বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
-আর একটু দেবো ?
জয়ন্তী আবারও ঘুরে ফিরে আমার সামনেই এসে হাজির । হাতে বাটি ভর্তি মাংশ । আমার অস্বস্তিটা আরো একটু বেড়ে গেল । ঠিক মত খেতেও পারছি না এই মেয়েটার জন্য । জয়ন্তী আবার বলল
-দেব আর একটু ?
আমি চাচ্ছিলাম জয়ন্তীর দিকে না তাকাতে কিন্তু এবার ওর দিকে না তাকিয়ে পারলাম না ।
ইস কি গভীর চোখেই না জয়ন্তী আমার দিকে তাকিয়ে আছে ! কত দিন দেখি না এই চোখ তবুও কত পরিচিত ।
আমি আমার চোখ ফিরিয়ে নিলাম । আগে এমনটা করলে জয়ন্তী খুব রাগ করতো ।
ওর কেন জানি আমার চোখের প্রতি খুব আকর্ষন ছিল । চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ও খুব পছন্দ করতো । কিন্তু আমায় খুব অস্বস্তি লাগতো । চোখ সরিয়ে নিতাম । তখনই ওর অভিমান কে দেখে ?
জয়ন্তী !!
সুমিত এগিয়ে আসল ।
-কি করছো ?
জয়ন্তী বলল
-উনি তো কিছু খাচ্ছেনই না । মনে হয় রান্না পছন্দ হয় নি । আমি বললাম
-না না রান্না ভাল হয়েছে । খুব ভাল হয়েছে ।
আমার কথা শুনে জয়ন্তী বলল
-তাহলে খাচ্ছেন না কেন ? রান্না ভাল হলে কেউ আবার না খায় ?
সুমিত হেসে বলল
-আরে অপু একটু কমই খায় । আর মানুষের বাড়িতে তো খেতেই পারে না । তুমি চেষ্টা করে দেখো আরো খানিকটা খাওয়াতে পারো কি না ।
সুমিত চলে গেল আবার আমাকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দিয়ে । আমি চাচ্ছিলাম সুমিত যেন না যায় । ও থাকলে আমার অস্বস্তিটা একটু কম হত !
সুমিত আমার কলিগ । চাকরীর সুবাদে ওর সাথে খুব ভাল একটা রিলেশন তৈরি হয়েছে । সেই সুবাদে ওর বাড়িতে আসা । আসলে উপলক্ষ্য আরো একটা আছে । কদিন আগে সুমিত বিয়ে করেছে । বউ নিয়ে স্যাটেল হওয়ার পর পরিচিত মানুষজন দাওয়াত খাওয়াচ্ছে । প্রথমে আমি আসতে চাইনি । কারনটা অবশ্য সুমিত খুব ভাল করেই জানে ।
আসলে মানুষজনের ভীড় আমার একদমই ভাল লাগে না । তবুও সুমিতের অনুরোধ ফেলা গেল না কিছুতেই । আসতেই হল । প্রথমে ভেবেছিলাম কেবল মানুষ জনের ভিড়ই থাকবে কিন্তু এখানে এসে যে এমন একটা পরিস্থিতিতে পরে যাবো ভাবতেও পারি নি ।
এতো দিন পর জয়ন্তীর সাথে দেখা হল তাও কিনা আমার কলিগের বাড়িতে । আর যে জয়ন্তী এক সময় আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল সে কি না এখন আমার কলিগের বউ ?
