বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজকে প্রিয়ন্তীর গায়ে হলুদ। সে নিজেই পরশু আমাকে তার বিয়ের কার্ড দিয়ে এসেছিলো আর বলেছিলো, খবরদার! আমার বিয়ে অবধি আমার বাড়ির আশেপাশে যেনো তোমায় না দেখি। এটা বলেই হনহন করে চলে গিয়েছিলো, আমি টায় দাড়িয়ে ছিলাম।
প্রিয়ন্তী মাঝে মাঝে আমাকে বলতো, রবিন আমায় আগলে রাখতে পারবা'তো? আমি বলতাম আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমার ভালোবাসা সত্যি হলে আমি তোমাকে পাবো। এই একটা ডায়লগ'ই ছোটবেলায় সিনেমা দেখে শিখেছিলাম। প্রিয়ন্তী বলতো জীবনটা বাংলা সিনেমা না রবিন। আর এত লেজি কেনো তুমি? আমরা বিয়ে করবো কবে? এই কথাটা কত্তবার প্রিয়ন্তী আমাকে শুনালো, উফফ! আমার মেজাজ খারাপ করে দিতো। আমার দুটো বোন এখনো বিয়ের বাকি, বাবা অসুস্থ। সবাই হ্যাঁ করে স্বপ্ন দেখছে আমি কিছু একটা করবো, সব অভাব ধুর করবো। কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছে না। এসব ভেবেই আমি ক্লান্ত তারউপর বিয়ে? অসম্ভব। এখন বলতে পারেন তো প্রেম করলাম কেন? হ্যাঁ, আইয়ুব বাচ্চু স্যার একটা গান গেয়েছিলেন না? আমি তো প্রেমে পারিনি;- প্রেম আমার উপর এসে পরেছে।
.
প্রিয়ন্তী'ই আমার এই কেয়ারলেস ভাব দেখে প্রেমে পরেছিলো। আর জীবনে প্রথম প্রেম, প্রথম সুন্দরী একটা মেয়ে আমায় ভালোবাসছে, তাকে কিভাবে ফিরিয়ে দেই বলেন? সেদিন এই বিয়ে ইস্যু থেকেই ওরে ঝাড়ি দিয়ে বলছিলাম, এত্তো শখ কেন বিয়ে করার? দুদিন পর করলে কি কিছু খসে পরে? যাও বিয়ে করে ফেলো যাকে খুশি, আমার সামনে আইসো না। তারপর যে সত্যি সত্যিই প্রিয়ন্তী বিয়ে করার জন্য রেডি হয়ে যাবে কল্পনাও করতে পারিনি। ভাবছিলাম যাকগে, কয়েকদিন পর ঠিকই আসবে কিন্তু বিয়ের কার্ড হাতে ধরায় দিলো যেদিন সেদিন আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরছিলো। ও বলছিলো ওর বিয়ে অবধি যেন ওর সামনে না যাই। আমার ভেতরটা ধুমড়ে মুছড়ে যাচ্ছিলো, আমি যেন বিশ্বাস'ই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছে প্রিয়ন্তী'ই আমার সব। প্রিয়ন্তীকে আমি অনেক ভালোবাসি, কিন্তু মেয়েটা তার চাইতেও আমাকে বেশি ভালোবাসতো। আজ কিভাবে পারলো এটা করতে? আমি যেনো আর পারছিলামনা।
.
ওর নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আজ অপয়ার মতো চলে আসলাম। পুরো বাড়িটা কত সুন্দর করে সাজানো, কতশত মানুষ। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা করছি কতো টাকা খরচ হয়েছে। আবার ভাবছি সিম্পলি আয়োজন করলে কতো টাকাটা'ইনা বেঁচে যেতো। গ্রামে আমরা ঝিলমিল বাতি, কলাগাছ, রঙ্গিন কাগজ, রিলের সুতো দিয়ে কত সুন্দর করে সাজাতাম। কতো টাকা খরচ হতো জানেন? এই ধরেন বেশি হলে হাজার খানেক টাকা। আর এখানে! আন্দাজ'ই করতে পারছি না, হাহাহা বড়লোকের কাজকারবার'ই আলাদা ভাই। ভাবতে ভাবতে ভেতরে ঢুকলাম। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রিয়ন্তীদের বাড়িতে আসলাম। প্রথম যেবার আসছিলাম, কতো দামি সোফায় বসতে দিয়েছিলো। আমি বুঝতে পারছিলামনা হাতটা কোন এঙ্গেলে রাখলে আমায় মানাবে, কিংবা পা'টা কোন এঙ্গেলে ভাজ করে রাখবো। নাকি ছড়িয়ে রাখবো। আমি এসবে খুব আনইজি হয়ে পরি। আমি গ্রামের ছেলে, সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরেফিরে, নদীতে ঝাপিয়ে গোসল করে চোখ লাল করে বাড়ি ফিরে এসে চাটাই পেতে দুমুঠো মুখে পুরে আবার উধাও হয়ে যেতাম। চা বাগান আর পাহাড় বেয়ে উঠা নামা। ঝড়নার পানির স্রোত কম থাকার সময় উপর থেকে পানির সাথে বেয়ে নেমে ঝাপিয়ে পরা, নৌকা নিয়ে বিলে শাপলা কুড়ানো, হাওড়ে মামাকে নিয়ে মাছ ধরা, এসব খুব ভালো পারতাম এসবেই অভ্যস্ত ছিলাম। শহরে এসে আমার দুরন্তপনা কঠিন অসুস্থতার শিকার হয়েছে। পড়াশোনা আর অট্টালিকায় ঘেরা শহরে আমার দম আটকে আসে। মাঝে মাঝে দূরে কোথাও গিয়ে হা করে বাতাস খেয়ে আসি। এই শহরের বায়ুতে ধুলোবালি, গ্যাস, কলকারখানার ধোয়া, দুর্গন্ধ, আর এতো এতো মানুষের ছোড়া কার্বনডাইঅক্সাইড সব মিলে এতো ঘনত্ব হয়েছে যে অক্সিজেন নিতেই কষ্ট হয় আমার।
.
