বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
তোর জন্য রাখা পূজার ফুল মন্দিরেই আছে। সেটা ভালবাসা হয়নি!
X
তোর জন্য রাখা পূজার ফুল মন্দিরেই আছে। সেটা ভালবাসা হয়নি!
(২২) -কিরে এমন ভাবে কি দেখছিস?
-তোকে শরৎচন্দ্রের নায়িকা মাধবীর মত লাগছে!কি যেন ছিল উপমা টা! “......অনেক কাল বৃষ্টি হইবার পরে সূর্য উঠিলে হটাত যেমন লোকে সেদিকে চাহিতে চায় ,ক্ষণকালের কালের জন্য যেমন মনে থাকেনা সূর্যের পানে চাহিতে নাই! চাহিলে চক্ষু পীড়িত হয়.........” তেমনি আমার চক্ষুও পীড়িত হচ্ছে! আঁচলে মুখ ঢাক! জ্যোতি রিনঝিন করে হাসল। সে হাসি মাধবী লতার চেয়েও শুভ্র। অনেক বেশি পবিত্র। আজ জ্যোতির জন্মদিন। তাই এত আয়োজন করে সেজেছে সে। নীল রঙের শাড়িটা যেন আকাশের সবটুকু নীল ধারন করেছে বুকে। হয়ত জ্যোতি পরেছে বলে!
- তাড়াতাড়ি আয়! কেক কাটবো! জ্যোতির ডাকে ভাবনায় টান পড়লো। একটা নীল পরি কেক কাটছে।তার পাশে ঘিরে আছে অনেক গুলা অনাথ আশ্রমের বাচ্চা। পরী টা সবাইকে কেক খাওয়াচ্ছে। বাচ্চাগুলার আনন্দ দেখে আমার মত কাঠখোট্টা মানুষেরও চোখ ছলছল করে উঠল। নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য অনেক সৌভাগ্যবান মনে হল। আমি অবাক হয়ে ভাবি এত শক্তি কোথায় পায় মেয়েটা! প্রচণ্ড শীতে আমরা যখন কম্বল মুড়ি দিয়ে প্রেমিকার সাথে প্রেমালাপে উত্তপ্ত হওয়ায় ব্যাস্ত তখন সে ছুটে যায় কমলাপুরের বস্তি গুলোতে।ঘুমন্ত মানুষ গুলকে ডেকে হাতে তুলে দিয়েছিল মানুষের কাছ থেকে চেয়ে আনা একটা করে গরম কাপড়। এই ঘুনে ধরা সমাজের হিংস্র মানুষ গুলোকে কি একটুও ভয় পায়না মেয়েটা! রিক্তার ফোন বাজছে। ধরতে ইচ্ছে করছে না।ধরলেই ঝারি খাবো। আয়তুল কুরছি পরে বুকে ফু দিয়ে ফোন ধরলাম!
- কই ছিলা সারাদিন? একটা বার ফোন দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলা না!
- রিক্তা, আজ জ্যোতির বার্থডে!
- ও!!! এই কথা! এজন্যই সারাদিনে একটা বার আমার কথা মনে পরে নি! কাল তো আমার সাথে জ্যোতির কথা হল তখনতো আমাকে ও ইনভাইট করল না! নাকি গেস্ট হিসেবে তুমি একাই......। লাইন টা কেটে দিলাম। এই অবুঝ মেয়েটা কে এখন যাই বলি তার মাথায় ঢুকবে না। মাথা ঠাণ্ডা হলে একটু পর নিজেই ফোন দিয়ে সরি বলবে। মেয়েটা একটু বেশিই ভালবাসে আমাকে!