জয়ন্তীর সাথে পরিচয়টা আমার এলাকাতেই । আমি সবসময় সাইকেল চালাতে খুবই পছন্দ করতাম । যখন এলাকায় ছিলাম সারাদিন কেবল সাইকেলই চালিয়ে বেড়াতাম । একদিন সাইকেল চালিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছি । বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি ঠিক এমন সময় আমাকে ক্রস করে একটা ভ্যান এগিয়ে গেল ।
ভ্যানটা এগিয়ে যেতেই আমি দেখতে পেলাম ভ্যানের পিছনে একটা মেয়ে বসে আছে । একটা ব্যাপার সব মেয়েদের ভিতরেই দেখা যায় যে যখনই কোন মেয়ে দেখে যে কোন ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে তখনই মেযেটার চেহারার এক্সপ্রেশন কেমন বদলে যায় । আর মেয়েটার চেহারা যদি একটু ভাল হয় তাহলে তো কোন কথাই নাই ।
ভ্যানের পেছনে মেয়েটাও ঠিক এমনই ভাব নেওয়া শুরু করলো । আর সত্যি বলতে কি মেয়েটা যথেষ্ট সুন্দরীও বটে । কিন্তু আমার এরকম ভাব নেওয়া মোটেও পছন্দ না । আমি এক গাদা থুতু মেয়েটার সামনে ফেললাম । এমন একটা ভাব যেন তোমার মেয়েকে আমি পুছি না । এটা আমি প্রায়ই করি !
এবার দেখলাম মেয়েটার মুখটা একটু যেন কালো হয়ে উঠল । ভ্যান সামনে চলে গেল আমি পেছন পেছন আসতে লাগলাম । একটু পর ভ্যানটা ঠিক আমাদের বাড়ির সামনেই থামল ।
এটা খানিকটা আশ্চর্যের বিষয় ।
আমাদের গ্রামের মোটামুটি সব মেয়েকেই আমি চিনি । তাহলে এই মেয়েটা এল কোথা থেকে ? তাও আবার নামল ঠিক আমাদের বাড়ির সামনেই ।
কে তুমি সুন্দরী ?
বাড়ির সামনে যেতে দেখলাম মেয়েটা আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে । আচ্ছা মেয়েটা তাহলে হিন্দু পাড়ার দিকে যাচ্ছে । কিন্তু কে মেয়েটা ?
হিন্দু পাড়ায় এতো সুন্দর মেয়ে কোথা থেকে এল ?
দুদিনের ভিতরেই মেয়েটার নাম পরিচয় জেনে ফেললাম । মেয়েটার নাম জয়ন্তী । শ্যামল বাবুর শালী । এখানে এসেছে পড়ালেখা করার জন্য ।
গ্রামে জয়ন্তীকে নিয়ে ভালই চর্চা শুরু হল ।
আসলে মিষ্টি যেখানেই থাকুক না কেন পিপড়া তো আসবেই ।
আমি দেখতাম শুনতাম আর মনে মনে হাসতাম । কিন্তু জয়ন্তীর সাথে আমার দেখা হত প্রায় প্রতিদিনই । কারন ওদের আসা যাওয়ার পথটা ছিল একদম আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে ।
প্রথম প্রথম দেখতাম জয়ন্তী আমাকে দেখে মাথা নিচ করে চলে যেন কিন্তু কয়েকদিন যাবার পর জয়ন্তী আর চোখ নামাতো না । কেমন অদ্ভুদ চোখে তাকাতো আর হাসতো ।
একদিন মেয়েটা খুব অদ্ভুদ একটা কাজ করে বসল । আমি বাড়ির সামনে বসে ছিলাম জয়ন্তী আমার সামনে এসে বলল -এই টা নেন ।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম
-এটা কি ?
-নিন । নিলেই বুঝবেন ।
আমি আশ্চর্য হয়েই নিলাম । কিন্তু তার থেকেও বেশি আশ্চর্য হলাম খামটা খুলে । খালি একটা কাগজ । উল্টেপাল্টে দেখলাম কিছুই নাই ।
আশ্চর্য খালী কাগজ দেওয়ার মানে কি ?
দুই
==
-স্যার আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে ! নিয়ে আসবো ?
রিসেপশনের ফোন পেয়ে খানিকটা অবাক হলাম । কেবিনে বসে ছিলাম । খুব বেশি সময় হয় নি । এরই মধ্যে আবার কে এল ? আমি জিজ্ঞেস করলাম
-কে এসেছে ?
