বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছায়াশহর"
লেখক : রাকিব হাসান
৪ র্থ পর্ব
______>" পা মুছে ঘরে ঢোক, কাদা মাখা
পায়ে ঘরটা নোংরা কোরো না",
ফাঁকা লিভিং রুমে মা'র গলা
প্রতিধ্বনি তুলল।
ভেতর বারান্দায় ঢুকলাম। নতুন রঙের
গন্ধ। গত বৃহস্পতিবারেই রঙ করে
রেখে গেছে রঙের মিস্ত্রি।
" এই শোন, রান্নাঘরের বাতিটা
জ্বলছে না", মা'কে চেঁচিয়ে
বললেন বাবা, " রঙের মিস্ত্রী কি
মেইন সুইচ অফ করে রেখে গেল
নাকি?"
" আমি কি করে বলব?", মা'ও
চেঁচিয়ে জবাব দিলেন।
দুজনের কন্ঠই জোরাল প্রতিধ্বনি তুলল
গোটা বাড়িটায়।
" মা, ওপরতলায় কে যেন আছে", নতুন
ডোরম্যাটে পা মুছতে মুছতে বললাম
আমি। লিভিং রুমে ঢোকার জন্য
তাড়াহুড়ো করছি।
জানলার কাছে দাঁড়ানো মা,
বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে
আছেন । মুভাররা আসছে কিনা,
দেখছেন হয়ত। ঘুরে তাকালেন
আমার দিকে, " কি?" আমি বললাম, "
ওপরতলায় একটা ছেলে আছে মনে
হল । জানলার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল,
আমার দিকে তাকিয়ে। "
পেছনের বারান্দার দরজা দিয়ে
বাবার সঙ্গে ঘরে ঢুকল সুজা।
বোঝাই যাচ্ছে, বাবার সঙ্গেই
ওদিকটায় ছিল এতক্ষণ। হেসে বলল, "
ভূত টূত হবে হয়ত। আগে থেকেই থানা
গেড়ে বসে আছে।"
" কেউ নেই ওপরে!", রুক্ষ্মস্বরে বলে
উঠলেন মা, " তোমরা কি আমায় একটু
শান্তিতে থাকতে দেবে না?"
" আমি আবার কি করলাম?" সুজা বলল।
" দেখো, রেজা, আজ আমরা সবাই
উত্তেজিত হয়ে আছি"....মা বলতে
গেলেন।
আমি বাধা দিয়ে বলে উঠলাম, "
কিন্তু আমি ছেলেটাকে পরিষ্কার
দেখেছি মা। জানলায় দাঁড়িয়ে
উঁকি মেরে দেখছিল। আমার মাথার
গোলমাল নেই, তা তো তুমি
জানো।"
" কে বলল?" পাশ থেকে ফোড়ন কাটল
সুজা।
" রেজা!", নীচের ঠোঁট কামড়ালেন
মা, বেশী উত্তেজিত হলে বা
ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে এমনটা করেন মা। "
নিশ্চয় কোনও কিছুর ছায়া দেখেছ,
গাছের ডাল টাল হতে পারে।"
আবার জানলার দিকে ফিরলেন
মা। বাইরে ওদিকে মুষলধারে বৃষ্টি
শুরু হয়েছে আবার। সেইসঙ্গে প্রবল
ঝোড়ো বাতাস। ঝাপটা দিচ্ছে
জানলার কাঁচে থেকে থেকে।
সিঁড়ির কাছে দৌড়ে গেলাম। ওপর
তলার দিকে তাকিয়ে চিৎকার
করে বললাম, " কে আছ ওখানে?"
কেউ জবাব দিল না।
আবার চেঁচিয়ে বললাম, " কে আছ
ওখানে?"
দুই আঙুলে কান ঢাকলেন মা। বিরক্ত
হয়ে বললেন, " ওহ, রেজা প্লিজ। "
ডাইনিং রুমের ভেতর দিয়ে অদৃশ্য
হয়েছে সুজা। বাড়ির ভেতরটা ঘুরে
ঘুরে দেখার জন্যে।
" কেউ আছেই ওখানে!" বলে আর
দাঁড়ালাম না। রাগ দেখিয়ে
দুপদাপ শব্দে কাঠের সিঁড়ি ভেঙে
ওপরে উঠতে লাগলাম।
" রেজা!", পিছন থেকে মা ডেকে
উঠলেন।
কিন্তু থামলাম না। রাগ কমছে না
আমার। কেন মা আমার কথা বিশ্বাস
করলেন না? কেন বললেন ওটা
গাছের ছায়া?