প্রিয়ন্তীদের বাড়িতে ঢুকলাম, কোনো কূল কিনারা করতে পারছিনা এতো লাইটিং আর এতো সাজানো হয়েছে বাড়িটা। ঘুরে ঘুরে দেখতেছি। হঠাৎ পেছন থেকে কাধে কেউ হাত রাখলো ঘুরে তাকিয়ে দেখি প্রিয়ন্তী। হলুদ শাড়ী, মাথায় কাচা হলুদ রঙের ফুলের বেণী, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, হাতে ঐযে বিয়ের সময় কি কি পরে ওসব পরা। সবমিলিয়ে একটা পরীর মতো লাগছে। আসলে সব মেয়েদেরকে'ই বিয়ের সাজে পরী লাগে এতে আলাদা বিশেষত্ব থাকার দরকার হয় না। আমাকে এসব খসখসে ভাবনাচিন্তার জন্যই হয়তো প্রিয়ন্তী সবসময় বলতো তুমি একটা গাইয়া আর তোমার চিন্তাভাবনাগুলো'ও। এতো আনরোমান্টিক হবা জানলে আমার জীবনের এতটা দিন নষ্ট করতাম না। প্রিয়ন্তী বলে উঠলো হা করে কি ভাবছো? বলছিলামনা না আসতে? তাও আসছো ক্যান? আমি বললাম, তুমি'না বিয়ের কার্ড দিলা আমাকে, তো আসবোনা? প্রিয়ন্তী দাতে দাত চেপে বলতেছে, আমি তোমাকে কনফার্ম করার জন্য এইটা দিয়েছিলাম, যে আমার বিয়েটা হয়ে যাচ্ছে, এখানে আসার জন্য না। হঠাৎ প্রিয়ন্তীর মা আসলেন, আমাকে বললেন আরে রবিন কেমন আছো? কিছু খাইছো? আমি জাস্ট সালাম দিলাম। ওনি বললেন প্রিয়ন্তী ওরে রুমে নিয়ে যা। তারপর আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো ভেতরে। প্রিয়ন্তীর মা জানতেন আমরা শুধুমাত্র ভালো বন্ধু।
.
প্রিয়ন্তী বিছানার একপাশে বসে আছে। আমি সোফায় বসে আছি। প্রিয়ন্তী বলতেছে, কিছু খাবা? এনে দিবো? আমি বললাম, না লাগবেনা। প্রিয়ন্তী বললো, কেনো আসছো? তামাশা দেখতে? আমি আর পারছিলাম না একদম, কেঁদে ফেললাম। বললাম, প্রিয়ন্তী আমি তোমাকে ভালবাসি। তুমি এতো বড় ডিসিশন কিভাবে নিলা? আমি কি নিয়ে বাঁচবো? প্রিয়ন্তী কিচ্ছু বললো না। এতো কঠিন হয়ে যাবে আমার প্রিয়ন্তী আমি ভাবতেই পারিনি। ও উঠে চলে যাচ্ছিলো আমি ওর হাত ধরে আটকে জড়িয়ে ধরলাম, বললাম;- তুমি এটা করতে পারোনা প্রিয়ন্তী। ও আমাকে একটা ঝটকা দিয়ে ছাড়িয়ে বললো, ভালোবাসা এতোদিন কই ছিলো? আমি মেহেদী পরে আসি। ইচ্ছে থাকলে বসে থাকো নইলে চলে যাও। আমি বসে বসে অনেক চোখের পানি ফেললাম। এখন কি করা উচিত বুঝতেছিনা, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, আজকে গরীব হয়ে জন্ম নেয়াতে'ই প্রিয়ন্তীকে হারালাম। যদিও প্রিয়ন্তীর মধ্যে বড়লোকি অহমিকাটা কোনদিন দেখিনি। এসব ভাবতে ভাবতে সোফাতেই শুয়ে পরলাম। আবার প্রিয়ন্তীর চিল্লা চিল্লিতে ঘুম ভাঙলো। বলতেছে, এই গবেট!!! প্রেমিকার বিয়ে এতোসবের মধ্যে ঘুমাও কিভাবে তুমি? আমি হলেতো জীবনেও পারতাম না। মাই গুডন্যাস! এত্তো আইলসা মানুষ বাপের জন্মে দেখিনি। আমি বললাম আমার খিদে পেয়েছে, কিছু খেতে দাও। প্রিয়ন্তী মিন মিন করে বললো, এটা মানুষ হবে না কোনদিন। ওর দু হাতে মেহেদী ছিলো। বাড়ির সবাই ব্যস্ত। আমাকে কিচেনে নিয়ে গেলো। ফ্রিজে কিছু খাবার ছিলো দেখিয়ে দিলো আমি নিজেই নিয়ে ইচ্ছে মতো খাচ্ছিলাম। ও আমার পাশেই দাঁড়ানো ছিলো। খেয়াল করিনি ও কাদঁতেছে।
.
