বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একেবারেই ভিন্নতর একটি লেখা- চিন্তিতভাবে বলল পোয়রো। ‘আমি শপথ নিয়ে বলতেপারি এখানে মিস্টার মার্শের ব্যক্তিত্বের কোনো আলামত খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু এই বাড়িতে বাইরের আর কে আসতে পারে? আসতে পাওে শুধুমাত্র মিস মার্শ। আর আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে এই যুবতীও তার বড় কাকার মতো গুছিয়ে সব কাজ করে থাকে। তার প্রতিটি কাজেই কোনো না কোনো একটা যুক্তির ছাপ থাকাই প্রাসঙ্গিক বটে।’
ইতোমধ্যে ঘণ্টার শব্দের উত্তরে মিস্টার বেকার এসে দাঁড়িয়েছিল সেখানে।
-শোনো বেকার তোমার স্ত্রীকে একটু আসতে বলবে? আমাদের কয়েটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তোমাদের।
বেকার চলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে মিসেস বেকার ভেজা হাত অ্যাপ্রোনে মুছতে মুছতে তার স্বামীর সঙ্গে ঘরে ঢুকল। সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট কয়েকটি বাক্যে পোয়রো তার উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে দিল তাদের। সঙ্গে সঙ্গে বেকাররা সহানুভূতি দেখাল।
-মিস ভায়োলেট তার এক্তিয়ারের বাইরে কিছু করতে চাইলে আমরা সেটা মানতে রাজি নই- স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন মিসেস বেকার। ‘তা করলে আমাদের পক্ষে কাজ করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।’
পোয়রো তার পরবর্তী প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। তার বুঝতে বাকি রইল না উইলের সাক্ষী দেয়ার কথা হুবহু মনে রেখেছে মিস্টার এবং মিসেস বেকার। বৃদ্ধ মার্শের নির্দেশেই পার্শ্ববর্তী শহর থেকে দুটি ছাপানো উইলের ফর্ম নিয়ে আসে মিস্টার বেকার।
– দুটি কেন? তীক্ষস্বরে জিজ্ঞেস করল পোয়রো।
-আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। আমার মনে হয়, সচেতনতার কারণেই হবে হয়তো। একটি ফর্ম যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাই তিনি আরো একটি বাড়তি ফরম আনিয়েছিলেন। তবে প্রথমে আমরা একটা উইলেই সই করেছিলাম
-সেটা ঠিক কোন সময়ে?
মাথা চুলকিয়ে বেকার বোধহয় সময়টা আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার স্ত্রী খুব তড়িঘড়ি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে।
-আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বেলা এগারোটা নাগাদ হবে। কোকো তৈরি করার জন্য স্টোভের ওপর তখন দুধ চাপিয়েছিলাম। তোমার মনে নেই? -স্বামীর দিকে ফিরে সে বলতে থাকে ‘রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে দেখি স্টোভের ওপর সমস্ত দুধ তখন তাপে একেবারে শুকিয়ে তলানিতে ঠেকেছিল।’
-আর তারপর?
-এর প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আবার আমাদের যেতে হয়েছিল মিস্টার মার্শের স্টাডিরুমে। আমাদের বৃদ্ধ মালিক তখন বলেন, ‘আমি একটা ভুল করে ফেলেছি, তাই আগের উইলটা ছিড়ে ফেলতে হলো। তোমাদের আবার সই করার জন্য কষ্ট দিচ্ছি’- আর তার কথামতো আমরা আবার সই করলাম। তারপর তিনি সামান্য কিছু টাকা দিলেন আমাদের উভয়কেই। ‘আমার সই করা উইলে আমি তোমাদের কিছুই দিয়ে যাইনি’।
তিনি বললেন ‘তবে আমি যখন থাকব না, প্রতি বছর তোমরা সবাই এর ভালো ফলাফল পাবে।’ এবং আমরা নিশ্চিত যে, সত্যি সত্যি তিনি তার লেখা উইলে তাই করে গেছেন।
তাদের দিকে তাকিয়ে পোয়রো জিজ্ঞেস করলেন, ‘দ্বিতীয়বার তোমরা সই করলে, তারপর মিস্টার মার্শ কি করলেন? সে বিষয়ে কিছু কি জানো তোমরা?’
