বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি নামল।ঝুম বৃষ্টি।দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ছোঁয়ার চেষ্টা করলাম। বৃষ্টির কয়েকটা ফোঁটা এসে মুখের ওপর পড়ল। একটু পরেই শুরু হল বাতাস। প্রকৃতির পাগলামি আজ একটু বেড়েছে। বৃষ্টি এলেই পুণ্যিকে খুব মনে পড়ে। মেয়েটা ভীষণ বৃষ্টি পাগলি ছিল। ক্লাশ শেষে প্রায়ই আড্ডা দিতাম............
.
পুণ্যি বলতো........"ইস যদি বৃষ্টি হত।কেন যে বছরের ছয়টি ঋতুই বর্ষা হলোনা। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজতাম।"
.
পুণ্যির কথা শুনে হাসতাম।বলতাম..........."এক ঋতুর বর্ষাতেই ঢাকার রাস্তা ঘাটের যে অবস্থা হয়। আর ছয় ঋতু বর্ষা হলে তো ঢাকা কে খুঁজে পাওয়া যেতোনা।"
.
পুণ্যি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলতো........"অনেক রষকষ হীন মানুষ তুই। একটুও কি বদলাবি না.....? আচ্ছা তোর বউ যদি কখনো বলে ‘ দেখ,চাঁদটা কত সুন্দর’ তুই নিশ্চই তখন বলবি চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই।সবটাই সূর্য থেকে ধার করা। তুই আসলেই একটা আঁতেল। চোখের সামনে থেকে দূর হ.....।”
.
আমি পুণ্যির দিকে তাকিয়ে দেখতাম ওর চোখ ছলছল করছে। মেয়েটা বড় বেশি অভিমানী। পুণ্যির সাথে বৃষ্টিতে ভিজতে সেদিন খুব ইচ্ছে করছিল। প্রচন্ড। কিন্তু সাধ্য ছিলনা।
.
..
.
পুণ্যি ছিল সুন্দর মেয়ে। দোহাড়া গড়ন। পাতলা শরীর। চোখে মুখে লাবণ্যতার কমতি ছিলনা। প্রতিদিন ছোট্ট একটা টিপ পড়তো। কপালের ঠিক মাঝখানে। মনে হতো প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝে ছোট একটি দ্বীপ। ভালোবাসার অথৈ সমুদ্রে পড়া নাবিক যেখানে শেষ আশ্রয় নিতে পারে............
.
আমাদের ক্লাসের মাহফুজ ছিল ওর অন্ধ ভক্ত। পুণ্যিকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। মাহফুজটা ছিল বেশ লাজুক প্রকৃতির। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতোনা। আমাকে অনেক অনুরোধ করেছিল পুণ্যিকে মাহফুজের ব্যাপারটা খুলে বলতে।
.
আমি ধমক দিয়ে বলেছিলাম.........
.
:-- এসব ব্যাপারে নিজেকেই আগাতে হয়। আমি পারি তোকে খুব সুন্দর একটা চিঠি লিখে দিতে। তুই পুণ্যির বইয়ের ভেতর রেখে দিবি।
.
)- এই ফেসবুকের যুগে ওকে চিঠি দেব....!কী বলিস তুই....?"
.
:-- চিঠি হচ্ছে নান্দনিক ভালোবাসার এক অনন্য স্মৃতিস্মারক......। ধর আজ থেকে চল্লিশ বছর পরে ফেসবুক নাও থাকতে পারে। কিন্তু তোর চিঠিটা থাকবে। পুণ্যি তখন বুড়ী হয়ে যাবে.....। খুরখুরে বুড়ী। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে হয়তো তোর চিঠি পড়ে শোনাবে নাতী নাতনীদের। আর বলবে এটা আমার প্রথম প্রেমিকের চিঠি..........
.
-- তোর যুক্তি ঠিক আছে। একটা কাজ করবি? আমাকে একটা চিঠি লিখে দে। যা খেতে চাস খাওয়াবো...........
.
:-- কিছু খাওয়াতে হবেনা। লিখে দেব..............
.
..
.
পরদিন তিন লাইনের একটা চিঠি লিখে মাহফুজকে দিলাম...............
.
....পুণ্যি,,জীবনের সকল স্বপ্নে তোমাকে চাই। জীবনের সকল ভালোবাসায় তোমাকে চাই। আজন্ম কাল আমি তোমাকে চাই !
.
ইচ্ছে করেই মাহফুজের নাম লিখলাম না। যদিও ওর নিষেধ ছিল।এটাকে চিঠি বললে ভুল হবে। চিরকুট। প্রথম বারের মত কারো প্রক্সি দেয়া। চিরকুটটা পুণ্যি পড়েছিল..........
.
এরপর আমার কাছে এসে বলল............
.
::-- তুই আমার বইয়ের ভেতরে কিছু রেখেছিস......?
.
আমি থতমত থেয়ে গেলাম..........
.
বললাম..........