কি ব্যাপার কাঁদতেছো কেন? তোমার বিয়ে কাল। তোমার'তো নাচার কথা। প্রিয়ন্তী ওর মেহেদী মাখা হাত দিয়েই জোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো আমার গালে। খাবারের প্লেট ছিটকে পরে গেলো। ভয়ে আমি ওরে জড়িয়ে ধরে ফেললাম। বলতেছি কি করবো বুঝতেছিনা প্রিয়ন্তী, আমাকে বলো আমি কি করবো? আমার অশান্তি লাগছে, আর অশান্তি লাগলে ঘুম আসে আর খিদে পায়। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি এই সিচুয়েশনটা কিভাবে নিবো, কি করবো বুঝতেছিনা। কখনো মনে হচ্ছে তুমি সুখে থাকবা। এই বিয়েটা মেনে নেয়া উচিত। যেখানে আমার পুরো পরিবারটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমি সেখানে তোমার জন্য স্বার্থপর। আবার মনে হচ্ছে আজকেই আমার শেষ দিন কালকে তুমি যাওয়ার পর পর আমিও মারা যাবো। প্রিয়ন্তীকে জড়িয়েই ধরে রাখছি। প্রিয়ন্তী বলতেছে তুমি এত্ত কেয়ারলেস, তাও কেন এতো ভালোবাসি তোমায় বলোতো? আচ্ছা শুনো একটা প্ল্যান আছে, বিয়েটা ভেঙে দেই রবিন? আমি তো চোখ মুখ মুছে একদম লাফিয়ে বলতেছি এখন, হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই করো জান। আসো আমরা পালিয়ে যাই। প্রিয়ন্তী ভেঙচি খেটে বললো হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই করো জান আসো আমরা পালিয়ে যাই! এতো সহজ? আমি আবার মন খারাপ করে বললাম তুমি'ই তো মাত্র বললা। প্রিয়ন্তী ওর বিয়ের কার্ডটা আবার বের করে দিলো। আমি বললাম এটা দিয়ে কি করবো? ও বললো, আমি জানি তুমি এটা খুলে'ও দেখোনি। আমার সামনে এখন খুলে দেখো আর পড়ে শুনাও। আমি সেটাই করলাম, একদম শেষে এসে দেখলাম কণের নামের জায়গায় লিখা 'রুপন্তী' তখন বড়সড় একটা ঝটকা খেলাম। রুপন্তী প্রিয়ন্তীর বড় বোন ছিলো। এখন ইচ্ছে করতেছে প্রিয়ন্তীকে খসে একটা থাপ্পড় দেই, আমি এতক্ষণ মরেই যাচ্ছিলাম। ভালোবাসাগুলো এতো রুদ্ধশ্বাস হয় এটা প্রথম অনুভব করলাম। প্রিয়ন্তী ভালোই রিভ্যাঞ্জ নিলো। অপরাধীর মতো করে মাথা নিচু করে কাঁদতেছে এখন। আমি ওর গাল দুটো ধরে মাথাটা আমার দিকে তুলে কপালে আলতো করে একটা চুমো দিয়ে বললাম আমি এমনটাই থাকবো, তুমি আমাকে ছেড়ে যাবেনা তো? প্রিয়ন্তী বললো আসো ছাদে যাই। ছাদে দাঁড়িয়ে আছি দুজন। ভোর হয়ে গেছে, বসন্তের শীতল বাতাস বইছে। প্রিয়ন্তী আমার বুকে, মিনমিন করে বলতেছে আমি সরি সোনা। আমি মুখে বললাম, আরে ধ্যাত কিসের সরি? আমিতো জানতাম তুমি এমনি এমনি করতেছো এসব। আমার জানটা আমায় ছেড়ে যেতেই পারে না। কিন্তু আমি মনে মনে এখন এই মুহূর্তে পার্থনা করতেছি, খোদা যে দিন দেখাইলা। এই দিনটা যেন দ্বিতীয়বার আমার জীবনে না আসে। তাহলে মরেই যাবো।
লেখক:- অলিভার কুইন (শুভ)।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now