বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। তৃতীয় পর্ব ।। ২য় পর্বের পরে থেকে...
জ্বর এসে গেছে নূসরাতের। থেকে থেকে কাঁপছে, আর প্রলাপের মত বকছে। রাহেলা খাতুন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন। জহর শেখের সাথে কথা বলার আগেও পুরো সুস্থ ছিল মেয়েটা। আধ ঘন্টার মধ্যেই শরীর কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসে গেছে। বুলবুল সাহেবের ওপর সামান্য রেগেছেন উনি। সেটা প্রকাশ করছেন না। বুলবুল সাহেব মেয়ের মাথার কাছে বসে পানি ঢালছেন। গম্ভীর হয়ে আছেন।
রাহেলা খাতুন দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে এখন। শান্ত আসেনি এখনো। মেয়ের পাশে এসে বসলেন। স্বামীর হাত থেকে প্লাস্টিকের মগটা নিয়ে পানি ঢালতে লাগলেন। নূসরাত বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছে- বোঝা যাচ্ছে না। চোখের পাতার নিচে ঘন ঘন চোখের মণি নড়ছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে এখন।
“জহর শেখ চলে গেছে?” শান্ত কন্ঠে বললেন রাহেলা খাতুন।
“হ্যাঁ।”
“এতক্ষণ বসে কি করছিল লোকটা?”
“জানি না। একটা কাগজে কি সব হিসাব নিকাশ করল। জিজ্ঞেস করলাম যখন, বলল মুদির দোকানে কত টাকা বাকি পরেছে সেটা হিসাব করছে।” শুঁকনো মুখে বললেন।
“এই লোকটা যে একটা বদ্ধ উন্মাদ – এটা কি তুমি বুঝতে পেরেছো?” তীক্ষ্ম স্বরে বলে উঠলেন রাহেলা খাতুন।
বুলবুল সাহেব জবাব দিলেন না। নিচ তলায় কলিং বেলের শব্দ হল। রাহেলা খাতুন উঠতে যাচ্ছিলেন, নিষেধ করলেন বুলবুল সাহেব, “আমি দেখছি।” উঠে চলে গেলেন দেখতে কে এল।
খানিক বাদেই নূসরাতের ঘরে এসে ঢুকল তেইশ চব্বিশ বছর বয়সী একটা ছেলে। গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। টি শার্ট গায়ে। বোনের মতই শুঁকনো শরীর শান্ত’র। চোখের নিচে কালি পরেছে। ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
“মা। আপার নাকি জ্বর?” বোনের দিকে এক নজর তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল শান্ত।
রাহেলা খাতুন কোনো কথা না বলে মগটা বালতিতে রেখে উঠে এলেন ছেলের সামনে। ঠাস করে বাম গালে একটা চড় দিলেন ছেলেকে। বুলবুল সাহেব মাত্র রূমে ঢুকেছিলেন। ঘটনাটা দেখে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
শান্ত গালে হাত দিয়ে বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে আছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। রাহেলা খাতুন আবার বিছানায় গিয়ে মেয়ের পাশে বসলেন, মগ দিয়ে পানি ঢালতে ঢালতে ঠান্ডা গলায় বললেন, “টেবিলে খাবার ঢেকে রাখা আছে। খেয়ে নিস। আর খাবার নষ্ট হলে অন্য গালটাও কাল সকালে ফাটিয়ে দেবো। সামনে থেকে যা এখন।”
নীরবে রূম থেকে বেরিয়ে গেল শান্ত। বুলবুল সাহেব অস্বস্তি ভরা মুখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন। ছেলে মেয়েগুলোকে মানুষ করার জন্য শাসন জিনিসটা এতদিন তিনিই করে এসেছিলেন। এখন আর করেন না। স্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়েছেন সব। বাধা দেন না স্ত্রীকে শাসনের ক্ষেত্রে। কিন্তু আজকে হঠাৎ কেমন যেন লাগল। কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ হয়ে গেলেন। পায়ের ভার বদল করলেন কেবল। নিজের অতি শাসনের ফসল বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে পা ভেঙ্গে। মেয়েকে জোর করে বিয়েটা তিনিই দিয়েছিলেন। এখন তাই আর সন্তানদের শাসন করতে যান না তিনি। গুটিয়ে ফেলেছেন নিজেকে এসব থেকে।
নূসরাত চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ম্লান হাসি হাসল, দূর্বল গলায় বলল, “মা, তুমি যে কবে এসব মারধোর বন্ধ করবে…..”
