বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমি ফারাবী।
বয়স ৫৫ বৎসর।
একটা ভার্সিটিতে পড়াই।
সেদিন ক্লাসে ভালোবাসা,বিয়ে নিয়ে কথা উঠলো।
আমার ছাত্র আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
---- স্যার, আপনি বিয়ে করেন নি কেনো?( ছাত্র)
---- জানিনা (আমি)
---- বলুন না স্যার।
---- শুনবে সে ইতিহাস?
.
সবাই একসঙ্গে চিৎকার দিলো, "শুনবো স্যার"।
আমি বললাম, "ওকে"।
চোখটা বন্ধ করলাম।
তারপর অতীতটাকে আরেকবার স্মরন করলাম।
এবার চোখ খুললাম,
সবাই আমার দিকে উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে।
আমি বলা শুরু করলাম।
.
প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিলাম,
সে দিনটি আজও ভুলতে পারিনি।
আদৌ ভোলা যাবে কিনা সে ব্যাপারে আমি আমৃত্যু সন্দিহান।
সেদিন আমি ভোলা কাকুর দোকান হতে দু ছটাক কেরোসিন আর দেড় টাকার বাতাসা কিনেছিলাম।
বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম তারপর।
পথিমধ্যে সোনা মুগের গাছ, তিল গাছ আর ধান ক্ষেতের আল মাড়াতে হয়।
আর সেসব মাড়াতে মাড়াতে আট আনার বাতাসা দাঁতের নীচে পিষে পেলেছি।
সে কি স্বাদ ছিলো গো বাতাসায়,
আমার আজও জীভে জল আসে।
ভোলা যায় না সে স্বাদ,
আর অতসী রায় কে ভোলা তো অসম্ভব।
হ্যাঁ,,,, অতসী রায়,
আমার অতসী........
.
সে যাই হোক,
বাতাসা চিবুতে চিবুতে আমি রায় বাড়ির আঙ্গিনায় পা রাখিলাম।
আমাদের বাড়িটা রায় বাড়ির পেছনে।
রায় বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই একটা নারী কন্ঠে আমার নাম শুনতে পেলাম।
কে জেনো "ও ফারাবী......"
বলে ডাক দিলো আমাকে।
আমি ক্ষনিকের জন্য থমকে গেলাম।
এদিক ওদিক তাকালাম।
নাহ্,কাউকেই তো দেখতে পেলাম নাহ্।
হুম,,,,,,,,মনের ভুল হয়তো!
আবার সামনের দিকে পা বাড়ালাম।
আবারও "ও ফারাবী" বলে কে যেনো ডাক দিলো।
হ্যাঁ, একজন আটপ্রৌঢ় সাধারন শাড়ি পরিহিতা একজন মহিলা রায় বাড়ির মাঝলা ঘরের দুয়ারে দাড়ানো।
কপালে চন্দনের তিলক,
সিঁথিতে লাল রাঙ্গা সিঁদুর।
ইনিই কি তাহলে আমাকে ডাকলেন?
আগে তো কখনো দেখিনি ইনাকে।!
ভদ্রতার খাতিরে উনার সামনে গিয়ে দাড়ালাম।
মহিলাটি আঁচলে নিজের মুখটাকে আরেকটু ডাকলেন।
কোমল স্বরে জানতে চাইলেন,
"তোমার নামই কি ফারাবী? "
আমি ঘাড় নাড়িয়ে সায় দিলাম।
মহিলাটি আমাকে ঘরের ভেতর ডাকলো।
আমি ঢুকলাম।
ধূপ আর চন্দন পোড়া একটা গন্ধ নাকে লাগলো।
মহিলা চেয়ার টেনে দিলেন,
আমি বসলাম।
আর তিনি খাটের কোনে।
তিনি আমার দিকে তাকালেন,
আমিও তাকালাম।
আমি উনার চেহারার লাবন্যতা আর সারল্যতায় মুগ্ধ!