রিসেপশনিষ্ট বলল
-একজন মেয়ে ! জয়ন্তী নাম বলল । সুমিত স্যারের ওয়াইফ মনে হয় । ওনার কাছেই এসেছিলেন । উনি নেই তাই আপনার সাথে একটু দেখা করতে চাচ্ছে ।
-আচ্ছা নিয়ে এস ।
মনের ভিতর অস্বস্তিতা আবার ফিরে এল ।
জয়ন্তী এখানে কি চায় ? একটু পরেই জয়ন্তী কেবিনে ঢুকলো ।
জয়ন্তীর আসার কথা শুনে আমি খুব একটা অবাক হয়নি । আমি জানতাম ও একদিন না একদিন আসবেই আমার সাথে দেখা করতে । তবে আজকেই চলে আসবে ভাবতে পারি নি ।
কিন্তু জয়ন্তী যখন কেবিনে ঢুকলো আমি সত্যিই অবাক হলাম । বিশেষ করে ওর পরনের পোষাক । জয়ন্তী আজ আকাশী রংয়ের একটা কামিজ পলেছে সাথে সাদা ল্যাগিংস । প্রথম যে দিন ও আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল আজকেও ঠিক এই রকম একটা পোষাক পরে এসেছে । আর আমার খুব পছন্দ হয়েছিল পোষাকটা ।
মাই গড ওর এখনও মনে আছে ।
আমাকে সাদা খামটা দেওয়ার পরদিন আমি ও যখন আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল আমি ওর পথ রোধ করে দাড়ালাম ।
-কি ব্যাপার তুমি আমাকে সাদা খাম কেন দিয়েছ ?
জয়ন্তী একটু হাসল । হেসে বলল
-সাদা খাম তো দেই নি । না সাদা খাম তো দেই নি ।
-না । সাদাই ছিল । আমি ভাল করে দেখেছি । ইভেন আমি আগুনের উপরেও দিয়ে দেখেছি ।
জয়ন্তী খানিকটা কৌতুহল নিয়ে বলল
-আগুনের উপরে কেন দিয়েছেন ?
-না মানে, এক ধরনের কালি আছে না লিখলে কিছু দেখা যায় না । আগুনের উপরে দিলে কালি ফুটে উঠে ।
জয়ন্তী এবার হেসে উঠল । বলল
-বাববাহ ! কি লেখা আছে জানার জন্য এতো আগ্রহ ?
-না , মানে .........!
সত্যি কথা বলতে কি আমার মনে ব্যাপারটা নিয়ে আসলেই প্রচন্ড কৌতুহল ছিল । বারবার কেবল এই মনে হচ্ছিল যে মেয়েটা আসলে কি লিখেছিল বা কি লিখতে চেয়েছিল । জয়ন্তী বলল
-আজ বিকেলে পুলিশ পার্কে যদি আসেন তাহলে জানতে পারবেন নীল খামে কি লেখা ছিল ।
আমি খানিকটা কনফিউজ হয়ে গেলাম । মেয়েটা কি আমাকে নিয়ে কোন খেলা করছে ?
গ্রামে আমার একটা সুনাম আছে । অন্তত মেয়ে ঘটিত কোন কোন বদনাম আমার ছিল না । আচ্ছা মেয়েটা ঐ দিনের বদলা নিচ্ছে না তো ! আমি বললাম
-আমি পুলিশ পার্কে যাবো না ।
-সেটা আপনি জানেন ? যদি জানতে চান তাহলে আসবেন । না চাইলে না ।
আমি সত্যি সত্যিই গেলাম না ।
চেয়ারে বসতে বসতে জয়ন্তী আর একবার হাসল । হাসিটা দেখে বুকের ভিতর কেমন যেন একটা কষ্ট অনুভব করলাম । একটা সময় ছিল এই হাসি ছাড়া দিন কাটতো না কিছুতেই আর আজ কত দিন পর এই হাসি দেখলাম ।
৭ বছর !
