বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বিশ্বাসের অন্তরালে

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X “বিশ্বাসের অন্তরালে” -এ.টি. নূর শেখ লিটা -আচ্ছা আমরা যাচ্ছিটা কোথায়?” গত চল্লিশ মিনিটের মাঝে একই প্রশ্ন এই নিয়ে ক্রিস তিনবার করে ফেলেছে। কিন্তু ডেভিডের বরাবর একই উত্তর-“উফ! তুমি বড্ড বেশি অধৈয্য ক্রিস। যদি বলেই দেই তবে সারপ্রাইজটা আর থাকছে কিভাবে?” -“হুমম… সেটাও ঠিক কিন্তু তুমি তো জানই তোমার প্রতিটা বিষয়েই আমি কতটা অধৈয্য এবং কতটা গভীরভাবে আগ্রহী।” -“ওহ প্রিয়া! আমার প্রিয়তমা ক্রিস! সেটা আমি জানি এবং বেশ ভালো করে জানি বলেই তোমাকে এতটা ভালো্বাসি। আর তুমি কিনা এই আমাকে বিশ্বাসই করো না!” যেন অনেকটা শ্রাগ করার মত করেই বলে ডেভিড। -“আহা! তুমি এভাবে কেন ভাবছ? তোমাকে বিশ্বাস করি বলেই তো এই মাঝরাত্রিতে, সবকিছুকে তুচ্ছ করে চলে এসেছি তোমার কাছে।” প্রতিউত্তরে ক্রিসের বিশ্বাসটাকে অবিশ্বাসের মতই হাত দিয়ে উড়িয়ে দেয় ডেভিড। ক্রিস ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আনমনেই বলে উঠে-“তুমি শুধু শুধুই আমাদের সময়টাকে মাটি করতে চাইছ। আমিতো কেবল বলতে চাইছিলাম, তোমার কি মনে হয়না আমরা শহর ছেড়ে বেশ নির্জন পথের দিকেই এগিয়ে চলেছি? আর তাছাড়া…” এবার ডেভিড ক্রিসকে ওর কথা শেষ করতে না দিয়েই সজোড়ে এমনভাবে ব্রেক কষল যে ক্রিস রীতিমত হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও কোনমতে বাঁচিয়ে নিল নিজেকে। আর ডেভিড স্টিয়ারিং হুইলের উপর হাত দু’টো রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে থেকেই থমথমে গলায় বলে-“এতই যদি অবিশ্বাস তবে এলে কেন? ভালোবাসার মিথ্যে অভিনয় ভালই শিখেছ দেখছি। আর বিষয়গুলোও তো কমনই। লং ড্রাইভেই তো নিয়ে এসেছিলাম তোমাকে আর একটা সারপ্রাইজ… প্রপোজই তো করতে চাইছিলাম তোমায় আর তুমি…! ঠিক আছে থাকো তোমার অবিশ্বাস নিয়ে। আমি এখনই পৌঁছে দেব তোমায় এয়ারপোর্টে।” ডেভিড খুব রেগে গেছে বুঝতে পেরেই এবং পরিস্থিতিটাকে স্বাভাবিক করতেই ক্রিস ওর কন্ঠে সমস্ত কোমলতাকে উজাড় করে আদুরে ভঙ্গিতে বলে-“ওহ ডেভিড! বেইবি তুমি রাগলে কতটা চমৎকার লাগে তোমায়… আর তুমি শুধু শুধুই আমাকে ভুল বুঝ। কোথায় যাচ্ছি তা কেবল জানতে চাইছিলাম কারন তোমার সারপ্রাইজটা পাওয়ার জন্য আর তর সইছিল না আমার। সত্যি বলছি তোমার সঙ্গটা দারুন উপভোগ করছি আমি ডেভিড। বিশ্বাস করো প্রিয়।” ক্রিসের কথায় এবার ডেভিডের মুখের কঠিন ভাবটা অনেকটাই শিথীল হয়ে আসে। অবশ্য এইসব বিষয় ওর কাছে নতুন কিছু নয়। মেয়েদের কিভাবে পটাতে হয়, কিভাবে ওদের শিকার বানাতে হয়, এসব ব্যাপারে ডেভিড নেহাতই পাক্কা শিকারী ছাড়া আর কিছুই নয়! ‘সারপ্রাইজের জন্যে তর সইছে না তোমার সোনামণি, এমনই সারপ্রাইজ দেব তোমায় যা তুমি ইহজীবনেও ভুলতে পারবে না!’ কুৎসিত চিন্তাটা ভাবনায় আসতেই মনে মনে বিশ্রীভাবে একগাল হেসে নেয় ডেভিড। তারপর ক্রিসের দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। পুনরায় প্রায় নির্জন রাস্তায় এগিয়ে চলে ডেভিডের ফেরারী। সরু রাস্তার দু’পাশের ঘন গাছ-গাছালী ক্রমশই পিছিয়ে যেতে থাকে আর কেবল মাঝে মাঝে দু’ একটা ট্রাক কি প্রাইভেটকার বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ছুটে যায়। এবং তারই দিকে ইঙ্গিত করে ডেভিড বলে-“তুমি এ ব্যাপারে কিন্তু পুরোপুরি সঠিক ছিলে না ক্রিস। পথটা কিন্তু এখনও