বাসায় ফিরে অনেক বার ফোন দিলাম রিক্তা কে... কিন্তু ফোন ধরার নাম নেই। ফোন টা রাখতেই জ্যোতি কল করল।
-স্যার , কালকে যে কুইজ সে কথা কি মনে আছে? নাকি সারাদিন প্রেম করলেই পাশ করা যাবে?সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম! কিন্তু লজ্জায় বলতে পারলাম না! ফোন রেখে পড়াশুনায় মন দিলাম! জীবনে প্রেমের চেয়ে অনেক জটিল কিছু সাবজেক্ট আছে তা বই খুলেই বুঝলাম।সবকিছু নির্দিষ্ট দুরত্ত রেখে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। নাহ ৩ মাসের পড়া কি আর এক রাতে শেষ হয়? পরদিন যথারীতি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে জ্যোতির পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। জনৈক মহামানব বলেছেন “everything is fair in exam hall!” কিন্তু বিধি বাম। স্যার ৪ সেট প্রশ্ন করায় একটু বেকায়দায় পরে গেলাম। কুইজ শেষে মুখ ভার করে বসে আছি।
-সরি রে দোস্ত। স্যার আজ এত অল্প সময় দিছে যে তোর সব কোশ্চেন গুলার আনসার বলে দেয়ার সময় পেলাম না।
মহামানবির কথায় অবাক হলাম! সে লাস্ট মিনিটেও নিজের লেখা বাদ দিয়ে আমাকে বলে দিচ্ছিল! আর এখন বলে সরি! বুঝিলাম ইহারা অন্য জাতের মানুষ!
(২)
সামনেই ফাইনাল। ইমপ্রুভ এর ভয়ে হলেও পড়ায় মন দিলাম। বিপদে পরলাম অডিট আর ম্যাথ নিয়ে। জ্যোতি অডিটে ভাল। অডিট বুঝতে ক্লাস শেষেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা পরে থাকতাম ক্যাম্পাসে। গ্রুপ স্টাডি করতে গিয়ে প্রায়ই জ্যোতির টিউশন মিস হত। মেয়েটা অনেক রাতে বাসায় ফিরত কখন কখনও। তখনও নিস্তার নেই। স্বার্থপরের মত ফোন দিতাম ম্যাথ গুলার আন্সার মিলানোর জন্য। কখনও বলত না আমি ক্লান্ত! পরিক্ষা চলাকালীন দিন গুলোতে রিক্তা কে একদম সময় দিতে পারছিলাম না। অভিমানীর সাথে দূরত্ব টা বেড়েই চলেছে। এর মাঝে একদিন ফোন দিয়ে ওয়েটিং পেলাম। বুকের ভেতর টা কেমন যেন করল। অনেকক্ষণ পর লাইন পেলাম। যে প্রশ্ন কখনও করিনি তাই করে বসলাম।
- কার সাথে কথা বললা এতক্ষণ!
- তুমি আমাকে সন্দেহ কর! করবাই বা না কেন! মানুষ যখন নিজে অন্যায় করে তখন দুনিয়ার সবাই কে অপরাধি মনে হয়। বলেই ফোন টা কেটে দিল। বুঝলাম শুধু দূরত্ব বাড়েনি। বিশ্বাসের সুতোয়ও টান পরেছে। কিন্তু আমার তখন অতশত ভাবার সময় ছিল না। আরও একটা পরীক্ষা বাকি। শেষ পরীক্ষার দিন লক্ষ্য করলাম জ্যোতির মন খারাপ। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
-কিরে মাদার তেরেসা মন খারাপ ক্যান?
- পরীক্ষা ভাল হয়নি তেমন। এডমিশন টেস্ট এর পড়া পড়তে গিয়ে এদিক টা ঠিক রাখতে পারিনি।
- তোর যদি ভাল কোথাও চান্স হয়ে তাহলে কি চলে যাবি এখান থেকে?! খুব বোকার মত প্রশ্ন করে আরও বোকা হয়ে গেলাম যখন দেখলাম মেয়েটা নিশব্দে কাঁদছে! কি বলা উচিৎ বুঝতে পারছিলাম না। রিক্তার কথায় নীরবতা ভাঙল। কখন সে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। এরপর রিক্তা যা বলল তা সহ্য করার ক্ষমতা জ্যোতি কেন পৃথিবীর কোন নারীরই নেই। কোথায় যেন পরেছিলাম ‘সুন্দর এর ও অস্ত্র আছে এবং তা অনেক ভয়ংকর। রিক্তা সেই অস্ত্র দিয়ে জ্যোতি কে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। আমি সেদিন বন্ধুত্ব কে ভালবাসার উপরে স্থান দিতে পারিনি। তাই আর কোনদিন জ্যোতির মুখোমুখি হওয়ার সাহস পাইনি। তার কিছুদিন পর একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে জ্যোতি চলে যায় সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। শুধু আমাকে বলেনি। এত কিছুর পর নির্লজ্জের মত আমি সেটা আশা করছিই বা কি করে!
