। তারপর লেখা পর্তুগিজ দের গুপ্তধনের কথা। আর এই গুপ্তধন পাবার জন্য ইঞ্জিনিয়ার কি কি করেছে তার বর্ণনা।
অনেক কষ্টে সে খোজ খবর নিয়ে গবেষণা করে বের করে।পর্তুগীজ দের ঘাটি কোথায় ছিল সেটা হয়ত দুর্গে কোন হিন্ট দেওয়া থাকবে। ইঞ্জিনিয়ার তখন দুর্গে ঢোকে। তারপর ইকবালের মত একটা কাল ছায়া এসে ওকে দেখিয়ে দেয় ঘাটি কোথায় ছিল।এবং লিজেন্ড সত্যি হলে কোথায় থাকবে সেই গুপ্তধন। ওই ছায়াটা ইঞ্জিনিয়ারকে এটাও বলে যে গুপ্তধন সরাতে দেখলেই দুর্গের নির্যাতিতদের প্রেতাত্মা মেরে ফেলবে ওকে। তাই ছায়াটা কিভাবে যেন ইঞ্জিনিয়ারকে একটা সুতা দেয়। বলে,এই সুতা হাতে রাখলে প্রেতাত্মারা আসতে পারবে না।
এতটুকুই নোটবুকে লেখা। বাকি পেইজ উল্টাল ইকবাল। একদম শেষ পেইজে শুকিয়ে যাওয়া রক্তে লেখা আকাবাকা কিছু কথা লেখা। ইঞ্জিনিয়ার লিখছে,,,"ওই কাল ছায়াটা পিশাচ বজ্রের। বজ্র আটকে আছে পাহাড়তলির মাটির নিচে। গুপ্তধন উঠালেই তার সাথে বের হতে পারবে সে। কিন্তু অভিশাপের কারণে প্রেতাত্মারা গুপ্তধন স্পর্শ করলেই মেরে ফেলবে। তাই পিশাচ সুতাটা বাধতে বলেছে। কিন্তু মাটি খুড়তেই আমার মনে পড়ে গ্রাম্য লিজেন্ডের সেই তান্ত্রিমের কথা,মানুষের লোভই নাকি ফিরাবে পিশাচকে। আমি তাই সুতাটা খুলে ফেললাম। পিশাচ ফিরলে পাহাড়তলি আবার মৃত্যুপুরী হয়ে যাবে। এর চেয়ে প্রেতাত্মারা আমাকে মারুক। এটা আমার লোভের শাস্তি। "
এরপর লেখা "লোভ "ক্রস চিহ্ন""
ইকবাল পড়ল পুরোটা। আজব জিনিস। গুপ্তধন উঠালে প্রেতাত্মা মারবে,প্রোটেকশন নিয়ে ওঠালে পিশাচ এসে মারবে। শুধু তাই নয়,লিজেন্ড অনুযায়ী পিশাচ যেদিকে যায়,মৃত লাশ জীবিত হয়ে পিশাচের অনুগত থাকে। দরকার নাই ভাই। ইকবাল সিদ্ধান্ত নেয়। এই ভুতুড়ে এবং শত্রুসংকুল পরিবেশে সে থাকবে না। শ্রমিকদের হাত থেকে বাচানোর মত গ্রামের লোকদের সাহায্যও আর পাবে না সে।
ইকবাল ঘুমিয়ে পড়ে। ভাবে এটাই পাহাড়তলিতে শেষ ঘুম তার। কালই বাড়ি ফিরবে।
এদিকে ইকবাল বেতন পেয়েছে।বেশ মোটা টাকা। রাতে শ্রমিকরা দা নিয়ে ঘরে ঢোকে। ইকবালকে জবাই দিয়ে টাকাটা নিতে। হঠাৎ শ্রমিকদের সর্দার টেবিলে রাখা নোটবুক আর ম্যাপ দেখে। নোটবুকে আগের আগের ইঞ্জিনিয়ার এর নাম লেখা। সাথে একটা ম্যাপ। সে শুনেছিল,সেই ইঞ্জিনিয়ার পর্তুগিজ দের গুপ্তধন এর পিছু পড়ছে। সেই দুইয়ে দুইয়ে চার মিকিয়ে বুঝে যায় এটা গুপ্তধনের নক্সা। শ্রমিকরা ইকবালকে কিছু না বলে বের হয়ে আসে। কোদাল নিয়ে ম্যাপ ধরে এগোয় গুপ্তধন এর জায়গায়। ইঞ্জিনিয়ার কাল ছায়ার ডিরেকশন ধরে ম্যাপ বানিয়েছিল। ইকবালের মত তাই শ্রমিকদের যেতে হল না দুর্গে।
