বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

________মিস্ট্রিয়াস________1,2ও3 পর্ব

"রহস্য" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Niyan Ahmed (০ পয়েন্ট)

X _________পর্ব-১__________ --আচ্ছা, আপনি বাংলোটা বিক্রি করতে চান কেন?" প্রশ্নটা করলাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটাকে। লোকটার বয়স চল্লিশও হতে পারে, আবার পঞ্চাশও হতে পারে, চেহারা দেখে বয়স বুঝা দায়। ঘনঘন সিগারেট টানার অভ্যাস আছে তার। হাতের সিগারেটটায় একটান দিয়ে ধোয়া ছাড়লেন তিনি। আমি নাকে হাত চেপে ধরলাম। আমি আবার সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারিনা একদম। সিগারেটে কয়েক টান দিয়ে লোকটা আমার দিকে তাকালেন সরাসরি। মন্তব্য করলেন: আচ্ছা, চা খেতে খেতে কথা বলি আমরা?" চা খাওয়া যায়? চা তো পান করার জিনিস। লোকটার ভুল সংশোধন করে দেয়ার ইচ্ছে ছিল। কষ্ট পাবে ভেবে সংশোধন করে দিলামনা। --হুমমম, চলুন.... এই ঠান্ডায় এক কাপ চা হলে মন্দ না।" বলেই ভদ্রতা করে একটা হাসি দিলাম আমি। লোকটার সাথে উনার বাসার ভেতরে গিয়ে বসলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে লোকটা জিজ্ঞেস করলেন: আপনার পরিচয়?" --জি, আমার নাম রানা চৌধুরী। পেশায় কিছুনা। একজন শখের গোয়েন্দা। বাবার অগাধ টাকা আছে, আর আমি ইচ্ছে মতো নষ্ট করি। এডভেঞ্চার আর রহস্য ভালো লাগে। তাই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন পেয়ে আপনার বাংলোটা কিনতে এসেছি। এবার আপনার সম্পর্কে বলুন।" লোকটা আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন: আমার নাম মাহতাব সিকদার। পেশায় একজন ফিল্ম ডিরেক্টর। বাংলোটাতে আমরা কেউ থাকিনা। ওটা শুধু শুধু পড়ে আছে তাই বিক্রি করতে চাই।" --ও আচ্ছা, আপনাকে তাহলে টাকাটা ২ দিন পরে দিচ্ছি। --আচ্ছা। --এখন তাহলে আসি। আর দুইদিন পর আমি বাংলোটাতে উঠব।" মাহতাব সিকদারের সাথে হ্যান্ডশেক করে চলে এলাম সেদিন। ২ দিন পর বাংলোটাতে উঠলাম আমি। সাথে মাহমুদ। মাহমুদ অনেকদিন ধরে আমার সাথে থাকে। বাবা-মা নেই তার। এতিম ছেলে। বয়স ১৭ বছর। প্রথমদিন তাকে ফুটপাতে শুয়ে থাকতে দেখে মায়া হয়েছিল আমার। কথা বলে বুঝলাম মেধাবী ছেলে। সেদিন থেকে আমার সাথে রেখে দিই তাকে। তারপর থেকে সবসময় আমার সাথেই থাকে সে। মাহমুদ আর আমি মিলে বাংলোটা গুছালাম। বাহির থেকে তেমন সুন্দর না দেখালেও, ভেতরে অনেক সুন্দর বাংলোটা। এত সুন্দর একটা বাংলো এত সস্তা দামে দিয়ে দিলেন মাহতাব সিকদার। ব্যাপারটা অদ্ভুত লাগল আমার কাছে। