বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

টাকার বিষ

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান আবির রায়হান অভ্র (০ পয়েন্ট)

X আরাম চেয়ারে বসে সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন শরীফ মজুমদার। প্রতিদিন সকালে তিনি ঠিক একই জায়গায় বসে সকালবেলা উপভোগ করেন। আজকেও তার ব্যাতিক্রম নয়। পুলিশের চাকরি করতে তিনি আজ ক্লান্ত। চোখ বন্ধ করে বুক ভরে সকালের ঠান্ডা বাতাস গ্রহন করছেন। হঠাৎ জুতার মচমচ শব্দে তার ঘোর ভাঙ্গলো। শরীফ মজুমদারের বাড়ির কাজের ছেলে আবির দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। -- আবির কিছু বলবে? -- স্যার বাইরে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে একটা মেয়েও আছে। -- সে কি চায়? -- আপনার সাথে দেখা করতে চায়। শরীফ সাহেব চোখ বন্ধ করে হাত দিয়ে কিছু একটা ইশারা করলেন। আবির সেই ইশারা দেখে হনহন করে চলে গেল। মাথার মধ্যে একটা জিনিস খেলা করছে শরীফ সাহেবের। গতকাল হেরোইনের একটা বড়সড় চালাক আটক করেছে পুলিশ। প্রায় দশ লাখ টাকার হেরোইন আছে সেখানে। কিছুক্ষন আগে এই হেরোইনের মালিক ফোন দিয়েছিল, ঘুষের বিনিময়ে ব্যাপারটা চেপে যেতে। আবারো জুতার মচমচ শব্দ, তবে এবার মচমচ শব্দটা আসছে জোরে জোরে। আবার শরীফ সাহেব চোখ মেললেন। লোকটার বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে হবে হয়তো। গায়ে একটা সাধারন ফতুয়া, মাথায় টুপি। আর সাথের মেয়েটার বয়স বড়জোর ষোল থেকে সতের হবে, মেয়েটার চোখদুটো মায়াময়। শরীফ সাহেব সোজা হয়ে বসলেন। তিনি লোকটার সাথে কথা বলতে প্রস্তুত। -- কি জন্য আমার সাথে দেখা করতে চাচ্ছিলেন? -- স্যার আপনি আমার মেয়েটাকে বাঁচান। ওর মা ওকে মেরে ফেলবে। -- ঝেড়ে কাশুন, কি হয়েছে খুলে বলুন। -- ওর নাম জাহানারা আক্তার। এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। কিন্তু ওর মা হঠাৎ করে ওর বিয়ে ঠিক করেছে। মেয়েটার অনেক স্বপ্ন, বড় হয়ে ডাক্তার হবে। কিন্তু ওর মা চাইছে এখনি বিয়ে দিয়ে দিতে। -- ছেলে কি করে? মানে যার সাথে বিয়ে দিতে চাইছে? -- ওই জানোয়ারটাকে ছেলে বললে ভুল হবে। বয়স মোটামুটি আমার কাছাকাছিই। জানোয়ারটা প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাসায় আসে। জাহানারার সাথে ভাব জমাবার চেষ্টা করে। -- নিশ্চয়ই লোকটার অনেক টাকা আছে? -- আপনি ঠিক ধরেছেন স্যার। শরীফ সাহেবের বুক চিরে দ্বীর্ঘশ্বাস নেমে আসে। এই টাকার কারনেই কতশত মানুষের স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, আবার এই টাকার কারণেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে কতজনের। -- তাহলে আপনি আপনার স্ত্রীকে বাঁধা দিচ্ছেন না কেন? -- আসলে ইয়ে ব্যাপারটা........! লোকটার দৃষ্টিতে একটা ইতস্তত ভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এবার শরীফ সাহেব জাহানারা নামের মেয়েটার দিকে তাকালেন। -- স্যার উনি আমার আসল বাবা নন, উনি আৃার সৎ বাবা। লোকটা হয়তো ব্যাপারটা বলতে চাচ্ছিলেন না, তাই জাহানারা নিজেই ব্যাপারটা বলে দিল। এবার শরীফ সাহেবের কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল মোটামুটি। তারপরেও ভালমত বুঝে নেয়াটা জরুরি। -- ভাই ব্যাপারটা খোলাসা করে বলুন। আমার হাতে সময় বেশি নেই। -- আসলে জাহানারার বাবা মারা যায় যখন ওর বয়স দশ বছর। তারপর ওর মাকে আমি বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু জাহানারাকে আমি কখনো সৎ মেয়ের চোখে দেখিনি। আমি সবসময় ওর