বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বামনের কঙ্কাল ----( ১ ম পর্ব)

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "বামনের কঙ্কাল" --------------- ( ১ ম পর্ব) (মানবেন্দ্র পাল) ---------------- *****সিঁড়িতে পায়ের শব্দ***** সেদিন অনেক রাতে অস্পষ্ট একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় উঠে বসলাম। কৃষ্ণপক্ষ। খোলা জানলা দিয়ে দেখলাম চাঁদের ম্লান আলো লুটিয়ে পড়েছে বরাকর নদীর জলে। ওপারে গভীর শালবন থমথম করছে। আমি বিছানায় বসে কান পেতে রইলাম। না, কোনও শব্দ নেই। তবে কি আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভুল শুনছিলাম! তারপরেই চমকে উঠলাম। আবার সেই শব্দ--খট...খট....খট.......কেউ যেন কাঠের পা নিয়ে কাঠের সিঁড়ির ওপর দিয়ে মাতালের মতো টেনে টেনে ওঠবার চেষ্টা করছে। হঠাৎই শব্দটা থেমে গেল। আমি নিশ্বাস বন্ধ করে বসে রইলাম। কিন্তু আর সেই শব্দটা শোনা গেল না। আশ্চর্য! কে উঠে আসছিল সিঁড়ি দিয়ে? কেনই বা দোতলা পর্যন্ত উঠল না? চোর-ডাকাত? তাই যদি হয়, তাহলে চোর-ডাকাতের পায়ের শব্দ কি ঐরকম হয়? কিছুই বুঝতে পারলাম না। তা হলে? হঠাৎ একটা অপ্রত্যাশিত সম্ভাবনা বুকের মধ্যে তোলপাড় করতে লাগল। তবে কি...... একবার ভাবলাম দরজা খুলে সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে দেখি। কিন্তু সাহস হল না। মশারির মধ্যে চুপ করে বসে রইলাম। *****ভয়ঙ্করী বুড়িমা***** বরাকর জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারের বর্ডারে। বরাকরের এদিকে কুলটি আর ওপারে কুমারডুবি। বহুকাল আগে আমার পিতামহ বরাকর নদীর নির্জন প্রান্তে শালবনের কাছে একটা দোতলা বাড়ি করেছিলেন। শুনেছি প্রতি বছর তিনি সপরিবারে এখানে হাওয়া বদলাতে আসতেন। কিন্তু এখন লোকে চেঞ্জে বা হাওয়া বদলাতে বড়ো একটা বিহার বা ছোটনাগপুরে যায় না। যায় দূর দূর দেশে। সেইজন্য নির্জন নদীর ধারে পূর্বপুরুষের এই বাড়ির প্রতি কারও আর আকর্ষণ নেই। নিরিবিলি জায়গাটা ভয়ের জায়গা হয়ে উঠেছে। চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাপি কি না হতে পারে। এ বাড়িতে আমিই এখন একা থাকি। আমার পক্ষে এরকম নির্জন নির্বান্ধব জায়গাই ভালো। কেন এরকম জায়গায় পড়ে আছি সে কথা বলার আগে নিজের বিষয়ে কিছু বলে নিই। আমি ঠিক সাধারণ মানুষের মতো নই। ঘর-সংসার করিনি। ছোটবেলা থেকে হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর তীব্র আকর্ষণ। তখন থেকেই সাধু-সন্ন্যাসীদের ওপর লেখা বই পড়তাম। যতই পড়তাম ততই তাঁদের ওপর আগ্রহ বেড়ে যেত। তারপর আমিও একদিন বাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাসীদের দলে