বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

" মা"-(০২)

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়াদুল ইসলাম রূপচাঁন (০ পয়েন্ট)

X আকবরের বয়স যখন ছয় মাস, তখন এক হরতালের দিনে হালিম রিকশা নিয়ে বেরোলো। আকবরের মা বলেছিল সাবধানে থাকতে। হালিম মিয়া হেসে বলেছিল, "চিন্তা কইরো না। হরতালে গাড়ি ভাংচুর হয়। গরীবের রিকশা ভাংলে কারও নজরে পরে না, তাই ভাঙ্গে না।" ঘর থেকে বেরোবার আগে আকবরকে কোলে তুলে তিনবার শূণ্যে ছুঁড়ে আবার লুফে নিল হালিম। আকবর খিলখিল করে হেসে দিল। এটা বাপ ব্যটার অতি প্রিয় খেলা। তারপর ছেলেকে চুমু দিয়ে মায়ের কোলে রেখে কাজে বেরিয়ে পড়লো সে। সন্ধ্যায় খবর আসলো হরতালে যানবাহন ভাংচুরের সময় একদল পিকেটার হালিমের রিকশায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। হালিম সেই আগুন নিভাতে গেলে তাকে ধরে আগুনে ফেলে দেয়া হয়। সে কোন রকমে উঠে আসলে তাকে ধরে মারধরও করে। এতে গুরুতর আহত হয় সে। এখন সে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। রোকেয়া আকবরকে নিয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। অচেতন হালিমের পাশে আছড়ে পরে সে বুক ফাটিয়ে কাঁদলো খুব। প্রথম প্রথম পত্র পত্রিকার লোকজন এ নিয়ে অনেক খবর ছাপালো। সরকারি দল, বিরোধি দলের নেতারা এসে প্রতিপক্ষের উপর দোষ চাপালো। এর সুবিচারের পক্ষ্যে আন্দোলন কমিটি গঠন হল। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সবার আগ্রহে ভাটা পড়লো এবং রোকেয়া নিজেকে স্বামীর পাশে সম্পূর্ণ একা আবিষ্কার করলো। তার কোলে দুধের শিশু আকবর। হালিম আর কখনই বিছানায় উঠে বসতে পারলো না। এ ঘটনা যেন আরেকটি রোকেয়ার জন্ম দিল। সারাদিন হারভাঙ্গা পরিশ্রম, ঘরে অচল স্বামী এবং শিশু সন্তান। দিন দ্রুত ফুরিয়ে আসে। টাকা হাতে আসার আগেই ফুরিয়ে যায়। রাতের বেলা ক্ষুধার্থ পুরুষেরা কুপ্রস্তাব নিয়ে আসে। সবার উদ্দেশ্য একটাই। সবার চোখেই লোভ। রোকেয়া বেগম চোখে অন্ধকার দেখে। এর মাঝেই একদিন আকবরের অসুখ ধরা করলো। তীব্র জ্বর। কিছু মুখে তুলে না। কিছুক্ষণ পরপর অজ্ঞান হয়ে যায়। ডাক্তারের কাছে নিবে, এই টাকাও তো নেই। কিন্তু ছেলের মৃত্যু নিরবে দেখার সাধ্যও তো তার নেই। যা হবার হবে, সে ছেলেকে নিয়ে চলে এলো এক ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার নিশ্চয়ই পাষাণ না। তাঁকে বুঝালে সে নিশ্চয়ই বুঝবে। দরকার হলে ডাক্তার সাহেবের পা জড়িয়ে সে বসে থাকবে। ঘরের ফুটফরমাস খাটবে। আজীবন বাঁদি হয়ে থাকবে। তবু যেন তার সন্তান বাঁচে। রোগী দেখার আগেই ডাক্তারের কম্পাউন্ডার টাকা চেয়ে বসলেন। রোকেয়া কম্পাউন্ডারের পা চেপে ধরলো। কম্পাউন্ডার যতই ধমক দেয় পা ছাড়তে, রোকেয়া ততই শক্ত