বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ছায়াশহর
লেখক : রাকিব হাসান
১ম পর্ব
নতুন বাড়িটা পছন্দ হল না আমার।
সুজার তো আরও অপছন্দ হল।
তবে বাড়িটা আয়তনে বিশাল।
আমাদের আগের বাড়িটার তুলনায়
বলতে গেলে প্রাসাদ। লাল ইঁটের
বাড়ি। ঢালু করে বানানো টালির
ছাদ। কালো রঙ করা। জানলার
ফ্রেমগুলোর রংও কালো। ভেতরে
ভীষণ অন্ধকার হবে, রাস্তা থেকেই
মনে হয়েছিল আমার। বাড়ি ঘিরে
কালো ছায়া। প্রচুর গাঁটওয়ালা
বিকৃত চেহারার প্রাচীন গাছগুলো
বাড়ির ওপর নুয়ে পড়ে যেন সমগ্র
বাড়িটাকে গ্রাস করে ফেলতে
চাইছে।
শেষ শরতের বাদামী রঙের ঝরা
পাতা বিছিয়ে রয়েছে বাড়ির
সামনের উঠোনে। আমাদের জুতোর
নীচে মড়মড় শব্দে গুঁড়ো হচ্ছে।
আগাছা উঁকি দিচ্ছে মরা পাতার
ফাঁকে ফাঁকে। বাগানের উঠোনের
পাশে একটা বহু পুরনো, মস্ত ফুলের
বেড আগাছার নীচে ডুবে আছে।
ভূতুরে বাড়ি ভেবে মনটা আমার
খুঁতখুঁত করতে লাগল।
সুজার মনেও বোধহয় একই ভাবনা।
প্রাচীন বাড়িটার দিকে
তাকিয়ে কেন জানি দুজনেই
গুঙিয়ে উঠলাম। স্থানীয় রিয়েল
এস্টেট অফিস থেকে জমি
বেচাকেনার দালাল মিঃ জোনস
এসেছেন আমাদের সঙ্গে।
হাসিখুশী, আন্তরিক। বয়স বছর
তিরিশের কোঠায়।
" কি? কেমন লাগছে তোমাদের নতুন
বাড়ি?" ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস
করলেন মিঃ জোনস।
" ওদের জিজ্ঞেস করে লাভ নেই",
হেসে জবাব দিলেন বাবা, " ওদের
ভালো লাগবে না। আগের
জায়গাটা ছেড়ে আসতে মোটেও
রাজি ছিল না ওরা"।
বাবার শার্টের নিচের অংশ
বেরিয়ে এসেছিল অনেকখানি।
প্যান্টের ভেতর গুঁজে দিলেন
আবার। পেট মোটা হয়ে যাচ্ছে
বাবার। ওজন বাড়ছে। প্যান্টের
ভেতর আর থাকতে চাইছে না শার্ট।
" ভাল লাগার কথাও নয়", মিঃ
জোনসের দিকে তাকিয়ে
হাসলেন মা, " তাছাড়া নতুন
জায়গা। এত বছরের পুরনো
বন্ধুবান্ধবদের ফেলে আসতে
হয়েছে। খারাপ তো লাগারই কথা।"
" শুধু খারাপ নয়, জঘন্য লাগছে", মুখ
বেঁকিয়ে বলল সুজা, " এরকম পচা
বাড়ি আমি জীবনে দেখিনি।"
হেসে সুজার পিঠ চাপড়ে দিলেন
মিঃ জোনস। বললেন, " এ বাড়ি
পুরনো ঠিকই, তবে পচা নয়।"
" অনেক দিন কেউ থাকে না তো
এখানে", সুজাকে স্বান্তনা দিতে
গিয়ে বাবা বললেন, "
ভাঙাচোরা জায়গাগুলো মেরামত
করে আবার নতুন রঙ লাগালেই
দেখবে সব আবার ঝলমল করে উঠবে।
তখন আবার ভালো লাগবে।" " না,
ভাল লাগবে না", মুখটা গোমড়া
করে রেখে বলল সুজা।
" কত্ত বড় বাড়ি, কত জায়গা", মা
ওকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন, "
কত্ত বড় বড় ঘর। থাকার জন্যে আলাদা
ঘর পাবে। শুধু খেলার জন্যেই পুরো
একটা ঘর পেয়ে যাবে।" এবার আমার
দিকে তাকালেন মা। বললেন, "
রেজা, তোমার নিশ্চয় খারাপ
লাগছে না?"