তীব্র গলায় জবাব দিলেন রাহেলা, “এটা আমেরিকা না, যে ষোল পেড়ুলো আর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কোনো শাসন বারণ নেই। এটা বাংলাদেশ, এখানে যতক্ষণ না থাপ্পড় মারবি- ছেলে মেয়েরা সোজা হবে না। আদর করবি, ঐ ছেলে মেয়ে বড় হয়ে কষ্ট দিবে। এই দেশে শাসন দেখাতে হয়। আর আদরটা আড়ালে লুকিয়ে রাখতে হয়। না হলে সন্তান মানুষ হয় না।”
নূসরাত চোখ মেলে তাকাল। অবাক হয়ে দেখল রাহেলা খাতুন কাঁদছেন। একটা মানুষ চোখে পানি নিয়ে এতটা কঠিন গলায় কথা কলেন কি করে? মা ছাড়া বোধ হয় আর কেউ এটা পারে না। চোখ বন্ধ করে ফেলল নূসরাত। কাঁদুক। রাহেলা খাতুনের সন্তানের প্রতি মমতা আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে – এটা দেখতে চায় না নূসরাত। প্রতিটা মানুষের চিরন্তন রূপ দেখতে অভ্যস্ত আমরা। তাতে ব্যতিক্রম হলে হিসাবে গড়মিল লেগে যায়। আমরা গড়মিল পছন্দ করি না।
মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল নূসরাতের। শীত শীত লাগছে খুব। গায়ে কাঁথা দেয়া তবুও শীতটা একে বারে হাড়ের ভেতর গিয়ে লাগছে। জ্বর বেড়েছে নাকি বাহিরে ঠান্ডা বেড়েছে বুঝতে পারলো না। কারেন্ট নেই। ডিম লাইট জ্বলছে না। বাহিরে বোধ হয় তার টার ছিঁড়ে গেছে ঝড়ের চোটে। এখানে একটু বাতাস হলেই তার ছিঁড়ে যায়। রাহেলা খাতুন হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, সলতে নামিয়ে প্রায় নিভু নিভু করে রাখা। কেবল হাল্কা নীলাভ হলুদ একটা আগুণ। সেই আলোতেই পুরো ঘরটা আস্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছে। কেমন ভ্যাপসা, শ্যাওলা পঁচা হাল্কা একটা গন্ধ নাকে আসছে। অবাক লাগল নূসরাতের। ঘরের ভেতর বাতাস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খোলা জানালা দিয়ে কোনো বাতাসই আসছে না। সারা ঘর জুড়ে অদ্ভূত চাপা একটা ঘ্রাণ, মিষ্টি মিষ্টি একটা আভা। মশারীর ভেতর এক কাঁত হয়ে শুয়ে আছে নূসরাত। ওর কেন যেন মনে হল মশারীর বাহিরে কিছু একটা ঘুরে বেরাচ্ছে! পাঁক খাচ্ছে বিছানাটাকে মাঝখানে রেখে! ঘাড়ের কাছটায় শিরশির করে উঠল ওর। কেমন যেন অসুস্থ লাগতে শুরু করেছে। আবছা অন্ধকারের মাঝেও বুঝতে পারছে জিনিসটা মানুষ না, তবুও কাঁপা গলায় বলল, “ক-কে? শান্ত? মা?”
অন্ধকারের মাঝে ধীরে ধীরে জিনিসিটার অবয়ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্রমশ। কালো একটা কুকুর। চোখগুলো হলুদ রঙের। ধক ধক করে জ্বলছে……..