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কারণটা এখন আমাকে খুঁজে বের করতে হবে। --মাহমুদ, রান্নাটা শেষ হয়ছে?" পেটে খিদে অনুভব করতেই মাহমুদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করলাম। সারাদিন কাজ করে খুব টায়ার্ড হয়ে গেছি। --হ্যা ভাইয়া হচ্ছে। আর একটু ওয়েট করেন।" বাথরুমে গিয়ে হাতমুখ পরিষ্কার করতে করতে মাহমুদের রান্না শেষ হয়েছে। তারপর দুইজন একসাথে বসে খাওয়া শুরু করলাম। খেতে খেতে হঠাৎ মাহমুদের চোখ গেল জানালার ওপাশে। --ভাইয়া ওখানে কে?" চিৎকার করে উঠল মাহমুদ। তড়িৎবেগে ঘুরে তাকালাম আমি। বাইরে চাঁদের আলোতে কাউকে দেখতে পেলামনা আমি। তবে কারো হাটার শব্দ শুনলাম। খাওয়াটা অর্ধেক রেখে, হাত ধুয়ে তাড়াতাড়ি বের হলাম আমি। অনেক্ষণ খুঁজে কাউকে পেলামনা। বাংলোর পেছনে কিছু ভাঙ্গা হাতের চুড়ি খুঁজে পেলাম। মাহমুদ এসে পাশে দাঁড়াল আমার। --কে এসেছিল ভাইয়া?" মাহমুদ জিজ্ঞেস করল। মোবাইলের টর্চ লাইটটা জ্বেলে ভাঙ্গা চুড়ির উপর আলো ফেললাম আমি। --একটা মেয়ে....।" ভাঙ্গা চুড়িগুলো মাটিতে থেকে তুলতে তুলতে বললাম আমি। --মেয়ে?" মাহমুদ অবাক হল। --হ্যা মেয়ে। --কিন্তু এতরাতে এখানে মেয়ে আসবে কোত্থেকে? কাছাকাছি তো কোন ঘর নেই। তাও আবার এই টিলার উপর মেয়ে আসবে কেন এত রাতে?" মাহমুদের চোখে বিস্ময়। --বুঝতেছিনা এখনও, মেয়েটা এদিক দিয়ে পালিয়েছে। পালানোর সময় হয়তো এই জায়গায় এসে হোচট খেয়ে পড়ে গেছিল?" --পড়ে গেছিল? কিভাবে বুঝলেন?" মাটিতে আবারও আলো ফেললাম আমি। তারপর বললাম: দেখ, দুইটা হাতের ছাপ লেগে আছে মাটিতে। --কিন্তু এই ছাপ তো আগেরও হতে পারে?" --হ্যা, আগের হতে পারত, কিন্তু আগের না। এই বাংলোতে অনেকদিন ধরে কেউ থাকেনা। আগের ছাপ হলে এতদিনে মুছে যেত। আর এই ছাপটা কেউ পালাতে গিয়ে অসতর্ক হয়ে পড়ে যাওয়ার জন্য হয়ছে। আর দেখ, হাতের আঙুলগুলো তার লম্বা লম্বা। --হুমমম বুঝলাম, কিন্তু কে আসছিল এখানে? আর এভাবে পালিয়ে গেল কেন?" --খুব শীঘ্রই জানতে পারব। যে এসেছিল, সে নিশ্চয়ই আবার আসবে। চল, এখন ঘুমাব।" --হুমমম.... চলেন।" দুজনে বাংলোর ভেতরে আসলাম। ভেতরের রুমটাতে আমি থাকলাম, আর সামনের রুমে মাহমুদ। খুব ক্লান্ত আমি, তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়ার সাথে সাথে ঘুম চলে এল আমার। কিন্তু শান্তিতে বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। হঠাৎ ধড়পড় করে উঠে পড়লাম ঘুম থেকে। দরজায় ধাক্কা দিয়ে মাহমুদ "ভাইয়া ভাইয়া" বলে চিৎকার করতেছিল। দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলাম তাকে: কি হয়েছে মাহমুদ?" --ভাইয়া, অদ্ভুত একটা শব্দ শুনলাম আমি। কেউ আমাদেরকে এখান থেকে চলে যেতে বলছে।" মাহমুদের কথা শেষ হতে না হতেই আবার শুরু হল। কেউ যেন ভয়ংকর কণ্ঠে বলছে: ওরে মূর্খের দল, চলে যা, চলে যা এখান থেকে। নিজের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে চলে যা।" তারপর থেমে গেল কণ্ঠটা। --মাহমুদ, চল বাইরে গিয়ে দেখে আসি।" কথাটি বলে বিছানা থেকে নামলাম। মাহমুদ ভয় পেয়ে বলল: কিন্তু ভূত/টূত কিছু না