বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আহমেদ শরীফ আর বদরুদ্দোজা সাহেবের পুনরায় দেখা হলো সপ্তাহ তিনেক পর। শহরের শেষ প্রান্ত থেকে দুজনেই পাতালরেলে উঠছিলেন। লোকের ভীড়ে কথাই হলো না তেমন। আশ্চর্যজনক ভাবে কামরাটা প্রায় শুণ্য হয়ে গেলো মাঝামাঝি এসে। দুই প্রবীণ বন্ধু তখন পাশাপাশি এসে বসলেন কামরারা পেছনের দিককার ফাঁকা সিটে।
-" শালার মানুষ !! " সখেদে বললেন বদরুদ্দোজা সাহেব। " চারদিকেই গিজগিজ করছে। একজন অন্য আরেকজনের জন্যে বিন্দুমাত্র ছাড়ও দেয় না !! "
-" কী করবে বলো, " আহমেদ শরীফ বললেন। " এটাই জীবন। তুমি হলেও তাই করতে।"
-" তা অবশ্য ঠিক। এটাই জীবন। আজকে আছি, কাল নাই। ... ভালো কথা, জীবনের কথা যখন চলেই আসলো- জানো নাকি, ঐ যে, আরে ক্যাফে পাতিসেরির সেই দাঁড়িওয়ালা বুড়ো, সে নাকি গত সপ্তায় খেতে যায় নি। আরে, ঐ মিস ইশিতাই আমায় এ কথা বললো।
" গোয়েন্দা আহমেদ শরীফ সোজা হয়ে বসলেন। " সত্যি ?? সত্যি বলছো ??"
বদরুদ্দোজা সাহেব বললেন- " আমার কী মনে হয় জানো। ঐ যে সেদিন বলেছিলাম, ডাক্তার লোকটাকে ডায়েট দিয়েছেন ?? আমার ধারণা- ঐ ডাক্তারের আচরণে লোকটা মানসিকভাবে কিছুটা ভেঙ্গে পড়েছিলো। যে কারণে খাবারের ফরমায়েশ দেয়ার সময়ও সে এমন মেন্যুর আদেশ দেয়, যা তার সাথে যায় না। আমার মনে হয়, ঐ মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়াটাই লোকটার কাল হয়েছে। নিশ্চয় এখন সে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কিংবা কে জানে, হয়তো মরেই গেছে।... শালার এই ডাক্তারদের আরো সাবধান হওয়া উচিৎ। "
-" সাধারণতঃ, তারা সাবধানই থাকে।" সতর্ক স্বরে বললেন আহমেদ শরীফ।
নিজের স্টপেজ আসতেই বদরুদ্দোজা সাহেব উঠে পড়লেন। যাবার আগে বললেন- "আশ্চর্যের কথা হলো, ঐ লোকটার নামধাম আমরা আর কখনোই জানবো না। ... পৃথিবী বড় আজব জায়গা, নাকি বলো হে ?? "
গোয়েন্দা আহমেদ শরীফের আচরণে অবশ্য মনে হলো না যে পৃথিবীটা খুব বিস্ময়কর স্থান। বাড়ি এসেই তিনি নিজের ব্যক্তিগত কাজের লোকটিকে কোন কিছুর আদেশ দিয়ে বাইরে পাঠালেন।
... খানিক পরেই আহমেদ শরীফকে দেখা গেলো একটি নামের তালিকায় চোখ বুলাতে। একটি বিশেষ এলাকায় গত কয়েকদিনে মৃত মানুষগুলোর তালিকা সেটি। আহমেদ শরীফের চোখ থেমে গেলো একটি বিশেষ নামের উপর। " সিদ্দিকুর রহমান - বয়স উনসত্তর। হুঁম, একে দিয়েই শুরু করা যাক। "
সেই সন্ধ্যায় গোয়েন্দা আহমেদ শরীফকে দেখা গেলো স্বাস্থ্যসেবা হাসপাতালের স্বনামখ্যাত চিকিৎসক- ডাঃ ইউনুসের সাথে কথা বলতে।
ডাঃ ইউনুস বলছিলেন, " সিদ্দিকুর রহমান ?? ওহ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ঐ দাঁড়িওয়ালা, আত্মকেন্দ্রিক লোকটা। বেচারা কাছেই থাকতেন, এই হাসপাতালের পেছনে একটা দোতলা বাড়িতে। আশেপাশের সবগুলো বাড়ি ভেঙ্গে এপার্টমেন্ট বানানো হয়ে গেছে, যে তিনচারটা বাড়ি বাদ ছিলো- সেটার মাঝে একটা ছিলো তার। সরাসরি আমি কখনো তার চিকিৎসা করিনি, তবে তার মুখ চিনতাম। ... মৃতদেহ প্রথমে খুঁজে পায় গোয়ালা। দুধ দিতে এসে সে দেখে গতবারের রেখে যাওয়া বোতলভাঙ্গা- নিশ্চয়ই বেড়ালের কাজ- দুধ গড়াচ্ছে। তখন সেই লোক হাঁকডাক করে লোক জড়ো করে দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে দেখে মিঃ সিদ্দিকুর সিঁড়ির গোড়ায় মরে পড়ে আছে। নিশ্চয়ই বেচারার পা পিছলে গিয়েছিলো। ঘাড় ভেঙ্গে গেছে সাথে সাথেই। বেচারা পরে ছিলো স্লিপিং গাউন। "
আহমেদ শরীফ বললেন, " হুঁম। দেখা যাচ্ছে, - 'দুর্ঘটনা' হিসেবে এটা বড় বেশি সরল।"
-" ঠিক তাই।"
-"মৃতের আত্নীয়-স্বজন ?? "
-" ঐ এক দূরসম্পর্কের ভাগ্নে বোধহয়। রক্তের কিছু নয়। মাসে একবার মামাকে দেখতে আসতো সে। নামটা বোধহয়- আশরাফ হোসেন। সে নিজেও ডাক্তার। শহরের বাইরে নিশ্চিন্তপুরের দিকে বাসা বোধহয়। "
-" চাচার মৃত্যুতে সে কি ভেঙ্গে পড়েছে ?? "
-" উম্ম, এটা অবশ্য নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কী জানেন, ছোকরা মামাকে পছন্দ করতো ঠিকই- কিন্তু ভালোবাসতো নাকি বলতে পারি না। বয়সের তফাতের কারণে একটা দূরত্বতো ছিলোই..."
