বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
সোনালি আপু
(৪০) সরকারি তিতুমীর কলেজে অনার্সে ভর্তি হলাম। ঢাকায় থাকতে হবে। ১০ দিন ধরে বাসা খুঁজছি। ব্যাচেলর থাকার অপরাধে ভাড়া দিতে চায় না কোনো বাড়িওয়ালা। একদিন দেখি রাস্তা সংলগ্ন বিদ্যুতের খুঁটিতে লিফলেট টানানো। একজন হিন্দু ছাত্র রুমমেট আবশ্যক। যোগাযোগ ০১৯১১...। কল দিয়ে ঠিকানা জেনে বাসায় গেলাম। নমস্কার। আমি আশিষ কুমার দেবনাথ। কথা পাকাপাকি হলো। রুম ভাড়া এক হাজার ৫০০ টাকা। রাজি হলাম। এক তারিখে বাসায় উঠলাম। সপ্তাহ খানেক গুটিশুটি মেরে কাটিয়ে দিই। আমি যে মুসলমান তা জেনে যাওয়ার ভয়ে আছি।
নাহ্, এভাবে চলবে না। সবার সঙ্গে মিশতে হবে। কারও বাজার করে দিই। কারও বাবুকে নিয়ে খেলা করি। কারও ছোটখাটো সমস্যায় এগিয়ে যাই। যদিও বাস্তবে এতটা ভালো নই। সরল আর বোকাদের ভুল নাকি সবাই মেনে নেয়। তাই সরল আর বোকা সাজলাম। দুই মাসে সবার সঙ্গে মিশে গেলাম। মাসি, পিসি, ঠাকুমা সবার সঙ্গে মিশলাম। সবচেয়ে বেশি মিশেছি সোনালি আপুর সঙ্গে। বাসার মালিকের বড় মেয়ে। মাস্টার্স পাস, সুশিক্ষিতা নারী সোনালি আপু। চমৎকার নৃত্য পারেন তিনি। আমি নৃত্যপাগল। আপুকে গল্পে, গানে, আড্ডায় খুশি রাখি। আপুর আদেশ যত কঠিনই হোক না কেন তা পালন করি। যেন খুশি হয়ে আমাকে নৃত্য দেখান। আপুর মাঝে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। ফলে বিউটি পার্লারে, পার্কে, কেএফসিতে, শপিং মলে সর্বত্র আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান। আমার সব রকম খোঁজ-খবর রাখেন। কখনও জানালা দিয়ে মজাদার খাবার রেখে যান। সন্ধ্যায় বা রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ছাদে গিয়ে গলা ছেড়ে দু'জনে গান গাই। গান শুনে আপু অবাক হন। অবাক হয়ে আমাকে এমন কিছু বলেন, যা শুনে আমি অবাক হই। ছয় মাস পার হলো। এরই মধ্যে সবাই জেনে যায় যে আপুর চেয়ে জুনিয়র, বোকাসোকা সরল এই আমি আপুর স্নেহের কাঙ্গাল। কিন্তু ইদানীং আপুর চলন-বলন পাল্টে গেছে, যা হওয়ার নয় তা বারবার ইঙ্গিত করছে। প্রথমত আমি মুসলমান, দ্বিতীয়ত আমি জুনিয়র। তাই ভয়ে আর লজ্জায় গলা শুকিয়ে যায় আমার। একদিন সকালে গৌরী শংকর কাকাকে (বাসার মালিক) বুঝিয়ে বাসা ছেড়ে দিলাম। আপু বারবার কল দেয়। রিসিভ করি না। কিন্তু আপুকে ভুলতেও পারছি না। আমার বুকের ভেতরটা হু হু করে কাঁদে প্রায়ই। আপুর আদর, স্নেহ, ভালোবাসার স্মৃতি বারবার মনে পড়ে। বাধ্য হয়ে সিমটা অফ করে দিই। কিন্তু সোনালি আপুকে কীভাবে ভুলি?
"প্রোপোজাল বাই ফুচকা"
(৪১) মেসেন্জারের ক্রিং ক্রিং শব্দে ঘুম ভাঙলো ইষাণার। নেট কানেকশন অফ না করেই ঘুমিয়ে পড়েছিল রাতে। ফোন টা হাতে নিয়ে দেখে "অর্নব সেন্ট এ স্টিকার".. ৫৩ টা স্টিকার পাঠিয়েছে। আরও পাঠাচ্ছে। কোনো থামাথামি নেই। ইষাণা মাথা গরম করে ফোন দিল অর্ণব কে। ফোন রিসিভ করল অর্ণব..
অর্নব: এতক্ষনে ঘুম ভাঙসে? মরার মত ঘুমাস নাকি?
ইষানা: আজব! মেজাজ খারাপ করার কথা আমার! আর মেজাজ দেখাচ্ছিস তুই??
অর্ণব: আসলে ফোনে টাকা নেই। তাই ফেইসবুকে মেসেজ করছি তোর ঘুম ভাঙানোর জন্য। জানি তো প্রতিদিনের মতই নেট অন রেখে ঘুমিয়ে যাবি তুই। হে হে হে।
ইষাণা: তোর মত বেয়াদব আর একটা ও দেখি নি। একটু শান্তিমত ঘুমাতে দিবি না?
