বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

এক বিদায়ের আগমুহুর্ত

"স্মৃতির পাতা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রামীম (০ পয়েন্ট)

X রাবণের রাত। আকাশ খন্ড খন্ড মেঘে ঢাকা। চাঁদ ও মেঘের লুকোচুরিতে আলো-আধাঁরের রহস্যময়তা। অনিক মাথা নিচু করে শহরের একটি ওভারব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি পরবর্তী ঠান্ডা বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যায়। অনিকের মনে হল তার মনে যে হিমালয় সমান চাপ, যে অব্যক্ত অসহ্য যন্ত্রণা সবই এই অবারিত হাওয়ায় উড়ে গেলে বেশ হত । অনিক যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশেই এক পঙ্গু ভিক্ষুক ও তার বাচ্চা মেয়ে শুয়ে কথা বলছে। সারাদিন বাপ-বেটি মিলে কত রোজগার করেছে তার গল্প করছে। হাহ! বেঁচে থাকার লড়াই। বেঁচে থাকার যুদ্ধ।মনে মনে হাসিই পেল তার। নাহ, ঠিক সিদ্ধান্তই সে নিয়েছে। এর বাইরে তার আর কিছুই করার নেই। ঘড়িতে রাত ২টা বাজে। আর হয়ত ১০ কি ১৫ মিনিট। তারপরেই এই লড়াই থেকে তার চির অব্যাহতি মিলবে। নিঃশব্দ নিস্তব্ধ নগরী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ভোর হলে আবার প্রাণোচ্ছ্বাসে জেগে উঠবে এই ব্যস্ত নগরী। শুধু ঘুম ভেঙ্গে জাগবেনা অনিক। মানুষগুলোর নিঃশ্বাসে ভারি হয়ে উঠবে শহরের বায়ুমন্ডল, কিন্তু তাতে আর অনিকের নিঃশ্বাস থাকবেনা। ‘আপনার কি শরীর খারাপ করছে? এত রাতে কি করেন?’ অনিকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল লাল দাঁড়ির বৃদ্ধ ভিক্ষুকটি। কণ্ঠে সুস্পষ্ঠ কৌতুহল। ‘না আমি ভাল আছি। কিছু না, এমনি দাঁড়িয়ে আছি’ অকস্মাত প্রশ্নে একটু কেঁপে উঠলেও শান্ত ভঙ্গিতে জবাব দিল অনিক। ‘ভালা থাকলেই ভালা’-বিরক্ত স্বরে কথাটি বলে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল বৃদ্ধ ভিক্ষুক। অনিক এখন আসলেই কিছুটা ভাল বোধ করছে। খুব সাহসী সিদ্ধান্তটি নেয়ার পর থেকেই নিজেকে বেশ হালকা মনে হচ্ছে তার। মনের সেই অস্থিরতা গুলোও যেন কিছুটা স্থিরতা পেয়েছে। অনিক ওভারব্রিজের নিচে তাকাল। কালো পিচ-ঢালা রাস্তাটাকে তার মনে হল কোন নতুন পৃথিবীর সুড়ঙ্গ পথ। হয়তো সেই নতুন পৃথিবীর, যেই পৃথিবীর পথে একটু পরেই পাড়ি দিবে সে। সেই পৃথিবী নিশ্চয় তার যাপিত জীবনের অসহ্য পৃথিবী থেকে মন্দ হবেনা। সেই পৃথিবীতে নিশ্চয় কোন মা তার শিশু সন্তানকে ফেলে রেখে স্বার্থপরের মত প্রেমিকের হাত ধরে চলে যায়না। সেই পৃথিবীতে নিশ্চয় কোন প্রেমিকা ভালবাসার কবিতা শুনিয়ে, অজস্র স্বপ্ন দেখিয়ে, তীব্র দাব-দাহে বৃষ্টির গান শুনিয়ে পরবর্তীতে ভালবাসার অলিখিত শপথগুলো পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়না। এই শেষ সময়ে সেই দুঃসহ স্মৃতির কাঁটাগুলো অনিকের মনকে আরো একবার রক্তাক্ত করে দিল। মনে করতে না চাইলেও অসহ্য স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসে সমুদ্রের ঢেউ এর মতো। আর লোনা ঝরণার সূত্রপাত ঘটায় অনিকের দু’চোখে। তখন তার বয়স মাত্র ৬।কি ভালোই না বাসত সে মাকে। মায়ের শরীরের ঘ্রাণ না পেলে তার রাতে ঘুমই আসতোনা। সেই জননীই তার শিশু মস্তিষ্ককে চুরমার করে দিয়ে পালিয়ে গেল তার বাবার বন্ধুর সাথে। আর বাবা! বেচারা বাবা। সেই ভয়ংকর সত্য মেনে নেবার সামর্থ্য সাদাসিধা মানুষটির ছিলনা। