বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বিকাশ হতবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে।
আমাকে বলে, “বাবুদা তোমার কি হয়েছে
বলো তো, তুমি কি সেই মানুষটা যে ৭১ এ যুদ্ধ
করেছিলো দেশের জন্য? আজ আমাদের
দেশটার অবস্থা কি করুণ, মানুষ পরাধীন হয়ে
নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেখতে পাওনা?”
আমি হাসি, উল্লাস নিয়ে হাসি।ওকে আমার হাতটা
দেখিয়ে বলি, “এই দেখো আমার বুড়ো
আঙ্গুলের অর্ধেকটা নাই।যুদ্ধের শেষ দিকে
গুলি খেয়েছিলাম।খুব যন্ত্রণা হতো একসময় এই
আঙ্গুলে যখন অন্যায় দেখতাম, মানুষের কষ্ট
দেখতাম।বিশ্বাস করো, যতটা না মনে আঘাত
পেতাম তার থেকে বেশি এই অর্ধেক
আঙ্গুলে।রুমী ভাই যেদিন মারা গেলেন
রাস্তাটাকে লাল রক্তে রাঙ্গিয়ে দিয়ে সেদিন
রুমীদার ভালোবাসার মানুষটা আমার কাছে
এসেছিলেন।খুব ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে বলেছিলো,
“এই জন্য দেশ স্বাধীন করছিলা? কি স্বাধীনতা
আনছো তোমরা? আমি সেদিন থেকে আর
কষ্ট পাইনা বিকাশ। আমার আঙ্গুলটাও এখন আর ওই
ভোতা ব্যাথাটা দেয়না”।
৷
৷
একজন অবিদ্যা ও আমাদের স্বাধীনতা
৷
৷
আজগর ভাই তার চশমাটা ঠিক জায়গায় লাগিয়ে রাখতে
পারছেন না।একটু পরপর তা নাকের ফাক গলে
পড়ে যাচ্ছে।ভদ্রলোককে সেজন্য বেশ
হতাশ দেখাচ্ছে।আমি আজগর ভাইয়ের পাশে
যেয়ে দাড়াই।তাকে বলি, “ভাইজান চশমাটা আপনার
মাপের না।একটা দড়ি দিয়ে বেধে রাখেননা
কেন?”
আজগর ভাই আমার দিকে তাকাননা।কোন উত্তরও
দেননা।আমি আস্তে আস্তে উনার সামনে
থেকে সরে আসলাম।উনি এখন আমার অথবা অন্য
কারো সাথেই কথা বলবেন না।আমি জানি তিনি এখন
একটি বিশেষ চিঠি লিখছেন।যাকে চিঠি লিখছেন তিনি
তার ভাইয়ের মেয়ে।মেয়ের নাম দুষ্টু মিনি। সে
বিড়ালের মত দুধ খেতে ভালোবাসে তাই তার নাম
রাখা হয়েছিলো মিনি।আজগর ভাইয়ের সামনে
মিনিকে গুলি করে মারা হয়েছিলো, ওর সাদা ফ্রক
লাল টকটকে রক্তে ভরে গিয়েছিলো।আমি
মিনিকে তখন কোলে নিয়ে ছিলাম আর আজগর
ভাই মিনির মাথাটা বুকে চেপে চিৎকার করে
কাদছিলেন।৭১ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা।এপ্রিল
মাসের ১২ তারিখ এক নিকষ কালো অমাবস্যা রাতে
মিনি নামের সেই পাচ বছরের মেয়েটিকে
কতজন জানোয়ারের বাচ্চা হত্যা করেছিলো।
সেই রাতেই ঢাকা শহরের এক গর্বিত আত্না
অর্ধপাগল হয়ে গিয়েছিলেন।অর্ধপাগলের নাম
আজগর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য জয়েন
করা লেকচারার।
সেই ভয়ংকর রাতে আমি আজগর ভাইয়ের বাসায় যাই
দুদিন লুকিয়ে থাকার জন্য।আজগর ভাইয়ের বড় ভাই
যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন, আজগর ভাইকে
রেখে গিয়েছিলেন সবার দেখাশোনার জন্য।
যখন ঘরে ঢুকলাম তখন ভাবী মিনিকে বুকে নিয়ে
কাদছেন।সেই সময়টা কান্নার ছিলো, বেদনার
ছিলো।তাই আমি ভাবীকে কিছু বলিনি, জিজ্ঞাসা
করিনি।একটু পর আজগর ভাইয়ের মা আমাকে ডাক
দিলেন খাওয়ার জন্য।বললেন, “বাবু আয় খেতে
বয়”।
কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি অনেকগুলো
বুটের আওয়াজ পেলাম সিড়িতে।এরপর দুটা মিনিট।সব
শেষ, সব সব সব।খালু, খালাম্মা, মিনি, ভাবী সব
শেষ।আমি আর আজগর ভাই মাটিতে শুয়ে পড়ে
চিৎকার করে বলছিলাম, “আমাদেরকে মারবেন না।
মাত মারো মাত মারো”।
পাক সেনাদের মাঝে যে অফিসার ছিলেন উনি
আমাদের দিকে এগিয়ে এসে দুজনের মুখে
বুটের বাড়ি দিয়ে ইংরেজীতে বললেন, “This
basterds does not know even what is
courage, such road side dogs cannot be
killed. They are already dead. Lets pee on
them.”