তো?" --আরে কি বলিস? আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা। যাবি আমার সাথে?" মাহমুদকে কাঁপতে দেখে বললাম: ঠিক আছে তুই এখানে থাক, আমি একাই দেখে আসি।" --না ভাইয়া চলুন। আমিও যাচ্ছি সাথে।" তারপর দুজনে বের হলাম আমরা। যেদিক থেকে শব্দটা এসেছিল সেদিকে গেলাম দুজন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলামনা। --কি হচ্ছে ভাইয়া এসব?" মাহমুদের কণ্ঠে ভীতি ফুটে উঠল। --বুঝতেছিনা এখনও। কেউ হয়তো চাই আমরা এখানে যেন না থাকি। --কিন্তু, ওটা তো কোন মানুষের কণ্ঠ বলে মনে হলনা।" --মাথা থেকে বাদ দে ওসব। চল, ঘুমাবি..... তারপর রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙল মাহমুদের ডাকে। চোখ খুলে তাকালাম ওর দিকে। --কি হয়েছে?" জিজ্ঞেস করলাম। --ভাইয়া, একটা মেয়ে আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।" --মেয়ে!!! কোন মেয়ে?? --চিনিনা। আপনি দেখেন। --ঠিক আছে, তুই ওকে বসতে বল। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। --আচ্ছা...." দাঁত ব্রাশ করে ফ্রেশ হতে হতে ১০ মিনিট লেগে গেল। তারপর সামনের রুমে গিয়ে দেখলাম একটা তরুণী মেয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে মেয়েটি একটু নড়েচড়ে বসল। একটা চাদর জড়ানো তার গায়ে। দেখতে যথেষ্ট রূপবতী মেয়েটা। চেহারায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ ফুটে উঠেছে তার। মেয়েটার মনে হয় ঠান্ডা লাগতেছে, হাতদুটো চাদরের ভেতর বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়েছে। --আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলামনা।" মেয়েটার সামনের সোফায় বসতে বসতে বললাম। মেয়েটা ইতস্তত করে বলল: আমার নাম শিখা। এখানকার স্থানীয় আমি। --হুমমম, কোন দরকারে কি এসেছেন আমার কাছে? --হ্যা, একটা কথা বলার জন্য এসেছি। --আচ্ছা, আমরা চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা বলি।" তারপর মাহমুদের উদ্দেশ্যে আওয়াজটা বাড়িয়ে বললাম: মাহমুদ, দুই কাপ চা দিয়ে যা এখানে....." একটুপর মাহমুদ চা নিয়ে এল। একটা কাপ শিখার দিকে বাড়িয়ে দিলাম আমি। তারপর বললাম: হ্যা, এইবার বলুন..... শিখা চাদরের ভেতর থেকে হাত বের করে চায়ের কাপটা নিল। চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়ে শিখা বলল: কেন এসেছেন আপনি এখানে?" --কেন এসেছি মানে?" অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। --এখান থেকে চলে যান, এটা খারাপ জায়গা। এখানে আগে যারা থাকত, তারা কেউ বেশিদিন থাকতে পারতনা। সবার কিছু না কিছু অঘটন ঘটেছে। তাই বলছি সময় থাকতে চলে যান।" --আপনি কি আমাকে সাবধান করতে এসেছেন এত সকাল সকাল? --দেখুন, কাউকে সাবধান করাটা আমার কর্তব্য। আপনাকে সাবধান করেছি, এখন আমি আসি।" বলেই হাতের খালি কাপটা ট্রেতে