পুরো মুখ জুড়ে মাতৃত্বের এক অসাধারন বিমুগ্ধ অহংকার ছড়ানো।
ললাটে যেনো সকল সাম্যতা ভর করছে।
কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম জানিনা।
একসময় তিনিই কথা বললেন।
.
---- কোথায় গেলে ফারাবী?
---- জ্বী,হাঁটে।
---- ওহ্ ভালো,শুনলাম তুমি নাকি কলেজে পড়ো?
---- জ্বী,
---- খুব ভালো,আসলে আমি এ বাড়ির কর্তা বিনোধ রায়ের ছোটো বৌ।
তুমি আমাকে কাকীমা ডাকতে পারো।
---- আচ্ছা,এতদিন কোথায় ছিলেন?
দেখিনি যে!
---- হ্যাঁ, আমরা কোলকাতা ছিলাম।
---- আচ্ছা!
---- শোনো ফারাবী,আমার একটা মেয়ে আছে।
অতসী রায়,এইবার এইটে ভর্তি করালাম।
---- ভালো,
---- আসলে যা বলতে চাইলাম,তোমার যদি সময় হয় তো একটু আধটু দেখিয়ে দিও বাবা।
---- আচ্ছা কাকীমা।
---- তো কাল থেকে এসো?
---- ঠিক আছে।
----আচ্ছা বাবা!
---- আজ আসি কাকীমা।
---- আচ্ছা বাবা।
.
আমি ঘর হতে বেরুলাম।
হঠাৎ করেই সামনে তাকিয়ে দেখি,
বেল গাছের আড়ালে একটি মেয়ে কুকুরকে আদর করছে।
আমাকে দেখেই কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে উঠলো।
মেয়েটি কুকুরের দৃষ্টি অনুসরন করতেই আমার চোখে চোখ পড়লো।
ক্ষনিকের জন্য আমার মনে হলো,
বেল পাতার আড়াতে যেনো একটা নতুন সূর্য উঁকি দিলো।
কি প্রগাঢ় মায়া গো সে চেহারায়!
আমি বিভোর হয়ে গেলাম।
এতও রূপও কারো হয়?
স্রষ্টার সৃষ্টি এতোটা সুনিপুণ কেনো?
কে গো এতো মায়া ছড়িয়ে দিলো মেয়েটির কায়ায়?!
কোন সে ভূবন এটা?
এতো সুন্দর সৃষ্টি যার বুকে বিদ্যমান।
আমি ক্রমশ ঘোরে চলে যেতে থাকলাম।
হঠাৎ করেই ভেতর বাড়ি থেকে একটা ডাক এলো,
"অতসী...................
বেলা তো পড়ে গেলো মা,
ঠাঁকুর ঘরে পূজো দিতে হবে যে! "
মেয়েটি "আসছি" বলেই দৌড়ে পালালো ভেতর বাড়ির দিকে।
কুকুরটি কিছু না বুঝেই আবার চিৎকার করতে থাকলো।
মেয়েটি হোগলা পাতার আড়াল থেকেই বললো,
"ও বুলু,,,,,,,
চিৎকার করিস কেনো?
উনি অতিথি,
অতিথি নারায়ণ,
চিৎকার করতে নেই।
অমঙ্গল হবে যে বাপু।"
কথা গুলো বলেই মেয়েটি মানে অতসী রায় আরেকবার উঁকি দিলো আমার দিকে।
আমি আলতো হেঁসে ঘাড় ফিরিয়ে নিলাম।
আমি বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম।
কুকুরটাও আমার পেছন পেছন হাঁটা শুরু করলো।
আমি আমার হাতের ঠোঙ্গার বাতাসা কুকুরটার দিকে ছিটিয়ে দিলাম।
কুকুরটা ঘড়ঘড় করে আওয়াজ করতে লাগলো।
হয়তো বাতাসা পেয়ে খুব খুশী হয়ে গেছে।
মানুষের চেয়ে কি পশুদের আনন্দের তীব্রতা বেশী নাকি?