-" আপনি যখন মৃতদেহ পরীক্ষা করেছিলেন, তার ঠিক কতক্ষণ আগে উনি মারা গিয়েছিলেন বলুন তো ?? "
-" এই রে, গোয়েন্দামার্কা সওয়াল শুরু হলো বুঝি..." ডাঃ ইউনুস হাসলেন। " অন্ততঃ আটচল্লিশ ঘন্টা। তবে বাহাত্তর ঘন্টার বেশি নয়। তাকে এখানে আনা হয় ছয় তারিখ সকালে। কী জানেন, আমরা আসলে আরো অনেক বেশি নিশ্চিত। সিদ্দিকুর সাহেবের গাউনের পকেটে একটা চিঠি ছিলো। ভাগ্নে ডাঃ আশরাফ তিন তারিখে পাঠিয়েছিলো নিশ্চিন্তপুর থেকেই। চিঠির সাথের খাম থেকে পাওয়া তথ্যমতে সিদ্দিকুর সাহেব চিঠিটা পেয়েছেন তিন তারিখ রাত দশটা বিশে। তারমানে মৃত্যুটা হয়েছে রাত দশটা বিশের পর। পোস্টমর্টেমে পাকস্থলি থেকে পাওয়া তথ্যের সাথে এটা মিলে যায়। ভদ্রলোক মৃত্যুর দুঘন্টা আগে রাতের খাবার খেয়েছিলেন। পোস্টমর্টেম থেকে আমরা তাই মোটামুটি নিশ্চিত- মৃত্যু হয়েছে রাত এগারোটার দিকে।"
-" শেষ কবে তাকে জীবিত দেখা গেছে জানেন নাকি ?? "
-" এইতো, কাছেই দেখা গিয়েছিলো। তিন তারিখ রাত আটটার দিকে। ক্যাফে পাতিসেরিতে। বিষ্যুদবার। প্রতি বিষ্যুদবার রাতেই নাকি ভদ্রলোক ওখানে খেতে যেতেন। "
-" তার আর কোন আত্মীয় নেই নাকি ?? খালি ঐ ভাগ্নে ?? "
-" ওহ হ্যাঁ, ভুলেই গেছিলাম বলতে। ভদ্রলোকের এক পিঠাপিঠি ভাই ছিলেন। যা শুনলাম, বহু বছর আগেই তারা ঝগড়া করে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দিয়েছেন। সেই ভাই, রাজ্জাকুর রহমান - তার নাকি বিয়ে হয়েছিলো এক ধনী শিল্পপতির মেয়ের সাথে। বিয়ের পর রাজ্জাকুর সাহেব চাকরি ছেড়ে দেন। এই নিয়ে ঝগড়া হয় দুই ভাইয়ের, এরপর থেকে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। ব্যাপার কী জানেন, খুবই অদ্ভূত যে মৃত্যুটাও দুই ভাইয়ের একই দিনে। রাজ্জাক সাহেব বয়সে সামান্য বড় ছিলেন সিদ্দিক সাহেবের চেয়ে। উনি মারা গেছেন ঐ তিন তারিখেই, দুপুর তিনটায়। কী অদ্ভূত কাকতালীয় ব্যাপার, না ?? "
-" রাজ্জাক সাহেবের স্ত্রী বেঁচে আছেন নাকি ?? "
-" উহুঁ, বহু আগেই মারা গেছেন ভদ্রমহিলা। "
-" রাজ্জাক সাহেব থাকতেন কোথায় ?? "
-" উনি বোধহয় থাকতেন নতুনবাজারের দিকে। আমার তো আসলে জানবার কথা নয়- ডাঃ আশরাফই আমায় এগুলো বলেন লাশ নেবার সময়। বললেন- পরপর দুটো আঘাত, তিন তারিখ দুপুরে রাজ্জাক সাহেব মারা গেলেন আর এখন সিদ্দিক সাহেব। "
আহমেদ শরীফের নীরবতা দেখে ডাঃ ইউনুস কী বলবেন ভেবে পেলেন না। "আপনি কি কিছু সন্দেহ করছেন নাকি মিঃ শরীফ ?? আমি কিন্তু আপনার প্রশ্নের ধারা দেখে কিছুই বুঝতে পারলাম না। "
-" পা পিছলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু। খুব সরল ঘটনা। " ধীরে ধীরে বললেন গোয়েন্দা আহমেদ শরীফ। "আমার মনে যা আসছে- সেটিও খুব সরল। একটু সামান্য ধাক্কা- এই যা। "