যথার্থভাবে নির্জন নয় ঠিক যেমনটা আমি চাইছি।” ডেভিডের কথায় এবার ঝট করে তাকায় ক্রিস ওর দিকে এবং দেখতে পায় ডেভিডের লোভাতুর চোখ দু’টো চিকচিক করছে...! দুইঃ ক্রিসের সাথে ডেভিডের পরিচয় একটা সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। সেদিন, আনুমানিক একটা নাগাদ ক্লান্ত ডেভিড হোম ওয়ার্ক শেষ করে যখন ফেইসবুকে লগ ইন করল, ও দেখতে পেল ক্রিশ্চিয়ানা পেরী নামের অসম্ভব রকমের রুপবতী একটা মেয়ে ওকে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়েছে। খুশিতে ডগমগ করতে থাকা ডেভিড আর একটা মুহূর্ত দেরী না করে তার বন্ধুত্বের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘুরে আসে ক্রিসের প্রোফাইল থেকে। ক্রিসের প্রতিটা ছবি যখন ও দেখতে থাকে, মনে মনে সংকল্প করে নেয় ডেভিড যে এই মেয়েকে ওর চাই-ই চাই। এবং সেটা যেভাবেই হোক না কেন! এরপর সময় এগিয়ে চলে। প্রথমে হাই হ্যালো দিয়ে শুরু হলেও ওদের সম্পর্কে বন্ধুত্ব নামক একটা নতুন মাত্রা যোগ হয়। এবং ধীরে ধীরে সেই বন্ধুত্ব গাঢ় হতে হতে এগিয়ে চলে আরও একধাপ। কিন্তু যতই সময় বাড়তে থাকে ক্রিসের প্রতি ডেভিডের মোহ ক্রমশ বেড়েই চলে। ডেভিড পাগল হয়ে যায় এবং বুঝতে পারে, ক্রিস কেবল দেখতেই রুপবতী তা নয় বরং সেই সাথে চমৎকার ব্যাক্তিত্বের অধকারীও বটে। কিন্তু ডেভিডকে আর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়না যখন ক্রিস নিজ থেকেই ওকে জানায় যে এ বছরই সামারের ছুটিতে ক্রিস ডেভিডের সাথে লং ড্রাইভে যেতে ইচ্ছুক এবং ও আশা করে ডেভিড নিজে ওকে সমস্ত আয়ারল্যান্ড ঘুরিয়ে দেখাবে। এটা যেন ডেভিডের কাছে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি মনে হয়। মনে মনে ডেভিড এটা ভেবে খুশিই হয় যে ক্রিস ওদের স্কুলে পড়ছে না নয়ত অমন একটা মেয়েকে বাগে পেতে ডেভিডের একটু বেশি বেগ পেতে হত বইকি! কেননা স্কুলে ‘প্লেয়ার বয়’ নামে খ্যাত ডেভিডের চরিত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রায় সকলেরই জানা। আর এমতাবস্থায় একই স্কুলের হলে হয়ত ক্রিসকে এত সহজেই হাত করতে পারত না ও। সেই থেকেই ওদের এই চার মাসের সম্পর্কে ওরা একে অপরের বিষয়ে কেবল বলা বিষয়টুকুই জেনে নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাক্তিগতভাবে কেউ কাউকেই চিনে উঠতে পারেনি। এত আনন্দিত ডেভিড হয়ত ঘুণাক্ষরেও ভেবে দেখেনি ওদের এই একত্রে ছুটি কাটানোর সুযোগটার অপেক্ষা ক্রিস হয়ত ওর চাইতেও কতটা গভীরভাবে করছিল! তিনঃ প্রায় নির্জন সরু পথ ধরে শোঁ শোঁ শব্দ তুলে এগিয়ে চলছে ডেভিডের রুপালী ফেরারী। ভিতরে চলছে আমেরিকান জ্যাজ কিন্তু সেটাতে কাউকেই মনোযোগী বলে মনে হল না। দু’জনের মাঝের গুমোট নিরবতা দূর করতেই যেন, ক্রিস ডানহাতে স্টেরিওটা বন্ধ করে ধীর শান্ত গলায় বলে-“তারপর ডেভিড, তুমি কি কখনই ভেবেছিলে তোমার সাথে আমার এতটা সহজেই দেখা হতে পারে!? আমার কাছে কিন্তু এটাকে এখনও কল্পনাই মনে হচ্ছে।” প্রতিউত্তরে ডেভিড মুখে কিছুই বলে না বরং মনে মনে এটা ভেবে বিশ্রীভাবে হেসে উঠে যে-কিছু সময়পর এটাকে কল্পনা নয় ক্রিস, দুঃস্বপ্ন বলে মনে হবে! -“কি হল ডেভিড? দেখ, এভাবে নীরব থেকে কিন্তু জার্নিটাকে ঠিকভাবে এনজয় করা যাচ্ছে না। তারচেয়ে বরং একটা খেলা খেললে কেমন হয়?” এবার ডেভিড ক্রিসের প্রস্তাবে আড়চোখে একবার ওকে দেখে নিয়ে বলে-“কি খেলা?” -“ট্রুথ অর ডেয়ার। এতে আমাদের জার্নিটাও বোরিং হবেনা এবং আমরা নিজেদের বিষয়েও অনেক কিছু জানতে পারব। কি বলো?” ক্রিসের কথায় দমকে আসা হাসিটকে ভেতরেই আটকে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতেই ডেভিড মনে মনে ভাবে, ‘শুনেছি সুন্দরী মেয়েরা একটু বোকা হয়, কথাটা তুমি দেখি সত্যিই প্রমাণ করে দিলে ক্রিস। এখন ট্রুথ অর ডেয়ার খেলে তুমি আমার সত্যতা জানতে চাইছ! নট বেড সুইটহার্ট। কিন্তু এখন সত্য জেনে তুমি আর কি’বা করতে পারবে প্রিয়তমা, কে তোমাকে বাঁচাতে আসবে এই নির্জন অরণ্যে?!’ -“ট্রুথ অর ডেয়ার! অবশ্যই, এটা মজার একটা খেলা। অসাধারন হবে, এমনিতেই একে অপরকে জানার খুব কম সময়ই পেয়েছি আমরা। তবে আর দেরি কেন? চলো শুরু করা যাক তবে প্রথম প্রশ্ন করার সুযোগটা কিন্তু আমি তোমাকেই দিচ্ছি। ইউ নো লেডিস ফার্স্ট!” ক্রিস মৃদু হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে-“ঠিক আছে। তোমার জন্যে আমার প্রথম প্রশ্ন। তবে বলো, পৃথিবীতে এমন কি কাজ আছে যেটা তুমি সবচেয়ে ভালো পারো এবং তোমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় অথবা তুমি করতে ভালোবাস?” -“অবশ্যই ফ্লার্ট! হাহা... ক্রিস সত্যের খেলায় নিঃসংকচে সত্যই বললাম। আশা করি ঘাবড়ে যাবে না তুমি!” -“উঁহু, মোটেই নয় বরং এর মাধ্যমে আমরা নিজেদের বিষয়ে আরো সুস্পষ্ট ধারণা নিতে পারব। তুমি নিশ্চয় জানো, কোন বইকেই তার প্রচ্ছদ দেখে জাজ করাটা ঠিক নয়! আমাদের অনেক ক্ষমতা-দুর্বলতা কিন্তু এখনও একে অপরের নিকট অজানা রয়ে আছে।” ক্রিসের ঠোঁটে বিদ্রূপের হাসি। ডেভিড একবার দেখে নেয় ক্রিসকে। এই মেয়েটাকে ও যতই দেখছে ততই অবাক করে চলছে ওকে।–“ডেভিড এবার কিন্তু তোমার পালা!” -“অবশ্যই। তো ক্রিস বলো, আমার পূর্বে কি তোমার জীবনে আর কোন পুরুষের আবির্ভাব হয়েছিল?” -“হ্যাঁ” ক্রিসের নির্লিপ্ত উত্তর। যদিও কথাটায় ডেভিডের খারাপ লাগার কথা নয় কেননা ক্রিস ওর কাছে কেবলই একটা সাচ্চা শিকার ছাড়া আর কিছুই নয় তবুও ডেভিডের ভিতরে যেন কেমন করে উঠে। তবুও ও কন্ঠটাকে স্বাভাবিক রেখেই বলে-“তো ক্রিস, কে সেই ভাগ্যবান সুপুরুষ! আমি কি তা জানতে পারি?” -“অবশ্যই, কেন নয়! তবে প্রশ্ন করার সুযোগ তুমি পাবে কিন্তু এবার আমার পালা। বুঝতেই পারছ।” ক্রিসের চোখ দু’টো জ্বলজ্বল করে উঠে। -“অবশ্যই। অবশ্যই। ইউ মে প্রসিড ম্যাম।” -“তবে ডেভিড আমাকে বলো, আমার আগে জুলিয়াই কি তোমার লাস্ট শিকার ছিল যাকে তুমি আর তোমার সো কলড ফ্রেন্ড ম্যাক মিলে... মেরে ফেলে এসেছিলে ম্যাকদের পরিত্যাক্ত বাগানবাড়ির পিছনে?” ক্রিসের কথায় এবার যেন বেশ বড় রকমেরই একটা ধাক্কা খায় ডেভিড। সবিস্ময়ে গাড়ি থামিয়েই ও অবিশ্বাসের চোখে তাকায় ক্রিসের দিকে। ও ভাবে, জুলিয়ার খবর নিশ্চয় জানার কথা নয় ক্রিসের। ঐ প্রতিবন্ধী মেয়েটার সাথে ঘটে যাওয়া বিষয়গুলো তো ম্যাক ছাড়া আর কারই জানার কথা নয়। তবে...! সব গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে ডেভিডের কাছে। এসির মাঝে থেকেও ও ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে যায়। ওর এই অবস্থা দেখে উচ্চস্বরে হেসে উঠে ক্রিস আর ওর এই হাসি সেই নির্জন পথেই যেন প্রতিধ্বন্বিত হয়ে ফিরে আসে, যেটাকে ঠিক পার্থিব বলে মনে হয়না ডেভিডের কাছে। ও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে-“তুমি... তুমি... তুমি কে?!” প্রতিউত্তরে ক্রিস হাসতে হাসতেই বলে-“এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর হলো না সুইটহার্ট! আরে আরে, ঘামছ কেন?! এই