হয়তো!
আমি বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলাম।
মনের মাঝে একটা আনন্দ টের পাচ্ছি,
সেটা কি অতসী কে দেখে নাকি কুকুরটার খুশি দেখে!?
তা জানিনা!
কাল থেকে আবার অতসীকে পড়াতে আসতে হবে।
.
আমি বসে আছি অতসীদের ঘরে।
অতসীর পড়ার টেবিলে।
কাল অতসীর মা বলায় আজ এলাম।
কিন্ত অতসী আসছে না।
আসে না আসে না করে চলেই এলো।
আমি অতসীর দিকে তাকালাম।
বাহ্ কি সুন্দরটাই না লাগছে মেয়েটিকে!
এককথায় অপরূপা!
পড়ন্ত বিকেল,
সূর্যটা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে।
যেনো কারো উপর রাগ করে নিকষ আঁধারে লুকিয়ে যাচ্ছে আলোর টুকরো টা।
বাতাসে আর আলোতে হয়তো শত্রুতা!
রাঁধাচূড়া আর সুপারি গাছগুলো ঠায় দাড়িয়ে,
যেনো বা অভিশপ্ত!
আর এই অভিশপ্ত নগরীর একছত্র দেবী যেনো অতসী রায়!
কি বলবো!
কি দিয়ে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা।
কিছু তো বলতেই হবে।
আমি অতসীর বই গুলো খুললাম,
কাগজে অতসী আঁকিবুকি করছে।
এভাবেই আঁকিবুকি আর পড়া লিখায় চলছে আমার আর অতসীর পড়ন্ত বিকেল গুলো।
.
ওই দিনের বিকেলটা ঠিক কেমন ছিলো?
তা আমি জানিনা!
আকাশ কি নতুন সাজে সেজেছিলো?
নাকি বাতাসে ফুলের রেনুরা দল বেঁধে মিছিল করেছিলো?!
যেদিন অতসী ইচ্ছে করেই আমার ডান হাতটা তার দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছিলো?!
আমার কেনো জানি মনে হলো,
পৃথিবিটা যেনো ঘূর্ণনরহিত!
বায়ু যেনো প্রবাহহীন,
সমুদ্র যেন স্তব্দ!
প্রকৃতি যেনো বিরাট এক শবদেহ!
অনেক্ষন আমি সমাধিস্থ মতো অতসীকে দেখছিলাম।
অতসী যেনো শূন্যতায় স্থির!
কতক্ষন যে অতসী আমার হাত ধরে বসে ছিলো তা জানিনা।
তবে মনে হলো চারদিকে আঁধার নামছে।
রায় বাড়ির ঠাঁকুর ঘরে শঙ্খ আর উলুধ্বনি বেজেছিলো।
মোল্লা বাড়ির মসজিদ থেকে বেজে আসছিলো মুয়াজ্জিন এর "আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার"
তখন আমি অতসীর হাত থেকে আমার হাত ছড়িয়ে নিলাম।
অতসী সচকিত হয়ে একবার আমার দিকে মুখ তুলে তাকালো,
তারপর আবার মাথা নত করে ফেললো।
আমি চেয়ার টেনে উঠে পড়লাম।
ঘর থেকে বেরুবার সময় একবার অতসীর দিকে তাকালাম।
ঘরে তখনও বাতি দেয়া হয় নি।
চাপা অন্ধকার!
তার মাঝেই আমার মনে হলো,
অতসী যেনো ঢুকরে কেঁদে উঠলো।
কাঁদছে নাকি মেয়েটা?
কাঁদুক,
কান্না করা ভালো।
এতে মন ভালো থাকে।
হঠাৎ করেই আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিলো।
মনকে বুঝালাম,
ও কিছুনা।
এ্যাসিডিটির প্রবলেম।
তবে যে দীর্ঘশ্বাস টা পেলেছিলাম,
সেটা কে কি স্বান্তনা দেবো আমি?
