বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

অমিয়েন্দ্র

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান ☫☤Ꮶℳ ЅᎯᎫU Ꭿℋℳℰⅅ ℛᎾᏦℐℬ ☢☣ (০ পয়েন্ট)

X ।। প্রথম পর্ব ।। প্রারম্ভিকার পর থেকে বুলবুল সাহেবের হাফানির টান আছে। সন্ধ্যা হলেই বাড়তে শুরু করে। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে একটা বই পড়ছিলেন- তার মাঝেই শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে। ড্রয়ার হাতড়ে ইনহিলারটা খুঁজলেন। পেলেন না। এখানেই রেখেছিলেন নাকি? মনে করতে পারলেন না। রাহেলাকে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলেন- নামায পড়ছে। ডাকা উচিত হবে না। নিজেই উঠে খোঁজা খুঁজি শুরু করলেন। বিছানার ওপর নেই। বালিশ উল্টে দেখলেন ভাল করে। পেলেন না সেখানে। অবাক লাগছে- গেল কোথায়? পাখা গজিয়েছে নাকি যে উড়ে যাবে! হাফাচ্ছেন ভীষণ ভাবে, ক্রমশ বাড়ছে। ওয়ার ড্রোবের ওপর খুঁজলেন হাতড়ে। হাতের ধাক্কা লেগে মোমদানীটা উল্টে পড়ে গেল। বিড়বিড় করে আপন মনেই বললেন, “রাহেলা আমার ইনহিলারটা পাচ্ছি না….. কোথায় রাখলাম?” রাহেলা খাতুন নামাযে মন দিতে পারছেন না। দেখতে পাচ্ছেন তাঁর স্বামী হাফাতে হাফাতে ইনহিলারটা খুঁজে বেরাচ্ছেন। তাড়াতাড়ি সালাম ফিরিয়ে বলে উঠলেন, “তোমার প্যান্টের পকেটে দেখো। বিকালে বাজারে গিয়েছিলে। খাটের স্ট্যান্ডে ঝোলানো আছে ঐ প্যান্টটা। ওটার পকেটে থাকতে পারে।” বুলবুল সাহেব তাড়াতাড়ি গিয়ে প্যান্টটা খাটের স্ট্যান্ড থেকে নামিয়ে পকেটগুলো ইয়াতড়ে দেখলেন। পাওয়া গেল অবশেষে ইনহিলারটা। মুখে লাগিয়ে পাফ নিলেন বিছানায় বসে। ধীরে ধীরে সময় যেতে লাগল। ধাতস্থ হতে সময় নিলেন। মোনাযাত শেষে জায়নামাযেই বসে রইলেন রাহেলা খাতুন। স্বামীর দিকে তাকিয়ে তজবী গুনছেন একমনে। সামলে নিয়েছেন বুলবুল সাহেব। ঢোক গিলে বললেন, “সন্ধ্যায় একজন লোক আসবে বাসায়।” জায়নামাযের কোনা ভাঙলেন রাহেলা খাতুন, কৌতূহলী মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” “জহর শেখ। তোমাকে বলেছিলাম তো ওনার কথা। কলেজ লাইফে আমার সিনিয়র ভাই ছিলেন।” চশমাটা খুলে পাঞ্জাবীর কোনা দিয়ে কাঁচগুলো মুছতে মুছতে বললেন তিনি। মনে পড়ল যেন হঠাৎ , কপালে ভাঁজ পড়ল রাহেলা খাতুনের, “ঐ যে, লোকটার গায়ে জ্বীন আছে বলেছিলে? সেই লোকটা?” মাথা ঝাঁকালেন, “হ্যাঁ।” গম্ভীর হয়ে গেলেন রাহেলা, “লোকটা তো বলে আধ পাগলাটে। আসলেই জ্বীন আছে নাকি পাগল- কোনটা?” “কি আছে এটা জানি না। তবে কাজের মানুষ খুব- এটা জানি।