একটা প্রশ্নেই এই কি হাল করছ তুমি নিজের, এখনো তো কতকিছু বলার বাকি, জানার বাকি। ন্যান্সি, ডায়েনা, রেগানদের কথা তো আমি এখনও শুরুই করিনি!” বিদ্রূপের হাসি হেসে ক্রিস টিস্যুর প্যাকেটটা ডেভিডের দিকে এগিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলে-“অহ! এই কি হাল করেছ তুমি তোমার ডেভিড! এ অবস্থায় এখন তুমি কি করে ড্রাইভ করবে? তারচেয়ে বরং উঠে এসো। দেখ, তুমি কিন্তু এখনও প্রকৃতঅর্থেই নির্জন পথ খুঁজে পেলে না, তবে চিন্তা করো না আমি কিন্তু এরচেয়েও অনেক নির্জন, শান্ত, নিরিবিলি পথ চিনি। সুতরাং তুমি আমাকে কেন ড্রাইভ করতে দিচ্ছ না ডেভিড?” কঠিন শান্ত সেই ক্রিসের কন্ঠে কিছু একটা যেন ছিল যা ডেভিড চেষ্টা করেও প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। ও উঠে এসে ড্রাইভিং সিটটা ছেড়ে দেয় ক্রিসের জন্য। ক্রিস গাড়ি স্টার্ট দেয়। প্রচন্ড গতীতে চারপাশের গাছগুলো কেবল ক্রমশ পিছিয়ে পড়ে আর ডেভিডের হৃদপিন্ডে তখনও ক্রমাগত ড্রাম বেজে চলেছে। চারঃ ক্রিস একবার আড়চোখে ডেভিডকে দেখে নিয়ে সামনে তাকিয়েই বলে-“হুমম... বুঝতে পারছি তোমার মাথায় এখন জ্যাম হয়ে আছে। হয়ত নিউরনগুলোও কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তবে অবশ্যই এটা ভেবে অস্থির হয়ো না যে আমি তোমার বিষয়ে এতকিছু কি করে জানলাম। সবটাই আমাকে ‘ও’ জানিয়েছে। ওহ! আর একটা কথা, এই ও-টা যে কে সেটা ভেবে আবার অযথাই ব্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করো না যেন এখন। অপেক্ষা করো, ধীরে ধীরে সমস্তটাই জানতে পারবে। তবে শুধু বলব, আমার উপর তুমি কোন ক্ষোভ রেখো না কেননা তোমার সাথে সত্যিই আমার কোন প্রকারের ব্যাক্তিগত শত্রুতা নেই। সমস্তটাই আমি করতে বাধ্য হয়েছি অথবা হচ্ছি ওর কারনে। অবশ্য এটা ভেবে নিও না যে ও আমাকে দিয়ে জোড় করে করিয়ে নিচ্ছে এসব। এখানে আমারও মতামত ছিল। আরো সহজভাবে বলতে গেলে, এটাকে একটা চুক্তিও মনে করে নিতে পারো।” ক্রিস একটা মুহূর্ত সময় নেয়। ডেভিডকে এখন ওর কাছে খাঁচায় বন্ধী হয়ে যাওয়া একটা ভীত পাখির মতই মনে হচ্ছে। আর ডেভিড নিজেকে এখন সে করুণা ভিক্ষারত মেয়েদের জায়গায় দেখতে পাচ্ছে। ডেভিডের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই যেন ক্রিস উচ্চস্বরে হেসে উঠে আর হাসতে হাসতেই বলে-“যাই বল না কেন, এই কাজটা কিন্তু আমার প্রথম নয় তবে এবারই যেন আমার কারো জন্যে, তোমার জন্যে মোটেও করুণা হচ্ছে না। অথচ অদ্ভুত বিষয়টা দেখ, তুমি আমাকে ট্রাপে ফেলতে গিয়ে নিজেই ট্রাপে আটকে গেলে! আহহালে...!” আফসোসের ভঙ্গিতে ক্রিস চুকচুক শব্দ করে উঠে। -“কেন করছ তুমি এমন? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। মানছি, আমি ভুল করেছি কিন্তু তুমিই’বা এতকিছু জানলে কি করে?! আর কার কথাই’বা বলছিলে তখন, কে সে?” -“ওহ! চুপ করো। একসাথে এতগুলো প্রশ্ন? এখন কিন্তু তুমিই অধৈর্য হয়ে যাচ্ছ ডেভিড!” -“হায় ঈশ্বর! ডেভিড, এভাবে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকো না। বলছি তবে শোন, তখন তুমি জানতে চেয়েছিলে না কে সেই ভাগ্যবান সুপুরুষ যার আবির্ভাব হয়েছিল আমার জীবনে অথবা এখনও আছে। সেই হচ্ছে রিচার্ড। আমার জীবনের প্রথম কেউ, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম এবং যেখানে কোন পরিমাণ খাঁদ ছিল না। হ্যাঁ, রিচার্ডের পরেও অনেকেই এসেছিল ঠিক কিন্তু বিশ্বাস করো ভালো তো কেবল আমি রিচার্ডকেই বেসেছিলাম। আর বাকি