-গ্রামের একটা বই এর দোকানে চলে গিয়েছিলেন তিনি।
সেটা তেমন কোনো ধর্তব্য বিষয় নয়, তাই আর একটা কৌশল খাটালেন পোয়রো। ডেস্কের চাবিটা হাতে নিয়ে সেই খামটা তাদের সামনে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি ‘দ্যাখো তো এই হাতের লেখাটি কি তোমাদের মনিবের?’
আমি সেরকম কিছু একটাই আন্দাজ করেছিলাম এবং কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই জবাবে বেকার বলে উঠল ‘হ্যাঁ স্যার, এটা তারই হাতের লেখা।’
মিথ্যে বলেছে সে আমি ভাবলাম। কিন্তু কেন? কেন সে মিথ্যে বলতে গেল?
-আচ্ছা তোমাদের মনিব কি এ বাড়িটা ভাড়া দিয়েছিলেন? মানে গত তিন বছরে এখানে কোনো আগন্তুক এসেছিল?
-না স্যার।
-কোনো অতিথিও আসেনি?
-শুধুমাত্র মিস ভায়োলেট এসেছেন।
-কোনো আগন্তুক এই ঘরে প্রবেশ করেনি?
-না স্যার।
-জিম, তুমি বোধহয় মিস্ত্রিদের কথা ভুলে গেছ- তার স্ত্রী তাকে স্মরণ করিয়ে দিল।
-মিস্ত্রি? -মিসেস বেকারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল পোয়রো। ‘কি ধরনের মিস্ত্রি?’
ভদ্রমহিলা এবার খুলে বলে, প্রায় আড়াই বছর আগে কিছু মেরামতি কাজের জন্য কয়েকজন রাজমিস্ত্রি এ বাড়িতে এসেছিল। ঠিক কি ধরনের মেরামতির কাজ সেটা সঠিকভাবে বলতে পারল না সে। তবে তার ধারণা সম্পূর্ণ বিষয়টিই ছিল তার মনিবের খামখেয়ালিপনার অংশ। সারাটি সময় জুড়ে তারা স্টাডিরুমের ভিতরেই ছিল। কিন্তু তারা সে সময় ঠিক কি ধরনের কাজ করছিল সেটা জানা যায়নি। কারণ কাজ চলার সময় মালিক তাদের ঘরে ঢুকতে দেয়নি এবং এ বিষয়ে কিছু বলেওনি। যে প্রতিষ্ঠান থেকে মিস্ত্রিদের পাঠানো হয়েছিল তার নামটা এখন আর স্মরণ করতে পারছে না তারা। তবে এটুকু তারা বলতে পারে যে, তারা এসেছিল প্লিমাউথ থেকে।
বেকার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে পর পোয়রো তার হাত ঘষতে ঘষতে বললেন, ‘হেস্টিংস, মনে হয় আমরা খানিকটা দূর এগিয়েছি। আপনমনে রুটির কারিগরদের মতো হাত রগড়াতে রগড়াতে তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন।’ একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তিনি অবশ্যই তার দ্বিতীয় উইল লিখে গিয়েছেন এবং উইলটাকে একটা গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে রাখবার জন্য প্লিমাউথ থেকে রাজমিস্ত্রি আনিয়েছিলেন। অতএব এই ঘরের মেঝে কিংবা দেয়ালে খোঁড়াখুঁড়ি করে অহেতুক সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। আমরা বরং প্লিমাউথ যাব, সেই সব মিস্ত্রিদের খোঁজ করে দেখব।
একেবারে অল্প খাটুনিতেই আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে গেলাম। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেয়ার পরেই এমন একটা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেলাম। মিস্টার মার্শ তাদেরই কাজে নিয়েছিলেন।
