বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
।। দ্বিতীয় পর্ব ।। ১ম পর্বের পর থেকে
“তোর ধারণা প্রত্যেকদিন ফুল গাছের চারা উপহার দিলেই তোর প্রেমে পড়ে যাবো?” গোলাপের চারাটা হাতে নিয়ে চোখ পাঁকালো নূসরাত।
সাইকেলটা থেকে নেমে ওটায় তালা লাগাতে লাগাতে অমিত কাঁধ নাচালো ঠোঁট উল্টে, “ডায়রেক্ট ফুল দেয়ার সাহস নেই, কারণ তোর মত মোহাম্মদ আলীর ফিমেল ভার্সন এই ভার্সিটির বহু ফ্রেজিয়ারের নাক ভেঙেছে। আমার এমনিতেই থ্যাবড়া নাক, পুরা ফ্ল্যাট করে ফেলার ইচ্ছা নেই। তাও দিলের ভেতর ‘বাইরাম বাইরাম’ করে বলে ফুল গাছ দেই। মোহাব্বত বলে কথা।”
“বাইরাম? এটা আবার কি রকম শব্দ? খারাপ কথা না বলতে নিষেধ করেছি তোকে?” কঠিন মুখে বলল।
“খারাপ কথা কোথায় পেলি? তোর তো কানের জায়গায় ফিল্টার বসানো থাকে- অচেনা শব্দ পেলেই ভাবিস খারাপ কথা বলা হয়েছে!” সোজা হয়ে বলল অমিত।
“মানে কি!”
“বুঝবি না। এটা ‘মামু ল্যাঙ্গুয়েজ’। তোর মত ‘কালিয়্যুগ কি সীতা’ টাইপের মেয়ের বোঝার দরকার নেই।” হাটতে লাগলো। ওর পেছন পেছন চারা গাছটা হাতে নিয়ে আসতে লাগল নূসরাত।
“মামু ল্যাঙ্গুয়েজটা কি?”
“তুই কি সাত সক্কাল বেলা আমার ভাইবা বোর্ড বসিয়েছিস?” বিরক্ত মুখে বলল অমিত ওর দিকে ফিরে।
শ্রাগ করল নূসরাত, “না, তা না। তবে মাঝে মাঝে এমন সব উদ্ভূট্টু শব্দ বলিস না যে কিছুই বুঝি না।”
“আমাকে বিয়ে করে ফেল, সব আন নোন শব্দের ওপর তখন সকাল বিকাল ক্লাস নেবো তোর।”
“যা ভাগ। তোর মত ছাগলকে বিয়ে করবো আমি? ঘর বাড়ি করেছিস? কোথায় নিয়ে তুলবি?”
“কেন? আমার বুকের ভেতর এত্ত বড় অ্যাপার্টম্যান্ট যে তোর জন্য বানিয়েছি- সেটাই তো যথেষ্ট। তুই, তোর বাচ্চা কাচ্চা, নাতি পুতি- সবাই থাকতে পারবে। একেবারে ফ্যামেলি সাইজ।” উদার গলায় বলল অমিত।
“ ওসব বলে লাভ নেই সোনা। আমার আব্বাজানের ভাইভাতে পাঁচ মিনিটেই রিজেক্ট হয়ে যাবি।”
“সমস্যা নেই তো। ভাল গুন্ডা আমি, এক কালে পাড়ায় ভাল নাম ডাক ছিল। তুলে এনে বিয়ে করে ফেলবো।”
“এত সাহস আছে নাকি?” চোখ মোটকে তাকালো নূসরাত।
“রাহুর প্রেমে পড়লে সাহসের আবার অভাব হয় নাকি?” নির্লিপ্ত গলায় বলল অমিত।
“ওফ হো! আবার রাহু? রবীন্দ্রনাথকে সামনে পেলে ওর নাকটা ভেঙ্গে দিতাম। কি সব ছাই পাশ লিখে গিয়ে তোর মাথা নষ্ট করে দিয়েছে বুড়ো ভামটা!”