সবাই তো ছিল তোমার মত, রিচার্ডের সাথে আমার সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার খোঁড়াকমাত্র! এছাড়া আর কিছুই নয়।” উত্তেজনায় ক্রিসের গলাটা সামান্য কেঁপে উঠে। ও একবার ডেভিডকে দেখে নিয়ে পুনরায় বলে-“আক্ষেপ করো না ডেভিড, আমিও করিনি। আমি বুঝে নিয়েছি ক্ষুধার কাছে তো সবকিছুই তুচ্ছ, খেয়ে অস্তিত্বটা টিকিয়ে রাখাটাই যেখানে মুখ্য! তুমি কি জানো রিচার্ডের মাঝেই আমার সমস্ত ক্ষমতা-দুর্বলতা নিহিত। আমিও কি কখনও ভেবে নিয়েছিলাম যে এমনটাও কখনো ঘটতে পারে আমার জীবনে! খুব ছোটবেলায় বাবা মরে যাওয়ার পর আমার মা যখন আমাকে একা এতিমখানায় ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, বলতে পারো ভেগে যায় আমারই বাবার তথাকথিত বন্ধুর সাথে, ভাবতে পারো কেমন ছিলাম আমি! আমার পরিস্থিতিটা তখন? বিশ্বাস করো আমি নিজেকে সেভাবেই গুছিয়ে নিয়েছিলাম। নিয়তিকেও মেনে নিয়েছিলাম হয়ত আর ভালোবাসা! অসম্ভব যন্ত্রণায় জর্জরিত আমার জীবনে সে সম্পর্কেও তো আমার জ্ঞান ছিল প্রায় শুন্যের কোঠায়। তবে যতদিন না আমার পরিচয় হয় রিচার্ডের সাথে। রিচার্ড, সেই প্রথম একটা নাম যা আমার হৃদপিন্ডে আঘাত হানে সবিস্ময়ে, আর আমার শ্বাসক্রিয়া সচল এবং নিশ্চল করে দিতে পারত একই সময়! কি অদ্ভুত সুন্দর ছিল রিচার্ডের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। প্রথম প্রথম কারো হাত ধরে হেঁটে চলা বহুদূর অথবা ভালোবাসার বাণীগুলোকে ক্রমাগত আওড়ানোর সেই মুহূর্তগুলো! আমার সমস্ত ভুবনটাই যেন হয়ে গিয়েছিল রিচার্ডময়। ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও যেন বেঁচে থাকাটা অসম্ভব হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য! জানই তো একজনকে বাহ্যিক দিক থেকে দেখে কখনই তুমি তার ভেতর সম্পর্কে জেনে নিতে পারবে না। এমনকি তার সম্পর্কে পুরোপুরি সঠিক একটা অনুমানও দাঁড় করাতে পারবে না। তোমার সকল বিশ্বস্ততাই কিন্তু এক পর্যায়ে এসে অবিশ্বাসে পরিণত হতে পারে, কে বলতে পারে আসলে!” ক্রিস এক মুহূর্ত সময় নেয় কিন্তু আগত বিষাদটাকে গ্রাহ্য না করে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার তাকায় ডেভিডের দিকে। ডেভিডের চোখ দু’টো ছানাবড়া হয়ে আছে। -“আমি কিন্তু গিয়েছিলাম রিচার্ডের সাথে, যখন চারপাশকে অন্ধকারের হাতে তুলে দিয়ে ডুবে গিয়েছিল সূর্য্যিমামা। তখন, আমরা বেড়িয়েছিলাম নৌকাভ্রমণে। আর যখন পৌঁছেছিলাম মাঝপথে, সেখান থেকে একজনের আর্তচিৎকারও কিন্তু কারো কানে পৌঁছানোর কথা নয়!” -“মানে কি? চুপ হয়ে গেলে কেন, তারপর কি হল?” উত্তেজনায় কাঁপছে ডেভিডের কন্ঠস্বর। -“তারপরের পর্ব জানার হঠ্যাৎ এত আগ্রহ তোমার মাঝে কেন জন্মাল ডেভিড? শুনে খুব মজা পাচ্ছ বুঝি?! অবশ্য তোমার কাছ থেকে এর বেশি কিবা আশা করা যায়!” খেঁকিয়ে উঠে ক্রিস। “যত নষ্ট মন-মানসিকতা। বলছি, নেমে পড়। আমরা পৌঁছে গেছি।” ক্রিস কন্ঠটাকে স্বাভাবিক রেখেই বলে কিন্তু ওর কথায়, ওর চোখের দৃষ্টির মাঝে অশুভ কিছু একটা যেন ছিল যার জন্য এটাকে ডেভিডের কাছে এটাকে একটা আদেশের মতই মনে হয়। ডেভিড আর কথা না বাড়িয়ে নেমে আসে গাড়ি থেকে। চারপাশে একবার চোখ বুলায়। অন্ধকারচ্ছন্ন গভীর ঘন জঙ্গল দু’পাশে আর মাঝের সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কেবল ওরা দুইজন। এমনই নির্জন পরিবেশ চেয়েছিল ডেভিড কিছু সময় আগেও সত্যি কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবে কি গলা ছেড়ে ও একটা আর্তচিৎকার দিবে! দিয়ে দেখবে কেউ আসে কিনা সাহায্যের জন্য?! কিন্তু চিন্তাটা মাথায় আসতেই বড্ড ছেলেমানুষ মনে হয় ডেভিডের কারন এটা অজানা নয় এই গভীর রাতের অন্ধকারে চিৎকারটা ঘুরেফিরে কেবল ওর কাছেই ফিরে আসবে আর ক্রিস! ও নিশ্চয় মজা লুটবে কুৎসিত হেসে। নাহ! আর ভাবতে পারে না ডেভিড। ওর ভেতরটা জ্বলে যায় রাগে-ভয়ে-ক্ষোভে। এই সময়টাতে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হয় ওর। ওর বিগত কৃতকর্মের জন্য মনে মনে অনেক অনুতপ্তও হয় কিন্তু এখন হয়ত দেরি হয়ে গেছে অনেক সবকিছুর জন্য। “ওহ! হ্যালো মিস্টার প্লে-বয়! ওহ! স্যরি স্যরি। মিস্টার রোমিও!” শব্দ করে হেসে উঠে ক্রিস আর সেই হাসির দমকেই ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে ডেভিড। আর ওর কিম্ভূতকিমাকার হয়ে থাকা অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে ক্রিস আফসোসের ভঙ্গিতে চুকচুক শব্দ করে উঠে কিন্তু কন্ঠস্বরে কঠোরতা ধরে রেখেই বলে-“ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে সময় অপচয় করনা, অনুসরন কর আমাকে। আমাদের হাতে সময় এমনিতেই খুব কম। ওকে আর অপেক্ষা করাতে পারছি না।” বলেই ঘুড়ে দাঁড়ায় ক্রিস এবং পুনরায় ডেভিডের দিকে তাকিয়ে বলে-“এন্ড রিমেম্বার, ডোন্ট ট্রাই টু টেইক এনি সিলি স্টেপস!” ক্রিস এগিয়ে যায় ডানদিকের গভীর ঘন জঙ্গল লক্ষ্য করে আর কোন উপায়ান্তু না দেখে ডেভিড বাধ্য হয় ওকে অনুসরন করতে। এবং যখন ওরা জঙ্গলের কিছুটা গভীরে পৌছায়, ওরা বুঝতে পারে এখানে সবকিছুই নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা নেই বরং চাঁদের আলোয় সবকিছু থকথক করছে। জঙ্গলের গভীরে, অনেকটা গভীরে গিয়ে ক্রিস থমকে দাঁড়ায় এবং ধীরে ধীরে ঘুরে তাকায় ডেভিডের দিকে। আর সেই ঘন জঙ্গলে, ডেভিডের প্রশ্নবোধক অসহায় দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে ক্রিস বলে-“ডেভিড, আমি পূর্বের মত এখনো বলছি তোমার সাথে আমার সত্যিই কোন প্রকারের ব্যাক্তিগত শত্রুতা নেই কিন্তু যা কিছু তোমার সাথে হতে যাচ্ছে এবং যা কিছু ঘটবে তার জন্য আমার উপর কোন আক্ষেপ না রাখারই অনুরোধটুকুই কেবল আমি করতে পারি।” ক্রিস একটা মুহূর্ত থামে এবং গভীরভাবে নিঃশ্বাস নিয়ে পুনরায় বলে-“তোমার মাথায় হয়ত এই মুহূর্তে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। হয়ত ভেবে পাচ্ছ না আমি কে, কি আমার প্রকৃত পরিচয় এবং কেন আমি তোমার সাথে এমন আচরণ করছি অথবা কেন আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। বিষয়গুলো তুমি জানতে চাইতেই পারো এবং আমি তোমাকে জানাতে চাই কারন তোমার চিন্তা-ভাবনা নিকৃষ্ট হতে পারে কিন্তু জানার অধিকার সবারই থাকে!” ক্রিস একটা মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে এবং পুনরায় চোখ তুলে তাকায় চাঁদের দিকে। এর রূপালী সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। “রিচার্ডের চলে আসার সময় হয়ে এসেছে কিন্তু তার আগেই আমি তোমাকে বলতে চাই। ওহ, হ্যাঁ! এখন মনে পড়েছে, আমি কি রিচার্ডের সাথে আমার সম্পর্কের কথা শেষ করিনি তখন!? বলিনি তোমাকে? সেটা ঠিক আছে, তবে এখন শোনো। সেটা একটা অসাধারণ এবং অপূর্ব সময় ছিল আমার জন্য। ছিল এমনই জ্যোৎস্নাময় রাত আর সেই রূপালী আলোয় নদীর মাঝপথের নৌকাটিতে ছিলাম কেবল আমি আর রিচার্ড। কতটা আনন্দের সময় ছিল সেটা তাই কি ভাবছ! কিন্তু এরপরের সময়গুলো মোটেও