কখনও কখনও জীবন বড় একাকী,
পৃথিবী যেনো বেশী ধীর!
অনাবশ্যকভাবে আমি মনের প্রতিটি আর্টারী অবলোকনে ব্যাস্ত!
হৃদয়ে আজ শূন্যতা ভিন্ন কেউ নেই।
একাকী এ সন্ধ্যায় প্রহরে আমার মনে হলো আমার হৃদয় যে বড় ক্ষুধার্ত।
আমার যে একটা সে খুব দরকার!
একটা অতসী,শুধুই একটা অতসী।
কিন্ত পরক্ষনেই মনে হয়,
না ফারাবী............
অতসী হিন্দু,তুই মুসলিম।
তোর সামনে ধর্মের কাঁটাতার!
সমাজের গলে যাওয়া পঁচা নিয়ম।
আর কঠিন কন্টকময় ভবিষ্যৎ।
এ যে পাপ নয় আবার এতে পাপও হয়।
.
এভাবেই চলছে আমার আর অতসীর দিনকাল।
এর মধ্যেই আমার কলেজ লাইফ শেষ হলো।
অতসী মেট্রিক দেবে।
আমি অতসীকে সীমাহীন ভালোবাসি।
অতসীও আমাকে অনেক ভালোবাসে।
ওই দিন অতসী আমাকে চিমটি কেটে বলেছিলো,
"ফারাবী, আমাকে চুড়ি কিনে দেবে? "
আমি অতসীর মুখের পানে তাকিয়ে ছিলাম ক্ষনকাল।
দেখতে লাগলাম,
কি করে লজ্জায় অবনত হয়ে যাচ্ছে অতসী রায়,
পুরো গোধূলী আকাশের লালীমা যেনো ভর করছিলো অতসীর চেহারায়।
আমি মৃদু হাঁসলাম।
এ হাঁসির অর্থ অনেক,
তবে এ মুহূর্তে নিরর্থক!
আমি বাজারে গিয়ে কাঁচের চুড়ি কিনে এনেছিলাম।
অতসী সে চুড়ি হাতে দেয় নি।
তবে মনাদের বাগান থেকে বকুল ফুল কুড়িয়ে বানানো মালাটা যখন অতসীর গলায় পরিয়ে দিয়েছিলাম,
সেদিন অতসীর চোখে আমি কিছু একটা দেখতে পেয়েছিলাম।
সেটা কি ছিলো,
তা আজ আমি বুঝি।
পুরো মাত্রায় বুঝতে পারি।
অতসী সে মালাটা গলায় দিয়ে রাখতো সবসময়।
আমি যেদিন চলে যাবো শহরে,
সেদিন কদম গাছের নীচে অতসী ঠায় দাড়িয়ে ছিলো।
চোখে অশ্রুর বন্যা।
আমার হাতটা ধরে রেখেছিলো অতসী।
সে যে কি শক্ত বাঁধন,
তা কেউ বুঝবে না।
আমি নিজেকে খুব শক্ত করে রেখেছিলাম।
একসময় চোখের জলে বাঁধন ছেড়ে দিলো অতসী।
আমি ধান ক্ষেতের আল ধরে হাঁটছি,
ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তাটা আমার লক্ষ্য।
ঘাড় ঘুরিয়ে অতসীকে দেখতে দেখতে কতবার যে আল রেখে ক্ষেতে পড়েছিলাম,
তার ইয়ত্তা নেই।
কাঁদায় আমার পা মাখামাখি,
চোখের জলকেই বা কই রাখি?
পেছনে দাড়িয়ে প্রান সাথী,
কোথায় পাবো তরে মনপাখি?