করে চেপে ধরে। হৈচৈ শুনে ডাক্তার সাহেব নিজেই বেরিয়ে আসলেন। ঘটনা কি শোনার পড়ে রোকেয়াকে চেম্বারে ঢুকালেন। আকবরকে পরীক্ষা করে তারপর চশমার ফাঁকা দিয়ে আবার রোকেয়ার দিকে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "কিছু খেয়েছো?" রোকেয়া দুপাশে মাথা নাড়লো। তিনি বললেন, "বাচ্চাকে নিয়মিত খাওয়াতে পারো?" রোকেয়া আবারও দুপাশে মাথা নাড়লো। এইবার তার ডান চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসলো। বাঁ চোখের বাঁধে এখনও ফাটল ধরে নি। ডাক্তার বললেন, "নিয়মিত খাওয়াতে না পারলে তো তুমি তোমার বাচ্চা বাঁচাতে পারবে না।" রোকেয়া ভয়ার্ত চোখে তাকালো ডাক্তার সাহেবের দিকে। তিনি বললেন, "তোমাকে দেখে বুঝতে পারছি তোমার সামর্থ্য নাই এই ছেলেকে তিন বেলা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর। রোগ হলে ওষুধ খাওয়ানোর। কিংবা লেখাপড়া করে বড় মানুষ করার।" রোকেয়া মাথা নিচু করে ফেলল। ডাক্তারের কথা মিথ্যা নয়, তার এখানে কিছুই বলার নেই। ডাক্তার বললেন, "এরকম চলতে থাকলে তোমার ছেলেকে তুমি কিছুদিনের মধ্যেই হারাবে!" রোকেয়া আবারও ভয়ার্ত চোখে তাকালো ডাক্তারের দিকে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "ডাক্তার সাব! আমার পোলারে আপনি বাঁচান! আপনি যা কইবেন, আমি তা করুম, আপনার বান্দি হয়া থাকুম; আপনি আমার পোলারে বাঁচান!" ডাক্তার সাহেব সামনে ঝুঁকে এসে গলা নিচু করে বললেন, "তোমার ছেলেটাকে আমার এক বন্ধুর কাছে দিয়ে দাও। সে ধনী লোক, তার কোন বাচ্চা নেই। সে তোমার ছেলেকে নিজের ছেলের মতই বড় করবে। ভাল খেতে দিবে, ভাল স্কুলে পড়াবে। এই ছেলে বড় হয়ে একদিন ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার হবে।" রোকেয়া ভ্রু কুঁচকে ধমক দিয়ে বলল, "এইসব আপনে কি কইতাছেন?" ডাক্তার বললেন, "তুমি যদি এখন মমতা দেখিয়ে ওকে নিয়ে যাও, তাহলে কে জানে, ওষুধের অভাবে ও হয়তো দুয়েক দিনের ভিতরেই মারা যাবে। আর যদি বেঁচেও উঠে, বড় হয়ে ও কি হবে? জুতা সেলাই করবে, অথবা রিকশা চালাবে। তুমি মমতা দেখিয়ে নিজের সন্তানের ভবিষ্যত নষ্ট করতে যাচ্ছো। তুমি যদি তাকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখো, তাহলে কি তুমি নিজেকে মাফ করতে পারবে? আর তাছাড়া তারা তোমাকে এর বিনিময়ে ভাল পরিমান টাকাও দিবে, সেটা পেলে তোমারই সাহায্য হবে।" রোকেয়া বেগম ধমকে উঠলো,"আমার পোলারে আমি কারও কাছে বেচুম না। ও বিক্রির মাল না। আমরা গরীব বইলা আপনেরা আমাগোরে যা খুশি তাই করতে পারেন না। দরকার হইলে এক বেলা না খাইয়া থাকুম, তারপরেও আমার পোলারে আমার কাছেই রাখুম!" ডাক্তার এরপরও কিছুক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু রোকেয়া আকবরকে কোলে তুলে নিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। রোকেয়া বস্তির জমশেদ কবিরাজের টোটকা ওষুধ খাওয়ালো আকবরকে। জমশেদ বিরাট বড় কবিরাজ। প্রায়ই নাকি গুলশান বনানীর বড়লোকেরা তাদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। চিকিৎসা করাতে। তার চিকিৎসায় নাকি ক্যানসার রোগিও সুস্থ্য হবার ঘটনা ঘটেছে। কবিরাজি ওষুধে হয়তো ক্যানসার সেরেছে কিন্তু আকবরের জ্বর সাড়েনি। সারাদিন ঝিমায়, কান্নাকাটিও করতে পারেনা। কান্নার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন, সেটাই নেই। ভিষণ দূর্বল হয়ে পরেছে সে। হালিমও বিছানায় শুয়ে শুয়ে যেন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে। কথা বলতে পারেনা। কিন্তু রোকেয়া বুঝতে পারে যে হালিম সবই বুঝে। মাঝে মাঝে নিজের অসহয়াত্বের উপর চড়ম রাগ লাগে রোকেয়ার। আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে আত্মহত্যা করলে এই দুজনের কি হবে? আবার সে বেঁচে থেকে এই দুজনকে তিলে তিলে মরতে দেখতেও সে পারবেনা! এক সন্ধ্যায় সে আকবরকে কোলে নিয়ে হাজির হল সেই ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তার সাহেব তাকে দেখেই বুঝে গেলেন। তিনি ফোনে কথা বলে চেম্বার বন্ধ করে তাঁকে নিজের গাড়িতে তুললেন। তারপর নিয়ে আসলেন এক দারুণ বড়লোকের ফ্ল্যাটে। সেখানে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল সুদর্শন এক দম্পতি। রোকেয়া তাঁদের দেখে আফসোস করে, ওরা কত সুখেই না আছে। ওদের নিজেদের সন্তনানকে অন্যের কাছে তুলে দিতে হয়না! মহিলাটি আকবরকে কোলে তুলে নিল। মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে আকবর যখন হাসলো, রোকেয়ার বুকটা তখন কে যেন তলোয়াড় দিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল! এই ছেলেকে সে আর কোনদিন নিজের বুকে নিতে পারবে না! তার ছেলে তাঁকে কোনদিন মা বলে ডাকবে না! হঠাৎ তাঁর খেয়াল হল, নিজের একমাত্র ছেলের মুখেই সে কখনও মা ডাক শুনেনি! আকবরের মায়ের রক্তের গ্রুপ ও-নেগেটিভ। তাঁর রক্তে কোন রোগ পাওয়া যায়নি। তাঁর রক্ত নেয়া যেতে পারে। তাঁকে অতি দ্রুত বেডে শোয়ানো হলো। একটি সুঁই দ্রুত তাঁর শরীর ফুটো করে ভিতরে ঢুকে গেল। সে দেখতে পেল প্লাস্টিকের স্বচ্ছ পাইপের পথ ধরে তার গাঢ় লাল রক্ত তাশফিনের শরীরে চলে যাচ্ছে। ও যেন তাঁরই শরীরের একটি অংশ। আর এই পাইপ হল ধমনী। হালিম অচল অবস্থাতেও আকবরের অনুপস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। সে দুচোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব সময় নিজের ছেলেকে খুঁজতো। রোকেয়াকে দেখলেই চোখের ভাষায় ছেলের সন্ধান করতো। রোকেয়া স্বামীর চোখে চোখ মিলাতে পারতো না। কি করে বুঝাবে ছেলের ভবিষ্যতের জন্য সে নিজের মমতার বিসর্জন দিয়ে এসেছে? হালিম তাকে এ দূরবস্থা থেকে মুক্তি দিল। ঐ বিছানাতে শুয়ে শুয়েই একদিন সে চোখ বুজলো আর একদম কবরে গিয়েই চোখ খুলল যখন ফেরেশতারা তাকে সাওয়াল জাওয়াবের জন্য জাগিয়েছিল। রোকেয়া কিছুদিন অনেক শোক করলো। স্বামী সন্তান ছাড়া নিজেকে মনে হতে লাগলো নদীতে ভাসা কচুরি পানার মত। একবার একূল তো আরেকবার ওকূল। কিন্তু কোন কূলই তার ঠিকানা নয়। একদিন সে গিয়ে হাজির হলো এক ফ্ল্যাট বাড়িতে। সেখানকার বেগম সাহেবাকে গিয়ে সরাসরি বলল সে কাজের বুয়ার চাকরি চায়। টাকা পয়সা যা খুশি দিলেও চলবে, সে শুধু দুবেলা খাওয়া আর রাতে থাকার জন্য একটা ছাদ চায়। গৃহকর্ত্রি নীলুফার প্রথমে একটু সন্দেহ করেছিলেন। আজকাল কাজের লোক খুঁজলেও পাওয়া যায় না, আর এ কিনা নিজে থেকেই এসেছে কাজ করতে। কোন খারাপ মতলব নেই তো? প্রায়ই তো দেখা যায় যে কাজের লোকের হাতে গৃহিনী খুন! ড্রাইভারকে দিয়ে খোঁজ খবর করিয়ে তারপর আকবরের মাকে চাকরিতে রেখেছিলেন নীলু। আজ তিন বছর হয়ে গেছে, তাশফিনকে সে নিজের ছেলের মতই আদর করে। হাসপাতালে পাশাপাশি বেডে শুয়ে আছে রোকেয়া আর তাশফিন। রোকেয়ার শরীরের রক্ত ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে তাশফিনের শরীরে। রোকেয়া ঘার ফিরিয়ে তাকিয়ে আছে তাশফিনের দিকে। কি সুন্দর চেহারা! রোকেয়া ছাড়া আর কেউ জানেনা যে এই শিশুটি আসলেই তার শরীরের এক অংশ। এই শিশুই তার আকবর! নিয়তি আবারও তাঁদের সেই গর্ভাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। যেদিন সে আকবরকে নীলুফারের হাতে তুলে দিতে এসেছিল, সেদিন ঘোমটায় তাঁর মুখ ঢাকা ছিল। সাহেব বা বিবি কেউই তাঁর চেহারা বেশি দেখেননি। তাই মনে রাখতে পারেননি। তিন বছর আগে যখন সে আসলো, তখন তারা চিনতে পারেননি তাকে। বিবি সাহেব মানা করে দিয়েছিলেন জীবনেও এ বাড়িমুখো না হতে, তাঁরা চান না তাশফিনের সাথে তাঁর আসল মায়ের দেখা হোক কখনও। তাই নিজের পেটের সন্তানকে কাছ থেকে দেখার এরচেয়ে ভাল সুযোগ আর পাওয়া যেত না। হোক না দাসী হয়েই থাকতে হবে, তারপরও তো নিজের সন্তানেরই পাশে থাকা হচ্ছে। এই ছেলের ঊজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যই রোকেয়াকে এই ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। আল্লাহ্ পাক কি এই কোরবানির প্রতিদান দিবেন না? সে উপরে তাকিয়ে প্রার্থণা করে, "মাবুদ! আমার পোলারে তুমি ফিরিয়া দাও! আমারে তুমি নিয়া যাও, তবু আমার পোলাটারে তুমি কিছু হইতে দিও না!" তারপর আবার সে পাশ ফিরে তাকায় নিজের রক্তের সন্তানের প্রতি। বিড়বিড় করে, কেউ যেন শুনতে না পারে এমন স্বরে সে বলে, "আকবর! বাপ আমার!একবার মা বইলা ডাক!"


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now