হুম মুটামুটি সাত বছর তো হবেই ।
জয়ন্তী আমার দিকে তাকিয়েই আছে । আমি ইতস্তর করতে করতে বললাম
-সুমিত তো গাজীপুর গেছে ।
জয়ন্তী হেসে বলল
-অপু তুমি খুব ভাল করেই জানো আমি সুমিতের সাথে দেখা করতে আসি নি !!
-আপনি এলেন না কেন ?
জয়ন্তী খানিকটা অভিমানের শুরেই বলল কথাটা ।
সকালবেলা মুখে ব্রাশ নিয়ে কেবল বাইরে বের হয়েছি এমন সময় এমন দেখি জয়ন্তী সামনে দাড়িয়ে ।
আমি ওর দিকে তাকিয়ে দেকি ওর চোখে পানি টলমল করছে । জয়ন্তী চেষ্টা করছে পানি আটকে রাখার জন্য কিন্তু কতক্ষন আটকে রাখতে পারবে কে জানে ।
জয়ন্তী আবার বলল
-আপনি এলেন না কেন ?
আমি বললাম
-আমি বলেই ছিলাম আমি আসবো না ।
-আমি অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্য ।
-সেটা তোমার সমস্যা । আমি তো তোমাকে অপেক্ষা করতে বলি নি ।
জয়ন্তী কিছুক্ষন নিরব চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল ।
জলভরা চোখে কি অদ্ভুদ সুন্দর লাগছিল মেয়েটাকে । এই সকাল বেলা মেয়েটার চোখে জল দেখে আমার নিজের মনও খানিকটা সিক্ত হয়ে গেল ।
জয়ন্তী বলল
-আপনি খুব খারাপ । একজন মানুষ আপনার সাথে দেখা করার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকলো আর আপনি এলেন না। আচ্ছা আর আসতে হবে না ।
এই বলেই জয়ন্তী চুপ করে গেল । দেখলাম জয়ন্তীর চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে । মেয়েটার চোখের পানি দেখে আসলে কেমন যেন লাগল নিজের কাছে ।
যদিও আমি কিছুই করি নি । আমি কাল ওকে ভাল ভাবেই বলে দিয়েছিলাম যে আমি আসবো না । তার পরেও যদি সে আমার জন্য অপেক্ষা করে সেটা নিশ্চই আমার দোষের ভিতর পড়ে না ।
কিন্তু তবুও আমার কাছে কেমন যেন খারাপ লাগছে ।
কেন লাগছে ?
আশ্চর্য!
জয়ন্তী আর দাড়াল না । জল ভরা চোখ নিয়ে পেছনে হাটা দিল । আমি দাড়িয়ে রইলাম ।
একটু দুরে গিয়ে জয়ন্তী পিছন ফিরে তাকাল । ওর চোখ দিয়ে পানি পরছে তখনও । আমি কেবল ওবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম মেয়েটার দিকে ।
মেয়েটার অশ্রু মাখা চোখের দিকে ।
আমার ভাবতেই অবাক লাগছে যে এই অশ্রু আমার জন্য । মেয়েটা কাঁদছে কেবল আমার জন্য ।
আশ্চর্য ।
আশ্চর্যের উপর আশ্চর্য !!
জয়ন্তী আমার দিকে তাকিয়েই আছে । আমার অস্বস্তি আস্তে আস্তে বাড়ছেই । আমি বললাম
-এটা ঠিক হচ্ছে না । এখানে এভাবে আশাটা তোমার উচিৎ হয় নি ।
জয়ন্তী হাসল একটু । বলল
-চলে যাবো ?
চলে যাবে ! মনটা কেন জানি চাইলো না জয়ন্তী চলে যাক ! থাকুক না আর একটু ।
কি ?