ডিস্ট্রিক বোর্ডের রাস্তায় উঠলাম।
পেছনে তাকালাম।
চারপাশ ঝাপসা।
তার মাঝেই যেনো অনেক অনেক দূরে দেখতে পাচ্ছিলাম অতসীকে।
কাকতাড়ুয়ার ন্যায় দাড়িয়ে আছে।
আমি চোখের জল মুখে পা ধুয়ে বাসে উঠলাম।
.
বাস ছেড়ে দেয়,
চোখ মুছতে মুছতে আমি আরেকবার অতসীকে দেখে নিতে চাই।
নয়ন তারে পায়না দেখিতে,
রয়েছে সে নয়নে নয়নে।
আমার মনের আনন্দের রংধনু টা হারিয়ে হেঁসে ওঠে কষ্টের রংধনুর সাত রঙের ছটা।
আমি বড়ই নীরব,নিষ্ক্রিয়, নিষ্প্রভ।
আমার অন্তরে প্রবাহমান বেদনার লাভায় দৃষ্টিগ্রাহ্য সমস্ত কিছুই ক্রমশঃ কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
আমি বাস থেকে দেখতে পাচ্ছি,
ধানের সবুজতা গ্রাস করছে পামরী পোকা,
হলদে হয়ে যাচ্ছে সব।
তবে কি পামরী পোকা...........?
স্বপ্নের তাজমহলের এক একটি ইট খসে পড়ার যন্ত্রনায় উদভ্রান্ত দৃষ্টি আমি বন্ধ করি।
মাথাটা ঝিম ঝিম করতে থাকে।
ঝিঁ ঝিঁ পোকারা খুঁড়ে কায় মগজের কোষ।
এ যে কত বড় কষ্ট,
কত তীব্র যন্ত্রনা।
.
ভার্সিটিতে ভর্তি হলাম,
নতুন বন্ধু নতুন পরিবেশ।
কিছু ভালো লাগছে না,
মন পড়ে আছে অতসীর কাছে।
রাতে বিছানায় যেতে পারি না।
মনটা হু হু করে উঠে।
কখনো কখনো চোখের কোনে জরের অস্তিত্ব টের পাই।
রুমমেট মাঝে মাঝে জিজ্ঞাস করে,
"কি হইছে ফারাবী? "
আমি বলি, "কিছু না,চোখে প্রব"
ছেলেটা কেমন করে যেনো আমার দিকে তাকায়।
তারপর শুয়ে পড়ে।
কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গলে অবাক চোখে আমার দিকে তাকায়।
হয়তো ভাবে,
"কি এমন হলো ফারাবীর?
অঝরে কেনো ঝর ঝর ওই দুই আঁখি? "
ঘুম নেই,হালকা পর্দার মতো ঝুলে আছে অন্ধকার।
জানালার ময়লা পর্দায় ফুরফুরে বাতাস।
জানালার সাথে লাগোয়া খাট।
মশারি থেকে মাথাটা বের করে পর্দাটা সরিয়ে দেই।
একটা সিগারেট ধরাই,
ফাইভ ফাইভ সিগারেট।
মনের মাঝে উঁকি দেয় অতসী রায়।
আমি চোখ বন্ধ করে সিগারেট ফুঁকি আর মনের আয়নায় দেখতে পাই,
অতসী শুয়ে আসে আমার পাশের বিল্ডিংয়ে,
ঠিক আমার খাট বরাবর।
অতসীর জানালা থেকে সরে গেছে পর্দা।
ফ্যানের বাতাসে উড়ে উড়ে যাচ্ছে।
হালকা নীল আলো,মশারী টাঙ্গানো নেই.......সাম্য মূর্তির নেয় শুয়ে আছে।
মুখটা ভালো করে দেখা যায় না,তবে বেদনার নীল চাপ স্পষ্ট বোঝা যায়।
চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পুরো বালিশ জুড়ে।
নড়ে উঠে আমার স্নায়ুতন্ত্র।
কেঁপে উঠে বুকের বামপাশ।
বিদ্যুৎ খেলে যায় শিড়দাঁড়া বরাবর।
চোখ খুলে ফেলি।
দপ্ দপ করে জ্বলে উঠে চোখের তারা।
রাতজাগা টিকটিকি টিক্ টিক্ করে উঠে।
অতসী!