জবাব দিলাম না। দিতে ইচ্ছে করল
না। ঠাণ্ডা বাতাস এসে কাঁপুনি
তুলে দিয়ে গেল কিছুক্ষনের জন্য।
অথচ এখন গ্রীষ্মকাল। চমৎকার, গরম
একটা দিন। কিন্তু যতই বাড়িটার
কাছাকাছি এগোতে লাগলাম,
ঠান্ডাটা যেন বাড়তে লাগল।
বড় বড় পুরনো গাছগুলোর ছায়ার
কারণেই বোধহয়।
মোটা কাপড়ের শার্ট পরেছি আমি।
গাড়িতে রীতিমতো ঘামছিলাম ;
কিন্তু এখন যেন জমে যাচ্ছি।
ভাবলাম, আবার বাড়ির ভেতরে
গেলে হয়ত গরম লাগতে পারে।
" বয়েস কত ওদের?", সামনের উঠোনে
পা রেখে মা কে জিজ্ঞেস
করলেন মিঃ জোনস।
" রেজার বারো। গত মাসে সুজা
এগারো পেরিয়েছে।"
" দেখে কিন্তু সমানই লাগছে",
মিঃ জোনস বললেন।
কথাটা ভুল বলেননি মিঃ জোনস।
কারণ, সুজা আর আমি দুজনেই সমান
লম্বা। আমার চুল কালো, সুজার
সোনালি।
" আমি বাড়ি যেতে চাই। এখানে
আমার একমূহুর্ত ভালো লাগছে না",
রুক্ষকন্ঠে বলল সুজা।
ভীষণ অধৈর্য সুজা। প্রচণ্ড জেদি।
কোনওকিছু নিয়ে একবার গোঁ ধরলে
ছাড়ানো কঠিন। কোনওকিছু নিয়ে
বায়না করলে সেটা না দেওয়া
পর্যন্ত নিস্তার নেই। আদর পেয়ে
পেয়ে মাথায় উঠেছে। অন্তত আমি
তাই মনে করি।
আমাদের দুজনার চেহারায় মিল
থাকলেও, স্বভাবে কিছু পার্থক্য
আছে। সবাই বলে, সুজার চেয়ে
আমার ধৈর্য বেশী। জেদিও নই। হয়ত
আমি ওর চেয়ে বয়সে বড় বলেই।
বাবার হাত ধরে টেনে গাড়ির
দিকে নিয়ে যেতে চাইল সুজা। "
বাবা, চলো এখান থেকে। আমার
ভাল লাগছে না।" আমি জানি,
বাবা ওর কথা শুনবেন না। এত বড়
বাড়ি বিনে পয়সায় পেয়ে যাওয়া
মুখের কথা নয়। বাবার এক দূর সম্পর্কের
নিঃসন্তান চাচা উইল করে
বাড়িটা দিয়ে গেছেন বাবাকে।
উকিলের চিঠিটা যখন বাবার
হাতে এল, তখন ধেই ধেই করে নাচ
জুড়ে দিয়েছিলেন বাবা। আমিও
অবাক হয়েছিলাম। বাবাকে অত
আনন্দ পেতে কখনো দেখিনি।
" এই শোন, আমার এক দূর সম্পর্কের
চাচা, মবিন চাচা, উইল করে একটা
বাড়ি দিয়ে গিয়েছেন
আমায়"....বলে চিঠিটা বারবার
পড়তে লাগলেন বাবা, " গ্রীন
ভ্যালি নামে একটা শহরে।"
অনিশ্চিত ভঙ্গীতে কাঁধ
ঝাঁকালেন বাবা।
বাবার কাঁধের ওপর দিয়ে চিঠিটা
পড়লেন মা। বললেন, " ওই নামে
তোমার কোনও চাচা আছেন বলে
তো কখনো শুনিনি আমি।"
" আমিই কি ছাই শুনেছি!", বাবা
বলেছিলেন, " আমি ওঁকে না
চিনলেও উনি আমায় জানতেন,
নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। আমি
ছাড়া ওঁর বোধহয় আর কেউ ছিল না।
তাই মৃত্যুর আগে ভাতিজাকে
বাড়িটা দিয়ে গেলেন। "
লেখক হবার একটা অদম্য বাসনা
চিরকালই সুপ্ত ছিল বাবার মনে।
সবসময় সুযোগ খুঁজতেন একঘেয়ে
চাকরীটা ছেড়ে পুরোপুরি লেখার
জগতে আত্মনিয়োগ করার। বাড়িটা
পাওয়ায় সেই সুযোগ এসে গেল
তাঁর। এত আনন্দ সে কারণেই।