তারা বেশ উৎফুল্ল হয়ে আমাদের সাথে
অনেকক্ষণ মজা করলো। আমাদের ভেতরের
মানুষটাকে হত্যা করলো, মানবতার চরম অবমাননা
করলো।আমরা নির্বাক ছিলাম, ভীতু ছিলাম।বাবা মা
যাদেরকে গ্রামে রেখে এসেছিলাম তাদের
কথা খুব মনে পড়লো।একসময় যখন সেই
জানোয়াররা চলে গেলো আমরা আস্তে
আস্তে এই ঘর সেই ঘর হেটে হেটে
মিনিকে খুজছিলাম।আজগর ভাই চিৎকার করে
বলছিলেন, “মিনি মা আমার কোথায় গেলি”।
মিনিকে পাওয়া গেলো বাথরুমের পাশে দুটো
দাত বের করে শুয়ে আছে।আমার মনে হয় ও
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আল্লাহ তাকে তুলে
নিয়ে গিয়েছিলেন।কার থেকে যেন শুনেছিলাম
ছোট বাচ্চারা মৃত্যুর সময় একটুও কষ্ট পায়না।আমি
মিনিকে কোলে নিয়ে বসে ছিলাম, আজগর ভাই
ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
আমার সেই সময়টাকে খুব পোট্রেট করতে
ইচ্ছা করে।আমি বেশ ভালো আকতে পারি।আমি
ঠিক করেছি যুদ্ধ শেষে সেই ছবিটা আকবো।
সেই দুঃসহ মুহূর্তটা, সেই সময়টাকে বন্দী করার
সাহস হবে কিনা জানিনা।কিন্তু তবুও আমি আকবো।
দরকার হলে সারাজীবন সময় নিয়ে আকবো।
আমি সেদিন রাতেই যুদ্ধে যোগ দেই।আজগর
ভাইয়ের মানসিক অবস্থা অনেক খারাপ ছিলো,
কিন্তু ভেতরের মানুষটা বোধহয় জেগে
ছিলো।উনিও আমার সাথে যুদ্ধে যোগ
দিয়েছিলেন। সমস্যাটা হলো উনি সেই রাতের
পুরো ঘটনাটাই ভুলে গিয়েছিলেন।গভীর রাতে
দেখতাম উনাকে ফুপিয়ে কাদতে।আমি মাথায় হাত
বুলিয়ে বলতাম, “আজগর ভাই শান্ত হোন।আমরা
কাদবো, কিন্তু যুদ্ধের পর।এখন কান্নার সময় না”।
আজগর ভাই মাথা তুলে বলতেন, “মিনি মাকে
অনেকদিন দেখিনা।ওকে দুধ খেতে দেয় কিনা
বুঝতে পারতেছিনা”।
আজগর ভাই প্রতিরাতে মিনিকে চিঠি লিখেন।তারপর
আমাকে দিয়ে বলেন, “বাবু চিঠিগুলা ঠিকমত
পোস্ট করে দিবি”।
আমি চিঠিগুলো লুকিয়ে রাখি, মাঝে মাঝে পড়ি।সব
চিঠিতে কিছু সাধারণ কথা লিখা থাকে, “মামণি তোমার
জন্য যুদ্ধ করতেছি।তুমি ঠিকমত যেন পড়াশোনা
করতে পারো, আমার মত শিক্ষক হইতে পারো
তাই যুদ্ধ করতেছি।তুমি মার কথা শুনবা, বাবার কথা চিন্তা
করবানা।তোমার বাবার সাথে আমার দেখা হলে
তাকে নিয়ে চলে আসবো।সদা সত্য কথা বলিবে
আর ঠিকমত খাওয়াদাওয়া করিবে”।
আমি স্টেনগান হাতে নিয়ে আধো আলোতে
সেই ভালোবাসার চিঠিগুলা পড়ি।নিজের ভিতরে নরম
মানুষটা জেগে উঠতে চায়, আমি বাধা দেই।
আমাকে যুদ্ধ করতে হবে কতগুলো
জানোয়ারকে লাথি দিয়ে এ দেশ থেকে বের
করতে হবে।এখন ভেঙ্গে পড়ার অবকাশ নাই।মা
বাবার কথা খুব মনে পড়ে।আমার ছোট্ট ভাইটা কি
করছে এখন আল্লাহই জানেন।বেচে আছে? তা
জানিনা, জানার অবকাশও নাই।চুলগুলো হঠাৎ করে
অনেক বড় হয়ে গেছে, তাতে আমার কোন
অসুবিধাও হচ্ছেনা।১৬ বছরের আমি যুদ্ধ করি,
বুকে একরাশ জমাট বাধা ক্ষোভ নিয়ে। এ
ক্ষোভ কার প্রতি আমি জানিনা।কেউ জানেনা।
একসময় দেশটা স্বাধীন হলো, আমি আমার
গ্রামে ফিরে গেলাম। আমাদের কুলবান্ধা গ্রামের
মরচেধরা টিনের ঘরটা তখন আর ছিলোনা।সব
জ্বলে পুড়ে ছারাখার। আমি খুব ভাগ্যবান ছিলাম যে
আমার বাবা মা ভাই সবাই বেচে ছিলেন।তারা আশ্রয়
নিয়েছিলেন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর ইউনিয়নের এক
ছোট্ট গ্রামে।আমার যে চাচা কখনও বাবার সাথে
সম্পর্ক রাখেননি সেই চাচাই আমার বাবাকে
সেসময় আশ্রয় দিয়েছিলেন।আমাকে দেখে চাচা
প্রথম কথাটা বলেছিলেন, “আমার পুলাটা তুমার মত
যুদ্ধে গেছিল”।
এরপর বুকে হাত দিয়ে জোরে থাপ্পর দিয়ে
বলেন, “পুলায় শহীদ হইছে।আমি শহীদ পুলার
বাপ।শহীদ পুলা”।
৭৫ সালের উত্তাল সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি
হই।মধুর ক্যান্টিনে ভোর হতে না হতে আমি চা
খেতে চলে যেতাম।অরুনদা প্রতিদিন তুলসীতলায়
প্রদীপ জ্বালান।আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম
প্রদীপ জ্বালানোর কথা।অরুনদা আমার মাথায় হাত
বুলিয়ে বলেন, “পিতাজীকে মনে পড়ে”।