নূসরাত অনূভব করল ওর সারা শরীর হঠাৎ করে প্রচন্ড গরম হয়ে উঠেছে। যেন শরীরের সমস্ত রক্ত পাগল হয়ে এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়ে পালাচ্ছে! হৃদস্পন্দন দ্রুত বাড়ছে কেবল। নিজের অজান্তেই জান্তব একটা ভয় এসে ভর করা শুরু করেছে ওর ভেতর। নড়তেও ভুলে গেছে একদম।
কুকুরটা ওর খাটটাকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে ধীর গতিতে। সেই সঙ্গে আরো একটা জিনিসের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে নূসরাত। কুকুরটার সঙ্গে সঙ্গে ওর মশারীর চারপাশে কুয়াশা ধরণের সাদা ধোঁয়ার মত কিছু একটা ঘুরছে খুব ধীরে ধীরে। ফিসফিসানো একটা কন্ঠস্বর ভেসে আসছে কুয়াশার মত জিনিসটার দিক থেকে……
নূসরাত বোবায় ধরা মানুষের মত গোঙ্গাচ্ছে প্রচন্ড ভয়ে…..
ফিসফিসানো কন্ঠটা ক্রমশ স্পষ্ট আর তীব্র হচ্ছে।
“ গভীর নিশীথে জাগিয়া উঠিয়া সহসা দেখিবি কাছে,
আড়ষ্ট কঠিন মৃতদেহ মোর তোর পাশে শুয়ে আছে…..”
নূসরাতের হৃদপিন্ডটা পাগলের মত লাফাচ্ছে বুকের ভেতর। ও জানে ও পাগল হয়ে যাচ্ছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে……
ধীরে ধীরে পাশ ফিরে তাকালো নুসরাত নিজের অজান্তেই।
বিস্ফোরিত নেত্রে চেয়ে দেখল ওর পাশে ময়লা, মাটি মাখা- শ্যাওলা ধরা একটা কাফন প্যাঁচানো লাশ শুয়ে আছে! মুখটা খোলা কাফনের- মাথাটা তার দিকে ফেরানো! শুঁকিয়ে চামড়া কুঁচকে গেছে লাশটার। নীলচে বর্ণ ধারণ করেছে লাশের শরীরটা। মাটি লেগে আছে কপালে, ভ্রুঁ-তে, মুখটা অল্প ফাঁক করা, আধ খোলা চোখ- লাশটা আর কেউ না, অমিত!
তীব্র একটা ভ্যাপসা গন্ধ আসছে লাশটা থেকে। মাটি লেগে থাকা কপালে জ্বল জ্বল করে হলদে আগুণের মত করে জ্বলছে একটা চিহ্ন, মাত্রাহীন বর্ণ স্বরে ‘অ’-কে প্রথমবার প্রতিবিম্ব করে তারপর আবার স্বাভাবিক ভাবে পাশাপাশি সাজালে যেমন দেখায় – তেমন একটা চিহ্ন। ক্ষত চিহ্নের মত জ্বলছে। দেখে মনে হচ্ছে ওর শরীরের ভেতর লাভা দৌড়াচ্ছে, কপালের ক্ষত চিহ্নটা দিয়ে ভেতরের আগুনটা দেখা যাচ্ছে কেবল। অন্ধকারের মধ্যেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে অমিতকে। স্পন্দনহীন লাশটা ওর দিকে ফিরে রয়েছে কাফনের ভেতর থেকে! অদ্ভূত একটা হাসি ফুটে উঠেছে লাশটার ঠোঁটের কোনায়…..
নূসরাত টের পাচ্ছে ও জ্ঞান হারাচ্ছে…… তার মাঝ দিয়েই আবারও ফিসফিসানো কন্ঠটা শুনতে পেল –
“ ঘুমাবি যখন স্বপন দেখিবি, কেবলি দেখিবি মোরে
এই অনিমেষ তৃষাতুর আঁখি চাহিয়া দেখিছে তোরে…..”
কেন যেন মনে হল কন্ঠটা অমিতের লাশটার দিক থেকে আসছে….. জ্ঞান হারালো নূসরাত। অন্ধকারে ডুবে গেল ওর আবছায়ার জগৎটা।
(চলবে...)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now