ভিড়ে পড়লাম। কত যে সন্ন্যাসীর সাথে মিশেছি তার হিসেব নেই। কিন্তু তাঁরা কেউ আমায় পাত্তা দেন নি। বলেছেন--" তুই ছেলেমানুষ। তোর এখনো সময় হয় নি। বাড়ি ফিরে যা।" বাড়ি ফিরে আসিনি। আবার অন্য সন্ন্যাসী ধরেছি। একবার এক তান্ত্রিকের সঙ্গ পেয়েছিলাম। তিনি আবার শবসাধনা করতেন। নির্জন ভয়ঙ্কর শ্মশানঘাটে গভীর রাতে একটা মড়ার ওপর বসে সারারাত মন্ত্র পড়ে যেতেন। এই সাধনা খুবই কঠিন। নানারকম ভয়াবহ ঘটনা ঘটত। তাতে ভয় পেলেই মৃত্যু। আর ভয় না পেলে সিদ্ধি। সে মহাশক্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। আমার সাধ হলো আমিও শবসাধনা শিখব। তান্ত্রিক গুরুকে একথা বলতেই তিনি লাল চোখে কটমট করে তাকিয়ে আমার গালে এক চড় মেরে বললেন...." ছেলেখেলা! বেরো এখান থেকে।" সে কি চড়! এক চড়ে মাথা ঘুরে গিয়েছিল। ওখান থেকে চলে এসে আবার ঘুরতে ঘুরতে একটা গ্রামের বাইরে নির্জন শ্মশানে এক বুড়ির সন্ধান পেলাম। লোকে তাকে "বুড়িমা" বলে ডাকত। কিন্তু কেউ তার কাছে ঘেঁষত না। বলত ও নাকি ভয়ঙ্করী বুড়িমা! শ্মশানটা একটা মজা নদীর পাশে। টোপা পানা আর ঢোল কলমীর দাম ডাঙার কাছে। এদিকে ওদিকে মরা কুকুর, বেড়াল, ছাগল পড়ে আছে। দূর্গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত। এছাড়া পড়ে রয়েছে শ্মশানযাত্রীদের ফেলে যাওয়া ভাঙা কলসি। একটা বিকট মড়ার খুলিও দেখলাম জলের ধারে পাকুড় গাছটার গোড়ায়। গা শিউরে উঠল। এখানেই একটা বটগাছের নিচে বুড়িমার দেখা পেলাম। ছেঁড়া ময়লা একটা কাঁথা জড়িয়ে পড়ে আছে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল জট পাকিয়ে গেছে। সর্বাঙ্গে মড়া পোড়ান ছাই মাখা। কাঁথা জড়ানো থুত্থুরে বুড়িকে দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল যেন একটা ময়লা কাপড়ের পুঁটলি। যাই হোক বুড়িকে প্রণাম করার অনেকক্ষণ পর মনের ইচ্ছে জানালাম। বুড়ি থু করে আমার গায়ে থুথু দিয়ে খোনা গলায় বলল...." দূঁর হঁ....দূঁর হঁ.....নঁইলেঁ মঁরবি।" বুড়ির মুখে প্রথমেই মরার কথা শুনে খুব উৎসাহ পেলাম। বুঝলাম এখানে সাঙ্ঘাতিক কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে। কাজেই আমি ওখান থেকে নড়লাম না। ওখানেই পড়ে থাকি। রোজই গাল খাই, মড়া পোড়ান কাঠ তুলে নির্দয়ভাবে মারে, পিঠ ফেটে রক্ত পড়ে। তবু নড়ি না। এমনি করে এক-মাস, দুই-মাস গেল। এর মধ্যে কতরকম ভয় পেলাম। কতরকম বুক কাঁপানো শব্দ শুনতে পেতাম রাতের বেলায়। এক-একসময় তিনখানি মাত্র দাঁত নিয়ে বুড়ি হি-হি করে হেসে ওঠে। আমি তখনি তার দিকে তাকিয়ে মা-মা করে ডাকি। অমনি ভয় কেটে যায়। ক্রমে বোধহয় আমার ধৈর্য দেখে বুড়িমা নরম হল। কাছে বসিয়ে ভূত-প্রেতের কত কথা শোনাল। বলল, " এঁই শ্মঁশান কঁত কাঁলের জাঁনিস? লঁক্ষ চিঁতা জ্বঁলেছে। এঁই পঁবিত্র থাঁনে ভূঁত-প্রেঁত, পিঁশাচ, কিঁ নেঁই? ভূঁত ছাঁড়াও আঁছে গোঁদান.....