-" মানে, মানে... খুন ?? এই অদ্ভূত সন্দেহের কারণ ?? " ডাঃইউনুসকে খুবই বিস্মিত দেখাচ্ছিলো।
-" উহুঁ, উহুঁ, সন্দেহ নয়। ... অনুমান মাত্র। "
-" যদি আপনি ভাগ্নেকে সন্দেহ করে থাকেন মিঃ শরীফ, বলতেই হচ্ছে- আপনার অনুমান ভুল। রাত সাড়ে আটটা থেকে বারোটা পর্যন্ত ডাঃ আশরাফ তাস খেলছিলেন তার বন্ধুদের সাথে - নিশ্চিন্তপুরে। তদন্তে পুলিশ এই জানতে পেরেছে। " বললেন ডাঃ ইউনুস।
-" হুঁম... নিশ্চিতভাবেই পুলিশ তথ্যটা যাচাই করেছে- এই বিষয়ে তারা খুবই সতর্ক।" বিড়বিড় করলেন গোয়েন্দাপ্রবর।-" আপনি নিশ্চয়ই ভাগ্নের সম্পর্কে কিছু পেয়েছেন মিঃ শরীফ। তাই নয় কি ?? "
-" মোটেই না, মোটেই না। আপনি বলার আগ পর্যন্ত আমি- এমনকি জানতামই না যে কোন ভাগ্নের অস্তিত্ব আছে। "
-" তবে ?? অন্য কাউকে সন্দেহ করছেন নাকি ?? "
-" তাও নয়।... কি জানেন ইউনুস সাহেব, মৃত্যুর পূর্বে একটা মানুষের সারাজীবনের অভ্যাসের হঠাৎ পরিবর্তনটাই আমায় ভাবিয়ে তুলছে। মাছ ঢাকতে শাকের পরিমানটা একটু বেশিই মনে হচ্ছে। "
-" কী বলছেন ভাই, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। "
গোয়েন্দা আহমেদ শরীফ হাসলেন। " আমায় পাগল ঠাওরাবেন হয়তো, কিন্তু ডাক্তার- আমি স্পষ্টঃ অনুভব করছি, মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। যা হোক, আপনি এতোটা সময় দিলেন- সে জন্যে কৃতজ্ঞ থাকলাম আপনার কাছে। "
আহমেদ শরীফ উঠে দাঁড়ালেন। বিদায় দেবার জন্যে এগিয়ে এলেন ডাঃ ইউনুসও। দরজার কাছে এসে ঘুরে দাঁড়ালেন গোয়েন্দা। "শেষ প্রশ্ন ডাক্তার, সিদ্দিকুর সাহেবের দাঁতের পাটি- সেটি কি আসল ছিলো, না নকল ?? "
-" না না, আসল !! ভদ্রলোক নিশ্চয়ই দাঁতজোড়ার খুব যত্ন নিতেন। এই বয়েসে দাঁতের অমন চমৎকার অবস্থা সচরাচর দেখা যায় না। "
-" তাহলে আপনি বলছেন, ভদ্রলোক তার দাঁতের নিয়মিত যত্ন নিতেন ?? ঝকঝকে দাঁত ছিলো তার, কেমন ?? "
-" একদম। বিষয়টা আমার খুব স্পষ্টঃ স্মরণ আছে। কারণ শেষ বয়েসে দাঁত সামান্য হলদেটে হয়ে যায়- কিন্তু সিদ্দিকুর সাহেবের দাঁতজোড়া ছিলো ঝকঝকে সাদা। আমার মনে হয় না তিনি ধূমপান করতেন- অবশ্য যদি এটাই আপনি জানতে চেয়ে থাকেন। "
-" ঠিক এটা আমার উদ্দেশ্য ছিলো না ডাক্তার। একটা ঢিল ছুঁড়লাম আর কি অন্ধকারে- মনে হয় লেগে যাবে। ... শুভরাত্রি ডাঃ ইউনুস। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। " গোয়েন্দা আহমেদ শরীফ বেরিয়ে এলেন।
-" এবার, " রাস্তায় নেমে বললেন তিনি- "দেখতে হবে ঢিলের টুকরা জায়গামত পড়েছে কি না.........."
(please wait for next part)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now