শ্রমিক ক্যাম্পের প্রত্যেকটা শ্রমিক গেল গুপ্তধনের জায়গায়।সরিয়ে ফেলল কংকাল ইঞ্জিনিয়ারের। সর্দার নোটবুকের নির্দেশ অনুযায়ী সুতা খুজে বার করে পড়ল। মাটিতে কোপ দিল। শ্রমিকদের হাতের মশাল কেপে উঠল। কাল কাল কি সব বিদঘুটে জিনিস চিৎকার করে মশালের আলো নিভিয়ে আকাশে উড়ে গেল।শ্রমিকরা প্রেতাত্মাদের দেখে আতকে উঠল।
বহুদিনের পুরনো পর্তুগিজ গুপ্তধনের বাক্সগুলোর খোজ পেল শ্রমিকরা। একটা একটা করে সব বাক্স বের করতেই। সারা পাহাড়তলিতে যেন ভূমিকম্প হল। সমান মাটি এবড়োখেবড়ো, উচুনিচু হয়ে গেল। কিছু মাটি হঠাৎ অনেক জায়গা নিয়ে উঠে গেল। পাশে ফাটল তৈরি হল।
পুরো পাহাড়তলি যেন একটা মেইজে পরিণত হল। কম্পিউটার গেইম। যেখানে ঢুকার জায়গা আছে। কিন্তু বের হবার পথটি খুজে নিতে অনেক বাধা। বারবার পথ খুজতে গিয়ে আপাতদৃষ্টে খোলা পথ সামনে এক বাধার মুখে পড়ে।
১৫ ফুট লম্বা বিশাল পিশাচটা মাটির নিচ থেকে উঠল। সেটার ভয়ংকর গর্জনে শ্রমিকদের প্যান্ট ভিজে গেল।
দেশ ও সমাজ গড়ার কারিগরদের উপর পিশাচ ঝাপিয়ে পড়ল। সেই প্রেতাত্মারা ফিরে আসল।সবাই একসাথে শ্রমিকদের হাত পা ছিড়তে লাগল।
পাহাড়তলিতে যত মৃত্যু হয়েছে গত ৫০০ বছরে। ( সংখ্যায় কমই বলা চলে,কারণ এই জায়গাটা দীর্ঘদিন মৃত্যুপুরী হিসেবে ছিল,ব্রিটিশ আমলে লোক আসা শুরু হয়,তাও এই গ্রামে তারা কম মরেছে। বাইরের হাসপাতালে মরেছে।), সেগুলো, এমনকি সেই পর্তুগিজ দের আমলে গায়ে আগুন দেয়া মহিলারা থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারের নববধূ সবাই উঠল কবর থেকে। মাথাহীন ইঞ্জিনিয়ার এবং কংকাল ইঞ্জিনিয়ার দুজনও উঠল। ইঞ্জিনিয়ারের নববধূ ঘোর আক্রোশে শ্রমিকদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটেই সেই জায়গায় শ্রমিকদের শরীরের টুকরা পড়ে রইল।
পিশাচ এরপর গেল সেই গ্রামে। পিশাচের নারীদের প্রতি আলাদা টান ছিল। গ্রামের পরিবারের মহিলাগুলোকে সে সবার আগে মারল। পুরুষগুলোকে অজানা কারণে ছেড়ে দিয়ে,সে পাহাড়তলি থেকে বের হবার পথে গেল এই আশায় যে সে এবার বেরোতে পারবে। কিন্তু পারল না। সে আটকে রইল। এবং প্রচণ্ড চিৎকার করল।