ভালই চেয়েছি। -- তারমানে আপনার স্ত্রী আপনার বারণ শুনছেন না? -- একেবারেই না, তার কথা একটাই। আমি ওর বাবা নই, তাই আমি যেন নাক না গলাই। -- আপনার মেয়ের বয়স কত? -- এবার আঠারোয় পা দিল। শরীফ সাহেবের ভ্রু কুঁচকে গেল। ব্যাপারটা তো দেখা যাচ্ছে পুলিশের আওতার বাইরে। -- আপনার বাসার ঠিকানা দিয়ে যাবেন, সাথে বুড়োটার ঠিকানাও । আমি হয়তো সর্বোচ্চ একবছর এই বিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো। কারন একবছর পর আপনার মেয়ে আঠারো বছরে পা দেবে। তখন কারো কিছু করার থাকবে না। অন্তত এইচএসসি পরীক্ষা তো দিতে পারবে মেয়েটা। শরীফ সাহেবের কথায় লোকটার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল, একই অবস্থা জাহানারার। আসলেই তো তারা ব্যাপারটা ভাবতেই পারেনি। অতঃপর লোকটা তার বাড়ীর ঠিকানা লিখে দিয়ে চলে গেলেন। তারপর শরীফ সাহেব উঠে পড়লেন চেয়ার থেকে। আমার যন্ত্রনাদায়ক পুলিশের পোশাক পরতে হবে তাকে। ব্লক সি, সূর্যসেন রোড,বাড়ি নাম্বার ৩২। লোকটার বাড়ির ঠিকানা ঠিক এমনই। সকালবেলা রিক্সায় চড়ে সে চলে এলো সূর্যসেন রোডে। তারপর সি ব্লকের ৩২ নাম্বার বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাড়ে চারতলা বিল্ডিং, সামনে গাড়ি রাখার জায়গায় দুইটা কালো রঙের গাড়ী দাঁড় করানো। লোকটার অবস্থা তাহলে অনেক ভালই। গেটের দারোয়ান এই সকালবেলায় ঝিমাচ্ছে। গেটে টোকা দিতেই লাফিয়ে উঠলো তারপর যান্ত্রীক গলায় বলে উঠলো, -- কাকে চাই? -- এটা কি জাহানারাদের বাড়ি? -- আপনি কে? -- আমি শরীফ মজুমদার, জাহানারার কলেজের স্যার। এরপরেই ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। দারোয়ান গেট খুলে দিল, আর শরীফ মজুমদার বাড়ির ভেতর পদার্পন করলেন। দারোয়ান একজন লোকের সাথে শরীফকে পাঠিয়ে দিয়ে চলে গেল। লোকটা শরীফ সাহেবকে বসার ঘরে বসিয়ে দিয়ে অন্য রুমে চলে গেল। -- স্যার আপনি বসেন। আপামনি আসতাছে। লোকটার কথায় শরীফ কিছুটা কনফিউশনে পড়ে গেল। আপামনি বলতে কি জাহানারাকে বোঝাচ্ছে? নাকি জাহানারার মাকে বোঝাচ্ছে? যদি জাহানারার মা হয়ে থাকে তাহলে সিরিয়াস মুড নিয়ে বসা দরকার। আজ মহিলাকে কড়া ধমক দিতেই এসেছে সে। আঠারো বছর হওয়ার আগেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া, তাও আবার মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে? যদি মেয়ে রাজি থাকতো তাহলে এক কথা ছিল। কারন বাংলাদেশে এম ঘটনা অহরহ ঘটছে। -- স্যার আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন? -- এইতো ভাল আছি জাহানারা। তোমার পড়ালেখার কি খবর? -- স্যার লোকটা কালকেও এসেছিল। রাত বারোটা পর্যন্ত আমার পাশে বসে ঘ্যান ঘ্যান করেছে। রাতে পড়তে পারিনি একটুও। আবার সামনে পরীক্ষা। -- হুম, আচ্ছা তোমার মাকে ডাকো। উনাকে একটু জ্ঞান দিয়ে যাই। তাকে বলবে যে তোমার কলেজের স্যার এসেছে। -- আচ্ছা স্যার আপনি বসেন। আমি মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। জাহানারা আবার ভেতরে চলে গেল। এবার শরীফ সাহেব সিরিয়াস মুড আর রাগী চেহারা নিয়ে তৈরী হলেন। হঠাৎ তার চোখ চলে গেল তার নাক বরাবর দেয়ালের দিকে। শরীফ সাহেবের মাথাটা মূহুর্তেই ফাঁকা হয়ে গেল। -- শরীফ তুমি এখানে? দেয়ালে থাকা ছবিটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিল শরীফ। তারপর হঠাৎ কারো কথায় ভাবনার সুতো বিছিন্ন হয়ে গেল। তাকিয়ে দেখলো জাহানারার মা, শরীফের সাবেক ভালবাসা সুপ্তি দাঁড়িয়ে আছে শরীফের সামনে। -- তুমিই তাহলে জাহানারার স্যার? -- তুমিই