কি ভাবছি এটা ?
কলিগের বউ সে এখন !!
এসব ভাবা উচিৎ না কিছুতেই !
-দেখো তোমার এখানে ...
আমি আমার কথা শেষ করতে পারলাম না । মেয়েটা চলে যাক এটা আমি বলতে পারলাম না ।
জয়ন্তী আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-তুমি যদি আমাকে চলে যেতে বলতে পারো তাহলে আমি এখনই চলে যাবো । পারবে বলবে ?
জয়ন্তীর আচরন দেখে আমি কেমন ধাঁধায় পড়ে গেলাম । ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে ও খুব ভাল করেই জানে আমি তা পারবো না । এতো বছর পরেও ও এতোটা নিশ্চিত কেমন করে ?
আশ্চর্য !
জয়ন্তী সব সময় নিশ্চিত ছিল আমার ব্যাপারে । আমি কি করবো সেই ব্যাপারে যেন আগে থেকেই ও জানে, এমন একটা ভাব ।
ঐ দুপুর বেলা জয়ন্তী একটা পিচ্চি ছেলের হাতে আর একটা চিরকুত দিয়ে পাঠাল । একটা মাত্র লাইন তাও আবার অসমাপ্ত ।
আজ কে যদি না আসেন ...........
কোথায় আসবো কখন আসবো কিছুই লেখা নাই । তবে অনুমান করে নিতে খুব বেশি কষ্টা হল না ।
বিকেল বেলা পুলিশ পার্কে গিয়ে হাজির হলাম ।
মনে মনে বললাম কি দরকার ছিল এমনটা করার ?
কি দরকার ছিল এতো ভাব নেওয়ার !
কালকে আসলেই হত !
কালকে আসলে অন্তত মেয়েটার চোখের জল দেখতে হত না ।
জয়ন্তী এল কিছুক্ষনের মধ্যেই । আকাশী রংয়ের একটা কামিজ সাথে সাদা ল্যাগিংস । হালকা সেজেছে কিন্তু ঠোটে লিপষ্টিক নাই । চুল গুলো পিছনে ক্লিপ দিয়ে আটকানো । তবে কিছু চুল বেড়িয়ে এসেছে । বাতাসে বারবার মুখের উপর চলে আসছে । জয়ন্তী বারবার হাত দিয়ে অবাধ্য চুল গুলো পিছনে সরিয়ে দিচ্ছে ।
আমি জয়ন্তীকে দেখে কিছুক্ষন থ হয়ে গেলাম । যতবার জয়ন্তীকে দেখেছি স্কুল ড্রেসেই দেখেছি । ও দেখতে যে সুন্দর এটা জানা ছিল কিন্তু আজকের সাথে কোন কিছুরই তুলনা করা যায় না । আমি এই মেয়েটাকে কাঁদিয়েছি এ কথা ভাবতেই নিজের কাছে খারাপ লাগছে ।
জয়ন্তীর মুখটা একটু যেন গম্ভীর । সকালের কান্নার রেশ বোধ হয় এখনও কাটে নি । জানি না বাসায় গিয়ে আবারও কেঁদেছে কিনা । জয়ন্তী চুপচাপ এসে আমার পাশে বসলো ।
দুজনেই চুপচাপ বসে থাকলাম কিছুক্ষন । আমি আসলে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছিলাম কিন্তু খানিকটা অস্বস্তি লাগছিল বিধায় কোন কথা বলে চুপচাপ বসে ছিলাম । কিছুক্ষন চুপ থাকার পর জয়ন্তী বলল
-কি ? কোন কথা বলবেন না ? চুপ করেই থাকবেন ?
-না মানে তুমি কি বলবে বলেছিলে ?
-ও তারমানে আপনার কোন আগ্রহ নাই আমার সাথে কথা বলার ?
-আমি সেটা মিন করি নি !
-তাহলে ?
-আসলে...............