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। বছর দুয়েক পরে এই জঘন্য পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। অনিকও আজ এই ধরিত্রী ছেড়ে চলে যেতে চায় তার বাবার কাছে। মরে গিয়ে বেঁচে যেতে চায় বাবার মত। এই অন্তিম সময়ে সামিয়ার কথা মনে পড়ার কোন দরকার ছিলনা। শেষ মুহূর্ত বলেই হয়তো প্রকৃতি তার প্রিয়-অপ্রিয় মুখগুলোকে আবার তার স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনছে। ভীষন ভালবেসেছিল সে সামিয়াকে। ভালবাসার গল্প-উপন্যাসে যতটা ভালবাসার কথা বলা হয়ে থাকে তার চেয়েও বেশি। ভেঙ্গে পড়া বৃক্ষ যেমন কোন অবলম্বন পেলে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়, তেমনি অনিকও চেয়েছিল সামিয়াকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে। কবিতা ছিল তাদের অসম্ভব প্রিয়। সকাল-দুপুর ভার্সিটির ক্লাসের ফাঁকে খোলা আকাশের নিচে অথবা গাছের ছায়ায় বসে কবিতার মাঝে হারাত তারা। একজন আবৃত্তি করত, আরেকজন শুনত। টিউশনীর বেতনের সব টাকা দিয়ে যেদিন সামিয়াকে সবুজ জামদানী কিনে দিয়েছিল সেদিন নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হয়েছিল অনিকের। সময়গুলো ছিল স্বপ্নের মত। সেই স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনাও ছিল ভয়াবহ। যখন দুঃখের ব্যাপ্তি সীমাকে ছাড়িয়ে যায় তখন মানুষের মস্তিষ্ক সেই দুঃখ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সেই অক্ষমতা ঢাকার জন্য সে তখন মস্তিষ্কের নিয়ন্তণ স্বেচ্ছায় হারাতে প্রবৃত্ত হয়। কিংবা মনের কষ্টকে শরীরে ছড়িয়ে দিতে চায়। অনিকও তার অসীম দুঃখকে উপেক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে নেশার পথে পা বাড়িয়েছিল। সাময়িকভাবে কিছুটা প্রশান্তি সে পেয়েছিল হয়তো। কিন্তু সেটা কোন সমাধান ছিলনা। যতক্ষণ মৌতাত থাকত ততক্ষণই সবকিছু ভুলে থাকতে পারত সে, তারপর আবার সেই অস্থিরতা। এই অস্থিরতাই তাকে শেষ করে দিচ্ছিল। অনিক শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকাল। তখনও চাঁদ মেঘের আড়ালে। হঠাৎ মেঘের অবরোধ ভেঙ্গে খোলা আকাশে বেরিয়ে আসল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহটি। আজ যেন চাঁদে আগুন লেগেছে। এত আলো ঠিকরে ঠিকরে বেরোচ্ছে! এত মায়াবী আলো! মেঘের পর্দার কারণে এতক্ষন এই আলো পথ খোঁজে পাচ্ছিলনা। অনিক অপলক চোখে সেই জোছনার বর্ষণ দেখতে লাগল। এই অপার্থিব সৌন্দর্যের কোন সংজ্ঞা অনিকের জানা ছিলনা। সে কেবল মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। অনিকের মনে হল সে অনন্ত কাল ধরে এই দৃশ্য দেখার অপেক্ষা করছে। কী যেন ছিল ঐ জোছনায়। অসাধারণ কিছু। অনিকের কী যেন হয়ে গেল। মনের সব অস্থিরতা, সব যন্ত্রণা, না-পাওয়ার সব বেদনা যেন তুচ্ছ হয়ে গেল সেই মায়াবী সৌন্দর্যের কাছে। ধরিত্রী যেন তার সবটুকে মায়া দিয়ে তাকে ধরে রাখতে চাইছে। সেই মায়ার বাঁধন ছিন্ন করার ক্ষমতা তার নেই। অনিকের কোষে কোষে অনুরণিত হল-পৃথিবী এখনো বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট সুন্দর। এই সৌন্দর্য সুধা পান করে হাজার বছর অবলীলায় বেঁচে থাকা যায়। অনিক ধীর পায়ে ওভারব্রিজ থেকে নেমে এল…একটা সিগারেট এখন খুব দরকার তার।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১১৪ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now