রাখল শিখা। তারপর উঠে দাঁড়াল। দরজা থেকে বের হল সে। পিছন থেকে আমি ডাক দিলাম: মিস শিখা, একটু দাঁড়ান।" শিখা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ঘুরে তাকাল আমার দিকে। --জি বলুন?" আগ্রহ দেখাল সে। --আপনার ভাঙা চুড়িগুলো নিয়ে যাবেননা?" প্রশ্ন করলাম আমি। --মানে?" অবাক হল শিখা। গতরাতে কুড়িয়ে পাওয়া ভাঙা চুড়িগুলো এগিয়ে দিলাম তার দিকে। তারপর বললাম: মনে হয় আপনার চুড়ি, নিয়ে যান। --এগুলো আমার চুড়ি না।" --কিন্তু চুড়িগুলো তো বলতেছে এরা এতদিন আপনার হাতে বসবাস করেছিল। --কি যা তা বলতেছেন? চুড়ি কি করে কথা বলবে?" বলার সময় শিখার গলা কেঁপে উঠল লক্ষ্য করলাম। --চুড়ি কথা বলেনা, কিন্তু এটা সত্যি যে এগুলো আপনার। আপনার হাতটা চাদর থেকে বের করুন তো, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে আপনার হাতে একটা কাটা দাগ থাকবে।" শিখা চাদর থেকে তার বাম হাতটা বের করল, ওখানে কোন কাটা দাগ নেই। --এবার ডান হাতটা বের করুন।" বললাম আমি। শিখা ভয়ে ভয়ে বের করল ডান হাতটা। একটা কাটা দাগ সত্যি সত্যি আছে ওখানে। --বিশ্বাস করুন, ওগুলো আমার চুড়ি না।" শিখা বলল। --দেখুন, মিথ্যে বলবেননা। আমি জানি এগুলো আপনার চুড়ি। এই কাচের চুড়িটা দেখুন, এখানে একটুখানি রক্ত লেগে আছে। যা আপনার হাতের ঐ ক্ষতস্থানের রক্ত। --আপনি কি করে এতটা শিওর হলেন যে, ওটা আমার হাতের রক্ত?" --প্রমাণ করার জন্য কি এখন ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্লাড টেস্ট করব?" --আচ্ছা থাক, করতে হবেনা। আমি মানলাম ওটা আমার রক্ত। আর চুড়িগুলো আমার। --আপনি গতরাতে এখানে এসেছিলেন কেন?" শিখা থতমত খেয়ে বলল: আসলে, আমি গতরাতেও এসেছিলাম আপনাকে সাবধান করার জন্য।" কিন্তু হঠাৎ ভয় পেয়ে গেছিলাম। রাতের বেলায়, অপরিচিত দুইটা লোক, আর একা একটা মেয়ে আমি। বুঝতেই তো পারছেন। তাই পালাতে হয়েছিল। কিন্তু পালাতে গিয়ে একটা ইটে হোচট খেয়ে পড়ি। কিন্তু আপনি কি করে বুঝলেন ওটা আমি?" শিখার চোখে বিস্ময়। আমি একটা রহস্যের হাসি দিলাম তখন। (চলবে......) _________পর্ব-২_________ শিখার বিস্মিত চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। পাশে এসে দাঁড়াল মাহমুদ। সেও আগ্রহ দেখাল জানার জন্য। শিখার দিকে তাকিয়ে বললাম: কাল, আপনি হোচট খেয়ে পড়েছিলেন, ওখানে আপনার ভাঙা চুড়িগুলো পাই, আর আপনার হাতের ছাপ পাই। ওখান থেকে বুঝলাম আপনার হাতের আঙুলগুলো লম্বা হবে। আর একটা ভাঙা চূড়িতে কিছুটা রক্ত দেখলাম, তার থেকে ধারণা করলাম আগন্তুকের হাত নিশ্চয়ই কেটেছে, আর যেহেতু হোচট খেয়েছে, তাও আবার শীতকালে, সেহেতু একটু খুড়িয়ে হাটবে। এই তিনটা ক্লু মিলে গেল আপনার সাথে। আপনি চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সময় খেয়াল করলাম, আপনার হাতের আঙুল গুলো লম্বা, আর আপনি