উদাস মুখে অমিত আবৃতির সুরে বলে উঠল নূসরাতের দিকে ফিরে –
“ হেরো তমঘন মরুময়ি নিশা-
আমার পরান হারায়েছে দিশা,
অনন্ত ক্ষুধা অনন্ত তৃষা করিতেছে হাহাকার।
আজিকে যখন পেয়েছি রে তোরে
এ চিরযামিনী ছাড়িব কি করে,
এ ঘোর পিপাসা যুগযুগান্তে মিটিবে কি কভু আর!”
নূসরাত কঠিন মুখে নাকের পাটা ফুলিয়ে খানিক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ ফিক করে হেসে দিল।
“হাসছিস যে? হাসির কি বললাম?” অবাক গলায় বলল অমিত।
হাসতে হাসতে চোখে পানি এনে ফেলেছে, তবু হাসি থামছে না ওর, “তোর কবিতা শুনে হঠাৎ মনে হল বাংলা ছবিতে যদি মিশা সওদাগর নায়িকাকে তুলে আনার পর এভাবে রাহুর প্রেম আবৃতি করা শুরু করে লাস্ট দৃশ্যে এসে – কেমন দেখাবে!”
অমিত না হেসে একটা নিঃশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল, “তোর আম্মার ধারণা আমার মাথায় গন্ডোগোল আছে- তাঁর মেয়ের মাথা যে পুরাই আউলা সেটা বেচারি মনে হয় এখনো জানে না। হায় আফসুস!”
হাসি থামিয়ে ফেলল নূসরাত, “চড় খাবি একটা!”
“ডায়লগ চেইঞ্জ কর। পুরানা ডায়লগ দেখি সব মেয়েরাই মারে!” ভাবলেশহীন গলায় বলল অমিত। “ভেরিয়েশন আন।”
“বক্সিং দিয়ে নাক ভেঙ্গে ফেলবো। ঠিক আছে এটা?”
“এইবার ঠিক আছে।” একটা চেয়ার টেনে ভার্সিটির টং- এ বসে পরল অমিত, “মামা, কড়া একটা লিকার চা দেন, চিনি কম…..” ফিরে তাকাল নূসরাতের দিকে, “মোহাম্মদ আলীর মুড ঠিক থাকলে চায়ের অর্ডার দেয়া যায়?”
ওর পাশে বসে পড়ল, “যায়। কিন্তু দুধ চা। তোর মত ইঁদুর মারার বিষ খেতে পারবো না আমি।”
“ইউর উইশ ইজ আওয়ার মামু’স কমান্ড!” দাঁত বের করে হাসল অমিত। রঙ চা দেয়া হয়ে গেছে অমিতের। পিরিচে চা ঢেলে শব্দ করে খাওয়া শুরু করেছে। বিরক্ত চোখে ওর দিকে তাকাল নূসরাত। সেটা দেখে আরো জোরে শব্দ করে চা খাওয়া শুরু করল অমিত। থোরাই কেয়ার করে এমন চাহুনির!