আঁছে বৈঁকি! মাঁনুষ মঁরলে চোঁখে দেঁখা যাঁয় নাঁ, তঁবু তাঁরা আঁছে।" একটু চুপ করে থেকে বুড়িমা আবার বলতে লাগল, " অঁনেক রঁকম প্রাঁনী ভূঁত আঁছে। তাঁদের বুঁদ্ধি মাঁনুষের চেঁয়ে কঁম কিঁন্তু ক্ষঁমতা অঁনেক বেঁশী। এঁরা হঁলো ডাঁকিনী, শঁঙখিনী। আঁর এঁক ধঁরনের অঁপদেঁবতা আঁছে.....তাঁরাও সাঁঙ্ঘাতিক। এঁদের বঁলে হাঁকিনী। মঁন্ত্রবলে এঁদের বঁশ কঁরে এঁদের দিঁয়ে যেঁ কোনও কাঁজ কঁরানো যাঁয়। কিঁন্তু এঁকটু অঁসাবধান হঁলে এঁরা তোঁকেই মেঁরে দেঁবে।" আমি অবাক হয়ে এই প্রেতসিদ্ধ বুড়িমার কথা শুনি। শ্রদ্ধা বিশ্বাস বাড়ে। শেষে একদিন ভয়ে ভয়ে শব সাধনা শিখিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম। এইজন্যই তো আমার আসা। আমার কথায় বুড়িমা তো চটে আগুন। শেষে অনেক কান্নাকাটি, অনুরোধ উপরোধের পর বুড়িমা একটু নরম হল। বলল, " এঁত কঁরে ধঁরছিস যঁখন, বেঁশ তোঁকে শিঁখিয়ে দেঁব। তঁবে তোঁর কোঁন ক্ষঁতি হঁলে আঁমি বাঁচাতে পাঁরব নাঁ।" আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললাম, " সাধনা করতে গিয়ে যদি প্রাণ যায় তো যাক।" আমার কথায় বুড়িমা মুচকি হাসল একটু। তারপর বলল, " যাঁ তাঁহলে, আঁমি ফঁর্দগুঁলো বঁলে দিঁচ্ছি, বাঁজার থেঁকে নিঁয়ে আঁয়।" দু-তিনদিন ধরে বুড়িমার ফর্দমতো জিনিসগুলো শহরে গিয়ে কিনে আনলাম। কিন্তু আসল জিনিস কই? মড়া? মড়া তো আর বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। আজ বেশ কদিন ধরে ঘাটে একটা মড়াও আসেনি। মড়া এলেই কি পাওয়া যাবে? যারা মড়া নিয়ে আসে তারা তো পুড়িয়ে চলে যাবে। এক যদি প্রবল বৃষ্টি হয়, চিতা জ্বালতে না পেরে মড়া ভাসিয়ে দেয় তাহলে হয়তো সেই শব পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সে সম্ভাবনাই বা কোথায়? বুড়িমা মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আমার কান্না পেল। বললাম, "তাহলে কি করে হবে?" আমার করুণ অবস্থা দেখে বুড়িমার যেন দয়া হল। বলল, " তাঁহলে এঁক কাঁজ কঁর। আঁমায় গঁলা টিঁপে মেঁরে ফ্যাঁল। তাঁরপর আঁমার শঁবের ওঁপর বঁসে..........' প্রথমে ভেবেছিলাম বুড়িমা বোধহয় মস্করা করছে। কিন্তু বুড়িমা যখন তার বড় বড় বাঁকান নখসুদ্ধ, রক্তশূন্য শীর্ণ হাতদুটো দিয়ে আমার হাতদুটো ধরে ( উ:, সেইসময় টের পেয়েছিলাম কি বরফশীতল হাত বুড়িমার) আর বলে, " ওঁরে, আঁমি বঁলছি তুঁই আঁমায় মেঁরে ফেঁল। আঁমার শঁরীলটা তাঁহলে শঁবসিদ্ধ হঁবে। আঁমি এঁকটা সঁৎকাঁজ কঁরে মুঁক্তি পাঁব"......