সন্ধ্যায় আমি আর রুমী ভাই যখন আড্ডা দিতে
যেতাম তখন দেখতাম অরুনদা মঙ্গলপ্রদীপ
জ্বালাতেন।ধুপের গন্ধে চারপাশে একটা পবিত্রতা
খেলা করতো।রুমী ভাই সেসময় খুব স্যাটায়ার
ঝাড়তেন।আমি মন দিয়ে শুনতাম।একেকদিন আমার
বড় চুল নিয়ে হাসতেন।বলতেন, “এক্কেবারে
নজরুল হয়ে গেছে। কবিতা লিখতে গেলে
তো কলম ভেঙ্গে ফেলবা”।
আমি হাসতাম, উনাকে বলতে সাহস পেতাম না যে
আমিও উনার মত একটু একটু কবিতা লিখতে পারি।তবে
তা শুধু আমার চামড়ায় বাধানো সোনালী
ডায়েরীতে।আমি কাউকে আমার কবিতা শোনাতাম
না, আমার লজ্জা হতো।রুমীদা ৭৬ সালের এক
স্বপ্নীল সন্ধ্যায় মারা যান।উনাকে কে বা কারা
যেন নির্মমভাবে রাস্তায় মাথা ফাটিয়ে হত্যা
করেছিলো।আমি যখন দৌড়িয়ে কার্জন হলের
গেটের বাহিরে যাই তখন রুমীদার মুখ দেখা
যাচ্ছেনা।তার মুখ এবং কালো রাস্তা লাল রক্তে
আলতা সাজে রাঙ্গা।আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে
দেই।উনাকে বলি, “দাদা ঘুমিয়ে থাকুন, একটুও
জাগবেন না।এই নষ্ট শহরে জেগে ওঠার অধিকার
কারো নাই”।
২৯শে সেপ্টেম্বরের সেই শরৎ সন্ধ্যায়
রুমী দাস নামে যেই মুক্তিযোদ্ধা ছেলেটির
মৃত্যু হয়েছিলো তাতে কারোও কোন যায় না
আসলেও আমার এসেছিলো।আমি বদলে
গিয়েছিলাম।যুদ্ধ যেই আমাকে বদলাতে পারেনি
সেই আমি ছন্নছাড়া হয়েছিলাম, নীরব ভাস্কর্য
হয়ে উঠেছিলাম এই বর্ণিল শহরে।
আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছিলো
১৯৮২ এর শেষদিকে।দিনটা ছিলো শীতার্ত
ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে।আমার ঠিক আজ তা মনে
নেই।আমি বড় বড় চুল নিয়ে লাল মলাটের বই
হাতে বাংলা একাডেমীর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম বেশ
অনেকক্ষণ।প্রথম বইটা ১৪ কপি বিক্রি হয়েছিলো
যার মধ্যে ১৩ টি আমি কিনেছি, একটা প্রকাশক
নিজে।আমাকে প্রকাশক হাজী মফিদুল্লাহ একদিন
তার বাড়িতে ডেকে বললেন, “আপনারা তরুণ
রক্ত, থেমে গেলে চলবেনা।আরো
লিখবেন।কেউ না ছাপালে আমার কাছে আসবেন।
আমি অর্থে গরীব হতেপারি, কিন্তু মনে নয়”।
হাজী সাহেব আমার আরো পাচটি কবিতার বই বের
করেছিলেন পরবর্তী তিনটি বইমেলায়(সেসময়
বইমেলা খুব ক্ষুদ্র আকারে হতো।১৯৭২ সালে
চিত্তরঞ্জন সাহা নামে এক মহান ব্যক্তি একটা
চটের উপর ৩২টি বই নিয়ে বইমেলা নামক সংস্কৃতিটি
চালু করেছিলেন। টানা ছয় বছর উনি একাই বইমেলা
আয়োজন করতেন, পাশে কেউ ছিলোনা।এই
মহান ব্যক্তি ২০০৭ সালে যখন মারা যান তখন
বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রকাশনা সংস্থা ও বই বিক্রির
দোকান বন্ধ রাখা হয়েছিলো।১৯৮৪ সালে
বইমেলাকে “অমর একুশে গ্রন্থমেলা” বলে
আখ্যায়িত করা হয়)। একটা কবিতার বইও মানুষ কিনে
পড়তোনা।আমার মনে হতো এই শহরের
মানুষগুলো বড্ড বুনো হয়ে গেছে, তারা কবিতা
ভালোবাসেনা, মাটির ঘ্রাণ ভালোবাসেনা, সবুজ
ঘাসে জমে থাকা শিশির ভালোবাসেনা।তারা শুধু
ভালোবাসে টাকার বাষ্পকে। আমি সেই সময়টা খুব
কষ্টে কাটাতাম।দুপুরে এক কাপ চা, আর দুটো চার
আনার সিঙ্গারা খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতে হতো।
রাতে মেসে আমার রুমমেট দয়া করে কিছু
খেতে দিলে খাওয়া হতো, নাহলে আল্লাহর নাম
নিয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম।আমার চাকরী করতে ইচ্ছা
হতোনা।মনটাকে বেধে নষ্ট করবো কেন?
তাও কিছু টাকার জন্য, দুবেলা পেট পুরে খাওয়ার
জন্য।ছি!
মাঝে মাঝে সন্ধ্যায় আজিজ মার্কেটে যেতাম,
রুমীদার চেহারা খুজতাম।এই রুমীদা আমাকে কবিতা
লিখার আইডিয়া দিতো, কলমের কালিতে ছন্দ
তোলা শিখাতো।আজ সেই রুমীদা নেই।শুধু তার
মনোমুগ্ধ জাদুটা আমার হৃদয়ের ভেতরে
সগর্বে জাগ্রত।আমি হাটতে থাকি, কোণায়
রসূলের পানের দোকানে যেয়ে বড় বড়
চোখে বদলে যাওয়া শহর আর তাতে বাস করা
মানুষগুলোকে দেখতাম।আমার ভয় করতে
থাকতো, একদিন কি এই শহরটা আরোও বদলে
যাবে?
