বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লোকটি!!!
(১ম পর্ব)
কায়েস চৌধুরীর মাথার ভেতরে চিন্তা চলছে ঝড়ের গতিতে। সম্মেলনকেন্দ্রের ভেতরের মৃদু শব্দে চলা এয়ার কন্ডিশনারটাও পারছে না তার কপালের ঘামের ফোঁটাগুলোকে থামিয়ে দিতে। কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন কায়েস চৌধুরী। তেতো কফি- অন্য সময় হলে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন তিনি এটাকে- এই মুহুর্তে ভ্রুক্ষেপও করছেন না সেদিকে। ভয় পেয়েছেন, কায়েস চৌধুরী ভয় পেয়েছেন...
প্রথমে হলুদ স্কার্ফে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলার স্বরে অলিভার আনিস, এরপর ডোরাকাটা হাতকাটা গেঞ্জির মোটর ফাইয়াজ। একের পর এক জট পাকিয়ে যাচ্ছে সব মাথার ভেতর...
ব্যাপারটা শুরু থেকে ভাবা দরকার এবার একবার ঠাণ্ডা মাথায়।
বাংলাদেশ লেখক সমিতির পক্ষ থেকে আয়োজিত তিনদিনের বিশেষ সম্মেলনের আজ দ্বিতীয় দিন। এই সম্মেলন চালু হয়েছে গত বছর থেকে। পাঠকদের সাথে লেখকদের আলোচনা আর সরাসরি মত বিনিময়ের জন্যেই আসলে আয়োজনটা। পাঠকেরা আসবে- লেখকদের সাথে কথা বলবে; কেবল এই জন্যেই ভাড়া নেয়া হয়েছে এই আটতলা বিশাল দালানটা। নিবন্ধিত লেখকদের মাঝে লটারি করে স্টল দিয়েছে লেখক সমিতি, একতলাটা বরাদ্দ হয়েছে রহস্য- ভৌতিক আর হরর গল্প লেখকদের জন্যে। কায়েস চৌধুরীর বরাত মন্দ, সিঁড়ির সামনের একেবারে ওঁচা একটি স্টল পেয়েছেন তিনি। স্টলের অবস্থান নিয়ে ক্ষোভের অন্ত নেই কায়েস চৌধুরীর, তবে সবকিছুর মতোই এই জায়গারও একটা ভালো দিক আছে। বাংলা রহস্য উপন্যাসের প্রবাদ পুরুষ কাজী আনোয়ার হোসেন ওরফে কাজীদার স্টলটা পড়েছে তার ঠিক উল্টোদিকে। কায়েস চৌধুরী আবার কাজীদার ভীষণ ভক্ত, মেলায় আসা অন্যান্য পাঠকদের স্রোতের মাঝখানে একটূ ফাঁক পেলেই তিনি গিয়ে কথা বলে আসছেন কাজীদার সাথে। এককথায়, মন্দ লাগছিলো না সম্মেলনটা।
মানে, লাগছিলো আর কী। কিন্তু এরপরেই ওই অলিভার আনিস আর মোটর ফাইয়াজ মিলে সমস্ত এলোমেলো করে দিলো।
অথচ সকালটা বড় চমৎকার ছিলো। সারাটা সকাল ভীড় লেগেই ছিলো কায়েস চৌধুরীর সামনে। অটোগ্রাফ আর ছবি তোলার জন্যে পাগল হয়েছিলো যেনো লোকগুলো। এর সাথে অনবরত ছুটে আসা প্রশ্নরা তো আছেই।...
- ‘স্যার, নায়িকা দিবা ফারাহকে অমন করে মেরে ফেল্লেন শেষটায় ??’
- ‘গোয়েন্দা ইমরুল বক্সীর মতো অমন দারুণ চরিত্রের আইডিয়াটা কি করে পেলেন স্যার ??’
