বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

লাল পাড়ের সাদা শাড়ি ও মিলি

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X সামনে খুব সুন্দর একটি বাগান; বাগানে ঢুকলে যে কারও চোখ এক নিমেষেই জুড়িয়ে যায়। কোথাও ফুল গাছ, কোথাও পাতাবাহার, কোথাও আছে ফলের গাছ। ছোট্ট বাগানটি এত পরিপাটি করে সাজানো দেখলে মন তো জুড়ে যাবেই। মিলি খুব যত্ন করে এই বাগানটি গড়ে তুলেছে। এক মাস নয় ছয় মাস নয়, কয়েক বছরে। মিলি আজ লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে বাগানটিতে ঢুকেছে; মনে হচ্ছে কোনো রূপকথার রাজকন্যা এই পৃথিবীতে নেমে এসেছে। সে খুব যত্ন করে গাছগুলো দেখছে, শুকিয়ে যাওয়া গাছের গোড়ায় সে সবসময় জল দিয়ে বেড়ায়। তবে আজ জল দিতে হচ্ছে না, কাল সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো বাতাস; রাতের নির্জনতাকে ভেঙ্গে তুমুল শব্দ উঠেছিল বাগানটিতে। বাগানের পেছনে থাকা মিলিদের দোতলা বাড়িটাতে সেই শব্দ শোঁ শোঁ করে ঢুকছিল। মিলির রুমের একটি জানালার কপাট বাতাসের তীব্র বেগে খুলে গিয়ে বারবার এদিক ওদিক নড়ছিল আর শব্দটাকে আরও বেগমান করে তুলছিল। জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে পর্দাটাকেও উড়াচ্ছিল পতাকার মতো। যে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে তড়াৎ করে উঠে যেত এমন শব্দ আর বাতাসের হুংকার টের পেয়ে। মিলি উঠছিল না, সে যেমন করে শুয়ে ছিল তেমন করেই অনড় রইল। সে যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন এমনটি নয়। তার চোখ খোলা ছিল, তার চুলগুলো এলোমেলো ভাবে উড়ছিল, সে জাগ্রতই ছিল। প্রকৃতির এই ভীষণ মুহুর্তে সে ছিল মোহগ্রস্ত। আগের একটি ঘটনা নিয়ে সে স্মৃতিকাতর হয়ে উঠেছিল তখন। সেই ঘটনাটা আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে। ২ সেদিন আকাশটা বেশ পরিষ্কার ছিল। শেষ রাতে খানিকটা বৃষ্টি হয়ে আকাশে জমে থাকা খন্ড খন্ড মেঘগুলোও বিলীন হয়ে গিয়েছিল সেদিন। সকাল থেকে আকাশ তাই নির্মল আনন্দে রোদ ঝরাচ্ছিল। মিলি সেদিন খুব ভোরে উঠেই ল্যান্ডফোনের কাছে চলে গেলো। মিলির নিজের কোনো মোবাইল ছিল না, এই ল্যান্ডফোনই তখন ভরসা। ল্যান্ডফোনের ডিজিট টিপে ফোন দিল নিলয়ের বাসায়। নিলয়ের আম্মু ধরল। -হ্যালো, কে? -আন্টি, আমি মিলি। কেমন আছেন আন্টি? -ও মিলি। আমি ভালো আছি মা। তুমি কেমন আছ? -আমি ভালো আছি আন্টি। আন্টি, নিলয় কি উঠেছে? -নিলয় তো এখনো উঠেনি মা। - আন্টি, প্লিজ, নিলয়কে একটু উঠিয়ে দেন না এখন। কথা আছে একটু। -আচ্ছা, দাঁড়াও, আমি ওকে এখনই ডেকে আনছি। প্রায় পাঁচ মিনিট পরে নিলয় এল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে বলল- কীরে, তোর কী হয়েছে? তুই এত সকালে! ঘুমাতে দিবি না নাকি? আজ তো ভার্সিটি বন্ধ। তুই কেন ফোন দিলি? -আজ ফোন না দিলে আর কোনো দিন ফোন দেওয়া হবে না। -মানে? কী বলছিস তুই? - আজ ১৪০৮ সালের প্রথম দিন। জানিস না, বাংলা বৎসরের প্রথম দিন মানুষ যা যা করে সারা বছর সে তাই করে। -তোর এই আবোল তাবোল কুসংস্কারগুলো বন্ধ করবি? -দেখ, এটা আমাদের মা-বাবারা বিশ্বাস করে। তুই এই নিয়মকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিস না। এখন কথা হচ্ছে, তোকে নিয়ে এখন ঘুরতে বের হবো। তাহলে