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “নূসরাতের ব্যাপারটা একটু ভেঙ্গে বলা দরকার ওনাকে। জামাই ছেলেটা তো খারাপ ছিল না, হঠাৎ করেই কেমন যেন মানসিক রুগীর মত হয়ে গেছে। কেউ তাবিজ টাবিজ করে ওদের সংসারটা ভাঙার চেষ্টা করছে কিনা একটু দেখা দরকার।” “এসব তাবিজ কবজে তুমি বিশ্বাস করো?” ভ্রুঁ কোঁচকালেন। “করতে চাই না। কিন্তু কেন জানি মনে হয় তোমার মেয়ের সংসারটা ভাঙার জন্য কেউ তাবিজ করেছে। মসজিদের ইমাম সাহেবও সেরকমই বলল। তাঁর মতে ভাল কাউকে দিয়ে ব্যাপারটা যাচাই করে দেখা দরকার- আসলেই কেউ তাবিজ করে জামাইয়ের মাথা নষ্ট করে দেয়নি তো। কারণ নূসরাত ওর আশে পাশে থাকলেই জাআই খ্যাপা টাইপের আচরণ করা শুরু করে। নইলে সব ঠিক। আমি গত পরশুও শহরে গিয়ে দেখা করে এলাম। একদম সুস্থ। আমাকে দেখেই পা ছুয়ে সালাম করল আগের মত। না খেয়ে আসতেই দিল না। অথচ নূসরাতের বিষয় সম্পর্কে বেমালুম ভুলে বসে আছে। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম শাবল দিয়ে পিটিয়ে নূসরাতের ডান পা’টা ভাঙল কেন সে- ও কিছুই মনে করতে পারল না। রীতিমত আকাশ থেকে পড়েছে! বলল সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে নাকি পা ভেঙেছে তোমার মেয়ে। ও নাকি নূসরাতকে হাতও লাগায়নি। বরং ভয় পায় নাকি! নূসরাতকে ওর ভয় লাগে। ভয়ংকর রকমের ভয় লাগে মাঝে মাঝে!” রাহেলা খাতুন তজবী গোণা থামিয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন তীক্ষ্ম চোখে, “ভাণও তো করতে পারে? বৌ পিটিয়ে সব জামাই সাধু সাজে। তোমার জামাই যে ধোঁয়া তুলসী পাতা- এটা নিশ্চিত হচ্ছো কি করে? নাটক করায় তো এমনিতেই ওস্তাদ ঐ ছেলে। মাঝে মাঝে মনে হয় অমিত ছেলেটার সঙ্গে বিয়ে দিলেই ভাল করতাম। তখন বুঝিনি।” শেষের দিকে এসে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন তিনি। “বিয়ে দিলেই বা কি লাভ হত? এক বছর পরেই তো মারা গেল।” একয়াট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন বুলবুল সাহেব। তজবীর বলগুলো আপন মনেই নাড়াচাড়া করতে করতে রাহেলা খাতুন বললেন, “ছেলেটার কথা মনে পড়লে এখনো খুব কষ্ট লাগে। এত ছট ফটে স্বভাবের একটা ছেলে….. ওর মারা যাওয়াটা এখনো বিশ্বাস হয় না আমার। এখনো মনে প্রায়ই শহরের বাসায় দল বেঁধে যখন নূসরাতের বন্ধু বান্ধবরা আসতো- অমিত এলে সোজা রান্না ঘরে এসে আমার সঙ্গে খুটুর খাটুর খুটুর খাটুর করে সাহায্য করত। আমি নিষেধ করলেই দাঁত বের করে হেসে বলত, ‘খালাম্মা আগে থেকেই প্র্যাক্টিস করছি। বিয়ে করলে তো ঘর জামাই থাকবো। বৌ করবে চাকরী বাকরী, আমি বাচ্চা কাচ্চা পুষবো- রান্না বান্না এখন থেকেই শুরু করে দিলাম! আপনি একটু শিখিয়ে দেন রাঁধতে হয় কেমন করে।’ আমি হাসতে হাসতে বলতাম, ‘কেনো? এত ঘর জামাই হওয়ার শখ কেনো?’ ‘বারে! ঘর জামাই না হলে এত ভাল শ্বাশুড়ি আম্মা পাবো কোথায়! আর নূসরাতের যা অবস্থা দেখেছি- কিছুই তো রান্না বান্না শেখাননি, তাই ভাবলাম আপনার হোম কোচিং এ আগেই ভর্তি হয়ে যাই। হবু জামাই বলে কথা!’ বলেই দৌড় রান্না ঘর থেকে! ঐ ছেলেকে যদি আর দেখা যায়!” আপন মনেই হেসে ফেললেন রাহেলা খাতুন। গম্ভীর মুখে কপাল ডললেন বুলবুল সাহেব, “ভাল মানুষ আসলে বেশি দিন দুনিয়ায় থাকে না। জগতের নিয়ম বড় বিচিত্র। যার ওপর মায়া জন্মাবে- তাকেই সবার আগে টেনে নিবে খোদা। মাঝে মাঝে কাউকে স্নেহ করতেও ভয় লাগে….” চুপ করে রইলেন রাহেলা বেগম। বাহিরের ঝড়ের শব্দ ভেতরে খুব হাল্কা ভাবে ভেসে আসছে। “নূসরাতকে ডাকলে নিয়ে এসো জহর ভাইয়ের কাছে। সমস্যাটা আসলে কার- জানা দরকার।” একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললেন তিনি। রাহেলা এখনো চুপচাপ বসে আছেন। অযথাই তজবী নাড়াচাড়া করছেন। গুণছেন না। অন্যমনস্ক হয়ে আছেন। জহর শেখ এলেন রাত নয়টার দিকে। বুলবুল সাহেব দরজা খুলেই নাক মুখ কুঁচকে ফেললেন। বৃষ্টিতে ভাল মত ভিজে এসেছেন উনি, সেই সঙ্গে গলা পর্যন্ত মদও গিলে এসেছেন। টলছেন রীতিমত। সাইকেল আছে সাথে। সাটা নিয়েই সোজা বসার ঘরে ঢুকে গেলেন কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে। রাহেলা খাতুন ওপর তলার বারান্দা দিয়ে উঁকি দিলেন নিচে, দেখলেন ভীষণ মোটা সোটা পাঞ্জাবী পরা এক লোক সাইকেল নিয়েই ড্রইং রূমে ঢুকে পরেছে! ভিজে আছে লোকটা। মাথায় কবিগুরুর মত লম্বা চুল, তবে কাঁচা পাঁকা সেগুলো। চোখে ভারী লেন্সের চশমা আর নাকের নিচে ঝাঁটার মত গোঁফ। টকটকে ফর্সা ধরণের গায়ের রঙ, লালচে ফর্সা যাকে বলে। সাইকেলটা সোফার পেছনে ঠেস দিয়ে দাঁড় করিয়ে সোফায় ধপাস করে বসে পড়লেন ভেজা কাপড় নিয়ে। হাফাচ্ছেন। সোফার দু’পাশে হাত মেলে দিয়ে ছাদের দিকে মুখ করে বড় বড় দম নিতে লাগলো রেলগাড়ির ইঞ্জিনের মত। শিসের মত শব্দ হচ্ছে। ঘর ময় মদের তীব্র কড়া গন্ধ ছড়িয়ে পরেছে। হেচকি তুলছে লোকটা একটু পর পর। সামান্য বিরক্ত হলেন রাহেলা খাতুন। এসব মাতাল দিয়ে মানুষের সমস্যা দূর করা যায় না- উল্টো সমস্যা বাড়ে। স্বামীর কাজ কারবারের ওপর থেকে দিন দিন আস্থা হারাচ্ছেন। পাগল ছাগল দিয়ে কোনো কাজ করানোর চেষ্টা করা মানে নিজেকে বড় গাধা প্রমাণ করা, বুলবুল সাহেব সেটাই করছেন বলে তাঁর ধারণা। ভেতরের ঘরে চলে গেলেন তিনি। বুলবুল সাহেবের শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। জহর ভাই এত বেশি মদ গিলে এসেছেন যে যতবার ঢেকুর তুলছেন- তীব্র বাজে একটা গন্ধে নাড়ি ভূড়ি উল্টে আসছে তাঁর। সামান্য দূরে একটা চেয়ারে বসলেন তিনি। জহর শেখ পা লম্বা করে সোফায় বসেছেন, হাফাতে হাফাতেই জড়ানো গলায় বললেন, “আসার সময় গাড়ির তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল। তেল নিয়ে আসতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল বুঝলি?” “গাড়ি?” অবাক হলেন বুলবুল সাহেব, “আপনি তো সাইকেলে এলেন দেখলাম!” “আমি সাইকেলের কথা বলি নাই, নিজের কথা বলেছি।” ঢেকুর তুললেন বিকট শব্দ করে, “আমাকে দেখে তোর গাড়ির কথা মনে হয় না? তোর বড় ভাবী তো বলে আমি নাকি একটা মাইক্রোবাসের সমান। ছোট বৌকে বিয়ে করতে যাওয়ার সময় যখন শেরওয়ানী পরে মাইক্রোতে উঠলাম, দু’টো চাকা জায়গাতেই বসে গেল। এমনকি মাইক্রোর দরজাতেই আটকে গেলাম। না পারি ঢুকতে, না পারি বের হতে। শেষে ওয়েল্ডিং-এর দোকান থেকে লোক এসে দরজা কেটে আমাকে বের করলো। ট্রাকে চড়ে বৌ আনতে গিয়েছি সেবার।” এতটুকু বলেই হাফানো শুরু করলেন। হা করে বড় বড় দম নিতে লাগলেন। বুলবুল সাহেব আড়ষ্ট গলায় বললেন, “দুই বিয়ে করে ফেলেছেন। কবে করলেন?” “তোর মাথা! দুই বিয়ে কে বলল? ছয় ছয়টা বৌ আছে আমার!” “এতগুলো!” চোখ কপালে উঠে গেল বুলবুল সাহেবের। “এতগুলো কথায়? আমার আব্বা ত নয়টা বিয়ে করেছিল। ছেলে সন্তানের শখ ছিল উনার। নয় নম্বর ঘরে আমি হলাম। তখন আব্বার বয়স সত্তর বছর। উনাকে আব্বা না ডেকে ডাকতান দাদাজান! তাঁর বড় আফসোস ছিল, ‘একটা মাত্র ছেলে আমার- সেও কিনা ডাকে দাদাজান!” “আপনারও কি ছেলে হয় না?” “হয়। বরং বেশিই হয়। কোনো মেয়ে নাই। আমার বাড়িতে গেলে মনে হবে মাদ্রাসা খোলা হয়েছে! পয়ত্রিশটা ছেলে আমার। এগারো জন বিয়ে করেছে। ওদেরও বাচ্চা কাচ্চা আছে। কয়দিন পর তো আমার বাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ হয়ে যাবে!” চুলে আঙ্গুল বোলালেন। অতি সাবধানে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বুলবুল সাহেব। “এখন দেরি না করে কাজের কথা শুরু করে দে। কি সমস্যা হয়েছে?” একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন জহর শেখ। নড়ে চড়ে বসলেন বুলবুল সাহেব, “ইয়ে, আমার তো একটাই মেয়ে জানেন। খুব ভাল মেয়ে। কিন্তু বিয়ে দেয়ার পর থেকে বড় কষ্টে আছে মেয়েটা। জামাই কেবল মারধোর করে। কিছুদিন আগে তো মেরে বেচারীর পা ভেঙ্গে দিয়েছে! তাই আপনাকে ডাকলাম- ওদের দুইজনের হাজিরা দেখবেন। কেউ তাবিজ টাবিজ করে সংসারটা ভাঙার চেষ্টা করছে নাকি? কারণ আমার জানা মতে জামাই ছেলেটা খারাপ না। অনেক ভাল ছেলে। বংশও ভাল।” “ অ। মেয়ের নাম, মায়ের নাম; ছেলের নাম আর ছেলের মায়ের নাম লিখে দে একয়াত কাগজে। আর তোর মেয়ে আর জামাইকে একটু ডাকতে হবে- কথা বলতাম।” “জামাই তো এখানেই নেই। নূসরাত, মানে আমার মেয়ে আছে- ওকে ডাকবো?” “ডাক দে। কথা বলে যাই একটু।” হেচকি তুললেন। “কিন্তু একলা।” উঠে দাঁড়ালেন বুলবুল সাহেব, “আপনি বসেন ভাই, আমি ডেকে দিচ্ছি।” চলে গেলেন ড্রইং রূম থেকে। জহর শেখ সোফায় বসে