আমি কি বলব ঠিক খুজে পেলাম না । জয়ন্তীর পাশে এভাবে বসে থাকতে একটু অস্বস্তিই লাগছিল । নিজেকে খুব বেশি মানিয়ে নিতে পারছিলাম না । জয়ন্তী বলল
-একটা কথা বলব আপনাকে ?
-বল ।
-আপনি কিন্তু আমাকে দুবার কষ্ট দিয়েছেন । একদম বিনা কারনে ।
আমার অস্বস্তিটা আরো একটু বেড়ে গেল । মেয়েটাকি এই কথাই বলবে ।
-কিন্তু তবুও আমি আপনার উপর রাগ করতে পারিনি । জানেন আমি সারা জীবন যেই রকম ছেলে কল্পনা করে এসেছি আপনি তেমন একটা কথা ছেলে ।
এই কথাটা বলেই জয়ন্তী দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকলো । আমি এই রকমই কিছু আশা করেছিলাম কিন্তু তবুও সহজ হতে কিছুটা সময় লাগল ।
জয়ন্তী হাত দিয়ে মুখ ঢেকেই আছে । আমি পড়লাম ঝামেলায় ।
কি করবো এখন ?
একটু সাহস নিয়ে জয়ন্তীর হাত দুটো সরিয়ে দিলাম ।
দেখি ও কাঁদছে ।
আরে এই মেয়ের সমস্যা কি ? এই মেয়ে কাঁদছে কেন ?
-কি হয়েছে তোমার ? কাঁদছো কেন ?
জয়ন্তী কোন কথা না বলল না । কেবল তাকিয়ে রইলো আমার দিকে । ওর চোখের দিকে তাকাতেই আমার নিজের ভিতরেই কেমন একটা কাঁপন অনুভব করলাম ।
আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । জয়ন্তীর ঐ চোখেই যেন সব প্রশ্লের উত্তর ।
-জানো অপু, তোমার চোখ দুটো আমি এখনও খুব মিস করি । কত বছর হয়ে গেছে তবুও ! মনে হয় যেন এইতো কালকের কথা !
জয়ন্তী সেই গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমার অস্বস্তিটা যেন আরও একটু বেড়ে গেল ।
তবে বলবো না যে আমার খারাপ লাগছে ! একটু অস্বস্তি লাগলেও সেটা ভাল লাগার অস্বস্তি !
চোখ সরিয়ে নিতে খুব ইচ্ছা করলেও আমি চোখ সরিয়ে নিলাম না । হয়তো আগের মত এখন চিৎকার করে উঠবে এখন ! না তা হয়তো উঠবে না ।
একবার কেবল এই চোখ সরিয়ে নেওয়ার জন্যই জয়ন্তী পুরো তিন দিন আমার সাথে কথা বলে নি । সেদিনকার কথাটা আমার এখনও খুব ভাল করেই মনে আছে ।
সে দিন জয়ন্তী স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এল । আমরা এমনটা প্রায়ই করতাম । স্কুল ফাঁকি দিয়ে দুজনে যে দিক চোখ যায় ঘুরে বেড়াতাম, রিক্সায় চড়তাম, কখনও বা নৌকায় চড়তাম সারাটা দিন । ঐ দিন গিয়েছিলাম ইস্টান লেকের ধারে ।
বিকেল বেলাটাতে ভিড় থাকলেও সকালের দিকে খুব একটা লোকজন আসে না এখানে । জয়ন্তী আমার খুব কাছেই বসল আমার হাতটা ধরে । কিছু সময় আমার কাধে মাথা রেখে আপন মনেই কথা বলতে লাগল ।
কত রকমের কথা !
আমাকে নিয়ে দেখা কত রকমের স্বপ্ন !
একটু পরেই কাধ থেকে মাথা তুলে বলল
-এই তোমার কোন জিনিসটা আমার সব থেকে প্রিয় ?
আমি খানিকটা কনফিউজড গলায় বললাম
-কোনটা ?