হাটার সময় একটু খুড়িয়ে হাটলেন, দুইটা ক্লু যখন মিলে গেল, তখন আন্দাজ করলাম তৃতীয় ক্লুটাও মিলতে পারে, এবং মিলেও গেল, আপনার ডানহাতে কাটা দাগ ছিল, একসাথে তিনটা ক্লু তো অন্যজনের সাথে কাকতালীয়ভাবে মিলতে পারেনা, তাই নিশ্চত হলাম, এটা আপনি।" আমার কথা শুনে শিখা অবাক হয়ে বলল: ভেরি জিনিয়াস!" আমি বললাম: এখানে জিনিয়াসের কিচ্ছু নেই। কমনসেন্স থাকতে হয় একটু।" --আচ্ছা আসি।" বলে শিখা সামনে পা বাড়াল। আমিও ভেতরে এসে ব্রেকফাস্টটা শেষ করলাম। তারপর বের হলাম বাইরে। কিছু বাজার করতে হবে। বাংলো থেকে ১০ মিনিটের দুরত্ব বাজারের। কিছু তরকারি কিনলাম, মাছ কিনলাম। মাছ কিনতে গিয়ে মাছ বিক্রেতা আমাকে জিজ্ঞেস করল: ভাই কি এখানে নতুন?" --হ্যা, ঐ বাংলোটা কিনে ওখানে উঠেছি।" জবাব দিলাম আমি? আমার কথা শুনে মাছ বিক্রেতা চমকে উঠল। বলল: ওটা তো খারাপ জায়গা, আপনি ওখানে উঠছেন কেন?" --আচ্ছা, আমাকে কি বলবেন ওখানে খারাপ কি আছে?" --সে অনেক কথা। সময় নিয়ে বলতে হবে। --আচ্ছা, আমি আজ আপনাকে লাঞ্চের দাওয়াত দিলাম, দুপুরে আমার ওখানে খাবেন আজ। যাবেন কিন্তু। তারপর আপনার কথা শুনা যাবে।" মাছ বিক্রেতা আমার কথায় রাজি হল। দুপরে খাওয়ার সময় লোকটার সাথে পরিচিত হলাম। নাম কালাম। স্থানীয় বাসিন্দা। আমিও নিজের পরিচয় দিলাম উনাকে। খাওয়ার পর বললাম: হ্যা কালাম সাহেব, এবার বলুন তো এই বাংলোটা সম্পর্কে....." একটু কেশে কালাম নিজের গলাটা ঝাকিয়ে নিল। তারপর বলতে শুরু করল: এই এলাকার প্রভাবশালী লোক ছিলেন রহমান সিকদার। উনার দুই ছেলে ছিলেন, আলতাফ সিকদার এবং মাহতাব সিকদার। রহমান সিকদারের মৃত্যুর পর উনার দুই ছেলের এই বাংলোটার প্রতি লোভ হল, বাবা মৃত্যুর আগে সব বিষয় সম্পত্তি দুই ছেলের নামে লিখে দিলেও বাংলোটা কারো নামে লিখে দেয়নি। তাই দুই ভাইয়ের মধ্যে সবসময় রেষারেষি চলত। একদিন আলতাফ সিকদার ঐ বাংলোয় গিয়ে উঠে তার নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে। এটা মানতে পারেনি মাহতাব সিকদার। দুই ভাইয়ের মধ্যে সেদিন অনেক ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে মাহতাব সিকদার আহত হয়। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আলতাফ সিকদার তখন ভুল বুঝতে পারে। শত হলেও ভাই তো তার। একমাত্র ছোট ভাই। মাহতাব সিকদার কিছুটা সুস্থ হলে আলতাফ সিকদার হাসপাতালে গিয়ে ছোট ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাই। মাহতাব সিকদার বড় ভাইকে ক্ষমা করে দিল সেদিন। তারপর দুই ভাই মিলে গেল। এলাকায় তাদের বিশাল বাড়ি থাকতেও ওরা থাকতো ঐ বাংলোয়।" এই পর্যন্ত বলার পর আমি থামালাম কালাম সাহেবকে। --আচ্ছা কালাম সাহেব ঐ বাংলোয় এমন কি আছে যে ওরা বিশাল বাড়ি থাকতে ঐ বাংলোয় গিয়ে থাকতো?" --সেটা আজ পর্যন্ত কেউ জানেনা ভাই।" --আচ্ছা, তারপর বলুন......" কালাম সাহেব