-‘ ওফ, কায়েস আঙ্কেল- আপনার ‘মধ্যরাতের ঘড়ি’ থ্রিলারটা পড়ে এমন ভয় পেয়েছিলাম না !! সে রাতে বাতি জ্বালিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলাম... কেন এমন পচা করে লেখেন- যাতে এতো ভয় পেতে হয় ??’ ... ইত্যাদি।
তবে কায়েস চৌধুরী এতো অল্পে বিরক্ত হন না। এই মুহুর্তে তাকে ঘিরে পাঠকদের এতো উচ্ছ্বাস-আগ্রহ খুবই স্বাভাবিক। কায়েস চৌধুরীই এখন সন্দেহাতীত ভাবে বাংলাদেশের সেরা রহস্য উপন্যাস লেখক। গত তিন বছরে টানা পাঁচটি শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলার লিখে তিনিই এখন রহস্য-গল্প প্রকাশকদের কাছে সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। কায়েস চৌধুরীর বই মানেই বাজারে নিশ্চিত কাটতি, ছয় মাসে ন্যূনতম তিন সংস্করণ। খুঁতখুঁতে টিভি নাটক পরিচালক অনিকেত আহমেদ পর্যন্ত কায়েসের উপন্যাস ‘সীমান্তের দিনরাত্রি’ নিয়ে মাসছয়েক আগে একটা টিভি সিরিয়াল বানিয়েছিলেন, দর্শকদের কাছে দারুণভাবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ওটাও।
কায়েস চৌধুরীর বয়স ৪০-৪২ হবে। ছোট করে ছাঁটা চুলের সাথে মোটাফ্রেমের চশমায় তাকে ভালোই দেখায়। আগে একটা বেসরকারী ফার্মে চাকরি করতেন, এখন চাকরি ছেড়ে শুধু লেখালেখিতে মন দিয়েছেন। রেজা হায়দার কিংবা গোবিন্দ রায়ের মতো পুরাতন রহস্য ঔপন্যাসিকদের নাম এখন আর সহজে আসে না পত্রিকার পাতায়। হাইটেক প্রযুক্তি নির্ভর তরুণ প্রজন্মের পাঠকেরা কী চায়, তা খুব ভালোমতোই ধরতে পেরেছেন কায়েস চৌধুরীর। প্রচুর বিদেশী খুনখারাবির সিরিয়াল দেখে আর পুরনো দিনের রহস্যপন্যাসের থেকে আইডিয়া এদিক-ওদিক করে একের পর এক হিট লেখা বের করছেন তিনি। অবসরে বাসায় বসে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে কায়েস চৌধুরীও মনে মনে স্বীকার করেন- হ্যাঁ, তার গোয়েন্দাদের মাঝে রেজা হায়দার কিংবা গোবিন্দ রায়ের অতটা প্রখর বুদ্ধির মারপ্যাঁচ- অতটা সূক্ষ্ম মনোবিশ্লেষণ হয়তো নেই- কিন্তু আছে প্রযুক্তির যাদু আর তরুণ পাঠকের যতটা প্রয়োজন ঠিক ততটা হালকা যৌনতা।
.. ঝামেলাটা শুরু হলো দুপুর নাগাদ। একটু স্পষ্ট করে বললে সকালের ভীড়ের পর লাঞ্চটা সেরে এসে যখন কায়েস চৌধুরী আবার স্টলে বসেছেন মাত্র, ঠিক তখনই তার সামনে এসে হাজির হলুদ স্কার্ফ জড়ানো একটা মানুষ।
‘হেহে, ভালো আছেন স্যার ?? ... আয়া পড়লাম আপনের লগে দেখা করতে। জন্মদাতা বাপের মতোইতো আপনে আমার- না কি কন ??...’ বলতে বলতে তার দিকে অটোগ্রাফের একটা হাত বাড়িয়ে দিয়েছে লোকটা।
কী নাম লিখবেন জানতে চাইতেই কায়েস চৌধুরীর মুখের উপর হেসে দিলো লোকটা। ‘ কন কী স্যার, আমারে আপনে চিনবার পারলেন না ??... আরে আমি আনিস- অলিভার আনিস !! মীরপুর দশ নাম্বারে তিন জোড়া খুন- মনে নাই স্যার ?? ...’
হতচকিত হয়ে লোকটার দিকে ভালো করে চাইলেন কায়েস চৌধুরী। হলুদ স্কার্ফ আর চাপা গলার স্বরের একটা ভয়াবহ লোককে তো তিনি চেনেন, বলা ভালো লোকটিকে তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তার ‘তুরুপের তাস’ উপন্যাসের দুর্ধর্ষ খুনী অলিভার আনিস, শেষ অধ্যায়ে গোয়েন্দা রাশেদ হাসানকে হুমকি দিয়ে যে উধাও হয়ে গিয়েছিলো ঢাকা ছেড়ে !!