চিঠিটা পাওয়ার এক সপ্তাহ পরেই
আমরা গ্রীন ভ্যালিতে চলে এলাম।
আমাদের পুরনো শহর থেকে এখানে
আসতে গাড়িতে প্রায় চার ঘণ্টা
লাগল। বাড়ির আঙিনায় পৌঁছে
প্রথম দর্শনেই বাড়িটা অপছন্দ হয়ে
যাওয়ায় আর ঘরেও ঢুকতে চাইল না
সুজা। উঠোন থেকেই ফিরে যাবার
জন্য বাবাকে পীড়াপীড়ি শুরু করে
দিল। বিরক্ত হয়ে ধমক দিয়ে উঠলেন
বাবা। " আহ, কি হচ্ছে?" বলেই এক
ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন
বাবা, সুজার হাত থেকে।
অসহায় ভঙ্গীতে মিঃ জোনসের
দিকে তাকালেন বাবা। সুজা
তাঁকে অস্থির করে তুলেছে। এবার
আমি চেষ্টা করতে লাগলাম, সুজার
হাত ধরে টেনে বললাম, " সুজা,
এখানে আসার আগে আমাদের কি
কথা হয়েছিল? প্রমিস করেছিলাম
না, গ্রীন ভ্যালিতে আমরা
মানিয়ে নেব?"
" মানিয়ে নিতে পারব না, দেখেই
বুঝে গেছি", গুঙিয়ে উঠে সুজা
ফের বাবার হাত আঁকড়ে ধরল। "
বাড়িটা একটুও ভাল লাগছে না
আমার। ফিরে চল বলছি।"
" এখনো ভেতরেই ঢোক নি তো
বুঝলে কি করে এখানে থাকতে
পারবে না?" রেগে গিয়ে বললেন
বাবা। হাসলেন মিঃ জোনস।
বললেন, " আগে ভেতরে চলো। দেখ
আগে। তারপর থাকতে পারবে
কিনা ঠিক কোরো" বলে সুজার
হাতদুটো ধরতে গেলেন তিনি।
" না, আমি যাব না" এক ঝটকায় মিঃ
জোনসের হাতদুটো সরিয়ে দিল
সুজা। মাঝেমাঝে এত গোঁয়ার্তুমি
করে ও। অন্ধকার, বিশাল বাড়িটা
আমারও পছন্দ হচ্ছে না, তাই বলে ওর
মতো এমন তো করছি না।
" সুজা, ভেতরে চলো। যে ঘরটা
তোমার পছন্দ হবে, সেটাই তোমায়
দেওয়া হবে", মা বললেন।
" না, যাব না ভেতরে", রুক্ষস্বরে
বলে উঠল সুজা।
দোতলার দিকে তাকালাম।
পাশাপাশি বড় বড় দুটো জানলা।
দুটো কালো চোখের মতো যেন
আমাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
" যে বাড়িটা ছেড়ে এলেন,
সেখানে কতদিন ছিলেন?",
বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন মিঃ
জোনস।
একমূহুর্ত ভাবলেন বাবা। তারপর
বললেন, " এই চোদ্দ বছর। রেজা আর
সুজা ওখানেই জন্মেছে। ওদের
সারাটা জীবন ও বাড়িতেই
কেটেছে।"
" হুঁ, পুরনো জায়গা ছেড়ে আসতে
খারাপই লাগে",সহানুভূতির সুরে
বললেন মিঃ জোনস। তাকালেন
আমার দিকে। তারপর বললেন, "
রেজা শোন, আমি গ্রীন ভ্যালিতে
এসেছি মাত্র কয়েক মাস আগে। প্রথম
প্রথম আমারও ভালো লাগেনি।
কিন্তু এখন এত ভালো লাগে যে,
দুনিয়ার কোনওখানে গেলেই আর
থাকতে পারব না আমি।" এই বলে
হাসলেন তিনি। হাসলে গালে
টোল পড়ে। পুরুষ মানুষের গালে
টোল পড়াটা কেমন যেন বেমানান
লাগে । বললেন, " চলো, ভেতরে
চলো। ভাল লাগবে। আমি বলছি।"
মিঃ জোনসের পেছন পেছন
এগোলাম আমরা। সুজা দাঁড়িয়েই
রইল। জিজ্ঞেস করল, " অন্য
ব্লকগুলোতে আর কোনও
ছেলেমেয়ে নেই?"