আমার প্রথম উপন্যাস “শিখা” যখন বের হয় তখন
মারমার কাটকাট বিক্রি হয়েছিলো।সেটা ১৯৮৭
সালের গল্প।অবাক হয়ে আমি খেয়াল করি আমার
সব বই বিক্রি হয়ে গেলো প্রকাশ হওয়ার ২১
দিনের মাথায়।আমি ৫০০ টাকার একটা সম্মানীও পাই।
সেই টাকাটা হাত নিয়ে আমি দৌড়িয়ে আমার মেসে
চলে আসি।আমার পাশের আজিম ভাই তখন যক্ষা
রোগীর মত কাশতে থাকেন।আমাকে বলেন,
“আজকে আপনি আমারে খাওয়ান।মুরগীর রান
খেতি মন চাইচ্ছে”।
আমি অনেকদিন পর সেই রাতে আরাম করে
মুরগীর গোশত দিয়ে ভাত খাই।নিজের টাকায়
কেনা ভাত। আজিম ভাই আমার দিকে তাকিয়ে
বলেন, “চোখে পানি কেন বন্ধু?”
আমি ভাত মুখে নিয়ে বলি, “ভাত খাওয়ার আনন্দে।
এই আনন্দ কে কবে আমায় দিয়েছিলো?”
এরপর আমি খুব সুখী মানুষের মত জীবনযাপন
করি।অন্যান্য বড়সড় বুদ্ধীজীবি কবিদের মত
চোখে সুরমা একে আজিজ মার্কেটে যেতাম।
আমাকে অনেকে সমীহ করতো, সম্মান
করতো, মোসাহেবী করতো।সত্যি বললে
ভালো লাগতোনা আমার তা।আমি শহরের ঘ্রাণ
নিতে ভালোবাসতাম। মানুষের মিথ্যা ভালোবাসার,
নির্লজ্জ সম্মান প্রদানের অশ্লীল অপচেষ্টা
আমার ঘৃণা লাগতো।আমি তবুও সেই মানুষগুলোর
পাশে বসে থাকতাম।একদিন একটা বন্ধু হলো, সে
অন্যদের মত ছিলোনা। নাম বিকাশ রঞ্জন পাল।
বিকাশ আমার থেকে বছর দুয়েকের ছোট
ছিলো, কবিতা লিখতো।আমাকে বলতো, “আমি
কবিতা লিখিনা।কবিতা আমাকে লেখায়।আমি শুধুই কবিতার
দাস”।
বিকাশদের বাড়িতে যেয়ে পরিচয় হয় ওর ছোট
বোন অপরাজিতার সাথে।একসময় আমি তাকে
পরী বলে ডাকা শুরু করি।পরী আমাকে দাদা বলে
ডাকতো।আমাকে একদিন পরী জিজ্ঞেস করে,
“দাদা আমায় পরী বলে ডাকো কেন?”
আমি হেসে বলি, “তুই পরীর মত তাই?তোকে
আয়নায় দেখতে পাস না?”
পরী লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে বলে, “কি সব
বলো।তোমার লাজ হয়না, না?”
আমি খিলখিল করে হেসে বলি, “আমি কবি।
কবিদের লাজ থাকেনা। কবিদের থাকে শুধু দিদিক্ষা।
সুন্দরের দিদিক্ষা।তাইতো তোকে দেখতে
ছুটে আসি”।
পরী আমার দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকিয়ে
থাকতো।আমি ওকে ওদের লাল আলোয় ঢাকা
ড্রয়িংরুমের সোফায় হেলান দিয়ে কবিতা শুনাতাম
একের পর এক।পরী মন দিয়ে শুনতো।তারপর
বলতো, “কিছুই বুঝিনি দাদা।কি সব লিখো!”
৮৭ সালের শেষদিকে ঢাকা ভয়ংকর উত্তাল।এরশাদ
সাহেব তখন বেশ চিন্তিত। অনেকে তাকে
স্বৈরাচারী বলে ডাকাডাকি করে আজকাল।উনার
ভালো লাগেনা তা।প্রায়ই উনি উনার আশেপাশের
মানুষদের মনে দুঃখের কথা শোনান।মাথায় হাত
বুলাতে বুলাতে বলেন, “মানুষজন সব অবুঝ হয়ে
যাচ্ছে। আমাকে কেউ বুঝলোনা।রাস্তাঘাট বানালাম,
পুল সেতু কি না বানিয়ে দিলাম।লোকের এগুলো
চোখে পড়েনা। আজকাল পড়াশোনা বাদ দিয়ে
ছাত্রগুলোও বেশ বিপ্লবী ভাব ধরেছে।
এদের পড়াশোনা ব্যাপারটা শেখাতে হবে
আবার”।
আমি সেই সময় ভালোবাসার কবিতা লিখি, সবুজ
মাঠের গল্প লিখি।দেশ নিয়ে ভাবতে পারতাম না।
আমার কাছে নিজেকে অন্ধকার যুগের দাস মনে
হতো।এখান থেকে কারো পরিত্রাণ নেই,
কারো নেই।
১০ই নভেম্বর, বাংলাদেশ অবরোধ কর্মসূচি
চারদিকে।রাস্তায় রাস্তায় স্বৈরাচারী মিছিল।তাতে
কোকড়াচুলো এক ছেলে জামাহীন দেহে
ঘুরে বেড়াচ্ছে।সাদা রঙ্গে তার কালো
শরীরে কি যেন লিখা।আমি সেই সময়টায় রাস্তায়
বিকাশের সাথে।বিকাশ আমাকে আমার মেস
থেকে জোর করে ধরে নিয়ে এসেছে।
ঢাকা জিপিওর সামনে একটা চায়ের দোকানে আমি
দাঁড়িয়ে আছি।পড়ন্ত দুপুরের রোদ আমাকে কাহিল
করে ফেলেছে, কিন্তু বিকাশ খুব আগ্রহ নিয়ে
অপেক্ষা করছে মিছিলের জন্য।আমি বিকাশকে
বললাম, “মিছিল দেখে কি হবে?”