বিস্ময়ে দম আটকে গেলো কায়েস চৌধুরীর, যখন তিনি হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন বইটার নাম ‘তুরুপের তাস’ !! এমন বিশ্রী রসিকতায় ক্ষেপে গিয়ে লোকটার দিকে আবার তাকিয়েই আরেকটা বিস্ময় উপহার পেলেন তিনি, কখন যেন মিলিয়ে গেছে অলিভার আনিস !!
ঘটনাটা মন বিক্ষিপ্ত করে তুললো কায়েস চৌধুরীর। বিকেলের দিকে আবার আসা শুরু করলো তার ভক্তের দল। অটোগ্রাফ-ফটোগ্রাফের তোড় কায়েসচৌধুরীকে ভুলিয়েই দিয়েছিলো সেই লোকটার কথা। বাজে একটা রসিকতা ছাড়া আর কিছুই মনে হচ্ছিলো না তার ওই ঘটনাটাকে। কিন্তু ডোরাকাটা হাতাকাটা গেঞ্জির আরেকটা লোক তার সামনে দাঁড়াতেই আবার মনে পড়ে গেলো তার অলিভার আনিসকে, কারণ এই ডোরাকাটা পোষাক তার ‘অপারেশন ঈশ্বরদী’ উপন্যাসের খলনায়ক মোটর ফাইয়াজের ট্রেডমার্ক।স্মাগলিং চক্রের নাটের গুরু ফাইয়াজের অন্তর্ধানটাও রহস্যজনক ছিলো বড়, গোয়েন্দা রাশেদ হাসান আগপাশতলা খুঁজেও ধরতে পারেনি ফাইয়াজকে- মনে পড়ে কায়েস চৌধুরীর। মোটর ফাইয়াজ তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে একট বই, সই করতে হবে। কাঁপাকাঁপা হাতে সে বইতে সই করতে করতে কায়েস চৌধুরী বললেন, ‘নাম কী আপনার ?’...
জবাবে ইনস্পেকটর মোজাম্মেল হককে যেমনটা বলেছিলো সে উপন্যাসের পঞ্চম অধ্যায়ে, তেমনটা ফিসফিস করেই বললো লোকটা- ‘আমি ফাইয়াজ, মোটরগাড়ি দিয়ে মানুষ মারি বলে আমায় লোকে মোটর ফাইয়াজ নামকে চেনে। ...সাপের গর্তে পা দিয়েছেন আপনি সাহেব, সাধ আহ্লাদ থাকলে মিটিয়ে নিন।’
ঠিক নিজের লেখা উপন্যাসের ভাষায় লোকটাকে কথা বলতে শুনে জমে গেলেন কায়েস চৌধুরী। এবং কথাটা বলেই মিলিয়ে গেলো মোটর ফাইয়াজ, অলিভার আনিসের মতোই- বইটা ফেরত না নিয়েই। কায়েস চৌধুরী ঘামতে লাগলেন দরদর করে। কেনো, কী ভাবে হচ্ছে এসব ??...
স্টল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কায়েস চৌধুরী। ঠান্ডা মাথায় ভাবা দরকার বিষয়টা, রহস্য গল্প লেখেন তিনি- চেষ্টা করলে এই রহস্যও ভেদ করতে পারবেন তিনি নিশ্চয়ই ! সম্মেলনের প্রতি তলার ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা জায়গা লেখকদের জন্যে সংরক্ষিত, সেই দিকে এগোলেন তিনি। ভাবতে হবে, গভীরভাবে ভাবতে হবে।
বিনা পয়সার কফিটায় – যেটা ভয়াবহ তিতকুটে হলেও তিনি পরোয়াই করলেন না- চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন কায়েস চৌধুরী। পুরো বিষয়টা খতিয়ে দেখা উচিৎ না মনে মনে ??...
প্রথম কথা, অলিভার আনিস বা মোটর ফাইয়াজ তার কল্পনা নয় তো ?? সম্ভব ছিলো ব্যাপারটা- কিন্তু তার হাতে ধরা বইদুটো একদম নিখাদ বাস্তব। অতএব আনিস বা ফাইয়াজ অথবা তাদের ছদ্মবেশে যারাই আসুক- তারা ঘোরতর বাস্তব। এবার পরের প্রশ্ন, মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও এটাই। এ রকমটা কেনো হবে ?? মানে, বইয়ের পাতা থেকে কোন চরিত্র কেনো উঠে আসবে তার কাছে ?? এরকম ঘটনা কখনো অন্য কারো ক্ষেত্রেও হয়েছে কি ??