.
:-- কই নাতো,কি....?
.
::-- আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল......?
.
কিছু কিছু চোখ আছে পবিত্র। যার দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলা যায়না। আমি গড়গড় করে সব বলে দিলাম। মাহফুজের ব্যাপারটাও বুঝিয়ে বললাম। আমার কথা শুনে মনে হল পুণ্যি ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট পেয়েছে..........
.
..
.
চাপা কন্ঠে বললো..........
.
::-- অন্যের হয়ে চিঠি লিখতে তোর লজ্জা করেনা....? কখনোতো আমাকে নিয়ে কিছু লিখিসনি। আর ফেসবুক খুললেই হোম পেজে তোর কবিতা ভর্তি। আমার জন্যে কিছু একটা লিখে দে। যেটা সম্পূর্ন ই আমার............
.
:-- শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতাটা আমি তোর জন্যে লিখবো..........
.
পুণ্যি হাসলো। কান্না চাপা হাসি............
.
কিছুদিন পর পুণ্যিকে একটা কবিতা লিখে দিলাম............
.
....( আমার আকাশ ভরা মেঘ
তোর আঁচল ভরা নীল
আমার আবোল তাবোল কাব্যে
তুই অবাক অন্ত্যমিল।
আমার রাতের নীরবতা
তোর আলতো পায়ে আসা
আমি পাবোনা জেনেও
শুধু তোকে ভালোবাসা।
তুই মেঘের মাঝে লুকাস
তোর কান্না ভেজা চোখ
আমি চাইছি এবার তবে
ভালোবাসার বৃষ্টি হোক।
আমি ভিজবো তার ই ধারায়
যদি হাতে রাখিস হাত
তুই বর্ষা দেশের রাণী
আমার ভেজা শ্রাবন রাত )....
.
প্রথম চার লাইনে ভালোবাসার কথা লেখা ঠিক হয়নি। আসলে কবিতার অন্ত্যমিলের জন্যেই শব্দটা দেয়া। ‘আসা’ এর সাথে মিল রাখতে হলে ভালোবাসা শব্দটাই যথার্থ। এছাড়া যে শব্দ গুলো মাথায় আসে তা বেশ হাস্যকর। দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে পুণ্যিকে কবিতাটি দিলাম।
.
বললাম............
.
:-- তোর জন্যে..........
.
..
.
কবিতাটি পড়ে পুণ্যি কিছুক্ষন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত আছে যা মনে হয় অনাদি কাল চলতে থাকুক। এই সময়টুকু যেন হবার নয়। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি যখন একধারায় এসে মিলিত হয় তখন তৈরি হয় স্বপ্নময় এক বাস্তবতা। মনে হয় সমস্ত পৃথিবীটা শুধুই ভালোবাসাবাসির।
.
আমি পুণ্যির চোখের সামনে হাত নাড়ালাম। ওর চোখের পলক পড়লো। সাথে এক ফোঁটা জল। চোখের পানি পড়ার কোন কারন খুঁজে পেলাম না। এটা কি ভালোবাসার জল নাকি অনেকক্ষন পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকার নিছক এক ফোঁটা তরল। বুঝলাম না..........
.
আমি বললাম..........
.
:-- কিরে কিছু বলবি....?
.
::-- মিথ্যা কথা কবিতায় লিখেছিস ক্যানো....? আমাকে তো তুই ভালোবাসিস না। তারপরেও কেন লিখলি....?
.
:-- শোন কবিতার অন্ত্যমিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তাই কবিতার জন্যে মিল দিতে গিয়ে.............
.
আমার কথা শেষ হবার আগেই ও হনহন করে চলে গেল। আমি ওকে থামাতে গিয়েও থামালাম না। শুধু ভাবলাম মেয়েদের মন অনেক জটিল সমীকরনে গড়া একটি সরল অংক যার ফলাফল বের করা দুরহ।
.
পরের বেশ কিছুদিন পুণ্যির কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলাম। পুণ্যিকে আশে পাশে দেখলে চলে যেতাম। ক্লাশেও ওর থেকে দূরে বসতাম। পুণ্যি বুঝতো। মাঝে মধ্যে আমার দিকে তাকাতো। আবার চোখ নামিয়ে ফেলতো........
.
মানুষ হিসেবে আমি খুব জঘন্য প্রকৃতির। মানুষের ভালোবাসার মূল্য দেইনা। আবেগের মূল্য দেইনা। আমি বুঝতাম পুণ্যি আমার প্রেমে পড়েছে। এবং ভয়ংকর ভাবে। আমি যে পড়িনি তাও না। ভালোবাসা নামক অদৃশ্য এই বস্তুটা কারো মনে একবার জন্মালে তাকে আর থামিয়ে রাখা যায়না। আর যদি ভালোবাসার মানুষটা তা গভীর ভাবে অনুধাবন করতে পারে তাহলে তো কথাই নেই।
.