তখন আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। বললাম, " না, না, খুন করে আমি ফাঁসি যেতে পারব না।" বুড়িমা বললে, " ধুঁর বোঁকা, পুঁলিশ টেঁর পাঁবে কিঁ কঁরে? এঁখানে জঁনমঁনিষ্যি নেঁই। নেঁ, নেঁ, গঁলাটা টিঁপে মেঁরে ফেঁল"......বলে বুড়িমা তার খসখসে চামড়া আবৃত সরু গলাটা বাড়িয়ে ধরল আমার দিকে। " না, না, খুন আমি করতে পারব না"....বলে আমি দৌড়ে পালাতে যেতেই বুড়িমা খপ করে আমার হাত চেপে ধরল। সে যে কি শক্ত হাত, বলে বোঝাতে পারব না। আশ্চর্য, এই থুত্থুরে বুড়ি এত শক্তি পেল কোথা থেকে! বুড়িমা বললে, " তোঁকে কোঁত্থাও যেঁতে হঁবে নাঁ, আঁমায় মেঁরেও ফেঁলতে হঁবে নাঁ। আঁজ থেঁকে তিঁনদিন পঁর অঁমাবঁস্যার রাঁতে এঁকখাঁনা মঁড়া এঁসে ভিঁড়বে ঘাঁটে। সেঁটা নিঁয়েই বঁসবি তুঁই।" "মড়া আসবে তুমি জানলে কি করে?" "আঁমি জাঁনতে পাঁরি।" "কোথা থেকে আসবে?" " এঁখান থেঁকে চাঁর পোঁ ( এক মাইল) পঁথ দূঁরে গঁদাধরপুরের চাঁমারদের এঁকটা চোঁদ্দ-পঁনের বঁছরের ছেঁলে মঁরবে। আঁমি তাঁকে দেঁখেছি। ভাঁরি সুঁলক্ষণ আঁছে।" " কিন্তু সে মরবেই, তুমি জানলে কি করে?" " বঁললাম তোঁ আঁমি জাঁনতে পাঁরি। সেঁ ক্ষ্যাঁমতা আঁমার নাঁ থাঁকলে তুঁই এঁসেছিঁস ক্যাঁনো আঁমার কাঁছে?" আমি শুনে কিরকম যেন ভয় পেলাম। বুড়িমা আমার মনের অবস্থাটা টের পেল। বলল, এঁই দ্যাঁখ, এঁখুনি তুঁই ভঁয়ে ভিঁরমি খাঁচ্ছিস। তোঁর দ্বাঁরা কিঁছু হঁবে নাঁ।" তবু যে সেই ভীতু 'আমি' টা কি করে যে সব কাজ নিখুঁতভাবে করতে পেরেছিলাম তা ভেবে আজও অবাক হই। সেদিনই গভীর রাতে বুড়িমা বললে, " আঁমি এঁকটু ঘুঁরে আঁসি। তুঁই এঁকা থাঁকতে পাঁরবি তোঁ?" ভয় চেপে রেখে বললাম, " পারব। তুমি যাচ্ছ কোথায়?" রেগেমেগে বুড়িমা বললে, " অঁত খোঁজে তোঁর দঁরকার কিঁ?" " বেশ। কখন ফিরবে বল?" " রাঁত থাঁকতে থাঁকতেই ফিঁরব। তোঁর তোঁ দেঁখছি শীঁত কঁরছে। দাঁড়া। " বলে চটের বস্তা থেকে একটা ছেঁড়া ময়লা দাগধরা বিছানার চাদর এনে দিয়ে বললে, " এঁটা গাঁয়ে দেঁ। আঁরাম পাঁবি।" " ম্যা গো! এ চাদর পেলে কোথায়?" " পাঁব আঁবার কোঁথায়? ঘাঁটে মঁড়া ভেঁসে আঁসে মাঁঝে মাঁঝে। তাঁদের গাঁ থেঁকে খুঁলে নিঁই।" ঘেন্নায় কুঁকড়ে গেলাম। কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করতে সাহস পেলাম না। দেখলাম, বুড়িমা নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বড্ড তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল। বুড়িমা চলে যেতেই গা থেকে চাদরটা বাঁ হাতের দুটো আঙুলে ধরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। কিছুক্ষণ কেমন যেন বিহ্বল হয়ে বসে রইলাম। তারপরেই গা-টা ছমছম করতে লাগল। এই ভয়ঙ্কর নির্জন শ্মশানভূমিতে নিশীথ রাতে কখনো একা থাকি নি। সামনে উত্তর -পশ্চিম