তাদের সকল কর্র্মচারীরাই অনেক দিন ধরে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটিতে। মিস্টার মার্শের নির্দেশে যে দুইজন মিস্ত্রি কাজে গিয়েছিল তাদের সন্ধান খুব সহজেই পাওয়া গেল। সেদিনের কাজটা তারা হুবহু মনে করতে পারল। অন্য আরো সব ছোটখাটো কাজের মধ্যে পুরনো কেতার ফায়ারপ্লেসের একটা ইট সরিয়ে তার নিচে একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গ তৈরি করে দিয়েছিল তারা। ইটটা এমন ভাবে কেটে বের করা হয়েছিল যে সেটা জোড়া লাগানোর পর দাগটা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল। দ্বিতীয় ইটের শেষ প্রান্তে চাপ দিলেই সম্পূর্ণ বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। বিষয়টি ছিল বেশ জটিল আর এই রকম কাজে বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ছিলেন অত্যান্ত করিৎকর্মা। আমাদের তথ্যদাতা লোকটির নাম ছিল কোঘান। বিরাট লম্বা চওড়া মানুষ, পুরু একজোড়া গোঁফে তাকে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষ বলেই মনে হচ্ছিল।
বহুগুণ উদ্যম নিয়ে আমরা ফিরে এলাম ক্লাবট্রি জমিদার বাড়িতে। স্টাডিরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে আমরাদের নতুন অর্জিত জ্ঞানটিকে প্রয়োগ করতে এগিয়ে গেলাম। ইটগুলোর ওপর কোনো ধরনের চিহ্নই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মিস্ত্রি ভদ্রলোকটির নির্দেশনা অনুসারে একটা ইটের ওপর চাপ দিতেই আলগোছে একটা গভীর গর্ত বেরিয়ে এলো।
অতি উৎসাহী পোয়রো সেই গর্তের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। হঠাৎ তার মুখটা গম্ভীর ও অন্ধকার হয়ে গেল। তার হাতে যে জিনিসটা ঠেকল সেটা একটা দুমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের খণ্ডিতাংশ মাত্র। এছাড়া সেই গর্তটা ছিল একেবারেই শূন্য।
-সর্বনাশ! -ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলেন পোয়রো। ‘আমাদের আগে অবশ্যই কোনো ব্যক্তি এই গুপ্ত স্থানের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে’।
অতিশয় উদ্বিগ্ন অবস্থায় সেই কাগজের টুকরোটি আমরা পরীক্ষা করে দেখলাম। আমরা যেটা অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছিলাম এটা তারই একটি ছেড়া অংশ মাত্র। সেই কাগজের ছেড়া অংশটিতে বেকারের সই এর একটা অংশ চোখে পড়ল কিন্তু সেই উইলের কোনো রকম ভাষ্য তাতে পাওয়া গেল না।
পোয়রোর তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। উত্তেজনা সামাল দিতে তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন। আমরা যদি সেই পরিস্থিতিটা মোকবিলা করতে না পারতাম তাহলে তার মুখের অভিব্যক্তি রীতিমতো কৌতুককর হয়ে উঠত। ‘আমি এটা বুঝতে পারছি না।’ রাগে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন তিনি। ‘কে বা কারা এটা ধ্বংস করল? আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কি ছিল?’
-বেকার পরিবার? আমি আমরার অভিমতের কথা বললাম তাকে।
-উইলে তাদের কারোরই জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা ছিল না। জায়গাটা যদি একটি হাসপাতালের সম্পত্তি হয়ে যেতো তাহলে সে ক্ষেত্রে মিস মার্শের পাশেই তাদের থাকা উচিত। কিন্তু উইলটা ধ্বংস করে ফেলার মতো সুযোগ কারই বা হতে পারে?