বিকাশ হতবাক হয়ে আমার দিকে চেয়ে থাকে।
আমাকে বলে, “বাবুদা তোমার কি হয়েছে
বলো তো, তুমি কি সেই মানুষটা যে ৭১ এ যুদ্ধ
করেছিলো দেশের জন্য? আজ আমাদের
দেশটার অবস্থা কি করুণ, মানুষ পরাধীন হয়ে
নিঃশ্বাস নিচ্ছে দেখতে পাওনা?”
আমি হাসি, উল্লাস নিয়ে হাসি।ওকে আমার হাতটা
দেখিয়ে বলি, “এই দেখো আমার বুড়ো
আঙ্গুলের অর্ধেকটা নাই।যুদ্ধের শেষ দিকে
গুলি খেয়েছিলাম।খুব যন্ত্রণা হতো একসময় এই
আঙ্গুলে যখন অন্যায় দেখতাম, মানুষের কষ্ট
দেখতাম।বিশ্বাস করো, যতটা না মনে আঘাত
পেতাম তার থেকে বেশি এই অর্ধেক
আঙ্গুলে।রুমী ভাই যেদিন মারা গেলেন
রাস্তাটাকে লাল রক্তে রাঙ্গিয়ে দিয়ে সেদিন
রুমীদার ভালোবাসার মানুষটা আমার কাছে
এসেছিলেন।খুব ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে বলেছিলো,
“এই জন্য দেশ স্বাধীন করছিলা? কি স্বাধীনতা
আনছো তোমরা? আমি সেদিন থেকে আর
কষ্ট পাইনা বিকাশ। আমার আঙ্গুলটাও এখন আর ওই
ভোতা ব্যাথাটা দেয়না”।
বিকাশ কিছু বলেনা।চুপ করে রাস্তায় তাকিয়ে তাকিয়ে
থাকে।বিকাশের কাধে হাত দিয়ে আমি বলি, “একটা
মজার ব্যাপার জানো? ৭১ এর পর এই দেশের
মানুষ ভয়ানক বিপদে পড়েছিলো।আমাদের
গ্রামের একটা মেয়েকে খুব ভালো লাগতো
সে সময়।মেয়েটার নাম ছিলো মিতা রানী সরকার।
আমি মুসলমান ছিলাম, কিন্তু স্বপ্ন দেখতাম বিয়ে
করলে এই মেয়েটাকেই করবো।কি প্রচন্ড
আবেগ ছিলো বোঝাতে পারবোনা।যুদ্ধের
সময় ওরা শরণার্থী শিবিরে ছিলো।স্বাধীন হবার
পর ওরা ফিরে আসে, দুঃস্থ অসহায় সেই
পরিবারটিকে কেউ তখন সাহায্য করার মত ছিলোনা।
আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তখন ওর সাথে দেখা করতাম।
খাবার দাবার কিনে দিতাম।৭৩ এর পর ওরা কোথায়
যেন হারিয়ে গিয়েছিলো।আমি কোত্থাও খুজে
পাইনি।মানুষ বলতো ওরা ঢাকায় চলে এসেছিলো
খাবারের খোজে।সেই সময় আমাদের সরকার
রক্ষীবাহিণী গঠন করেছিলো, কম্বল চুরির
উৎসব করেছিলো।কেউ ওই পরিবারগুলোকে
দেখেনি”।
বিকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আর দেখা
হয়নি আপনার মিতার সাথে”?
আমি ধীরে ধীরে বলি, “বিকাশ জানো ক্ষুধার
তাড়নায় আমাদের এই দেশটার খুব পবিত্র কিছু নারী
যুদ্ধের পর ওই রাস্তাটা বেছে নিয়েছিলো।
তাদের নতুন পরিচয় হয়ে উঠেছিলো তারা অবিদ্যা।
শুধু নিজের পেটের জন্য হলে হয়তো তারা
আত্নহত্যা করতো, কিন্তু পরিবারের মানুষের কথা
ভেবেই তারা সে পথে গিয়েছিলো।মিতা ঠিক
এমন একজন ছিলো।আমার সাথে যখন তার দেখা
হয় আরো একবার, তখন নিশুতি এক বৃষ্টির রাত
ছিলো।ও নানান রঙ্গে সেজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে
ছিলো।আমি ওর পাশে যেয়ে দাড়াই।ওর মুখটা কি
শুকনো ছিলো! খুব মায়া হচ্ছিলো।আমি ওকে
বলেছিলাম, “আমার সাথে যাবে সারা জীবনের
জন্য? আমি তোমাকে প্রতিমা বানাবো, কখনও
বিসর্জন দেবোনা।আগলে রাখবো আজীবন ”
বিকাশ জিজ্ঞেস করে, “তারপর?”
আমি খুব জোরে একটা শ্বাস নিয়ে বলি, “ও
পালিয়ে গিয়েছিলো।আমার সাথে যায়নি।একবার
ফিরে তাকিয়েছিলো, আমার চোখের দিকে খুব
ধারালো একটা দৃষ্টি দিয়েছিলো।সেই দৃষ্টিতে কি
লিখা ছিলো জানো - "এর নাম স্বাধীনতা?এর
জন্য দেশ স্বাধীন করেছিলে?”