আমায় জানতেই হবে ওপরতলায় কে
আছে। মায়ের ধারণা ভুল প্রমাণ
করতেই হবে। বোঝাতে হবে যে
আমি মানুষের মুখই দেখেছি,
গাছের ছায়া নয়। বুঝতে পারছি
বেশী জেদ দেখাচ্ছি, কিন্তু কি
আর করব! একগুঁয়েমি আমাদের
পরিবারের রক্তে!
পায়ের চাপে ক্যাঁচক্যাঁচ, মচমচ শব্দ
করতে লাগল পুরাতন কাঠের সিঁড়ি।
দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছাবার
আগে পর্যন্ত ভয় পাইনি। কিন্তু
সেখানে পৌঁছবার পর হঠাৎ খামচে
ধরা অনুভূতিটা টের পেলাম।
থেমে গেলাম। জোরে জোরে
শ্বাস ফেলতে লাগলাম রেলিঙে
ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে।
কে হতে পারে? চোর? ডাকাত? না
একঘেয়েমির শিকার কোনও
ছেলে? আমাদের পড়শি? খালি
বাড়িতে ঢুকে পড়েছে
রোমাঞ্চের আশায়?
একলা এইভাবে আমার আসাটা ঠিক
হয়নি আমার বুঝলাম।
এটা আমার বিপদের কারণ হতে
পারে! " কে ওখানে?" আবার
ডাকলাম। গলা কাঁপছে আমার।
কণ্ঠস্বরও দূর্বল। রেলিঙে ঠেস দিয়ে
দাঁড়িয়ে কান পেতে রইলাম।
বারান্দা ধরে একটা পায়ের শব্দ
এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে না!
নাকি বৃষ্টির শব্দ? হ্যাঁ, তাই হবে।
টালির ছাদে আছড়ে পড়া বৃষ্টির
ফোঁটার শব্দ। পায়ের শব্দের মতো
শোনাচ্ছে।
ভয় কমে গেল আমার। রেলিঙ থেকে
সরে এসে লম্বা, সরু বারান্দায় পা
রাখলাম। অন্য প্রান্তের ছোট
জানলা দিয়ে ধূসর আলো আসছে। এত
সামান্য আলোয় বারান্দার অন্ধকার
কাটছে না। কয়েক পা এগোলাম।
পুরনো মেঝের তক্তা পায়ের চাপে
মচমচ করে উঠল। " কে ওখানে?
চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
কোনও জবাব নেই।
বাঁ দিকের প্রথম দরজাটার কাছে
এসে দাঁড়ালাম। দরজাটা বন্ধ। নতুন
রঙের গন্ধ দম আটকে দিতে চায়।
দরজার পাশে একটা বাতির সুইচ।
নিশ্চয় বারান্দার সুইচ। টিপলাম।
আলো জ্বলল না। " কেউ আছেন?"
আবার চেঁচিয়ে বললাম। কোনও
জবাব নেই।
দরজার নবের দিকে হাত বাড়ালাম।
লক্ষ্য করলাম, আমার হাতটা কাঁপছে।
নবটা ধরে আস্তে করে ঘুরিয়ে
দিলাম। ভারী দম নিয়ে ঠেলা
দিলাম দরজাটায়।
দরজা খুলে উঁকি দিলাম ঘরের
ভেতর। মস্ত জানলাটা দিয়ে ধূসর
আলো আসছে। ঠিক এইসময় বিদ্যুৎ
চমকাল। লাফিয়ে সরে এলাম।
প্রথমে বিকট শব্দে বাজ পড়ল; তারপর
দূরে সরে গেল বজ্রের গুড়ুগুড়ু।
আস্তে, খুব সাবধানে ঘরের ভেতর
পা রাখলাম। প্রথমে এক পা, তারপর
আর এক পা।
কাউকে চোখে পড়ল না। ঘরটাকে
গেস্টরুমের মতো মনে হল আমার।
সুজা ইচ্ছে করলে এটাকে বেডরুম
বানাতে পারবে।
আবার বিদ্যুৎ চমকাল, আরও কালো
হয়ে আসছে আকাশ। এখন দুপুর,
লাঞ্চের সময়। কিন্তু বাইরের অবস্থা
দেখে মনে হচ্ছে যেন রাত নামছে।
পিছিয়ে বেরিয়ে এলাম
বারান্দায়। পাশের রুমটায় আমি
থাকব ঠিক করেছি। ওটাতেও বড়
একটা জানলা আছে, যেটা দিয়ে
সামনের আঙিনাটা দেখা যায়।
অন্ধকারে পা টিপে টিপে