শেষ ক্লাসটা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেল প্রায়। নূসরাত বারান্দায় বেরিয়ে এসে দেখে বাহিরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে, অন্ধকার হয়ে এসেছে প্রায় চারপাশ। ক্যাম্পাসের লাইট পোস্টের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এর মধ্যেই। মাগরিবের আযান শোনা যাচ্ছে ক্যাম্পাসের মসজিদ থেকে। মাথায় ওড়না দিল। আযানের সময় মাথায় ওড়না না দিলে রাহেলা খাতুন বকা ঝকা করেন খুব।
যারা যারা ছাতা এনেছে ওরা চলে গেল। যাদের গাড়ি আছে তারাও চলে গেছে অনেক আগেই। নূসরাত সহ দু-চার জন কেবল ওদের ভবনের নিচে কলপসিবল গেটের কাছে ইতস্তত ভাবে পায়চারি করছে। অপেক্ষা করছে বৃষ্টি থামার। মোবাইলে কথা বলছে কয়েকজন। বোধ হয় গাড়ি পাঠাতে বলছে কিংবা ছাতা নিয়ে আসতে বলছে।
নূসরাতের মোবাইল বন্ধ হয়ে আছে অনেক্ষণ হল। ক্লাসে হাত থেকে পড়ে গিয়েছিল। ভেতরে কিছু নষ্ট হয়ে গেছে মনে হয়, এত টেপাটিপির পরেও অন হচ্ছে না কিছুতেই। বিরক্ত লাগছে খুব। দেরি হলে মায়ের বকুনি খেতে হবে। অথচ বৃষ্টি থামার নামই নিচ্ছে না। এদিক ওদিক তাকাল, অমিত মনে হয় চলে গেছে। দেখা যাচ্ছে না কোথাও।
এক দৃষ্টিতে লাইট পোস্টের দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো হলুদ আলোতে আরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। খুব অদ্ভূত লাগছে দেখতে। পিচের রাস্তায় আছড়ে পড়ার কারণে রাস্তা থেকে দু হাত সমান উঁচু পর্যন্ত কুয়াশার মত সৃষ্টি হয়েছে। তার মাঝ দিয়ে টিনটিন বেল বাজিয়ে দু-একটা রিক্সা চলে যাচ্ছে। সব রিক্সাই ভরা, খালি নেই একটাও যে ডেকে থামাবে।
ঘুরে ফিরে অমিতের কথা মাথায় আসছে বার বার। সন্ধ্যা হয়ে যায় প্রায় দিনই ক্লাস করতে গিয়ে। ক্যাম্পাস একেবারে ফাঁকা হয়ে যায় তখন। দেখা যায় প্রতি দিনই অমিত এই সময়টায় ওর সঙ্গে হাটতে হাটতে কিছু একটা বলে হাসাহাসি করে। তারপরেই রাহুর প্রেম কবিতার একটা অংশ আবৃত্তি করে –
“ নিরজন পথে চলিতে চলিতে সহসা সভয় গণি
সাঝেঁর আধাঁরে শুনিতে পাইবি আমার হাসির ধ্বনি।”
সিঁড়িতে বসে পরল নূসরাত। মাথার ভেতর কবিতার লাইনগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাল লাগছে না একদম। সিঁড়ির ওখানে ওর দু’জন ক্লাস মেট দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, নুশান আর ফারিয়া- বাকিরা চলে গেছে এর মাঝেই। নূসরাত হাটুতে চিবুক রেখে শূণ্য দৃষ্টিতে রাস্তার লাইট পোস্টের দিকে তাকিয়ে আছে এখনো।
নুশান নূসরাতের দিকে তাকাল, “ছাতা আনিসনি?”
“নাহ। আনলে এতক্ষণ বসে থাকি?” ঠোঁট ওল্টালো নূসরাত।
ডান কানের দুলটা খুলতে খুলতে বিরক্ত মুখে নুশান বলল, “খালি ভেঙ্গে যায়! কানে যে কি হয়েছে! যাই পরি ডান কানেরটাই আগে ভাঙে! ডিসগাস্টিং!”
ফারিয়া মুখ বাঁকালো, “এত ভারি দুল পরিস কেন? কান তো তিব্বতি লামাদের মত ঝুলে পরেছে! ছাগলের কান বানিয়ে ফেলেছিস!”