" নিশ্চয় আছে", মাথা ঝাঁকালেন
মিঃ জোনস। বললেন, " দুটো ব্লক
দূরেই স্কুল। ওখানে গেলে অনেকের
সঙ্গেই দেখা হবে।"
হাত তুলে রাস্তার দিকে
দেখালেন তিনি।
" দেখলে কত সুবিধে?", হাসিমুখে
বললেন মা। " হেঁটেই স্কুলে যেতে
পারবে। রোজ রোজ বাসে চড়ার
ঝামেলা নেই।"
" আমার বাসে চড়ে স্কুলে যেতে
ভালো লাগে", সুজা বলল।
সহজে ও বাবা মাকে নিস্তার
দেবে না, বুঝলাম।
এই বাড়ি বদলানোটা আমারও
ভালো লাগে নি। কিন্তু বিনে
পয়সায় এত বড় বাড়ি পাওয়াও তো
ভাগ্যের ব্যাপার। আমাদের আগের
বাড়িটা এত ছোট যে গাদাগাদি
করে বাস করতে হত। বাবা ঠিক
করেছে ওটা বিক্রি করে দেবেন ।
ছোট হলেও বাড়িটা এমন জায়গায়
যে বিক্রি করলে ভালো টাকা
পাওয়া যাবে। তাতে এখানকার
চেয়ে অনেক স্বচ্ছলভাবে চলতে
পারব আমরা। কিন্তু সেকথা সুজাকে
বোঝায় কে? হঠাৎ ড্রাইভওয়ের
মাথায় রাখা আমাদের গাড়ির
ভেতর থেকে ঘেউ ঘেউ করে উঠল
কিটু।
কিটু আমাদের পোষা কুকুর। সাদা
রঙের লম্বা লোমওয়ালা টেরিয়ার
প্রজাতির কুকুর। খুব সুন্দর। গাড়িতে
একা রেখে এলে কখনো
চেঁচামেচি করে না। কিন্তু এখন
একেবারে চিৎকার করে গলা
ফাটিয়ে দিচ্ছে। জানলার কাঁচ
আঁচড়াচ্ছে। বেরিয়ে আসার আপ্রাণ
চেষ্টা করছে। চিৎকার করে বললাম, " কিটু থাম,
চুপ
কর"। আমার কথা শোনে কুকুরটা।
কিন্তু এখন থামল না।
" বেরোতে চায়", সুজা বলল, " গাড়ি
থেকে বের না করলে ও আর চুপ করবে
না", এই বলে সুজা লম্বা লম্বা পায়ে
গাড়ির দিকে হাঁটা দিল।
" না, দাঁড়াও...." বাবা বাধা দিতে
গেলেন।
কিন্তু কিটুর চিৎকারেই বোধহয়
বাবার কথা কানে গেল না সুজার।
" দিক না ছেড়ে, কুত্তাটাও ঘুরে
আসুক ", মিঃ জোনস বললেন, " ওকেও
তো এখানে থাকতে হবে।"
গাড়ির দরজা খুলে দিতেই
লাফিয়ে বেরিয়ে এল কিটু। লনের
ওপর দিয়ে দৌড়ে এল। উত্তেজিত
চিৎকার করতে করতে এসে আমাদের
ওপর যেন লাফিয়ে পড়ল। এমন করতে
লাগল যেন আমাদের কতকাল
দেখেনি। কিন্তু মিঃ জোনসের
দিকে চোখ পড়তেই রাগে আর ভয়ে
দাঁতমুখ খিঁচিয়ে গজরাতে লাগল।
আমরা অবাক হলাম। " কিটু! কি হচ্ছে?