চিৎকারে ইকবালের ঘুম ভেঙে গেল। চাদের আলোয় জানালা দিয়ে সে উকি মারল। ভয়াবহ দৃশ্য। সারা পাহাড়তলি একটা মেইজে পরিণত হয়েছে। বাংলায় এটাকে ধাঁধাও বলা যায়।
কোয়ার্টারের ছাদে উঠল ইকবাল। এখান থেকে পালাবার পথ খুজল। সাহায্য করবার মত কেউ নেই। টেবিলে নোটবুক আর ম্যাপ নেই দেখেই সে বুঝে গেছে কি হয়েছে।
সে দেখল, কোয়ার্টার একদম গ্রামের এক প্রান্তে,পিছে জংগল। সামনের রেল কারখানার আর চিহ্ন নেই। পড়ে রয়েছে ধ্বংসস্তূপ। রেললাইনগুলো উচুনিচু মাটির দেয়ালে কোনোরকম লটকে আছে।
আতংকের সাথে ইকবাল দেখল,কোয়ার্টারের কাছে বের হবার রাস্তা জুড়ে,পড়া বীভৎস কিছু লাশ। সব দাঁড়িয়ে আছে।
এর পর একটু জায়গা ফাকা,সেখানে আকাশে বাতাসে কাল কাল কি যেন উড়ছে।হ্যারি পটারের ডিমেন্টরের মত। এরপর অনেক জায়গা ফাকা। তারপর দাঁড়ানো ১৫ ফুট উচু একটা পিশাচ। এর পর পাহাড়তলি থেকে বেরোবার রাস্তা। এছাড়া আর রাস্তা নেই।
ইকবাল একটা কাগজে পুরো মেইজটা আকল্ম তারপর সে সলভ করল। কোথা থেকে ঢুকে,কোথায় কোন পথ দিয়ে বেরোতে হবে। পথে পড়বে জীবন্ত লাশ,প্রেতাত্মা আর পিশাচ।
ইকবাল নিচে নেমে একটা মশাল নিল। লাশগুলো সব আগুনে পোড়া।সে আশা করল আগুনকে এখনো ভয় পাবে। বাড়তি সতর্কতা হিসেবে একটা দা নিল। নোটবুক পড়ে প্রেতাত্মা দের বিরুদ্ধে প্রোটেক্টিভ সুতা তৈরির নিয়ম সে জেনেছিল। এভাবে সে কয়েকটা বানাল। কিছু হাতে,কিছু পায়ে আর কিছু গলায় পড়ল।তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে সে বের হয়ে গেল।
হাতে মশাল আর দা। পকেটে সলভ করা মেইজের পথ। ইকবাল সে পথ ধরল। পথে ওকে মারতে অসংখ্য জীবিত লাশ আসল। কিন্তু মশাল ধরতেই সরে গেল। একটা বাতাস এসে মশাল নিভিয়ে দিতে গেল। বিপদ বুঝে ইকবাল আশেপাশের মাটিতে আগুন লাগিয়ে দিল। পাহাড়তলিরর মাটিতে সালফার আছে সেটা সে জানত। মেইজগুলোর দেয়ালে যতদূর সালফারের অস্তিত্ব আছে,আগুন জ্বলে গেল। লাশ গুলো সরে গেল। নিভে যাওয়া মশাল সেই আগুনে জ্বালাল ইকবাল।
এরপরে যে রাস্তায় সে ঢুকল তার উপরে প্রেতাত্মারা ঘুরছে। আকাশে বাতাসে শীতলতা। কিন্তু প্রেতাত্মারা ওর কাছে এল না। বরং শ্রমিকদের তোলা ধনরত্ন ফেলতে লাগল পথে।
নোটবুকে ইকবাল পড়েছে,ধনরত্নের বাক্স ধরলে কিছু না হলেও ভিতরের জিনিস স্পর্শ করলে সুতা আর কাজ করবে না। কিন্তু সেই ধনরত্ন প্রেতাত্মারা সারা পথে ছড়িয়ে রেখে দিল। ইকবাল বুঝল একটায় পাড়া দিলে শেষ। ওদিকে রত্নের মালা ঝুলিয়ে রাখল ওরা মাথার কাছে। ইকবাল আশ্চর্যভাবে শরীর বাকিয়ে ওগুলো এড়িয়ে ওই পথ অতিক্রম করল।