ভেজা শরীরে এখনো হেঁচকি তুলে যাচ্ছেন এক নাগাড়ে। জহর শেখ ভারী লেন্সের চশমা দিয়ে ঝিম ধরা ঢুলু ঢুলু চোখে চেয়ে আছেন তাঁর সামনে বসে থাকা মেয়েটার দিকে। ক্র্যাচ দু’টো সোফার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা। হাল্কা, পাতলা ছিপছিপে শরীর, গায়ের রঙ এক সময় ফর্সা ছিল, এখন ফ্যাকাসে ধরণের একটা ভাব চলে এসেছে। বেগুনী রঙের সালোয়ার কামিজ পরা। মাথায় ওড়না চাপানো। শুঁকনো মুখে বসে আছে। অসম্ভব মায়া কাড়া একয়াত মুখ। একটু পর পর অন্য দিকে তাকাচ্ছে মেয়েটা। জহর শেখ খেয়াল করলেন মেয়েটার ডান পা’টা যতটা দেখা যাচ্ছে- সাদা প্লাস্টার করা। জড়ানো গলায় জহর শেখ বললেন, “তোমাকে দেখে একজনের কথা মনে পরে গেল।” “জী?” ঢোক গিলল নূসরাত। “সমরেশ মজুমদারের নায়িকা মাধবীলতার কথা মনে পড়ল।” চুলে আঙ্গুল চালালেন কম বয়সী ছেলে ছোকড়াদের মত। নূসরাত আড়ষ্ট ভাবে পাশের ঘরের পর্দাটার দিকে তাকালো আবার। ওখানে রাহেলা খাতুন দাঁড়িয়ে আছেন। মেয়েকে একটা মাতালের কাছে একা পাঠাতে চাচ্ছিলেন না তিনি। বুলবুল সাহেবের বড় ভাই শ্রেণীর মানুষ বলে আসতে দিয়েছেন নূসরাতকে। তবুও পর্দার আড়াল থেকে তীক্ষ্ম নজর রাখছেন। উল্টো পাল্টা কিছু করতে দেখলেই ঢুকে পরবেন ভেতরে। মাতাল মানুষের কোনো বিশ্বাস নেই। মেয়ের বয়সীদেরকেও বুকে হাত দিয়ে বসে। জহর শেখের দিকে তাকাল নূসরাত। ইতস্ততঃ বোধ করছে খুব। এর আগে কখনো কোনো মাতালের সামনে যায়নি ও। এই প্রথম। দেখল জহর শেখের ঠোঁটের কোনে অদ্ভূত একটা হাসি ফুটে উঠছে ক্রমশ। অস্বস্তি বাড়ছে নূসরাতের। জহর শেখ হঠাৎ খুবস্বাভাবিক গলায় বললেন, “ভয় পাওয়ার কিছু নাই তোমার। কয়েকটা প্রশ্ন করবো কেবল।” গলায় মাতলামির কোনো চিহ্নই নেই। “বারবার দরজার পর্দার দিকে না তাকালেও চলবে। তোমার মা’র ধারণা পুরোপুরি ঠিক না। মাতাল মানুষের আত্ম নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক রকমের ভাল হয়।” ঢোক গিলল নূসরাত, আড় চোখে পর্দার দিকে তাকাল। জহর শেখ টের পেল কি করে যে ওখানে ওর মা দাঁড়িয়ে রয়েছে? “তোমার পুরো নাম?” হাতের নখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন জহর শেখ। “নাহিদা বিনতে নূসরাত।” “স্বামীর নাম?” “মোনেম চৌধুরী।” নামটা বলতে গিয়ে মুখটা কঠিন হয়ে গেল নূসরাতের। “তোমাদের মাঝে ঝগড়া হত কি নিয়ে?” চুপ হয়ে গেল নূসরাত। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে জহর শেখ হাত নাড়লেন, “বাদ দাও। বরং এটা বলো- তুমি কি কখনো ভয় টয় পাও? মানে উল্টো পাল্টা কিছু দেখো? কিংবা তোমার স্বামী কখনো দেখেছে? অস্বাভাবিক কিছু?” দীর্ঘ একটা মুহূর্ত নীরব বইল নূসরাত। তারপর নিচু গলায় বলল, “নাহ।” “বেশ।” একটা ভেজা সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন তিনি। ভেতর থেকে শুঁকনো সিগারেট বের করলেন, ম্যাচটা ভিজে গেছে। এমনি এমনি সিগারেটটা ঠোঁটে লাগিয়ে বললেন, “তোমার শ্বশুড় বাড়িতে কে কে আছে?” “আব্বা, আম্মা, দু’টো ননদ, একটা ভাসুর, বড় ভাবী আর ওদের দু’টো ছেলে মেয়ে। ননদ দু’টোর বিয়ে হয়ে গেছে বছর খানেক আগে। আর ভাসুর-ভাবী দুজনেই ফ্যামিলি নিয়ে আলাদা বাসা নিয়েছেন গত বছর। বাসায় থাকার মত বলতে গেলে কেবল আব্বা আম্মাই আছে।” “তোমরা তো বাচ্চা কাচ্চা নাওনি?” “জী।” “শ্বশুড় বাড়ির লোকজন কেমন? মানে কেউ হিংসা টিংসা করে এরকম লেগেছে?” “নাহ। সবাইকেই অনেক ভাল লেগেছে।” “কেবল স্বামী ভদ্রলোককে বাদে….. হুম।” বিড়বিড় করলেন আপন মনে। নুসরাত কিছু বলল না। “তোমার স্বামীর সঙ্গে অন্য কোনো মেয়ের সম্পর্ক আছে নাকি?” “জানি না।” বেশ কাটা কাটা স্বরে জবাবটা দিল নূসরাত। চশমার ওপর দিয়ে সরাসরি তাকালেন জহর শেখ, “আর তোমার? অন্য কোনো ছেলের সাথে?” ক্র্যাচ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো নূসরাত, “স্যরি চাচা। আমার মাথা ধরেছে। আমি যাই।” ঘুরে দরজার দিকে হাটতে লাগলো জবাবের অপেক্ষা না করেই। হেলান দিলেন সোফায় জহর শেখ, পেছন থেকে বলে উঠলেন, “অমিয়েন্দ্র- নামটা কিন্তু আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। খুব ভাল নাম দিতে পারো তুমি।” ঝট করে ফিরে তাকালো নূসরাত। রক্ত সরে গেছে মুখ থেকে। তাকিয়ে দেখল সোফায় বসে থাকা জহর শেখের মুখের সিগারেটটা আপনা আপনি জ্বলে উঠল। ছাদের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছেন, সোফার দুই দিকে দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে আপন মনেই একটা কবিতার লাইন আবৃতি করলেন – “ শুনেছি আমারে ভালই লাগেনা, নাই বা লাগিল তোর। কঠিন বাধনে চরণ বেড়িয়া চিরকাল তোরে রব আকড়িয়া লোহার শিকল-ডোর। তুই যে আমার বন্দি অভাগী, বাধিয়াছি কারাগারে, প্রাণের বাঁধন দিয়েছি প্রাণেতে, দেখি কে খুলিতে পারে…..” মাথা সোজা করে সরাসরি তাকালেন নূসরাতের দিকে, রহস্যময় একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল জহর শেখের মুখে। সিগারেটটা হাতে নিয়ে ভ্রুঁ কুটি করলেন, “রবী ঠাকুরের কবিতা। পছন্দ আছে ছেলের!” নূসরাতের মাথা ঘোরাচ্ছে। পড়ে যাবে, টলছে। রাহেলা খাতুন দৌড়ে এসে ধরে ফেললেন মেয়েকে। জহর শেখ তখন বসে রয়েছেন। স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন মা মেয়ের দিকে। (চলবে...)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অমিয়েন্দ্র!!!(পর্ব৪)
→ অমিয়েন্দ্র!!!(পর্ব৩)
→ অমিয়েন্দ্র!!!(পর্ব ২)
→ অমিয়েন্দ্র!!!

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now