সুখকর ছিল না। কারন সেই রাতেই আমি আবিষ্কার করেছিলাম রিচার্ডকে নতুনরূপে, ভয়ানক এবং ওর প্রকৃতরূপে!” কথাগুলো বলতে গিয়ে ক্রিস কেঁপে উঠে এবং কন্ঠস্বরটাও যেন ওর বুজে আসে। “সেই রাতেই আমি জানতে পারি, যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, আমার ভিতরের সমস্ত বিশ্বাস নিয়ে যাকে আমি প্রত্যাশা করেছিলাম, যার কথায়-যার মাঝে আমি নির্ভরতা খুঁজে পেতাম, তার সমস্তটাই ছিক ধোঁকা, অভিনয়! আমার অবশ্য তখন এমনই মনে হয়েছিল। যে কারোই মনে হতে পারে। এটাই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, যখন তুমি জানবে যাকে তুমি ভালোবাস, যাকে নিয়ে তুমি স্বপ্ন দেখ সমস্ত জীবনটা কাটিয়ে দেওয়ার, তার তো পার্থিব জগতের সাথে প্রকৃতঅর্থে কোন সম্পর্কই নেই। তার অস্তিত্ব তো পৃথিবীর চিরায়ত নিয়মের মাঝেই পড়ে না। সে’তো কেবল রাতের অন্ধকারের এক বিস্ময়কর বাস্তবতা! দিনের সূর্যালোকের মাঝে কফিনে ঘুমিয়ে থাকা একটা দানব! হ্যাঁ, এটাই ছিল সে রাত যখন আমি প্রথম জানতে পারি রিচার্ডের পরিচয় তো আর কিছু নয় বরং ও একটা ভ্যাম্পায়ার…!” ক্রিস পুনরায় থামে এবং দু’হাতের তালুতে মুখ ঢেকে রাখে কিছুটা সময়। অন্যদিকে ডেভিডের কাছে এখন সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারছে না কিছুই। হাজারটা প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু আর কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে নিশ্চুপ ক্রিসের দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা করেই ফেলে ডেভিড-“কিন্তু ক্রিস, এসব কথা তুমি আমাকে কেন বলছ? এ ঘটনার সাথে আমাকে এখানে ধরে রাখার মাঝে কি সম্পর্ক থাকতে পারে? এক মিনিট অপেক্ষা করো, রিচার্ড তো আবার তোমাকে ওর মত… বানিয়ে…! ইশ্বরের দোহাই চুপ করে থেকো না ক্রিস কথা বলো।” উত্তেজনায় কেঁপে উঠে ডেভিডের গলা। -“আছে, সম্পর্ক অবশ্যই আছে নয়ত আজ আর আমাকে এখানে খুঁজে পেতে না। তোমার কি মনে হয় একটা ক্ষুধার্ত শিকারী তার শিকারকে এতটা কাছে পেয়েও কোন কারন ছাড়াই এমনি এমনি চলে যেতে দিত?!” প্রশ্নটা ডেভিডের দিকে ছুঁড়ে দিয়েই ক্রিস ধীরে ধীরে মুখ থেকে হাত নামিয়ে আনে এবং বলতে থাকে-“সে রাতে প্রথম যখন আমি জানতে পারি রিচার্ড আসলে ভ্যাম্পায়ার এবং এরই সাথে জানতে পারি আমার সাথে ওর সম্পর্কে জড়ানোর প্রকৃত কারন, তখন প্রাণের ভয়ে একটা মুহূর্তের জন্য আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম যেন। আর তুমি তো জেনেই থাকবে, ব্যাক্তি মাত্রই নিজেকে ভালোবাসে। একজন মানুষ দিনে যতবারই আত্মহত্যার কথা স্মরণ করুক না কেন, মৃত্যু সন্যিকটে এলে একটা মুহূর্তের জন্য সে যে বেঁচে থাকতে চাইবে না, একথা তুমি নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। এবং আমিও তাদের ব্যাতিক্রম ছিলাম না। আর যখন বুঝতে পারছিলাম এটাই আমার জীবনের শেষ সময় হতে পারে, আমি উদ্ভ্রান্তের মত হয়ে গিয়েছিলাম। প্রাণভিক্ষা ওর কাছে এমনভাবেই চাইছিলাম অথবা ওর হৃদয়শূন্য ভিতরেও আমার জন্যে কখনো হয়ত কোন অনুভূতি অঙ্কুরিত হয়েছিল। ও আমাকে ছেড়ে দেয় এবং দেয় বেঁচে থাকার একটা সুযোগ কিন্তু এরমাঝেই ও জুড়ে দেয় শর্ত। এটা তো সত্যিই দুনিয়াতে কোনকিছুই ফ্রিতে পাওয়া যায় না। রক্তপিপাসু রিচার্ড আমাকে শর্ত দেয়, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে, আমার জীবনের পরিবর্তে ওর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাকে নিতে