নুসরাতের এসব কথা শুনতে ভাল লাগছে না, “মোবাইল আছে তোদের কাছে? আমারটা হাত থেকে পড়ে বিগড়ে গেছে। বাসায় একটা ফোন করা দরকার।”
নুশান ওর হ্যান্ড ব্যাগ খুলে সেল ফোনটা এগিয়ে দিল, “নে।”
“থ্যাংক্স।” ভদ্রতার একটা হাসি দিয়ে ফোনটা নিল। বাসার নাম্বারে ডায়াল করল। রিং হচ্ছে ওপাশে, ধরল না কেউ প্রথমবার। দ্বিতীয়বার রিং হতেই ধরল ওর মা।
ও প্রান্ত থেকে রাহেলা খাতুনের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল, “ হ্যালো? নুশান? নূসরাত কোথায়? ওর মোবাইল বন্ধ পাচ্ছি অনেক্ষণ ধরে।”
“মা, আমি নূসরাত। আমার মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হচ্ছে খুব। আটকে গেছে।”
মেয়ের কন্ঠ শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রাহেলা খাতুন, “এত করে বলি ছাতা সঙ্গে নিয়ে যেতে। কয় শো কেজি ওজন যে নেয়া যায় না?” সামান্য রাগ মেশানো গলায় বললেন।
“কান ধরেছি। এরপর থেকে শুধু ছাতা না, রেইন কোট সুদ্ধ নিয়ে আসবো। শিক্ষা হয়ে গেছে আজ।” তিক্ত মুখে বলল।
“তোর বাবাকে পাঠাচ্ছি। গিয়ে নিয়ে আসবে তোকে।”
“ বাবার শরীর এমনিতেই খারাপ। কোনো দরকার নেই। একটু পর বৃষ্টি থামলে আমি নিজেই চলে আসতে পারবো। বাচ্চা নাকি আমি?”
“সে জন্যই তো ভয় যত।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “সাবধানে আসিস।”
“ আচ্ছা, রাখি তাহলে।” লাইন কেটে গেল। ফোনতা নুশানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কৃতজ্ঞ কন্ঠে বলল, মেনি থ্যাংক্স তোকে। আম্মা অনেক টেনসন করছিল।”
নুশান ফোনটা নিয়ে হাসল কেবল, ফারিয়ার সঙ্গে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে গেল।
হাটুতে চিবুক রেখে রাস্তার দিকে আবার তাকালো নূসরাত। বৃষ্টির বেগ কমার বদলে আরো বেড়েছে। একটা কুকুর লাইট পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছে বৃষ্টিতে। কোথায় যাবে যেন বুঝতে পারছে না। ইতস্তত ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ক্যাম্পাসের চা ওয়ালা এক পিচ্চি মাথায় পলিথিন দিয়ে যাচ্ছিল ওখান দিয়ে। কুকুরটাকে দেখে রাস্তার পাশ থেকে ঢিল তুলে মারতে লাগল কুকুরটার দিকে তাক করে। এত দূর থেকেও কুকুরটার চিৎকার শোনা গেল। ছেলেটা হাসছে ঢিল মারতে মারতে। নূসরাত ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে দেখছে দৃশ্যটা। ছেলেটা নিভু নিভু কয়লা ঢাকনা সরিয়ে বালতি থেকে ছুড়ে মারতে নিল কুকুরটার দিকে।
হঠাৎ করেই অমিতের গলা শোনা গেল। অবাক হয়ে মুখ তুলল নূসরাত। লাইট পোস্টের আলোতে আচমকাই যেন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল একটা সাইকেল, নীল শার্ট পরা অমিতকে এত দূর থেকেও স্পষ্ট চেনা গেল। ভিজে গেছে একেবারে। অমিত চা ওয়ালা ছেলেটাকে ধমক দিল কড়া গলায়, “যা ভাগ হারামজাদা! কাম কাজ নাই? কুকুরের পেছন লাগছিস ক্যান? কামড়াইছে নাকি!” রীতিমত রেগে গেছে- গলা শুনেই বোঝা গেল। ছেলেটা দৌড়ে আরেক দিক চলে গেল। সাইকেল থেকে পা নামিয়ে দাঁড়াল রাস্তায় ও। কুকুরটা একটা ঝোঁপের কাছে চলে গেছে। অমিত ওটাকেও ধমক দিয়ে বলল, “যা, বাড়ি যা। এখানে বাংলা সিনেমার শ্যুটিং হচ্ছে নাকি যে পাসিং শট দিতে এসেছিস বৃষ্টির মাঝে? ভাগ!”