কোণে একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছ। তার একটা পাতাও নড়ছে না। মাঝে মাঝে বুনো ঝিঁকুড় ফুলের বিশ্রী গন্ধ আসছে নাকে। অন্ধকার আকাশে ঝিকমিক করছে তারা। যেন আমাকে ভয় দেখাচ্ছে হাজার হাজার চোখ মেলে। হঠাৎ মাথার ওপর বটগাছের পাতাগুলো নড়ে উঠল। আমি শিউরে উঠলাম। যদিও জানি কোনও বড় রাতজাগা পাখি পাখা ঝাপটাল, কিন্তু কত বড় পাখি সেটা যে এত জোরে পাতা নাড়াতে পারে? তখনই লক্ষ্য পড়ল নদীর ধারে সেই খুলিটার দিকে। মনে হলো খুলিটা যেন হঠাৎ খুব বড়ো হয়ে গেছে। ওটাকে তো রোজই দেখি। এত বড়ো তো ছিল না। গভীর রাতে কি খুলিও বড়ো হয়ে ওঠে? ওটা আবার গড়াতে গড়াতে আমার কাছে চলে আসবে না তো? আমি ভয়ে চোখ বুজে বসে রইলাম। প্রায় রাত তিনটের সময় বুড়িমা ফিরে এল। কোথা থেকে, কোন পথে, কেমন করে এল জানি না। শুধু দেখলাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চাদরটা জড়িয়ে নিলাম। বুড়িমা বললে, " কিঁরে ভঁয় পাঁসনি তোঁ?" বললাম, " না। তোমার কাজ হলো?" বুড়িমা সংক্ষেপে বলল, " হ্যাঁ।" কি এমন জরুরী কাজে তাকে যেতে হলো তা জিজ্ঞেস করতে সাহস হয়নি। দু'দিন পর তিন দিনের দিন অল্প রাতে বুড়িমা ঢুলছিল। হঠাৎ জেগে উঠে বলল, " দ্যাঁখ তোঁ, নঁদীর ধাঁরে বোঁধ হয় শঁব লেঁগেছে।" তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে দেখলাম, সত্যিই নদীর ধারে বড়ো পাকুড় গাছটার শেকড়ের মধ্যে একটা মৃতদেহ আটকে রয়েছে। ছুটে গিয়ে বুড়িকে জানাতেই বুড়ি বলল, " ওঁটা তুঁলে নিঁয়ে আঁয়।" বোঝো কথা! জীবনে আমি অনেক মড়া পুড়িয়েছি কিন্তু তিনদিনের বাসি মড়া এই গভীর রাতে একা একা জল থেকে তুলে আনা যে কি কঠিন কাজ তা যে করে সেইই জানে। কিন্তু শব-সাধনা করতে গেলে এসব আমাকে করতেই হবে। ছপাৎ ছপাৎ করে আমি জলে নেমে এগিয়ে গেলাম। হাঁটুজল। মৃতদেহটার পরনের কাপড় পাকুড় গাছের শেকড়ে আটকে ছিল। কোনওরকমে ছাড়িয়ে দুহাতে পাঁজাকোলা করে তুললাম। অন্ধকারে মৃতদেহটার মুখের ওপর হাত ঠেকতেই নরম নরম কি যেন ঠেকল। বুঝলাম, জিভ! ও বাবা! মড়াটার জিভ বেরিয়ে আছে যে! যাই হোক, ওটাকে তুলে নিয়ে এলাম। বুড়িমা ইতিমধ্যেই মৃতদেহটার জন্য কুশের শয্যা প্রস্তুত করে রেখেছে। আমায় বললে, " ওঁটাকে পূঁব দিঁকে মাঁথা কঁরিয়েঁ শোঁওয়া।" সেইভাবে শুইয়ে দিয়ে বললাম, " এর জিভ বেরিয়ে আছে কেন?" বুড়িমা সহজভাবেই বললে, " বোঁধ হঁয় কেঁউ গঁলা টিঁপে মেঁরেছেঁ।" শুনেই কি জানি কেন বুকের ভেতরটা ছাঁৎ করে উঠল। চোদ্দ-পনের বছরের এইটুকু ছেলেকে কে গলা টিপে হত্যা করল? সঙ্গে সঙ্গে একটা গভীর সন্দেহও মনের মধ্যে খচখচ করে উঠল। বুড়িমা বোধহয় আমার মনের ভাব বুঝেই বলল, " ভাঁবিস নেঁ। ছোঁড়াটাঁ সঁদগতি হঁয়ে