আবারও গলাটা ঝাকিয়ে নিল। তারপর আবার বলতে শুরু করল: এরপর দুইভাই মিলে সুখে বসবাস করতে লাগল। দুই ভাইয়ের মধ্যে গলায় গলায় ভাব। একদিন মাহতাব সিকদার তার ব্যবসার কাজে শহরে যায়। কিন্তু তিনি ফিরে আসার পর সবকিছু পাল্টে যায়। তার ভাবী আত্মহত্যা করে। আর তার বড় ভাইকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেলনা। সবাই ধারণা করেছে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে প্রচুর ঝগড়া হয়। স্ত্রীকে আলতাফ সিকদার অনেক মারধর করে। তারপর এক পর্যায়ে রাগ করে আলতাফ সিকদার স্ত্রী, পরিবার ছেড়ে চলে যায়, আর কখনো ফিরে আসেনি। আর ঐদিনই তার স্ত্রী স্বামীর উপর অভিমান করে আত্মহত্যা করে।" --আচ্ছা, আলতাফ সিকদার আর তার স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা কেমন ছিল?" কালাম সাহেবকে বাধা দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।" --ওরা তো একজন আরেকজনকে খুব ভালোবাসত।" কালাম সাহেব বললেন। --এই ঘটনার আগে কি তাদের মধ্যে কোনদিন ঝগড়া হয়েছিল।" --না, সেটা কোনদিন হয়নি।" --তাহলে মাহতাব সিকদার যেদিন শহরে যায়, সেদিন এমন কি হয়েছে যার কারনে একটা লোক উধাও হয়ে গেল, আর তার স্ত্রী আত্মহত্যা করল? --সেটা তো আমরা জানিনা।" --আমার মনে হয়না, আলতাফ সিকদার উধাও হয়েছে, আর তার স্ত্রী আত্মহত্যা করেছে।" --মানে?" --মানে, হতে পারে এটা প্লানিং মার্ডার। মানে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক সবকিছু হয়েছে। হঠাৎ করে একটা লোক স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে উধাও হয়ে যাবে কেন? আর শুধুমাত্র একটা দিন ঝগড়া করে স্ত্রীও বা আত্মহত্যা করবে কেন?" --এই গোয়েন্দাদের এক সমস্যা, সবাই এক নজরে দেখলে ওরা আরেক নজরে দেখে।" --হ্যা ভাই, গোয়েন্দারা সন্দেহের বাইরে কাউকে রাখেনা। তারপর কি হল বলেন?" --তারপর ঐ বাংলোয় মাহতাব সিকদার একা থাকতে শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি বিয়ে করেন। কিন্তু তার বউটা বেশিদিন রইলনা, কে যেন তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে রক্তাক্ত অবস্থায় রেখে দেয় বাংলোর ফ্লোরে। তারপর মাহতাব সিকদার আবার বিয়ে করেন, পরের মাসের একই তারিখে সেই বউটারও রক্তাক্ত দেহ পাওয়া যায় ফ্লোরে। কে বা কারা যেন নির্মমভাবে খুন করে রেখে দেয় তাকেও। এরপর মাঝেমাঝে গভীররাতে একটা মেয়ের কান্না শুনা যেত এখানে। প্রতিমাসের একই তারিখে একটা করে খুন হয় এই বাংলোয়। মাহতাব সিকদার তখন বাংলো ছেড়ে তার বাড়িতে উঠেন। আবারও বিয়ে করেন। এরপর তিনি এই বাংলোটা বিক্রি করে দেন। কিন্তু যারা এই বাংলোটা কিনেছিল, তারা কেউ আজ বেঁচে নেই। মাহতাব সিকদার তখন এটা আরেকজনকে বিক্রি করেন। এভাবে অনেকবার বিক্রি হয়েছে এই বাংলোটা, কিন্তু যে বা যারা এই বাংলোটা কিনত, তাদের