ও কি লজ্জা পাবে, আমি লজ্জায় কুকড়ে
গিয়েছিলাম।বিকাশ, এই দেশ স্বাধীন করে কি
করেছিলাম আমরা বলো? যুদ্ধের পর আমাদের
সরকার এত এত ত্রাণ পেয়েছে যা তুমি কল্পনা
করতে পারবেনা, সরকার প্রধাণ থেকে শুরু
করে সবাই তখন বড় বড় গাড়িতে চলতো।
বিদেশে ভ্রমণ করে আমাদের জন্য ভিক্ষা
চাইতো।কেউ মিতাদের দিকে তাকায়নি।তাদের
কাধে হাত দিয়ে বলেনি, এই দেশে কেউ না
খেয়ে মরবেনা।ক্ষমতার লোভে এই
দেশটাকে কি তারা ধ্বংস করেনি? যুদ্ধের পর
মুমূর্ষ দেশটাকে না বাচিয়ে কিভাবে ক্ষমতায় থাকা
যায় যুগ যুগ ধরে এই চর্চায় সবাই মত্ত ছিলোনা?
কিভাবে ভারতে খাবার পাচার করা যায় সেটা নিয়েই কি
সরকার ব্যস্ত ছিলোনা?৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ কি এমনি
এমনি হয়েছিলো ভাই? বায়তুল মোকাররমের
সামনে যখন শতশত হাড্ডিসার নরনারী প্রায়
বস্ত্রহীন অবস্থায় ক্ষুধার দাবী জানিয়েছিল তা
কে আমলে নিয়েছিলো?জানো সে বছরেই
লক্ষ টাকার বিদেশী মদ আমদানী করা
হয়েছিলো সরকারী টাকায়। সে সময় যখন ঘন্টায়
৩-৪ জন করে লাশ দাফন করতে হতো
আঞ্জুমানকে, আমাদের সরকার বলেছিলো,
“এটা কিছু না, শুধুই পুষ্টিহীনতা”।
বিকাশ এই দেশে স্বাধীনতা শুধু
ক্ষমতাবানদেরকেই সমৃদ্ধ করেছে, তোমার
আমার মত মানুষের জন্য স্বাধীনতা ছিলোনা।আজ
এই দিনে এই রাস্তায় যে মিছিলটা হবে, তুমি
দেখে নিও তাতে আমরা কেউ উপকৃত হবেনা।যদি
সত্যি এই স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়,
গণতন্ত্রের মত কিছু আসে তবে সেটাও
আমাদের জন্য হবেনা।আমরা সবসময় শুকরের
হাতে শোষিত হয়েছি এবং আরো শত বছর
হবো।তাই এইসব মিছিল, আন্দোলন আমাকে
টানেনা”।
সেই দিন তার কিছু সময় পড়ে কোকড়া চুলের
সেই ছেলেটাকে ধুম করে পুলিশ গুলি করে
মেরে ফেলে। আমি দেখলাম রাস্তায় একটা
মৃতদেহ পড়ে আছে। তার পিঠে লিখা, “স্বৈরাচার
নিপাত যাক”।তার বুকের রক্তে রাস্তাঘাট ভেসে
যাচ্ছে।সেক্ষণে আমার রুমিদার রক্তাক্ত দেহের
কথা মনে পড়লো।একইভাবেই তো ওই লাশটাও
রাস্তায় পড়ে ছিলো।আমি দৌড়িয়ে ২৫-২৬ বছরের
ছেলেটার কাছে গেলাম। লাশের পাশে বিমূঢ়
আমি আর অন্যদিকে বিকাশ আমার হাত ধরে
টানছিলো।চিৎকার করে বলছিলো, “বাবুদা ওঠো।
ওঠো।গুলি খাবে তো?”
বিকাশ জানতোনা আমার সারা শরীর তখন হাজার হাজার
গুলিতে ঝাঝরা হয়ে গেছে। (পাঠককে জানাই,
সেই যুবকের নাম ছিলো শহীদ নূর
হোসেন,আমরা তাকে সম্মানের সাথে বিপ্লবী
নূর হোসেন বলি।আমার কাছে তাকে চে
গুয়েভারার থেকে কোন অংশে কম মনে হয়না।
বিপ্লবী নূর হোসেনের মাতা মরিয়ম বিবি কিছুদিন
আগে একটা ছোট্ট দাবী জানিয়েছিলেন।তিনি চান
এরশাদ সাহেব যেন জনসম্মুখে তার ছেলেকে
হত্যার জন্য ক্ষমা চান। এরশাদ সাহেব ২০০৬ সালে
কোন এক বিলাসবহুল হোটেলে বিবৃতি
দিয়েছিলেন, “আমিতো নূর হোসেনকে হত্যা
করিনি। সে আওয়ামী রাজনীতির শিকার”।সবাই বলি
মারহাবা!!)
সেদিন রাতে আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে রবি ঠাকুরের
গান গাচ্ছিলাম, “আমার দিন ফুরালো, ব্যকুল বাদল
সাঝে, আমার দিন ফুরালো”
৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সাহেব পদত্যাগ
করেন। সেইসময়ের দুই জনপ্রিয় নেত্রী
একসাথে হাত তুলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায়
করেন এবং কসম কাটেন, স্বৈরাচারী এরশাদকে
আর কোনদিন তারা ক্ষমতায় নিবেন না।মারহাবা!
আমি তখন নিজ ঘরে শুয়ে আছি।বাহিরে গণমানুষের
আনন্দোল্লাস। বিকাশের কথা খুব মনে
পড়ছিলো।ও যখন যক্ষায় ধুকে ধুকে মরছে
তখন একদিন আমার কাছে ফোন করলো।আমি
ওকে দেখতে যেতাম না।আমার কষ্ট হতো,
অনেক কষ্ট।একটা জ্বলজ্যান্ত কবি এভাবে
হারিয়ে যাচ্ছে আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।বিকাশ
ফ্যাসফ্যাসে কন্ঠে আমাকে বলেছিলো,“দাদা
কেমন আছো বলো তো? তোমার কবিতা
কতদিন পড়া হয়না”।
আমি ওকে বললাম, “আমি কবিতা লিখতে পারিনা।
পরাধীন আত্না কবিতা লিখতে পারেনা”।
বিকাশ একটু রেগে গিয়ে বললো, “বাবুদা
তোমার উপর মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়।তোমরা
পরাধীন পরাধীন বলে চেচাচ্ছো, অথচ একবার
নিজেদের এই শেকল থেকে মুক্ত করার
চেষ্টা করোনা।মনুষ্যত্বটা কি মরে গেছে?”
