বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

শান্তির গল্প

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X শান্তির গল্প ।। কাহিনীঃ কবিতা সিংহ কলকাতায় বদলি হয়ে আসার পর তিনটে বাড়ি বদল হল। যদি একটাও বাড়ি মা আর বাবার পছন্দ হয়। বাবার পছন্দ হলে মায়ের হয় না, মায়ের পছন্দ হলে বাবার হয় না। শেষপর্যন্ত ওল্ড বালিগঞ্জে একটা চমৎকার গড়নের বহু পুরনো আমলের একতলা খোলামেলা মফস্বলের বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি পেয়ে মা-বাবা দুজনেই খুশি আর মিলু -পলি খুশি চমৎকার গাছপালায় ভরা ঝুপসি বাগান পেয়ে। বাড়ির চিলেকোঠায় ছোট্ট একটা ঘরে কেবল মরচে ধরা একটা তালা আটকানো। বাবা কথা দিলেন বাগানের বড় আমগাছটায় দুটো চওড়া হ্যামক বেঁধে দেবেন, যাতে পরীক্ষার পর দুই ভাইবোন বাগানে রোদে-ছায়ায় আরাম করে তাতে শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়তে পারে। বাবা অফিসে বেরিয়ে পড়ার পর মা মাঝেমাঝে রাঙাপিসিকে নিয়ে বাজারে বেরোন। তখন শুধু...আয়া চুমকি, অন্যান্য কাজের লোক আর রাঁধুনি শ্যামা মাসির রাজত্ব। খুব কড়াকড়ি। সেদিন কি একটা উপলক্ষ্যে মিলু-পলির স্কুল ছুটি ছিল। বাগানে মাটি খুঁড়ে উনুন বানিয়ে, লুচিপাতার তরকারি আর লাল কাঁকরের ডাল বানিয়ে মিলু-পলি পুতুলের পিকনিক করছিল। হঠাৎ দেখে নীচু ঝুপসি ফণিমনসার ঝোপের পাশ থেকে তাদের সমবয়সী একটি মেয়ে উঁকি দিচ্ছে। কি সুন্দর মায়াকাড়া বড় বড় চোখ, লম্বা লম্বা নরম পল্লবে ঘেরা। ফ্যাকাসে ফরসা মুখ, পাতলা দুটি ঠোঁট। গালে একটা তিল, ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, ওর খুব খেলতে ইচ্ছে করছে। মিলু-পলি ডাকলেই ও চলে আসে। মিলু আর পলিও খুব খুশি মেয়েটাকে দেখে। বলল, " এসোনা ভাই, আমাদের পিকনিকে।" মেয়েটি এগিয়ে এল। ওরা জিজ্ঞেস করল, " তোমার নাম কি ভাই?" মেয়েটি বলল, " আমার নাম শান্তি।" " কোথায় থাকো?" মেয়েটি বলল, " এই তো, কাছেই...." খুব কেতাদুরস্ত পোশাক পরা মেয়ে শান্তি। পরনে ফুলহাতা সাদা সিল্কের গাউন, জুতোয় ঝকঝকে বখলশ লাগানো, হাঁটু পর্যন্ত মোজা, ফ্রকের কোমরে বেল্ট লাগানো। ওপরে ভেলভেটের জ্যাকেট পরা, চুলে মস্ত ফুল করা সাটিনের রিবন বাঁধা। শান্তি ওদের পাশেই বসে পড়ল। তারপর চলল পুরোদমে পুতুলের পিকনিক। শান্তি একদিনেই মিলু পলির প্রাণের বন্ধু হয়ে গেল। সবচেয়ে মুস্কিল হল বাবা মা আর রাঙা পিসির। বাবাকে খবরের কাগজ ফেলে, মা'কে সেলাই ফোঁড়াই ফেলে, একনাগাড়ে ঐ শান্তির গল্প শুনতে হবে। রাঙা পিসির তো কলেজের পড়াই বন্ধ। শান্তি কি ভালো মেয়ে.....শান্তি কি মজার মজার গল্প করে.....শান্তিদের বাড়িটা কি ভালো....