বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছায়াশহর"
লেখক : রাকিব হাসান
৫ ম পর্ব
সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেছে সুজা।
আমার দিকে তাকিয়ে আছে
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে। তাড়াতাড়ি ওখান
থেকে সরে আসার জন্য হাতের
ঈশারায় ডাকছে আমায়।
কিন্তু আমি সরলাম না, বরং এগিয়ে
গিয়ে দরজার নবটা চেপে ধরলাম,
আরেক হাতে ধাক্কা দিলাম
দরজার পাল্লায়।
নব ছেড়ে দিলাম। দরজা খুলে গেল।
চিৎকার করে বললাম, " কে আছ
এখানে?"
কিন্তু ফাঁকা, শূন্য ঘর। বাইরে আবার
বাজ পড়ল।
কিসে দরজার পাল্লা নেড়েছে
বুঝতে পারলাম এবার। উল্টো
দিকের জানলার পাল্লা সামান্য
ফাঁক হয়ে গেছে। নিশ্চয় ঝোড়ো
বাতাস ওখান দিয়ে ঢুকে পাল্লায়
লেগেছে। তাতে পাল্লা নড়েছে।
ঘরের ভেতর যে ফিসফিসানি
শুনেছিলাম সেটাও নিশ্চয়
বাতাসেরই শব্দ। কিন্তু জানলাটা
খোলা রেখে গেল কে?
নিশ্চয় রঙের মিস্ত্রিরা। কিছুক্ষণ
দাঁড়িয়ে দম নিলাম। আমার ধড়াস
ধড়াস করতে থাকা হৃদপিন্ডটাকে
শান্ত হবার সময় দিলাম। তারপর
ধীরেসুস্থে গিয়ে ওপাশের ফাঁক
হয়ে যাওয়া জানলার পাল্লাটা
বন্ধ করে দিলাম।
" ভাইয়া, কিছু আছে ওখানে?",
সিঁড়ি থেকেই জিজ্ঞেস করল সুজা।
বললাম, " না, কিছু না। বাতাসের
খেলা।"
দুজনে নেমে এলাম নীচে। মুভাররা
এল একঘণ্টা দেরী করে। বৃষ্টির
বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে
জানাতে ওরা ভ্যান থেকে
মালপত্র নামাতে লাগল। বলল,
রাস্তা খারাপ থাকায় ওদের
আসতে দেরী হল। আমি আর সুজা
ওদের দেখিয়ে দিলাম, আমাদের
জিনিসগুলো আমাদের ঘরের কোন
পজিশনে রাখতে হবে। সিঁড়ি
দিয়ে তোলার সময় আমার
ড্রেসারটা হাত ফসকে ফেলে দিল
ওরা। তবে দু এক জায়গায় সামান্য
আঁচড় ছাড়া তেমন ক্ষতি হল না
সেটার।
আমাদের আসবাবপত্রগুলো কেমন
ছোট ছোট আর হাস্যকর লাগল এত বড়
বাড়িটায়। আমাদের বাবা-মা কে
সারাটাদিন কঠোর পরিশ্রম করতে
হল। আমি আর সুজা ওঁদের থেকে
যতটা পারি দূরে দূরে রইলাম, বিরক্ত
করতে চাইলাম না ওঁদের। বাক্স
থেকে মাল নামানো, সেগুলো
গোছানো, কাপড় চোপর সাজিয়ে
রাখা ইত্যাদি প্রচুর কাজ। অন্য কাজ
ছাড়াও আমাদের দুজনের ঘরের
পর্দাগুলোও টাঙিয়ে দিলেন মা-
বাবা।
কি ধকলটাই না গেল আজ সারাদিন!
বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে
লাগলাম। রাত এখন প্রায় দশটা। নতুন,
অপরিচিত ঘরটায় শুয়ে আমি ঘুমোনর
চেষ্টা করছি। কিন্তু ঘুম আসছে না।
এপাশ ওপাশ করতে করতে বিরক্ত
হয়ে শেষে চিত হলাম। কিন্তু আমার
পুরনো বিছানাটায় এভাবে শুয়েও
ঘুম এল না আমার। সবকিছুই কেমন
অন্যরকম লাগছে, কেমন যেন
গোলমেলে। আমার বিছানাটা এখন
যেদিকে মুখ করে আছে, আগের
বাড়ির বেডরুমে সেদিকে ছিল
না। শূন্য দেওয়াল। এখনও একটা
পোস্টারও দেওয়ালে লাগানো
হয়নি। একেবারে খালি লাগছে
মস্ত ঘরখানাকে। ছায়াগুলো অনেক
বেশী অন্ধকার।
একটু পরে আমার পিঠ চুলকোতে
লাগল। এখানে একবার চুলকোয়,
আবার অন্য পাশটায় চুলকোয়। কি
ব্যাপার? ছারপোকা আছে নাকি
আমার বিছানায়? কিন্তু আমার
বিছানায় তো কোনওদিন
ছারপোকা ছিল না, ভাবতে
ভাবতে উঠে বসলাম। তাকালাম
বিছানাটার দিকে। না, কোথাও
কোনও পরিবর্তন নেই। ধবধবে সাদা
চাদর,কোথাও কিছু নজরে পড়ল না।
আবার শুয়ে পড়লাম। চোখ বুজে
ঘুমোনর চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঘুম এল
না। যখন ঘুম আসে না তখন আমি মনে
মনে সংখ্যা গুনি, সুন্দর সুন্দর দৃশ্যের
কথা চিন্তা করি, তাতে মাথা
সাফ হয়ে গিয়ে ঘুম আসে।
এক্ষেত্রেও তাই করলাম, তাতে
কিছুক্ষণের মধ্যে বড় বড় হাই উঠতে
লাগল কিন্তু ঘুম এল না। ঘড়ির দিকে
তাকিয়ে দেখি দুটো বেজে বিশ।
সারারাত কি এভাবেই জেগে
থাকতে হবে? মনে হচ্ছে নতুন এই
ঘরটায় কোনও রাতেই আমার ঘুম
আসবে না। তারপর কখন একসময় বোধহয়
নিজের অজান্তেই দু'চোখে তন্দ্রা
নেমে এসেছে, বুঝতেও পারিনি।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, বলতে পারব না।
হয়তো একঘন্টা, কি বড়জোর দুই ঘন্টা
হবে। হালকা, অস্বস্তিকর ঘুম। কিন্তু
এমনি এমনিই আমার ঘুমটা ভাঙেনি।
নিশ্চয় কোনও কারণে ভেঙেছে।
চমকে বিছানায় উঠে বসলাম।
ঘরের আবহাওয়া মোটেও ঠাণ্ডা নয়,
বরং গরমই বলা যায়। কিন্তু আমার
প্রচণ্ড শীত করতে লাগল। পায়ের
দিকে তাকালাম ; কখন যে লাথি
মেরে গায়ের চাদরটা ফেলে
দিয়েছি, জানি না। গুঙিয়ে উঠে
নুয়ে পড়ে চাদরটা তুলে আবার
গায়ে টেনে দিতে গিয়েই থমকে
গেলাম।
কার যেন ফিসফিসানি কানে এল।
স্পষ্ট মনে হল, ঘরের মধ্যে কে যেন
ফিসফিস করে কথা বলছে।
" কে? কে ওখানে?" চেঁচানোর
সাহস নেই, তাই নিচুস্বরে
জিজ্ঞেস করলাম। ফিসফিসানি
বেড়ে গেল। অন্ধকারে তাকিয়ে
থাকতে থাকতে দৃষ্টি সয়ে এল
আমার।
বিকেলবেলা যে পর্দাগুলো আমার
ঘরে টাঙিয়ে দিয়ে
গিয়েছিলেন মা, এখন সেগুলো
জোরাল বাতাসে উড়ছে, দেখলাম।
এবার বুঝলাম। বাতাসে পর্দাগুলো
ওভাবে ওড়ার ফলেই ওরকম
ফিসফিসানির মতো শব্দ হচ্ছিল।
সেই শব্দই জাগিয়ে দিয়েছে
আমাকে। বাইরে থেকে মৃদু ধূসর
আলো ঢুকছে ঘরে। আমার পায়ের
কাছে ছায়া নড়ছে। পর্দার ছায়া।
লম্বা হাই তুলে বিছানা থেকে
নামলাম। ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে।
কাঠের মেঝেতে পা ফেলে
জানলার দিকে এগোলাম,
জানলাগুলো বন্ধ করতে।
জানলার কাছে যেতেই বন্ধ হয়ে
গেল পর্দার ওড়াউড়ি। একেবারে
শান্ত হয়ে ঝুলে রইল পর্দাগুলো।
পর্দা সরিয়ে পাল্লা লাগাতে
গেলাম।
" আরে!"
মৃদু চিৎকারটা আমার মুখ দিয়ে
আপনা আপনিই বেরিয়ে এল।
জানলা তো বন্ধই আছে!