কুকুরটা দৌড়ে অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে গেল। অমিত আবার সাইকেল চালানো শুরু করল। নূসরাতদের দেখেনি, চলে যাচ্ছিল হলের দিকে।
নূসরাত দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাক দিল, “অমিত? অমিত!!”
ব্রেক কষে থামিয়ে দিল সাইকেল। অবাক হয়ে এদিকে তাকালো, “কিরে! ক্লাস তো শেষ হয়েছে অনেক আগে! তোরা এখনো বাসায় যাসনি?” সাইকেল থেকে নেমে ওটা ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে এল ওদের কাছে।
“তুই ক্লাস শেষে কোথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিলি?” নূসরাত জিজ্ঞেস করল।
“নামাযে গিয়েছিলাম। তোরা তিন সুন্দরী এই নির্জন ক্যাম্পাসে কি করছিস? জানিস না সন্ধ্যার পর স্যারেরা নারী খাদক হিসেবে বের হয়ে আসে?”
“চুপ কর!” ধমক দিল নূসরাত।
নুশান হাসতে লাগল, “মুস্তাফিজ স্যারের মত সবাই নাকি! ভাল টাইটেল বানিয়েছিস তো! “নারী খাদক” হি হি!”
“শুকরিয়া, শুকরিয়া!” বাউ করার মত করে বলল, তো এখন কি ‘ভাই অমিত’ হেল্প লাইন সার্ভিসের প্রয়োজন?”
“মানে কি! ‘ভাই অমিত হেল্প লাইন সার্ভিস’ এটা কি জিনিস?” ফারিয়া চোখ কপালে তুলে বলল।
“সন্ধ্যার পর নির্জন জায়গাতে তোদের মত অবলা নারীদের জন্য আমি ভাই রূপে আবির্ভূত হই। এজন্য বললাম ভাই সার্ভিস। আমাদের কোনো শাখা নেই।”
“ওউ!” নুশান হাসি চেপে বলল, “প্লিজ অমিত ভাইয়া আমাদের একটু হেল্প করবেন? বৃষ্টির জন্য আমরা বাসায় যেতে পারছি না।”
“আলবত। ‘ভাই অমি’ হেল্প লাইন সার্ভিসের প্রধান কাজই তো এটা। অবলা নারীদের সাহায্যে এগিয়ে আসা।” চশমাটা খুলে শার্টের কোনা দিয়ে কাঁচ মুছতে লাগল, “বাসা তো তিন জনের তিন দিক- রিক্সা তিনটা ডাকবো? নাকি সি.এন.জি?”
নূসরাত একটু ভেবে বলল, “সি.এন.জি ডাক। রিক্সায় গেলে ভিজে যাবো। ওদের ড্রপ করে দিয়ে বাসায় চলে গেলাম না হয়।”
“হোকে!” ঠোঁট উল্টে বলল। গিয়ে সাইকেলে বসল আবার। “আমি আসাতক অপেক্ষা করিস। যাবো আর আসবো। দেখিস আবার কোনো স্যারের উদার হৃদয়ের হেল্প নিতে যাসনে।” চলে গেল সাইকেল নিয়ে। হারিয়ে গেল বৃষ্টির মাঝে।
নুশান মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, “এই ছেলেটার মাথায় আসলেই সমস্যা আছে!”
নূসরাত কিছু বলল না। তাকিয়ে আছে এখনো রাস্তার লাইট পোস্টের নিচে। কুকুরটা আবার ফিরে এসেছে। ভিজছে বৃষ্টিতে। আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে একভাবে। আচ্ছা কুকুররাও কি প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বুঝতে পারে? স্থির হয়ে কুকুরটা বৃষ্টিতে ভিজবে কেন তাহলে? ওরাও কি মানুষের মত অনুভব করে প্রতিটা বেঁচে থাকার মুহূর্ত?
সি.এন.জি.তে ওঠার পর ড্রাইভার সামনের দিক থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিল। নূসরাত গ্রিলের বেতর থেকে অমিতের দিকে তাকাল, “তোর জ্বর টর হয় না? এভাবে কতক্ষণ ভিজবি?”