হবে! আমাকে তিন মাস অন্তর অন্তর ওর হয়ে ওর জন্য শিকারের ব্যাবস্থা করে দিতে হবে। যেটা আমি আজ দু’বছর যাবত করে চলেছি এবং হয়ত করে যেতে হবে। কিন্তু বিশ্বাস করো শুরুতে এটা আমাকে অনেক যন্ত্রণা দিত, কষ্ট দিত। আমাকে পুড়তে হত প্রতিনিয়ত বিবেকের দহনে। কিন্তু এখন আর নয় কারন আমি শিকার হিসেবে বেঁছে নেই তোমার মত দূষিত কীটগুলোকে। আর জানই তো জীবনে কৃতকর্মের ফল এক পর্যায়ে ভোগ করতেই হয়। তাই যেতে যেতে তোমার পাপেপূর্ণ জীবনের পরিবর্তে একটা পুণ্য করে যেতে পারছ অন্যের খাদ্য বনে, অন্যের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কারন হয়ে, এটা ভেবে নিয়ে অন্তত আক্ষেপ রেখো না…!” -“অবশেষে তুমি এসেছ! এই এতদিনে সময় হল তোমার আসার?!” শেষ্মাজড়িত কাঁপা একটা ভাঙা কন্ঠস্বর লক্ষ্য করে ক্রিস এবং ডেভিড দু’জনেই তাকায় সামনের দিকে। সেখানে ওরা দেখতে পায় কালোরঙা লং ওভারকোট পরিহিত এক বৃদ্ধকে। কিন্তু তাকে দেখেই ক্রিস রীতিমত দৌড়ে এগিয়ে যায় তার দিকে এবং বলে-“হায় ঈশ্বর! এই কি হাল হয়েছে তোমার রিচার্ড! তুমি এতটা… বুড়িয়ে গেছ কিভাবে?!” -“এই প্রস্ন তুমি আমাকে করছ বোকা মেয়ে! তোমার কি কথা ছিল, ভুলে গেছ? আজ কত মাস হতে চলল আমি ক্ষুধার্ত। তুমি কি জানো না নিরামিষ আর আমিষের মাঝের পার্থক্য?!” খেঁকিয়ে উঠে বৃদ্ধ। “একসময় তো আমি ভেবেই নিয়েছিলাম তুমি আমাকে ধোঁকা দিচ্ছ।” পরক্ষণেই কন্ঠটাকে নরম করে বলে রিচার্ড। -“দুঃখিত আমি… কিন্তু তুমি কি সত্যিই এটা ভেবে নিয়েছিলে! তুমি তো জানতে কাজটা মোটেও আমার জন্য সহজ ছিল না করা।” অনেকটা শ্রাগ করার মত করেই বলে ক্রিস। -“আমি জানি কিন্তু বুঝই তো আমি অনেক ক্ষুধার্ত ছিলাম প্রিয়া।” শান্তনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে রিচার্ড। “আক্ষেপ রেখে তুমি বরং আজকের চাঁদটাকে দেখ। এটা অপূর্ব, তাই কি নয়! সমস্ত জঙ্গলটাই যেন ভেসে যাচ্ছে এর রূপালী মায়ায়। জঙ্গলের শেষ প্রান্তে, ঐদিকটায় একটা নদী আছে। তুমি কি নদীর বুকে চাঁদের সৌন্দর্য অবলোকন করতে চাও ক্রিস? তবে তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রিয়া। সুতরাং তুমি কি এখানেই অপেক্ষা করবে অথবা…… কারন বুঝোই তো সামনে রাখা খাবারকে বেশি সময় আমি অপেক্ষা করাতে পছন্দ করি না!” -“না না। আমি ঠিক আছি। তুমি বরং চালিয়ে যাও।” এই মুহূর্তটা ক্রিসের কাছে সবসময়ই বিব্রতকর। -“ঠিক আছে। তবে তুমি অপেক্ষা করো অথবা এগিয়ে যেতে থাকো। আমি আসছি নতুনরূপে, আমাকে যে রূপে প্রথম দেখেছিলে। যে রূপে আমাকে দেখতে তুমি বরাবরই ভালোবাস!” রিচার্ড হাসে আর ক্রিসও ওর দিকে তাকিয়ে সম্মতির হাসি হেসে সামনে এগিয়ে যায়। এক ধরণের দায়বদ্ধতা ওর মাঝে কাজ করে যখন ও শেষবারের মত পিছে থেকে শুনতে পায় ডেভিডের শেষ আর্তচিৎকার। ও নিজেকে শান্তনা দেয়। ও জানে রিচার্ড এখনি ফিরে আসবে ওর আগের রূপ নিয়ে এবং এটাতে ওর মননিবেশ করা উচিত। নিজেকে বোঝায় ক্রিস। পরবর্তীতেও কাজটা ওকে করতে হবে যেভাবে ও করছে এবং করে আসছে এতদিন যাবত সুতরাং এখানে মন খারাপ করে রাখাটা অযৌক্তিক যেখানে বাধ্যতা নিশ্চিত। নিজেকে শান্তনা দিতে থাকে ক্রিস এবং রিচার্ড চলে আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আপন মনেই বিড়বির করে চলে- বেঁচে থাকাটাই সত্য! বেঁচে থাকাটাই সত্য! বেঁচে থাকাটাই সত্য!!


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৯১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now