কিন্তু বাতাস না পেয়ে পর্দাগুলো
উড়ছিল কিভাবে! কিছুক্ষণ ওখানে
চুপচাপ দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম
বাইরের ধূসর রাতের দিকে। জানলা
দিয়ে একটুও বাতাস আসছে না। শক্ত
করে আটকানো।
পর্দাগুলোর ওড়াউড়ি দেখাটা কি
তাহলে আমার চোখের ভুল ছিল?
হাই তুলতে তুলতে আবার ফিরে
এলাম বিছানায়। অদ্ভুত ছায়া
পড়েছে বিছানায়। সেদিকে যতদূর
সম্ভব না তাকিয়ে আবার শুয়ে
পড়লাম। চাদর টেনে নিলাম গায়ে।
নিজের মনকে শাসন করলাম, ' রেজা,
নিজেকে সামলাও, এভাবে ভয়
পাওয়ার কোনও কারণ নেই!'
কয়েক মিনিট পর যখন ঘুমিয়ে পড়লাম
তখন এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখলাম।
দেখলাম, আমরা সবাই মরে গেছি।
বাবা, মা, আমি, সুজা...কেউ বেঁচে
নেই।
প্রথমে দেখলাম, নতুন বাড়ির
ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসে আছি
আমরা চারজনে। ঘরের আলো এত
উজ্জ্বল, এত চোখ ধাঁধানো যে কেউ
কারোর মুখ দেখতে পাচ্ছি না।
সাদা উজ্জ্বল ঝিলিমিলির মতো
লাগছে। তারপর ধীরেধীরে স্পষ্ট
হয়ে উঠতে লাগল সবকিছু। দেখলাম,
আমাদের মুখের মাংস খসে গিয়ে
হাড় বেরিয়ে পড়েছে। চোয়ালের
কাছে এখানে ওখানে একটু একটু
চামড়া আর কয়েক টুকরো মাংস ঝুলে
আছে। যেখানে চোখ থাকার কথা,
সেই জায়গায় দুটো বড় বড় কালো
গর্ত।
চারজনেই মৃত মানুষ আমরা নীরবে
খেয়ে চলেছি। আমাদের
প্লেটগুলো কাঁচা মাংস আর ছোট
ছোট হাড়ের টুকরোয় ভর্তি।
টেবিলের মাঝখানে মস্ত একটা
প্লেটে সবজে-ধূসর হাড়ের স্তুপ উঁচু
হয়ে আছে। মানুষের হাড়। আর
তারপরেই, স্বপ্নের মধ্যেই, আমাদের
এই ভয়াবহ খাবার খাওয়ায় বাধা
পড়ল দরজায় করাঘাতের শব্দে।
ক্রমেই জোরাল হচ্ছে সেই শব্দ।
বুঝলাম, নেড এসেছে। আমার বন্ধু।
সামনের দরজায় ওকে দেখতে
পাচ্ছি। নাগাড়ে করাঘাত করেই
চলেছে।
আমি ওকে দরজা খুলে দিতে
চাইলাম। ডাইনিং টেবিল থেকে
উঠে গিয়ে দরজা খুলে ওকে স্বাগত
জানাতে চাইলাম। ওকে সব বলতে
চাইলাম....আমি যে মারা
গিয়েছি, আমার মুখ থেকে মাংস
খসে পড়ছে....সব বলতে চাইলাম
ওকে।
কিন্তু আমি চেয়ার থেকে একচুল
উঠতে পারলাম না। চেষ্টা করেই
যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি কিন্তু নিজের
শরীরটাকে ওঠাতেই পারছি না।
দরজায় করাঘাতের শব্দ জোরাল
হচ্ছে, কান ফেটে যাবার যোগাড়।
কিন্তু উঠতে পারছি না। বসে আছি
আমার পরিবারের বিকৃত মানুষগুলোর
সঙ্গে, প্লেট থেকে হাড় তুলে
চিবোচ্ছি। ঘুমের মধ্যে এই ভয়াবহ
স্বপ্ন দেখতে দেখতে এপাশ ওপাশ
করছিলাম বোধহয়। একসময় চমকে
জেগে উঠলাম। যাক, বাইরে সকাল
হয়ে গেছে। জানলার বাইরে নীল
আকাশ চোখে পড়ছে।
আরে! একি!
পর্দা! জানলার পর্দা আবার উড়তে
লেগেছে! বেশ শব্দ করে উড়ছে। অথচ
জানলার পাল্লা লাগানো!
উঠে বসে তাকিয়ে রইলাম।
না, জানলার পাল্লা শক্ত করেই
আটকানো! অথচ পর্দাগুলো যেন
দমকা হাওয়ায় ওড়ার মতো উড়েই
চলেছে!
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now