হাসল অমিত, “ভাবিস না। পাপ করলে জ্বর আসে, যাতে পাপ কেটে যায়। আমি মোটামুটি মহাপুরুষ টাইপের মানুষ। জাগতিক অসুখ বিসুখের উর্ধ্বে। এখনো সময় আছে, বিয়েতে রাজী হয়ে যা। এক শতাব্দীতে আমার মত মহাপুরুষ একটাই জন্মায়। আর সেই মহাপুরুষ কিনা দুই পায়ে সাইকেল নিয়ে তোকে বিয়ে করতে দাঁড়িয়ে আছে। হেলায় সুযোগ হারাসনে!” চোখ টিপল। “এ সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য।”
“না বাবা! আমি মহাপুরুষকে বিয়ে টিয়ে করতে পারবো না। আমার সাধারণ মানুষ দরকার। বরং বল, তোর এই মহান বদান্যতার ঋণ কি করে শোধ করবো?”
“নেক্সট শীতে একটা সোয়েটার বানিয়ে দিস। যেটা শুঁকলেই তোর হাতের ঘ্রাণ পাবো।” বলেই সাইকেল নিয়ে দৌড় মারল অমিত।
নূসরাত হা হয়ে গেল। নুশান আর ফারিয়া হাসছে ওর কথা শুনে। সি.এন.জি. চলতে শুরু করেছে।
ফিরে তাকাল নূসরাত। লাইট পোস্টের নিচে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অমিত। এদিকে তাকিয়ে আছে। ওর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই কুকুরটা। অমিত কুকুরটার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলল। এত দূর থেকে শোনা গেল না। হেলান দিল সিটের গায়ে। ক্লান্ত লাগছে খুব। চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু হঠাৎ যেন মনে হল অমিত নূসরাতের নাম ধরে ডাক দিল। চমকে ফিরে তাকাল পেছনে। অনেক দূর চলে এসেছে, অস্পষ্ট ভাবে দেখা যায় এখনো বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অমিত। বোঝা যাচ্ছে না মুখটা, কিন্তু মনে হল হাসছে। আস্তে আস্তে সাইকেলটা নিয়ে অন্ধকারের মাঝে হারিয়ে গেল ও। দাঁড়িয়ে রইল কেবল কুকুরটা।
অমিতের কন্ঠ কানে বাজছে নূসরাতের। সি.এন.জি.র একটানা দুলুনির মাঝেই মাথার চেতর আপনা আপনি অমিতের গলা ঘুর পাক খাচ্ছে –
“ নিশীথে বসিয়া থেকে থেকে তুই শুনিবি আঁধার ঘোরে কোথা হতে এক ঘোর উন্মাদ ডাকে তোর নাম ধ’রে……”
প্রকৃতি বড় বিচিত্র উপায়ে সাজিয়েছেন মানুষের স্মৃতির প্রতিটা কক্ষ। একেক কক্ষে একেক স্মৃতি জমা থাকে। একদম হঠাৎ করেই কক্ষগুলোর কোনো কোনোটার দরজা জানালা খুলে দেয়া হয়। এই দরজা জানালা খুলে দেয়াটা মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। যদি থাকতো তাহলে অনুভূতির অস্তিত্ব হারিয়ে যেত। প্রকৃতি সেটা চায় না, তাই সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ মানুষকে দেয়া হয়নি। এজন্যই হয়তো নিজের অজান্তেই অমিতের কবিতা আবৃতির কন্ঠস্বর নূসরাতের স্মৃতির যে কক্ষগুলোয় জমা ছিল- সেগুলোর দরজা জানালা হঠাৎ খুলে গেছে। সেখান দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা আসছে। কেন যেন অসম্ভব ভাল লাগছে ওর। সেই সঙ্গে চাপা একটা কষ্টও হচ্ছে বুকের ভেতর। কেন- সে নিজেও জানে না!
স্মৃতির কক্ষগুলো বড় অদ্ভূত। অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে দুঃখ সৃষ্টি করে, আবার আনন্দও!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now