নিউটনের গতিতত্ত্বের তৃতীয় সূত্রের মত তার হৃদয় থেকে ভালোবাসা ফেরত আসবে। অবশ্য অনেকের ব্যাপারেই এটা হয়না। ভালোবাসার মত ভালোবাসলে গভীর প্রেমের মহাস্রোত কখনোই এক দিকে ধাবিত হতে পারেনা। তবুও কখনো কখনো ভালোবাসাটা এক তরফা হয়ে যায়। ইচ্ছে থাকলেও উপায় থাকেনা। সামাজিক আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দুটি মনকে আলাদা করে রাখে। আমিও পারিনি। আমাদের সমাজটা খুব অদ্ভুত। মানুষ যন্ত্র না তাই তাকে অনেক যন্ত্রনা সহ্য করতে হয়।
.
সকল প্রকার কষ্টের মধ্যে তাই ভালোবাসার কষ্টটাই প্রখর। হৃদয়টাকে কার্বন মনো অক্সাইডের মত নীরবে শেষ করে দেয়। পুণ্যিকে ভালোবাসার ক্ষমতা থাকলেও তা প্রকাশ করার মত শক্তি আমার ছিলনা। পুণ্যি সৃষ্টিকর্তাকে ভগবান নামে ডাকে আর আমি আল্লাহ। নাম দুটির সত্তা একজন হলেও এরমাঝে ব্যবধান বিস্তর। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আর গতানুগতিক জীবনের মাঝে এক অভেদ্য দেয়াল। যা ভেদ করা গুরুতর অপরাধ।
.
তাই নিজ থেকেই ব্যবধান বাড়ালাম। পুণ্যি বুদ্ধিমতি মেয়ে। সহজেই ধরে ফেলল। ব্যবধান জিনিসটাই এমন। যদি তা একবার বেড়ে যায় তবে তা বাড়তেই থাকে। জীবনের সরল রেখার আবর্তিত পথে বৃত্তের মত করে ভালোবাসা ঘিরে থাকে। আর যখন হতাশা আসে ভাঙন আসে তখন বক্ররেখার মত জীবন এলোমেলো হয়ে যায়। এরই নাম জীবন। আমি বরাবর ই জীবনকে দর্শন দিয়ে বিবেচনা করি। তাই পুণ্যিকে জীবন বৃত্তে জড়ানোর সাহস আমার হয়নি...........
.
..
.
একদিন ক্লাশ শেষে পুণ্যি আমাকে বললো..........
.
::-- তোকে একটা কথা বলার ছিল। তোর কখন সময় হবে....?
.
:-- কাল বিকেলে বলিস। শোন আমার জরুরী কাজ আছে। আসিরে..........
.
পুণ্যির কথা আমার শোনা হয়নি। বিকেলে মাহফুজের ফোন এল। কান্না ভেজা কন্ঠ............
.
:-- দোস্ত, পুণ্যি….ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়।
.
আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ও ফোন কেটে দিল। হাসপাতালে পৌঁছালাম বিকেল চারটায়। তার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে পুণ্যি ঘুমিয়েছে। অনেক ক্লান্তির ঘুম। ওর নীথর দেহটার চারপাশে কয়েকজন ক্লাসমেট। পুণ্যিটা একটু সময় ও দিলনা।
.
ডাক্তার বললেন..........
.
))- লিউকেমিয়া….অনেক দেরি হয়ে গেছে।
.
কিছুক্ষন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পুণ্যির কপালের টিপটা তখনো স্পষ্ট শোভা পাচ্ছিল। একটু বাঁকিয়ে গেছে। বরাবরের মত ওকে ছুঁতে গিয়ে হাত গুটিয়ে নিলাম। মনে হলো এক্ষনি পুণ্যির ঘুম ভাঙবে। আমাদের দিকে তাকিয়ে শাষনের সুরে বলবে........."আর কতবার টিপ ঠিক করে দেয়ার অজুহাতে আমায় ছুঁবি? তুই আসলেই একটা ভীতুর ডিম"
.
..
.
মেঘ চিড়ে বৃষ্টি নামলো। ঘন শ্রাবণের অবাধ বর্ষণ। জীবনে প্রথম বারের মত খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করলো। পুণ্যির হাত ধরে। মনে পড়লো পুণ্যি কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। পুণ্যির শান্ত মুখটির দিকে শেষবারের মত তাকালাম। কিছু একটা বলতে চাওয়ার প্রবল আকুতি..........
.
মনে হলে হয়তো ও বলবে ওর প্রিয় মিফতাহ এর সেই গানটি........
.
"জীবনের সে হিসেবে যদি
মিলে যায় সময়
তোমায় যাবো নিয়ে
ভিজতে ইচ্ছের বর্ষায়.............
..
..
এখনো যখন বৃষ্টি নামে আমি বৃষ্টিতে অবিরামভাবে ভিজি, আর চোখ বন্ধ করে কল্পনা করি পুন্যি আমার সাথেই আছে...!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now