আমি হাসতে হাসতে বলি, “রিলিফের মত চুরি হয়ে
গেছে?আমার মত ভেজাল মানুষ এইসব নিয়ে
ভাবেনা”।
বিকাশ বললো, “তোমরা নিজেরাই নিজেদের
পরাধীন করেছো”।
ছেলেটা প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছিলো।শেষ
সময় যখন তার খুব শ্বাস কষ্ট হচ্ছিলো হাসপাতালে
অনেক চেষ্টা করেছিলাম ভর্তি করাতে।পারিনি,
ব্যর্থ হয়েছিলাম। যক্ষা রোগীকে কেউ একটু
ছুয়ে দিতে চায়নি।নার্সগুলো নাক সিটকালো, বয়রা
দূরে দূরে থাকলো আর ডাক্তার, সে কোথায়?
হাসপাতালের বারান্দায় বিকাশের মাথায় হাত বুলিয়ে
দিয়ে বলছিলাম, “তুমি ঘুমাও কবি।তোমার ঘুম
দরকার”।
বিকাশের একটা কথা খুব মনে পড়ে। ও প্রায়
বলতো, দেশ আর দেশের মাটি কখনো
অপবিত্র হয়না।যেমনটা হয়না আমাদের মা।ওর কথাটা
আত্নস্থ করতে খুব চেষ্টা করতাম।পারতাম কিনা
জানিনা।
মিতার ঠিকানাটা অনেক কষ্টে খুজে বের
করেছিলাম।৯১ সালের নভেম্বরের এক শান্ত
গোধুলীবেলায় আমি তার সাথে দেখা করতে
গেলাম।সেই দিনটা খুব বৃষ্টি হয়েছিলো,
রাস্তাঘাটে থইথই পানি।টঙ্গী বিজ থেকে একটু
দূরে যে বস্তিটা ছিলো সেখানে ও থাকতো
একাকী।আমি হাতে একগুচ্ছ ফুল নিয়ে ওর সামনে
দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ।আমাদের দুজনের
তখন প্রেম করার বয়সটা ঠিক ছিলোনা।মিতার
চেহারাটা খুব বদলিয়ে গিয়েছিলো।ওকে ওর
থেকেও অনেক বয়স্ক দেখাচ্ছিলো।খুব
তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে গেলো, কিন্তু আমার
মুখের আধারটা কাটেনি।একসময় ও নিজে থেকে
জিজ্ঞেস করলো, “ফুলগুলো খুব সুন্দর আর
পবিত্র তোমার মনের মত। বাবু এতো দিন পর কি
কোন হিসাব চাইতে এসেছো?”
আমি মাথা নাড়ি।ওকে বলি, “সাহস পাইনি জানো।
ওইযে কত্ত বছর আগে একবার দেখা
হয়েছিলো, তুমি কি ঘৃণা আর অসহায়ত্ব নিয়ে আমার
দিকে তাকিয়ে ছিলে।আমি মনে থেকে আর
সাহসটা যোগাতে পারিনি তোমার পাশে দাড়ানোর”।
মিতা হাসে, সেই পুরনো অকৃত্তিম হাসি।আমাকে
বলে, “বাবু আমার ভেতরটা পচে গেছে
জানো।ঠিক আমার শরীরটার মত।এখন আর
ওইরকম অনুভূতিগুলো কাজ করেনা।তবুও জানো
খুব সহানুভূতি হচ্ছে তোমার জন্য।খুব হচ্ছে।তুমি
আমাকে অনেক চাইতে আমি জানি।আজ আমাকে
এমন অবস্থায় দেখে তোমার ভেতরটা
ভেঙ্গে যাচ্ছে আমি টের পাই।কিন্তু এজন্য
নিজেকে দোষ দিওনা।আমরা একটা নষ্ট সময়ের
অংশ।এই নষ্ট সময়টা আমাকে শেষ করে
দিয়েছে, আমার সত্তাটাকে ভেঙ্গে
ফেলেছে।আমার মাঝে আগের মানুষটাকে আর
খুজতে যেওনা”।
আমি মিতার দিকে তাকাই।যুদ্ধের পর ওদের বাড়িতে
যখন যেতাম, তখন ওর চোখে আমারে জন্য কি
প্রবল মায়া ছিলো।আমার খুব রাগ হয়েছিলো ও
যখন আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলো।আজ
তার থেকে অসহায় কেউ নেই।কিন্তু আমি আজ
বাধনহারা নিজের জীবনটা হারানোর ক্ষোভে।
কিছু খেয়াল না করেই খুব রাগ নিয়ে বললাম, “তুমি
চলে এসেছিলে কেন গ্রাম থেকে?একটাবার
বলে যেতে পারতানা?আমার জন্য একটা চিঠি
রেখে যেতে পারতানা?”