(৩)
আজ রিক্তা নিশ্চয়ই সাদা শাড়ি পরেছে। আজ তার বেলিফুল চাই। কিন্তু অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে সব গুলো ফুলের দোকান ঘুরেও কোথাও বেলিফুল পেলাম না। মুঠোফোনে অচেনা নাম্বার থেকে বার্তা এসেছে। পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না। বাসায় গিয়ে পড়া যাবে। বেলি ফুল দেখতে না পেয়ে রিক্তার একটু মন খারাপ হল বুঝতে পারলাম। কিন্তু যখন আলতো করে জড়িয়ে ধরে লক্ষ্মী বউ বলে ডাকলাম তখন সব অভিমান দূর হয়ে গেল। বলল ‘ চল ছাদে যাই।একটা মাদুর পেতে তাতে রিক্তা বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এমন স্বর্গীয় অনুভূতির মাঝে কেন মেসেজ টার কথা মনে পরল বুঝলাম না। পকেট থেকে ফোন তা বের করে পড়লাম। রিক্তাও পড়ল। খুব সাদামাটা উইশ।
“ বিবাহ বার্ষিকী শুভ হোক”
-জ্যোতি
তবুও এইদিনটার সর্বশ্রেষ্ঠ উইশ মনে হল। রিক্তার চোখমুখে অনুশোচনার ছায়া অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম। খানিকটা ইতস্তত করে প্রশ্ন করল “ আচ্ছা তুমি সত্যিই কি কখনও জ্যোতি কে ভালবাসনি?!" পাগলী টা কে বুকের আর একটু কাছে এনে বললাম – "জ্যোতি আমার ভেতরের এমন একটা সত্তা যাকে মন প্রান সঁপে শ্রদ্ধা করা যায় কিন্তু হৃদয় উজার করে ভালবাসা যায় না। শুধু দুঃখ একটাই ও যে জিনিস সবচেয়ে অপছন্দ করত সেই ভুল বুঝেই আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেল।
মেঘ বৃষ্টিতে মোড়ানো মিষ্টি পাগলামীর গল্প
(২৩) মেঘার সাথে আমার প্রথম দেখা আজ থেকে প্রায় ২ বছর আগে। কোন এক পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন প্রায় ডুবতে যাচ্ছে ঠিক এমন সময়ে ক্লাস শেষ করে বাসায় আসছিলাম। এমনিতেই সারাদিনের ক্লাসের চাপে প্রচন্ড টায়ার্ড। বাসে একটি সিট পেতেই বসে পরলাম। পাশে একটি মেয়ে বসেছিল। বাসের হেল্পার যখন ভাড়া নিতে আসল তখন আমি ভাড়া দিয়ে দিলাম। কিন্তু পাশের মেয়েটি বলল ভাড়া পরে নিতে। হেল্পার চলে গেলে মেয়েটি ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছিল। কথা-বার্তা থেকে বুঝলাম ওর কাছে কোন টাকা নেই। আমি সাধারণত অপরিচিত কারও সাথে যেচে পড়ে কথা কখনই বলি না। কিন্তু ফোন রাখার পর আমি ওকে বললাম যে ভাড়া নিয়ে কোন টেনশন না করতে। আমি দিয়ে দিব। সাথে সাথে ও আমার সাথে ঝগড়া করা শুরু করে দিল। কেন আমি তার ভাড়া দিব, আমার কি ঠেকা পড়েছে এই নিয়ে বিশাল প্যানপ্যানানি শুরু করল। এমনিতেই খুব ক্লান্ত ছিলাম তাই আর কোন কথা না বলে ওকে সরি বলে সিটে মাথাটা এলিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বোধ হয় হেল্পার এল এবং বিশাল জোড়ে চিল্লাচিল্লি করা শুরু করল। সামনের সিট থেকে উতসুক কয়েকজন উঠে এল এবং নানাকথা বলতে লাগল। পাশে তাকিয়ে দেখি প্রচন্ড শক্ত মেয়েটা লজ্জায় একেবারে চুপসে গিয়েছে। আমি আর কোন কথা না বলে হেল্পারকে ১০ টাকা দিয়ে দিলাম। সারা রাস্তায় ও আরেকবারও একটি কথাও বলল না। মনে মনে বললাম কি রকম দেমাগ মেয়ের! একটা ধন্যবাদও দিল না। দুনিয়া বড়ই আজীব। পরের স্টপিজে ও যখন নামতে নিল তখন হঠাত করেই বলল- আপনার মোবাইল নম্বরটা দিন। টাকা ফ্লেক্সি করে দিব। আমি তাকে আমার মোবাইল নম্বরটা দিয়ে দিলাম। সেদিন রাতেই আমার মোবাইলে ১০ টাকা চলে আসল। টাকা পাওয়ার সাথে সাথে মনে মনে হেসে উঠলাম।
কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমি এক দিন একা হাটতে হাটতে বই মেলায় চলে এসেছি। চারদিকে অনেক তরুন-তরুনী। প্রত্যেকটা সেকেন্ডে আমার অনুভূতি তখন চেঞ্জ হচ্ছিল। একবার মনে হচ্ছিল একা এসে চরম বোরিং লাগছে। ফ্রেন্ডদের নিয়ে আসলে অনেক ভাল হত। আবার মনে হচ্ছিল একা এসে ঠিকই করেছি। আমার আবার পুরা পাগলা রোগ ধরেছে। যেই দৃশ্যই দেখি কেন যেন মনে হয় এটাই আমি কিছুদিন আগে স্বপ্নে দেখেছি! হঠাত করে পকেটের মোবাইলে রিং বেজে উঠল। সম্পূর্ণ অপরিচিত এক নম্বর। ফোন টোন রিসিভ করতে এক-দম ইচ্ছে করছিল না। তাও করলাম। ওপাশ থেকে এক মেয়ে কন্ঠ প্রথমেই জিজ্ঞাস করল আমি ব্যস্ত কি না!! ফোন করলে মানুষ হাই হ্যালো এসব বলে। কিন্তু ব্যস্ত কি না এটা জিজ্ঞাস করতে এই প্রথম দেখলাম। আমার ইতস্তত দেখে ওপাশ থেকেই বলল যে ও ওই বাসের মেয়েটা। ওই ঘটনা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। যাই হোক, কিছুক্ষণ কথা হল। হঠাত করে ও বলল ও বইমেলায়। পুরাই টাস্কি খেয়ে গেলাম। তারপর ওকে আমার অবস্থানের কথা বললাম। ও সব কিছু জেনে আমাকে ৪ মিনিট বট-বৃক্ষের মত দাড়ায়ে থাকতে বলল। আমি তার আদেশ পালন করতে লাগলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই মনে হল আমার এই উসকো চেহারা দেখলে ও তো দৌড়ে পালাবে! তাও কথা যেহেতু দিয়েই ফেলেছি সেহেতু থাকতেই হয়। ও এসে উপস্থিত হয়েই আমার চেহারার করুণ অবস্থা নিয়ে প্রচন্ড বড় বক্তৃতা দেওয়া শুরু করল। আরে বাপ, একজন আরেকজনের নামই জানি না তাতেই এত কিছু! আরও কথার মাঝখানে তার নাম পরিচয় নেওয়া হল। কথা থেকে বুঝলাম দুইজনই বই পাগল। সেখান থেকেই শুরু। কি এক অজানা বাধনে বাধা পড়লাম। না পারলাম বাধনটাকে কাটতে না পারলাম ভেঙ্গে ফেলতে।
প্রতিদিনই বই মেলায় আসা। মেলার সব বই নিয়েই আমাদের দীর্ঘ গবেষণা। কোন বইয়ে কি ভাল কি লেখলে আরও বেশি ভাল হত এসব নিয়ে আমাদের যুক্তি তর্কের কোন শেষ হত না। আমার প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ আর ও ক্লাসিকেল বই বেশি পড়ত। এসব নিয়ে আমাদের যুক্তি আর ঝগড়া ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। ও যুক্তিতে হেরে গেলে যে কি প্রচন্ড মন খারাপ করত। ওর মন খারাপ করা দেখে আমিও ইচ্ছে করে ওর সাথের যুক্তিতে হেরে যেতাম। ও যে ঠিকই বুঝে নিত ওর কাছে হেরে যেতে আমার ভাল বই খারাপ লাগে না এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই!! আমরা একই ভার্সিটিতে পড়তাম(ডিপার্টমেন্ট আলাদা)। আমাদের দুজনকে নিয়ে ফ্রেন্ড সার্কেলে প্রায় সব সময়ই আলোচনার ঝড় উঠত। ফ্রেন্ডগুলাও যে কি রকমের! আরেক জনের প্রেম সহ্য করতে পারে না। আড়ালে আবডালে কত কথা। অবশ্য আমরা এসব কথার নিকুচি করতাম। যত্ত সব আতেলগিরি!! আমরা আমাদের মতই সময় কাটাতাম। সময় পেলেই রিকশা করে ঘুরে বেড়ানো। রিকশা দিয়ে ঘুরাও যে চরম রোমান্টিক তা আমি মেঘার কাছে থেকেই প্রথম জেনেছি!