শান্তিদের খুব সুন্দর রোলস রয়েস গাড়ি আছে, খুব বড় ফিটন গাড়ি আছে। সেই গাড়িতে ওয়েলার ঘোড়া লাগানো। ঘোড়ার গায়ে ঝকমকে পেতলের গয়না, মাথায় পালক দেওয়া টায়রা। বাবা ভ্রু তুলে বলেছিলেন, " সত্যি!" মিলু পলি সমস্বরে বলল, " হ্যাঁ বাবা, আমরা শব্দ শুনেছি ঘোড়ার গাড়ির। ঘোড়ার গলার ঝুমুরগুলো কেমন ঝুম ঝুম শব্দ করে।" মিলু বলল, " জানো বাবা, একদিন শান্তি রোলস রয়েসটায় চেপেও এসেছিল। রূপোলী রঙের গাড়ি। গাড়ির ফুটবোর্ডের ওপর একটা শোয়ানো পেতলের সাপ সেই আগা থেকে গোড়া মার্ড গার্ডের ওপর পর্যন্ত চলে গেছে। তার হাঁ করা মুখে একটা আলোর বালব লাগানো। এবার মা'র অবাক হবার পালা। বললেন, " ভিনটেজ কার! তোদের শান্তিকে একবার আনিস না এখানে। বলিস মা আলাপ করতে চেয়েছে।" রাঙাপিসি বলল, " হ্যাঁ, যা শুনছি, খুব কৌতূহল হচ্ছে মেয়েটাকে দেখার জন্য।" মিলু বলল, " আমরা তো কতবার বলেছি, বাগানে কেন ভাই, এসো না বাড়িতে খেলব। কিন্তু ও কিছুতেই আসতে চায় না। ওর ভারী লজ্জা।" মা বললেন, " বেশ। ও যখন আসবে তখন তোদের কেউ এসে চুপিচুপি আমায় খবর দিস, আমি গিয়ে আলাপ করব।" মিলু - পলি বলল, " আচ্ছা।" বাজার থেকে ফিরে এসে মা সেদিন মিলু-পলিকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, " আচ্ছা, তোদের শান্তি এ পাড়ায় কোন বাড়িতে থাকে?" মিলু শুধালো, " কেন মা?" মা বললেন, " এ পাড়ায় পুরনো আমলের বাসিন্দা মাধুরী দেবীর সঙ্গে আলাপ হল মনিহারী স্টোরে, উনি বললেন, এ পাড়ায় কারোর রোলস রয়েস গাড়ি নেই। ওয়েলার লাগানো ফিটন গাড়িও নেই।" পলি এবার বলল, " হতেই পারে না। শান্তি তো বলেইছে ওর বাড়ি হল ফিরোজা মঞ্জিল। ওদের বাড়ির রঙ হালকা ফিরোজা আর জানলার রঙ গাঢ় গোলাপি। " মা বললেন " এ পাড়ায় এমনি দেখতে বাড়ি কোথায়? আমি তো দেখিনি।" পলি বলল, " ঠিক আছে, আজ বিকেলে শান্তি এলে আমরা ওর সঙ্গে গিয়ে ওর বাড়ি দেখে আসব।" মা বললেন, " তার আগে তোমরা আমায় ওর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিও।" কিন্তু সেদিন বিকেলে শান্তি এল না। পরদিন বিকেলে মিলু-পলি ছুটতে ছুটতে ওপরে এল। তাদের হাতে গরম গরম সদ্য ভাজা কয়েকটা আনন্দ নাড়ু। ....." মা, মা, দ্যাখো, টাটানগরে আমাদের সোনা পিসি এখন আনন্দ নাড়ু ভাজছেন, এই সেই নাড়ু!" মা বাবা আর রাঙাপিসি তো হতবাক। জিজ্ঞেস করলেন, " তোমরা কি করে পেলে নাড়ু?" মিলু-পলি বলল, " শান্তি এনে দিল। ও ম্যাজিক জানে। ওকে বলেছিলাম টাটানগরে আমাদের একজন পিসি আছেন। তিনি খুব ভালবাসেন আমাদের। কথাটা শুনেই শান্তি বলল, দাঁড়াও খবর এনে দিচ্ছি তোমাদের সোনাপিসির! তারপর এই নাড়ু এনে দিল আমাদের।" শুনতে শুনতে বাবার হাত থেকে খবরের কাগজটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। তিনি জড়ানো গলায় বললেন, " ডেট আর টাইম দিয়ে আমি এক্ষুনি টাটানগরে সোনাকে একটা চিঠি লিখছি যে সে সত্যিই এখন আনন্দ নাড়ু ভাজছে কিনা! " মা বললেন, " তোমরা আর শান্তির সঙ্গে মিশবে না।" পরদিন বাবা মা, রাঙাপিসি আর মিলু-পলি বসবার ঘরটায় বসে আছে। হঠাৎ টেবিলে রাখা ভিজিটার্স প্যাডের ওপর সুতোয় বাঁধা