-তোমার চোখ । কেবল তোমার চোখ !
এই বলে জয়ন্তী আমার চোখের দিকে এক ভাবেই তাকিয়ে রইল ।
আমি পরলাম বিপাকে !
আসলে জয়ন্তী এমন গভীর চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল যে আমার অস্বস্থি লাগা শুরু করলো । আমি চোখ সরিয়ে নিতেই জয়ন্তী বলল
-কি ব্যাপার তুমি চোখ সরালে কেন ?
-আরে এ ভাবে তাকিয়ে থাকা যায় নাকি ?
-কেন আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে তোমার ভাল লাগে না ?
-আহা ব্যাপারটা তা না । বাংলা সিনেমায় মত নায়ক নায়িকার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকবে ! এটা আমার দ্বারা হবে না ।
জয়ন্তীর দিকে তাকিয়ে দেখি ওর মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে ।
বলল
-ঠিক আছে আমার দিকে তোমার তাকিয়ে থাকতে হবে না !
এই বলে জয়ন্তী উঠে পড়ল ।
-আরে যাও কই !
জয়ন্তী কোন কথা বলল না । হনহন করে হাটতে লাগল । তারপর পুরো তিনদিন আমাল সাথে কোন যোগাযোগ নাই । অনেক অনুনয় বিনয়ের পর সেই রাগ ভাঙ্গাতে হয়েছিল ।
ইস তখনকার দিন গুলো কি চমৎকারই না ছিল !
চাইলেই কি ভোলা যায় !
অথবা বলা আমি ইচ্ছা করেই ভুলতে চাই না ।
খানিকটা অপরাধ বোধ থেকে হয়তো জয়ন্তীর স্মৃতি আমার কাছে সবসময় উজ্জল ।
হঠাৎ জয়ন্তীর কি হল বলল
-আমি আজকে যাই !
-এখনই যাবে ?
জয়ন্তী হেসে বলল
-তুমি বললে না যে এখানে আসা আমার উচিৎ হয়নি । আবার এখন আমাকে যেতে মানা করছে !
সত্যিই তো !
জয়ন্তীকে দেখে এতোক্ষন অস্বস্তি লাগছিল আর এখন ও চলে যাবে শুনে মনের ভিতরটা কেমন করে উঠল । মনে মনে বললাম আর একটু বস । কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকো আমার দিকে । তোমার তাকিয়ে থাকাটা আমি খুব মিস করি !
খুব বেশি !
বললাম
-কি জন্য এসেছিলে বললে না তো ?
-কোন কারন নেই । একটা কথা জানতে এসেছিলাম কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে কথাটা না বলাই ভাল ।
আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । কারন টা হয়তো আমি জানি । তবুও বললাম
-আর একটু বস !
-না যাই ! সুমিত চলে আসবে হয়তো !
আগে জয়ন্তী এমন টা কখনও করতো না । আমি যদি না বলতাম তাহলে ও কখনও আমাকে ছেড়ে যেত না ।
আমি বললাম
-শোধ নিচ্ছ ?
-শোধ নিচ্ছি মানে ? কি বলছো তুমি ?
কি বললাম ! ছি !!
আমি বললাম
-না কিছু না । সরি ! আর একটু বসলে হয় না ?
-অপু এমন কথা কেন বল ?
-সরি !
জয়ন্তী যাবে বললেও চলে গেল না । বসেই রইলো ।
-আমি কেন এসেছি জানো ?
-কেন ?
-তোমাকে দেখতে ! কাল যখন তোমাকে দেখলাম .......
কিছুক্ষন চুপ থেকে জয়ন্তী বলল
-যখন তোমাকে দেখলাম বিশ্বাস করবা না নিজের ভিতর কি চলছিল । তুমি তো ঐ দিনের পর আর আমার সাথে দেখাই কর নি । তোমাকে দেখতে কি যে মন চাইতো ! নির্লজ্জের মত তোমাদের বাড়ির আশে পাশে কত যে দাড়িয়ে থেকেছি । তুমি নেই এটা জেনেও দাড়িয়ে থেকেছি । কেবল তোমাকে একটু দেখার জন্য !