নাম মেঘা দেখেই ও মনে হয় বৃষ্টির জন্য পাগল। আমিও যে ভিজতে খুব অপছন্দ করি তাও না। তবে বৃষ্টি হলে মেঘার আর কোন কথা নেই। বৃষ্টিতে তার ভিজা লাগবেই। আর তার সঙ্গী হওয়া লাগে এই আমাকে। এই বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে কত ঝগড়া হয়েছে তার সাথে। একবার তো প্রায় রিলেশন ভেঙ্গে যাওয়ারই উপক্রম হয়েছিল!! সেবারের মধুর ঝগড়া শুরু হয়েছিল অনেক ছোট্ট একটা কারণে- একদিন সকাল থেকে প্রচন্ড মেঘে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। আমার সাত সকালের কঠিন ঘুম পাগলীটা। সেদিন আমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে কই কই কিভাবে ভিজবে তার দীর্ঘ বর্ণনা করতে লাগল। আমার প্রচণ্ড ঠান্ডা লেগেছিল। কিন্তু, এটা জানতে পারলে পাগলীটা মনে অনেক কষ্ট পাবে তাই আর কিছু না বলে পাগলীর সাথে প্রায় সারাদিনই বৃষ্টিতে ভিজলাম। ফলে যা হওয়ার তাই হল। বাসায় ফিরলাম ১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে। পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বাসায় প্রচণ্ড কান্নার শব্দ। তাকিয়ে দেখি পাগলী বাসায় এসে হাজির। ফ্রেন্ডদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে বাসায় এসে হাজির। আমি কেন তাকে বলি নি আমার সেদিন ঠান্ডা লেগেছিল সেটা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তে লাগল। কেমনে কেমনে আমার আম্মুকেও পটিয়ে ফেলল! যদিও সে সেদিন বাসা থেকে অনেক খাবার রান্না করে নিয়ে আসল। খেতে যে কত অসাধারণ হয়েছিল তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষত আমার আম্মু যখন অন্য রুমে গেল সে তখন আমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগল। কেন যেন তখন মনে হল জ্বর হয়ে তো অনেক ভালই হয়েছে।
তার সাথে আমার যত ঝগড়া হয় অন্য জুটির মধ্যে বোধ হয় এত ঝগড়া হয় না। উফফ!! বিয়ের পর বাচ্চা কাচ্চা হলে কি নাম হবে, প্রথম বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা নিয়ে কত ঝগড়া! কে কাকে বেশি ভালবাসে এসব নিয়ে ঝগড়ার কোন শেষ হয় না। ভালই লাগে এসব মধুর ঝগড়া গুলো। আজকে আবার ভ্যালেন্টাইন ডে। বিশেষ দিন। এই দিনে সেজেগুজে ওই মহারানীর জন্য দশটা লাল গোলাপ কিনে নিয়ে যেতে হবে। একটা জিনিসই বুঝি না ভালবাসার জন্য আবার বিশেষ দিনের কি দরকার!! যত্তসব। তাও মহারাণীর হুকুম যখন মানতে তো হবেই।
আমাকে ছেড়ে যাবিনাতো পাগলি . . .?
(২৪) ক্লাস থেকে বের হয়ে একটু চিন্তায় পরলাম। পকেটে মাত্র একশ টাকা। সম্বল বলতে এটুকুই। কাল নীরার জন্মদিন। তিন বছর ধরে একসাথে আছি। মেয়েটাকে কখনোই কিছু দেয়া হয়নি। পৃথীবিতে কিছু কিছুমেয়ে আছে যারা অল্পতেই খুশী। নীরাও তাই। ও এমন একটা মেয়ে যার কাছে কিছুই লুকানো যায়না। আর তাই তিন বছরের মধ্যে ওর সামনে কখনো মন খারাপ করতে পারিনি। এমনিতেই ও অনেক বেশি কেয়ারিং।নীরার সাথে আমার পরিচয় ফার্মগেটে।
ইউ-সি-সি তে কোচিং করার সুবাদে। ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়ে প্রথমেই নিজেকে গুছিয়ে নিতে কিছু সময় লাগে। জীবনের বড় একটা অংশ মেয়েদের কাছ থেকে দূরে থাকারফলে মেয়েদের প্রতি তীব্র কৌতূহল ছিল। যদিও ছেলে হিসেবে আমি বেশ লাজুক প্রকৃতির। একবার কোচিংএর সামনে বসে ফুচকা খাওয়ার পর টাকা দিতে গেলে খেয়াল করলাম পকেটে মানিব্যাগ নেই। এক প্রকার অস্বস্তির মধ্যে পড়লাম।
ছোটবেলা থেকেই আত্মসম্মান বোধটা আমার প্রচন্ড। ফুচকাওয়ালাকে বললাম 'মামা, মানিব্যাগ ফেলে এসেছি। আমার কাছে টাকা নাই। এই ঘড়িটা রাখুন।' দোকানী বিজয়ীর হাসি দিল। স্টিভ জবস আইপড আবিস্কার করে যেমন হাসি দিয়েছিলেন অনেকটা সেরকম। জীবনের সেই চরম অপমানজনক অবস্থা থেকে নীরাই আমাকে রক্ষা করেছিল। সেই থেকে একসাথে আছি। জীবনের বাকীটা পথও এভাবেই থাকার ইচ্ছা।মনে মনে একটা হিসেব দাঁড় করালাম। কাল নীরার একুশতম জন্মদিন। শাহবাগ থেকে একুশটা সাদা গোলাপ কিনতে হবে। আর সাথে নীরার সবচেয়ে পছন্দের কৃষ্ণপক্ষ বইটা। সবমিলিয়ে দেড়শ টাকার মধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা। বিকেলে অবশ্য হাতে কিছু টাকা আসবে। প্রথম আলোর সাহিত্য পাতায় গত সপ্তাহে আমার একটা লেখা ছাপা হয়েছিল। তার সম্মানী হিসেবে কিছু পাওয়ার কথা। আসলে ঢাকা শহরে অর্থের কষ্টটা কাউকে বুঝতে দেয়া যায়না। প্রিয় মানুষ গুলোকে তো না ই। আর নীরা যদি জানতে পারে আমার এ অবস্থাতা হলে নির্ঘাত খুন করে ফেলবে। হাতে এক হাজার টাকার নোট ধরিয়ে দিয়ে বলবে 'ধুর গাধা। ফ্রেন্ডদের কাছে কিছু লুকোতে হয়?' গত তিনবছরে অনেকবার এমন হয়েছে। যদিও নীরা আমার শুধু বন্ধুই না, বন্ধুর চেয়ে কিছুটা ওপরে।
আর প্রেয়সীর চেয়ে কিছুটা নিচে। তবে আমার ইচ্ছে কাল ওকেআমার ভালোবাসার কথা বলবো।আগে থেকেই প্লান করা। সকালে ও টিএসসি তে আসবে। সেখান থেকে দু জন ধানমন্ডী যাবো। বিকেলে আশুলিয়া। নীরার সাথে ঘোরার একটা আলাদা মজা আছে। সারাক্ষন পাগলামী করবে। কখনো চুল ধরে,কখনো শার্ট ধরে টান মারবে। আর সবসময় হাসির কথাবার্তা। দামী কোন রেস্তোরায় খেতে গেলে বলবে 'ধুর বোকা,তুই কি অনেক টাকা আয় করিস? তার চেয়ে আয় বাদাম খাই। শোন বাদাম হলো ভালোবাসার ফল। দেখিসনা খোসার মধ্যে দু টো ফল। একটা তুই আর একটা আমি। আর আবরন হয়ে আছে ভালোবাসা কিংবা বন্ধুত্ব। বলেই জোড়ে হাসত। ঢাকা শহরের আকাশ বাতাস কাঁপানো সে হাসি দেখে মনে হত এই মেয়ের কোন দুঃখ নেই।থাকতে পারেনা।বিকেলে কাওরান বাজারে প্রথম আলোর অফিসে গেলাম। যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অল্প কিছু টাকা বেশি পাওয়া গেলো। হলে ফেরার পথে একুশটা সাদা গোলাপ কিনলাম। ইচ্ছে ছিল লাল গোলাপ কিনবো। কিন্তু নীরা এখনো আমার বন্ধু। লাল গোলাপ দেয়ার সাহস হলোনা।