হয়তো মৃত্যু হত, নইলে ওরা বাংলো ছেড়ে পালিয়ে যেত। এবার আপনি কিনলেন এই বাংলোটা। কে জানে, এবার হয়তো আপনার মৃত্যু দরজায় কড়া নাড়ছে।" কালাম সাহেব থামলেন। আমি একটা মৃদু হাসি দিয়ে বললাম: আমার মৃত্যু? অনেকদিন মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখিনা, এইবার তাহলে মৃত্যুর সাথে একটা এডভেঞ্চার হয়ে যাক....." (চলবে.......) ________পর্ব-৩________ আমার কথা শুনে কালাম সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। তারপর বললেন: মানলাম আপনার সাহস আছে, কিন্তু অতিরিক্ত সাহস থাকাটা ভালো না। এখন তাহলে আসি।" --আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। হুমমম.... মাঝেমাঝে আসবেন এখানে।" কালাম সাহেব চলে যাবার পর অনেক্ষণ ঝিম ধরে বসে থাকলাম। মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যার কোন উত্তর আমার জানা নেই। ডায়রিটা খুলে কিছু প্রশ্ন লিখে রাখলাম। ১).মাহতাব সিকদার বাংলোটা সস্তায় বিক্রি করলেন কেন? ২).মধ্যরাতে অদ্ভুত কণ্ঠটা আসলে কার ছিল, যে আমাকে এখান থেকে পালিয়ে যেতে বলেছে? ৩).এই বাংলোতে এমন কি ছিল বা এখনো আছে, যার কারণে আলতাফ সিকদার এবং মাহতাব সিকদার দুইভাই বাংলোর জন্য ঝগড়া করেছিল? এবং পরবর্তীতে দুইভাই মিলে গিয়ে বাংলোয় থাকতে শুরু করল কেন বিশাল বাড়ি থাকা সত্ত্বেও? ৪).আলতাফ সাহেবের স্ত্রী আত্মহত্যা করল কেন? আর আলতাফ সিকদার উধাও হল কেন? আর সেদিনই মাহতাব সিকদারকে ব্যবসার কাজে শহরে যেতে হল কেন? ৫).গভীর রাতে মাঝেমাঝে এখানে কোন মেয়ে কান্না করে? আর প্রতিমাসের একটা নির্দিষ্ট তারিখে কে খুন করতে আসে? ব্যাপারটা কি আসলেই ভৌতিক? নাকি মানুষেরও হাত আছে? নাকি পুরোটাই মানুষের হাত? প্রশ্নগুলো লিখে কিছুক্ষণ ভাবতে লাগলাম। মাহমুদ ছিল পাশে। সে হঠাৎ বলে উঠল: ভাইয়া প্রথম প্রশ্নটার উত্তর মনে হয় আমি জানি।" --কি??" জিজ্ঞেস করলাম তাকে। --বাংলোটা যেহেতু ভৌতিক পরিবেশে পরিণত হয়েছে, বেশি দামে কে কিনতে চাইবে এটা? তাই মাহতাব সিকদার এটা সস্তা দামে বিক্রি করে দেন।" আমি একটু ভেবে মাহমুদের দিকে তাকিয়ে বললাম: মাহমুদ, বিষয়টা তুই এভাবে ভেবে দেখ, এই যে এই বাংলোটা ভৌতিক পরিবেশ হয়ে উঠার কারণে সবচেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে কার? --মাহতাব সিকদারের। --হুমমম.... এই বাংলোটা যারা কিনে তারা মারা যায়, ফলে মাহতাব সিকদার নতুন করে বাংলোটা আবার বিক্রি করে। সস্তায় বিক্রি করে কারণ এটা তো তার লাভ, ক্ষতি তো হচ্ছেনা, প্রতিমাসে তিনি বাংলোটা বিক্রি করতে পারছেন। প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা তাহলে জানা গেল। এবার বাকি প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে হবে। ডায়রিটা বন্ধ করে মাহমুদকে বললাম: মাহমুদ, তুই মাহতাব সিকদার সম্পর্কে একটু খোঁজ নিয়ে দেখ, তার সম্পর্কে যত বেশি তথ্য সংগ্রহ করতে পারিস একটু জেনে আয়...... মাহমুদ বের হয়ে যাবার পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাঙল দেখলাম রাত হয়ে গেছে। মাহমুদ এখনও ফেরেনি। তার নাম্বারে ফোন দিলাম। কিন্তু ফোন সুইচড অফ। একটা চাদর জড়িয়ে বের হলাম আমি মাহমুদকে খুঁজতে। বেশিদূর যেতে হলনা, টিলা থেকে নেমেই পেয়ে গেলাম মাহমুদকে রক্তাক্ত অবস্থায়। মাটিতে শুয়ে সে ছটফট করতেছে যন্ত্রণায়। আমি আর দেরি করলামনা। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। ও.টি তে নিয়ে যাওয়া হল তাকে। প্রচুর ব্লিডিং হওয়ায় (AB-) রক্তের প্রয়োজন। আমার রক্তের গ্রুপ (B+), ব্লাড ব্যাংকেও মাত্র দুই ব্যাগ (AB-) রক্ত পাওয়া গেল। আরো দুই ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন মাহমুদকে বাঁচাতে হলে। এখন আমি রক্ত পাব কোথায়? টেনশন বেড়ে গেল আমার। হাসপাতাল থেকে বের হলাম। কয়েকটা বন্ধুর নাম্বারে ফোন করে বললাম রক্ত কালেক্ট করার জন্য। --এই হ্যালো....." হঠাৎ একটা মেয়েলি কণ্ঠ শুনে পেছনে তাকালাম। একটা অপরূপ মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে দুই ব্যাগ রক্ত ছিল। রক্তের ব্যাগ দুইটা আমার দিকে বাড়িয়ে বলল: এই নেন....." অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম: কি? --(AB-) ব্লাড।" বলে মেয়েটি রহস্যময় একটা হাসি দিল। আমি তাড়াতাড়ি রক্তের ব্যাগ দুইটা নিয়ে বললাম: আপনি একটু এখানে দাঁড়ান, আমি এগুলো দিয়ে আসতেছি।" বলে আর অপেক্ষা করলামনা, দৌড়ে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারে পৌঁছে দিলাম রক্তের ব্যাগ দুইটা। মাহমুদের অপারেশন চলতেছে আর আমি বাইরে এসে মেয়েটাকে খুঁজতে লাগলাম। আশ্চর্য! মেয়েটাকে কোথাও খুঁজে পেলামনা। ভাবলাম, কে এই রহস্যময়ী মেয়ে, যে হঠাৎ এভাবে এসে উপকার করে চলে গেল? মাথায় নতুন আরো একটা প্রশ্নের জন্ম হল এবার। অনেক রাতে একা একা বাংলোতে ফিরে এলাম। মাহমুদকে হাসপাতালে একা রেখে আসতে কষ্ট হল। আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী সে। আমি ছাড়া পৃথিবীতে তার আর কেউ নাই। তার প্রতি অনেক মায়া জন্মে গেছে আমার। ছোট ভাইয়ের মতো প্রচন্ড ভালোবাসি তাকে। আজ তাকে ছাড়া একা একা থাকতে হবে। বাংলোতে এসে কিচেনে ঢুকলাম। রাতের খাবার এখনও রেডি করিনি। সব চিন্তা বাদ দিয়ে রান্নার কাজ শুরু করলাম। হঠাৎ পেছন থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ শুনা গেল: --এই যে মিস্টার সরে দাঁড়ান, মেয়েদের কাজ আপনি পারবেননা, আমিই রান্না করে দিচ্ছি।" চমকে পেছনে তাকালাম আমি, দেখলাম হাসপাতালের সেই মেয়েটা, যে আমার হাতে দুই ব্যাগ রক্ত তুলে দিয়েছিল। (চলবে......) লেখক - সোহেল রানা শামী


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now