ও অতসী রায়!!
মনের ভেতর জেগে উঠা হাতের সুখ মেটানোর পরে গাঢ় চুম্বনের কামনা লহমায় দূর হয়ে যায়।
মনে পড়ে যায় সুনীলের কবিতা,
"এই হাত ছুঁয়েছে নারীর মুখ,
আমি কি এ-হাতে কোন পাপ করতে পারি?"
বাতাস ছুঁয়ে যায় শরীর।
পর্দা নামিয়ে দিলে নিথর রাত।
মনের ক্যানভাসে একটি মুখ,
যেনো একটি অখন্ড রেখা।
.
ঘুম...........
আয় ঘুম আয়।
হাত থেকে পড়ে যায় সিগারেটের ফিল্টার।
ঘুম পাড়ানী মাসী পিসি,
মোদের বাড়ি এসো।
খাট নেই পালঙ্গ নেই,
এ চোখেতে বসো।
ঘুমের প্রতীক্ষায় চোখের পাতা বন্ধ হয়।
একটা স্মৃতি নামক শামুক ধীরে ধীরে চষে বেড়ায় মগজের কোষ।
.........
মুখটি বারান্দায়,
জানালার পর্দা নির্দিষ্টরূপে ফাঁক হয়ে যায়,
স্পষ্ট হয়ে উঠে সব।
নাকের ডগায় চশমা,
পিঠ জুড়ে কালো লম্বা চুল।
ফুলের চারা লাগানো হয় আমার স্বপ্নে।
ফুলে ফুলে ভরে যাবে আমার বারান্দা,
ভরে যাবে পৃথিবী,
পাখি গেয়ে উঠবে গান।
বাতাসে চুল উড়ে,
উড়ে বেগুনী ওড়না,
উড়তে থাকে সীমাহীন আকাশে একঝাঁক স্বপ্ন বলাকা।
মনের মধ্যে হালকা সুর।
রবীন্দ্র!
নজরুল!!
কোনো পল্লীগীতি!!!
.......
না,বারান্দা থেকেই যেনো এ সুর একান্ত নিজস্ব হয়ে ভেসে আসছে মনের বারান্দায়।
আমি স্পষ্ট দেখতে পাই,
হাতের উল্টো পিঠে কপালের চুল সরিয়ে অতসী দৃষ্টি দেয় জানালার দিকে।
কেঁপে উঠে অন্তর,
ধসে পড়ে মনের শিলাস্তর ভূ-পৃষ্ঠের গভীরে।
আবারো মনের টবে শিল্পিত হতে থাকে দুটি হাত।
কাজ শেষ হয়,
চলে যায় অতসী।
আমার অতসী,
অতসী রায়।
সে কি আরেকটু থাকতে পারে না স্বপ্নে?
জানালার পর্দার সাথে লেপ্টে অপেক্ষা,
যদি বা আবারো.......।
সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ে পরবর্তি ঢেউয়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে।
সে আসবে,
চুল উড়বে,
বাতাস হাঁসবে।
........আসে না,কূল ভেঙ্গে যায় মনের।
নোনা জলে ভেসে যায় আমার দু চোখের বালুকনা।
.
.