ফুল কেনার পর গেলাম আজিজ মার্কেটে। অনেকখুঁজে কৃষ্ণপক্ষ বইটা কিনলাম। হাতে কিছু টাকা বেশি থাকায় একটা কবিতার বই ও কিনলাম। নীরার আবার সুনীল খুব পছন্দ। মাঝেমাঝে ক্লাসের ফাঁকে ও বলত ...এই গাধা,তুই কি কিছুই লিখতে পারিসনা? দেখিস না সুনীল কি সুন্দর করে লিখেছে...এ হাত ছুঁয়েছে নীরার হাত। আমি কি এ হাতে কোন পাপ করতে পারি? ইস যদি কেউ আমার হাত ধরে এভাবে বলত. . . .দেখতাম নীরার অভিমানী চোখ দুটো ছলছল করে উঠতো।
আমার খুব ইচ্ছে হত নীরার হাত ধরে বলি 'আমি আর কখনো পাপ করবোনা নীরা, তোর হাত টা একটু ধরতে দিবি???গত চৌদ্দই ফেব্রুয়ারীর কথা। খুব সকালে নীরার ফোন। ঘুম জড়ানো কন্ঠে মোবাইল রিসিভ করে বললাম 'কি রে,তুই এত সকালে? ওপাশ থেকে নীরা শাসনের সুরে বললো 'আমি কলাভবনের সামনে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে চলে আয়। আমি স্বভাবতই একটু ঢিলেঢালা। নীলা জানতো আমার আসতে আধঘন্টা লাগবে। তবুও অসহায়মেয়েটি আমার পথের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কিছুক্ষন পর এসে দেখি নীরা দাঁড়িয়ে আছে। নীল শাড়ী পরা নীরাকে দেখে মনে হল এক টুকরো আকাশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুগ্ধ চোখে নীরার দিকে তাকিয়ে বললাম 'তুই আসলেই অনেক সুন্দর...'নীরা অভিমানের স্বরে বললো 'তুই আসলেই গাধা, এতো দিনে খেয়াল করলি? শুধু আমার মনের ভেতর কোথাও বেজে উঠতো ...ভালোবাসি তোমাকে. . ."সকাল থেকেই নীরার জন্যে অপেক্ষা। কখনো ও এত দেরী করেনা।
মনের মাঝে অজানা আশঙ্কা কাজ করছে। আজ আবার হরতাল। কখন কি হয় বলা যায়না। আজ অনুধাবন করলাম অপেক্ষার কষ্ট আসলেই অনেক। প্রতিবারইনীরাকে যা আমার জন্যে সহ্য করতে হয়। এসব ভাবতে ভাবতে সামনে আগালাম। গোলাগুলির শব্দ। নীরার মোবাইলে ফোন দিলাম। অনেক আওয়াজের মধ্যে অপরিচিত একটা কন্ঠ বলল 'একটা মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে,শাহবাগ মোড়ে আসেন। আমি অবাক বাকরুদ্ধ হয়ে উদভ্রান্তের মত ছুটলাম। ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে দেখি নীরা। মাটিতে লুটিয়ে আছে।
ফিনকি দিয়ে পরা রক্তের অজস্র ধারায় সাদা শাড়ী খানা খয়েরী হয়ে গেছে।. . . .তানভীরের ডাকে তন্দ্রা ভাঙলো। এই ওঠ বারোটা বাজে। নীরাকে Wish করবিনা? হঠাত্ করেই নিজেকে আলাদা এক জগতে আবিস্কার করলাম। কি দুঃস্বপ্নটাই না দেখেছি। এক মুহুর্ত দেরী না করে নীরাকে ফোন দিলাম। এক রিং হতেই নীরা ফোন ধরল। 'কি ব্যাপার হাঁপাচ্ছিস ক্যানো?কি হয়েছে?????"আমি বললাম 'নীরা আমি তোকে অনেক অনেক ভালোবাসি।আমাকে ছেড়ে যাবিনাতো. . . .?'
নীরা বললো কি পাগলের মত কথা বলছিস,কি হয়েছে বলবিতো? আমি বললাম "শোন কাল তোর আসতে হবেনা। দেশের অবস্থা ভালো না। কাল হরতাল...'নীরা অবাক হয়ে বলল ক্যানো?মুখ থেকে মনের অজান্তেই বের হয়ে গেল 'আমি তোকে হারাতে চাইনা. . .I love u Neera, I love u so much.
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now