এগোলাম। আমার ঘরের দরজায় এসে
দাঁড়ালাম। এ ঘরটাও বন্ধ।
ভারী দম নিয়ে দরজায় টোকা
দিলাম। আবার জিজ্ঞেস করলাম, "
কেউ আছ?" কোনও সাড়া নেই।
বাইরে আবার বিকট শব্দে বাজ পড়ল।
আগেরবারের চেয়ে কাছে। বরফের
মতো জমে গেলাম যেন; অসাড় হয়ে
গেল শরীর। বাড়ির ভেতরের
বাতাস গরম আর ভেজা ভেজা।
রঙের গন্ধে মাথা ঘুরছে আমার।
দরজার নব চেপে ধরলাম। আবার
জিজ্ঞেস করলাম, " কেউ আছ
ভেতরে?" দরজার নব ঘোরাতে শুরু
করেছি, এইসময় পেছন থেকে এসে
আমার কাঁধ চেপে ধরল একটা হাত।
দম নিতে পারছি না। চিৎকার
করতে পারছি না। বুকের ভেতর এত
জোরে লাফাচ্ছে হৃদপিন্ডটা যেন
মনে হচ্ছে ফেটে বেরিয়ে যাবে।
ভয়ে ভয়ে পেছন ঘুরলাম, কে কাঁধ
চেপে ধরেছে দেখার জন্য।
" সুজা তুই !"....চেঁচিয়ে উঠলাম আমি
প্রায়। " আর আমি ভেবেছি.... ইস! আর
একটু হলে মেরেই ফেলছিলি!"
আমায় ছেড়ে দিয়ে লাফিয়ে
পিছিয়ে গেল সুজা। হাসতে শুরু
করল। সারা বারান্দায় ছড়িয়ে পড়ল
ওর তীক্ষ্ণ জোরাল কন্ঠের হাসি।
এখনও বুকের কাঁপুনি থামেনি আমার।
কপালটা এখনো ঘামছে। " এতে
হাসির কি দেখলি?", বলে ধাক্কা
দিয়ে সুজাকে দেওয়ালের ওপর
ফেললাম আমি, " তুই আমায় আরেকটু
হলে তো মেরেই ফেলছিলি।"
হাসতে হাসতেই সুজা আমার
চারপাশে ঘুরতে শুরু করল। একেক সময়
ওকে আমার মানসিক রোগী মনে
হচ্ছিল। আবার ওকে ধাক্কা দিয়ে
ফেলে দিতে যাচ্ছিলাম; কিন্তু
ধরতে না পেরে, রাগ দেখিয়ে এক
ঝটকায় দরজার দিকে ঘুরলাম।
দরজার দিকে তাকিয়ে নিজের
চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলাম
না। ভয়ে, বিস্ময়ে হাঁ করে চেয়ে
রইলাম দরজার দিকে।
দরজাটা ধীরেধীরে খুলে যাচ্ছে।
আমার গলার কাছে দমটা আটকে
গেল। এমনকি সুজাও হাসি থামিয়ে
বড় বড় চোখ করে দরজার দিকে
তাকিয়ে রইল। ঘরের ভেতর কে যেন
নড়াচড়া করছে মনে হল। শুধু তাই
নয়,কেউ যেন ফিসফিস করছে,
উত্তেজিত গলায় হাসছে মনে
হচ্ছে!
" কে, কে ওখানে?" কোনওরকমে
তোতলাতে তোতলাতে আমি
বললাম। নিজের গলার স্বর নিজের
কানেই কেমন তীক্ষ্ণ আর কর্কশ
শোনাল। জোরে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ
করে উঠল দরজার পাল্লাটা।
সামান্য ফাঁক হলো। তারপর আবার
বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করল। " কে আছ
ভেতরে? জবাব দিচ্ছ না কেন?"
বিকৃত গলায় চেঁচিয়ে উঠলাম আমি।
আবার ঘরের ভেতর থেকে
উত্তেজিত ফিসফিসানি কানে
এল। ঘরে কেউ নড়াচড়া করছে মনে
হল। দেওয়ালের সঙ্গে নিজেকে
মিশিয়ে দিল সুজা। আতঙ্কে বিকৃত
হয়ে যাওয়া ওর চেহারাটা তখন
দেখবার মতো। কোনওরকমে
দেওয়াল ধরে ধরে সিঁড়ি দিয়ে
নেমে যেতে চাইল ও। দরজার
পাল্লাটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তুলে
আরেকটু বন্ধ হল।
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now