তিনটে মাস ভার্সিটিতে খুব ব্যাস্ত ছিলাম।
আজ গ্রামে ফিরে যাচ্ছি।
অনেকদিন পর যাচ্ছি।
অতসীর সাথে দেখা হবে,
কথা হবে,
চোখে চোখ রাখা হবে।
ভাবতেই কেমন জানি লাগছে।
ট্রেনে উঠে পড়লাম।
গার্ডের বাঁশি বাজে,
সবুজ পতাকা দুলতে থাকে এদিক ওদিক।
আমার মনের কষ্টের মেঘ কেটে হেঁসে ওঠে রংধনুর সাত রঙ্গের ছটা।
যথারীতি বাড়ি এলাম।
মাকে জড়িয়ে ধরলাম।
সে কি কান্না গো মায়ের।
আমি ফ্রেশ হয়ে আসি,
মা আমার জন্য ভাত বাড়ে।
মুরগীর সালুন আর টক ডাল।
খেতে বসে কত রাজ্যের গল্প করি।
শহরের গল্প,
বন্ধুদের গল্প।
শুধু বলতে পারিনা অতসীর গল্প।
তাকে না দেখে এ তিনটে মাস কেমন করে কাটলো,
সে গল্প বলতে পারি না আমি।
খাবার শেষে মা বললো,
---- কি রে?
---- বলো মা।
---- অতসীর কথা মনে আছে?
---- হ্যাঁ (কথাটা বলতেই মনটা কেমন জানি করে উঠলো)
---- তার বাবা তার বিয়ে ঠিক করেছে।
---- কি যা তা বলছো?
---- হুম,অতসী রাজি হয় নি।
---- তারপর?
---- তারপর আর কি?
---- সে নাকি কোন ছেলেকে ভালোবাসে।
ছেলে শহরে পড়ে।
---- তারপর কি মা?
---- কতবার রায় সাহেব ছেলের নাম জিজ্ঞাস করলো,
পোড়ামুখী একবারের জন্যেও বলেনি।
বলে কিনা, সে আসলে বলবো।
---- কি বলো মা?
---- হুম,সে ছেলেটাও আর এলো না।
অভাগী আজ সকালে গলায় কলসী বেঁধে তালপুকুরে ডুবে মরলো।
---- আমি বিশ্বাস করি না মা।
---- তুই এমন করছিস কেনো?
একটু আগেই তো শশ্মান ঘাটে নিয়ে গেলো অতসী কে।
---- আমি যাই মা।
---- কই যাস?
---- শশ্মান ঘাটে।
---- কেনো?
---- পরে বলবো মা।
---- এই ফারাবী!
বাবা দাড়া, মাত্র তো এলি.......
.
মা পেছন থেকে ডাকছে আর আমি সামনের দিকে ছুটছি।
আমার অতসী মরতে পারে না।
শশ্মান ঘাটায় যাবার সময় অতসীদের বাড়িতে উঁকি দিলাম।
সুনসান নীরবতা পুরো বাড়ি জুড়ে।
আমার বুকটা হু হু করে উঠলো।
চিৎকার করছি পাগলের মতো,
আর দৌড়াচ্ছি।
আমার অতসী মরতে পারে না।
মিথ্যে সব,সব মিথ্যে শুনেছি আমি।
আমি শশ্মানে চলে এলাম।
চন্দনের পর চন্দনের কাঠ দিয়ে সাজানো হলো চিতা।
মাঝখানে আমার অতসী।
চন্দনের ফোটার তিলকে কি যে সুন্দর লাগছে গো।
অমর এক ভূবন ভোলানো হাসি মুখে চোখ বন্ধ করে আছে আমার অতসী।
রায় সাহেব মুখাগ্নি করলেন।
দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো চিতা।
সে সাথে আমার কলিজাটাও।
অতসীর মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
আঁচলে মুখ চেপে কান্না করছেন তিনি।
আমিও কাঁদছি,
আকাশ বাতাস কে জানিয়ে কাঁদছি।
আমার অতসী,
অতসী রায় আমার.....!
রায় সাহেব আমার সামনে এসে ঢুকরে কেঁদে দিলো।
আমি দুজনকেই জড়িয়ে কাঁদছি।
ওগো কান্না........
মরা কান্না গো......
তুই কার গো......?