চুপ!" মা ধমকে উঠলেন। " আশ্চর্য! এরকম
তো কখনো করে না!" বাবা অবাক
হয়ে তাকালেন মিঃ জোনসের
দিকে, " ওর স্বভাব খুব ভালো।"
" আমার গায়ে বোধহয় ভূতের গন্ধ
পেয়েছে", রসিকতা করে বললেন
মিঃ জোনস। কুকুরটার দিকে সতর্ক
চোখে তাকিয়ে মিঃ জোনস
টাইয়ের গিঁট সামান্য হালকা করে
নিলেন। কিন্তু কিটু আর শান্ত হয় না।
শেষে ওকে কোলে তুলে মিঃ
জোনসের কাছ থেকে সরে গেল
সুজা। কুকুরটার নাকে নাক ঠেকিয়ে,
চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে
ধমকে বলল, " এই, থামবি তুই। মিঃ
জোনস আমাদের বন্ধু।" কুঁইকুঁই করে
সুজার নাক চেটে দিল কিটু। সুজা
ওকে মাটিতে নামিয়ে দিল। কিটু
একবার আমার দিকে তাকাল, তারপর
মিঃ জোনসের দিকে। তারপর
মাটিতে নাক নামিয়ে সারা
উঠোনে কিসের যেন গন্ধ শুঁকে শুঁকে
বেড়াতে লাগল।
" ভেতরে চলুন ", আঙুল দিয়ে মাথার
চুল সমান করলেন মিঃ জোনস। কিটু
বেশ অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে
তাকে। সামনের দরজার তালা
খুললেন। স্প্রিং লাগানো
পাল্লাটা আমাদের ঢোকার জন্য
ঠেলে ধরে রাখলেন। মা বাবার
পেছন পেছন আমিও পা বাড়ালাম
বাড়ির ভেতর দিকে।
" আমি এখানেই থাকি" সুজা বলল।
ধমক দিতে গিয়েও পারলেন না
বাবা। জোরে নিশ্বাস ফেলে
মাথাটা দুদিকে নেড়ে রাগ দমন
করলেন। বললেন, " তোমার যা
ভালো লাগে তাই কর। বাইরে
থাকতে যদি ভালো লাগে,
বাইরেই থাকো। "
" আমি কিটুকে নিয়ে বাইরেই
থাকব", সুজা বলল। কুকুরটা কি করছে
দেখার জন্য মুখ ফেরাল সুজা।
দেখে, কিটু মরা ফুলের বেড শুঁকছে।
আমরা ঢুকলাম। স্প্রিং দেওয়া
পাল্লাটা ছেড়ে দেবার আগে
একবার সুজার দিকে তাকালেন
মিঃ জোনস। বললেন, " থাক,
ওখানেই ও ভাল থাকবে", মৃদু হেসে
মায়ের অস্বস্তি দূর করতে গিয়ে
বললেন কথাটা। পাল্লাটা ছেড়ে
গেল। আপনা আপনি লেগে গেল
স্প্রিং লাগান পাল্লাটা। কিটুর
এই অদ্ভুত আচরণ মা'কে অস্বস্তিতে
ফেলে দিয়েছে। মিঃ জোনসকে
কৈফিয়ত দিতে গিয়ে বললেন, "
মাঝেমাঝে এরকম অদ্ভুত আচরণ করে
কুকুরটা। ও সাধারণত এমনটা করে না।
আপনি কিছু মনে করবেন না।"
" না, না", মিঃ জোনস আশ্বস্ত করে
বললেন। তারপর বললেন, " প্রথমে
বসার ঘরটা থেকে শুরু করা যাক। কি
বলেন? " এরপর বাড়িটার বর্ণনা
দিতে গিয়ে বললেন, " আসলে এ
বাড়িতে এত বেশী জায়গা, এত
বেশী ছড়ানো আর খোলামেলা
যে অবাক না হয়ে পারবেন না।
তবে কিছু মেরামত করে নিতে
হবে।"
বাড়ির প্রত্যেকটি ঘর আমাদের ঘুরে
ঘুরে দেখাতে লাগলেন মিঃ
জোনস। না, বাড়ির ভেতরটা সত্যিই
চমৎকার। ঝকঝকে, তকতকে। অসংখ্য ঘর।
আর প্রত্যেকটা ঘরেই আছে ক্লজিট।
এটাচড বাথওয়ালা একটা বড় ঘর পছন্দ
করলাম আমি। জানলার কাছে রাখা
পুরনো মডেলের রকিং চেয়ার।