পেনসিলটা গড়গড় করে গড়াতে লাগল। মা কাঁপা কাঁপা হাতে পেনসিলটা তুলে নিতেই কে যেন প্যাডে তাঁর হাতটা আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিল। আঁকাবাঁকা কাঁচা হাতের লেখায় ফুটল, " মাসীমা, আমি শান্তি। মিলু-পলিকে আমার সঙ্গে খেলতে দেবেন। আমি বড় একা, আমি কখনো কারোর ক্ষতি করিনি। করবও না।" এরপর মা পাতার পর পাতা লিখে যেতে লাগলেন। প্রশ্ন মা-ই করছিলেন শান্তি কেবল উত্তর দিচ্ছিল। খসখস করে পেন্সিলটা রাইটিং প্যাডে চলতে লাগল আর লেখা ফুটে উঠতে লাগল...... ' আমার নাম শান্তি। আমি সত্তর বছর আগে এই পাড়ায় এই বাড়িতেই থাকতাম। এই বাড়ির ভাঙা গেটের থামটা উলটে ফেললে দেখবেন পাথরের গায়ে বাড়ির নাম লেখা রয়েছে। আমার বাবা মা ছিলেন। ছোট্ট একটা ভাইও ছিল। এগারো বছর বয়সে আমি কালাজ্বরে মারা যাই। সব বেচে দিয়ে আমার মা বাবা চলে যান সিমলা পাহাড়ে। আমার বাবা মা আরও দশ বারো বছর বেঁচেছিলেন। আমার ভাইটি এখন অতি বৃদ্ধ। সে থাকে বিদেশে। আমি বাবা মা'কে দেখতে পাই না। ভাইকে কখনো কখনো গিয়ে দেখে আসি। সবার সঙ্গে কথাও বলতে পারি না। শরীরও ধারণ করতে পারি না। মিলু-পলির মতো কারও কারও সামনে পারি।" মা প্যাড রেখে দিলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, " মিলু পলি, যাও, শান্তির সঙ্গে খেলো গিয়ে। " মিলু আর পলি চলে গেলে বাবা বললেন, " এ তুমি কি করলে, বীণা?" মা ধরা গলায় বললেন, " আহা, মেয়েটার কষ্টের কথা একবার ভাবো তো।" রাঙাপিসি বললেন, " তাই বলে জেনেশুনে........" মা বললেন, " বেশ তো, তোমার দাদার যদি এতই ভয় হয়, তাহলে গয়ায় গিয়ে প্রেতকুন্ডে পিন্ডটা দিয়ে আসুক। মেয়েটা উদ্ধার হোক।" তিনদিন বাদে বাবা প্রেতকুন্ড থেকে পিন্ড দিয়ে ফিরলেন। ইতিমধ্যে টাটানগর থেকে সোনাপিসির চিঠিও এসেছে। তিনি লিখেছেন, হ্যাঁ ওই তারিখে, ওই সময় তিনি আনন্দ নাড়ু ভাজছিলেন। মিলু আর পলির খুব দু:খ এখন। শান্তি আর আসে না। ঘোড়ার গাড়ির ঝুমুরঝুমুর শব্দ আর পাওয়া যায় না। রোলস রয়েসেরও আর শব্দ নেই। শেষপর্যন্ত বাড়িটি মা বাবার এত পছন্দ হয়ে গেল যে বাড়িটা কিনেই নেওয়া হল। বাড়ি সারানোর আগে চিলেকোঠায় সেই মরচেধরা তালা ভাঙা হল। তালা ভেঙে ঘরে ঢুকে মা বাবা আবিষ্কার করলেন অনেক পুরনো ছবি, কিছু ভাঙা খেলনা আর একটি পুতুলের বাক্স। পুরনো ছবির মধ্যে চোখে পড়ল শান্তির একটি ছবি যে পোশাক পরে সে মিলু-পলির কাছে আসত অবিকল সেই পোশাক। এখনও তোমরা যদি মিলু -পলিদের বাড়ি যাও, তাহলে ওদের ঘরের দেওয়ালে টাঙানো শান্তির ছবিখানি দেখতে পাবে। ছবির মধ্যে থেকে যেন হাসছে শান্তি। মিলু-পলিদের সত্তর বছর আগের বেঁচে থাকা প্রাণের বন্ধু ৷ (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১০৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গল্পঃ:-শান্তির খোঁজে পর্ব:-০৩

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now