-সম্ভবত বৃদ্ধ মানুষটির মনের ইচ্ছা বদলে যাওয়ার ফলে নিজেই সেই উইলটা নষ্ট করে ফেলেন তিনি। আমার অনুমানের কথা বললাম তাকে।
-হাঁটু ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন পোয়রো।
-‘হতে পারে’ স্বীকার করলেন পোয়রো। হেস্টিংস, তোমার কথাটিতে বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে। তাহলে এখন এখানে আমাদের করণীয় আর কিছইু নেই। মরণশীল মানুষেরা যেসব কাজ করতে পারে আমরা তার সবই করেছি। মৃত অ্যান্ড্রু মার্শের প্রতি আমরা আমাদের চিন্তাভাবনা সফলতার সঙ্গে ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পেরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাময়িক সাফল্যের ক্ষেত্রে তার ভাইঝি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।
তখনই আমরা চটজলদি একটি গাড়িতে চড়ে স্টেশনে চলে এলাম। সাথে সাথেই লন্ডনের ট্রেনটা আমরা পেয়ে গেলাম। তবে ওটা দ্রুতগামী কোনো ট্রেন ছিল না। পোয়রোকে বিষণœ এবং অতৃপ্ত দেখা যাচ্ছিল। আমি নিজে তখন অত্যন্ত ক্লান্ত দেহে কামরার এক কোণে পড়ে রইলাম। ট্রেনটি তখন সবেমাত্র টনটন স্টেশন ছেড়ে যেতে উদ্যত এমন সময় আচমকা তীক্ষèস্বরে চেচিয়ে উঠল পোয়রো।
-চলো হেস্টিংস জলদি ট্রেন থেকে লাফাও ! জলদি লাফ দাও!
ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই আমি নিজেকে প্লাটফরমের ওপর খালি পায়ে আবিষ্কার করলাম। আমাদের থলে বোঁচকাগুলো নিয়ে ট্রেনটি রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল। আমি তখন খুব ক্ষেপে গেছি। কিন্তু পোয়রোর সে দিকে কোনো মনোযোগ নেই।
-আমি গণ্ডমূর্খ হয়ে গেছি! -চিৎকার করে উঠল সে, ‘তিনগুণ গণ্ডমূর্খ! আমি আর কখনোই আমার বুদ্ধিমত্তার বড়াই করতে পারবো না।’
-যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। কিন্তু এসব কি হচ্ছে বলতে পারেন?- রাগত স্বরে আমি বলে ফেললাম।
পোয়রো যখন তার আপন ভাবনায় মশগুল থাকে তখন আর অন্য কোনো দিকে তার ভ্রƒক্ষেপ থাকে না। এখনো সে আমাকে কোনো পাত্তাই দিল না।
-বইয়ের দোকানিদের বইগুলো- আমি সম্পূর্ণভাবেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, কিন্তু কোথায়? কোথায় সেই সব দোকানগুলো? কিছু মনে করো না, আমার ভুল হতেই পারে না। তাই এক্ষুনি আমাদের ফিরতেই হবে।
বলা যতখানি সহজ করে দেখানো ততটা সহজ নয়। আমরা এক্সেটার যাওয়ার জন্য একটা ধীরগতির ট্রেন পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করল পোয়রো। কাক ডাকা ভোরে আমরা ক্যাবট্রি জমিদার বাড়িতে এসে হাজির হলাম। সাত সকালে আমাদের দেখে হতভম্ব হয়ে থাকা বেকারদের আমরা পার হয়ে এলাম। কোনো দিকে ভ্রƒক্ষেপ না করেই লম্বা পা ফেলে সোজা স্টাডিরুমে গিয়ে ঢুকল পোয়রো।
-বন্ধু আগে তোমাকে বলেছিলাম আমি বোকা ভীষণ বোকা অতুলনীয় বোকা- না আমি তিনগুণ বোকা নই তারও বেশি ছত্রিশগুণ। মন্তব্যটা সে নিজের থেকেই করল। ‘এখন দেখতে পাচ্ছো!’