চট্ করে কথাটা মনে পড়ে গেলো কায়েস চৌধুরীর। মানে রেজা হায়দারের কথাটা। আজ দুপুরে লাঞ্চ করবার সময়ই তার পাশে বসা রেজা হায়দার বলছিলেন কাকে যেন, ‘ যা ভয়টা পেয়েছিলাম বুঝলেন !! অবিকল সেই কপালের কাটা দাগ- সেই পাকানো মোঁচ- সেই ছ’ফুট দুই ইঞ্চির গুলজারিলাল !! আরে ‘অন্তিম মৃত্যু’ উপন্যাসে ঠিক এমন করেই আমি একটা চরিত্র বানিয়েছিলাম মনে নেই ?? আমার তো কথাই আটকে গেলো ...’
কথোপকথনের পরের অংশটা আর শোনার প্রয়োজন বোধ করেননি তখন কায়েস চৌধুরী, তার মনোযোগ ছিলো তখন ফ্রায়েড রাইসের দিকেই। এখন মনে হচ্ছে শুনলে পারতেন পুরো ঘটনাটা। ... যাক, রেজা হায়দারের কথাটা সত্য বলে মানলে বোঝা যাচ্ছে এরকম পরিস্থিতির ভিকটিম তিনি একাই নন। তবে কি সমস্ত রহস্য উপন্যাসের খলনায়কেরা একজোট হয়েছে ?? উঠে আসছে বইয়ের পাতা থেকে ?? কাজীদার কবীর চৌধুরী ?? গোবিন্দ রায়ের শাকের মৃধা ??...
কায়েস চৌধুরী ঠিক করলেন একবার কথা বলবেন রেজা হায়দারের সাথে। ভদ্রলোক বয়েসে তার চাইতে একটু বড়, কায়েস চৌধুরীর পূর্বে রহস্য উপন্যাসের প্রকাশনা জগতে তিনিই ছিলেন সেরা তাস। এখন সময় পাল্টেছে- বাজারের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়েছে বলে হয়তো রেজা হায়দার মনে মনেও ক্ষুদ্ধ কায়েস চৌধুরীর ওপর, সেকারণেই কায়েস চৌধুরী সযতনে এড়িয়ে চলেন রেজা হায়দারকে।
কিন্তু আজ এমন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। কায়েস চৌধুরী তাই রওয়ানা দিলেন রেজা হায়দারের বসবার জায়গাটার দিকে।
কী আশ্চর্য ! রেজা হায়দারের স্টলটা খালি !! কেউ নেই সেখানে। কায়েস চৌধুরী গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। রেজা হায়দার ছাড়া কারু কাছে তিনি যদি বলেন এই অলিভার আনিসদের কথা- শতকরা ৯৮ ভাগ লোকে সেটাকে ভাববে মানুষিক অসুস্থতা বলে। বাকিরা বলবে স্টান্ট- বলবে পাবলিসিটি করবার ধান্দা।
কোথায় যেতে পারেন রেজা হায়দার ?? গুরুতর অসুস্থ বা ওইরকম জরুরী কোন কারণ না থাকলে লেখকেরা সাধারণতঃ স্টল ছাড়েন না এই সম্মেলনে। পাবলিক ইমেজের জন্যে সেটা খুবই খারাপ। রেজা হায়দারের মতো ঝানু লোকে সেটা জানেন না ভাবার কোন কারণই নেই। তবে কি তারও কিছু হয়েছে ?? মানে, খারাপ ধরণের কিছু ?? ...গভীর ভাবনার ফাঁকতালে কখন লোকটা এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেননি কায়েস চৌধুরী। কড়া চুরুটের গন্ধে নাক জ্বলে গেলে পেছনে ফিরলেন তিনি। নীল ফ্লানেলের স্যুট, ঠোঁটে চুরুট, সোনালী ফ্রেমের গোল চশমা পড়া লোকটা দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক পেছনে। হাসছে মিটিমিটি।
(চলবে)
(গল্পটি কোন শ্রেণীর জানান প্লিজ)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now