মিতা ওর ছনের বস্তির পাশে ধুপ করে বসে
পড়লো।আমার দিকে তাকিয়ে বললো, “আমি
একজন নারী তো তাই পারিনি।তোমাকে খুব একটা
চিঠি লিখতে চেয়েছিলাম, একটাবার তোমার দিকে
তাকিয়ে মনের কথাটা বলতে চেয়েছিলাম।উপায়
ছিলোনা, একদম উপায় ছিলোনা।তিনদিন মাটি খেয়ে
পড়ে ছিলাম ঘরে, কেউ দেখেনি।সেসময়টা
কেউ এক মুঠো ভাত দেয়নি।মা মারা যাচ্ছিলো
প্রায় জানো।তখন পাশের বাড়ির মোতালেব
আমাকে এক বাটি চাল দেয়ার লোভ
দেখিয়েছিলো।এই আমার হাতটা দেখো।এই
এত্তগুলো চাল।আমি নিজেকে বিক্রি করে
দিয়েছিলাম।মা মারা যেতো যে বাবু।আমি আসলে
নিজেকে না নিজের আত্নাটাকে বিক্রি করে
দিয়েছিলাম।একসময় ওই লোকটা আমাকে শহরে
নিয়ে এসে বিক্রি করে দিলো।কত আঘাত
পেয়েছি, কত অপমান হয়েছি আর প্রতারিত
হয়েছি কতবার হিসাব নেই।আমাকে বলো তো,
তোমরা যারা যুদ্ধ করলে তারা আমাদের কথা
ভাবলেনা কেন?”
আমি মিতাকে ছেড়ে চলে এসেছিলাম। আবার
সেই একই প্রশ্নটা আমাকে কেউ একজন
করলো।আমি ভাবতে থাকি একসময় কি আমার এই
ভালোবাসার দেশটা আরো নষ্ট হয়ে যাবে?
দেশের নদীগুলো সব শুকিয়ে যাবে, সমুদ্রটা
স্রোত হারিয়ে ফেলবে, দেশের গাছগুলো
পাখিগুলো সব হারিয়ে যেতে থাকবে?মানুষগুলো
আরো চরিত্রহীন, ক্ষমতালোভী আর পশুর
থেকেও পাশবিক হয়ে যাবে?আমার মাথায় যন্ত্রণা
হয়।আমি কিছু আর ভাবতে চাইনা, ভাবতে পারিনা।
ঠিক পরের দিন আমি মিতার সাথে আরেকটিবার
দেখা করতে গিয়েছিলাম।তাকে মুক্তি দিতে
গিয়েছিলাম, তার অভিশপ্ত জীবনটাকে আবার
পবিত্র আলোতে ভরিয়ে দিতে গিয়েছিলাম।
এসবকিছু ঠিক তাকে ভালোবেসেছিলাম একসময়
তার জন্য নয়, নিজের জন্য করতে চাচ্ছিলাম।
অনেকদিন পর মনে হচ্ছিলো দেশটাকে না পারি
একটা মানুষকে একটু আশার আলো তো দিতে
পারি।আফসোস মিতাকে আমি খুজে পাইনি, সে
হারিয়ে গিয়েছিলো।শুধু তার দেহটা, শুকনো
পাতলা জরাজীর্ণ দেহটা রেখে গিয়েছিলো।
আমি তার প্রাণহীন দেহ্টার পাশে বসে তার
মুখের আদলটা খুব খেয়াল করছিলাম।এই মুখটায়
মনে হয় আমাদের পুরো দেশের একটা রূপ
আকা হয়ে গেছে। দূর থেকে দেখলে মনে
হবে শীর্ণ জরাজীর্ণ, কিন্তু মায়া নিয়ে
ভালোবাসা নিয়ে তাকালে বোঝা যায় এমন পবিত্রতা
আর কোথাও পাওয়া যায়না।আমি মিতার খসখসে হাতটা
ধরে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।
মিতার দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে রাস্তায় যখন
বের হলাম তখন সন্ধ্যা হবে হবে।চারপাশে
তাকিয়ে একটা স্নিগ্ধতা অনুভব হলো। মনে
হলো, এই সময়টাকে একে ফেলা দরকার।
হয়তো একদিন এই শহর থেকে পবিত্রতাটুকু
হারিয়ে যাবে, যান্ত্রিকতা আমাদেরকে ছেয়ে
যেবে কালো ধোয়ার মতন।যারা দেশটাকে
স্বাধীন করার জন্য আমাকে প্রশ্ন করেছিলো
তাদেরকে খুব বলতে ইচ্ছা হচ্ছে, আমি
তোমাদের ভালোবাসার জন্য দেশটাকে
স্বাধীন করেছিলাম।তোমরা আমার ভালোবাসাটার
গুরুত্ব দাওনি।আমার মত কোন কোন যোদ্ধাকে
হয়তো বানিয়েছো ফকির, কাউকে দিনমজুর।
হয়তো কোন শহীদের স্ত্রীকে তোমরা
বানিয়েছো ইট ভাঙ্গার শ্রমিক। হয়তো আমার মত
কোন এক যোদ্ধাকে তোমরা একটু থাকার যায়গা
দাওনি, একমুঠো ভাত দাওনি, একটু ভালোবাসার
স্পর্শ দাওনি।তাতে এই আমার এখন আর কিচ্ছু যায়
আসেনা।তোমরা যখন এই দেশটাকে আরো
অপবিত্র করবে ক্ষমতার জন্য, টাকার জন্য,
ভোগের জন্য তখন আমার মত একজন সাধারণ
মানুষের হয়তো সামর্থ্য থাকবেনা প্রতিবাদ করার।
কিন্তু আমার মত লাল রক্ত যাদের শরীরে
থাকবে তারা তোমাদের ক্ষমা করবেনা।কারণ আমি
ভালোবাসার জন্য দেশটাকে নিজের করে
নিয়েছিলাম, স্বাধীন করেছিলাম। এই আমার মত
আরো একশ, এক হাজার এক কোটি যোদ্ধা এই
দেশে জন্মাবে। তারা সেই নীল রক্তের
পশুগুলোর থেকে পবিত্র দেশটাকে আবার
স্বাধীন করবে।
আমি ক্লান্ত শরীরে হাটতে থাকি।নিজেকে একটা
গল্প মনে হচ্ছিলো, যেই গল্পের শুরু আছে
কিন্তু শেষ নেই।
-সাদ আহম্মেদ-
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now