সবসময় তোকে নিয়ে ঘোরা হবে। আমি চাই, তোকে নিয়ে সারাজীবন দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াব। তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আমাদের বাসায় আয়। -বাঃ, আমার বয়েই গেছে তোর সাথে ঘুরে বেড়াবার। আমি এখন ঘুমাবো। তুইও ঘুমা। -দেখ, ভালো হবে না কিন্তু। আমি এখনই রেডি হবো, তুই তাড়াতাড়ি আয়। -আমি কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলাম। আমি পারব না বের হতে। বাই। ফোন রেখে দেওয়ার শব্দ আসে মিলির কানে। মিলির মুডটাই খারাপ হয়ে যায়। ছেলেটাকে নিয়ে সে আর পারে না। একেক সময় এমনভাবে ভালোবাসবে যেন তাকে স্বর্গের আনন্দ দিবে। আবার আরেক সময় এমন বিহেভ করবে যেন সে তার কেউই না। সে ভাবতে লাগল, কয়েকটা দিন নিলয়ের সঙ্গে কথা বন্ধ রাখতে হবে, তাহলেই তার শিক্ষা হবে। কিন্তু ভাবনাটা বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারল না। কিছুক্ষণ বাদেই নিলয় হাজির। পাঞ্জাবী পরা নিলয়কে তখন উপন্যাস থেকে উঠে আসা নায়কের মতো লাগছে। এই ছেলেটাকে দেখলেই মিলির এত মায়া হয়, তার সঙ্গে কি আর রাগ করে থাকা যায়? নিলয় আজ একটা শাড়ি এনেছে, লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। নিলয়ের কঠিন আবদারের মুখে সেই শাড়িটাই পরতে হলো । বাবার দেওয়া নতুন ড্রেসটা পরতে চেয়েছিল, কিন্তু নিলয় কিছুতেই দেবে না। শেষ পর্যন্ত মিলির বাবাই বলল – ছেলেটা এত শখ করে যখন এনেছে, তখন এটাই পর। নিলয়কেও বলল –দেখো, তুমি এখনো স্টুডেন্ট, তুমি এভাবে টাকাগুলো খরচ করো না। আগে প্রতিষ্ঠিত হও, তারপর ইচ্ছেমতো খরচ করো। পাঞ্জাবী পরা নিলয় আর শাড়িতে মোড়ানো মিলি বাসা থেকে বের হয়ে রিকশা নিল। রিকশার হুড নামিয়ে তারা যেতে শুরু করল প্রাচীন বট গাছটির দিকে। রিকশায় বসে একজন আরেকজনের সঙ্গে এমন খুনসুটি করছিল যে রিকশাওয়ালা পর্যন্ত মিটমিটিয়ে হাসছিল। এই শহরের মধ্যে এই বটগাছটি সবার চেনা। বৈশাখের প্রথম দিনে এখানে বেশ উৎসব উৎসব ভাব হয়। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসে এই উৎসবে সামিল হতে। একটি বড় সাংস্কৃতিক সংগঠন বর্ষবরণের নানান আয়োজন করে এই বটমূলে। আজকেও সকাল থেকেই অসাধারণ কিছু সমবেত গান উপহার দিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। মিলি এই গানগুলো শুনতে খুব ভালোবাসে। তাই নিলয়ের হাত ধরে এখানেই প্রথমে চলে এসেছে। কয়েকটা গান শুনে তারপর অন্য জায়গায় যাবে, নিলয়ের হাত ধরে সারাদিন ঘুরে বেড়াবে- এটাই মনে মনে ঠিক করে রেখেছে সে। গান শোনার ফাঁকে ফাঁকে মিলি নিলয়কেও মাঝেমধ্যে দেখে নিচ্ছে। নিলয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে নিলয়কে ঠান্ডা জল খেতে বলছে। কিন্তু নিলয়ের এক কথা, সে এখন জল খাবে না। নিলয়, ছেলে হিসেবে খুব একরোখা। তার যেটা করতে জেদ উঠবে সেটা সে করেই ছাড়বে। একবার এক মেডিকেলের ছেলে মিলিকে খুব ডিস্টার্ব করত, মিলির পাশের বাড়িতেই থাকত ছেলেটা। সে মিলির কানে বিভিন্ন ভাবে খবর পাঠাত, মেডিকেলের ছাত্র বলে খুব পার্ট মারত। বলে বেড়াত – দেখো, তুমি যার সাথে চলে বেড়াও, তার কোনো ভবিষ্যত নেই। তোমাকে সে পরে ঠকাবে, দেখে নিও। আমাকে নিয়ে একটু ভাবো। জীবন কিন্তু তোমার হাতেই। এসব খবর যখন নিলয়ের কানে পৌঁছল, সে ঐ ছেলেকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। চ্যালেঞ্জ হলো- সে ঐ ছেলেকে ১ নম্বরের হাঁদারাম প্রমাণ করবে। এমন কথা শুনে, ঐ ছেলের প্রেস্টিজে লাগল, সে ভয় না পেয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করল। ঠিক হলো, মিলির সামনে আইকিউ টেস্ট হবে। যেই কথা সেই কাজ। তুমুল লড়াই চললো সেদিন, মিলি তো ভয় পাচ্ছিল, নিলয় হেরে গিয়ে না জানি আবার মারামারি শুরু করে দেয়। না, তা আর হলো না। ছেলেটিকে হার মানতেই হলো নিলয়ের কাছে। হার মানতে হলো নিলয়ের ভালোবাসার কাছে, জেদের কাছে, বুদ্ধির কাছে। ৩ বটমূলের সেই উৎসবে মানুষ যেন খুব বেশিই হয়েছিল। গরমটাও পড়ছিল একটু বেশি। দরদর করে নিলয়ের ঘাম ঝরছে দেখে মিলি এবার বুদ্ধি করে বলল, নিলয়, আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে, তুই একটু ঠান্ডা জল এনে দে প্লিজ। নিলয় এবার যেতে উদ্যত হলো। একটি ছায়াযুক্ত স্থানে মিলিকে বসিয়ে সে ভিড় ঠেলে ঠান্ডা জলের বোতল আনতে ছুটে গেল। মিলি, ছেলেটার ছুটে যাওয়া দেখতে থাকল। এই ছেলেটা তাকে খুউব ভালোবাসে। তারা একই ইয়ারে স্টাডি করছে। তারা ঠিক করেছে, যতদিন তারা ভার্সিটিতে আছে, ততোদিন একজন আরেকজনকে তুই বলেই ডাকবে। সেভাবেই ডাকছে তারা। ভিড়ের মাঝে ছেলেটা হারিয়ে যায়। মিলি আফসোস করে, নিলয়কে এভাবে কষ্ট না দিয়ে তাদের বরং অন্য জায়গায় ঘুরতে যাওয়াটাই উচিত ছিল। এই গরমে ছেলেটাকে এখানে রাখাটা ঠিক হচ্ছে না। সে এত গরম সহ্য করতে পারে না। তবু তার জন্য মুখ ফুটেও কিছু বলছে না। ছেলেটার এত ভালোবাসা মিলিকে অবাক করে দেয়। নিলয় যে দিকের ভিড় ঠেলে ছুটে যাচ্ছিল, সেই ভিড়ের মাঝে বিকট একটা শব্দ হয়। তারপর আরও কয়েকটা গগনবিদারী শব্দে চারিদিক কেঁপে ওঠে। ধোঁয়াতে চারপাশ ঢেকে যায়। বটমূলের সব মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। কী হচ্ছে বা কী হয়েছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না তৎক্ষণাৎ। কেউ কেউ চিৎকার দিয়ে বলছে, বোমা ফেটেছে, বোমা ফেটেছে, আরও ফাটবে, সবাই দৌড়ান। সবাই প্রাণপণে ছুটছে। শুধু, একজন ঠায় বসে আছে। নিলয় মিলিকে যেখানে বসিয়ে রেখেছিল, সে সেখানেই বসে রইল। একপাও নড়ল না। ৪ বারো বছর হলো। নিলয় নেই। মিলি সেখানে এখনও যায়। মিলি সেই জায়গাটাতে বসে থাকে। সে ভাবে, নিলয় যদি ঠান্ডা জলের বোতল নিয়ে হাজির হয় সে তখন কী করবে! একবার এলেই হলো, ছেলেটাকে আর কোথাও কখনো যেতে দেবে না। তার কাছে রেখে দেবে চিরকাল। মিলি প্রতিটি পহেলা বৈশাখে নিলয়ের দেওয়া লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে। যতদিন নিলয় আসবে না, ততোদিন পর্যন্ত এই শাড়ি পরেই পহেলা বৈশাখ কাটাবে সে। মিলি ভাবে, নিলয় যদি আবার আসে, আরেকটা নতুন শাড়ি নিয়ে আসবে তার জন্য। সে তখন ঐটা পরবে। সে যদি না পরতে চায়, নিলয় তখন কঠিনভাবে আবদার করবে। তার বাবা এসে ব্যাপারটার মীমাংসা করে দিয়ে যাবে সেদিনের মতো। মিলি নিলয়কে সবসময় অনুভব করার জন্য এই বাগানটিকে গড়ে তুলেছে। এই বাগানটি যেন নিলয়ের মতোই পবিত্র। নিলয় তো এই গাছ, ফুল, পাখিগুলোর মতোই পবিত্র, এটা তো মিলিই ভালো করে জানে। (সমাপ্ত)


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮১ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now