ইকবালের জানামতে পিশাচের আগ পর্যন্ত রাস্তা ফাকা। কিন্তু ওকে আশ্চর্য করে গ্রামের প্রত্যেকটা পুরুষ ওর পথরোধ করল। ইকবাল শুনেছে,পিশাচের লোক বশ করার ক্ষমতা আছে। এই গ্রাম থেকে বেরোনোর রাস্তা করে দিতে হয়ত সে লোকগুলোকে বশ করেছে।
এতদিনের আপন গ্রাম্য লোকগুলো ভয়াবহ চেহারা করে ইকবালকে মারতে আসল। ইকবাল প্রস্তুত ছিল না। সে পথ থেকে সরে গেল। তাড়া খেয়ে কোথায় যে আসল। সলভ করা মেইজেও এর সমাধান পেল না।
এদিকে পিশাচের ডাকে লাশ,মানুষ আর প্রেতাত্মারা একদম পাহাড়তলির গেইটের কাছে এসে দাড়াল।
পথ হারিয়ে ইকবাল পড়ে গেল একদম পিশাচের সামনে। পিশাচ ইকবালকে মারতে এল। ইকবাল কোন রকম এড়াল। মশাল নাড়িয়ে ওটাকে দূরে থাকতে বাধ্য করল। তারপর দৌড় দিল। পিশাচ পিছু নিল। ইকবাল খেয়াল করল,পিশাচ ইকবালকে একটা নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যাচ্ছে তাড়া করে। প্রথমে ও ভাবল,আবার পিছনে কিনা। পরে দেখল পিছনে হলে তো সালফারের আগুন দেখত।
অবশেষে তাড়া করে ইকবালকে পিশাচ পথ দেখিয়ে পাহাড়তলির গেইটের কাছে নিয়ে এল। গেইটের কাছে ইকবাল দেখল সেই লাশ গুলো,প্রেতাত্মা আর বশ করা মানুষ দাঁড়ানো,,আর ইকবালের পিছে পিশাচ। পিশাচ এগোতে লাগল। সামনে অন্যরা এগোতে লাগল। ইকবালকে ঘিরে ধরল সবাই।
সবার সামনে ছিল জামাল। কিন্তু ওর চোখে আগের সেই ভক্তি নেই। তীব্র ক্ষুধা রয়েছে যেন।ইকবাল কেদে দিল।
বুঝল কি করতে হবে। সে জামালকে বলল,"আমি খুবই দুঃখিত। "
এই বলে সে জামালের ঘাড়ে দা দিয়ে কোপ দিল,রক্ত ফিনকি দিয়ে ছুটল।মাথা আলাদা হয়ে গেল।
পিশাচ আর লাশগুলো তাজা রক্তের গন্ধে মনযোগ হারাল ইকবালের উপর। জামালে তড়পানো দেহের উপর ঝাপিয়ে পড়ল।
এই সুযোগে ইকবাল দৌড় দিল। এমন দৌড়,যা জীবনে সে দেয় নি। টের পেল,পিছনে প্রেতাত্মাগুলো ধেয়ে আসছে,,সেগুলোর শো শো শব্দ।
ইকবাল এক লাফে পাহাড়তলির গন্ডি পার হল। পিছে ফিরে দেখল,এক অদৃশ্য দেয়াল যেন আটকে রেখেছে পিশাচকে,এভাবে মাত্র ২ হাত দূরে ১৫ ফুট লম্বা পিশাচটা ক্ষুধার্তভাবে তাকে দেখছে।
পাহাড়তলির ভুতুড়ে পাহাড়তলিতে রয়ে গেল। একটা ভয়াবহ কিংবদন্তি হিসেবে। কেউ বিশ্বাস না করলে গিয়ে দেখতে পারেন।
(সমাপ্ত)
{[গল্পটি প্রথম প্রকাশিত www.awakeningbd.com ওয়েবসাইটে]}
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now