তাতে আরাম করে বসে দুলতে
দুলতে রাস্তা সহ বাইরের
অনেকখানি দেখতে পাব আমি।
সুজাটা জেদ ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে
থেকে ভুল করছে। এসব দেখলে ওর
রাগ চলে যেত।
পুরনো আসবাবপত্র আর বাক্স পেঁটরায়
ভর্তি চিলেকোঠাটা।
দেখতে দেখতে আধঘণ্টা যে
কোথা দিয়ে পার হয়ে গেল
বুঝতেই পারলাম না। এখন আর অতটা
মন খারাপ লাগছে না।
" সব তো দেখালাম ", ঘড়ির দিকে
তাকিয়ে বললেন মিঃ জোনস।
তারপর আমাদের নিয়ে সামনের
দরজার দিকে চললেন।
আমি বললাম, " একটু দাঁড়ান। আমার
ঘরটা আর একবার দেখে আসি।" বলেই
আমি দু তিনটে করে সিঁড়ি একসঙ্গে
টপকে দোতলায় উঠতে লাগলাম।
" জলদি ফিরো", মা পেছন থেকে
বলে উঠলেন, " মিঃ জোনসের
নিশ্চয় অন্য কোথাও কাজ আছে।"
দোতলার ল্যান্ডিংয়ে পৌঁছলাম।
সেখান থেকে সরু বারান্দা ধরে
এসে পোঁছালাম নিজের নতুন ঘরে। "
বাপরে!" চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। শূন্য
ঘরে প্রতিধ্বনিত হল আমার কথা।
ঘরটা সত্যিই বিশাল। একধারের মস্ত
জানলাটা, যেটার পাশে রকিং
চেয়ারটা আছে, সত্যিই দারুণ পছন্দ
হয়েছে আমার।
জানলার কাছে গিয়ে বাইরে
তাকালাম। গাছের পাতার ফাঁক
দিয়ে ড্রাইভওয়েতে দাঁড় করানো
আমাদের গাড়িটা চোখে পড়ল।
রাস্তার ওপাশে আর একটা বাড়ি।
অনেকটা আমাদের বাড়িটার
মতোই। জানলার ওপাশে দেওয়াল
ঘেঁষে আমার খাটটা পাতব ঠিক
করলাম। ডেস্ক আর কম্পিউটারটা
ঘরের কোন কোণে থাকবে তাও
ঠিক করে ফেললাম। আমার ঘরের
ক্লজিটের দিকে তাকালাম। ঘরের
উঁচু ছাদে লাইট লাগানোর ব্যবস্থা
আছে। পেছনের দেওয়ালে
অনেকগুলো উঁচু উঁচু তাক। ঘরের দরজার
দিকে এগোলাম এবার। পুরনো
বাড়ি থেকে যেসব পোস্টারগুলো
আনব সেগুলো ঘরের কোথায়
কোথায় রাখব, রাখলে ভাল
লাগবে, সেসব চিন্তা করছি,
এইসময়তেই নজরে পড়ল ছেলেটাকে।
একমূহুর্তের জন্য নজরে পড়ল
ছেলেটাকে। দরজায় দাঁড়িয়ে
যেন আমাকেই দেখছিল। তারপরই
লম্বা বারান্দা ধরে হেঁটে চলে
গেল।
" সুজা, শোনো "! ওকে সুজা ভেবে
আমি চেঁচিয়ে ডাকতে গিয়েও
থেমে গেলাম। এটুকু বুঝলাম, ও আমার
ভাই সুজা নয়। যদিও এর চুলের রঙও
সোনালী। " এই শোনো " বলে
চেঁচিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে
এলাম আমি। বারান্দার এমাথা
ওমাথা তাকালাম। " কোথায় তুমি?"
চেঁচিয়ে ডাকলাম। ছেলেটার
হাঁটার ধরনটা কেমন যেন ছিল! অত
দ্রুত কোনও মানুষ হাঁটতে পারে!
আমার ডাকে সাড়া দিল না কেউ।
লম্বা বারান্দাটা বিরাণ
একেবারে। বারান্দার পাশের বন্ধ
দরজাগুলো আমায় দেখে যেন ব্যঙ্গ
করছে। আশ্চর্য! আমি কি ভুল দেখলাম!
(চলবে....)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now