আমি অনেক্ষন দাড়িয়ে ছিলাম,
শুধু অতসীর হৃদয়টা দেখার জন্য।
আমি দেখতে চেয়েছিলাম অতসীর পোড়া হৃদয়,
সেটা কি আমার হৃদয়ের চেয়ে বেশী পোড়া কিনা।
কিন্ত নিষ্ঠুর পাষান লাল আগুন,
চন্দনের মাঝেই বন্ধন কে জ্বালিয়ে ছাই বানিয়ে দিলো।
আমার না দেখা হলো আর অতসীকে,
না দেখলাম তার হৃদয় টা কে।
তারপর আমি চলে আসি শশ্মান থেকে।
আমার সাথে চলে আসে বুলু।
অতসীর কুকুরটা।
.
তারপর থেকেই আমি কেমন যেনো নীরব হয়ে গেছি।
পুরো নীরব।
মাঝে মাঝে চোখে জল আসে,
বেশীর ভাগ সময়ই আসে না।
আর আসলেও সেটা আমি মুছি না।
কখনো কখনো অতসীর কুকুরটা কুঁই কুঁই করে কেঁদে উঠতো।
আমি বুলুকে জড়িয়ে ধরতাম।
বুলু আমার কোলে মুখ গুঁজে দিতো।
আমি যেনো দেখতে পেতাম,
সামনের বেল গাছের পাতার আড়ালে আমার অতসীর মুখ।
রাজ্যের বিষন্নতা নিয়ে উঁকি দিয়ে আছে।
.
মাঝে মাঝে বারান্দায় দাড়াতাম।
বারান্দায় দাঁড়াতে আর ভাল্লাগেনা।
দরজাটা বন্ধ করে ড্রয়ার হাতড়ে খুঁজে বেড়াতাম ঘুমের ট্যাবলেট।
একসাথে কয়েকটা মুখে পুরে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে নিতাম।
তারপর বালিশে কয়েকটা মৃদু চড় দিয়ে শুয়ে পড়তাম।
ঘুম.......
একটু শান্তি.......
একটু শান্তির ঘুম...!
ঘুমের ঘোরে দেখি,
এগিয়ে আসে একটা শরীর।
পরনে সেই সেলোয়ার কামিজ।
গলায় সেই বকুলের মালা।
হাতে প্রথম দেয়া সেই কাঁচের চুড়ি।
মুখটা ভালো করে দেখা যায় না।
আলো ছায়ার খেলা তাতে।
চেনা চেনা মনে হয়,
তবুও ঠিক যেনো চিনে উঠতে পারি না।
এগিয়ে আসে সে,
আমাকে শোয়া থেকে উঠিয়ে বসায়।
ডান হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে বাঁশের কঞ্চি ঢুকিয়ে ভূমিতে চেপে ধরে।
তারপর ক্রমাগত দাগ কাটতে থাকে মৃত্তিকার আঁচলে।
রহস্যময় সে চাঁপাকলির মতই আঙ্গুল দিয়ে হাত চেপে ধরে ক্রমাগত সৃষ্টি করে চলে ভালোবাসা।
আর আমার বুকের বামপাশটা মোচড় দিয়ে উঠে,
মনের অজান্তেই বলে ফেলি,
অতসী........
অতসী রায় আমার।
.
এই টুকু বলে থেমে গেলাম।
টিস্যু নিয়ে চোখ মুছলাম।
তাকিয়ে দেখি ছেলে মেয়েরা কাঁদছে নিরবে।
আমি বললাম,
কোনো ইমোশনাল হয়ে লাভ নেই।
ইজি হও সকলে।
একটা ছাত্রী উঠে দাড়ালো।
চোখ মুছতে মুছতেই বললো,"আপনি কি এখনো অতসী রায় কে ভালোবাসেন স্যার? "
আমার দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে গেলো।
তারপরও জবাব দিলাম,
"হ্যা ভালোবাসি তো"
মেয়েটি বললো,
"কেনো স্যার? "
আমি বললাম,
"সে যে আজও প্রতিটি নীরব রাতের সাক্ষী,
সে যে আমার অতসী,
অতসী রায়.........."
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now