এই টুকু বলে জয়ন্তী চুপ করে গেল । দেখলাম ওর চোখ দিয়ে পানি পরছে !
এখন এই মেয়েটা আমার জন্য কাঁদে ?
এখনও আমার জন্য চোখের পানি ঝরে ??
আমি কিভাবে থাকবো এখন ?
ওর সাথে দেখা না হওয়াই বোধহয় ভাল ছিল !
তাহলে অন্তত পুরানো কষ্ট টুকু আর মাথা চাড়া দিয়ে উঠত না !
আমাদের দিন কাটছিল খুব ভাল । দেখা হত কথা হত ! আরো কত কিছু !! সারাক্ষন যেন আমরা একটা রঙিন স্বপ্নের ভিতর ছিলাম । কিন্তু স্বপ্ন ভাঙ্গতে খুব বেশি দেরি হল না ।
খুব শীঘ্রই এলাকার সবাই আমাদের সম্পর্কের কথা জেনে গেল । আমাদের বাড়ি পৌছাতেও খুব বেশি সময় লাগলো না ।
ঐদিন আব্বা আমাকে কাঠের চলা দিয়ে এমন ভাবে পিটালো যে আমার মনে আর কিছু ছিল না ।
মিথ্যা কথা বলবো না আমি ঐ দিন বুঝলাম লোকে কেন বলে মাইরের কাছে ভুত পালায় !!
আব্বা তবুও আর রিস্ক নিলো না । আমাকে ঐদিনই মামার বাড়ি পাঠিয়ে দিল । আমি আর আসতেই পারলাম না এলাকাতে !
আর দেখা হল না জয়ন্তীর সাথে !!
-একটা কথা বলবো ?
-বল ?
-এই বার আমাকে ছেড়ে না গেলে হয় না ?
আমি অবাক হয়ে বললাম
-মানে ? কি বলছো তুমি ?
-আমি খুব ভাল করে চিনি তোমাকে । তোমাকে আমি যত দুর চিনি চোখে সামনে আমাকে অন্য কারো সাথে, এটা তোমার সহ্য হবে না ।
মনে আছে তুমি একবার কি পরিমান রাগ করেছিলে আমি তোমার এক বন্ধুর সাথে একটু হেসে কথা বলেছিলাম বলে !!
আমি এবার সত্যি অবাক না হয়ে পারলাম না । জয়ন্তীর এখনও সব কিছু মনে আছে ! এমন কি আমার মনে কি চলছে এটাও ও ধরে ফেলেছে !
আমি কাল রাতেই ঠিক করেছিলাম যে আমি আর এখানে থাকবো না ।
আমাদের কোম্পানির নতুন ব্রাঞ্চ খুলেছে সাভারে । ওখানে চলে যাবো ভাবছিলাম ।
আসলেই সুমিতের সাথে জয়ন্তীকে দেখলে আমার সহ্যই হবে না । আসলেই সহ্য হবে না ! এর থেকে চোখের সামনে থেক দূরে চলে যাই !
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম ।
-প্লিজ !
-জয়ন্তী ! আমার সহ্য হবে না এটা ! কিছুতেই হবে না !
জয়ন্তী আর বেশিক্ষন দাড়াল না ।
জয়ন্তী চলে যাবার পর কেন জানি বুকের ভিতর পুরানো বিষন্নতা ভর করে রইল । আসলেই দেখাটা না হলেই বোধ হয় ভাল হত !! সব কিছু একটা পুরানো ক্ষতের মত শুকিয়ে গিয়েছিল । আবার যেন জেগে উঠলো !
জীবন বাবু ঠিকই বলেছিলেন, "কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে"
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now