অর্নব: এত কথা নেই। তাড়াতাড়ি ভার্সিটি আয়। ইমপর্টেন্ট কথা আছে। এই কথা বলে ফোন কেটে দিল অর্নব। ভার্সিটি এসেই অর্নব কে দেখে ইষানা বললো,
ইষাণা: কি ব্যাপার? কি তোর ইমপর্টেন্ট কথা? বল।
অর্নব: কই? কি? কি কথা?
ইষাণা: মানে কি? তুইই তো বললি!
অর্নব: ওওও। হ্যাঁ মনে পড়েছে। আজকে কি বার?
ইষাণা: এইটা তোর ইমপর্টেন্ট কথা? উফফ্ আমি যাচ্ছি।
অর্নব: দাড়া দাড়া। বলছি বলছি।
ইষানা: বল তাড়াতাড়ি।
অর্ণব: আয় প্লিজ ফুচকা খাই। খেতে খেতে বলি? প্লিজ।
ইষাণা: ওহ! ওকে চল। হাঁটতে হাঁটতে বলছে,
অর্নব: তোকে আজকে খুব সুন্দর লাগছে।
ইষাণা: কি? এই কথা তুই বলছিস?!! সবসময় তো বলিস, জংলীর মতো লাগে।
অর্নব: জংলীদেরকে ও মাঝে মাঝে সুন্দর লাগে।
ইষানা: চুপ! গরু। তোর ইমপর্টেন্ট কথা বল।
অর্নব: কালকে বলি?
ইষাণা: উফ্ফ আমি বাসায় যাচ্ছি। কাজ আছে।
অর্নব: কি কাজ? দেখতে আসবে নাকি তোকে?
ইষানা: হুম তাই। তোকে বলতে ভুলে গেছিলাম! তুই ঠিকই ধরেছিস। দেখতে আসবে আজকে। হয়তো এন্গেজমেন্ট ও হয়ে যেতে পারে আজকে!
অর্নব: মানে কি?? ফাইজলামি করবি না।
ইষানা: সত্যি বলছি। তোর ইমপর্টেন্ট কথা টা বল। কাল থেকে আর ভার্সিটি আসবো না। কথা টা কিন্তু আর বলা হবে না তোর।
অর্নব: কি বলছিস এসব? আমি বলবো না কথাটা।
ইষানা: বল। নাহলে যাচ্ছি। আর দেখা হবে না কিন্তু।
অর্নব: ইয়ে মানে, কথাটা হচ্ছে "আই লাভ ইউ".
ইষানা: গাধা! এই কথা টা বলতে এতদিন লাগালি? যাক আজকে তোর মুখ থেকে কথাটা বের করতে পারলাম।
অর্নব: বলে আর কি হবে? আজ তো তোর এন্গেজমেন্ট!
ইষানা: হি হি হি। আরে না। দুষ্টামি করছি। ইষানার চুল টেনে ধরে বললো,
অর্নব: ফাজিল একটা! আর একটু হলে হার্ট আ্যটাক করতাম।
ইষানা: চুপ ছাগল! আমি এখন থেকে তোর গার্লফ্রেন্ড। চুল ধরবি না আমার।
অর্নব: এখন থেকে তো চুলের মুঠি ধরে ঘুরাবো।কিন্তু তুই এখনো আমার গার্লফ্রেন্ড হতে পারিস নি। লাভ ইউ টু বল।
ইষানা: আগে সুন্দর করে প্রপোজ কর। অর্নব মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে একটা ফুচকা হাতে নিয়ে বললো,
অর্নব: আই লাভ ইউ জংলী।
অর্নবের হাত থেকে ইষানা ফুচকা টা নিয়ে খেয়ে বললো,
ইষাণা: লাভ ইউ টু বিড়াল ছানা।
অর্নব: বাহ্! গরু গাধা ছাগল বিড়াল কিছুই বাদ রাখলি না! হুহ্...
তোমার সুখে সুখি আমি
(৪২) ইশিতাকে আজ অসাধারণ লাগছে লাল বেনারসি শাড়িতে। সাব্বির এই প্রথমবার তাকে স্কার্ফ ছাড়া দেখছে। কাঁধ পর্যন্ত লম্বা স্ট্রেইট সিল্কি চুলগুলোর দিক থেকে চোখ সরাতে কষ্ট হচ্ছে তার।
"এই সাব্বির!"
ইশিতার হঠাৎ ডাকে লজ্জা পেয়ে গেল সাব্বির। চোখ সরিয়ে রাস্তার পাশের দোকানের দিকে গভীর মনযোগ দিয়ে তাকাল সে।
- "কি দেখছিলা ঐভাবে?" ইশিতার গলায় চাপা হাসি।
সাব্বির একটু লাল হয়ে বলে, - "না মানে স্কার্ফ ছাড়া আগে দেখি নাই তো, তাই অন্যরকম লাগছে..."