সোজা ডেস্কের কাছে গিয়ে চাবিটা তুলে নিল সে তার হাতের চাবি থেকে খামটা আলাদা করে ফেললেন। বোকার মতো আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই ছোট্ট একটি খামের ভেতর থেকে কি করেই বা অত বড় একটা উইলের ফর্ম খুঁজে পাব? অতি যতেœর সঙ্গে খামের মুখটা কাটলেন তিনি। তারপর লাইটার জ্বেলে আগুনের শিখার ওপর খোলা খামটা এমন করে তুলে ধরলেন যেন সেটা পুড়ে না যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা একটা করে সবগুলো লেখা ফুটে উঠতে থাকলো।
-দেখ বন্ধু দেখো! উল্লাসে ফেটে পড়লেন পোয়রো।
তার কথা অনুসরণ করে আমি চোখ রাখলাম সেই কাগজটার ওপর। কতকগুলো অস্পষ্ট শব্দাবলীতে লেখা উইলের শর্তগুলো। সংক্ষেপে যার অর্থ হলো মিস্টার মার্শ তার সব বিষয় সম্পত্তি তার ভাইঝি ভায়োলেট মার্শকে দান করে গেছেন। তারিখ লেখা রয়েছে ২৫ মার্চ দ্বিপ্রহর সাড়ে বারোটা। সেই উইলের সাক্ষী ছিল অ্যালবার্ট পাইক নামের এক কনফেকশনার ও জেসি পাইক নামের বিবাহিতা এক ভদ্রমহিলা।
-কিন্তু বিষয়টি কি আইন সম্মত? আমি আমতা আমতা করে বলে উঠলাম।
-আমি যতদূর জানি অদৃশ্য কালিতে কেই উইল লিখলে সেটা কখনো আইনবিরুদ্ধ হয় না। অতত্রব এর থেকে বৃদ্ধ মিস্টার মার্শের ইচ্ছাটা এখন খুবই স্পষ্ট এবং এর থেকে নির্দিষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে তার সব বিষয় সম্পত্তি ও অর্থের অধিকারিণী হলেন তার একমাত্র জীবিত আত্মীয়া। তার এই কাজের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তার দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিলেন এই দ্বিতীয় উইলটার খোঁজ অনেকেই করবে এবং তারা সকলেই তার ভাইঝির প্রতিপক্ষ। তাই সেইসব ব্যক্তিরা তার উইলের বক্তব্য যাতে জানতে না পারে এজন্যই তিনি অদৃশ্য কালি দিয়ে দ্বিতীয় উইলে তার শেষ ইচ্ছাটা লিখে রেখে যান। তিনি দুটি ছাপানো উইল ফর্ম আনিয়েছিলেন এবং গৃহকর্মীদের দিয়ে দুইবার সই করিয়ে নেন সাক্ষী হিসেবে। তারপর সেই নোংরা খামের ভেতরে রাখা অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা দ্বিতীয় উইলটা নিজেই লেখেন তিনি। কোনো একটা অজুহাতে উইলটিতে নিজের স্বাক্ষরের নিচে কনফেকশনার এবং তার স্ত্রীকে দিয়ে যৌথভাবে সই করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর তিনি সেটা একটা খামে ঢুকিয়ে এই ডেস্কে রেখে দেন ভবিষ্যতের জন্য। বলাবাহুল্য মিস মার্শ এই উইলটি সাদরে গ্রহন করবে বলে তার বিশ্বাস ছিল।
-মিস মার্শ কিন্তু উইলটির সন্ধান পাননি! বৃদ্ধ মার্শের ধারণা ছিল মিস মার্শ যদি সহজেই তার দ্বিতীয় উইলের সন্ধান পেয়ে যায়, তাহলে সে তার উচ্চশিক্ষার পেছনে অনেক টাকা খরচ করে ফেলবে। যাই হোক মিস মার্শ সেই উইলের সন্ধান পাননি, পেয়েছেন কি?- আমি ধীরে ধীরে বললাম, ‘তাই আবার বলছি এটা অনৈতিক। তবে বৃদ্ধ মার্শ এক্ষেত্রে সত্যি সত্যি জয়ীই হয়েছেন।’
-কিন্তু না হেস্টিংস, এটা তোমার বোধশক্তি যা ছাইয়ের সঙ্গে মিশে যাবে। তবে মিস মার্শের বোধশক্তি অনেক বেশি প্রখর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিজ্ঞজনদেরই কাজে নিয়োগ করতে হয়। তিনি এই হারানো উইলের কেসটা আমার হাতে তুলে দিয়ে তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ই দিয়েছেন। এর ফলে তিনি তার উচ্চশিক্ষার খরচ অনায়াসে চালিয়ে যেতে পারবেন। বড় কাকা অ্যান্ড্রু মার্শের অর্থের ওপর যে তার প্রকৃত অধিকার আছে, তিনি সেটা প্রমাণ করে দিলেন।
তবুও আমি অবাক হয়েছি। আমি অবাক হয়ে ভাবছি বৃদ্ধ অ্যান্ড্রু মার্শ আসলে কি ভেবেছিলেন????
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now