গেঁল। নেঁ, এঁবার ওঁর মুঁখে এঁকটু এঁলাচ, লঁবঙ্গ, কঁর্পূর, পাঁন আঁর এঁকটু মঁদ দিঁয়ে দেঁ।" এ সবই এনে রাখা হয়েছিল। মৃতের মুখে একে একে সব দিলাম। " এঁবার শঁবটাঁকে উঁপুড় কঁরে দেঁ।" দু হাতে আঁকড়ে ধরে মৃতদেহটাকে উপুড় করে দিলাম। এরপর সারা পিঠে চন্দন মাখানো, পায়ের তলায় আলতা দিয়ে ত্রিকোণ চক্র আঁকা, আরও কিছু কিছু আনুষ্ঠানিক কাজ করে গেলাম। তারপর বুড়িমার আদেশমতো শবের পিঠে কম্বল চাপিয়ে ঘোড়ার মতো চেপে বসলাম। বুড়িমা মৃতদেহের হাত-পা শক্ত করে বেঁধে দিয়ে বললে, " এঁবার যাঁ যাঁ মঁন্ত্র বঁলছি, চোঁখ বুঁজে আঁওড়াঁবি। দেঁখিস ভঁয় পাঁসনি। ভঁয় পেঁলেই মঁরবি। নেঁ বঁল, ওঁ ফঁট। বঁল, ওঁ হুঁ মৃঁতকায় নঁম:"........ এর অর্থ, হে মৃতব্যক্তি, তুমি যে-ই হও, তোমায় নমস্কার। বুড়িমার মুখ দিয়ে যে এমন সংস্কৃত শব্দ বার হবে ভাবতে পারিনি। অবাক হলাম। কিন্তু বুড়িমা তখন অধৈর্য হয়ে তাগাদা দিচ্ছে, " কিঁ হলো? বঁল।" মন্ত্র পড়তে লাগলাম। মন্ত্র কি একটা দুটো? মন্ত্রের যেন শেষ নেই। মন্ত্র জপতে জপতে চোয়াল ধরে গেল। গলা শুকিয়ে গেল। তবু জপেই চললাম। রাত দু প্রহর হলো। চারদিকে চাপ চাপ অন্ধকার। নদীর জল কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে। দূরে কষাড় ঝোপে শেয়াল ডেকে উঠল। হঠাৎ আমার মনে হল, এই নির্জন শ্মশানে আমি একা মৃতদেহের ওপর বসে আছি, বুড়িমা নেই। জানি ভয় পেলে চলবে না। তাই মন শক্ত করে মন্ত্র আওড়েই চললাম। তারপরেই মনে হলো মড়াটা যেন থরথর করে কাঁপছে। শুনেছি এরপর এই মৃতদেহ জ্যান্ত হয়ে উঠে আমায় পিঠ থেকে ফেলে উঠে দাঁড়াবে। কিন্তু আমায় পড়ে গেলে চলবে না। সেই ভয়ঙ্কর অবস্থা কল্পনা করে আমি সিদ্ধির প্রথম ধাপে পৌঁছেই মৃতদেহের ওপর থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটে পালালাম শ্মশান থেকে। পিছনে শুনলাম বুড়িমা হাসছে খলখল করে। শবসাধনার এখানেই আমার ইতি। আর কখনো আমি ওমুখো হইনি। ..........এই হলো আমার জীবনের এক দিকের ইতিহাস। এখন আমি নিরিবিলিতে আমার ঠাকুর্দার পরিত্যক্ত দোতলা বাড়িতে একাই থাকি। জায়গাটা নির্জন। কিছু আদিবাসীদের ঘর। তারা চাষবাস করে। একটা ছোটখাটো মুদির দোকান। ওরই একপাশে তরি-তরকারী বিক্রি হয়। এরাই হলো আমার প্রতিবেশী। আমি চিরদিন সাধু-সন্ন্যাসীদের পেছনে ঘুরেছি। কাজেই লোকালয় আমার পছন্দ নয়। পৈতৃক টাকাপয়সাও কিছু আছে। তাই নিয়ে একা একা বেশ আছি। তবে বড্ড অলস জীবন। কিছু করতে চাই। তার মানে চাকরী বাকরি বা ব্যবসা বানিজ্য নয়। অন্য কিছু। কিন্তু সেই অন্য কিছুটা যে কি, ভেবে পাই না। এমনি সময়ে একদিন....... ( চলবে) ------------------------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now