ইশিতা হাত দিয়ে নিজের চুলগুলো এলোমেলো করে বললো, - "আমারো অন্যরকম লাগছে। কি যেন নাই মনে হচ্ছে"
সাব্বির কিছু বললো না। রিক্সা ওয়ালা আয়েশ করে প্যাডেল মারছে। তার ছেড়া স্যন্ডেলের দিকে তাকিয়ে সাব্বির তিন বছর আগে পিছিয়ে গেল।
একুশে বই মেলায় ইশিতার সাথে প্রথম দেখা। কবিতার বই উলটে পালটে দেখছিলো মেয়েটা। মেয়েটার সাথে থাকা কয়েকজন বন্ধুর মধ্যে তারও বন্ধু ছিল। সেখানে পরিচয়... তারপর গত তিন বছরে কত যায়গায় কত অকেশনে তাদের দেখা হয়েছে- পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূল, বাণিজ্য মেলা বা ভার্সিটির কালচুরাল ফাংশন- যতবার দেখা হয়েছে, নতুন ভাবে মেয়েটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে সাব্বির। তারচেয়েও বেশি ভাল লেগেছে মেয়েটার শার্প পার্সোনালিটি। মেয়েটার বুদ্ধিদীপ্ত চোখ।
আজ প্রথম বারের মত মেয়েটার পাশে বসে রিক্সায় চড়ার সুযোগ হয়েছে।
অন্যমনস্ক ছিল সাব্বির, ইশিতা হঠাৎ রিক্সা থামাতে বলায় চমকে উঠলো।
- "খুব পিপাসা পেয়েছে সাব্বির, পানি খাব" সাব্বির পায়ের কাছে রাখা বড় দুইটা লাগেজের দিকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
- "একমিনিট বস।"
একমিনিটের জায়গায় দশ মিনিট লাগালো সাব্বির। পানির বোতলের সাথে তার হাতে একটা বড় প্যাকেট। ইশিতা প্রশ্ন করার আগেই সাব্বির বললো,
- "ট্রেইনে খেতে হবে তো"
ইশিতার মুখে প্রশংসার হাসি ফুটে উঠলো। সাব্বির চোখ সরিয়ে নিল।
রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে দারুন ভীর। তার মাঝেই একহাতে ভারী একটা ব্যাগ, আরেক হাতে লাগেজ টেনে জায়গা করে হাঁটছে সাব্বির, তার ঠিক পিছনেই ইশিতা। ইশিতার চোখে অস্থিরতা, ইতি উতি করে কাকে যেন খুজঁছে।
"ঝ" বগির সামনে আসতেই সাদা শার্ট পরা লম্বা এক যুবক প্রায় ছুটে এসে ইশিতার হাত চেপে ধরলো। সাব্বির ব্যাগ দুইটা নামিয়ে অল্প হাঁপাতে লাগলো।
ছেলেটা এবার ইশিতাকে ছেড়ে সাব্বিরকে জড়িয়ে ধরলো,
- "অনেক অনেক থ্যাংকু তোরে দোস্ত, তুই ছাড়া আর কেউ এত করতো না রে..."
সাব্বির বিরক্ত গলায় বললো,
- "আরে ছাড় বেটা, এমনি ঘামায় গেসি"
ছেলেটার মুখে হাসি, চোখে পানি। সাব্বির কে ছেড়ে সে লাগেজ দুইটা নিয়ে ইশিতাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিতে গেল।
সাব্বির প্লাটফরম থেকে একবোতল পানি কিনে খেতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ছেলেটা নেমে এল ট্রেন থেকে...সাব্বির এগিয়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে ধরে বললো,
- "হিমেল, যেই ভালবাসাটুকুর জোরে এত বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস, সেটা যেন ঠুনকো না হয়ে যায়। তোদের দুই জনের জন্য আমি অনেক বড় ঝুঁকি নিতে পারি, কিন্তু তারপর যদি শুনি তোদের মধ্যে কোনো ঝামেলা হইসে, কসম বললাম, আমি নিজে এসে তোদের দুইটাকে পিটিয়ে হাড্ডি মাংস গুড়া করে ফেলব"
হিমেল জোরে হেসে উঠে। প্লাটফর্মের কেউ কেউ ঘুরে তাকায় তাদের দিকে।
হুইসেল দিয়ে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। জানালা দিয়ে হিমেল আর ইশিতা পাগলের মত হাত নাড়ছে। সাব্বিরও হাসি মুখে হাত নাড়তে নাড়তে মনে মনে ভাবলো,
- "বিদায় ইশিতা। আমার যে ভালো লাগাটুকু মুখ ফুটে কখনও বলতে পারিনি, তার চেয়েও বেশি ভালবাসা তুমি আমার এই বন্ধুটাকে দিও।"
ঘুরে ফেরার পথ ধরে সাব্বির, অনেক কাজ বাকি। সাব্বিরের মত কেউ কেউ ভালবাসে অকারণেই, কোনো প্রাপ্তির আশা ছাড়া এসব ভালবাসাই হয়তো আমাদের এই পাপ-পংকিল পৃথিবীটাকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now