জাহানারার মা? -- তোমার আগের স্বভাব রয়ে গেছে, প্রশ্নের বদলে প্রশ্ন করা। তারপর পিনপতন নিরবতা। শরীফ তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে, আর সুপ্তি তাকিয়ে আছে শরীফের দিকে। শরীফ এখনো আগের মতই আছে, শুধু বয়সটা বেড়ে গেছে। -- শরীফ তুমি একটু বসো। আমি চা নিয়ে আসছি। সুপ্তি চলে গেল চা আনতে। শরীফের মনের অজান্তেই চোখ দিয়ে টপটপ করে দুই ফোঁটা দুঃখ ঝরে পড়লো। এই জাহানারা নামের মেয়েটা কি তার মেয়ে হতে পারতো না। -- শরীফ এই নাও চা। একি তোমার চোখ লাল হয়ে আছে কেন? -- চোখে অসুখ হয়েছে। সারারাত চোখ জ্বালা করেছিল। সকালে উঠে দেখি চোখ লাল হয়ে আছে। -- তাহলে তুমি অবশেষে চাকরি পেয়েছো? তাও শিক্ষকতা নামক মহান পেশা। -- হুম চাকরি তো হয়েই গিয়েছিল তুমি চলে যাওয়ার পরপরই। -- বেতন কতো পাও এখন? -- মোটামুটি একজন মানুষের চলে যায় আরকি। -- তারমানে এখনো বিয়ে করোনি? -- চিন্তা ছিল প্রচুর টাকা কামাই করে তারপর বিয়ে করবো। যেন টাকার জন্য কেউ আমায় ছেড়ে যেতে না পারে। কিন্তু টাকা জিনিসটা সবসময় আমার নাগালের বাইরেই থেকে গেল। আবারো পিনপতন নিরবতা কিছুক্ষন। সুপ্তির চোখে কিছুটা অস্বস্তি। -- আচ্ছা সুপ্তি টাকাই কি জীবনের সব? তুমি কিভাবে টাকার জন্য তোমার বাচ্চা মেয়েটাকে তার বাবার বয়সি একজনের সাথে বিয়ে দিচ্ছো? -- সেটা আমার একান্ত ব্যাক্তিগত ব্যাপার। তোমার নাক না গলালেও চলবে। -- টাকার জন্যই তো তুমি তোমার বয়সের দ্বীগুন বয়সী একজনকে বিয়ে করেছিলে আমাকে ছেড়ে। তাই বলে এই টাকার জন্য নিজের মেয়ের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন গলা টিপে হত্যা করবে? -- টাকার মর্ম তুমি কি বুঝবে শরীফ? জীবনে টাকা ছাড়া কোন কিছুই হয়না। টাকাটাই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। যা তোমার কাছে কখনোই ছিল না। তাই আমি বাধ্য হয়ে লোকটাকে বিয়ে করেছি। -- যার ফলে তার মৃত্যুর পর তুমি এতো টাকা আর বাড়ি গাড়ির মালিক। তোমার মেয়েটাকেও এভাবেই টাকা পয়সার মালিক বানাতে চাও তাই না? শরীফ মজুমদার উঠে দাঁড়ালো বসা থেকে। তাকে যেতে হবে। সুপ্তির মত অর্থলোভী মেয়ে মানুষের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও একটা কথা না বলে সে পারলো না। -- সুপ্তি একটা কথা বলি শোনো। টাকা জীবনে দরকারী জিনিস, তাই বলে তা ভালবাসার উর্ধে নয়। ভালবাসা ছাড়া জীবনটা অনেকটা চোখ ছাড়া অন্ধ মানুষের মত। সবকিছুই আছে, কিন্তু দেখার শক্তি নেই। শরীফকে এগিয়ে দিতে গেট পর্যন্ত এগিয়ে এলো সুপ্তি। তার চোখমুখ শক্ত। এতদিন পর তার প্রাক্তনের সাথে দেখা, একটু তো আবেগপ্রবন হওয়া উচিত ছিল সুপ্তির। কিন্তু টাকা নামক বিষাক্ত লোভে সুপ্তির আবেগ ঢাকা পড়ে গেছে। -- সুপ্তি আরেকটা কথা, দয়া করে আঠারো বছর হওয়ার আগে তোমার মেয়ের বিয়ে দিয়ো না। এটা আমি তোমার প্রাক্তন হিসেবে নয়, সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে বলছি। সুপ্তির কঠিন হয়ে থাকা মুখের পেশিগুলো হঠাৎ শিথিল হয়ে গেল। সে হয়তো জীবনে এতটা অবাক হয়নি। -- জানোই তো বাল্যবিবাহ দেওয়ার শাস্তি কি। আর না জেনে থাকলে গুগলে সার্চ দিয়ে বের করে নাও। এত টাকার মালিক হয়ে জেলের ভাত খাবেনা নিশ্চয়ই। শরীফ মজুমদার রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাঁক দিলো রিক্সাওয়ালাদের উদ্দেশ্যে। তাকে এখন ওই বুড়ো হারামীটার কাছে যেতে হবে যে জাহানারাকে বিয়ে করতে পাগল হয়ে আছে। লেখক : Abir Rayhan Ovro


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now